সংবাদ

একান্ত আলাপচারিতায় অধ‍্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

পুঁজিবাদের বর্তমান আগ্রাসন তাকে গভীরভাবে ভাবায়


প্রকাশ: ৫ জুন ২০২৬, ১০:৪৪ এএম

পুঁজিবাদের বর্তমান আগ্রাসন তাকে গভীরভাবে ভাবায়

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। দীর্ঘ দিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন। এখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস। তার আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। তিনি মানুষের জীবনবোধ নিয়ে লেখালেখি করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেন গভীরভাবে। তিনি মার্কসবাদী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। হুবহু তুলে ধরা হলো। 

রাশেদ আহমেদ: আপনি লেখালেখি করেন, অসংখ্য বই আপনার আছে। সেই লেখার মধ্যে একটি জীবনবোধ থাকে, রাজনীতির বিশ্লেষণ করেন। আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করি,সাধারণ মানুষের কথাগুলো তার লেখায় উঠে এসেছেন, সমতার কথা বলেন। এই যে বলা, এই যে লেখালেখি, এটির কি কোনো সফলতা পেয়েছেন? কোনো পরিবর্তন কি সমাজে এসেছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, পরিবর্তন তো হবে না ঐভাবে। কেননা যে ব্যবস্থাটা আমাদের এখানে বিদ্যমান সেটা খুব কঠিন ব্যবস্থা। এবং সে ব্যবস্থা কেবল বাংলাদেশের না, সে ব্যবস্থাটা বিশ্বব্যাপী এখন বিরাজমান। এই বিশ্বব্যাপী যে পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারা তার ফলাফল আমরা দেখছি। যেমন ধরুন নির্বাচনগুলো হচ্ছে। নির্বাচনে যাদেরকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলি, কেবল রক্ষণশীল না, প্রতিক্রিয়াশীল বলি, তারা প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। সেই শক্তিগুলোই বিজয়ী হচ্ছে। কেননা এটা হচ্ছে পুঁজিবাদেরই একটা চরম পরিণতির দিকে আমরা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছি। এখন দেখুন, এখন আর কিন্তু এমনকি শ্রেণীর কথা আমরা বলতাম যে শ্রেণীর আধিপত্য, এখন শ্রেণীও না, এখন ব্যক্তির আধিপত্য। এই যে একেকটা জায়গাতে সারা পৃথিবী মানে এখন একটা লোক, ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সারা পৃথিবীর মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা ইচ্ছা তা করছেন এবং তার ফল আমরা ভোগ করছি। আমাদের জ্বালানি তেল বলুন, আমাদের এই সরকার যে চুক্তিগুলো করছে, বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে অথবা যে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের যে টার্মিনাল থেকে ব্যবস্থাপনা সেইটাও তো তারা বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তো এই মালিকানার প্রশ্নটাই হচ্ছে এখন মূল প্রশ্ন। তো আমরা আমাদের লেখায় যেটা আমরা বলতে চেষ্টা করি সেটা হলো এই মালিকানা বদল করতে হবে। এইটা সামাজিক মালিকানায় যেতে হবে। তো এইটা আমাদের একার কথা না, এটা পৃথিবী ব্যাপী যারা চিন্তা করেন যে মুক্তির পথটা কোথায়? এই উন্নয়নের ধারায় কি চলবে? অর্থাৎ কয়েক জন লোক বা ক্ষেত্রবিশেষে একজন লোক সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবে এবং তার পরে যেটা হবে যে উন্নয়নের ফলে কি কি ঘটছে? এক নম্বরে এই পুঁজিবাদী উন্নয়নের ফলে এক নম্বর ঘটছে যে বৈষম্য বাড়ছে। দুই নম্বর ঘটছে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মানুষ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কেবল ব্যক্তি স্বার্থ দেখছে। আর এই বিচ্ছিন্নতাটা এমন জায়গায় গেছে যে এখন এই যে করোনাভাইরাসের যে আক্রমণটা, সেই আক্রমণটা ছিল এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটা প্রতীক। এই অর্থে যে সর্বত্র ছড়িয়েছে। আরেক অর্থে যে মানুষকে বলছে যে তুমি তোমার আত্মরক্ষার জন্য সমাজ বিচ্ছিন্ন হও। কারো সাথে হাত মেলাবে না, কারো সাথে দেখা করবে না এবং তোমার নিরাপত্তা নির্ভর করছে তোমার ঐ বিচ্ছিন্নতার উপরে। তো এর ফলে যেটা হলো যে এখন চরম অবস্থায় চলে গেছে। তো সেইখানে মানুষ চিন্তা করছেন যে এই ব্যবস্থা বদল করা দরকার। বড় একটা অসুবিধা হচ্ছে যে আমরা যারা মিডিয়া, মিডিয়া কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে। মিডিয়া তো সামাজিক মালিকানার হাতে না। কাজেই মিডিয়া খুব শক্তিশালী। মিডিয়া মানে মানুষের যে চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে, মানুষের বক্তব্যকে উপস্থাপন করে বা বিকৃত করে। তো এই মিডিয়া, নানা মিডিয়া তো এখন কেবল যে ছাপা মিডিয়া বা আগেকার দিন টেলিভিশন এটা না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এসেছে। ফলে দাঁড়াচ্ছে কি যে মিডিয়াও এই ব্যক্তিগত মালিকানার অধীনে রয়েছে এবং ব্যক্তিগত মালিকানাকে সমর্থন করছে।

রাশেদ আহমেদ: আগেও তো ছিল মিডিয়া ব্যক্তিগত মালিকানার অধীন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আগেও ছিল কিন্তু আগে এতটা ছিল না। এখন কিন্তু মালিকানাটা একেবারেই কুক্ষিগত হয়ে গেছে। আগে ধরুন একটা গোষ্ঠী করত, একটা ট্রাস্ট করত। এখন মালিকানাটা ব্যক্তিগত হয়ে গেছে এবং একেকজন ধনী লোক, তারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন আপনি ধরুন ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ইলন মাস্ক এরা খুব বন্ধু ছিলেন এবং একসাথেই কাজ টাজ করেছেন। ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাহায্য করেছেন নির্বাচিত হতে। কিন্তু তাদের মধ্যে আবার বিরোধ লেগে গেছে। তারা এখন আর এক সাথে কাজ করতে পারছে না। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প একলাই করছেন। তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে কিন্তু তাতে তার পরোয়া নেই। কেননা কিছু লোক আছে যারা বিভ্রান্ত বা যারা মনে করে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাদের যে মতবাদ সেই মতবাদের প্রতিনিধি এবং তাদের তারা যে ব্যবস্থা চায় সেই ব্যবস্থার রক্ষক। কাজেই ঐ অল্প কয়েকজন লোক ও সবসময় তাদের সমর্থন করছে। আবার যখন ভোট হয় তখন এই মিডিয়া কাজ করে, টাকা কাজ করে। এবং মানুষের মধ্যে একটা ভয় থাকে যে পরিবর্তন ভালো কি মন্দ। সেজন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা কাজ করছে না। এবং পুঁজিবাদ...

রাশেদ আহমেদ: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও তো  প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, গণতন্ত্রের মূল কথাটা কি ধরুন? গণতন্ত্রে আমরা একটা বাহ্যিক দৃশ্য দেখি যে ভোট হয়, নির্বাচিত সরকার। কিন্তু সেটা গণতন্ত্রের মূল কথাটা নয়। গণতন্ত্রের মূল কথাটা হচ্ছে অধিকার এবং সুযোগের সমতা। যে নাগরিকের সঙ্গে নাগরিকের পার্থক্য থাকবে নানান রকম। কিন্তু অধিকার থাকবে সমান এবং অধিকার কেবল লেখা থাকলেও চলবে না, সংবিধানে লেখা থাকলে চলবে না। অধিকারকে সুযোগে পরিণত করতে হবে। যে সকলের সমান সুযোগ পাবে। এখন গরিব মানুষ সুযোগ পাবে না। সব বংশানুক্রমে গরিবই থাকবে। আর ধনীর ছেলে বংশানুক্রমে সুযোগই পেতে থাকবে। এইটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না। এইটা হচ্ছে এক নম্বর শর্ত যে অধিকার এবং সুযোগের সাম্য যেটা নাই। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ক্ষমতা যদি এক জায়গায় থাকে তাহলে সেটা গণতান্ত্রিক না। গণতন্ত্রের কথা তো হচ্ছে মানুষ যারা তারাই নির্ধারণ করবে সমস্ত সিদ্ধান্ত তারাই নেবে। তারাই কর্তৃত্ব করবে সেজন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। তিন নম্বর শর্ত হচ্ছে যে সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধি প্রকৃত জনপ্রতিনিধি তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অর্থাৎ একজনকে আমি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছি তাকে আমি প্রত্যাহার করে নিতে পারবো। এবং সেই সাথে বিচার ব্যবস্থাটাও বদলে যাবে। বিচার ব্যবস্থাটি আমাদের দেশে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিচার আপনাকে কিনতে হয়। আপনার যদি টাকা না থাকে তাহলে আপনি উকিল পাবেন না। এমনকি ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিতে পারবেন না এবং যেতেই ভয় পাবেন যে ঐ জায়গাটা একটা নিষিদ্ধ এলাকা। এবং যে ঢুকবে একবার মামলায় সে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে যদি সে অর্থবিত্তের অধিকারী না হয়। কাজেই এই বিচার ব্যবস্থাটাও বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। যে এখানে সালিশির মাধ্যমে মীমাংসা হবে এবং লোকরাই ঠিক করে দিবে যে এখানে সমস্যাটা কি। যেতে হবে না আদালতে। তো এই যে একটা ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাটাই হচ্ছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমরা যাকে সমাজতন্ত্র বলি সেটা কিন্তু আসলে প্রকৃত যথার্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ যেখানে ঐ গুণগুলো থাকবে। কিন্তু ঐ ব্যবস্থা তো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এখন আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন ভবিষ্যৎটা কি? আমরা একটা ঐতিহাসিক ক্রান্তি মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছি। সেটা হলো উন্নয়ন কি এই ধারাতেই চলবে? উন্নয়ন যদি এই ধারাতে চলে তাহলে যেটা ঘটবে সেটা হচ্ছে বৈষম্য বাড়বে, বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে বিচ্ছিন্নতা সেইটা বাড়বে। মানে প্রকৃতি বিরূপ হয়ে গেছে। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। এবং প্রকৃতির যে আচরণ যে ধরনের বন্যা হচ্ছে প্লাবন তারপরে খরা দেখা দিচ্ছে। যেভাবে ভূমিকম্প হচ্ছে বা যেভাবে ধরুন জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে। এইগুলো সমস্তই হচ্ছে প্রকৃতির উপরে যে নিপীড়ন চলছে সেই নিপীড়নেরই একটা প্রতিশোধ প্রকৃতি নিচ্ছে। আজকে যে জলবায়ু পরিবর্তনের যে সমস্যা। এইটা তো পুঁজিবাদের সমস্যা। এটা মানুষের সৃষ্টি। এটা তো প্রকৃতির সৃষ্টি না। আমাদের যেমন ধরুন হাওড়ে ফসল ডুবে যাচ্ছে। এটা মানুষের সৃষ্টি। প্রকৃতির ঐ হাওড় তৈরি করে রেখেছে কিন্তু আমরা ঐটাকে নানা রকম বাঁধ দিয়ে নানা রকম সড়ক তৈরি করে ঐটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বা সুবিধাজনক নিজের সুবিধা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাকে শত্রুতাতে পরিণত করেছি।

