খন্দকার সাখাওয়াত আলী একজন সমাজতাত্ত্বিক, গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস, সোয়ানজি থেকে সমাজতত্ত্ব ও উন্নয়ন অধ্যয়নে পড়াশোনা করেছেন। বিগত দশকের বেশি সময় ধরে গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন দেশের প্রধান সারির থিং ট্যাংক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন ডিএফআইডি, বিশ্বব্যাংক, সিডা, সুইস দূতাবাস, নেদারল্যান্ডস দূতাবাস এবং কানাডিয়ান হাই কমিশনের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার সংস্থায়। পাশাপাশি ইউএনডিপি, ইউনিসেফ এবং ইউনেস্কোসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায়ও কাজ করেছেন। তিনি সমাজ, রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন যুক্তি এবং রেফারেন্স দিয়ে। দেশের যেকোনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন গভীরভাবে। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছেন সংবাদ-এর ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতার সম্পাদিত সংস্করণ তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ : আলোচনার শুরুতেই যেটি আপনার কাছে জানার ইচ্ছে— বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আসলে কেমন দেখছেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: একটা রক্তক্ষরণ অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ এগোচ্ছে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে দুই ডিজিটের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে প্রায় তিন বছর আমাদের চলতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একে সামনে রেখেই বাজেট হয়েছে এবং সেই বাজেটের আকার গতবারের বাজেট থেকে বেশি।রাজস্ব টার্গেট প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। এটা সংগ্রহ হবে কোথা থেকে? এর ভার নিশ্চিতভাবেই পড়বে আমাদের সাধারণ মানুষের ওপরে। যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়াবে। অর্থনৈতিক একটা গভীর ক্ষত অবস্থা মধ্যবিত্তের এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর।
জুলাই ’২৪-এ যে অভ্যুত্থান ঘটল, তার প্রতিশ্রুতি ছিল বৈষম্যমূলক সমাজের কথা বলে। কিন্তু বিগত ৫৫ বছরে আমরা ইতিহাসে তিনটি সুযোগকে লস্ট মোমেন্ট হিসেবে পাই। আমরা বিগত ৬৯-এর মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে কিন্তু একটা দেশ পেয়েছিলাম। সেটাও কিন্তু একটা গণঅভ্যুত্থান ছিল। ১৯৭১—’মুক্তিযুদ্ধ’ আমাদের ইতিহাস ও গোটা জাতির ভরকেন্দ্র–কিন্তু মুক্তির-লড়াই আজও শেষ হয় নি। ১৯৭১ সালের মাধ্যমে আমাদের আইডেন্টিটির প্রশ্নের সমাধান করে দেশ স্বাধীন হয়েছে।উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা ৭১-কে দেখি, আজকের প্রজন্ম কীভাবে দেখে সেটা নিশ্চয়ই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের জন্য বিষয়টি এক নতুন বাস্তবতা। কিন্তু একাডেমিক জায়গা থেকে যদি আমরা দেখি, ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ যে ভাগ হলো দুটো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। দুই ধর্ম-এর ভিত্তিতে যে দ্বিজাতিতত্ত্ব, তাকে নিরাকরণ করেই কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম।
এখানেই আমাদের প্রশ্ন? ইতিহাস কি সব সময় সামনের দিকে আগায়, না ক্ষেত্র বিশেষে পেছনের দিকে কখনো গড়ায়? সে ক্ষেত্রে ইতিহাস বলে হ্যাঁ, ইতিহাস মাঝেমধ্যে পেছনের দিকেও গড়ায়। এ ব্যাপার মার্কসের বিখ্যাত এক উক্তি আছে, ইতিহাস সবসময় সরলরেখায় সামনে এগোয় না, কখনও কখনও তা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ। চব্বিশের জুলাই অভূত্থান যদি আমরা দেখি, এর অর্থনৈতিক বৈষম্যতার ভিত্তিটা কী ছিল? আমরা অভ্যুত্থান বলছি, কেউ কেউ বিপ্লব বলছে— আমি এটা বিপ্লব বলতে রাজি নই। কারণ এর মুভমেন্টের যদি মূল পটভূমি দেখেন, যা ছিল সম্পূর্ণ একটা অর্থনীতিবাদী আন্দোলন।
বিগত দুই দশক জুড়ে নব্যউদারিকরণ নীতির ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে নতুন এক অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়েছে। নতুন এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়াতে অর্থ ব্যয় করছে। যারা শিক্ষিত। শিক্ষাকে তারা সামাজিক গতিশীলতার উপায় হিসেবে নিয়েছে।মা-বাবার কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে নিয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত এই সব তরুণ যুবাদের পড়াশোনা শেষে চাকরি নেই। সুতরাং চাকরির জন্য কোটাভিত্তিক আন্দোলন থেকেই বাংলাদেশে এই আন্দোলনের শুরু।বিষয়টিকে আমি গভীর লেন্স দিয়ে দেখতে চাই। সাধারণভাবে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিবেচনায় বিশ্লেষণে বিষয়টিকে তেমনভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
বলাই বাহুল্য ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে, ১৯৭১ সাল ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও প্রস্তুতি দুই ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রশ্নগুলো আমাদের সহযোগিতা করেছে। সেই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সংগঠন ছিল, জনগণকে রাজনৈতিভাবে শিক্ষিত করা গেছে, নেতা ছিল। ২০২৪ সালে এরকম, রিজিয়নালি এবং গ্লোবালি একটা রাজনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা চেঞ্জ হচ্ছে। সেই অর্ডারের যে ফাইন টিউনিং হচ্ছে তার ভেতরে কিন্তু আমরা আছি। কিন্তু আমাদের তিনটি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একাত্তুর থেকে আমরা পিছিয়ে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক শক্তির প্রস্তুতি নেই। রাজনৈতিক শক্তি সত্যিকারের জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ দেখছিল। দ্বিতীয়ত, যে তরুণ শক্তি, তাদের রাজনৈতিক জায়গা থেকে প্রশিক্ষিত করার যে সম্ভাবনা, এটি তাদের দুর্বলতা নয়—এটা রাজনৈতিক শক্তির দুর্বলতা। আর তৃতীয়ত, জাতীয় স্বার্থ-এর পক্ষে শক্তিশালী ও মানুষের কাছে নেতা।
এইরকম একটা আন্তর্জাতিক বিষয়কে নেভিগেট করে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে সেটাকে নিয়ে আসা—এই প্রস্তুতির অভাবটা কিন্তু আজ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এবং আপনি যদি ২০০৮ সালকে দেখেন, সেই সময়েও কিন্তু আমরা নেগোশিয়েট করে সবদল মিলে একটা নির্বাচন করে এগিয়েছিলাম। আজকে ২০২৬-এর যে নির্বাচন, আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে এক ধরনের আলোচনা, আপোসরফা ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যেন নির্বাচনটা হলো। এক ধরনের অসম্পন্নতা নিয়ে কিন্তু এই অংশগ্রহণ, যেটি ইতিহাসগতভাবে গড়ে রাজনৈতিক সংকটের মীমাংসা হলো না, মীমাংসা হলো না রাজনৈতিক বিরোধের। ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়ালো, ইলেক্টোরালদের বড় অংশ কিন্তু তাদের ভোটাধিকারের সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ একটি বড় দলের সাপোর্টারদের নির্বাচন অংশগ্রহণের বাইরে রাখা হলো। একই ঘটনা ও উদাহরণ কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে আরও দুটো দেশে ঘটেছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দেখেন, শ্রীলঙ্কায় যারা রাষ্ট্রক্ষমতা হারিয়েছিল তারা নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে। নেপালেও আমরা সেই বিষয়টা দেখলাম। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে যেটা হলো, আমরা বড় একটা রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রেখলাম। যে কারণে নির্বাচনের প্রশ্নে সবার অংশগ্রহণ ছিল না। কাজেই আমরা সমাধানটা সম্পূর্ণ কিন্তু করতে পারলাম না। আমরা জবরদস্তিমূলকভাবে, একটা রাজনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে রেখে সমাধান খুঁজছি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে তেলের দামের উচ্চমূল্য এবং যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে - সংকট আরও গভীর হবে এবং তার অভিঘাত আমাদের ওপর পড়বে।
রাশেদ আহমেদ : আমি যেটি বলতে চাচ্ছি, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেল ২৪-এর আন্দোলনের পরবর্তীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছুর ওপর আঘাত আসলো। সেটি কেন? কারা এটি করলো? এবং ৭১-কে কেন অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: খুব ভালো সময়ে আপনি এই প্রশ্নটা করলেন। এ প্রশ্ন দুই বছর আগে করলে, এর উত্তর দেওয়াটা হয়তো কঠিন ছিল। কিন্তু এখন ক্রমশ ঘটনার নানাদিকগুলো আনফোল্ড করছে। ২৪-এর যে অভ্যুত্থান, এই অভ্যুত্থান নিয়ে, নানাপক্ষের নানা রকম কথা হচ্ছে। তখনই এই কথাটা হচ্ছে যখন ২৪-কে প্রতিপক্ষ করছি আমরা ৭১-এর। আমি এ প্রসঙ্গে তিনটি ব্যাখ্যা দিতে চাই। সেটা হচ্ছে ৭১ আমাদের তিনটি পরিচয়কে নিশ্চিত করেছে। একটা হচ্ছে, প্রথমতম আত্মপরিচয়, দ্বিতীয়ত, সার্বভৌমত্ব এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্র তৈরি করেছে। যেটি অন্য কোনো গণঅভ্যুত্থান করতে পারে নাই। করার কথাও নয়।
’৬৯ দেশ স্বাধীন হওয়ার পটভূমি তৈরি করেছে। আপনি আমি আমরা ‘৯০-র জেনারেশন। আমরাও এরশাদ স্বৈরাচারকে উপড়ে ফেলেছি— জুলাই গণঅভ্যূত্থানে ’ফ্যাসিস্ট‘ শব্দটি বেশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা নিয়ে একাডেমিকভাবে প্রশ্ন করা দরকার। সাধারণভাবে বলা যায়, আমাদের পলিটিক্যাল সিস্টেমটার ভেতরে এক ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবের জন্ম হয়েছিল। এবং সেটি তো ঐতিহাসিক পটভূমিতে হয়েছিল। আমাদের বড় দলগুলো নির্বাচনে নিজেদের জয়কে নিশ্চিত করতে চায়। জয় ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা করে আমরা এর একটি সাসয়িক সমাধান খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্টটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা পরস্পর কিন্তু নষ্ট করেছে। সেই অবিশ্বাসের জায়গা থেকেই নির্বাচনের ফলাফলকে গ্রহণ করার সংকটই কিন্তু বাংলাদেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। এখানে আমার দুটো খুব স্পষ্ট অবস্থান আমি দেখি। সেটা হচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিজেদের জয়ী হিসেবে না দেখতে পাওয়ার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল না, যে নির্বাচনে একতরফাভাবে তৎকালীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসলো দ্বিতীয়বারের মতো।
রাশেদ আহমেদ : তাদের একটা ইস্যু ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেটি বাতিল করা হয়েছে, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: হ্যাঁ, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি আমাদের রাজনীতিতে নতুন করে সংকটের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কিন্তু তারা নির্বাচনে আসলো। সেই জায়গাটা সত্যিকারের, আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আজ দেখুন ৭০ থেকে ৮০, ১০০টি সিট— এইরকম বিরোধীদলের অবস্থান নিয়ে যদি সমাধানটা হতো, তাহলে আজকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির এইসুযোগটা হত না— মানে রাজনীতিতে ১৯৭১-এর প্রশ্নে যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিকভাবে এমন বৈধতা পেতে না। ২০২৬-এর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে–আজ তারা তা পেয়েছে।
আমাদের রাজনৈতিক-ব্যবস্থায়, ‘দুর্বৃত্তায়ন’ প্রবণতা আজ খুব স্পষ্ট দৃশ্যমান। যেখানে আমরা দেখবে, প্রশাসন— সেটা আর্মি-সিভিল-পুলিশ, ব্যবসায়ী, পলিটিশিয়ান, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ— এদের ভেতরে একটা গোষ্ঠীগত স্বার্থ তৈরি হয়েছে। যা মূলত ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ, একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গত রেজিমে বড় আকারে আবির্ভুত হয়েছে। অর্থ্যাৎ আমাদের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ক্রমান্নয়ে বুর্জোয়া লুম্পেনাইজেশনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। যা স্পষ্ট করে না বুঝলে আমাদের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতাটা বোঝা যাবে না।
আপনি দেখুন জুলাই-এ অভ্যুত্থান হলো, কিন্তু অভ্যুত্থানের পরে অভ্যুত্থানের নায়করাই কিন্তু লুটে অংশ নিল। বিগত ৫৫ বছরে, আমাদের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের একটা চেহারা দাঁড়াচ্ছে, যার সঙ্গে আশির দশকের ল্যাটিন আমেরিকার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। আশির দশকের ল্যাটিন আমেরিকা ছিল উন্নয়নের নামে ‘দুর্বৃত্তায়ন’। সমাজবিজ্ঞানী এ জি ফ্রাঙ্ক তার বই ‘লুম্পেনবুর্জোয়াজি, লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট ও লুম্পেনপ্রলেতারিত’ যে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করেছিলেন। একই চেহারা আমরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখছি। যেখানে শুধু বুর্জোয়ারাই লুট করে না, এখানে দরিদ্ররাও সুযোগ পেলে লুট করে। আপনি দেখবেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা কিন্তু তা করেন নি। তারা পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা হয়েছেন। তারা অর্থবিত্ত করেছে ১৯৭১- সালের পরে। কাজেই তাদের বিরেুদ্ধে সমালোচনাটা আসবে একাত্তুরের পরে।