রাশেদ আহমেদ: একটি বিষয়, মানুষ এখন ব্যক্তির স্বার্থের দিকে চলে যাচ্ছে। কার চেয়ে কত খারাপ কাজ করতে পারবে সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এটার কি পরিবর্তন হবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এখন কথাটা হচ্ছে যে মানুষ এখন ব্যস্ত আছে। মানে অধিকাংশ মানুষই ব্যস্ত আছে নিজের জন্য। নিজের জীবিকাই এত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আপনাকে জীবিকার সন্ধান করতে হয়। প্রত্যেক দেশেই বেকারত্ব দেখা দিয়েছে। এবং এই যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে আবারও সমস্যা সৃষ্টি করছে যে শ্রমের মূল্য কমে যাচ্ছে। শ্রমিক এখন আর অত প্রয়োজনীয় নয়। তো এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো যে ব্যক্তি ব্যস্ত রয়েছে নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য। এবং মনে করছে যে তার জীবিকাটাই প্রথম। এরপরে সে এর বাইরে যে চিন্তা সেই চিন্তাটা সে করতে পারছে না। এটা এক নম্বর কথা। দুই নম্বর কথা হচ্ছে যে পুঁজিবাদের হাতে এত শক্তি যে সে মিডিয়া চালায় তার পক্ষে প্রচার করে। এই ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে। আর একটা বিষয় সেটা হচ্ছে এই যে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে, মানুষ মনে করছে যে এই ব্যবস্থা বদলাবে না। তাই  আন্দোলনের দিকে তাদের আগ্রহ নাই। আর একটা হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আরেকটা কাজ করে সেটা হলো কিছু সুবিধা তৈরি করে দেয়। তো আমি আন্দোলন করছি সমাজ পরিবর্তনের জন্য কিন্তু আমার পরিবার তো চায় সুবিধা নিতে এবং আমাকে প্ররোচিত করে। আমি দেখি আরেকজন সুবিধা নিচ্ছে। তো আমি অল্প সুবিধার জন্য ঐ চলে যাই ঐখানে শাসক শ্রেণির সাথে। শাসক শ্রেণি কিন্তু একটাই শ্রেণি। তারা বিভিন্ন নামে আছে। যেমন বাংলাদেশের অবস্থা। বাংলাদেশে এখন আগেকার দিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের। দুটোই বুর্জোয়া দল আমরা বলি। এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামীও কিন্তু বুর্জোয়া দল। যারাও কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে বিশ্বাস করে। তারাও কিন্তু এই বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। কাজেই এরাই নানা নামে ধরুন উদার নৈতিক যদি বলি, একটা উদার নৈতিক ধারা ইহজাগতিক ধারা আরেকটা ধর্মকে ব্যবহার করা ধারা। পোশাকে পরিবর্তন নামে ভিন্নতা কিন্তু আসলে দুই দলই নিজেদের মধ্যে যে ঝগড়াটা সেটা হচ্ছে ক্ষমতার দখল নিয়ে ঝগড়া। ভাগাভাগির লড়াই। তারা কিন্তু এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। এবং দেখুন খুব ছোট উদাহরণ এই যে মার্কিনের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। ভয়াবহ চুক্তি। এটা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা বাধ্যতামূলক। আমাদের সংবিধানে ১৪২ক ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে বিদেশের সাথে যে চুক্তি হবে সেগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তো সংসদ তো চলে গেলো। আগে যখন সংসদ নির্বাচনের আগে চুক্তি হয়েছে। তিন দিন আগে চুক্তি হয়েছে গোপনে। তারপরে সংসদের যে অধিবেশন হলো সেখানে এটা উত্থাপিত হলো না। দেশের মানুষ জানতেই পারলো না যে এই চুক্তির কি আছে এবং এই চুক্তি কি ভালো বা মন্দ কোন দিকগুলো আলোচনা হলো না। তার মানে কি যারা দুই দল এদের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা সরকার এবং বিরোধী দল। কিন্তু তারা ঐক্যমত এই জায়গাতে যে তারা এই ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চায়। এবং তারা এই বাণিজ্যিক চুক্তি একটা উদাহরণ যে তারা সকলেই নীরবে বাণিজ্যিক চুক্তি সমর্থন।

রাশেদ আহমেদ: খারাপ দিকটা বললেন চুক্তির, কি কি খারাপ দিকগুলো আছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: অনেক খারাপ দিক আছে। এই তো যেমন বোয়িং বিমান কিনছে। এটা তো আমাদের দরকার নাই। আর বোয়িং বিমানের অনেক দুর্বলতা আছে। আমরা তো এরকম খোলা বাজারে কিনব অন্য যেখানে সুবিধা পাব সেইখানে কিনব। আর আমাদের অপ্রয়োজনীয়। আমাদের যে বিমান ব্যবস্থা সেইটা তো খুব দুর্বল। এগুলো কিনতে বাধ্য হচ্ছি। তারপরে তাদের কাছ থেকে অনুমতি লাগবে অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনতে। আমাদের অস্ত্রশস্ত্র যে সামরিক সরঞ্জামাদি সেগুলোও তাদের কাছ থেকে অনুমতি লাগবে। তো এই চুক্তিটা তুলে ধরা হচ্ছে না যে এটার যে আমরা বলছি মুখে ভয়াবহ কিন্তু এইটা যে সত্যি কত কি রকম সেটা কিন্তু আলোচনার মধ্যে আসছে না। পত্রিকাতে কিছু লেখা হচ্ছে কিন্তু পত্রিকার কয়জন পড়ে। এবং পত্রিকার লেখা পড়লে হয়তো একজন বিচ্ছিন্নভাবে আমি পড়ছি। যদি এটা সংসদে আলোচিত হতো সবাই জানতো যে কেউ বুঝতো এবং একটা জনমত তৈরি হতো তখন কিন্তু সরকারেরও সুবিধা হতো। সরকার বলতে পারতো যে এই চুক্তিটাকে আমরা বেরিয়ে যেতে চাই। আমরা এই চুক্তি করি নাই।

রাশেদ আহমেদ: একটা পরাশক্তির সঙ্গে চুক্তি করা সেটা চাইলেই কি বেরিয়ে আসা যায়?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এটা বেরিয়ে আসা যায়। একটা প্রভিশন আছে যে ৬০ দিনের মধ্যে আপত্তি করলে যেকোনো পক্ষ আপত্তি করতে পারে। এবং আরেকটা সুবিধা হচ্ছে যে জনমত সব সময় এটাই বলা যায় যে জনমত এটার বিরুদ্ধে আমরা কি করব? আমরা তো জনমতের বিরুদ্ধে যেতে পারছি না। আমরা বাধ্য হচ্ছি চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে। তো এইটা কিন্তু সরকারের জন্যও সুবিধাজনক হতো যদি সরকার মনে করতো যে এটা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। কিন্তু হলো না। তাহলে আগের সরকারের সাথে এই সরকারের পার্থক্যটা কোথায়? অন্তর্র্বতী সরকার তারা তো নির্বাচিত নয়। কোন পার্থক্য দেখা গেল না এই বিষয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একই সম্পর্ক রাখতে চায়।

রাশেদ আহমেদ: আমি মূলত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে বেশি আগ্রহী আজকে। যেটি আমাদের এই অঞ্চলের সাহিত্য ১৯ শতকে একটি স্বর্ণযুগ বলা হতো বঙ্কিমচন্দ্র, তারপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি। এবং ৭০ দশকে সৈয়দ আলী আহসান, শামসুল হক, শওকত ওসমান, তখন আপনি নিজেও লেখালেখি শুরু করেছেন। এখন যে সাহিত্য বাংলাদেশে সেই সাহিত্যের মধ্যে জীবনবোধটাকে কম দেখা যায় এবং সাহিত্যের গভীরতা অনেক কম। এটার কারণ কি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: দুইটা ঘটনা ঘটছে সাহিত্যের ক্ষেত্রে। একটা হচ্ছে যে সাহিত্যের পাঠক কমেছে। এই কারণে যে এখন মিডিয়া চলে এসেছে সেইখান থেকে শোনা যায় বা দেখা যায়। পড়ার আর দরকার হয় না। পড়া কিন্তু আলাদা জিনিস। কিন্তু দেখা এবং শোনা সেটা আলাদা জিনিস। তো পাঠক সারা পৃথিবী জুড়েই কমে গেছে এটা এক নম্বর। দুই নম্বর হচ্ছে যে সাহিত্যিক যিনি তিনি আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন সমাজ থেকে। আগে আমাদের সাহিত্যের কিন্তু বড় একটা সমস্যা ছিল যে এটা মধ্যবিত্ত লেখে, মধ্যবিত্তের জন্য লেখে এবং মধ্যবিত্ত নিয়েই লেখে। আপনি দেখুন যে স্বর্ণযুগ বলছেন সেখানেও কৃষকের কোনো কথা ঐভাবে নেই। যদিও অধিকাংশ মানুষই কৃষক ছিল। এবং বঙ্কিমচন্দ্রের অসাধারণ প্রবন্ধ আছে কৃষকের উপরে যে ওরকমভাবে কৃষকের দুর্দশা জমিদারী প্রথায় কেউ তুলে ধরেনি। কিন্তু শেষে উনি বলছেন যে আমরা জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ চাই না। কেননা আমরা সামাজিক বিপ্লবের কথাটাই বলেছেন সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি। তো আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি আমাদের স্বার্থ দেখছি এখন মধ্যবিত্ত এতই সংকুচিত হয়ে গেছে যে নিজের বাইরে আর চিন্তা করতে পারছে না বা বাইরের জীবন সম্বন্ধে তার যোগাযোগ নাই। বিচ্ছিন্নতাটা এতো প্রবল হয়েছে। সাহিত্য কিন্তু বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে। কিন্তু সাহিত্য আবার বিচ্ছিন্নতার শিকার হয় যে বিচ্ছিন্নতা যখন বাড়ে তখন লেখক যিনি লেখকের কথাই আমি ধরি লেখক যিনি তিনি নিজের কথা শুধু বলতে পারেন বা নিজের চার পাশে যা দেখেন সেটাই তিনি দেখতে পারেন। তো আমি ধরুন এই যেহেতু প্রসঙ্গটা উঠলো এবং আমি এই বিষয়ে এখন একটা প্রবন্ধ লেখার কথা, লিখতে একজন অনুরোধ করেছে। আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বাংলা কবিতাকে একটা জায়গায় নিয়ে গেলেন। শামসুর রহমান পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে উনি মধ্যবিত্তের কথাই বলছেন। ওনার যে দুঃখ সেটা মধ্যবিত্তের দুঃখ। উনি যে স্বাধীনতার কথা বলছেন ওটা মধ্যবিত্তের যে ধারণা স্বাধীনতার, সেইটাই। তো ওখানে সমাজ বিপ্লবের কোনো কথা নাই। কিন্তু তারপরে কি হচ্ছে? তারপরে যে কবিতা আমি একটা সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করি এখন যে কবিতা আমরা পাই সে কবিতাটা নিজের কথা শুধু যে নিজের অসুবিধা নিজের বিচ্ছিন্নতা নিজের দুঃখ। ঐ যে সমষ্টিগত দুঃখ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দুঃখের কথাও এখন আর আসছে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাটা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটাকে ভাঙতে হলে আবার সাহিত্যকেই ব্যবহার করতে হবে। কেননা সাহিত্য এই বিভাজন মানে না। সাহিত্য মানুষকে সংলগ্ন করতে চায় ঐক্যবদ্ধ করতে চায়। তো সেজন্য সাহিত্যের কাছেই আমাদের যেতে হবে যদি আমরা এটা ভাঙতে চাই। কিন্তু এইটা ভাঙার জন্য যে চেতনা দরকার সেটা আবার সাহিত্য তৈরি করবে। সমস্যাটা কিন্তু একেবারে একটা চক্রের মতো যে সাহিত্য পারছে না কিন্তু সাহিত্যেরই কর্তব্য। ধরুন এখন উপন্যাস আগের মতো লেখা হচ্ছে না সেটার কারণ হচ্ছে যে মধ্যবিত্তের মধ্যেই আমরা আবদ্ধ হয়ে পড়েছি আগেও ছিলাম এর বাইরে যেতে পারিনি। এখন ধরুন সাধারণ মানুষের জীবন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা আমরা বলি আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলি বা শওকত ওসমানের কিছু লেখার কথা বলি। কিন্তু কৃষকের জীবন ঐভাবে সাহিত্যে আসেনি।

রাশেদ আহমেদ: শরৎচন্দ্রের লেখার মধ্যে কিছু পাওয়া যায়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: খুব একটা মজার ব্যাপার মনে হবে শরৎচন্দ্র খুবই কৃষকের ভক্ত। আমার একটা বই আছে শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ হ্যাঁ অনেক আগে লিখেছি। সেখানে আমি দেখছি যে উনি জমিদারদের দৃষ্টিতে দেখছেন। মানে ভালো জমিদার চাচ্ছেন। জমিদারী ব্যবস্থার উচ্ছেদ চাচ্ছেন না।

রাশেদ আহমেদ: মহেশ তাঁর তো বিখ্যাত গল্প। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মানে মহেশ তো একটাই মাত্র গল্প। আর একটা হচ্ছে অভয়ার স্বর্গ। সে অভয়া হচ্ছে খুব দরিদ্র। এই দুটোই চরিত্র যেখানে খুব দরিদ্র মানুষের চরিত্র পাচ্ছেন। মহেশের সমস্যাটা কি? মহেশের সমস্যাটা হচ্ছে যে গফুর। গফুর হচ্ছে নায়ক হ্যাঁ কিন্তু গফুর এই নায়ক হতে পারছে সে মহেশ তাকে সে ভালোবাসে বলে মানে ঐ কারণেই সে হচ্ছে। এবং গফুরের সমস্যা হচ্ছে যে গফুর শ্রমিক হবে না। গফুর কৃষক থাকতে চায়। এখন তার একটামাত্র অবলম্বন সেই মহেশ সে যখন তাকে সেই মেরে ফেললো তখন গফুরের পক্ষে এখন তার মেয়ে আমিনাকে নিয়ে শহরে চলে যেতে হবে। এই শহরে যে কৃষক যে শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে এইটাই হচ্ছে দুঃখ এই গল্পের। তো ঐ একটাই চরিত্র কিন্তু এইটা মানে গফুরের দুর্দশাটা কিন্তু গফুরের সমস্যাটার সমাধান হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। গফুর কৃষক থেকে শ্রমিক হয়ে তার অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। যেটা হবে সেটা হচ্ছে সে একটা দাসত্ব থেকে আরেকটা দাসত্বে যাচ্ছে। শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে এই বিভ্রান্তি কিন্তু আছে। একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝিতে মেহনতি মানুষকে জেলেদেরকে নিয়ে এসেছেন পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও তিনি একটা সামাজিক বিপ্লবের কথা বলেছেন। আবার যারা বলতেন সমরেশ বসু যেমন বলতেন তারপরে বগলারা ছেড়ে দিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন তারপরে দেখা গেল তিনি তৃণমূলে চলে গেলেন। তো এই সুবিধাগুলোর দিয়ে আকর্ষণ করে নেয় টেনে নেয়।

রাশেদ আহমেদ: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও কিন্তু কিছু আছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার মধ্যেও কিন্তু কৃষকের জীবনটা আপনি পাবেন না মানে সেটা সম্ভব না। আমাদের এখানে সূর্যদীঘল বাড়ি নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন আবু ইসহাক। তো ঐ জায়গায় যে জয়গুন যে চরিত্রটা ঐরকম চরিত্র আর হচ্ছে না। বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লালসালুতে যে দেখা যাচ্ছে লালসালু কিন্তু মজিদকে নিয়ে লেখা যে মজিদ অত্যাচারী। কিন্তু মজিদের যে স্ত্রীর যে ব্যথা বা মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রীর যে বিদ্রোহ এটা দেখিয়েছেন। বাচ্চা মেয়েটা বিদ্রোহ করছে মাজারের উপর পা তুলে দিয়ে শুয়ে আছে। সেইটাই হচ্ছে আসল ঘটনা। মজিদের অত্যাচারের চাইতেও এই যে বাল্যবিবাহ সেইটা এখনো রয়ে গেছে। এবং এই বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের যে লেখাপড়া হচ্ছে না তারা বন্দি অবস্থায় আছে এবং যত উন্নয়নই হোক ঐ উন্নয়ন মেয়েদেরকে মুক্তি দিচ্ছে না। মেয়েদের সব কাজ করছে কিন্তু ব্যবস্থাটা এরকম যে মেয়েদের মুক্তি হচ্ছে না। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা রয়ে গেছে। 

রাশেদ আহমেদ: নীল দর্পণের মধ্যে বিদ্রোহ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ নীল দর্পণে বিদ্রোহটা আছে কিন্তু আমার মূল জায়গাটা হচ্ছে যে নীল দর্পণ কিন্তু ভদ্রলোকদের বিদ্রোহ। মানে তোরাপ সে কিন্তু নিজে নীল চাষী না মানে সে ভদ্রলোকদের উপরে যে সাহেবরা অত্যাচার করছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। ঐটাও কিন্তু বিপ্লবী কোনো ব্যাপার না মানে এটা হচ্ছে নীল চাষের বিরুদ্ধে। এটা ব্রিটিশের যে শোষণ তার বিরুদ্ধে। লেখা সম্ভবও ছিল না ওতো উনি যখন...

রাশেদ আহমেদ: আপনার একটি সুবিধাজনক জায়গা হচ্ছে আপনি ৪৭ সালে দেশভাগটা পুরো দেখেছেন। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আপনার চোখের সামনে দেখা। পরবর্তীতে আরও আন্দোলন। যদি বলি আমাদের সমাজে কি কোনো পার্থক্যের কি হয়েছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৪৭ থেকে ৭১ আছে। আচ্ছা এটা হলো ৪৭-এর পরে যেটা হলো সেটা আসলে...

রাশেদ আহমেদ: আপনি তো তখন কলকাতায় ছিলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ আমরা কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলাম দেশভাগের কারণেই। আর না হলে আমরা কলকাতাতেই হয়তো লেখাপড়া করতাম।

রাশেদ আহমেদ: কিভাবে এলেন ঐটা একটু বলবেন? 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এটা হলো বাবার চাকরির জন্য। বাবাদের তখন অপশন দেওয়া হতো যে তুমি ভারতে থাকবে না পাকিস্তানে যাবে। তো স্বভাবতই আমার বাবা বিক্রমপুরের লোক হিসেবে ঢাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। আমরা ঢাকায় চলে এলাম। তো ঢাকায় এসে যেটা আমরা দেখলাম সেটা হচ্ছে যে এই যে ধারাবাহিকতা আপনি ধরুন আমরা বিদ্রোহ করলাম একেবারে ৫২ সাল থেকে বিদ্রোহ শুরু ৭১-এ চূড়ান্ত আমরা মুক্ত হলাম নতুন রাষ্ট্র করলাম। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাষ্ট্র ঐ আমলাতান্ত্রিক। রাষ্ট্র ঐ পুঁজিবাদী ঐ সামরিক বাহিনী ঐ পুলিশ ঐ বিচার ব্যবস্থা ঐ আইন সমস্ত কিছুই বজায় রয়েছে আগের মতোই।

রাশেদ আহমেদ: ৭২ সালে কিছু হয়েছিল মনে হয়? ৭২ সালে যেটি জাতীয়করণের মাধ্যমে...

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না না ঐটা ঐটা ভুল। ঐটা তো টিকবে না। কেননা রাষ্ট্র যদি পুঁজিবাদী থাকে তার অধীনে জাতীয়করণ মানে হচ্ছে রাষ্ট্রীয়করণ। এবং রাষ্ট্রের মালিকানা মানে মালিক হয়ে গেল রাষ্ট্র। এবং রাষ্ট্র কাদের? রাষ্ট্র হচ্ছে যারা উদীয়মান বুর্জোয়া তাদের। এবং রাষ্ট্র ঐ কলকারখানাগুলোকে নিয়ে কি করলো? তারা লুটপাট করলো। তারা যত কাঁচামাল সব বিক্রি করে দিলো। তারা এটাকে অলাভজনক করে দিল। আদমজীর মতো প্রতিষ্ঠান বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে বড় পাটকল আমরা বলতাম। সেই পাটকল ওরা তো অবঙালীরা করেছিল, চালিয়েছিল ঐটা তো মুনাফার জন্য করেছে মুনাফা পেয়েছে। কিন্তু শেষে কি হলো? এই পাটকল যে একটা বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ালো পাটকল তুলে দিতে হলো। তো কত বড় একটা শিল্পায়ন তো মানে যে হবে না কি এই জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে শিল্পায়নের প্রক্রিয়াটা নষ্ট হয়ে গেল এই কারণে যে ব্যবস্থাটাই হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানার। এবং ব্যবস্থা ঐটা হলো এখন ম্যানেজাররা ব্যবস্থাপক হয়ে গেল নতুন করে তারা এই মালিকের মতো আচরণ করতে থাকলো এবং তারা এটাতে মুনাফা করবে কি তারা লুটপাটের দিকে চলে গেল। ঐ পাকিস্তানীরা লুটপাট করত তাও তারা বিনিয়োগ করে লুটপাট করেছে। আর এই বাংলাদেশের পুঁজিপতিরা তারা কিন্তু লুটপাট করেছে তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেনি তারা ঐ যেগুলো আছে ওগুলোকে লুটপাট করছে এবং পাচার করছে। আমরা যে এত দরিদ্র এই পূর্ববঙ্গ সেটা হচ্ছে যে আমাদের সম্পদ মোঘল আমলে দিল্লীতে গেছে ব্রিটিশ আমলে লন্ডনে গেছে এখন বাংলাদেশ আমলে পৃথিবীর নানা শহরে চলে যাচ্ছে। শ্রমিক কৃষক এবং বিদেশই যারা আমাদের মেহনতি ভাইরা তারা যে টাকা পাঠাচ্ছে সেই টাকা আবার এখান থেকে চলে যাচ্ছে এই ধনীদের মধ্যে।

রাশেদ আহমেদ: আপনি এই সময়ের কথা বলছেন। এখনকার সময়ের কথা বলছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ এই সময়ের কথা বলছি।