৬৯’-এ ছাত্রনেতারা নৈতিকতা বা মোরাল হাইটটা কিন্তু ধরে রেখেছিল। ‘৯০-এর পরে ছাত্রনেতারা সেই মোরাল হাইট কিন্তু ধরে রাখতে পারে নি। আমরা যাদের ছাত্রনেতা হিসেবে পেয়েছিলাম তাদের শুধু সোশ্যাল প্রোফাইলটা যদি আজকে দেখেন, তবে দেখবেন– রাজনীতি ও সমাজ তাদের সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছিল এবং তারাও সেই মোরাল হাইটটা ধরে রাখতে পারে নি।
রাশেদ আহমেদ : অনেকে বলে থাকেন, এখনো বলেন যে ২৪-এর আন্দোলনের পরে, গণঅভ্যুত্থানের পরে যেটি হয়েছে বাংলাদেশে উগ্রবাদী যে শক্তি সেই শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তো তাদের উত্থানটা হলো—আপনি কি এটা সমর্থন করেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি ’৬০-এর দশকের এবং ’৯০-এর দশকের এবং ২০২৪-এর এই তিনটি জেনারেশনের যারা মার্কসিস্ট অথবা যারা বামপন্থা রাজনীতি করেছেন, তাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংগঠনিক একটা চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। সম্ভবত সেটাই উত্তর হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। ৬০-এর দশকে আপনি দেখবেন যে বৈশ্বিক মতার্দশকে কেন্দ্র করে, বাম-কমিউনিস্ট রাজনীতি ভেঙে যায়।’৬৯-গণঅভুত্থানের নেতৃত্ব দেবার কথা লেফটদের। কিন্তু সেই রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র তারা ধরে রাখতে পারে না। ‘৬৬-তে সোভিয়েত এবং চায়না দ্বন্দ্বের কারণে পার্টিগুলো ভেঙে যায়, সামাজিকশক্তিগুলো ভেঙে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও গণসংগঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সত্যিকারের নিয়ামক ভূমিকা কিন্তু কমিউনিস্টরাই পালন করেছে। সেই সময় ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায়, সেই সময় আপনার কৃষক সভা ভেঙে যায় এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙে যায়।
যে কারণে আপনি দেখবেন যে জাতীয়তাবাদী শক্তি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কত দ্রুততার সঙ্গে জনমানুষের অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জন্ম দিল। আপনি যদি দেখেন ৬২ থেকে ৭১-এর দূরত্বটা খুব বেশি না। সেখান থেকে দেখেন ৬৬-তে ছয় দফা। তার আগে আপনার ৬৪-তে শিক্ষা আন্দোলন। আপনি যদি এর সঙ্গে লিংক করেন, দেখবেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে দুইজন লেফটনেতা ছিলেন সংস্কৃতি এবং শিক্ষার দায়িত্বে। একজন ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। উনি তো কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত মানুষ। ৬২-র ছাত্রনেতা। শিক্ষার ক্ষেত্রে ’৬২ সালের যে প্রতিশ্রুতি, তিনি তা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছিলেন। দশ বছর উনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে পেয়েছিলেন। শিক্ষার ফাইভ ইয়ার্স প্ল্যানের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। তার সময় মাদ্রাসায় সরকারি ইনভেস্টমেন্টই বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো মাদ্রাসার পড়া ছাত্ররা প্রগ্রেসিভ কি হয় না? হয়। আবুল ফজল তার বড় উদাহরণ, শহীদুল্লা কায়সার তার বড় উদাহরণ। কিন্তু সেজন্য যে সামাজিক পরিবেশ লাগে। এই প্রগ্রেসিভনেস পরিবেশ ধরে রাখার জন্য, আমাদের তো ৬০-এর দশকের বিনিয়োগ দিয়েই আমরা ২০২৫ সাল অব্দি চলতে চেয়েছি। সমসাময়িককালে আমাদের যে নতুন মধ্যবিত্ত তৈরি হয়েছে, এখনকার মধ্যবিত্ত আর ৬০-এর দশকের যে মধ্যবিত্ত- তো একই সাংস্কৃতিক মান এবং বোধ নিয়ে জন্মায়নি। এর যে ঘাটতিটা, এর দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজকে নিতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির যে উত্থান সেটি হলো কেন? বাংলাদেশ সেটি এক্সেপ্ট করছে কী কারণে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি দুটো দিক থেকেই মনে করি আমরা একটা প্রতিকূলের মধ্যে আছি। প্রথমত, ৬০-এর দশকের আধুনিক মানুষের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল, প্রগ্রেসিভ মতার্দশ মার্কসবাদ।বিশ্ব রাজনীতিতে তার বিশেষ অবস্থান ছিল। ৯০-এর দশকের পরে ডানপন্থা রাজনীতির অভ্যুত্থান হচ্ছে দেশে ও বিশ্বব্যাপী। আপনি দেখেন আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াতে সেখানে হিন্দুত্ববাদের জন্ম হচ্ছে। এবং আপনি দেখেন, আমরা আমাদের দেশে রিহ্যাবিলিটেড করলাম জামাতসহ মুসলিম ফোর্সেসগুলোকে। আরেকটি জিনিস যদি দেখেন, সাম্প্রতিককালের এই যে নিউ মিডিয়া যেটা আসলো—অর্থ্যাৎ সামাজিক গণমাধ্যম। এর সর্বোচ্চ ব্যবহার তো হচ্ছে ধর্মীয় উত্থানে মদদযোগাতে। আগে শীতকালে গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন ছিল। এখন সেই ওয়াজ মাহফিল রেকর্ডে হয়ে, ইউটিউব ফেইজ বুক এর মাধ্যমে হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। সেই তুলনায় আপনি চিন্তা করেন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি বা লেফটরা এই মিডিয়াকে কি সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পেরেছে? সময়ের ব্যবধানে পরিবেশ ও পরিস্থির পরবর্তন হয়েছে।
প্রথমত, শিক্ষা-সংস্কৃতির জায়গায় সত্যিকারের সৃজনশীল সামাজিক কোনো উদ্যোগ, এই সময়ে আপনি খুঁজে পাবেন না। খেলাঘর ভেঙে গেছে, উদীচী ভেঙে গেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রাখার সক্ষমতা হারিয়েছে। গ্রামাাঞ্চলে আপনার কৃষক সমিতি বলতে তো কিছু নেই, তাই কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ নাই। খেতমজুর সমিতি একসময় ছিল সেগুলো একসময় এনজিও হয়েছিল আজ তার অস্তিত্ব নেই।সুতরাং রিপ্রেজেন্টেশন—পলিটিক্যাল রিপ্রেজেন্টেশন ভুল মানুষ ও সংগঠনের দ্বারা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে রাজনৈতিক দলের গণসংগঠনের মধ্য দিয়েই, বিদ্যায়তনে ও সমাজে সামাজিক সংগঠনগুলো গড়ে ওঠে। ৬০ দশকের পর এখানে রাজনৈতিক কোনো উদ্যোগ ও বিনিয়োগও হয়নি। অন্যদিকে রাষ্ট্রও শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে একক বা কমন নাগরিক তৈরির প্রকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরেকটা দিক থেকে যদি বলি— বাংলাদেশ ইজ এ কেস অফ এলিট ফেইলর। এ কথাটার ভেতর দিয়ে আমি কী বলতে চাচ্ছি? অর্থাৎ আমাদের যারা মধ্যবিত্ত, যে মধ্যবিত্ত ৭১-এ ছিল, তাদের একটি বড় অংশ আজ আমাদের সমাজে এলিট। সেই এলিটরা রাষ্ট্র গঠনের জন্য, সমাজ গঠনের জন্য কি সত্যিকারের কোনো বিকল্প তৈরি করতে পেরেছে- বিগত ৫৫ বছরে? আমরা বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছি প্রাইভেট সেক্টরকে। আমরা কী আমাদের বাচ্চাদের পাবলিক স্কুলে পাঠাচ্ছি, চিকিৎসার জন্য পাবলিক হাসপাতালে যাচ্ছি? না, বড় অংশটা যাচ্ছি না।আমরা নিজেদের উপযোগী ব্যবস্থা প্রাইভেট সেক্টরে করে নিয়েছি। আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করছি, নিজেদের দেশের জন্য নয়, বরং বিদেশের মার্কেটের জন্য। এরা ও-লেভেল, এ-লেভেল পাস করছে। অন্য কাউকে আমি উদাহরণ দিচ্ছি না, আমি নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েই সেই কথাগুলো বলছি। এবং এর কারণ পেছনে আছে, দেশে নিরাপত্তা বোধ করা যাচ্ছে না, ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। বুয়েটে যেন ওয়ার্কস্টেশন ফর দ্য ওয়েস্ট। ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা ও-লেভেল, এ-লেভেল পড়ে আগে স্কলারশিপে অথবা বাবা-মায়ের পয়সাতেই পশ্চিমের দেশগুলো পড়তে যাচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর বিদেশি ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়তে যাচ্ছে এবং অভিবাসন নিচ্ছে।
রাশেদ আহমেদ : একসময় দেখা যেত এলিট শ্রেণি বাংলাদেশের পলিটিক্যাল পার্টিগুলোকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করত। এখন কিন্তু তারা সক্রিয় নয়। এই যে সুশীল সমাজের দূরে সরে যাওয়া এবং সুশীল সমাজ রাষ্ট্র গঠনে কি কোনো ভূমিকা রাখছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: খুব ভালো প্রশ্ন। ৯০-এর দশকের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। নিউ লিবারেলিজমের কারণে বিষয়টি ঘটেছে। ইতিহাসের আলোকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। ৬০ দশকের পাঁচজন অর্থনীতিবিদের কথা, বারবারই ঘুরে ফিরে আসে। সেই সব অর্থনীতিবিদরা কীভাবে নিজেদের পুনর্বাসিত করেছিল নতুন সিচুয়েশনে? রিফ্লেক্টিভ হওয়া দরকার, বিষয়গুলোকে আত্মসমালোচনার জায়গা থেকে আনা। উনারা সবাই ইন্টারন্যাশনাল ডোনারসদের সঙ্গে নিয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত করে উনাদের ইন্টেলেকচুয়ালি সারভাইব করেছিলেন। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে এরাই কিন্তু সমাজতন্ত্রের জন্য ফাইভইয়ার্প্ল্যানের প্ল্যানটা করেছিলেন, শিক্ষানীতিটা করেছিলেন। প্রফেসর আনিসুজ্জামান নমস্যব্যক্তি— কিন্তু এই আনিস স্যার কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু অর্থ্যাৎ শেখ মুজিবুর রহমান উনাকে বলছিলেন, আনিস তুমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব নেও। স্যার কিন্তু ওই রাজনৈতিক কাজটাকে নেন নি। উনি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে বিদেশে চলে যান। বিদেশে ফেলোশিপ নিয়ে একটা বড় একাডেমিক কাজ করেছিলেন। অষ্টদশ দশকের বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করেন।
আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকতার ডিপারচারটা আমি একদম খুব স্পষ্ট দেখি এবং এটা বলার সময় এসেছে। আমি বিগত তিন দশক ধরে থিংক ট্যাংকের সঙ্গে কাজ করেছি এবং করছি। আমি প্রাইভেট সেক্টরের মানুষ, আমি খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু আমাদের এই ফিরে দেখাটা খুব দরকার। ৯০-এর পরে আপনার পাঁচটা গবেষণা প্রতিষ্ঠিান তৈরি হয়েছে। যা মূলত গড়ে উঠেছে বিআইডিএসের হিউম্যান রিসোর্স দিয়ে।এসব প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে; সিপিডি, পিপিআরসি, উন্নয়ন সমন্বয়, ইআরজি এবং পিআরআই— ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং বিআইডিএস-এর সহকর্মীদের নিয়ে।
আমাদের পাবলিক সেক্টরের প্রোডাক্ট প্রাইভেট সেক্টরে এসে থিংক ট্যাংক হয়েছে। কিন্তু ন্যাশনাল ইন্টারেস্টকে কতটা সার্ভ করতে পেরেছে তারা? এই থিংক ট্যাংক এবং মিডিয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালের অংশ হয়ে উঠেছে।যে কারণে কিন্তু, এ দেশে ওয়ান ইলেভেন হয়েছে। যে কারণে ২০২৪ হয়েছে। জনঅংশগ্রহণের পাশাপাশি, পেছনে নানা শক্তি কাজ করার তথ্য ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে। আমি আমার সমস্ত আলোচনার ভিত্তিতে একটি কথা বলতে চেয়েছি যে, আমাদের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো, আজ আমাদের হাতে নেই। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও গ্লোবাল স্টেক হোল্ডারদের সংযোগ আছে। একে এভয়েড করার কি সুযোগ ছিল? বলাই বাহুল্য, বর্তমান বাস্তবতায় সুযোগ নেই। কিন্তু যেটি ৭১-এ ছিল, ঠিক একই রকম পরিস্থিতি আমরা মোকাবিলা করেছি। আমাদের জাতীয় ‘স্বার্থ’ এর প্রশ্নে, জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল। একটা ন্যাশনাল ক্যাপাসিটি ছিল, ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটি। আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটি জাতীয় স্বার্থে দেখার বিবেচনায় একটা ব্যাংকরাপ্সি লেভেলে পৌঁছে গেছে। যার ফলাফল রাজনীতি এবং সমাজসহ সব জায়গায় আজ দৃশ্যমান।
রাশেদ আহমেদ : ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটির কথা যেটি বললেন, আমরা গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেটা দেখেছি অনেক ইন্টেলেকচুয়াল তো এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন নোবেল লরিয়েটও এটার সঙ্গে ছিলেন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ লেভেলের লোকজনও ছিলেন। ১৮ মাসে কী দেখেছেন আপনি?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এখানে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে, যে মোরাল হাইট নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছিলেন, সরকার ছেড়ে আসার পর তারা নিশ্চিয়ই নিজেদের আয়নায় নিজেদের কাজের ও দায়িত্বের বিবেচনা করবেন। কতটুকু তা সফল কিংবা ব্যর্থ হলেন। মোরাল হাইট তারা জাতির জন্য কোথায় রেখে গেছেন।
জাতি হিসেবে বিশেষত ইন্টেলেকচুয়ালরা, কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টকে আমরা কীভাবে বুঝি? ওই লেভেলের লোকরা যদি কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট ব্রেক করে, তাহলে এই মেসেজটা নিচের পর্যন্ত কোথায় যায়? আমরা যে ব্রেক করি সেটা ভেঙে বারবার কেন বলি? আমরা চেয়ারে বসে বেনিফিসিয়ারি হই। সে উদাহরণগুলো তো আছে। আমি যদি আমার ট্যাক্স হলিডে করি, প্রতিষ্ঠানের নামেই করি, তাহলে অন্যপ্রতিষ্ঠানের ওপর ট্যাক্স প্রয়োগ করার, আদায় করার নৈতিক শক্তি থাকে কী?