রাশেদ আহমেদ: বড় বড় যেসব কর্পোরেট হাউজগুলো আছে তাদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এখন তো আমাদের কর্পোরেট সিস্টেমে সবকিছু চলছে বড় বড় পুঁজিপতি তৈরি হয়েছে তারা কর্পোরেট সিস্টেমে চালাচ্ছে। তাদের মাধ্যমেই তো এটা বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা দেশী। আগে ওরা ছিল বিদেশী কিন্তু এরা দেশী। আর দেশী বিদেশীতে পার্থক্য নাই। পাচারের ব্যাপারে তো কোনো পার্থক্য দেখছি না। মানে অবঙালীরা করাচীতে নিয়ে যেত বাঙালীরা মালয়েশিয়া বা কানাডাতে নিয়ে যাচ্ছে। সুইস ব্যাংকে রাখছে। আসল পরিচয়টা হচ্ছে যে ধনী মানে যার দেশপ্রেমহীন ধনী। এবং ধনীরা যারা ধনী হয়েছে তারা দেশপ্রেমিক না। মানে দেশের জন্য ধনী হচ্ছে না নিজের জন্য ধনী হচ্ছে। তো নিজের জন্য ধনী হয়ে এখন দেখছি যে দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। তো এখান থেকে যত পারা যায় সংগ্রহ কর। সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাও এবং সেইজন্য বাড়ি ঘর তৈরি কর সন্তানদের লেখাপড়ার বন্দোবস্ত কর এইগুলো চলছে পাচার চলছে আর কি।

রাশেদ আহমেদ: ৭১ সালে আপনি কোথায় ছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৭১ সালে ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। মানে  ২৫শে মার্চের সময়ও ঢাকায় মানে আমি ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার্সে থাকি। তো আমরা জানতাম না বুঝতে পারি না কল্পনাও করি নাই যে এরকম ঘটনা ঘটবে। তারপরে ২৭শে মার্চ যখন কার্ফিউ তুললো কিছুক্ষণের জন্য তখন আমরা বেরিয়ে গেছি। আমরা এবার জানতাম যে আমরা তো আন্দোলন টান্দোলন করতাম সব সময় যে আমাদের খুঁজবে, খুঁজেছেও । তো আমি বেরিয়ে গেছি ২৭শে মার্চ আর এখানে ফিরি নাই। টিক্কা খান যাওয়ার আগে সেকেন্ড সেপ্টেম্বরে ঐ ছয় জন শিক্ষকের নামে সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে গেছিল যে তোমরা রাষ্ট্রদ্রোহী ওর মধ্যে আমিও ছিলমা। আমাদের একটা অংশ কলকাতায় আগেই চলে গিয়েছিলেন। আর যারা ছিলেন এবং যারা ইনক্যাম্পাসে ছিলেন বা পরিচিত ঠিকানায় ছিলেন তাদেরকে আলবদর ধরে নিয়ে গেল। আমাকেও আলবদর ধরে নিয়ে যেতে পারতো তাহলে তো নাম দেখা গেছে কিন্তু আমার তো ঠিকানা পায়নি।

রাশেদ আহমেদ: আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি নানা জায়গায় থাকি আত্মীয় স্বজনের বাসায় গ্রামে এনো তেনো। আমি বুঝে ফেলেছি যে এখানে যাওয়া বিপদজনক আমার জন্য।

রাশেদ আহমেদ: ঢাকায় ফিরলেন কবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমরা আশেপাশেই ছিলাম গ্রামেই ছিলাম এবং ঐ ৬ই ডিসেম্বরের পরে আমরা ঐ গ্রামে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তো আমাদের একটা অংশ গ্রামে চলে গেল। আমরা যেতে পারলাম না কেননা এত লোক হয়ে গেল যে আত্মীয় স্বজন যারা আছে সবাই যেতে চাইলো আমরা তাদেরকে নৌকায় তুলে দিয়ে রয়ে গেলাম। তো রয়ে যাওয়ার পরে দেখি আর যাওয়ার অবস্থা নাই কার্ফিউ তো ঢাকাতেই ছিলাম। যারা গেছেন তারা কিন্তু নদী পার হয়েই দেখেন যে মুক্ত এলাকা মানে তাদের ওখানে এখনো পাকিস্তানী নাই, রাজাকার টাজাকারও নাই।

রাশেদ আহমেদ: এখন আপনি কি বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি তো এখন দুটো কাজ করি। একটা কাজ হচ্ছে আমরা একটা নতুন দিগন্ত পত্রিকা বের করি। সেই ২০০২ সাল থেকে সেটা এখন ২৪ বছর ধরে চলছে ত্রৈমাসিক। এইটা আমাদের একটা সাহিত্য সংস্কৃতির পত্রিকা আমাদের এই যে সামাজিক পরিবর্তনের কথা। আমরা একটা সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র করেছিলাম। অর্থাৎ সমাজে যে রূপান্তর হচ্ছে সেই রূপান্তরটাকে যাতে গণতান্ত্রিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। তো ঐটা করি আর দ্বিতীয় আমার নিজের লেখা টেখা প্রবন্ধ টবন্ধ লিখি আর একটা আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করছি। আমি বিক্ষিপ্ত হয়ে লিখেছি কিন্তু এখন এগুলো সংলগ্ন করে ধারাবাহিকভাবে লেখার চেষ্টা করছি এবং এটা আমাদের পত্রিকাতে প্রকাশ করছি।

রাশেদ আহমেদ: দিনে কয় ঘণ্টা লিখেন আপনি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমার অন্য কাজ নাই মানে আমি হচ্ছে শারীরিকভাবে কিছুটা সক্ষমতা হারিয়েছি। আগে যতটা সক্ষম ছিলাম। চোখে অত ভালো দেখি না আগের মতো দেখতাম। আবার ঐ করোনা তো আমাকে আক্রমণ করেছিল। তো যাই হোক তো আমার মূল কাজ হচ্ছে পড়া আর লেখার আর অন্য কোনো কাজ নেই। আমার পারিবারিক দায়িত্ব নেই কেননা আমি থাকি আমার মেয়েদের সাথে। ও দুই মেয়েই ঢাকায় থাকে ওরা একেবারে আবার পাশাপাশি ফ্ল্যাটেই থাকে ওরাই দেখাশোনা করে।

রাশেদ আহমেদ: লেখার জন্য কোন সময়টাকে আপনি বেছে নেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি আমার কোন বিশেষ সময় নেই। আমার সারাদিনই এইগুলো যেমন এখানে এসছি আপনার সাথে কথা বললাম এইটার কিছু তো সময় গেল না হলে আমি লেখাপড়ার কাজই করতাম। মানে এই কাগজ নিয়ে এসছি বই নিয়ে এসছি এবং বাসায় যেয়েও এই কাজই করব।

রাশেদ আহমেদ: কতগুলো বই আপনার বেরিয়েছে, মনে আছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মানে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ছোট ছোট বই আর কি। ১০৪-১০৫ টা হবে হয়তো।

রাশেদ আহমেদ: এখন কোন সাবজেক্ট নিয়ে আপনার লিখতে বেশি আগ্রহী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমার সাবজেক্টটা হচ্ছে যে আমি তো সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। সাহিত্য বিষয়ে আমি লিখেছি অনুবাদও করেছি এবং আমার গল্প গল্পের লেখারও চেষ্টা করেছি। এবং আমি প্রবন্ধ লিখি এবং এখন আমার প্রবন্ধগুলোর মূল বিষয়টা হচ্ছে এই যে সমাজে যে একটা পরিবর্তন ঘটছে মানে সেই পরিবর্তনটা সম্বন্ধে ঐ কারণগুলো বিশ্বব্যাপী যেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্বন্ধে এইটারই একটা যতটা পারা যায় এরই একটা মানে বিশ্লেষণ এবং এরই আমাদের দেশে এর প্রতিক্রিয়া বা আমাদের দেশে যে শ্রেণী গঠন হচ্ছে বা সামাজিক বিপ্লব যে ঘটছে না। আমার মূল ঐটা হচ্ছে উদ্দেশ্য যে সামাজিক বিপ্লবের পক্ষে একটা চেতনাটাকে আরও বিস্তৃত করা। এই চেতনাটা আছে কিন্তু এটাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা বা ঐখানে আমি কোন অবদান রাখতে পারি কিনা ঐ চেতনার বিস্তার আবার গভীরতা সৃষ্টিতে এটিই আমার লক্ষ্য।

রাশেদ আহমেদ: আপনি দৈনিক সংবাদে দীর্ঘ দিন কলাম লিখেছেন ছদ্মনামে লিখেছেন গাছপাথর নামে। প্রথম কথা যে ছদ্মনামে কেন লিখতেন আর গাছপাথর নামটি কেন দিয়েছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি অনেক বছর লিখেছি এটাকে আমার জীবনের একটা খুবই সুখকর অভিজ্ঞতা। নানা আমার দুঃখ গেছে পারিবারিক আমার স্ত্রী তখন মারা গেছেন। কিন্তু ঐ ১৪ বছর আমি লিখেছি। গাছপাথর কেন নাম নিলাম? গাছপাথর আর সময় বয়ে যায় এটা মিলিয়েছিলাম আমি। ওটা ভেতর থেকে এসছিল যে সময় তো চলছে আমি সময়টাকে দেখছি। আর আমি দেখছি একটা দাঁড়িয়ে স্থির জায়গাতে গাছ যেন পাথর হয়ে গেছে কিন্তু এই গাছ পাথরটা নির্বাক নয়। দাঁড়িয়ে দেখছে ঐ এটাতে কিন্তু সে নিষ্প্রাণ নয় যদিও সে পাথরের মতন শক্ত হয়ে আবার একটা অবস্থানে আছে। সময়টা তার সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তো সে ঐ সময়টাকে দেখে এই সময় সম্পর্কে তার যে উপলব্ধি সেইটা সে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। এইটাই হচ্ছে তার ছদ্মনামে কেন লিখতাম? ছদ্মনামে লেখা একটা স্বাধীনতা দেয়। আপনি যে নিজের নামে লিখলে যে মানুষ যে একটা ই থাকে যে আপনি লিখছেন এটা জানে মানুষ। ছদ্মনামে লেখার পরেও মানুষ চিনে ফেলে যে কে লেখে কিন্তু তবুও আমি তো আর লিখি নাই মানে আরেকজন ঐ এরকম একটা একটা আবরণ থাকে এই আবরণটা আমার পছন্দ হয়। যে একেবারে প্রকাশে না গিয়ে একটা আবরণের মধ্য দিয়ে লিখছি। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমি অতটা প্রত্যক্ষ হতে আমার লেখার মধ্যেও আমি ঐ নিজেকে খুব একটা জাহির করতে চাই না মানে আমি একটু অপ্রত্যক্ষ থাকতে চাই ঐ কারণে।

রাশেদ আহমেদ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ যে এত কথা বলার সুযোগ দিলেন আমাকে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬


পুঁজিবাদের বর্তমান আগ্রাসন তাকে গভীরভাবে ভাবায়

প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬

featured Image

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। দীর্ঘ দিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন। এখন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস। তার আরেকটি পরিচয় আছে, তিনি লেখক, সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। তিনি মানুষের জীবনবোধ নিয়ে লেখালেখি করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেন গভীরভাবে। তিনি মার্কসবাদী চিন্তা চেতনায় বিশ্বাসী। তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। হুবহু তুলে ধরা হলো। 

রাশেদ আহমেদ: আপনি লেখালেখি করেন, অসংখ্য বই আপনার আছে। সেই লেখার মধ্যে একটি জীবনবোধ থাকে, রাজনীতির বিশ্লেষণ করেন। আরেকটি বিষয় আমরা লক্ষ্য করি,সাধারণ মানুষের কথাগুলো তার লেখায় উঠে এসেছেন, সমতার কথা বলেন। এই যে বলা, এই যে লেখালেখি, এটির কি কোনো সফলতা পেয়েছেন? কোনো পরিবর্তন কি সমাজে এসেছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, পরিবর্তন তো হবে না ঐভাবে। কেননা যে ব্যবস্থাটা আমাদের এখানে বিদ্যমান সেটা খুব কঠিন ব্যবস্থা। এবং সে ব্যবস্থা কেবল বাংলাদেশের না, সে ব্যবস্থাটা বিশ্বব্যাপী এখন বিরাজমান। এই বিশ্বব্যাপী যে পুঁজিবাদী উন্নয়নের ধারা তার ফলাফল আমরা দেখছি। যেমন ধরুন নির্বাচনগুলো হচ্ছে। নির্বাচনে যাদেরকে আমরা প্রতিক্রিয়াশীল বলি, কেবল রক্ষণশীল না, প্রতিক্রিয়াশীল বলি, তারা প্রগতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। সেই শক্তিগুলোই বিজয়ী হচ্ছে। কেননা এটা হচ্ছে পুঁজিবাদেরই একটা চরম পরিণতির দিকে আমরা পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছি। এখন দেখুন, এখন আর কিন্তু এমনকি শ্রেণীর কথা আমরা বলতাম যে শ্রেণীর আধিপত্য, এখন শ্রেণীও না, এখন ব্যক্তির আধিপত্য। এই যে একেকটা জায়গাতে সারা পৃথিবী মানে এখন একটা লোক, ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি সারা পৃথিবীর মানুষ নিয়ন্ত্রণ করছেন, যা ইচ্ছা তা করছেন এবং তার ফল আমরা ভোগ করছি। আমাদের জ্বালানি তেল বলুন, আমাদের এই সরকার যে চুক্তিগুলো করছে, বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে অথবা যে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরের যে টার্মিনাল থেকে ব্যবস্থাপনা সেইটাও তো তারা বিদেশীদের হাতে তুলে দিচ্ছে। তো এই মালিকানার প্রশ্নটাই হচ্ছে এখন মূল প্রশ্ন। তো আমরা আমাদের লেখায় যেটা আমরা বলতে চেষ্টা করি সেটা হলো এই মালিকানা বদল করতে হবে। এইটা সামাজিক মালিকানায় যেতে হবে। তো এইটা আমাদের একার কথা না, এটা পৃথিবী ব্যাপী যারা চিন্তা করেন যে মুক্তির পথটা কোথায়? এই উন্নয়নের ধারায় কি চলবে? অর্থাৎ কয়েক জন লোক বা ক্ষেত্রবিশেষে একজন লোক সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবে এবং তার পরে যেটা হবে যে উন্নয়নের ফলে কি কি ঘটছে? এক নম্বরে এই পুঁজিবাদী উন্নয়নের ফলে এক নম্বর ঘটছে যে বৈষম্য বাড়ছে। দুই নম্বর ঘটছে বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মানুষ মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কেবল ব্যক্তি স্বার্থ দেখছে। আর এই বিচ্ছিন্নতাটা এমন জায়গায় গেছে যে এখন এই যে করোনাভাইরাসের যে আক্রমণটা, সেই আক্রমণটা ছিল এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটা প্রতীক। এই অর্থে যে সর্বত্র ছড়িয়েছে। আরেক অর্থে যে মানুষকে বলছে যে তুমি তোমার আত্মরক্ষার জন্য সমাজ বিচ্ছিন্ন হও। কারো সাথে হাত মেলাবে না, কারো সাথে দেখা করবে না এবং তোমার নিরাপত্তা নির্ভর করছে তোমার ঐ বিচ্ছিন্নতার উপরে। তো এর ফলে যেটা হলো যে এখন চরম অবস্থায় চলে গেছে। তো সেইখানে মানুষ চিন্তা করছেন যে এই ব্যবস্থা বদল করা দরকার। বড় একটা অসুবিধা হচ্ছে যে আমরা যারা মিডিয়া, মিডিয়া কিন্তু ব্যক্তিগত মালিকানার হাতে। মিডিয়া তো সামাজিক মালিকানার হাতে না। কাজেই মিডিয়া খুব শক্তিশালী। মিডিয়া মানে মানুষের যে চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করে, মানুষের বক্তব্যকে উপস্থাপন করে বা বিকৃত করে। তো এই মিডিয়া, নানা মিডিয়া তো এখন কেবল যে ছাপা মিডিয়া বা আগেকার দিন টেলিভিশন এটা না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এসেছে। ফলে দাঁড়াচ্ছে কি যে মিডিয়াও এই ব্যক্তিগত মালিকানার অধীনে রয়েছে এবং ব্যক্তিগত মালিকানাকে সমর্থন করছে।

রাশেদ আহমেদ: আগেও তো ছিল মিডিয়া ব্যক্তিগত মালিকানার অধীন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আগেও ছিল কিন্তু আগে এতটা ছিল না। এখন কিন্তু মালিকানাটা একেবারেই কুক্ষিগত হয়ে গেছে। আগে ধরুন একটা গোষ্ঠী করত, একটা ট্রাস্ট করত। এখন মালিকানাটা ব্যক্তিগত হয়ে গেছে এবং একেকজন ধনী লোক, তারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন আপনি ধরুন ডোনাল্ড ট্রাম্প আর ইলন মাস্ক এরা খুব বন্ধু ছিলেন এবং একসাথেই কাজ টাজ করেছেন। ইলন মাস্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সাহায্য করেছেন নির্বাচিত হতে। কিন্তু তাদের মধ্যে আবার বিরোধ লেগে গেছে। তারা এখন আর এক সাথে কাজ করতে পারছে না। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প একলাই করছেন। তার জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে কিন্তু তাতে তার পরোয়া নেই। কেননা কিছু লোক আছে যারা বিভ্রান্ত বা যারা মনে করে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পই তাদের যে মতবাদ সেই মতবাদের প্রতিনিধি এবং তাদের তারা যে ব্যবস্থা চায় সেই ব্যবস্থার রক্ষক। কাজেই ঐ অল্প কয়েকজন লোক ও সবসময় তাদের সমর্থন করছে। আবার যখন ভোট হয় তখন এই মিডিয়া কাজ করে, টাকা কাজ করে। এবং মানুষের মধ্যে একটা ভয় থাকে যে পরিবর্তন ভালো কি মন্দ। সেজন্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা কাজ করছে না। এবং পুঁজিবাদ...

রাশেদ আহমেদ: সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও তো  প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না, গণতন্ত্রের মূল কথাটা কি ধরুন? গণতন্ত্রে আমরা একটা বাহ্যিক দৃশ্য দেখি যে ভোট হয়, নির্বাচিত সরকার। কিন্তু সেটা গণতন্ত্রের মূল কথাটা নয়। গণতন্ত্রের মূল কথাটা হচ্ছে অধিকার এবং সুযোগের সমতা। যে নাগরিকের সঙ্গে নাগরিকের পার্থক্য থাকবে নানান রকম। কিন্তু অধিকার থাকবে সমান এবং অধিকার কেবল লেখা থাকলেও চলবে না, সংবিধানে লেখা থাকলে চলবে না। অধিকারকে সুযোগে পরিণত করতে হবে। যে সকলের সমান সুযোগ পাবে। এখন গরিব মানুষ সুযোগ পাবে না। সব বংশানুক্রমে গরিবই থাকবে। আর ধনীর ছেলে বংশানুক্রমে সুযোগই পেতে থাকবে। এইটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না। এইটা হচ্ছে এক নম্বর শর্ত যে অধিকার এবং সুযোগের সাম্য যেটা নাই। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে যে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। ক্ষমতা যদি এক জায়গায় থাকে তাহলে সেটা গণতান্ত্রিক না। গণতন্ত্রের কথা তো হচ্ছে মানুষ যারা তারাই নির্ধারণ করবে সমস্ত সিদ্ধান্ত তারাই নেবে। তারাই কর্তৃত্ব করবে সেজন্য ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। তিন নম্বর শর্ত হচ্ছে যে সর্বস্তরে জনপ্রতিনিধি প্রকৃত জনপ্রতিনিধি তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অর্থাৎ একজনকে আমি জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করেছি তাকে আমি প্রত্যাহার করে নিতে পারবো। এবং সেই সাথে বিচার ব্যবস্থাটাও বদলে যাবে। বিচার ব্যবস্থাটি আমাদের দেশে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় বিচার আপনাকে কিনতে হয়। আপনার যদি টাকা না থাকে তাহলে আপনি উকিল পাবেন না। এমনকি ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিতে পারবেন না এবং যেতেই ভয় পাবেন যে ঐ জায়গাটা একটা নিষিদ্ধ এলাকা। এবং যে ঢুকবে একবার মামলায় সে সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে যদি সে অর্থবিত্তের অধিকারী না হয়। কাজেই এই বিচার ব্যবস্থাটাও বিকেন্দ্রীকরণ করা দরকার। যে এখানে সালিশির মাধ্যমে মীমাংসা হবে এবং লোকরাই ঠিক করে দিবে যে এখানে সমস্যাটা কি। যেতে হবে না আদালতে। তো এই যে একটা ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাটাই হচ্ছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। আমরা যাকে সমাজতন্ত্র বলি সেটা কিন্তু আসলে প্রকৃত যথার্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অর্থাৎ যেখানে ঐ গুণগুলো থাকবে। কিন্তু ঐ ব্যবস্থা তো প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। এখন আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন ভবিষ্যৎটা কি? আমরা একটা ঐতিহাসিক ক্রান্তি মুহূর্তে এসে দাঁড়িয়েছি। সেটা হলো উন্নয়ন কি এই ধারাতেই চলবে? উন্নয়ন যদি এই ধারাতে চলে তাহলে যেটা ঘটবে সেটা হচ্ছে বৈষম্য বাড়বে, বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির যে বিচ্ছিন্নতা সেইটা বাড়বে। মানে প্রকৃতি বিরূপ হয়ে গেছে। প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। এবং প্রকৃতির যে আচরণ যে ধরনের বন্যা হচ্ছে প্লাবন তারপরে খরা দেখা দিচ্ছে। যেভাবে ভূমিকম্প হচ্ছে বা যেভাবে ধরুন জলোচ্ছ্বাস হচ্ছে। এইগুলো সমস্তই হচ্ছে প্রকৃতির উপরে যে নিপীড়ন চলছে সেই নিপীড়নেরই একটা প্রতিশোধ প্রকৃতি নিচ্ছে। আজকে যে জলবায়ু পরিবর্তনের যে সমস্যা। এইটা তো পুঁজিবাদের সমস্যা। এটা মানুষের সৃষ্টি। এটা তো প্রকৃতির সৃষ্টি না। আমাদের যেমন ধরুন হাওড়ে ফসল ডুবে যাচ্ছে। এটা মানুষের সৃষ্টি। প্রকৃতির ঐ হাওড় তৈরি করে রেখেছে কিন্তু আমরা ঐটাকে নানা রকম বাঁধ দিয়ে নানা রকম সড়ক তৈরি করে ঐটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে বা সুবিধাজনক নিজের সুবিধা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাকে শত্রুতাতে পরিণত করেছি।