বর্তমান বাজেটে ছয় লক্ষ কোটি টাকা ট্যাক্স আদায় হবে আমার আপনার ওপরই তো ট্যাক্সটা বসবে, করদাতা হিসেবে আমার প্রণোদনাটা কোথায়? আমি যে ট্যাক্স দেই রাষ্ট্র আমাকে কী মানসম্পন্ন পরিসেবা দেয়? আমি পুরো আলোচনার মধ্য দিয়ে এ কথাটাই বলতে চাচ্ছি যে শিক্ষা-স্বাস্থ্য— এ দু’খাতের মধ্য দিয়ে নাগরিক সেবার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। এ দুটো সেবা আজ কোথায় দাাঁড়িয়ে? এই দুটো সেবার মধ্যে কি আমাদের এলিটরা তাদের সন্তানদের এবং নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যাচ্ছে? এই প্রশ্নের মধ্যেই কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎটা লুকিয়ে আছে।
আরেকটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার, তা হলো লন্ডারিং ইস্যুটি। আমাদের একটা বড় সংকট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিষয়টা আজ সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্যে হয়ে উঠেছে। এটা সমাধান কী? আমাদের কতগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, আমি যদি এক এক করে সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা বলি অর্থ্যাৎ আমাদের ভবিষ্যত রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো কী? আমাদের শিক্ষাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আওতায় নিতে যেতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের সকল অংশকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।নিজেদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লেন্সে প্রশ্ন করতে হবে, অ্যাকাউন্টেবিলিটি ফর হুম? আমাদের এলিটদের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? শুধু রাজনীতিবিদের অ্যাকাউন্টেবিলিটি? ব্যুরোক্রেসি আর্মি-সিভিলের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? একজন ইন্টেলেকচুয়ালের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? সাংবাদিকের কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? আমরা কি যে অভিযোগগুলো আসে পাবলিক মিডিয়াতে আলাপ হয় আমরা কি সেগুলোকে রেসপেক্ট করি? আমরা কি ব্যাখ্যা দেই? তার মানে কী? সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয়রা নিজে রদায়বদ্ধতার বাইরে রাখেন। যা প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর থেকে গড়ে উঠতে দেয় না।
আপনি যদি ফিলোসফিক্যালি নাগরিকের জায়গা থেকে দেখেন, নাগরিকের তো দুটো দায়িত্ব। তার যে রকম অধিকার আছে তার সমানভাবে দায়িত্ব রয়েছে। সমাজে উদাহরণটা তৈরি করবে তো এলিটরা। সেটা শিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজের মাথারা সবাই। আমরা কি সেই জায়গায় এলিটদের বেস্ট প্র্যাকটিসেস বলে কিছু দেখি? আমিতো দেখছি না। একজন সম্পাদক দেশের পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অ্যাড্রেস করে নৈতিক জায়গা থেকে আর্টিকেল লেখাতে পারতেন। যেটা ৬০-এর দশকে ৭০-এর দশকেও আমাদের সম্পাদকরা করতে পারত।
আমাদের ন্যাশনাল ক্যাপাসিটিতে এরকম একজন সম্পাদককে দেখেন, একজন ন্যাশনাল প্রফেসরকে দেখেন যে প্রাইম মিনিস্টারকে বলতে পারে— ‘ইউ আর ডুইং রং থিং’। সমাজ ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে রাষ্ট্র বড় হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্রের আনুকূল্য পেতে আমরা সবাই ক্ষমতাসীন হতে চাচ্ছি। কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে, সমাজবিজ্ঞান বলে সমাজ সবসময় বেশি শক্তিশালী।
রাশেদ আহমেদ: কীভাবে করবে? কারণ করতে গেলেই তো, ছোটখাটো করতে গেলেও তাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়, যেমন আপনার প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেয়া হলো।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আপনার এই ভাষ্য একটি আংশিক চিত্র। পুড়িয়ে দেওয়া হলো এটার পুরো সত্য— আমাদের কেন সংবাদপত্র নিজে পুড়িয়ে দেবার ৩৬০ ডিগ্রি চিত্রটি নিজেরা তুলে আনার চেষ্টা করলাম না। এই প্রত্যেকটা ঘটনার কেন নাগরিক শ্বেতপত্র প্রকাশ হয় না? সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের কাছে শ্বেতপত্র চাওয়া, বিচার চাওয়াটা তো সবচেয়ে বড় কাজ। কী অভাব ছিল? কী মেশিনারিজের অভাব ছিল এখানে? কার কী রোল? এবং সেই জায়গায় তৎকালীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের নিজেরও তো একটা দায়িত্ব আছে। এতগুলো শিক্ষিত মানুষ তাদের তো একটা জবাবদিহিতার জায়গা আছে—কেন আমরা ফেইল করলাম? তার কারণ খোঁজা, এটা থেকেও তো শুরু করা যায়। আরেকটা জায়গায় কিন্তু বলার আছে সেটা হচ্ছে ৭১-এর পরে আপনি যে ধর্ম নিয়ে প্রশ্নটা করলেন, তার ব্যাপারে আমি পুরো আলোচনায় নানাভাবে বলবার চেষ্টা করেছিলাম। এ ব্যাপারে বলা দরকার, পুরো বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় কিন্তু ধর্ম আবার নতুনভাবে ফেরত আসছে। এই ধর্মকে কীভাবে আমরা ডিল করব, নেগোশিয়েট করব— এই জায়গাটাও কিন্তু ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হবে, আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : ধর্ম আর উগ্রবাদিতা এটা কি এক জিনিস?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: অব্যশই এটা এক জিনিস নয়। কিন্তু আমাদের দেশে ৭২-এর সংবিধানে খুব সহজভাবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি বলতে পেরেছিলাম যে ধর্মটা যার যার থাকবে রাষ্ট্র এর পার্ট হবে না। কিন্তু সেখান থেকে তো আমরা ফেরত এসেছি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তো ধর্মীয় ব্যাপারগুলোকে প্রশয় দেওয়া হয়েছে, নানা সময় নানাভাবে। আপনি শুধু একটি কথা ভাবুন—ট্রাস্ট। ট্রাস্ট ব্যাপার কী আসলে? গ্রামীণ ট্রাস্টও ট্রাস্ট, বঙ্গবন্ধুর ম্যামরিয়াল ট্রাস্টও ট্রাস্ট। অর্থাৎ কোনো ট্রাস্ট বিপদগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নেবে। আমরা চোখের সামনে দেখলাম, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে কিন্তু ব্যর্থ হলো। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকার যে দায়িত্ব পালনে কী ভূমিকা রেখেছিলেন, ইতিহাসের এই প্রশ্ন বড় করে রয়ে যাবে। আজকে যেটা এক্স-এর জন্য ঘটল, ওয়াই-এর জন্য কি সেটা ভবিষ্যতে ঘটবে না? রাষ্ট্র কি আমাদের সে নিশ্চিয়তা দিতে পারছে? দিতে পারছে না। এই খাপাপ দৃষ্টান্তগুলো কিন্তু আমাদের সবাইকেই ভঙ্গুর করে তুলেছে। যার পরিপ্রেক্সিতে আমরা কিন্তু কেউ এই ঝুঁকির বাইরে থাকবো না।
রাশেদ আহমেদ : আপনি চুক্তির কথা বলছিলেন শুরুর দিকে যেটা বলতে চাচ্ছিলেন যে ইউনুস সরকারের সময় একটি চুক্তি করা হয়েছে।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এই চুক্তিটা নিশ্চিতভাবেই গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে হওয়াটা উচিত ছিল। তিনদিন আগে কেন করতে হলো? এ প্রশ্নটা উঠছে, সবাই তুলছে। এটা তো সত্যি...
রাশেদ আহমেদ : এটা কি ভালো হয়েছে না কি খারাপ হয়েছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না না, এটা তো কোনোভাবেই গুড এক্সাম্পল নয়। একটা ডেমোক্রেটিক নর্মস ভ্যালুজের জন্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের জন্য নয়। প্রথম আলো চুক্তিটির বাংলা অনুবাদ করে ছেপেছে। এটা তো ভালো। এটার ওপর আলোচনা হওয়া দরকার। এখন আপনি যদি হাত-পা বেঁধে আমাকে সাঁতার কাটতে দেন, আমি তো প্রতিযোগিতায় প্রথমেই হেরে যাচ্ছি। এই গ্লোবাল অর্ডারটা তৈরি হচ্ছে, সেখানে টেরিফকে একটা নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের কি এই জায়গায় প্রথমেই হেরে গেছি, আমাদের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমরা যেন চুক্তিতে সাইন করলাম?
রাশেদ আহমেদ : কেন করল? কেন করল ইউনুস সরকার এটা? স্বার্থ?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: বিষয়টি জাতীয় আলোচনার অংশ। এটা আমি আপনি বলা যথেষ্ট না। এখানেই জাতীয় আলোচনায় জাতীয় মনোযোগে বিষয়টিকে আনতে হবে। নির্বাচিত সরকার ও বিরোধীদল কী কারণে সংসদে বিলয়টি নিয়ে আলোচনা করলো না, বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হবে। এই দায় প্রফেসর ইউনূস ও অন্তবর্তীকালীন সরকার, বিএনপি সরকার, বিরোধী দল, সংসদদের বাইরের দলগুলো, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও থিংট ট্যাংকগুলো এ দায় এড়াতে পারেন না। এ বিষয়ে একটি কঠিন কথা বলতে হয়, আমি ’হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটার’ উপমাটি অনেক না বলা কথা বলে দিচ্ছে। অর্থাৎ আমরা হেরেই কিন্তু ওই চুক্তিতে সাইন করলাম।
রাশেদ আহমেদ : অনেকে বলে যে এটা অন্তর্বর্তী সরকারের একটা এজেন্ডাই ছিল এই রকম একটা আন্দোলনের।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: বিষয়টিতো বোঝাই যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টা বলছেন - যে চুক্তির ব্যাপারটি তারা জানেন না। তারা ক্রমশই যখন ডিজঅ্যাসোসিয়েট করছেন নিজেদের, তার মানে যারা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তারা একসময় সিঙ্গেল আউট হয়ে যাবেন। যদি কেউ এটা করে থাকেন, তাকে তো সে দায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কিন্তু কখনও কাউকে শেষ বিচারে দায় মুক্তি দেয় না। সরকারে থেকে যারা বলছেন তারা জানতেন না, অর্থ্যাৎ তারা এর দায় নিতে চাচ্ছেন না এখন? কিন্তু তা তো হয় না, সবাইকেই ভালোমন্দের দুটোরই দায় নিতে হবে, বিকজ হি ইজ আ পার্ট অফ দ্য সিস্টেম।
ব্যাপারটা পার্ট অফ হিজ সিস্টেম, তাই না? সেই সাথে চোখ পড়ার মত কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের জায়গাগুলো। সবাই যেন, সজ্ঞানে বিষয়গুলোকে আমল দিচ্ছেন না। আপনি দেখবেন যে অনেক উপদেষ্টাই, সরকারের দায়িত্ব শেষে দু’তিন মাসের মাথায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করছেন। ইট ইজ নট গুড গেসচার। ইট ইজ কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট। আমার মতো ছোট মানুষ এগুলো বোঝে, এরা এতসব বড় মানুষ, এরা বোঝে না এটা ভাবা ঠিক হবে না।
রাশেদ আহমেদ : চুক্তিতে যে প্রথম আলোতে এটা বাংলা করে ছেপেছে আপনি পড়েছেন নিশ্চয়ই। মানে কী মনে হলো? যাতে আমাদের অর্থনীতিটা...
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি তো এক কথায় বললাম হাত-পা বেঁধেই আমাদের সাঁতার কাটতে দেওয়া হলো। এটা রিয়েল অর্থে গার্মেন্টস সেক্টরের স্বার্থ কতটা রক্ষা করবে সেটাও দেখার ব্যাপার। আমার যেটা সামান্য বুদ্ধিতে নাগরিক হিসেবে কথাটি বলছি আমি এক্সপার্ট হিসেবে না। আমি ভূ-রাজনীতির সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করছি বারবার। কারণ হচ্ছে ভবিষ্যত এশিয়া, সেই এশিয়া, বে অফ বেঙ্গলকে নিয়ে প্রত্যেকটা পরাশক্তির কিন্তু নিজস্ব পরিকল্পনা আছে।
আমাদের পরিকল্পনার জায়গা থেকে আমরা এটা কানেক্ট করতে পারছি কি না সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিকতা, কৌশল, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং মানুষকে সমবেত করে এর পক্ষে জনমত তৈরি করা একটা বড় কাজ। আপনি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় দেখবেন, বে অফ বেঙ্গলকে কেন্দ্র করে একটা ছোট্ট দাবি ছিল। সেটা কী? সেটা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের নেভির হেডকোয়ার্টার হতে হবে চট্টগ্রামে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ছিল এটার প্রমাণ। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষগুলোর এই রাজনৈতিক সংযোগের সাথে কি আপস করল কি না? এ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই আমি এ প্রসঙ্গের ইতি টানতে চাই।
আমাদের পূর্বপুরুষরা তো ১৯৭১ সালে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল।‘৬৬-তেই রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। কারণ তারা রাজনীতি-অর্থনীতি এবং এ জনমানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে পারত। মনে রাখতে হবে, পলিটিক্যাল লিডার হ্যাভ এ উইজডম। এবং শুধু উইজডম ইজ নট এনাফ, রেসপনসিবিলিটি, রেসপেক্ট টু দ্য পিপল এবং ওইটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও মানুষের প্রতি দৃঢ অঙ্গিকার রাজনীতিবিদদের থাকতে হয়। কারণ তাদের জনসম্মতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হয়।
রাশেদ আহমেদ : তারা তো পলিটিক্যাল লিডার না। যারা অন্তর্বর্তী সরকারে ছিলেন তারা তো পলিটিক্যাল লিডার না, তারা এলিট শ্রেণীর।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: হ্যাঁ কথাটা সত্য। তাদের পেছনে জনআস্থা ছিল। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নয়। এই বাস্তব সত্যটি, তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তাদের মনে রাখা উচিত ছিল। বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবার সিদ্ধান্ত তাদের ছিল না। তিনদিন পরে নির্বাচন একটা পলিটিক্যাল গভর্মেন্ট আসছে, তারা কেন এই চুক্তিটা করবে? চুক্তি এই ডিসকোর্স, দেশের প্রয়োজনে তাই আমাদের চালু রাখতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : যদি না করত তাহলে কি বিপদ হতো দেশের?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: কী বিপদ হতো? আমি একজন অর্থনীতিবিদ নাম নিয়ে বলছি না, তাকে করাতে ‘তুমি বুঝবা না’। আমি নাগরিক হিসেবে বুঝব না? আপনি প্রফেসর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স প্রফেসর হিসেবে বুঝে ফেলেছেন আমার শিক্ষক সম্মান নিয়েই বলছি— আমি আপনার উত্তরে যথেষ্ট মনে করছি না। এটা দায়িত্ব কোনো প্রফেসরের না, তৎকালীন সময়ে প্রধান নির্বাহীর না। এটার সঙ্গে জাতির স্বার্থ প্রত্যেক নাগরিকের স্বার্থ যুক্ত। আমরা কি এভাবে রাষ্ট্রকে দেখতে ভুলে যাচ্ছি? আমরা যখন কোনো সাইন করি তখন তো এটা রাষ্ট্রের নির্বাহী হিসেবে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে তার রিফ্লেকশন হয়। সেখানে আমরা ওথ নেই না যে সেই ওথের কি প্রতিফলন ঘটল? সে প্রশ্ন তো একজন নাগরিক হিসেবে করতে পারি আমরা।
রাশেদ আহমেদ : মানে এখন প্রশ্ন করলাম, করে কী হবে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি আপনার এ প্রশ্ন থেকে বুঝতে পারছি যে হতাশার জায়গা থেকে প্রশ্নটি করছেন। প্রত্যেকটি যৌক্তিক প্রশ্নের ভেতরেই কিন্তু আগামীর ভবিষ্যৎ। একাত্তুর পূর্ব ৬৬-তেও কিন্তু এ রকমই মনে হয়েছিল। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা কি একটা পোষ্য দেশ হিসেবে নিজেদের আইডেন্টিটি ধরে রাখতে চাচ্ছি, না আমরা একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে চাচ্ছি?
বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। এবং রাজনীতিবিদদের সে দায়িত্ব কিন্তু নিতে হবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিকতার জায়গা থেকেও তারাও কিন্তু এই দায় এড়াতে পারেন না। ইতিহাস যার যার ভূমিকার জন্য তার বিচার করবে। কারণ রাষ্ট্র ও সরকার একটা পরম্পরা ব্যবস্থা। প্রত্যেকটা সরকার কিন্তু তার পূর্ববর্তী সরকারের পরম্পরা। ৬০ দিন তো তার হাতে ছিল, সে কীভাবে লাগিয়েছে এই সরকার? তারা চুক্তিটি নিয়ে সংসদে গিয়ে আলাপ করল না কেন? সংসদে তো একজন ইনডিপেন্ডেন্ট মেম্বার আলাপটা তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে নানা নিয়ম কাণুন দেখিয়ে, আলোচনার সুযোগ কাজে লাগানো হয় নি। আমি মনে করি, এই প্রশ্ন তুলে রাখাই হচ্ছে আগামীর সম্ভাবনা। আজকে হয়তো ইমিডিয়েটলি আপনি কিছু দেখছেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। মানুষের এইসব পর্যবেক্ষণ ও চাহিদার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের রাজনীতিটা কিন্তু গড়ে উঠবে।
রাশেদ আহমেদ : এখন বিএনপি সরকার দেশ চালাচ্ছে— আপনার কাছে কী মনে হচ্ছে? একটা বিষয় তো বললেনই এই চুক্তির বিষয় নিয়ে তারা পার্লামেন্টে তুলে নাই। হয়তো কোথাও তাদের এখানে কমিটমেন্টের কোনো বিষয় আছে। তারপর যা ঘটছে কী মনে হয়?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি মনে করি, দেশে যে কোনো অস্থিরতা আমাদের জন্য কিন্তু আরও গভীর ভঙ্গুরতা তৈরি করবে। বিএনপি সরকার তিনটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে একটা চরম কঠিন অবস্থা। দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে নানা চাপের মুখে। যা বিপদ ও সম্ভাবনা দুইয়ের ইঙ্গিত দেয়।তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটা অংশকে বাদ দিয়ে তাকে, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ও চরম ডানপন্থী একটি পক্ষকে বিরোধী দলে নিয়ে তাকে রাজনীতিটা করতে হচ্ছে। এই তিনটার চ্যালেঞ্জকে সমন্বয় করে, বিএনপি সরকারকে এগাতে হচ্ছে।
রাশেদ আহমেদ : একটা অংশকে বাদ দিয়ে মানে আপনি আওয়ামী লীগকে বোঝাতে চাইছেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: শুধু আওয়ামী লীগ প্রশ্নটা তো না, একাত্তুরে মূলধারার বিষয়টিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।একাত্তুরের শেকড়কে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ২০২৬ সালের নির্বাচন ৭১-কে ইররেলেভেন্ট করার যেন উদ্যোগ ছিল? এই নির্বাচন থেকেই কিন্তু বোঝা গেল, ৭১ আরও ইনার ফোর্স যেন ক্রমশ আরো বড় হবার সম্ভাবনার দিকে এগোবে। কারণ বিএনপি ৭১-কে বলেই কিন্তু নিজেকে ডিফারেন্স করেছে। জামাত থেকে নিজেকে পৃথক করছে। তাই না? আবার ছাত্ররা দেখেন নিজেদের আইডেন্টিটিটা বিলোপ করে দিল জামাতের ভেতরে। রাজনীতির এই ডাইনামিকসের দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। পলিটিক্যাল ডাইনামিকস-এর দিকে।
রাশেদ আহমেদ : এইটা কি এই বিষয়ে— মানে বিএনপিকে জামাত থেকে আলাদা করা ছাড়া তো উপায় নেই। পার্টি তো এখন দুইটা। ইলেকশন করেছে এই দুই পার্টি।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এই জায়গায় দেখতে হবে যে, তাদের এই সেপারেশনটা পলিটিক্যাল সেপারেশনস কি না। ২০২৪ সালে একটা কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের পতন হয়েছে বুঝলাম। ২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকার আসলো, পরিস্থিতি কি আপনি দেখেন - ব্যাংক ফাঁকা। কিন্তু এই ব্যাংকের পরিস্থিতি আপনি ঠিক করতে চাচ্ছেন? পারছেন? সে তো পারছেন না। এখন রাজনৈতিক স্লোগানের ভেতর দিয়ে যদি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং গভর্নর পরিবর্তন হয়; ভালো দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করা গেল না। অর্থনৈতিক জায়গাটা না গোছাতে পারলে, গর্তটা কিন্তু আরও গভীর হতে থাকবে। এই ঝুঁকির জায়গা নিয়ে আমি কী বলছি আপনি কী বলছেন, তা মূখ্য বিষয় নয়। বাস্তবতা হলো, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারকে বাজেট করতে হয়েছে।
দেশে খুব ডিপ ডিপ্রেশন ইকোনমিক পরিস্থিতি। আমরা একটা খুবই কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছি। বাংলাদেশ মনে হয় এই রকম সংকটে ৭২-এর পরে কখনও পড়েনি। এই পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্ডারের সঙ্গে নিজেদের অ্যালাইন করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য, তা নিয়েই আমাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে ।
রাশেদ আহমেদ : সামনে পারা যাবে? কী মনে হয় আপনার?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না পারার তো একটাই ফলাফল, ’ফেইলর স্টেট’। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে সংগ্রামী জাতি। বারবারই তো আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এবং সেটা আমি নির্ভর করতে চাই মানুষের ওপর। মানুষই কিন্তু আসলে উত্তরণের পিছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সেখানে লিডারশিপ ম্যাটার করে। আপনি যে জায়গাটা মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাচ্ছিলেন সেটা হচ্ছে নাগরিক প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল সরকার এবং রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।
মাদ্রাসায় এক ধারার শিক্ষা, মূলধারায় এক ধারার শিক্ষা, ইংরেজি ধারায় এক রকম শিক্ষা। কিন্তু সেখানে তো একটা কমন সোশ্যাল গ্রুপস এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা থাকুক এতে আমি অসমর্থন করি না। প্রতিযোগিতার জায়গায় সেই সুযোগটা আমরা রাখব। কিন্তু সেখানে একটা জাতীয় সত্তার পরিচয়ের যে ইউনিটি গড়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল সেটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যর্থ হয়েছে। তার প্রতিফলন হিসেবে আজকে আমাদের এই জটিলতাগুলোর মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এক জটিল আত্মপরিচয়ের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমরা সবাই শুধু, কোনোভাবে সামাল দিয়ে কিংবা কোনো রকম এটাকে হাউসকিপিং করে এগিয়েছি। আমরা এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে চাই না। সবার মধ্যে একটা দায়সারা ছাড়া ছাড়া ভাব। সমস্যাটাকে আমরা সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি না।
আমাদের যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য সেটা একদিকে ম্যানি-লন্ডারিং-এর মাধ্যমে লুট করা হচ্ছে। আমার ভাইয়ের টাকাই আমার আরেক ভাই লুট করেছে। এটা রোধ করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যাপারে আমি মনে করি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের ভাই-ব্রাদাররাই তো আজ অভিবাসিত। আমার পরিবারে প্রায় ৬০ ভাগ, বড় আমেরিকা-কানাডায় অধিবাসিত। গ্রাম থেকেও মানুষ বিদেশে গিয়ে অধিবাসিত হয়েছে। ভবিষ্যতে উত্তারিকার সূত্রে পাওয়া, কৃষি জমি বিক্রি কিংবা শহরের জমি বিক্রি করে সে টাকা নিয়ে যাবে ট্যাক্স না দিয়ে— সেটা তো হতে পারে না।
আমরা এখনও জানি না, আলী রিয়াজ আমেরিকান সিটিজেন না বাংলাদেশের সিটিজেন। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়েই তো সে করছে, সংবিধান সংস্কারের মতো সংবেদনশীল কাজে তাকে যুক্ত করা হলো। তিনি একাডেমিক প্রতিচিন্তা পত্রিকায় সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন। আমি আট বছর সেই জার্নালের নিবার্হী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। তিনি একসময় আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ বিষয় রিপোর্ট করেছেন। বাঙালি আমেরিকার দেশে বিনিয়োগকারী হোক, বিদ্যায়তনে যুক্ত হোন, গবেষণায় যুক্ত হোন, তাদের মেধা বুদ্ধিকে জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে অবশ্যই আমরা চাই। অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে বিশে ষবিবেচনায় নিয়ে। ডক্টর. খলিলুর রহমানকে নিয়ে একই প্রশ্ন? এ প্রশ্নে ব্যক্তির দায়িত্বশীলতা ও আত্মসম্মান বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে আসে। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : আলী রিয়াজের প্রশ্নে প্রসঙ্গ যখন তুললেন উনি তো সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়ে গেছেন। আপনি কি সেটি দেখেছেন? আপনার কী মনে হয় যে এই সংস্কারগুলো দরকার কি না?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: দেখেছি, প্রক্রিয়া বুঝেছি। কিন্তু সেটা তো এখন যে ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে আছে সেটা তো আর... সংস্কারের প্রশ্নে তো সবাই ভালো কথাই বলে। তাই না? ১৯৯৯০ সাল পরবর্তীতে ২০০১-এর থেকে আমি দেখছি যে, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সে কথাগুলো আমরা সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষরা নানাভাবে বলছি। সিভিল সোসাইটিই এ প্রসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বলছে।
একটা যৌক্তিক প্রশ্ন করা দরকার। আপনি পার্ট অফ এ সিভিল সোসাইটি ইউ রিপ্রেজেন্ট এ স্টেট অ্যাফেয়ার কেস। আবার ওই ফেরামের বাইরে এসে আপনি আবার সিভিল সোসাইটি হয়ে সমালোচনা করছেন। এগুলো কি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট না কিনা? এই যে বৈপরীত্যগুলো, আমাদের সমাজে এলিটরা প্রতিনিয়ত তৈরি করছে -এগুলোর বিরুদ্ধে তো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত রাজনীতিটা তো রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : এই সংস্কারের বিষয়টা যে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা— যেগুলো প্রস্তাবগুলোর মধ্যে...
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: প্রস্তাবগুলো তো রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়েই নিতে হয়েছে। কিন্তু সবাই একমত হবে এমনতো ভাবার কারণ নেই। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও রাজনীতি আছে। সব বিষয় সবাই একমত হলে তো পৃথক পৃথক দলের প্রয়োজন হতো না। নূন্যতম ঐকমত্য - এর ভিত্তিতে আমরা এগোতে পারি না। এটাই বাংলাদেশে তো মূল সমস্যা।
রাশেদ আহমেদ : আচ্ছা একটা জিনিস কি আপনি লক্ষ্য করেছেন আমাদের তরুণ সমাজ বলেন এবং মানুষ বলি তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। সেই পরিবর্তনটা কী আপনার ছোটখাটো ইস্যু নিয়েও কিন্তু বড় ধরনের শো-অফ করা হয়। ধরুন একটি ছবি করা হয়েছে সেই ছবির বিরুদ্ধে ছবি প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এটা আমাদের সমাজ ছাড়া অন্য কোথাও এরকম ঘটছে কি না আমি জানি না। কিন্তু হোল ট্রেন্ডটাই কিন্তু একটা নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে।
রাশেদ আহমেদ : আমি যেটা বলছি যে একটা মানে উগ্রবাদী গোষ্ঠী আমাদের উত্থান এমন বেশি ঘটেছে যেটা একটা সুন্দর প্রদর্শনও তারা আটকে দিচ্ছে।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না এগুলো করা সম্ভব হচ্ছে বর্তমান নানা ধরনের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। তরুণ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত সামাজিক মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। আপনি দেখুন নেপালে যেটা হলো, আপনার শ্রীলঙ্কায় যেটা হলো বাংলাদেশে যেটা হলো বা হচ্ছে সেটা এই ডিজিটাল প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে কিন্তু সাংগঠনিক ব্যাপারটা ঘটল। এটা কিন্তু নতুন ধরনের একটা ফেনোমেনন।
সেটা হচ্ছে ফিজিক্যাল সংগঠনের বাইরে মতাদর্শগত ঐক্য তৈরি হচ্ছে এবং তার ভিত্তি কিন্তু নীরবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম-এর মাধ্যমে। সুতরাং এর পক্ষে-বিপক্ষে যাওয়ার চেয়ে একে বোঝা, গভীরভাবে একে বোঝা দরকার। এবং ভ্যালুজাজমেন্টের বাইরে থেকে এই তরুণদের দেখা ও বোঝা দরকার। কারণ আমরা তো জাতি হিসেবে কমন ইউনিক নাগরিক ধারণাটা তৈরি করতে পারিনি।
কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট ডেমোক্রেসির একটা বড় ধরনের কিন্তু চেক এন্ড ব্যালেন্সের ইস্যু। সেগুলো আমরা আমাদের সোশ্যাল নর্মস ভ্যালুজ প্র্যাকটিসে রাখছি না। আমরা অন্যদের বলছি। এই তরুণরা পয়সা করেছে বলছি। কিন্তু অন্যরাও তো তা করেছে এবং করছে। তখন রেফারেন্স পয়েন্ট তো বয়স্কদের দিকেই বেশি চলে যাবে।
আমরা কিন্তু কেউ দৃষ্টান্ত তৈরির জায়গায় ও সংস্কারের জায়গায় কাজ করছি না। আরেকটা বড় ব্যর্থতা আমি যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে, আমাদের দেশে ফাংশনাল চেঞ্জের দিকে আমাদের মনোযোগ কম। আমরা সব কিছুতে সব সময়, বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা করছি। রেসপন্সিবল বিরোধী দল এবং ডিসকোর্স তৈরি করার ক্ষেত্রে সমাজকে এনগেজ করছে না। এবং এক্ষেত্রে সোশিওলজিস্টদের বড় ব্যর্থতা আছে।
রাশেদ আহমেদ : শেখ হাসিনা আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে চান।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি এই জায়গাগুলোর ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বেশি আস্থা রাখি। তারা নিজের ও দেশের ভালোর জন্য নিজেদের নেতাদের বাছাই করতে ভুল করেন না। ইতিহাস আমাদের সে কথাই বলে। তা সাক্ষ্য ইতিহাসে আমরা পাই। জোয়ার-ভাটার দেশে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ এগিয়েছে।এই যে পরাশক্তির ওপর কেন্দ্র করে জাতীয় স্বার্থ অর্জন করা যায় না। এ দেশের অভিজ্ঞতায় ও সামাজিক-স্মৃতিমেদে ভাঁজে ভাঁজে সে সব ও গল্পসত্য লুকায়িত। কম্প্রোমাইজ ও বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র ও চরিত্র দুই তাদের জানা।