রাশেদ আহমেদ: একটি বিষয়, মানুষ এখন ব্যক্তির স্বার্থের দিকে চলে যাচ্ছে। কার চেয়ে কত খারাপ কাজ করতে পারবে সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছে। এটার কি পরিবর্তন হবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এখন কথাটা হচ্ছে যে মানুষ এখন ব্যস্ত আছে। মানে অধিকাংশ মানুষই ব্যস্ত আছে নিজের জন্য। নিজের জীবিকাই এত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে আপনাকে জীবিকার সন্ধান করতে হয়। প্রত্যেক দেশেই বেকারত্ব দেখা দিয়েছে। এবং এই যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এসে আবারও সমস্যা সৃষ্টি করছে যে শ্রমের মূল্য কমে যাচ্ছে। শ্রমিক এখন আর অত প্রয়োজনীয় নয়। তো এখন যেটা হচ্ছে সেটা হলো যে ব্যক্তি ব্যস্ত রয়েছে নিজের সমস্যা সমাধানের জন্য। এবং মনে করছে যে তার জীবিকাটাই প্রথম। এরপরে সে এর বাইরে যে চিন্তা সেই চিন্তাটা সে করতে পারছে না। এটা এক নম্বর কথা। দুই নম্বর কথা হচ্ছে যে পুঁজিবাদের হাতে এত শক্তি যে সে মিডিয়া চালায় তার পক্ষে প্রচার করে। এই ব্যবস্থাটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য কাজ করে। আর একটা বিষয় সেটা হচ্ছে এই যে মানুষের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে, মানুষ মনে করছে যে এই ব্যবস্থা বদলাবে না। তাই  আন্দোলনের দিকে তাদের আগ্রহ নাই। আর একটা হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা আরেকটা কাজ করে সেটা হলো কিছু সুবিধা তৈরি করে দেয়। তো আমি আন্দোলন করছি সমাজ পরিবর্তনের জন্য কিন্তু আমার পরিবার তো চায় সুবিধা নিতে এবং আমাকে প্ররোচিত করে। আমি দেখি আরেকজন সুবিধা নিচ্ছে। তো আমি অল্প সুবিধার জন্য ঐ চলে যাই ঐখানে শাসক শ্রেণির সাথে। শাসক শ্রেণি কিন্তু একটাই শ্রেণি। তারা বিভিন্ন নামে আছে। যেমন বাংলাদেশের অবস্থা। বাংলাদেশে এখন আগেকার দিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের। দুটোই বুর্জোয়া দল আমরা বলি। এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী। জামায়াতে ইসলামীও কিন্তু বুর্জোয়া দল। যারাও কিন্তু ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে বিশ্বাস করে। তারাও কিন্তু এই বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। কাজেই এরাই নানা নামে ধরুন উদার নৈতিক যদি বলি, একটা উদার নৈতিক ধারা ইহজাগতিক ধারা আরেকটা ধর্মকে ব্যবহার করা ধারা। পোশাকে পরিবর্তন নামে ভিন্নতা কিন্তু আসলে দুই দলই নিজেদের মধ্যে যে ঝগড়াটা সেটা হচ্ছে ক্ষমতার দখল নিয়ে ঝগড়া। ভাগাভাগির লড়াই। তারা কিন্তু এই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে চায়। এবং দেখুন খুব ছোট উদাহরণ এই যে মার্কিনের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে। ভয়াবহ চুক্তি। এটা জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা বাধ্যতামূলক। আমাদের সংবিধানে ১৪২ক ধারায় স্পষ্ট বলা আছে যে বিদেশের সাথে যে চুক্তি হবে সেগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে। তো সংসদ তো চলে গেলো। আগে যখন সংসদ নির্বাচনের আগে চুক্তি হয়েছে। তিন দিন আগে চুক্তি হয়েছে গোপনে। তারপরে সংসদের যে অধিবেশন হলো সেখানে এটা উত্থাপিত হলো না। দেশের মানুষ জানতেই পারলো না যে এই চুক্তির কি আছে এবং এই চুক্তি কি ভালো বা মন্দ কোন দিকগুলো আলোচনা হলো না। তার মানে কি যারা দুই দল এদের মধ্যে প্রবল বিরোধিতা সরকার এবং বিরোধী দল। কিন্তু তারা ঐক্যমত এই জায়গাতে যে তারা এই ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে চায়। এবং তারা এই বাণিজ্যিক চুক্তি একটা উদাহরণ যে তারা সকলেই নীরবে বাণিজ্যিক চুক্তি সমর্থন।

রাশেদ আহমেদ: খারাপ দিকটা বললেন চুক্তির, কি কি খারাপ দিকগুলো আছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: অনেক খারাপ দিক আছে। এই তো যেমন বোয়িং বিমান কিনছে। এটা তো আমাদের দরকার নাই। আর বোয়িং বিমানের অনেক দুর্বলতা আছে। আমরা তো এরকম খোলা বাজারে কিনব অন্য যেখানে সুবিধা পাব সেইখানে কিনব। আর আমাদের অপ্রয়োজনীয়। আমাদের যে বিমান ব্যবস্থা সেইটা তো খুব দুর্বল। এগুলো কিনতে বাধ্য হচ্ছি। তারপরে তাদের কাছ থেকে অনুমতি লাগবে অন্য দেশ থেকে পণ্য কিনতে। আমাদের অস্ত্রশস্ত্র যে সামরিক সরঞ্জামাদি সেগুলোও তাদের কাছ থেকে অনুমতি লাগবে। তো এই চুক্তিটা তুলে ধরা হচ্ছে না যে এটার যে আমরা বলছি মুখে ভয়াবহ কিন্তু এইটা যে সত্যি কত কি রকম সেটা কিন্তু আলোচনার মধ্যে আসছে না। পত্রিকাতে কিছু লেখা হচ্ছে কিন্তু পত্রিকার কয়জন পড়ে। এবং পত্রিকার লেখা পড়লে হয়তো একজন বিচ্ছিন্নভাবে আমি পড়ছি। যদি এটা সংসদে আলোচিত হতো সবাই জানতো যে কেউ বুঝতো এবং একটা জনমত তৈরি হতো তখন কিন্তু সরকারেরও সুবিধা হতো। সরকার বলতে পারতো যে এই চুক্তিটাকে আমরা বেরিয়ে যেতে চাই। আমরা এই চুক্তি করি নাই।

রাশেদ আহমেদ: একটা পরাশক্তির সঙ্গে চুক্তি করা সেটা চাইলেই কি বেরিয়ে আসা যায়?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এটা বেরিয়ে আসা যায়। একটা প্রভিশন আছে যে ৬০ দিনের মধ্যে আপত্তি করলে যেকোনো পক্ষ আপত্তি করতে পারে। এবং আরেকটা সুবিধা হচ্ছে যে জনমত সব সময় এটাই বলা যায় যে জনমত এটার বিরুদ্ধে আমরা কি করব? আমরা তো জনমতের বিরুদ্ধে যেতে পারছি না। আমরা বাধ্য হচ্ছি চুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে। তো এইটা কিন্তু সরকারের জন্যও সুবিধাজনক হতো যদি সরকার মনে করতো যে এটা থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। কিন্তু হলো না। তাহলে আগের সরকারের সাথে এই সরকারের পার্থক্যটা কোথায়? অন্তর্র্বতী সরকার তারা তো নির্বাচিত নয়। কোন পার্থক্য দেখা গেল না এই বিষয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একই সম্পর্ক রাখতে চায়।

রাশেদ আহমেদ: আমি মূলত সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে বেশি আগ্রহী আজকে। যেটি আমাদের এই অঞ্চলের সাহিত্য ১৯ শতকে একটি স্বর্ণযুগ বলা হতো বঙ্কিমচন্দ্র, তারপরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি। এবং ৭০ দশকে সৈয়দ আলী আহসান, শামসুল হক, শওকত ওসমান, তখন আপনি নিজেও লেখালেখি শুরু করেছেন। এখন যে সাহিত্য বাংলাদেশে সেই সাহিত্যের মধ্যে জীবনবোধটাকে কম দেখা যায় এবং সাহিত্যের গভীরতা অনেক কম। এটার কারণ কি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: দুইটা ঘটনা ঘটছে সাহিত্যের ক্ষেত্রে। একটা হচ্ছে যে সাহিত্যের পাঠক কমেছে। এই কারণে যে এখন মিডিয়া চলে এসেছে সেইখান থেকে শোনা যায় বা দেখা যায়। পড়ার আর দরকার হয় না। পড়া কিন্তু আলাদা জিনিস। কিন্তু দেখা এবং শোনা সেটা আলাদা জিনিস। তো পাঠক সারা পৃথিবী জুড়েই কমে গেছে এটা এক নম্বর। দুই নম্বর হচ্ছে যে সাহিত্যিক যিনি তিনি আবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন সমাজ থেকে। আগে আমাদের সাহিত্যের কিন্তু বড় একটা সমস্যা ছিল যে এটা মধ্যবিত্ত লেখে, মধ্যবিত্তের জন্য লেখে এবং মধ্যবিত্ত নিয়েই লেখে। আপনি দেখুন যে স্বর্ণযুগ বলছেন সেখানেও কৃষকের কোনো কথা ঐভাবে নেই। যদিও অধিকাংশ মানুষই কৃষক ছিল। এবং বঙ্কিমচন্দ্রের অসাধারণ প্রবন্ধ আছে কৃষকের উপরে যে ওরকমভাবে কৃষকের দুর্দশা জমিদারী প্রথায় কেউ তুলে ধরেনি। কিন্তু শেষে উনি বলছেন যে আমরা জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ চাই না। কেননা আমরা সামাজিক বিপ্লবের কথাটাই বলেছেন সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নহি। তো আমরা মধ্যবিত্ত শ্রেণি আমাদের স্বার্থ দেখছি এখন মধ্যবিত্ত এতই সংকুচিত হয়ে গেছে যে নিজের বাইরে আর চিন্তা করতে পারছে না বা বাইরের জীবন সম্বন্ধে তার যোগাযোগ নাই। বিচ্ছিন্নতাটা এতো প্রবল হয়েছে। সাহিত্য কিন্তু বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে। কিন্তু সাহিত্য আবার বিচ্ছিন্নতার শিকার হয় যে বিচ্ছিন্নতা যখন বাড়ে তখন লেখক যিনি লেখকের কথাই আমি ধরি লেখক যিনি তিনি নিজের কথা শুধু বলতে পারেন বা নিজের চার পাশে যা দেখেন সেটাই তিনি দেখতে পারেন। তো আমি ধরুন এই যেহেতু প্রসঙ্গটা উঠলো এবং আমি এই বিষয়ে এখন একটা প্রবন্ধ লেখার কথা, লিখতে একজন অনুরোধ করেছে। আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমান বাংলা কবিতাকে একটা জায়গায় নিয়ে গেলেন। শামসুর রহমান পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে উনি মধ্যবিত্তের কথাই বলছেন। ওনার যে দুঃখ সেটা মধ্যবিত্তের দুঃখ। উনি যে স্বাধীনতার কথা বলছেন ওটা মধ্যবিত্তের যে ধারণা স্বাধীনতার, সেইটাই। তো ওখানে সমাজ বিপ্লবের কোনো কথা নাই। কিন্তু তারপরে কি হচ্ছে? তারপরে যে কবিতা আমি একটা সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করি এখন যে কবিতা আমরা পাই সে কবিতাটা নিজের কথা শুধু যে নিজের অসুবিধা নিজের বিচ্ছিন্নতা নিজের দুঃখ। ঐ যে সমষ্টিগত দুঃখ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দুঃখের কথাও এখন আর আসছে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিকতাটা প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটাকে ভাঙতে হলে আবার সাহিত্যকেই ব্যবহার করতে হবে। কেননা সাহিত্য এই বিভাজন মানে না। সাহিত্য মানুষকে সংলগ্ন করতে চায় ঐক্যবদ্ধ করতে চায়। তো সেজন্য সাহিত্যের কাছেই আমাদের যেতে হবে যদি আমরা এটা ভাঙতে চাই। কিন্তু এইটা ভাঙার জন্য যে চেতনা দরকার সেটা আবার সাহিত্য তৈরি করবে। সমস্যাটা কিন্তু একেবারে একটা চক্রের মতো যে সাহিত্য পারছে না কিন্তু সাহিত্যেরই কর্তব্য। ধরুন এখন উপন্যাস আগের মতো লেখা হচ্ছে না সেটার কারণ হচ্ছে যে মধ্যবিত্তের মধ্যেই আমরা আবদ্ধ হয়ে পড়েছি আগেও ছিলাম এর বাইরে যেতে পারিনি। এখন ধরুন সাধারণ মানুষের জীবন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর কথা আমরা বলি আমরা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা বলি বা শওকত ওসমানের কিছু লেখার কথা বলি। কিন্তু কৃষকের জীবন ঐভাবে সাহিত্যে আসেনি।

রাশেদ আহমেদ: শরৎচন্দ্রের লেখার মধ্যে কিছু পাওয়া যায়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: খুব একটা মজার ব্যাপার মনে হবে শরৎচন্দ্র খুবই কৃষকের ভক্ত। আমার একটা বই আছে শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ হ্যাঁ অনেক আগে লিখেছি। সেখানে আমি দেখছি যে উনি জমিদারদের দৃষ্টিতে দেখছেন। মানে ভালো জমিদার চাচ্ছেন। জমিদারী ব্যবস্থার উচ্ছেদ চাচ্ছেন না।

রাশেদ আহমেদ: মহেশ তাঁর তো বিখ্যাত গল্প। 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মানে মহেশ তো একটাই মাত্র গল্প। আর একটা হচ্ছে অভয়ার স্বর্গ। সে অভয়া হচ্ছে খুব দরিদ্র। এই দুটোই চরিত্র যেখানে খুব দরিদ্র মানুষের চরিত্র পাচ্ছেন। মহেশের সমস্যাটা কি? মহেশের সমস্যাটা হচ্ছে যে গফুর। গফুর হচ্ছে নায়ক হ্যাঁ কিন্তু গফুর এই নায়ক হতে পারছে সে মহেশ তাকে সে ভালোবাসে বলে মানে ঐ কারণেই সে হচ্ছে। এবং গফুরের সমস্যা হচ্ছে যে গফুর শ্রমিক হবে না। গফুর কৃষক থাকতে চায়। এখন তার একটামাত্র অবলম্বন সেই মহেশ সে যখন তাকে সেই মেরে ফেললো তখন গফুরের পক্ষে এখন তার মেয়ে আমিনাকে নিয়ে শহরে চলে যেতে হবে। এই শহরে যে কৃষক যে শ্রমিক হয়ে যাচ্ছে এইটাই হচ্ছে দুঃখ এই গল্পের। তো ঐ একটাই চরিত্র কিন্তু এইটা মানে গফুরের দুর্দশাটা কিন্তু গফুরের সমস্যাটার সমাধান হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। গফুর কৃষক থেকে শ্রমিক হয়ে তার অবস্থার কোনো উন্নতি হবে না। যেটা হবে সেটা হচ্ছে সে একটা দাসত্ব থেকে আরেকটা দাসত্বে যাচ্ছে। শরৎচন্দ্র সম্বন্ধে এই বিভ্রান্তি কিন্তু আছে। একমাত্র মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মা নদীর মাঝিতে মেহনতি মানুষকে জেলেদেরকে নিয়ে এসেছেন পরবর্তী উপন্যাসগুলোতেও তিনি একটা সামাজিক বিপ্লবের কথা বলেছেন। আবার যারা বলতেন সমরেশ বসু যেমন বলতেন তারপরে বগলারা ছেড়ে দিলেন সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন তারপরে দেখা গেল তিনি তৃণমূলে চলে গেলেন। তো এই সুবিধাগুলোর দিয়ে আকর্ষণ করে নেয় টেনে নেয়।

রাশেদ আহমেদ: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখাও কিন্তু কিছু আছে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার মধ্যেও কিন্তু কৃষকের জীবনটা আপনি পাবেন না মানে সেটা সম্ভব না। আমাদের এখানে সূর্যদীঘল বাড়ি নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন আবু ইসহাক। তো ঐ জায়গায় যে জয়গুন যে চরিত্রটা ঐরকম চরিত্র আর হচ্ছে না। বা সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ লালসালুতে যে দেখা যাচ্ছে লালসালু কিন্তু মজিদকে নিয়ে লেখা যে মজিদ অত্যাচারী। কিন্তু মজিদের যে স্ত্রীর যে ব্যথা বা মজিদের দ্বিতীয় স্ত্রীর যে বিদ্রোহ এটা দেখিয়েছেন। বাচ্চা মেয়েটা বিদ্রোহ করছে মাজারের উপর পা তুলে দিয়ে শুয়ে আছে। সেইটাই হচ্ছে আসল ঘটনা। মজিদের অত্যাচারের চাইতেও এই যে বাল্যবিবাহ সেইটা এখনো রয়ে গেছে। এবং এই বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েদের যে লেখাপড়া হচ্ছে না তারা বন্দি অবস্থায় আছে এবং যত উন্নয়নই হোক ঐ উন্নয়ন মেয়েদেরকে মুক্তি দিচ্ছে না। মেয়েদের সব কাজ করছে কিন্তু ব্যবস্থাটা এরকম যে মেয়েদের মুক্তি হচ্ছে না। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থাটা রয়ে গেছে। 

রাশেদ আহমেদ: নীল দর্পণের মধ্যে বিদ্রোহ?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ নীল দর্পণে বিদ্রোহটা আছে কিন্তু আমার মূল জায়গাটা হচ্ছে যে নীল দর্পণ কিন্তু ভদ্রলোকদের বিদ্রোহ। মানে তোরাপ সে কিন্তু নিজে নীল চাষী না মানে সে ভদ্রলোকদের উপরে যে সাহেবরা অত্যাচার করছে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। ঐটাও কিন্তু বিপ্লবী কোনো ব্যাপার না মানে এটা হচ্ছে নীল চাষের বিরুদ্ধে। এটা ব্রিটিশের যে শোষণ তার বিরুদ্ধে। লেখা সম্ভবও ছিল না ওতো উনি যখন...

রাশেদ আহমেদ: আপনার একটি সুবিধাজনক জায়গা হচ্ছে আপনি ৪৭ সালে দেশভাগটা পুরো দেখেছেন। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ আপনার চোখের সামনে দেখা। পরবর্তীতে আরও আন্দোলন। যদি বলি আমাদের সমাজে কি কোনো পার্থক্যের কি হয়েছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৪৭ থেকে ৭১ আছে। আচ্ছা এটা হলো ৪৭-এর পরে যেটা হলো সেটা আসলে...

রাশেদ আহমেদ: আপনি তো তখন কলকাতায় ছিলেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ আমরা কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এলাম দেশভাগের কারণেই। আর না হলে আমরা কলকাতাতেই হয়তো লেখাপড়া করতাম।

রাশেদ আহমেদ: কিভাবে এলেন ঐটা একটু বলবেন? 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এটা হলো বাবার চাকরির জন্য। বাবাদের তখন অপশন দেওয়া হতো যে তুমি ভারতে থাকবে না পাকিস্তানে যাবে। তো স্বভাবতই আমার বাবা বিক্রমপুরের লোক হিসেবে ঢাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। আমরা ঢাকায় চলে এলাম। তো ঢাকায় এসে যেটা আমরা দেখলাম সেটা হচ্ছে যে এই যে ধারাবাহিকতা আপনি ধরুন আমরা বিদ্রোহ করলাম একেবারে ৫২ সাল থেকে বিদ্রোহ শুরু ৭১-এ চূড়ান্ত আমরা মুক্ত হলাম নতুন রাষ্ট্র করলাম। কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি। রাষ্ট্র ঐ আমলাতান্ত্রিক। রাষ্ট্র ঐ পুঁজিবাদী ঐ সামরিক বাহিনী ঐ পুলিশ ঐ বিচার ব্যবস্থা ঐ আইন সমস্ত কিছুই বজায় রয়েছে আগের মতোই।

রাশেদ আহমেদ: ৭২ সালে কিছু হয়েছিল মনে হয়? ৭২ সালে যেটি জাতীয়করণের মাধ্যমে...

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: না না ঐটা ঐটা ভুল। ঐটা তো টিকবে না। কেননা রাষ্ট্র যদি পুঁজিবাদী থাকে তার অধীনে জাতীয়করণ মানে হচ্ছে রাষ্ট্রীয়করণ। এবং রাষ্ট্রের মালিকানা মানে মালিক হয়ে গেল রাষ্ট্র। এবং রাষ্ট্র কাদের? রাষ্ট্র হচ্ছে যারা উদীয়মান বুর্জোয়া তাদের। এবং রাষ্ট্র ঐ কলকারখানাগুলোকে নিয়ে কি করলো? তারা লুটপাট করলো। তারা যত কাঁচামাল সব বিক্রি করে দিলো। তারা এটাকে অলাভজনক করে দিল। আদমজীর মতো প্রতিষ্ঠান বিশ্বের মধ্যে সবচাইতে বড় পাটকল আমরা বলতাম। সেই পাটকল ওরা তো অবঙালীরা করেছিল, চালিয়েছিল ঐটা তো মুনাফার জন্য করেছে মুনাফা পেয়েছে। কিন্তু শেষে কি হলো? এই পাটকল যে একটা বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়ালো পাটকল তুলে দিতে হলো। তো কত বড় একটা শিল্পায়ন তো মানে যে হবে না কি এই জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে শিল্পায়নের প্রক্রিয়াটা নষ্ট হয়ে গেল এই কারণে যে ব্যবস্থাটাই হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানার। এবং ব্যবস্থা ঐটা হলো এখন ম্যানেজাররা ব্যবস্থাপক হয়ে গেল নতুন করে তারা এই মালিকের মতো আচরণ করতে থাকলো এবং তারা এটাতে মুনাফা করবে কি তারা লুটপাটের দিকে চলে গেল। ঐ পাকিস্তানীরা লুটপাট করত তাও তারা বিনিয়োগ করে লুটপাট করেছে। আর এই বাংলাদেশের পুঁজিপতিরা তারা কিন্তু লুটপাট করেছে তারা পুঁজি বিনিয়োগ করেনি তারা ঐ যেগুলো আছে ওগুলোকে লুটপাট করছে এবং পাচার করছে। আমরা যে এত দরিদ্র এই পূর্ববঙ্গ সেটা হচ্ছে যে আমাদের সম্পদ মোঘল আমলে দিল্লীতে গেছে ব্রিটিশ আমলে লন্ডনে গেছে এখন বাংলাদেশ আমলে পৃথিবীর নানা শহরে চলে যাচ্ছে। শ্রমিক কৃষক এবং বিদেশই যারা আমাদের মেহনতি ভাইরা তারা যে টাকা পাঠাচ্ছে সেই টাকা আবার এখান থেকে চলে যাচ্ছে এই ধনীদের মধ্যে।

রাশেদ আহমেদ: আপনি এই সময়ের কথা বলছেন। এখনকার সময়ের কথা বলছেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: হ্যাঁ এই সময়ের কথা বলছি।