বর্তমার পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল ও নেতাকে অবশ্যই কৌশলী হতে হবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এই নেগোশিয়েট করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাটা আমাদের আজ ভীষণভাবে প্রয়োজন। ক্রাইসিসই জনসমর্থিত নেতা বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।সঙ্গে রয়েছে ভূ-রাজনীতির জটিল অংকের সমাধান।
রাশেদ আহমেদ : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: ধন্যবাদ আপনাদের, আমার প্রতি আগ্রহ দেখানোর জন্য এবং সংবাদকে ধন্যবাদ।

শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুলাই ২০২৬
খন্দকার সাখাওয়াত আলী একজন সমাজতাত্ত্বিক, গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলস, সোয়ানজি থেকে সমাজতত্ত্ব ও উন্নয়ন অধ্যয়নে পড়াশোনা করেছেন। বিগত দশকের বেশি সময় ধরে গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন দেশের প্রধান সারির থিং ট্যাংক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন ডিএফআইডি, বিশ্বব্যাংক, সিডা, সুইস দূতাবাস, নেদারল্যান্ডস দূতাবাস এবং কানাডিয়ান হাই কমিশনের মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অংশীদার সংস্থায়। পাশাপাশি ইউএনডিপি, ইউনিসেফ এবং ইউনেস্কোসহ জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায়ও কাজ করেছেন। তিনি সমাজ, রাজনৈতিক-অর্থনীতি ও রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন যুক্তি এবং রেফারেন্স দিয়ে। দেশের যেকোনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন গভীরভাবে। তার সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছেন সংবাদ-এর ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতার সম্পাদিত সংস্করণ তুলে ধরা হলো।
রাশেদ আহমেদ : আলোচনার শুরুতেই যেটি আপনার কাছে জানার ইচ্ছে— বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা আসলে কেমন দেখছেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: একটা রক্তক্ষরণ অবস্থা নিয়ে বাংলাদেশ এগোচ্ছে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে দুই ডিজিটের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে প্রায় তিন বছর আমাদের চলতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। একে সামনে রেখেই বাজেট হয়েছে এবং সেই বাজেটের আকার গতবারের বাজেট থেকে বেশি।রাজস্ব টার্গেট প্রায় ৬ লক্ষ কোটি টাকা। এটা সংগ্রহ হবে কোথা থেকে? এর ভার নিশ্চিতভাবেই পড়বে আমাদের সাধারণ মানুষের ওপরে। যা মুদ্রাস্ফীতিকে আরও বাড়াবে। অর্থনৈতিক একটা গভীর ক্ষত অবস্থা মধ্যবিত্তের এবং নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর।
জুলাই ’২৪-এ যে অভ্যুত্থান ঘটল, তার প্রতিশ্রুতি ছিল বৈষম্যমূলক সমাজের কথা বলে। কিন্তু বিগত ৫৫ বছরে আমরা ইতিহাসে তিনটি সুযোগকে লস্ট মোমেন্ট হিসেবে পাই। আমরা বিগত ৬৯-এর মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে কিন্তু একটা দেশ পেয়েছিলাম। সেটাও কিন্তু একটা গণঅভ্যুত্থান ছিল। ১৯৭১—’মুক্তিযুদ্ধ’ আমাদের ইতিহাস ও গোটা জাতির ভরকেন্দ্র–কিন্তু মুক্তির-লড়াই আজও শেষ হয় নি। ১৯৭১ সালের মাধ্যমে আমাদের আইডেন্টিটির প্রশ্নের সমাধান করে দেশ স্বাধীন হয়েছে।উপমহাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যদি আমরা ৭১-কে দেখি, আজকের প্রজন্ম কীভাবে দেখে সেটা নিশ্চয়ই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের জন্য বিষয়টি এক নতুন বাস্তবতা। কিন্তু একাডেমিক জায়গা থেকে যদি আমরা দেখি, ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষ যে ভাগ হলো দুটো ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে। দুই ধর্ম-এর ভিত্তিতে যে দ্বিজাতিতত্ত্ব, তাকে নিরাকরণ করেই কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম।
এখানেই আমাদের প্রশ্ন? ইতিহাস কি সব সময় সামনের দিকে আগায়, না ক্ষেত্র বিশেষে পেছনের দিকে কখনো গড়ায়? সে ক্ষেত্রে ইতিহাস বলে হ্যাঁ, ইতিহাস মাঝেমধ্যে পেছনের দিকেও গড়ায়। এ ব্যাপার মার্কসের বিখ্যাত এক উক্তি আছে, ইতিহাস সবসময় সরলরেখায় সামনে এগোয় না, কখনও কখনও তা একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটায়। এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে কিন্তু এখনকার বাংলাদেশ। চব্বিশের জুলাই অভূত্থান যদি আমরা দেখি, এর অর্থনৈতিক বৈষম্যতার ভিত্তিটা কী ছিল? আমরা অভ্যুত্থান বলছি, কেউ কেউ বিপ্লব বলছে— আমি এটা বিপ্লব বলতে রাজি নই। কারণ এর মুভমেন্টের যদি মূল পটভূমি দেখেন, যা ছিল সম্পূর্ণ একটা অর্থনীতিবাদী আন্দোলন।
বিগত দুই দশক জুড়ে নব্যউদারিকরণ নীতির ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশে নতুন এক অর্থনৈতিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্ম হয়েছে। নতুন এই মধ্যবিত্ত শ্রেণী, যারা তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়াতে অর্থ ব্যয় করছে। যারা শিক্ষিত। শিক্ষাকে তারা সামাজিক গতিশীলতার উপায় হিসেবে নিয়েছে।মা-বাবার কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে পড়াশোনার সুযোগ করে নিয়েছে। কিন্তু শিক্ষিত এই সব তরুণ যুবাদের পড়াশোনা শেষে চাকরি নেই। সুতরাং চাকরির জন্য কোটাভিত্তিক আন্দোলন থেকেই বাংলাদেশে এই আন্দোলনের শুরু।বিষয়টিকে আমি গভীর লেন্স দিয়ে দেখতে চাই। সাধারণভাবে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক বিবেচনায় বিশ্লেষণে বিষয়টিকে তেমনভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
বলাই বাহুল্য ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে, ১৯৭১ সাল ছিল একটা টার্নিং পয়েন্ট। সেখানে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও প্রস্তুতি দুই ছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রশ্নগুলো আমাদের সহযোগিতা করেছে। সেই সঙ্গে আমাদের রাজনৈতিক সংগঠন ছিল, জনগণকে রাজনৈতিভাবে শিক্ষিত করা গেছে, নেতা ছিল। ২০২৪ সালে এরকম, রিজিয়নালি এবং গ্লোবালি একটা রাজনৈতিক গ্লোবাল অর্ডারটা চেঞ্জ হচ্ছে। সেই অর্ডারের যে ফাইন টিউনিং হচ্ছে তার ভেতরে কিন্তু আমরা আছি। কিন্তু আমাদের তিনটি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে একাত্তুর থেকে আমরা পিছিয়ে। প্রথমত, আমাদের রাজনৈতিক শক্তির প্রস্তুতি নেই। রাজনৈতিক শক্তি সত্যিকারের জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ দেখছিল। দ্বিতীয়ত, যে তরুণ শক্তি, তাদের রাজনৈতিক জায়গা থেকে প্রশিক্ষিত করার যে সম্ভাবনা, এটি তাদের দুর্বলতা নয়—এটা রাজনৈতিক শক্তির দুর্বলতা। আর তৃতীয়ত, জাতীয় স্বার্থ-এর পক্ষে শক্তিশালী ও মানুষের কাছে নেতা।
এইরকম একটা আন্তর্জাতিক বিষয়কে নেভিগেট করে জাতীয় স্বার্থের পক্ষে সেটাকে নিয়ে আসা—এই প্রস্তুতির অভাবটা কিন্তু আজ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। এবং আপনি যদি ২০০৮ সালকে দেখেন, সেই সময়েও কিন্তু আমরা নেগোশিয়েট করে সবদল মিলে একটা নির্বাচন করে এগিয়েছিলাম। আজকে ২০২৬-এর যে নির্বাচন, আন্তর্জাতিক শক্তির সঙ্গে এক ধরনের আলোচনা, আপোসরফা ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে যেন নির্বাচনটা হলো। এক ধরনের অসম্পন্নতা নিয়ে কিন্তু এই অংশগ্রহণ, যেটি ইতিহাসগতভাবে গড়ে রাজনৈতিক সংকটের মীমাংসা হলো না, মীমাংসা হলো না রাজনৈতিক বিরোধের। ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়ালো, ইলেক্টোরালদের বড় অংশ কিন্তু তাদের ভোটাধিকারের সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ একটি বড় দলের সাপোর্টারদের নির্বাচন অংশগ্রহণের বাইরে রাখা হলো। একই ঘটনা ও উদাহরণ কিন্তু আমাদের উপমহাদেশে আরও দুটো দেশে ঘটেছে। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে দেখেন, শ্রীলঙ্কায় যারা রাষ্ট্রক্ষমতা হারিয়েছিল তারা নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে। নেপালেও আমরা সেই বিষয়টা দেখলাম। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে যেটা হলো, আমরা বড় একটা রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচনের বাইরে রেখলাম। যে কারণে নির্বাচনের প্রশ্নে সবার অংশগ্রহণ ছিল না। কাজেই আমরা সমাধানটা সম্পূর্ণ কিন্তু করতে পারলাম না। আমরা জবরদস্তিমূলকভাবে, একটা রাজনৈতিক শক্তিকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে রেখে সমাধান খুঁজছি।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিকভাবে তেলের দামের উচ্চমূল্য এবং যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদী হলে - সংকট আরও গভীর হবে এবং তার অভিঘাত আমাদের ওপর পড়বে।
রাশেদ আহমেদ : আমি যেটি বলতে চাচ্ছি, অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেল ২৪-এর আন্দোলনের পরবর্তীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অনেক কিছুর ওপর আঘাত আসলো। সেটি কেন? কারা এটি করলো? এবং ৭১-কে কেন অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: খুব ভালো সময়ে আপনি এই প্রশ্নটা করলেন। এ প্রশ্ন দুই বছর আগে করলে, এর উত্তর দেওয়াটা হয়তো কঠিন ছিল। কিন্তু এখন ক্রমশ ঘটনার নানাদিকগুলো আনফোল্ড করছে। ২৪-এর যে অভ্যুত্থান, এই অভ্যুত্থান নিয়ে, নানাপক্ষের নানা রকম কথা হচ্ছে। তখনই এই কথাটা হচ্ছে যখন ২৪-কে প্রতিপক্ষ করছি আমরা ৭১-এর। আমি এ প্রসঙ্গে তিনটি ব্যাখ্যা দিতে চাই। সেটা হচ্ছে ৭১ আমাদের তিনটি পরিচয়কে নিশ্চিত করেছে। একটা হচ্ছে, প্রথমতম আত্মপরিচয়, দ্বিতীয়ত, সার্বভৌমত্ব এবং তৃতীয়ত, রাষ্ট্র তৈরি করেছে। যেটি অন্য কোনো গণঅভ্যুত্থান করতে পারে নাই। করার কথাও নয়।
’৬৯ দেশ স্বাধীন হওয়ার পটভূমি তৈরি করেছে। আপনি আমি আমরা ‘৯০-র জেনারেশন। আমরাও এরশাদ স্বৈরাচারকে উপড়ে ফেলেছি— জুলাই গণঅভ্যূত্থানে ’ফ্যাসিস্ট‘ শব্দটি বেশি বেশি উচ্চারিত হচ্ছে।ফ্যাসিজমের সংজ্ঞা নিয়ে একাডেমিকভাবে প্রশ্ন করা দরকার। সাধারণভাবে বলা যায়, আমাদের পলিটিক্যাল সিস্টেমটার ভেতরে এক ধরনের কর্তৃত্বপরায়ণ মনোভাবের জন্ম হয়েছিল। এবং সেটি তো ঐতিহাসিক পটভূমিতে হয়েছিল। আমাদের বড় দলগুলো নির্বাচনে নিজেদের জয়কে নিশ্চিত করতে চায়। জয় ছাড়া নির্বাচনে অংশ নিতে চায় না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা করে আমরা এর একটি সাসয়িক সমাধান খুঁজে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কনসেপ্টটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা পরস্পর কিন্তু নষ্ট করেছে। সেই অবিশ্বাসের জায়গা থেকেই নির্বাচনের ফলাফলকে গ্রহণ করার সংকটই কিন্তু বাংলাদেশকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। এখানে আমার দুটো খুব স্পষ্ট অবস্থান আমি দেখি। সেটা হচ্ছে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি নিজেদের জয়ী হিসেবে না দেখতে পাওয়ার কারণে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করল না, যে নির্বাচনে একতরফাভাবে তৎকালীন আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে আসলো দ্বিতীয়বারের মতো।
রাশেদ আহমেদ : তাদের একটা ইস্যু ছিল যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যেটি বাতিল করা হয়েছে, তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: হ্যাঁ, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাটি আমাদের রাজনীতিতে নতুন করে সংকটের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে কিন্তু তারা নির্বাচনে আসলো। সেই জায়গাটা সত্যিকারের, আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট ছিল। আজ দেখুন ৭০ থেকে ৮০, ১০০টি সিট— এইরকম বিরোধীদলের অবস্থান নিয়ে যদি সমাধানটা হতো, তাহলে আজকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তির এইসুযোগটা হত না— মানে রাজনীতিতে ১৯৭১-এর প্রশ্নে যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি, সামাজিকভাবে এমন বৈধতা পেতে না। ২০২৬-এর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে–আজ তারা তা পেয়েছে।
আমাদের রাজনৈতিক-ব্যবস্থায়, ‘দুর্বৃত্তায়ন’ প্রবণতা আজ খুব স্পষ্ট দৃশ্যমান। যেখানে আমরা দেখবে, প্রশাসন— সেটা আর্মি-সিভিল-পুলিশ, ব্যবসায়ী, পলিটিশিয়ান, মিডিয়া, বুদ্ধিবৃত্তিক অংশ— এদের ভেতরে একটা গোষ্ঠীগত স্বার্থ তৈরি হয়েছে। যা মূলত ক্রনি ক্যাপিটালিজম বা স্বজনতোষী পুঁজিবাদ, একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গত রেজিমে বড় আকারে আবির্ভুত হয়েছে। অর্থ্যাৎ আমাদের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ক্রমান্নয়ে বুর্জোয়া লুম্পেনাইজেশনের মধ্যে প্রবেশ করেছে। যা স্পষ্ট করে না বুঝলে আমাদের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতাটা বোঝা যাবে না।
আপনি দেখুন জুলাই-এ অভ্যুত্থান হলো, কিন্তু অভ্যুত্থানের পরে অভ্যুত্থানের নায়করাই কিন্তু লুটে অংশ নিল। বিগত ৫৫ বছরে, আমাদের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের একটা চেহারা দাঁড়াচ্ছে, যার সঙ্গে আশির দশকের ল্যাটিন আমেরিকার সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যাবে। আশির দশকের ল্যাটিন আমেরিকা ছিল উন্নয়নের নামে ‘দুর্বৃত্তায়ন’। সমাজবিজ্ঞানী এ জি ফ্রাঙ্ক তার বই ‘লুম্পেনবুর্জোয়াজি, লুম্পেন ডেভেলপমেন্ট ও লুম্পেনপ্রলেতারিত’ যে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করেছিলেন। একই চেহারা আমরা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখছি। যেখানে শুধু বুর্জোয়ারাই লুট করে না, এখানে দরিদ্ররাও সুযোগ পেলে লুট করে। আপনি দেখবেন ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতারা কিন্তু তা করেন নি। তারা পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক নেতা হয়েছেন। তারা অর্থবিত্ত করেছে ১৯৭১- সালের পরে। কাজেই তাদের বিরেুদ্ধে সমালোচনাটা আসবে একাত্তুরের পরে।
৬৯’-এ ছাত্রনেতারা নৈতিকতা বা মোরাল হাইটটা কিন্তু ধরে রেখেছিল। ‘৯০-এর পরে ছাত্রনেতারা সেই মোরাল হাইট কিন্তু ধরে রাখতে পারে নি। আমরা যাদের ছাত্রনেতা হিসেবে পেয়েছিলাম তাদের শুধু সোশ্যাল প্রোফাইলটা যদি আজকে দেখেন, তবে দেখবেন– রাজনীতি ও সমাজ তাদের সেই সুযোগটা তৈরি করে দিয়েছিল এবং তারাও সেই মোরাল হাইটটা ধরে রাখতে পারে নি।
রাশেদ আহমেদ : অনেকে বলে থাকেন, এখনো বলেন যে ২৪-এর আন্দোলনের পরে, গণঅভ্যুত্থানের পরে যেটি হয়েছে বাংলাদেশে উগ্রবাদী যে শক্তি সেই শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তো তাদের উত্থানটা হলো—আপনি কি এটা সমর্থন করেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি ’৬০-এর দশকের এবং ’৯০-এর দশকের এবং ২০২৪-এর এই তিনটি জেনারেশনের যারা মার্কসিস্ট অথবা যারা বামপন্থা রাজনীতি করেছেন, তাদের মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংগঠনিক একটা চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। সম্ভবত সেটাই উত্তর হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। ৬০-এর দশকে আপনি দেখবেন যে বৈশ্বিক মতার্দশকে কেন্দ্র করে, বাম-কমিউনিস্ট রাজনীতি ভেঙে যায়।’৬৯-গণঅভুত্থানের নেতৃত্ব দেবার কথা লেফটদের। কিন্তু সেই রাজনৈতিক ভরকেন্দ্র তারা ধরে রাখতে পারে না। ‘৬৬-তে সোভিয়েত এবং চায়না দ্বন্দ্বের কারণে পার্টিগুলো ভেঙে যায়, সামাজিকশক্তিগুলো ভেঙে যায়। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও গণসংগঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সত্যিকারের নিয়ামক ভূমিকা কিন্তু কমিউনিস্টরাই পালন করেছে। সেই সময় ছাত্র ইউনিয়ন ভেঙে যায়, সেই সময় আপনার কৃষক সভা ভেঙে যায় এবং শ্রমিক সংগঠনগুলো ভেঙে যায়।
যে কারণে আপনি দেখবেন যে জাতীয়তাবাদী শক্তি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে কত দ্রুততার সঙ্গে জনমানুষের অংশ নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ জন্ম দিল। আপনি যদি দেখেন ৬২ থেকে ৭১-এর দূরত্বটা খুব বেশি না। সেখান থেকে দেখেন ৬৬-তে ছয় দফা। তার আগে আপনার ৬৪-তে শিক্ষা আন্দোলন। আপনি যদি এর সঙ্গে লিংক করেন, দেখবেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারে দুইজন লেফটনেতা ছিলেন সংস্কৃতি এবং শিক্ষার দায়িত্বে। একজন ছিলেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। উনি তো কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত মানুষ। ৬২-র ছাত্রনেতা। শিক্ষার ক্ষেত্রে ’৬২ সালের যে প্রতিশ্রুতি, তিনি তা বাস্তবায়নের সুযোগ পেয়েছিলেন। দশ বছর উনি শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বে পেয়েছিলেন। শিক্ষার ফাইভ ইয়ার্স প্ল্যানের সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। তার সময় মাদ্রাসায় সরকারি ইনভেস্টমেন্টই বেড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো মাদ্রাসার পড়া ছাত্ররা প্রগ্রেসিভ কি হয় না? হয়। আবুল ফজল তার বড় উদাহরণ, শহীদুল্লা কায়সার তার বড় উদাহরণ। কিন্তু সেজন্য যে সামাজিক পরিবেশ লাগে। এই প্রগ্রেসিভনেস পরিবেশ ধরে রাখার জন্য, আমাদের তো ৬০-এর দশকের বিনিয়োগ দিয়েই আমরা ২০২৫ সাল অব্দি চলতে চেয়েছি। সমসাময়িককালে আমাদের যে নতুন মধ্যবিত্ত তৈরি হয়েছে, এখনকার মধ্যবিত্ত আর ৬০-এর দশকের যে মধ্যবিত্ত- তো একই সাংস্কৃতিক মান এবং বোধ নিয়ে জন্মায়নি। এর যে ঘাটতিটা, এর দায়িত্ব রাষ্ট্র ও সমাজকে নিতে হবে।
রাশেদ আহমেদ: স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির যে উত্থান সেটি হলো কেন? বাংলাদেশ সেটি এক্সেপ্ট করছে কী কারণে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি দুটো দিক থেকেই মনে করি আমরা একটা প্রতিকূলের মধ্যে আছি। প্রথমত, ৬০-এর দশকের আধুনিক মানুষের রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি ছিল, প্রগ্রেসিভ মতার্দশ মার্কসবাদ।বিশ্ব রাজনীতিতে তার বিশেষ অবস্থান ছিল। ৯০-এর দশকের পরে ডানপন্থা রাজনীতির অভ্যুত্থান হচ্ছে দেশে ও বিশ্বব্যাপী। আপনি দেখেন আমাদের পাশের দেশ ইন্ডিয়াতে সেখানে হিন্দুত্ববাদের জন্ম হচ্ছে। এবং আপনি দেখেন, আমরা আমাদের দেশে রিহ্যাবিলিটেড করলাম জামাতসহ মুসলিম ফোর্সেসগুলোকে। আরেকটি জিনিস যদি দেখেন, সাম্প্রতিককালের এই যে নিউ মিডিয়া যেটা আসলো—অর্থ্যাৎ সামাজিক গণমাধ্যম। এর সর্বোচ্চ ব্যবহার তো হচ্ছে ধর্মীয় উত্থানে মদদযোগাতে। আগে শীতকালে গ্রামে ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন ছিল। এখন সেই ওয়াজ মাহফিল রেকর্ডে হয়ে, ইউটিউব ফেইজ বুক এর মাধ্যমে হাতে হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। সেই তুলনায় আপনি চিন্তা করেন জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি বা লেফটরা এই মিডিয়াকে কি সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পেরেছে? সময়ের ব্যবধানে পরিবেশ ও পরিস্থির পরবর্তন হয়েছে।
প্রথমত, শিক্ষা-সংস্কৃতির জায়গায় সত্যিকারের সৃজনশীল সামাজিক কোনো উদ্যোগ, এই সময়ে আপনি খুঁজে পাবেন না। খেলাঘর ভেঙে গেছে, উদীচী ভেঙে গেছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব রাখার সক্ষমতা হারিয়েছে। গ্রামাাঞ্চলে আপনার কৃষক সমিতি বলতে তো কিছু নেই, তাই কৃষকের স্বার্থ দেখার কেউ নাই। খেতমজুর সমিতি একসময় ছিল সেগুলো একসময় এনজিও হয়েছিল আজ তার অস্তিত্ব নেই।সুতরাং রিপ্রেজেন্টেশন—পলিটিক্যাল রিপ্রেজেন্টেশন ভুল মানুষ ও সংগঠনের দ্বারা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে রাজনৈতিক দলের গণসংগঠনের মধ্য দিয়েই, বিদ্যায়তনে ও সমাজে সামাজিক সংগঠনগুলো গড়ে ওঠে। ৬০ দশকের পর এখানে রাজনৈতিক কোনো উদ্যোগ ও বিনিয়োগও হয়নি। অন্যদিকে রাষ্ট্রও শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে একক বা কমন নাগরিক তৈরির প্রকল্প গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে।
আরেকটা দিক থেকে যদি বলি— বাংলাদেশ ইজ এ কেস অফ এলিট ফেইলর। এ কথাটার ভেতর দিয়ে আমি কী বলতে চাচ্ছি? অর্থাৎ আমাদের যারা মধ্যবিত্ত, যে মধ্যবিত্ত ৭১-এ ছিল, তাদের একটি বড় অংশ আজ আমাদের সমাজে এলিট। সেই এলিটরা রাষ্ট্র গঠনের জন্য, সমাজ গঠনের জন্য কি সত্যিকারের কোনো বিকল্প তৈরি করতে পেরেছে- বিগত ৫৫ বছরে? আমরা বিকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছি প্রাইভেট সেক্টরকে। আমরা কী আমাদের বাচ্চাদের পাবলিক স্কুলে পাঠাচ্ছি, চিকিৎসার জন্য পাবলিক হাসপাতালে যাচ্ছি? না, বড় অংশটা যাচ্ছি না।আমরা নিজেদের উপযোগী ব্যবস্থা প্রাইভেট সেক্টরে করে নিয়েছি। আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করছি, নিজেদের দেশের জন্য নয়, বরং বিদেশের মার্কেটের জন্য। এরা ও-লেভেল, এ-লেভেল পাস করছে। অন্য কাউকে আমি উদাহরণ দিচ্ছি না, আমি নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েই সেই কথাগুলো বলছি। এবং এর কারণ পেছনে আছে, দেশে নিরাপত্তা বোধ করা যাচ্ছে না, ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। বুয়েটে যেন ওয়ার্কস্টেশন ফর দ্য ওয়েস্ট। ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থীরা ও-লেভেল, এ-লেভেল পড়ে আগে স্কলারশিপে অথবা বাবা-মায়ের পয়সাতেই পশ্চিমের দেশগুলো পড়তে যাচ্ছে। প্রায় ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রতিবছর বিদেশি ইউনিভার্সিটিগুলোতে পড়তে যাচ্ছে এবং অভিবাসন নিচ্ছে।
রাশেদ আহমেদ : একসময় দেখা যেত এলিট শ্রেণি বাংলাদেশের পলিটিক্যাল পার্টিগুলোকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে নানাভাবে সহযোগিতা করত। এখন কিন্তু তারা সক্রিয় নয়। এই যে সুশীল সমাজের দূরে সরে যাওয়া এবং সুশীল সমাজ রাষ্ট্র গঠনে কি কোনো ভূমিকা রাখছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: খুব ভালো প্রশ্ন। ৯০-এর দশকের সঙ্গে এর একটা সম্পর্ক রয়েছে। নিউ লিবারেলিজমের কারণে বিষয়টি ঘটেছে। ইতিহাসের আলোকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করি। ৬০ দশকের পাঁচজন অর্থনীতিবিদের কথা, বারবারই ঘুরে ফিরে আসে। সেই সব অর্থনীতিবিদরা কীভাবে নিজেদের পুনর্বাসিত করেছিল নতুন সিচুয়েশনে? রিফ্লেক্টিভ হওয়া দরকার, বিষয়গুলোকে আত্মসমালোচনার জায়গা থেকে আনা। উনারা সবাই ইন্টারন্যাশনাল ডোনারসদের সঙ্গে নিয়ে নিজেদের সম্পৃক্ত করে উনাদের ইন্টেলেকচুয়ালি সারভাইব করেছিলেন। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে এরাই কিন্তু সমাজতন্ত্রের জন্য ফাইভইয়ার্প্ল্যানের প্ল্যানটা করেছিলেন, শিক্ষানীতিটা করেছিলেন। প্রফেসর আনিসুজ্জামান নমস্যব্যক্তি— কিন্তু এই আনিস স্যার কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন। বঙ্গবন্ধু অর্থ্যাৎ শেখ মুজিবুর রহমান উনাকে বলছিলেন, আনিস তুমি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব নেও। স্যার কিন্তু ওই রাজনৈতিক কাজটাকে নেন নি। উনি গবেষণা বৃত্তি নিয়ে বিদেশে চলে যান। বিদেশে ফেলোশিপ নিয়ে একটা বড় একাডেমিক কাজ করেছিলেন। অষ্টদশ দশকের বাংলা গদ্য নিয়ে গবেষণা করেন।
আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিকতার ডিপারচারটা আমি একদম খুব স্পষ্ট দেখি এবং এটা বলার সময় এসেছে। আমি বিগত তিন দশক ধরে থিংক ট্যাংকের সঙ্গে কাজ করেছি এবং করছি। আমি প্রাইভেট সেক্টরের মানুষ, আমি খেটে খাওয়া মানুষ। কিন্তু আমাদের এই ফিরে দেখাটা খুব দরকার। ৯০-এর পরে আপনার পাঁচটা গবেষণা প্রতিষ্ঠিান তৈরি হয়েছে। যা মূলত গড়ে উঠেছে বিআইডিএসের হিউম্যান রিসোর্স দিয়ে।এসব প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে; সিপিডি, পিপিআরসি, উন্নয়ন সমন্বয়, ইআরজি এবং পিআরআই— ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং বিআইডিএস-এর সহকর্মীদের নিয়ে।
আমাদের পাবলিক সেক্টরের প্রোডাক্ট প্রাইভেট সেক্টরে এসে থিংক ট্যাংক হয়েছে। কিন্তু ন্যাশনাল ইন্টারেস্টকে কতটা সার্ভ করতে পেরেছে তারা? এই থিংক ট্যাংক এবং মিডিয়া গ্লোবাল ক্যাপিটালের অংশ হয়ে উঠেছে।যে কারণে কিন্তু, এ দেশে ওয়ান ইলেভেন হয়েছে। যে কারণে ২০২৪ হয়েছে। জনঅংশগ্রহণের পাশাপাশি, পেছনে নানা শক্তি কাজ করার তথ্য ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে। আমি আমার সমস্ত আলোচনার ভিত্তিতে একটি কথা বলতে চেয়েছি যে, আমাদের এই রাজনৈতিক পরিবর্তনগুলো, আজ আমাদের হাতে নেই। এর সঙ্গে আঞ্চলিক ও গ্লোবাল স্টেক হোল্ডারদের সংযোগ আছে। একে এভয়েড করার কি সুযোগ ছিল? বলাই বাহুল্য, বর্তমান বাস্তবতায় সুযোগ নেই। কিন্তু যেটি ৭১-এ ছিল, ঠিক একই রকম পরিস্থিতি আমরা মোকাবিলা করেছি। আমাদের জাতীয় ‘স্বার্থ’ এর প্রশ্নে, জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল। একটা ন্যাশনাল ক্যাপাসিটি ছিল, ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটি। আমাদের ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটি জাতীয় স্বার্থে দেখার বিবেচনায় একটা ব্যাংকরাপ্সি লেভেলে পৌঁছে গেছে। যার ফলাফল রাজনীতি এবং সমাজসহ সব জায়গায় আজ দৃশ্যমান।
রাশেদ আহমেদ : ইন্টেলেকচুয়াল ক্যাপাসিটির কথা যেটি বললেন, আমরা গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেটা দেখেছি অনেক ইন্টেলেকচুয়াল তো এটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একজন নোবেল লরিয়েটও এটার সঙ্গে ছিলেন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ লেভেলের লোকজনও ছিলেন। ১৮ মাসে কী দেখেছেন আপনি?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এখানে গভীর দার্শনিক প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে। সাধারণ মানুষের সমর্থন নিয়ে, যে মোরাল হাইট নিয়ে তারা সরকার গঠন করেছিলেন, সরকার ছেড়ে আসার পর তারা নিশ্চিয়ই নিজেদের আয়নায় নিজেদের কাজের ও দায়িত্বের বিবেচনা করবেন। কতটুকু তা সফল কিংবা ব্যর্থ হলেন। মোরাল হাইট তারা জাতির জন্য কোথায় রেখে গেছেন।
জাতি হিসেবে বিশেষত ইন্টেলেকচুয়ালরা, কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টকে আমরা কীভাবে বুঝি? ওই লেভেলের লোকরা যদি কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট ব্রেক করে, তাহলে এই মেসেজটা নিচের পর্যন্ত কোথায় যায়? আমরা যে ব্রেক করি সেটা ভেঙে বারবার কেন বলি? আমরা চেয়ারে বসে বেনিফিসিয়ারি হই। সে উদাহরণগুলো তো আছে। আমি যদি আমার ট্যাক্স হলিডে করি, প্রতিষ্ঠানের নামেই করি, তাহলে অন্যপ্রতিষ্ঠানের ওপর ট্যাক্স প্রয়োগ করার, আদায় করার নৈতিক শক্তি থাকে কী?
বর্তমান বাজেটে ছয় লক্ষ কোটি টাকা ট্যাক্স আদায় হবে আমার আপনার ওপরই তো ট্যাক্সটা বসবে, করদাতা হিসেবে আমার প্রণোদনাটা কোথায়? আমি যে ট্যাক্স দেই রাষ্ট্র আমাকে কী মানসম্পন্ন পরিসেবা দেয়? আমি পুরো আলোচনার মধ্য দিয়ে এ কথাটাই বলতে চাচ্ছি যে শিক্ষা-স্বাস্থ্য— এ দু’খাতের মধ্য দিয়ে নাগরিক সেবার সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। এ দুটো সেবা আজ কোথায় দাাঁড়িয়ে? এই দুটো সেবার মধ্যে কি আমাদের এলিটরা তাদের সন্তানদের এবং নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যাচ্ছে? এই প্রশ্নের মধ্যেই কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎটা লুকিয়ে আছে।
আরেকটি কথা খুব স্পষ্ট করে বলা দরকার, তা হলো লন্ডারিং ইস্যুটি। আমাদের একটা বড় সংকট ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বিষয়টা আজ সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ্যে হয়ে উঠেছে। এটা সমাধান কী? আমাদের কতগুলো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল, আমি যদি এক এক করে সেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কথা বলি অর্থ্যাৎ আমাদের ভবিষ্যত রাজনৈতিক এজেন্ডাগুলো কী? আমাদের শিক্ষাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের আওতায় নিতে যেতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারের সকল অংশকে দায়বদ্ধতার আওতায় আনতে হবে।নিজেদের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে। রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লেন্সে প্রশ্ন করতে হবে, অ্যাকাউন্টেবিলিটি ফর হুম? আমাদের এলিটদের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? শুধু রাজনীতিবিদের অ্যাকাউন্টেবিলিটি? ব্যুরোক্রেসি আর্মি-সিভিলের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? একজন ইন্টেলেকচুয়ালের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের কি কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? সাংবাদিকের কোনো অ্যাকাউন্টেবিলিটি নাই? আমরা কি যে অভিযোগগুলো আসে পাবলিক মিডিয়াতে আলাপ হয় আমরা কি সেগুলোকে রেসপেক্ট করি? আমরা কি ব্যাখ্যা দেই? তার মানে কী? সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয়রা নিজে রদায়বদ্ধতার বাইরে রাখেন। যা প্রতিষ্ঠান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতর থেকে গড়ে উঠতে দেয় না।
আপনি যদি ফিলোসফিক্যালি নাগরিকের জায়গা থেকে দেখেন, নাগরিকের তো দুটো দায়িত্ব। তার যে রকম অধিকার আছে তার সমানভাবে দায়িত্ব রয়েছে। সমাজে উদাহরণটা তৈরি করবে তো এলিটরা। সেটা শিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজের মাথারা সবাই। আমরা কি সেই জায়গায় এলিটদের বেস্ট প্র্যাকটিসেস বলে কিছু দেখি? আমিতো দেখছি না। একজন সম্পাদক দেশের পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অ্যাড্রেস করে নৈতিক জায়গা থেকে আর্টিকেল লেখাতে পারতেন। যেটা ৬০-এর দশকে ৭০-এর দশকেও আমাদের সম্পাদকরা করতে পারত।
আমাদের ন্যাশনাল ক্যাপাসিটিতে এরকম একজন সম্পাদককে দেখেন, একজন ন্যাশনাল প্রফেসরকে দেখেন যে প্রাইম মিনিস্টারকে বলতে পারে— ‘ইউ আর ডুইং রং থিং’। সমাজ ক্রমশ ছোট হয়ে গেছে রাষ্ট্র বড় হচ্ছে। কারণ রাষ্ট্রের আনুকূল্য পেতে আমরা সবাই ক্ষমতাসীন হতে চাচ্ছি। কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে, সমাজবিজ্ঞান বলে সমাজ সবসময় বেশি শক্তিশালী।
রাশেদ আহমেদ: কীভাবে করবে? কারণ করতে গেলেই তো, ছোটখাটো করতে গেলেও তাদের হুমকির মুখে পড়তে হয়, যেমন আপনার প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দেয়া হলো।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আপনার এই ভাষ্য একটি আংশিক চিত্র। পুড়িয়ে দেওয়া হলো এটার পুরো সত্য— আমাদের কেন সংবাদপত্র নিজে পুড়িয়ে দেবার ৩৬০ ডিগ্রি চিত্রটি নিজেরা তুলে আনার চেষ্টা করলাম না। এই প্রত্যেকটা ঘটনার কেন নাগরিক শ্বেতপত্র প্রকাশ হয় না? সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের কাছে শ্বেতপত্র চাওয়া, বিচার চাওয়াটা তো সবচেয়ে বড় কাজ। কী অভাব ছিল? কী মেশিনারিজের অভাব ছিল এখানে? কার কী রোল? এবং সেই জায়গায় তৎকালীন অন্তবর্তীকালীন সরকারের নিজেরও তো একটা দায়িত্ব আছে। এতগুলো শিক্ষিত মানুষ তাদের তো একটা জবাবদিহিতার জায়গা আছে—কেন আমরা ফেইল করলাম? তার কারণ খোঁজা, এটা থেকেও তো শুরু করা যায়। আরেকটা জায়গায় কিন্তু বলার আছে সেটা হচ্ছে ৭১-এর পরে আপনি যে ধর্ম নিয়ে প্রশ্নটা করলেন, তার ব্যাপারে আমি পুরো আলোচনায় নানাভাবে বলবার চেষ্টা করেছিলাম। এ ব্যাপারে বলা দরকার, পুরো বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় কিন্তু ধর্ম আবার নতুনভাবে ফেরত আসছে। এই ধর্মকে কীভাবে আমরা ডিল করব, নেগোশিয়েট করব— এই জায়গাটাও কিন্তু ভবিষ্যতে আরো গুরুত্বপূর্ণ হবে, আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : ধর্ম আর উগ্রবাদিতা এটা কি এক জিনিস?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: অব্যশই এটা এক জিনিস নয়। কিন্তু আমাদের দেশে ৭২-এর সংবিধানে খুব সহজভাবে আমরা ধর্মনিরপেক্ষতা বিষয়টি বলতে পেরেছিলাম যে ধর্মটা যার যার থাকবে রাষ্ট্র এর পার্ট হবে না। কিন্তু সেখান থেকে তো আমরা ফেরত এসেছি। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তো ধর্মীয় ব্যাপারগুলোকে প্রশয় দেওয়া হয়েছে, নানা সময় নানাভাবে। আপনি শুধু একটি কথা ভাবুন—ট্রাস্ট। ট্রাস্ট ব্যাপার কী আসলে? গ্রামীণ ট্রাস্টও ট্রাস্ট, বঙ্গবন্ধুর ম্যামরিয়াল ট্রাস্টও ট্রাস্ট। অর্থাৎ কোনো ট্রাস্ট বিপদগ্রস্ত হলে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব নেবে। আমরা চোখের সামনে দেখলাম, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে কিন্তু ব্যর্থ হলো। প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তবর্তীকালীন সরকার যে দায়িত্ব পালনে কী ভূমিকা রেখেছিলেন, ইতিহাসের এই প্রশ্ন বড় করে রয়ে যাবে। আজকে যেটা এক্স-এর জন্য ঘটল, ওয়াই-এর জন্য কি সেটা ভবিষ্যতে ঘটবে না? রাষ্ট্র কি আমাদের সে নিশ্চিয়তা দিতে পারছে? দিতে পারছে না। এই খাপাপ দৃষ্টান্তগুলো কিন্তু আমাদের সবাইকেই ভঙ্গুর করে তুলেছে। যার পরিপ্রেক্সিতে আমরা কিন্তু কেউ এই ঝুঁকির বাইরে থাকবো না।
রাশেদ আহমেদ : আপনি চুক্তির কথা বলছিলেন শুরুর দিকে যেটা বলতে চাচ্ছিলেন যে ইউনুস সরকারের সময় একটি চুক্তি করা হয়েছে।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এই চুক্তিটা নিশ্চিতভাবেই গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে হওয়াটা উচিত ছিল। তিনদিন আগে কেন করতে হলো? এ প্রশ্নটা উঠছে, সবাই তুলছে। এটা তো সত্যি...
রাশেদ আহমেদ : এটা কি ভালো হয়েছে না কি খারাপ হয়েছে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না না, এটা তো কোনোভাবেই গুড এক্সাম্পল নয়। একটা ডেমোক্রেটিক নর্মস ভ্যালুজের জন্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্টের জন্য নয়। প্রথম আলো চুক্তিটির বাংলা অনুবাদ করে ছেপেছে। এটা তো ভালো। এটার ওপর আলোচনা হওয়া দরকার। এখন আপনি যদি হাত-পা বেঁধে আমাকে সাঁতার কাটতে দেন, আমি তো প্রতিযোগিতায় প্রথমেই হেরে যাচ্ছি। এই গ্লোবাল অর্ডারটা তৈরি হচ্ছে, সেখানে টেরিফকে একটা নতুন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আমাদের কি এই জায়গায় প্রথমেই হেরে গেছি, আমাদের হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আমরা যেন চুক্তিতে সাইন করলাম?
রাশেদ আহমেদ : কেন করল? কেন করল ইউনুস সরকার এটা? স্বার্থ?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: বিষয়টি জাতীয় আলোচনার অংশ। এটা আমি আপনি বলা যথেষ্ট না। এখানেই জাতীয় আলোচনায় জাতীয় মনোযোগে বিষয়টিকে আনতে হবে। নির্বাচিত সরকার ও বিরোধীদল কী কারণে সংসদে বিলয়টি নিয়ে আলোচনা করলো না, বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্ব দিয়ে আলোচিত হবে। এই দায় প্রফেসর ইউনূস ও অন্তবর্তীকালীন সরকার, বিএনপি সরকার, বিরোধী দল, সংসদদের বাইরের দলগুলো, মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও থিংট ট্যাংকগুলো এ দায় এড়াতে পারেন না। এ বিষয়ে একটি কঠিন কথা বলতে হয়, আমি ’হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটার’ উপমাটি অনেক না বলা কথা বলে দিচ্ছে। অর্থাৎ আমরা হেরেই কিন্তু ওই চুক্তিতে সাইন করলাম।
রাশেদ আহমেদ : অনেকে বলে যে এটা অন্তর্বর্তী সরকারের একটা এজেন্ডাই ছিল এই রকম একটা আন্দোলনের।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: বিষয়টিতো বোঝাই যাচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অনেক উপদেষ্টা বলছেন - যে চুক্তির ব্যাপারটি তারা জানেন না। তারা ক্রমশই যখন ডিজঅ্যাসোসিয়েট করছেন নিজেদের, তার মানে যারা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত তারা একসময় সিঙ্গেল আউট হয়ে যাবেন। যদি কেউ এটা করে থাকেন, তাকে তো সে দায় নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইতিহাস কিন্তু কখনও কাউকে শেষ বিচারে দায় মুক্তি দেয় না। সরকারে থেকে যারা বলছেন তারা জানতেন না, অর্থ্যাৎ তারা এর দায় নিতে চাচ্ছেন না এখন? কিন্তু তা তো হয় না, সবাইকেই ভালোমন্দের দুটোরই দায় নিতে হবে, বিকজ হি ইজ আ পার্ট অফ দ্য সিস্টেম।
ব্যাপারটা পার্ট অফ হিজ সিস্টেম, তাই না? সেই সাথে চোখ পড়ার মত কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্টের জায়গাগুলো। সবাই যেন, সজ্ঞানে বিষয়গুলোকে আমল দিচ্ছেন না। আপনি দেখবেন যে অনেক উপদেষ্টাই, সরকারের দায়িত্ব শেষে দু’তিন মাসের মাথায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করছেন। ইট ইজ নট গুড গেসচার। ইট ইজ কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট। আমার মতো ছোট মানুষ এগুলো বোঝে, এরা এতসব বড় মানুষ, এরা বোঝে না এটা ভাবা ঠিক হবে না।
রাশেদ আহমেদ : চুক্তিতে যে প্রথম আলোতে এটা বাংলা করে ছেপেছে আপনি পড়েছেন নিশ্চয়ই। মানে কী মনে হলো? যাতে আমাদের অর্থনীতিটা...
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি তো এক কথায় বললাম হাত-পা বেঁধেই আমাদের সাঁতার কাটতে দেওয়া হলো। এটা রিয়েল অর্থে গার্মেন্টস সেক্টরের স্বার্থ কতটা রক্ষা করবে সেটাও দেখার ব্যাপার। আমার যেটা সামান্য বুদ্ধিতে নাগরিক হিসেবে কথাটি বলছি আমি এক্সপার্ট হিসেবে না। আমি ভূ-রাজনীতির সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করছি বারবার। কারণ হচ্ছে ভবিষ্যত এশিয়া, সেই এশিয়া, বে অফ বেঙ্গলকে নিয়ে প্রত্যেকটা পরাশক্তির কিন্তু নিজস্ব পরিকল্পনা আছে।
আমাদের পরিকল্পনার জায়গা থেকে আমরা এটা কানেক্ট করতে পারছি কি না সেখানে বুদ্ধিবৃত্তিকতা, কৌশল, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং মানুষকে সমবেত করে এর পক্ষে জনমত তৈরি করা একটা বড় কাজ। আপনি বঙ্গবন্ধুর ছয় দফায় দেখবেন, বে অফ বেঙ্গলকে কেন্দ্র করে একটা ছোট্ট দাবি ছিল। সেটা কী? সেটা হচ্ছে পূর্ব পাকিস্তানের নেভির হেডকোয়ার্টার হতে হবে চট্টগ্রামে। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের দূরদর্শিতা ছিল এটার প্রমাণ। আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষগুলোর এই রাজনৈতিক সংযোগের সাথে কি আপস করল কি না? এ প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই আমি এ প্রসঙ্গের ইতি টানতে চাই।
আমাদের পূর্বপুরুষরা তো ১৯৭১ সালে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল।‘৬৬-তেই রাজনৈতিকভাবে স্পষ্ট এই সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল। কারণ তারা রাজনীতি-অর্থনীতি এবং এ জনমানুষের ভবিষ্যৎ দেখতে পারত। মনে রাখতে হবে, পলিটিক্যাল লিডার হ্যাভ এ উইজডম। এবং শুধু উইজডম ইজ নট এনাফ, রেসপনসিবিলিটি, রেসপেক্ট টু দ্য পিপল এবং ওইটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ও মানুষের প্রতি দৃঢ অঙ্গিকার রাজনীতিবিদদের থাকতে হয়। কারণ তাদের জনসম্মতি নিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হয়।
রাশেদ আহমেদ : তারা তো পলিটিক্যাল লিডার না। যারা অন্তর্বর্তী সরকারে ছিলেন তারা তো পলিটিক্যাল লিডার না, তারা এলিট শ্রেণীর।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: হ্যাঁ কথাটা সত্য। তাদের পেছনে জনআস্থা ছিল। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশকে ফিরিয়ে আনার জন্য। তারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত নয়। এই বাস্তব সত্যটি, তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই তাদের মনে রাখা উচিত ছিল। বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবার সিদ্ধান্ত তাদের ছিল না। তিনদিন পরে নির্বাচন একটা পলিটিক্যাল গভর্মেন্ট আসছে, তারা কেন এই চুক্তিটা করবে? চুক্তি এই ডিসকোর্স, দেশের প্রয়োজনে তাই আমাদের চালু রাখতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : যদি না করত তাহলে কি বিপদ হতো দেশের?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: কী বিপদ হতো? আমি একজন অর্থনীতিবিদ নাম নিয়ে বলছি না, তাকে করাতে ‘তুমি বুঝবা না’। আমি নাগরিক হিসেবে বুঝব না? আপনি প্রফেসর হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্স প্রফেসর হিসেবে বুঝে ফেলেছেন আমার শিক্ষক সম্মান নিয়েই বলছি— আমি আপনার উত্তরে যথেষ্ট মনে করছি না। এটা দায়িত্ব কোনো প্রফেসরের না, তৎকালীন সময়ে প্রধান নির্বাহীর না। এটার সঙ্গে জাতির স্বার্থ প্রত্যেক নাগরিকের স্বার্থ যুক্ত। আমরা কি এভাবে রাষ্ট্রকে দেখতে ভুলে যাচ্ছি? আমরা যখন কোনো সাইন করি তখন তো এটা রাষ্ট্রের নির্বাহী হিসেবে জনগণের স্বার্থের সঙ্গে তার রিফ্লেকশন হয়। সেখানে আমরা ওথ নেই না যে সেই ওথের কি প্রতিফলন ঘটল? সে প্রশ্ন তো একজন নাগরিক হিসেবে করতে পারি আমরা।
রাশেদ আহমেদ : মানে এখন প্রশ্ন করলাম, করে কী হবে?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি আপনার এ প্রশ্ন থেকে বুঝতে পারছি যে হতাশার জায়গা থেকে প্রশ্নটি করছেন। প্রত্যেকটি যৌক্তিক প্রশ্নের ভেতরেই কিন্তু আগামীর ভবিষ্যৎ। একাত্তুর পূর্ব ৬৬-তেও কিন্তু এ রকমই মনে হয়েছিল। জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেই রাজনৈতিক নেতাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে আমরা কি একটা পোষ্য দেশ হিসেবে নিজেদের আইডেন্টিটি ধরে রাখতে চাচ্ছি, না আমরা একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব ধরে রাখতে চাচ্ছি?
বিষয়টি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। এবং রাজনীতিবিদদের সে দায়িত্ব কিন্তু নিতে হবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিকতার জায়গা থেকেও তারাও কিন্তু এই দায় এড়াতে পারেন না। ইতিহাস যার যার ভূমিকার জন্য তার বিচার করবে। কারণ রাষ্ট্র ও সরকার একটা পরম্পরা ব্যবস্থা। প্রত্যেকটা সরকার কিন্তু তার পূর্ববর্তী সরকারের পরম্পরা। ৬০ দিন তো তার হাতে ছিল, সে কীভাবে লাগিয়েছে এই সরকার? তারা চুক্তিটি নিয়ে সংসদে গিয়ে আলাপ করল না কেন? সংসদে তো একজন ইনডিপেন্ডেন্ট মেম্বার আলাপটা তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে নানা নিয়ম কাণুন দেখিয়ে, আলোচনার সুযোগ কাজে লাগানো হয় নি। আমি মনে করি, এই প্রশ্ন তুলে রাখাই হচ্ছে আগামীর সম্ভাবনা। আজকে হয়তো ইমিডিয়েটলি আপনি কিছু দেখছেন না। কিন্তু সাধারণ মানুষ বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। মানুষের এইসব পর্যবেক্ষণ ও চাহিদার ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের রাজনীতিটা কিন্তু গড়ে উঠবে।
রাশেদ আহমেদ : এখন বিএনপি সরকার দেশ চালাচ্ছে— আপনার কাছে কী মনে হচ্ছে? একটা বিষয় তো বললেনই এই চুক্তির বিষয় নিয়ে তারা পার্লামেন্টে তুলে নাই। হয়তো কোথাও তাদের এখানে কমিটমেন্টের কোনো বিষয় আছে। তারপর যা ঘটছে কী মনে হয়?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি মনে করি, দেশে যে কোনো অস্থিরতা আমাদের জন্য কিন্তু আরও গভীর ভঙ্গুরতা তৈরি করবে। বিএনপি সরকার তিনটি কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে। প্রথমত, অর্থনৈতিকভাবে একটা চরম কঠিন অবস্থা। দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনীতির প্রশ্নে নানা চাপের মুখে। যা বিপদ ও সম্ভাবনা দুইয়ের ইঙ্গিত দেয়।তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে একটা অংশকে বাদ দিয়ে তাকে, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ও চরম ডানপন্থী একটি পক্ষকে বিরোধী দলে নিয়ে তাকে রাজনীতিটা করতে হচ্ছে। এই তিনটার চ্যালেঞ্জকে সমন্বয় করে, বিএনপি সরকারকে এগাতে হচ্ছে।
রাশেদ আহমেদ : একটা অংশকে বাদ দিয়ে মানে আপনি আওয়ামী লীগকে বোঝাতে চাইছেন?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: শুধু আওয়ামী লীগ প্রশ্নটা তো না, একাত্তুরে মূলধারার বিষয়টিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।একাত্তুরের শেকড়কে ছোট করে দেখার কোনো সুযোগ নেই সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। ২০২৬ সালের নির্বাচন ৭১-কে ইররেলেভেন্ট করার যেন উদ্যোগ ছিল? এই নির্বাচন থেকেই কিন্তু বোঝা গেল, ৭১ আরও ইনার ফোর্স যেন ক্রমশ আরো বড় হবার সম্ভাবনার দিকে এগোবে। কারণ বিএনপি ৭১-কে বলেই কিন্তু নিজেকে ডিফারেন্স করেছে। জামাত থেকে নিজেকে পৃথক করছে। তাই না? আবার ছাত্ররা দেখেন নিজেদের আইডেন্টিটিটা বিলোপ করে দিল জামাতের ভেতরে। রাজনীতির এই ডাইনামিকসের দিকে আমাদের নজর রাখতে হবে। পলিটিক্যাল ডাইনামিকস-এর দিকে।
রাশেদ আহমেদ : এইটা কি এই বিষয়ে— মানে বিএনপিকে জামাত থেকে আলাদা করা ছাড়া তো উপায় নেই। পার্টি তো এখন দুইটা। ইলেকশন করেছে এই দুই পার্টি।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এই জায়গায় দেখতে হবে যে, তাদের এই সেপারেশনটা পলিটিক্যাল সেপারেশনস কি না। ২০২৪ সালে একটা কর্তৃত্বপরায়ণ সরকারের পতন হয়েছে বুঝলাম। ২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকার আসলো, পরিস্থিতি কি আপনি দেখেন - ব্যাংক ফাঁকা। কিন্তু এই ব্যাংকের পরিস্থিতি আপনি ঠিক করতে চাচ্ছেন? পারছেন? সে তো পারছেন না। এখন রাজনৈতিক স্লোগানের ভেতর দিয়ে যদি ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং গভর্নর পরিবর্তন হয়; ভালো দৃষ্টান্ত দিয়ে শুরু করা গেল না। অর্থনৈতিক জায়গাটা না গোছাতে পারলে, গর্তটা কিন্তু আরও গভীর হতে থাকবে। এই ঝুঁকির জায়গা নিয়ে আমি কী বলছি আপনি কী বলছেন, তা মূখ্য বিষয় নয়। বাস্তবতা হলো, এমন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকারকে বাজেট করতে হয়েছে।
দেশে খুব ডিপ ডিপ্রেশন ইকোনমিক পরিস্থিতি। আমরা একটা খুবই কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছি। বাংলাদেশ মনে হয় এই রকম সংকটে ৭২-এর পরে কখনও পড়েনি। এই পরিস্থিতিতে গ্লোবাল অর্ডারের সঙ্গে নিজেদের অ্যালাইন করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক সামর্থ্য, তা নিয়েই আমাদের পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে ।
রাশেদ আহমেদ : সামনে পারা যাবে? কী মনে হয় আপনার?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না পারার তো একটাই ফলাফল, ’ফেইলর স্টেট’। কিন্তু আমরা জাতি হিসেবে সংগ্রামী জাতি। বারবারই তো আমরা এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছি। এবং সেটা আমি নির্ভর করতে চাই মানুষের ওপর। মানুষই কিন্তু আসলে উত্তরণের পিছনে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সেখানে লিডারশিপ ম্যাটার করে। আপনি যে জায়গাটা মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাচ্ছিলেন সেটা হচ্ছে নাগরিক প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল সরকার এবং রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।
মাদ্রাসায় এক ধারার শিক্ষা, মূলধারায় এক ধারার শিক্ষা, ইংরেজি ধারায় এক রকম শিক্ষা। কিন্তু সেখানে তো একটা কমন সোশ্যাল গ্রুপস এর মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষা থাকুক এতে আমি অসমর্থন করি না। প্রতিযোগিতার জায়গায় সেই সুযোগটা আমরা রাখব। কিন্তু সেখানে একটা জাতীয় সত্তার পরিচয়ের যে ইউনিটি গড়ে দেওয়ার ব্যাপার ছিল সেটা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যর্থ হয়েছে। তার প্রতিফলন হিসেবে আজকে আমাদের এই জটিলতাগুলোর মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এক জটিল আত্মপরিচয়ের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমরা সবাই শুধু, কোনোভাবে সামাল দিয়ে কিংবা কোনো রকম এটাকে হাউসকিপিং করে এগিয়েছি। আমরা এই কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে চাই না। সবার মধ্যে একটা দায়সারা ছাড়া ছাড়া ভাব। সমস্যাটাকে আমরা সমস্যা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে ভাবছি না।
আমাদের যে অর্থনৈতিক সামর্থ্য সেটা একদিকে ম্যানি-লন্ডারিং-এর মাধ্যমে লুট করা হচ্ছে। আমার ভাইয়ের টাকাই আমার আরেক ভাই লুট করেছে। এটা রোধ করতে হবে। দ্বৈত নাগরিকত্বের ব্যাপারে আমি মনে করি একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের ভাই-ব্রাদাররাই তো আজ অভিবাসিত। আমার পরিবারে প্রায় ৬০ ভাগ, বড় আমেরিকা-কানাডায় অধিবাসিত। গ্রাম থেকেও মানুষ বিদেশে গিয়ে অধিবাসিত হয়েছে। ভবিষ্যতে উত্তারিকার সূত্রে পাওয়া, কৃষি জমি বিক্রি কিংবা শহরের জমি বিক্রি করে সে টাকা নিয়ে যাবে ট্যাক্স না দিয়ে— সেটা তো হতে পারে না।
আমরা এখনও জানি না, আলী রিয়াজ আমেরিকান সিটিজেন না বাংলাদেশের সিটিজেন। দ্বৈত নাগরিকত্বের সুবিধা নিয়েই তো সে করছে, সংবিধান সংস্কারের মতো সংবেদনশীল কাজে তাকে যুক্ত করা হলো। তিনি একাডেমিক প্রতিচিন্তা পত্রিকায় সম্পাদনা পরিষদে ছিলেন। আমি আট বছর সেই জার্নালের নিবার্হী সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলাম। তিনি একসময় আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টে বাংলাদেশ বিষয় রিপোর্ট করেছেন। বাঙালি আমেরিকার দেশে বিনিয়োগকারী হোক, বিদ্যায়তনে যুক্ত হোন, গবেষণায় যুক্ত হোন, তাদের মেধা বুদ্ধিকে জাতি গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে অবশ্যই আমরা চাই। অবশ্যই জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে বিশে ষবিবেচনায় নিয়ে। ডক্টর. খলিলুর রহমানকে নিয়ে একই প্রশ্ন? এ প্রশ্নে ব্যক্তির দায়িত্বশীলতা ও আত্মসম্মান বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি সামনে আসে। দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে রাষ্ট্রের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : আলী রিয়াজের প্রশ্নে প্রসঙ্গ যখন তুললেন উনি তো সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি প্রস্তাব দিয়ে গেছেন। আপনি কি সেটি দেখেছেন? আপনার কী মনে হয় যে এই সংস্কারগুলো দরকার কি না?
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: দেখেছি, প্রক্রিয়া বুঝেছি। কিন্তু সেটা তো এখন যে ফ্রেম ওয়ার্কের মধ্যে আছে সেটা তো আর... সংস্কারের প্রশ্নে তো সবাই ভালো কথাই বলে। তাই না? ১৯৯৯০ সাল পরবর্তীতে ২০০১-এর থেকে আমি দেখছি যে, যে কথাগুলো বলা হচ্ছে সে কথাগুলো আমরা সমাজের বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষরা নানাভাবে বলছি। সিভিল সোসাইটিই এ প্রসঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বলছে।
একটা যৌক্তিক প্রশ্ন করা দরকার। আপনি পার্ট অফ এ সিভিল সোসাইটি ইউ রিপ্রেজেন্ট এ স্টেট অ্যাফেয়ার কেস। আবার ওই ফেরামের বাইরে এসে আপনি আবার সিভিল সোসাইটি হয়ে সমালোচনা করছেন। এগুলো কি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট না কিনা? এই যে বৈপরীত্যগুলো, আমাদের সমাজে এলিটরা প্রতিনিয়ত তৈরি করছে -এগুলোর বিরুদ্ধে তো রাজনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। আর শেষ পর্যন্ত রাজনীতিটা তো রাজনীতিবিদদেরই করতে হবে।
রাশেদ আহমেদ : এই সংস্কারের বিষয়টা যে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থা— যেগুলো প্রস্তাবগুলোর মধ্যে...
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: প্রস্তাবগুলো তো রাজনৈতিক দলগুলোকে একমত হয়েই নিতে হয়েছে। কিন্তু সবাই একমত হবে এমনতো ভাবার কারণ নেই। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শন ও রাজনীতি আছে। সব বিষয় সবাই একমত হলে তো পৃথক পৃথক দলের প্রয়োজন হতো না। নূন্যতম ঐকমত্য - এর ভিত্তিতে আমরা এগোতে পারি না। এটাই বাংলাদেশে তো মূল সমস্যা।
রাশেদ আহমেদ : আচ্ছা একটা জিনিস কি আপনি লক্ষ্য করেছেন আমাদের তরুণ সমাজ বলেন এবং মানুষ বলি তাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক একটা বিশাল পরিবর্তন ঘটেছে। সেই পরিবর্তনটা কী আপনার ছোটখাটো ইস্যু নিয়েও কিন্তু বড় ধরনের শো-অফ করা হয়। ধরুন একটি ছবি করা হয়েছে সেই ছবির বিরুদ্ধে ছবি প্রদর্শন করতে দেওয়া হবে না।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: এটা আমাদের সমাজ ছাড়া অন্য কোথাও এরকম ঘটছে কি না আমি জানি না। কিন্তু হোল ট্রেন্ডটাই কিন্তু একটা নতুন ধরনের সংকট তৈরি করছে।
রাশেদ আহমেদ : আমি যেটা বলছি যে একটা মানে উগ্রবাদী গোষ্ঠী আমাদের উত্থান এমন বেশি ঘটেছে যেটা একটা সুন্দর প্রদর্শনও তারা আটকে দিচ্ছে।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: না এগুলো করা সম্ভব হচ্ছে বর্তমান নানা ধরনের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে। তরুণ জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সংগঠিত সামাজিক মাধ্যমের ওপর ভিত্তি করে। আপনি দেখুন নেপালে যেটা হলো, আপনার শ্রীলঙ্কায় যেটা হলো বাংলাদেশে যেটা হলো বা হচ্ছে সেটা এই ডিজিটাল প্লাটফর্মকে ব্যবহার করে কিন্তু সাংগঠনিক ব্যাপারটা ঘটল। এটা কিন্তু নতুন ধরনের একটা ফেনোমেনন।
সেটা হচ্ছে ফিজিক্যাল সংগঠনের বাইরে মতাদর্শগত ঐক্য তৈরি হচ্ছে এবং তার ভিত্তি কিন্তু নীরবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম-এর মাধ্যমে। সুতরাং এর পক্ষে-বিপক্ষে যাওয়ার চেয়ে একে বোঝা, গভীরভাবে একে বোঝা দরকার। এবং ভ্যালুজাজমেন্টের বাইরে থেকে এই তরুণদের দেখা ও বোঝা দরকার। কারণ আমরা তো জাতি হিসেবে কমন ইউনিক নাগরিক ধারণাটা তৈরি করতে পারিনি।
কনফ্লিক্ট অফ ইন্টারেস্ট ডেমোক্রেসির একটা বড় ধরনের কিন্তু চেক এন্ড ব্যালেন্সের ইস্যু। সেগুলো আমরা আমাদের সোশ্যাল নর্মস ভ্যালুজ প্র্যাকটিসে রাখছি না। আমরা অন্যদের বলছি। এই তরুণরা পয়সা করেছে বলছি। কিন্তু অন্যরাও তো তা করেছে এবং করছে। তখন রেফারেন্স পয়েন্ট তো বয়স্কদের দিকেই বেশি চলে যাবে।
আমরা কিন্তু কেউ দৃষ্টান্ত তৈরির জায়গায় ও সংস্কারের জায়গায় কাজ করছি না। আরেকটা বড় ব্যর্থতা আমি যেটা মনে করি সেটা হচ্ছে, আমাদের দেশে ফাংশনাল চেঞ্জের দিকে আমাদের মনোযোগ কম। আমরা সব কিছুতে সব সময়, বিরোধিতার স্বার্থে বিরোধিতা করছি। রেসপন্সিবল বিরোধী দল এবং ডিসকোর্স তৈরি করার ক্ষেত্রে সমাজকে এনগেজ করছে না। এবং এক্ষেত্রে সোশিওলজিস্টদের বড় ব্যর্থতা আছে।
রাশেদ আহমেদ : শেখ হাসিনা আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি ইন্টারভিউ দিয়ে বলেছেন যে ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে চান।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: আমি এই জায়গাগুলোর ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ মানুষের ওপর বেশি আস্থা রাখি। তারা নিজের ও দেশের ভালোর জন্য নিজেদের নেতাদের বাছাই করতে ভুল করেন না। ইতিহাস আমাদের সে কথাই বলে। তা সাক্ষ্য ইতিহাসে আমরা পাই। জোয়ার-ভাটার দেশে নানা উত্থান পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের দেশ এগিয়েছে।এই যে পরাশক্তির ওপর কেন্দ্র করে জাতীয় স্বার্থ অর্জন করা যায় না। এ দেশের অভিজ্ঞতায় ও সামাজিক-স্মৃতিমেদে ভাঁজে ভাঁজে সে সব ও গল্পসত্য লুকায়িত। কম্প্রোমাইজ ও বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র ও চরিত্র দুই তাদের জানা।
বর্তমার পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল ও নেতাকে অবশ্যই কৌশলী হতে হবে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে এই নেগোশিয়েট করার রাজনৈতিক প্রজ্ঞাটা আমাদের আজ ভীষণভাবে প্রয়োজন। ক্রাইসিসই জনসমর্থিত নেতা বাছাইয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।সঙ্গে রয়েছে ভূ-রাজনীতির জটিল অংকের সমাধান।
রাশেদ আহমেদ : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
খন্দকার সাখাওয়াত আলী: ধন্যবাদ আপনাদের, আমার প্রতি আগ্রহ দেখানোর জন্য এবং সংবাদকে ধন্যবাদ।

আপনার মতামত লিখুন