রাশেদ আহমেদ: বড় বড় যেসব কর্পোরেট হাউজগুলো আছে তাদের একটি বড় অংশ দেশের বাইরে পাচার করছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: এখন তো আমাদের কর্পোরেট সিস্টেমে সবকিছু চলছে বড় বড় পুঁজিপতি তৈরি হয়েছে তারা কর্পোরেট সিস্টেমে চালাচ্ছে। তাদের মাধ্যমেই তো এটা বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা দেশী। আগে ওরা ছিল বিদেশী কিন্তু এরা দেশী। আর দেশী বিদেশীতে পার্থক্য নাই। পাচারের ব্যাপারে তো কোনো পার্থক্য দেখছি না। মানে অবঙালীরা করাচীতে নিয়ে যেত বাঙালীরা মালয়েশিয়া বা কানাডাতে নিয়ে যাচ্ছে। সুইস ব্যাংকে রাখছে। আসল পরিচয়টা হচ্ছে যে ধনী মানে যার দেশপ্রেমহীন ধনী। এবং ধনীরা যারা ধনী হয়েছে তারা দেশপ্রেমিক না। মানে দেশের জন্য ধনী হচ্ছে না নিজের জন্য ধনী হচ্ছে। তো নিজের জন্য ধনী হয়ে এখন দেখছি যে দেশের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। তো এখান থেকে যত পারা যায় সংগ্রহ কর। সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাও এবং সেইজন্য বাড়ি ঘর তৈরি কর সন্তানদের লেখাপড়ার বন্দোবস্ত কর এইগুলো চলছে পাচার চলছে আর কি।

রাশেদ আহমেদ: ৭১ সালে আপনি কোথায় ছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ৭১ সালে ঢাকায় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। মানে  ২৫শে মার্চের সময়ও ঢাকায় মানে আমি ইউনিভার্সিটি কোয়ার্টার্সে থাকি। তো আমরা জানতাম না বুঝতে পারি না কল্পনাও করি নাই যে এরকম ঘটনা ঘটবে। তারপরে ২৭শে মার্চ যখন কার্ফিউ তুললো কিছুক্ষণের জন্য তখন আমরা বেরিয়ে গেছি। আমরা এবার জানতাম যে আমরা তো আন্দোলন টান্দোলন করতাম সব সময় যে আমাদের খুঁজবে, খুঁজেছেও । তো আমি বেরিয়ে গেছি ২৭শে মার্চ আর এখানে ফিরি নাই। টিক্কা খান যাওয়ার আগে সেকেন্ড সেপ্টেম্বরে ঐ ছয় জন শিক্ষকের নামে সতর্কতামূলক চিঠি দিয়ে গেছিল যে তোমরা রাষ্ট্রদ্রোহী ওর মধ্যে আমিও ছিলমা। আমাদের একটা অংশ কলকাতায় আগেই চলে গিয়েছিলেন। আর যারা ছিলেন এবং যারা ইনক্যাম্পাসে ছিলেন বা পরিচিত ঠিকানায় ছিলেন তাদেরকে আলবদর ধরে নিয়ে গেল। আমাকেও আলবদর ধরে নিয়ে যেতে পারতো তাহলে তো নাম দেখা গেছে কিন্তু আমার তো ঠিকানা পায়নি।

রাশেদ আহমেদ: আপনি তখন কোথায় ছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি নানা জায়গায় থাকি আত্মীয় স্বজনের বাসায় গ্রামে এনো তেনো। আমি বুঝে ফেলেছি যে এখানে যাওয়া বিপদজনক আমার জন্য।

রাশেদ আহমেদ: ঢাকায় ফিরলেন কবে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমরা আশেপাশেই ছিলাম গ্রামেই ছিলাম এবং ঐ ৬ই ডিসেম্বরের পরে আমরা ঐ গ্রামে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। তো আমাদের একটা অংশ গ্রামে চলে গেল। আমরা যেতে পারলাম না কেননা এত লোক হয়ে গেল যে আত্মীয় স্বজন যারা আছে সবাই যেতে চাইলো আমরা তাদেরকে নৌকায় তুলে দিয়ে রয়ে গেলাম। তো রয়ে যাওয়ার পরে দেখি আর যাওয়ার অবস্থা নাই কার্ফিউ তো ঢাকাতেই ছিলাম। যারা গেছেন তারা কিন্তু নদী পার হয়েই দেখেন যে মুক্ত এলাকা মানে তাদের ওখানে এখনো পাকিস্তানী নাই, রাজাকার টাজাকারও নাই।

রাশেদ আহমেদ: এখন আপনি কি বিষয় নিয়ে লেখালেখি করছেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি তো এখন দুটো কাজ করি। একটা কাজ হচ্ছে আমরা একটা নতুন দিগন্ত পত্রিকা বের করি। সেই ২০০২ সাল থেকে সেটা এখন ২৪ বছর ধরে চলছে ত্রৈমাসিক। এইটা আমাদের একটা সাহিত্য সংস্কৃতির পত্রিকা আমাদের এই যে সামাজিক পরিবর্তনের কথা। আমরা একটা সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র করেছিলাম। অর্থাৎ সমাজে যে রূপান্তর হচ্ছে সেই রূপান্তরটাকে যাতে গণতান্ত্রিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। তো ঐটা করি আর দ্বিতীয় আমার নিজের লেখা টেখা প্রবন্ধ টবন্ধ লিখি আর একটা আত্মজীবনী লেখার চেষ্টা করছি। আমি বিক্ষিপ্ত হয়ে লিখেছি কিন্তু এখন এগুলো সংলগ্ন করে ধারাবাহিকভাবে লেখার চেষ্টা করছি এবং এটা আমাদের পত্রিকাতে প্রকাশ করছি।

রাশেদ আহমেদ: দিনে কয় ঘণ্টা লিখেন আপনি?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমার অন্য কাজ নাই মানে আমি হচ্ছে শারীরিকভাবে কিছুটা সক্ষমতা হারিয়েছি। আগে যতটা সক্ষম ছিলাম। চোখে অত ভালো দেখি না আগের মতো দেখতাম। আবার ঐ করোনা তো আমাকে আক্রমণ করেছিল। তো যাই হোক তো আমার মূল কাজ হচ্ছে পড়া আর লেখার আর অন্য কোনো কাজ নেই। আমার পারিবারিক দায়িত্ব নেই কেননা আমি থাকি আমার মেয়েদের সাথে। ও দুই মেয়েই ঢাকায় থাকে ওরা একেবারে আবার পাশাপাশি ফ্ল্যাটেই থাকে ওরাই দেখাশোনা করে।

রাশেদ আহমেদ: লেখার জন্য কোন সময়টাকে আপনি বেছে নেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি আমার কোন বিশেষ সময় নেই। আমার সারাদিনই এইগুলো যেমন এখানে এসছি আপনার সাথে কথা বললাম এইটার কিছু তো সময় গেল না হলে আমি লেখাপড়ার কাজই করতাম। মানে এই কাগজ নিয়ে এসছি বই নিয়ে এসছি এবং বাসায় যেয়েও এই কাজই করব।

রাশেদ আহমেদ: কতগুলো বই আপনার বেরিয়েছে, মনে আছে?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: মানে ১০০ ছাড়িয়ে গেছে। ছোট ছোট বই আর কি। ১০৪-১০৫ টা হবে হয়তো।

রাশেদ আহমেদ: এখন কোন সাবজেক্ট নিয়ে আপনার লিখতে বেশি আগ্রহী?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমার সাবজেক্টটা হচ্ছে যে আমি তো সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম। সাহিত্য বিষয়ে আমি লিখেছি অনুবাদও করেছি এবং আমার গল্প গল্পের লেখারও চেষ্টা করেছি। এবং আমি প্রবন্ধ লিখি এবং এখন আমার প্রবন্ধগুলোর মূল বিষয়টা হচ্ছে এই যে সমাজে যে একটা পরিবর্তন ঘটছে মানে সেই পরিবর্তনটা সম্বন্ধে ঐ কারণগুলো বিশ্বব্যাপী যেটা পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্বন্ধে এইটারই একটা যতটা পারা যায় এরই একটা মানে বিশ্লেষণ এবং এরই আমাদের দেশে এর প্রতিক্রিয়া বা আমাদের দেশে যে শ্রেণী গঠন হচ্ছে বা সামাজিক বিপ্লব যে ঘটছে না। আমার মূল ঐটা হচ্ছে উদ্দেশ্য যে সামাজিক বিপ্লবের পক্ষে একটা চেতনাটাকে আরও বিস্তৃত করা। এই চেতনাটা আছে কিন্তু এটাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া যায় কিনা বা ঐখানে আমি কোন অবদান রাখতে পারি কিনা ঐ চেতনার বিস্তার আবার গভীরতা সৃষ্টিতে এটিই আমার লক্ষ্য।

রাশেদ আহমেদ: আপনি দৈনিক সংবাদে দীর্ঘ দিন কলাম লিখেছেন ছদ্মনামে লিখেছেন গাছপাথর নামে। প্রথম কথা যে ছদ্মনামে কেন লিখতেন আর গাছপাথর নামটি কেন দিয়েছিলেন?

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি অনেক বছর লিখেছি এটাকে আমার জীবনের একটা খুবই সুখকর অভিজ্ঞতা। নানা আমার দুঃখ গেছে পারিবারিক আমার স্ত্রী তখন মারা গেছেন। কিন্তু ঐ ১৪ বছর আমি লিখেছি। গাছপাথর কেন নাম নিলাম? গাছপাথর আর সময় বয়ে যায় এটা মিলিয়েছিলাম আমি। ওটা ভেতর থেকে এসছিল যে সময় তো চলছে আমি সময়টাকে দেখছি। আর আমি দেখছি একটা দাঁড়িয়ে স্থির জায়গাতে গাছ যেন পাথর হয়ে গেছে কিন্তু এই গাছ পাথরটা নির্বাক নয়। দাঁড়িয়ে দেখছে ঐ এটাতে কিন্তু সে নিষ্প্রাণ নয় যদিও সে পাথরের মতন শক্ত হয়ে আবার একটা অবস্থানে আছে। সময়টা তার সামনে দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। তো সে ঐ সময়টাকে দেখে এই সময় সম্পর্কে তার যে উপলব্ধি সেইটা সে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। এইটাই হচ্ছে তার ছদ্মনামে কেন লিখতাম? ছদ্মনামে লেখা একটা স্বাধীনতা দেয়। আপনি যে নিজের নামে লিখলে যে মানুষ যে একটা ই থাকে যে আপনি লিখছেন এটা জানে মানুষ। ছদ্মনামে লেখার পরেও মানুষ চিনে ফেলে যে কে লেখে কিন্তু তবুও আমি তো আর লিখি নাই মানে আরেকজন ঐ এরকম একটা একটা আবরণ থাকে এই আবরণটা আমার পছন্দ হয়। যে একেবারে প্রকাশে না গিয়ে একটা আবরণের মধ্য দিয়ে লিখছি। আর দ্বিতীয় কথা হচ্ছে যে আমি অতটা প্রত্যক্ষ হতে আমার লেখার মধ্যেও আমি ঐ নিজেকে খুব একটা জাহির করতে চাই না মানে আমি একটু অপ্রত্যক্ষ থাকতে চাই ঐ কারণে।

রাশেদ আহমেদ: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আপনাকেও ধন্যবাদ যে এত কথা বলার সুযোগ দিলেন আমাকে।




সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত