সংবাদ

‘নানা দিক থেকে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়েছি ’ -ড. সেলিম জাহান


প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম

‘নানা দিক থেকে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়েছি ’  -ড. সেলিম জাহান

ডক্টর সেলিম জাহান। মূলত অর্থনীতিবিদ। কিন্তু লেখালেখির জগতে তার বিচরণ অনেক। চাকরি করেছেন জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে। দারিদ্র্য নিয়ে তার গবেষণাও রয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য এবং এর মুক্তির উপায় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটালের হেড অব নিউজ রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো। 

রাশেদ আহমেদ : আলাপটা শুরু করি, এই ভূখণ্ড কখনো কি দারিদ্র্যমুক্ত ছিল?

ড. সেলিম জাহান: আসলে সারা বিশ্বেই কখনো দারিদ্র্যমুক্ত ছিল না। দারিদ্র্য নানা মাত্রিকতায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মহাদেশে সবসময় ছিল। তবে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে দারিদ্র্যের আপাতন বেড়ে গেছে। কোনো কোনো দেশের ৬০ শতাংশ, ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে। অতএব দারিদ্র্যের আপাতনটা ঊর্ধ্বমুখী। আর ২ হচ্ছে যে দারিদ্র্যের নানা মাত্রিকতা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যেটা শুধু আয়ের ঘাটতি নয়, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শিক্ষায় স্বাস্থ্যের সুযোগে একটা বঞ্চনা রয়েছে। এবং যার জন্যে আমরা দারিদ্র্যকে নানা খাতে নানা মাত্রিকতায় দেখি। আর শেষ কথাটা হচ্ছে যে দারিদ্র্যের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় অসমতা বেড়েছে।

রাশেদ আহমেদ : আমি বলতে চাচ্ছি যে সোনার বাংলা বলা হয়। এই সোনার বাংলা কি কখনো সোনার বাংলা ছিল কি না, মানুষ সুখে-শান্তিতে বাস করতো কিনা, দারিদ্র্যমুক্ত ছিল কি না। আমি ওইখান থেকে আলাপটা শুরু করতে চাই।

ড. সেলিম জাহান: হ্যাঁ তো এখন এই যে সোনার বাংলা বলা হয় সেটার একটা হচ্ছে প্রতীকী ব্যাপার। আর সোনার বাংলা বলে সোনার মানুষও ছিল না সবাই কিংবা এই ভূখণ্ড সোনায় মোড়া ছিল এমনও ভাববার কোনো কারণ নেই। এবং তখন মানুষ সুখে-শান্তিতে ছিল কি না; আমি বলব ছিল এই কারণে যে মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তি কাজ করেছে সেই সময়ে। বঞ্চনা ছিল, নিশ্চিতভাবে বঞ্চনা ছিল এবং আপনার জানা আছে যে এখানে নানা রকমের অত্যাচারের সম্মুখীন আমরা হয়েছি। ব্রিটিশ সময়ে হয়েছি পরবর্তী সময়ে জমিদারের উদ্ভব এবং জমিদার দ্বারা নিষ্পেষিত হয়েছে জনগণ। কিন্তু তারপরেও ওই যে বলা চলে যে দুমুঠোভাত, দুমুঠো অন্ন এটা মানুষের কিন্তু ছিল। একেবারে হাভাতে বা খাদ‍্যের জন্য মারা গেছে সেটা কয়েকটা দুর্ভিক্ষের সময় হয়েছে। 

রাশেদ আহমেদ : ওই দুর্ভিক্ষগুলো কি মানুষ সৃষ্ট ?

ড. সেলিম জাহান: পৃথিবীর সব দুর্ভিক্ষই মনুষ্য সৃষ্ট। কারণ দুর্ভিক্ষের প্রথম দিকে হয়তো প্রাকৃতিক কারণে হয় কিন্তু পরে মানুষ তার নিজের স্বার্থে কোনো কোনো গোষ্ঠী সেই দুর্ভিক্ষটাকে কাজে লাগায়। আপনি যদি বাংলার ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের দিকে তাকান, সেই সময় কিন্তু বাংলাদেশে ধান বা খাদ্যশস্যের কোনো অভাব ছিল না, সামগ্রিকভাবে। কিন্তু সেগুলোকে নানাভাবে সরিয়ে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম ঘাটতির তৈরি করা হয়েছে সেটা থেকে দুর্ভিক্ষ হয়েছে। আফ্রিকাতেও তাই, চীনেও তাই। তো আমি যদি আপনার ওই জায়গাটায় যাই যে সোনার বাংলা কেন বলা হতো, ১ হচ্ছে প্রতীকী অর্থে বলা হতো আর সোনার বাংলা বলা হতো যে মানুষের একটা স্বস্তিকর শান্তিপূর্ণ জীবন ছিল।

রাশেদ আহমেদ : আবার একটু বলুন, আপনি দারিদ্র্যকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ?

ড. সেলিম জাহান: আমার কাছে দারিদ্র্যের সংজ্ঞাটা হচ্ছে, বহু দিক থেকে এক ধরনের বঞ্চনা, যে বঞ্চনার কারণে মানুষ তার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না, তার সক্ষমতা নষ্ট হয়। আমি একটা খুব ভালো কথা বহু আগে যেটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল, এক ব্রাজিলীয় রমণী আমাকে বলেছিলেন যে দারিদ্র্যের আসলে কোনো সংজ্ঞা নেই। দারিদ্র্য হচ্ছে আগুনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া। যে সেখান দিয়ে হেঁটে না গেছে সে কখনো দারিদ্র্যকে বুঝতে পারবে না।

রাশেদ আহমেদ : তাহলে এই অঞ্চলের দারিদ্র্য বলতে আপনার নিজস্ব কিছু ধারণা আছে, নিজস্ব কিছু সংজ্ঞা আছে, আমি সেই বিষয়গুলো জানতে চাচ্ছি।

ড. সেলিম জাহান: আমি দারিদ্র্যকে দুই দিক থেকে দেখি। এক দিক থেকে দেখি যে সুযোগের বঞ্চনা আর এক দিক থেকে দেখি ফলাফলের বঞ্চনা। তো সুযোগের বঞ্চনা বলতে আমি কি বোঝাচ্ছি? আমি সুযোগের বঞ্চনা বলতে বোঝাচ্ছি যে এই যে আমরা বলি আয় দারিদ্র্য, সম্পদের দারিদ্র্য। এই আয় দারিদ্র্য বা সম্পদের দারিদ্র্য সেই সময় পর্যন্তই যাবে যে সময় পর্যন্ত আমরা মানুষকে সুযোগ দিতে পারবো না। কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারবো না, সত্যিকার অর্থে উদ্যোগের সুযোগ দিতে পারবো না। এই সুযোগের একটা ঘাটতি যদি থেকে যায় সেখানে দারিদ্র্যের আপাতন হতে পারে। আর একটা হচ্ছে ফলাফলের দিক থেকে এবং ফলাফলের দিক থেকে আমি মনে করি যে সাধারণত অর্থনীতিবিদেরা সব সময় আয় দিয়ে দারিদ্র্য পরিমাপ করেন বা সম্পদ দিয়ে দারিদ্র্য পরিমাপ করেন। আমার মনে হয় বঞ্চনাটা শুধু আয় বা সম্পদে নয়, বঞ্চনাটা আসলে থাকে সুযোগে এবং শিক্ষার সুযোগে। একটা দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠী এক রকমের সুবিধা পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্যের সুযোগে আমরা জানি যে বাংলাদেশে ত্রিধারা চারধারার স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। একটা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তার চাইতেও যারা বিত্তবান তারা বাইরে গিয়ে স্বাস্থ্য সুবিধানিতে পারছেন। তো এই যে বঞ্চনাগুলো এগুলো আমার মনে হয় সুযোগের বঞ্চনা। সুযোগের বঞ্চনাকে যদি আমরা আরও একটু বিস্তৃত করি সেটা হচ্ছে যে আসলে শুধু মাত্র মানুষের কুশল বা বস্তুগত জিনিসের ঘাটতিই কিন্তু দারিদ্র্য নয়। আপনার যদি কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা না থাকে, আপনার যদি অংশ গ্রহণের স্বাধীনতানা থাকে, আপনার যদি সেই জায়গায় রাজনৈতিক অধিকারের যে বলয়টা সেটা যদি আপনার সীমিত থাকে তাহলেও কিন্তু আপনি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সেটাও কিন্তু দারিদ্র্য। আর শেষ কথা যেটা আমি আরও একটু বিস্তৃত করি সেটা আমি মনে করি যে দারিদ্র্যের একটা বিশেষ মাত্রিকতা হচ্ছে মানুষের অসম্মান এবং মানুষের যে শ্রদ্ধার প্রাপ্তি সেটির যদি একটা ঘাটতি তৈরি হয়ে যায় এবং আমরা যদি মানুষকে যে অবস্থায় তিনি থাকুন না কেন, যে আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যেই তিনি পড়ুন না কেন তাকে যখন আমরা সম্মান না করব, তার প্রতি যখন আমরা শ্রদ্ধা না দেখাবো তাকে আমরা দরিদ্র করে দিই।

রাশেদ আহমেদ : আপনি যেগুলো বললেন এটার সমাধানটা কিভাবে আসবে ?

ড. সেলিম জাহান: এটার সমাধান নানা পর্যায়ে হবে। একটা পর্যায় হচ্ছে যে প্রথম এটার দায়-দায়িত্বটা পড়বে রাষ্ট্রের ওপরে। যেটাকে আমরা বলে থাকি যে রাষ্ট্র একটা পরিবেশ তৈরি করতে পারে। একটা উপরি কাঠামো তৈরি করতে পারে। সেই উপরি কাঠামো এবং পরিবেশ যদি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যে না থাকে তাহলে কিন্তু দারিদ্র্য যাবে না। এটা গেল রাষ্ট্রের কথা। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের নীতিমালার মধ্যে এমন কিছু বিষয় থাকতে হবে যেটা অনেকে বলেন দারিদ্র্যবান্ধব, আমি বলি দারিদ্র্য অভিমুখী। কারণ দারিদ্র্য নিরসনের জন্যে কতগুলো নীতিমালা কতগুলো ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি এবং সেই জিনিসগুলো রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। যারা কোনো রকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারছে না বিভিন্ন কারণে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা তাদের থাকতে পারে কিংবা তারা একেবারে প্রান্তিক মানুষ থাকতে পারেন তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণে যে ধরনের সুরক্ষা বলয় বা সামাজিক সুরক্ষা বলয় প্রয়োজন আছে রাষ্ট্র সেটা দিতে পারছে কি না। গেল রাষ্ট্রের দিকে। 

সমাজের একটা ভূমিকা আছে এবং সত্যিকার অর্থে আমাদের এই উপমহাদেশের সমাজে সমাজ কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে এবং রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন যে এখানে আমরা সবসময় রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে একটা পার্থক্য করেছি। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বহুকিছু হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা কিছু হয়েছে কিন্তু সেটা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার যে মূল কাঠামো সেটাকে নষ্ট করতে পারেনি। সেই মূল কাঠামোর যদি একটা দিকে আমি আসি সেটা হচ্ছে দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকে তাহলে দেখা যাবে যে সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী কিন্তু তার যে দরিদ্র অন্যান্য গোষ্ঠী রয়েছেন তাদের সাহায্য করতে কিন্তু নানাভাবে এগিয়ে এসেছেন। সেটা দুর্যোগের সময়ও করেছেন সেটা শান্তির সময়ও করেছেন। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর খোঁজ নিয়েছেন, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে সাহায্য করেছেন। তো এই যে একটা সামাজিক বন্ধন, সামাজিক কাঠামো এটা দারিদ্র্যদূরীকরণে সাহায্য করে। আমাদের দেশে ইদানিং আমরা সামাজিক সুরক্ষার কথা বলছি, অর্থনৈতিক সুরক্ষার কথা বলছি আসলে আমাদেরতো ঠিক পশ্চিমা দেশের মতো এরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের পরিবার ছিল আমাদের সুরক্ষার একটা ঢাল, আমাদের সমাজ ছিল সুরক্ষার একটা বলয়। তো তারা একটা ভূমিকা পালন করেছে। আর তৃতীয় পর্যায়ে আমি মনে করি ব্যক্তি মানুষের একটা ভূমিকা আছে। অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণ বাদ দিয়ে সামাজিক কারণ বাদ দিয়ে এই যে দারিদ্র্যের যে মাত্রিকতা আমি বললাম যে মানুষকে সম্মান করা, মানুষকে অশ্রদ্ধা না করা, মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া, মানুষকে তার কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতাটা দেওয়া, তার কথা শোনা এই জিনিসগুলো কিন্তু আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে করতে পারি। কিন্তু অনেক সময় আমরা দেখিযে ক্ষমতার কারণে বা অর্থের কারণে আমরা অনেক সময় যারা প্রান্তিক মানুষ দরিদ্র জনগণ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি, তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেই না, মানুষ হিসেবে। এটা কিন্তু তাদেরকে দরিদ্রতর করে। এখানে আমার মনে হয় ব্যক্তি মানুষের একটা ভূমিকা আছে।

রাশেদ আহমেদ : আর একটি বিষয় সম্পদের সুষম বণ্টন না হলেই তো সেটি একটি দারিদ্র্য একটি শ্রেণিকে দরিদ্র করে দেয় নিশ্চিত। কিন্তু আমরা তো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আছি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটি এখন সম্ভব কি না?

ড. সেলিম জাহান: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন এবং আমার মনে হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আমরা সনাতনভাবে বলে এসেছি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতিরাই লাভবান হবেন, শ্রমিকদেরকে শোষণ করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আমার মনে হয় পুঁজিবাদের যে সনাতন যে সংজ্ঞা বা সনাতন যে কাঠামো সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জন্য যে জিনিসটির সবচাইতে বিস্তার দরকার বা আমরা ঐতিহাসিক ভাবে দেখেছি সেটা হচ্ছে বাজার এবং মুক্ত প্রতিযোগিতা। বাজার এবং মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে পরে পুঁজিবাদ সম্প্রসারিত হতে পারে না। তো এর আগে সবাই বলেছেন অর্থনীতিরা বলেছেন যে বাজারে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া যাবে না। বাজারকে বাজারের মতো থাকতে দিতে হবে এবং সেখান থেকে যে লাভবান হবে সে লাভবান হবে। সাম্প্রতিককালে বা বেশ কিছুদিন ধরে আমরা যে কথাটা শুনেছি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে কিংবা ধরা যাক ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে যে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের একটা ধারণা। এখন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সবচাইতে বড় কাজ হচ্ছে যে আসলে যেখানে বাজার কাজ করছে যেখানে প্রতিযোগিতা কাজ করছে সেই জায়গাটাকে সমতল করে দেওয়া, যাতে সবার সেই সুযোগটা থাকে।

রাশেদ আহমেদ : যেটা ইউরোপের অনেক কান্ট্রিতে সেগুলো আছে। হ্যাঁ করেছেওতো।

ড. সেলিম জাহান: যেমন জার্মানিতে আছে। এগুলোতে রাষ্ট্র করতে পারে। যেমন জার্মানিতে বলুন, যুক্তরাজ্যে বলুন বা নরওয়ে, সুইডেনে বলুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা সবার জন্যে অবারিত। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো রকমের ত্রিধারা চতুর্ধারার ব্যবস্থা নেই, একই রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা। একটা পর্যায় পর্যন্ত রাষ্ট্র জনগণের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার দায়-দায়িত্ব নেয়। এখন এটার জন্য যে অর্থায়নের দরকার সেই জন্য সেই সমস্ত দেশে কিন্তু করের হারও অত্যন্ত বেশি। আপনি যদি নরওয়ে বা সুইডেনে যান আপনার আয়ের ৪০ শতাংশ আপনাকে কর হিসেবে দিতে হচ্ছে ।

রাশেদ আহমেদ : যার আয় বেশি তার কর বেশি।

ড. সেলিম জাহান: বেশি হচ্ছে। কিন্তু কর নিয়ে রাষ্ট্র এগুলোকে অন্য জায়গায় খরচ করছে না। ওই করের বিনিময়ে আপনি কতগুলো সুবিধা পাচ্ছেন সার্বজনীন সুবিধা পাচ্ছেন সেবার এবং স্বাস্থ্য সেবার শিক্ষাসেবার সুতরাং ওই জায়গায় কিন্তু আর আপনার খরচ নেই।

রাশেদ আহমেদ : আমাদের দেশে এখন একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার। এই যে বেকার কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না পাচ্ছে না এটা জনসংখ্যা একটি বড় বাধা?

ড. সেলিম জাহান: আমার মনে হয় আপনি তিনটে দিকে উল্লেখ করেছেন একটা হচ্ছে যে জনসংখ্যার একটা চাপ আছে। এই চাপ বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বহু নীতিমালাকে কিন্তু ভঙ্গুর করে দেবে। এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ কিন্তু তরুণ এটাও খেয়াল রাখতে হবে। তো স্বাভাবিকভাবেই জনসংখ্যার এইচাপটা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বা বেকারত্ব দূরীকরণের ক্ষেত্রে একটা বড় চাপের সৃষ্টি করবে। এবং একটা কথা এখানে টিকা হিসেবে আমি ব্যবহার করতে চাই জনসংখ্যার হার কিন্তু বাংলাদেশে এখন বাড়ছে। বহু দিন যাবত প্রায় ধরা যাক ৩০-৪০ বছর যাবত জনসংখ্যার হারটা কমে এসেছিল এবং বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে যে এটা ২ দশমিক ১ এ আর থাকছে না।এটা বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা শঙ্কার বিষয়। দ্বিতীয়ত যে দুটো অন্য বিষয় আপনি বলেছেন যে এই যে বেকারত্ব কর্মসংস্থানের যে একটা ঘাটতি আছে কোত্থেকে আসছে। এটা দুদিক থেকে আসছে কারণ একটা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাহিদার একটা ব্যাপার আছে আপনার যোগানের একটা ব্যাপার আছে। এখন চাহিদার দিক থেকেই অর্থনীতির মধ্যে আমরা জানি যে নানা রকমের পরিবর্তন হচ্ছে কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা যদি শিল্পের দিকে তাকাই শিল্পের কাঠামো উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা যদি কৃষির দিকে তাকাই যেটা দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশে অবহেলিত। কৃষিতে একটা সুযোগ আছে কিন্তু সেটার আপনার সদব্যবহার করছে না। আমরা মূলত বাণিজ্য এবং সেবাখাত দিয়েই কিন্তু চলছি। এবং বাংলাদেশে জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি সেবা খাত বা বাণিজ্য খাত থেকে এসেছে। তো এভাবেই যদি চলে তাহলে পরে দেখা যাবে যে চাহিদার দিক থেকে যে জাতীয় চাহিদা আছে সেটা আমরা মেটাতে পারছি না। কারণ চাহিদা তো বদলাচ্ছে এবং এই চাহিদা আরও বদলাবে। যতই পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাঠামো বদলাবে তার সাথে চাহিদা বদলাবে। আমরা তথ্য প্রযুক্তির জগতে বাস করছি তথ্য প্রযুক্তিতে প্রচুর লোক লাগছে সেখানে চাহিদা বদলাবে। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলছি কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা যদি আজকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে আরও ব্যবহৃত হয় সেখানে একটা বেকারত্ব দেখা দেবে। তো সুতরাং আমাদের মানব সম্পদের একটা পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে যে এই যে চাহিদা বদলাচ্ছে এই চাহিদার সঙ্গে আমরা কি তাল মেলাতে চাচ্ছি, পারছি কিনা। আমরা কি এখনো সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি আমরা কি বিভিন্ন বিষয় যেগুলো আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে পড়ানো হয় তার চাহিদা বিদেশে আছে কি না। কারণ আপনি যদি বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পখাতের সেবা খাতের তারা কিন্তু প্রায়ই বলে যে যে জাতীয় দক্ষতার তাদের প্রয়োজন সে জাতীয় দক্ষতা তারা পারছে না। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠাচ্ছি, অদক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিক নয়। তো যেখানে শ্রীলঙ্কা ভারত ফিলিপাইন তারা দক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছে এবং সেই সমস্ত দক্ষ শ্রমিকের আয় কিন্তু অদক্ষ শ্রমিকের চাইতে অনেক বেশি। গত ৪০ বছর যাবত আমরা শ্রমিক পাঠাচ্ছি মধ্যপ্রাচ্যে এখনো পর্যন্ত আমরা দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারছি না। আমি পেশাজীবীদের কথা বলছি না আমি দক্ষ শ্রমিকের কথা বলছি। তো সেইজন্য আমার মনে হয় চাহিদার যে একটা মূল্যায়ন দেশে কি প্রয়োজন, বিদেশে কি প্রয়োজন সেটা আমাদেরকে দেখতে হবে। আপনি সনদ দিয়ে ছাত্রছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার করে দিচ্ছেন প্রশ্ন হচ্ছে যে জাতীয় দক্ষতা তাদের অর্জন করার কথা ছিল সেই দক্ষতা তারা পেয়েছে কি না।

রাশেদ আহমেদ : তাহলে তো সাবজেক্ট পরিবর্তন করতে হবে, যুগোপযোগী সাবজেক্ট যুক্ত করতে হবে।

ড. সেলিম জাহান: নিশ্চয়ই এখন আপনি যদি দেখেন এর মধ্যে কিএকটা সমীক্ষা হয়েছে সেটা দেখা গেছে যে ইংরেজিতে যারা বিশ্ববিদ্যালয়থেকে পাশ করে বের হয় তাদের চাহিদা অনেক বেশি। কারণ ভালো ইংরেজি জানা লোক আপনার শুধুমাত্র যে আন্তর্জাতিক সংস্থায় লাগবে তা নয় এটা কিন্তু উদ্যোক্তাদেরও লাগবে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে লাগছে। কারণ আপনি তো শুধু ব্যবসা আপনার দেশের চৌহদ্দির মধ্যে করছেন না আপনি বিদেশের সঙ্গে করছেন। তারপরে ধরা যাক যেটাকে আমরা বলি যে বিজ্ঞান প্রযুক্তি অংক কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা এই ব্যাপারগুলো সেখানে আপনার লাগবে। শিক্ষাকে এতদিন পর্যন্ত আমার একটা মর্যাদামূলক জায়গায় রেখে দিয়েছি। আমরা প্রচুর মানুষকে শিক্ষা ব্যবস্থায় নিচ্ছি, প্রচুর ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সার্টিফিকেট দিচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে সেই সমস্ত শিক্ষার গুণগত মান কি। এটা কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই আপনি যদি রাস্তাঘাটে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন সর্বস্তরে শিক্ষারগুণগত মান পড়ে গেছে। সুতরাং আপনার প্রশ্নের জায়গায় যদি আসি তাহলে এই যে কর্মসংস্থান বেকারত্বের জন্যে আমার মনে হয় চাহিদার দিকটা দেখতে হবে এবং চাহিদাতে যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন তার একটা মূল্যায়ন করে আমাদেরকে ভাবতে হবে সেই চাহিদা দেশের মধ্যে দেশের বাইরে।

রাশেদ আহমেদ : আর একটি বলছিলেন আপনি জনসংখ্যা। আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বলছিলেন। কিন্তু এই যে তরুণ একটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে অনেকে বলে যে এটা আমাদের সম্পদ । আমি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শুনেছি গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ডক্টর ইউনুস বলেছিলেন এটি বিশাল একটি অ্যাসেট। তার আগের সরকারের সময় শুনেছি আপনার কাছে কি মনে হয় এটা অ্যাসেট নাকি বোঝা।

ড. সেলিম জাহান: এটা নির্ভর করবে আপনি এটাকে কিভাবে ব্যবহার করবেন। আমরা সবসময় জনমিতিক লভ্যাংশের কথা বলে থাকি এবং বলে থাকি যে তরুণেরাই হচ্ছে আমাদের সম্পদ। কিন্তু তরুণেরা আপনার সম্পদ হতে পারে তরুণেরা আপনার দায়ও হতে পারে। এবং এটা নির্ভর করবে আপনি এই তরুণদের জন্য তরুণদেরকে কিভাবেব্যবহার করছেন। বহু ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে তরুণেরা রাজনৈতিক কারণে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা সত্য কথা। এবং তরুণদেরকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করার জন্য আমরা তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছি আমরা তাদের মূল্যবোধ নষ্ট করেছি এবং আমরা তাদের লক্ষ্যকে অন্যভাবে অন্য দিকে চালিত করেছি। আজকের তরুণেরা আপনি যদি রাস্তায় কথা বলেন বা অন্য জায়গায় কথা বলেন তাদের অনেকেই ভাবছে যে শিক্ষার কি দরকার আছে। আমি যদি একটা মব তৈরি করে এক ঘণ্টার মধ্যে ১ কোটি টাকা পেয়ে যেতে পারি কিংবা আমি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে অথবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যদি মাসে ১০ লাখ টাকা করে যদি আয় হয় তাহলে আমি লেখাপড়া করে কি করব। এটা অনেকেই বলছেন এবং যার জন্য তরুণেরা কিন্তু বর্তমান অবস্থায় শিক্ষা বিমুখ হয়ে গেছে। যেমন আমি এটা যদি বলি যে এই যে জুলাই অভ্যুত্থান হয়ে গেল। জুলাই অভ্যুত্থান হওয়ার পরে আমরা একটা জায়গায় দাঁড়ালাম। সেক্ষেত্রে সবচাইতে যেকথাটা প্রথমে বলা উচিত ছিল যারা তরুণ এই অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি তাদেরকে বলা উচিত ছিল তোমরা তোমাদের কাজ করেছ তোমরা এখন তোমাদের যে জায়গায় তোমরা ছিলে সেই জায়গায় ফেরত যাও। আমরা তো সেটা করিনি নেপালে তো সেটা করেছে। নেপালে অভ্যুত্থানের পরেই বলা হয়েছে যে তোমরা তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় ফেরত যাও। বাকি যেটা এটা আমরা করছি। কিন্তু আমরা তো তরুণদেরকে বলেছি যে তোমরাই সম্পদ তোমরাই ভবিষ্যৎ আমরা আমাদেরকে তোমরাই প্রতিষ্ঠিত করেছ এবং তোমরাই বললে আমরা চলে যাব। এই জাতীয় একটা কথা বললে পরে আপনি তরুণদের ভূমিকাটা সেটাকে কিন্তু আপনি নষ্ট করছেন। তাদের একটামহৎ এবং আমি মনে করি যে একটা উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল যে ভূমিকানিয়ে আমরা গর্ব করতে পারতাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের যেকর্মকাণ্ড এবং তারা যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দিয়ে তাতে কিন্তু তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধাবোধ তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে সৌহার্দ্য সেটা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে গেছে।

রাশেদ আহমেদ : তরুণরা ক্ষমতার অংশীদার হলো কেন, এটা তাদেরও একটা যুক্তি আছে সেই যুক্তিটা তারা এভাবে বলে তা না হলে তো রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না, টার্গেট নিয়ে রাষ্ট্র যাচ্ছে না এবং রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন দরকার রাষ্ট্রের অনেক কিছুর পরিবর্তন দরকার সেটির জন্য তারা ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। 

ড. সেলিম জাহান: না এখন এই যে আপনি কথাটা ব্যবহার করলেন যে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া মানে অংশীদারী হওয়া। ক্ষমতার অংশীদার কিন্তু নানাভাবে হওয়া যায় সেটা ক্ষমতার ভেতরে থেকে আপনি অংশীদার হতে পারেন ক্ষমতার বাইরে থেকেও আপনি অংশীদার হতে পারেন। এখন যদি তরুণদের ভূমিকাটা যদি এই হতো যে আমরা ক্ষমতার ভেতরের মধ্যে ঢুকব না কিন্তু আমরা ক্ষমতার বাইরে থেকে যাচাই-বাছাই করব আমরা একটা খবরদারি রাখব যেটা বলা চলে  নাগরিক সমাজ করে থাকে। তরুণেরা যদি সেই ভূমিকাটা নিত যে আমরা ক্ষমতা কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্র কিভাবে চলছে সরকার কিভাবে চলছে সেটার ওপরে আমরা নজর রাখব। এবং যে সমস্ত লক্ষ্য নিয়ে যে সমস্ত মূল্যবোধ নিয়ে অভ্যুত্থান হয়েছিল সেটা সত্যিকার অর্থে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না সেটার দিকে আমরা নজর রাখব। তাহলে কিন্তু ক্ষমতায় তাদের ভূমিকা কিন্তু অনেক বড় হতো এবং তারা আরও বেশি শক্তিশালী হতো।

রাশেদ আহমেদ : কি ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে এই জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল আপনি যেটি বলছিলেন?

ড. সেলিম জাহান: প্রথমেই যেটার কারণে জুলাই অভ্যুত্থানটা আসলো দু তিনটে কারণের প্রথমটা বলছি সেটা হচ্ছে যে একটা অসমতার ব্যাপার একটা বৈষম্যের ব্যাপার সেটাতো প্রথমেই শুরু হয়েছিল। এখন সেই বৈষম্যটা আমরা বলে থাকি যে কোটা বৈষম্য নিয়ে শুরু। কিন্তু পরে যেটা স্থাপিত হলো যে বৈষম্যটা শুধু কোটার মধ্যে নয় বৈষম্যটা সারা সমাজে এবং অর্থনৈতিক সুযোগে বৈষম্য আছে সুবিধায় বৈষম্য আছে একটা গোষ্ঠী পুরো রাষ্ট্রকে লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে অন্যরা বলা চলে বঞ্চনার শিকার হয়েছে সেটা একটা মূল্যবোধ আছে। দ্বিতীয়ত যে কথাটা আমি আগে বলেছি আবারও এখানে আসি যে মানুষ সবসময়চায় একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে থাকতে। মানুষ সবসময় চায় এমন একটা পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে যেখানে তার কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা আছে যেখানে সে বলতে পারে। এখন এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে নাযে গত ১৫-১৬ বছর যাবত আমরা দেখেছি যে একটা অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বারবার ভাঙা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে যে জাতীয় সুশাসন জবাবদিহিতা দৃশ্যমানতা থাকা দরকার সেটা হয়নি। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে উপাত্ত ব্যবহার করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হচ্ছে সেই উপাত্ত কতখানি গ্রহণযোগ্য সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুতরাং এক ধরনের অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে। আর তৃতীয়তআমার মনে হয় যে মূল্যবোধটা হয়েছিল যে অর্থনৈতিক দিক থেকেএকটা শৃঙ্খলা আসবে একটা কাঠামোগত সুশাসন আসবে এক ধরনের দৃশ্যমানতা এবং এক ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে।

রাশেদ আহমেদ : সেটি কি হয়েছে এই ২৪ এর পরে?

ড. সেলিম জাহান: না হয়নি। নিশ্চয়ই হয়নি। এটারও অনেক কারণ আছে একটা কারণ হচ্ছে যে আপনার প্রথমেই বলতে হবে যে একটিঅন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ কি তার এক্তিয়ার কতখানি সেটাআপনাকে দেখতে হবে। আমি মনে করি যে একটা অন্তর্বর্তীকালীনসরকারের যেটা নেপালেও দেখা গেছে এক্তিয়ার হচ্ছে যে একটি সুষ্ঠু জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজন করা যার ফলে একটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক উত্তরণ হয়ে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। এইটা হচ্ছে তার মৌলিক এক্তিয়ার। আমরা তো দেখেছি যে এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েএই এক্তিয়ারের বাইরে বহু কিছু করা হয়েছে। যে সমস্ত সংস্কারের পেছনে সংসদের অনুমোদন লাগবে সেই সমস্ত সংস্কারের মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে ঢুকেছে। আচ্ছা গেল একটা এই ব্যাপার। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক দিক থেকে তারা যতখানি সক্রিয় ছিল অর্থনীতিকে ঠিককরার ব্যাপারে তাদের মনোযোগ সেইভাবে ছিল না। তো এটা যদি নাথাকে তখন পর্যন্ত তখন দেখা গেছে যে সাধারণ মানুষ কিন্তু নানা রকমের চাপের শিকার হয়েছে। আপনি মূল্যস্ফীতির কথা বলেন মূল্যস্ফীতির চাপের শিকার হয়েছে সেবার যে প্রসারণ ছিল সেবাটা সংকুচিত হয়েছে। আজকে যে হামের আমি এটাকে অতিমারিই বলি মহামারিও না এটা অতিমারি আমরা দেখতে পাচ্ছি এটা এখন দেখা যাচ্ছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ব্যবস্থা দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের শিশু প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে পাঁচ বার ১০ বারসরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে তারা এটা করেনি। তো সুতরাং স্বাভাবিকভাবে যে জাতীয় কার্যক্রম তাদের করার কথা ছিল সেটাকরেনি। তৃতীয় এবং শেষ কথাটা হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই বিদেশের কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করতে পারে না যে চুক্তির নানা রকমের দিক থাকবে যেগুলো গোপনীয়তার মধ্যে থাকবে এটা করা যেতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই জাতীয় একটা চুক্তি হয়েছে। একটা বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে কোনো অসুবিধা নেই একটা বাণিজ্য চুক্তি দৃশ্যমান বাণিজ্য চুক্তি একটা দেশেরসঙ্গে আরেকটা দেশের হতেই পারে। এবং সেখানে শুল্কের তারতম্য থাকতে পারে সুবিধার তারতম্য থাকতে পারে হতে পারে। সেটার জন্য যদি আমাদের সুবিধা কম হতো আমরা হয়তো সমালোচনা করতে পারতাম। কিন্তু একটা বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে তার পেছনে নানা রকমের গোপনীয়তার চুক্তি হয়েছে যেখানে আমাদের বহু কর্মকাণ্ড আমরা একটি দেশের অনুমোদন ছাড়া করতে পারব না। এবং সেই কর্মকাণ্ডগুলো অর্থনৈতিক নয় অর্থনীতির বাইরে। তো এটা যখন হয়ে যায় তখন তো সত্যিকার অর্থে আপনার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে আপনি বিক্রি করে দিলেন। এবং এর ফলে যেটা হয়েছে যে আজকে যে নির্বাচিত সরকার এসেছে তারা বহু দিক থেকে তাদের হাত পা বাধা।

রাশেদ আহমেদ : কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকে বলেছে যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই হয়েছে এই চুক্তিটা।

ড. সেলিম জাহান: কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তো সরকার নয় রাজনৈতিক দলগুলো তো সংসদও নয়। রাজনৈতিক দলের সাথেআপনি আলাপ করতে পারেন কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তো একটাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে না। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না একটা সরকার এবং একটা সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক। এখন আপনিরাজনৈতিক দলের সাথে করলে এটা করতে পারেন আপনি পেশাজীবী সমিতির সঙ্গে আপনার আলাপ আলোচনা করতে পারেন আপনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে পারেন কিন্তু সেটা আপনার কাজ এবং আপনার কার্যবিধিকে বৈধতা দেয় না। কেন তারা এই জাতীয় কাজ করলেন এবং সেখানে কোনো রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না এইটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। 

রাশেদ আহমেদ : তো এই যে সংস্কার তারা বলছিল যে সংস্কার কিছু করতে হবে কারণ রাজনৈতিক দলগুলো 

এটি করেনা। তাই সংস্কারের উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিলো। আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ড. সেলিম জাহান: না আমি এটা এভাবে ব্যাখ্যা করব যে আপনি সেই জাতীয় সংস্কার করবেন যে জাতীয় সংস্কার আপনার একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে প্রয়োজন। আপনি নির্বাচন কমিশনেরসংস্কার করবেন অবশ্যই, আপনি নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার যদি প্রয়োজন হয় অবশ্যই করবেন। নিত্যনৈমিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে যে জাতীয় সংস্কার করতে হবে অবশ্যই। আপনি তো করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার করলেন না। আপনি তো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এটাকে মানে বিভাজিত করার জন্যে যে সংস্কার করতে চেয়েছিলেন আপনি সেটা করলেন না। তো যে সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেগুলো আপনি করলেন না কিন্তু আপনি এমন সংস্কারের জায়গায় গেলেন যে সংস্কারগুলো আপনার আওতার বাইরে এক্তিয়ারের বাইরে তখন তো জিনিসটা একটা অন্য রকমের হয়। সংস্কারের দোহাই দিয়ে আমি কাজ করেছি এই কাজগুলো করেছি এটা হতে পারেনা। তাহলে পরে আপনি সংস্কারগুলো ওই জায়গায় করতেন যে সংস্কারগুলো আপনার যে কাজের যে পরিধি এবং যে কাজের জন্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা নিয়ে এসেছি সেই কাজগুলো করার জন্যে যে সংস্কার সেগুলো তো আপনার করতেই হচ্ছে সেই জায়গায় আপনি যাননি আপনি সংস্কার অন্য জায়গায় করতে গেছেন এবং তাতে বৈধতা দেওয়ার জন্যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার কথা বলেছেন একাধিক কমিশন আপনি গঠন করেছেন নানা রকম শ্বেতপত্র বার করেছেন যেগুলো এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ইত্যাদি আপনি করেছেন। এত সংস্কারের কথা বলা হলো এত সংস্কার করা হলো কই শিক্ষা সংস্কারের জন্য তো কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। আপনি যদি আজকে বাংলাদেশের সব সমস্যার মধ্যে আমাকে একটা সমস্যাকে চিহ্নিত করতে বলেন আমি তো বলব যে শিক্ষার সমস্যা। ওটা যদি আমরা সমাধান করতে পারি বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নারীর জন্যে সংস্কার কমিশন করেননি।

রাশেদ আহমেদ : নারীর জন্যে করেছে কিন্তু বাস্তবায়ন করা যায়নি।

ড. সেলিম জাহান: বাস্তবায় করে তো করেনি হ্যাঁ সেটি আচ্ছা ঠিক আছে করেছে। শিক্ষার জন্যে কোনো সংস্কার কমিশন হয়নি কৃষির জন্যে কোনো সংস্কার কমিশন হয়নি। তো এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাশেদ আহমেদ : তাহলে কেন তারা এই সংস্কার সংস্কার কাজগুলো করতে গেছে?

ড. সেলিম জাহান: এটা অনেক কারণে হয়েছে কারণ কথা হচ্ছে যে তাদের পেছনেও তো বহু লোকজন ছিল যারা এই সংস্কারের ধোয়া তুলেবহু কিছু অর্জন করতে চেয়েছে তাদের হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল এবং আমরা যে বহু প্রস্তাব পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি সেইগুলো একটা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদে আলোচিত হয়ে বিবেচিত হয়েভোটের মাধ্যমে সেগুলো আইনে পরিণত হবে এবং সেগুলো তারপর বাস্তবায়ন করা হবে। এখন সংস্কার নিয়ে একটা ব্যাপার হচ্ছে যে অনেক মানুষের নানা রকমের উদ্দেশ্য ছিল সেগুলো তারা সাধন করতে চেয়েছেএটা একটা হতে পারে। আর একটা হচ্ছে যে সংস্কারের কথা বলে সংস্কারের কথা বারবার উচ্চারণ করে তারা তাদের যে আসল কাজ সেটাথেকে মানুষের দৃষ্টি দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে সেটাও হতে পারে। সুতরাং এটা কি কারণে এই সংস্কার নিয়ে কথা হয়েছে এটা বলা খুব মুশকিল। আপনি জানেন যে সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমের জন্যে একটা সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল কামাল আহমেদ সেটারনেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কামাল আহমেদ নিজে বলেছেন যে ওই সংস্কার কমিশনের কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি। এটা বোধহয় সব সংস্কারকমিশনের ক্ষেত্রে সত্য। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটা শ্বেতপত্র বারকরা হয়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির কি অবস্থা সেটার ওপরে। দেবপ্রিয় নিজেও বলেছে যে এটার কোনো কিছুই আলোচিত হয়নি বা এটাকরা হয়নি। সুতরাং শেষ পর্যন্ত তো আমরা দেখেছি যখনঅন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলে গেছে সংস্কার কমিশনের রিপোর্টগুলো রয়েগেছে কিন্তু সেই ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি কোনো জায়গাতেই আমরাদেখতে পাচ্ছি না।

রাশেদ আহমেদ : তারা তো জনগণের সমর্থনের জন্যে একটি গণভোটও দিয়েছেন যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করি যে গণভোটটা আসলে সঠিক হয়েছে কি না?

ড. সেলিম জাহান: প্রথমত যতদূর আমি জানি আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানে কোনো গণভোটের ব্যবস্থা নেই এক সময় ছিল তারপর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গণভোট কখন দেওয়াহয়? গণভোট দেওয়া হয় সাধারণত যে আপনি একটা বিষয় সংসদেআলাপ আলোচনা করছেন সে বিষয়ের কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছে না এবংসংসদ মনে করছে যে তারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটার কোনো নিষ্পত্তি করতে পারছে না তারা জনগণের কাছে যেতে হবে। তখন গণভোট হয় যেসংসদ এটার কোনো নিষ্পত্তি করতে পারছে না যে কোনো কারণেই হোকএবং জনগণের রায় নিতে হবে তখন গণভোট করা উচিত। এই গণভোটতো আপনি নিজের থেকে ঠিক করেছেন যে একটা গণভোট হবে। তো এইগণভোটে সেই জন্য এই গণভোট সম্পর্কে যারা সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞতারা অনেক ভাবে প্রশ্ন করেছেন এবং আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন যেসংসদের মধ্যে বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কিন্তু এই গণভোটসম্পর্কে উচ্চবাচ্য অনেক কম। অতএব আগামীতে কি হবে গণভোটসম্পর্কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন আছে। তারপরে শেষ কথা যেটা বলছি গণভোট সাধারণত একটা প্রশ্নের ব্যাপারে হ্যাঁ কিংবা না। যেমন আপনি ‘ক’ কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখতে চান কি তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখতে চান না অথবা ‘ক’ এর প্রতি আপনার জনসমর্থন আছে কি না রাষ্ট্রপতির প্রতি অথবা না হ্যাঁ কি না। সবাই বলেছেন এটার মধ্যে চারটা ব্যাপার ছিল। চারটা ব্যাপারের মধ্যে অনেকগুলো বিষয় ছিল। এখন যে জায়গায় আপনার অন্ত দ্বন্দ্বমূলক ব্যবস্থাটা চলে আসছে সেটা হচ্ছে যে কেউ যদি মনে করেন যে আমি তিনটে হ্যাঁ একটা না বা দুটো হ্যাঁ আর দুটো নাতাহলে তিনি কিভাবে ভোট দেবেন? হয় তাকে পুরোটা হ্যাঁ বলতে হবেঅথবা তাকে পুরোটা না বলতে হবে তো আপনি তো মানুষের গণভোটের যে গণতান্ত্রিক অধিকার সেটার ওপরে আপনি চড়াও হয়েছেন। তাহলেপরে এটা কিভাবে আপনি গণভোটকে বৈধতা দেবেন বা যৌক্তিক বলে মনে করবেন?

রাশেদ আহমেদ : আপনি যেটি এর আগে বলছিলেন যে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে একটি মূল্যবোধের ওপরে ভিত্তি করে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান হলো ৫ ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। তারপরে দেখলাম রাতারাতি বাংলাদেশের অনেক ম্যুরাল ভাঙা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করা হলো। তো এটাকে মূল্যবোধের সাথে মেলাতে পারছি না। আপনি কি মেলাতে পারছেন?

ড. সেলিম জাহান: না আমি মেলাতে পারছি না। আমি মেলাতে পারছিনা এবং এটার মানে অনেকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন অভ্যুত্থান যেটাহয়েছে আমরা জানি যে এটা কোনো সমসত্ত্ব সম্পন্ন একটা দল করেনি একটা গোষ্ঠী করেনি। এখানে নানা রকমের গোষ্ঠী এবং নানা রকমের দল তাদের নানা রকমের মত এবং তাদের নানা রকমের উদ্দেশ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছে এবং সেখানে একটা যেটা আমি বলব যে সবাই যেটাতেঅভিন্ন মত ছিল সেটা হচ্ছে যে এই একটা স্বৈরাচারমূলক একটা ব্যবস্থারঅবসান করতে হবে। কিন্তু এইটা করতে গিয়ে এই যে বিভিন্ন দল এবংবিভিন্ন মতের মধ্যে যে মতপার্থক্য আছে তারই একটা দল হতে পারেউপদল হতে পারে তারা এই যে একাত্তরের যে চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এটার বহু কিছুই হয়তো তারা আত্মস্থ করতে পারেনি। এবং এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদেরমুক্তিযুদ্ধের সময় একটা দল একটা গোষ্ঠী ছিল যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে স্বীকার করেনি এবং পরবর্তী সময়েও স্বীকার করেনি। তো সেই কারণে তাদের পক্ষে হয়তো এই যে ম্যুরাল ভাঙাএই যে নানা রকমের লুণ্ঠন এবং এই যে নানা রকমের কার্যকলাপ যেগুলোকে আপনি সমর্থন করতে পারেন না এটা হয়েছে। নেপালে তো এটা হয়নি। নেপালে প্রথম থেকেই সরকার বলে দিয়েছিলেন যে আর যাইকরা হোক ভালো কথা অভ্যুত্থান হয়েছে ইত্যাদি কিন্তু কোনো মন্দির বামূর্তি কিন্তু ভাঙা যাবে না। তো আমাদের এখানে তো আমরা অনেক সময় অনেকেই বলেছেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেপারতেন কিন্তু সেটা তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তো এই যে ম্যুরাল ভাঙা এটার একটা রাজনৈতিক দিক আছে এটার একটা হয়তো সাংস্কৃতিক দিকও আছে। এবং অনেক যারা অত্যন্ত চরমপন্থী কোনো একটা ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাস করেন তারা ভেঙেছেন অনেকে রাজনৈতিক কারণে ভেঙেছেন। সুতরাং আমি মনে করি যে এটা আসলে ওই যে অভ্যুত্থানের সময় যে সমাবেশ বা অভ্যুত্থানের সময় যে দলগুলো সামনেগিয়েছিল তাদের মধ্যে তাদের বিশ্বাসে তাদের মূল্যবোধে তাদের লক্ষ্যেরমধ্যে যে বিভাজন সেই বিভাজনেরই একটা প্রতিফলন আমরা দেখেছি।

রাশেদ আহমেদ : নতুন একটি সরকার এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমেই তো আসলো এবং অনেক ভোটে তারা জয়ী হয়ে এসেছে। তাদের অর্থনৈতিক আউটলুকটা এখন কেমন দেখছেন তারা কোন দিকে যাচ্ছে যেহেতু আপনি অর্থনীতিবিদ।

ড. সেলিম জাহান: আমি মনে করি যে অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের যে ব্যবস্থাগুলো তারা এই পর্যন্ত নিয়েছেন তার একটা বড় অংশ হচ্ছে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কি ছিল। যেমন আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কথাদেখেছি কৃষক কার্ডের কথা দেখেছি। এবং সেটা আমি মনে করি যেএকটা সামাজিক সুরক্ষাকে আরও ভালো ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করারজন্যে তারা এটা বলেছেন। সুতরাং এটার ফলে প্রান্তিক মানুষ দরিদ্রমানুষ উপকৃত হবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখা দরকারযে এই সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে একটা গতিময়তারসৃষ্টি করতে হবে। কারণ সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজনীয় কিন্তু এটা পর্যাপ্তশর্ত নয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তির জন্যে আমাদের আয় বাড়ানোর জন্যেমাথাপিছু এবং সার্বিক আয় বাড়ানোর জন্যে আমাদের অর্থনীতিতেএকটা গতিময়তা সৃষ্টি করতে হবে। এবং বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি যেজায়গায় আছে খুব মোটা দাগে যদি বলি যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কম। আমাদের উৎপাদনে যেখানে আমরা ছিলাম সেখানেএখনো আমরা যেতে পারছি না। বহু কলকারখানা এখনো বন্ধ। আমাদের পোশাক শিল্পের রপ্তানিও স্থবির। আমাদের কর্মসংস্থানেরক্ষেত্রে একটা ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং অর্থনীতিতে একটা শ্লথতা আছে। এই অর্থনৈতিক শ্লথতা থেকে কাটিয়ে ওঠার জন্যে কি জাতীয় ব্যবস্থানেওয়া হবে তার দুটো দিকে আমরা তাকিয়ে আছি। একটা দিক হচ্ছে যেকদিন আগে সরকার একটা ৫ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আচ্ছা। আর একটা দিক হচ্ছে আগামীতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। তো ৫ বছরের পরিকল্পনাটা দীর্ঘমেয়াদী এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই আমিবাজেটটাকে দেখি যেটা এক বছরের। তো এখানে সরকারের কাছ থেকেএখনো খুব পরিস্ফুট কোনো বার্তা সাধারণত আমাদের কাছে পৌঁছায়নি বা আমরা দেখতে পাইনি সেটা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্যে কি কিব্যবস্থা করা হবে। এবং কোন কোন জায়গায় এখানে আপনার জোর দেওয়া হবে। এবং কোন কোন জায়গায় এখানে সত্যিকার অর্থে একটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে এটা আমরা দেখতে পাইনি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আমরা অনেকগুলো লক্ষ্যমাত্রা দেখেছি ১০ লাখ নতুন কাজ সৃষ্টি করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু সেটা কোথায় করা হবে কেমন করে করা হবেকোন কৌশলে করা হবে সে ব্যাপারে কিন্তু আমরা এখনো অপেক্ষা করছি। তার মধ্যে বাজেট দেওয়া হচ্ছে এবং মনে রাখা দরকার যে একটা সংকটকালের মধ্যেই এই বাজেটটা দেওয়া হচ্ছে। এবং এটা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক যে তারা ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই বৈশ্বিক চালচিত্র বদলে গেছে। যেখানে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। এবং এটা তো আমাদের অর্থনীতির ওপর একটা বিরাট আঘাত। এবং সেই বিরাট আঘাতের একটা হচ্ছে যে সত্যিকারঅর্থে যে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে যদি আঘাত পড়ে তাহলে পরেআমাদের যে শ্রম আয় যেটা সেটার ওপরে একটা আঘাত পড়বে এবং সেটা আমাদের অর্থনীতির দুটো স্তম্ভ পোশাক শিল্পের থেকে যে আয়এবং শ্রমিকের কাছ থেকে আয় তার একটা বড় স্তম্ভ সেখানে আঘাত পড়বে। দ্বিতীয়ত আমরা জ্বালানি নির্ভর এবং আমরা জ্বালানিআমদানি করি। জ্বালানির মূল্য বেড়ে গেলে এটা বেড়ে যাবে। তবে এইক্ষেত্রে যেখানে আমি মনে করি যে সরকারের একটা সাফল্য উল্লেখ করা দরকার সেটা হচ্ছে যে বেশ কিছুদিন আগে আমরা দেখছিলাম যে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গাড়ির সারি। এবং একটা সময় মনে হয়েছিল যে সরকারবোধ হয় এটাকে সামাল দিতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেছে যে এই জ্বালানির ব্যবস্থাপনা দিয়ে সরকার এটাকে সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তুখেয়াল রাখতে হবে যে দীর্ঘমেয়াদী আমাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা। আমরা কি তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যে নতুন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণকরব কি না। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেযে জাতীয় সামগ্রিক বা পণ্যকে আমরা বলি যে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি তার কোনো মজুদ নেই। সেরকম মজুদ নেই আপনি একসপ্তাহ এক মাস তিন মাসের কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কোনো রকমের মজুদ নেই। তেলের ক্ষেত্রে এটা সত্য সেই জাতীয় মজুদ আপনি তৈরি করতে পারবেনকি না। তো সেই জাতীয় দেখতে হবে। চতুর্থত হচ্ছে যে একটা বড় প্রশ্নসেটা ৫ বছরের পরিকল্পনার জন্যও সত্য হবে বাজেটের জন্যও সত্য হবেসেটা হলো অর্থায়ন। টাকা কোত্থেকে আসবে। এবং আজকে এখনআমরা যেখানে কাজ করছি মানে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের বাজেটতৈরি করছি আমরা জানি যে আমাদের করের যে ভূমি সেটা অত্যন্ত কম। আমাদের কর জাতীয় আয়ের অনুপাত হচ্ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ এটাএশিয়ার মধ্যে সবচাইতে কম এবং বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম। সুতরাংআপনি আয় পাচ্ছেন না সেখানে। ব্যয়ের দিক থেকে দেখলে ব্যয় কিন্তুবহু বহু। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারা যাওয়ার আগে সরকারিকর্মচারীদের বেতন এবং ভাতা বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। এবং এটা বর্তমানসরকারকে এটাকে বাস্তবায়ন করতে হবে অর্থ লাগবে। আপনি বর্তমানসময়ে এই যে তেলের দাম জ্বালানির দাম সারের দাম বেড়ে গেছে। তোএটার জন্য আপনার যে ভর্তুকি প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দেওয়া হয়। তোসেই ভর্তুকি আপনি তুলে নিলে পরে জনগণ কিন্তু একটা অসুবিধার মধ্যে পড়বে। আপনি যদি না তুলে নিতে পারেন এর মধ্যে বা কমিয়ে না আনতে পারেন আপনার কিন্তু অর্থায়নের একটা সমস্যা দেখা দেবে। বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিরাট। এবং এই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ একটি বড় বোঝা।

রাশেদ আহমেদ : ডক্টর সেলিম জাহান আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

ড. সেলিম জাহান: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ এই সুযোগ দেওয়ার জন্যে ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬


‘নানা দিক থেকে আমরা দরিদ্র হয়ে পড়েছি ’ -ড. সেলিম জাহান

প্রকাশের তারিখ : ২৬ জুন ২০২৬

featured Image

ডক্টর সেলিম জাহান। মূলত অর্থনীতিবিদ। কিন্তু লেখালেখির জগতে তার বিচরণ অনেক। চাকরি করেছেন জাতিসংঘের দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচিতে। দারিদ্র্য নিয়ে তার গবেষণাও রয়েছে। বাংলাদেশের দারিদ্র্য এবং এর মুক্তির উপায় নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটালের হেড অব নিউজ রাশেদ আহমেদ। আলাপচারিতা হুবহু তুলে ধরা হলো। 

রাশেদ আহমেদ : আলাপটা শুরু করি, এই ভূখণ্ড কখনো কি দারিদ্র্যমুক্ত ছিল?

ড. সেলিম জাহান: আসলে সারা বিশ্বেই কখনো দারিদ্র্যমুক্ত ছিল না। দারিদ্র্য নানা মাত্রিকতায় বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন মহাদেশে সবসময় ছিল। তবে যেটা হয়েছে সেটা হচ্ছে দারিদ্র্যের আপাতন বেড়ে গেছে। কোনো কোনো দেশের ৬০ শতাংশ, ৭০ শতাংশ বেড়ে গেছে। অতএব দারিদ্র্যের আপাতনটা ঊর্ধ্বমুখী। আর ২ হচ্ছে যে দারিদ্র্যের নানা মাত্রিকতা এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যেটা শুধু আয়ের ঘাটতি নয়, আমরা দেখতে পাচ্ছি যে শিক্ষায় স্বাস্থ্যের সুযোগে একটা বঞ্চনা রয়েছে। এবং যার জন্যে আমরা দারিদ্র্যকে নানা খাতে নানা মাত্রিকতায় দেখি। আর শেষ কথাটা হচ্ছে যে দারিদ্র্যের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় অসমতা বেড়েছে।

রাশেদ আহমেদ : আমি বলতে চাচ্ছি যে সোনার বাংলা বলা হয়। এই সোনার বাংলা কি কখনো সোনার বাংলা ছিল কি না, মানুষ সুখে-শান্তিতে বাস করতো কিনা, দারিদ্র্যমুক্ত ছিল কি না। আমি ওইখান থেকে আলাপটা শুরু করতে চাই।

ড. সেলিম জাহান: হ্যাঁ তো এখন এই যে সোনার বাংলা বলা হয় সেটার একটা হচ্ছে প্রতীকী ব্যাপার। আর সোনার বাংলা বলে সোনার মানুষও ছিল না সবাই কিংবা এই ভূখণ্ড সোনায় মোড়া ছিল এমনও ভাববার কোনো কারণ নেই। এবং তখন মানুষ সুখে-শান্তিতে ছিল কি না; আমি বলব ছিল এই কারণে যে মানুষের মধ্যে একটা স্বস্তি কাজ করেছে সেই সময়ে। বঞ্চনা ছিল, নিশ্চিতভাবে বঞ্চনা ছিল এবং আপনার জানা আছে যে এখানে নানা রকমের অত্যাচারের সম্মুখীন আমরা হয়েছি। ব্রিটিশ সময়ে হয়েছি পরবর্তী সময়ে জমিদারের উদ্ভব এবং জমিদার দ্বারা নিষ্পেষিত হয়েছে জনগণ। কিন্তু তারপরেও ওই যে বলা চলে যে দুমুঠোভাত, দুমুঠো অন্ন এটা মানুষের কিন্তু ছিল। একেবারে হাভাতে বা খাদ‍্যের জন্য মারা গেছে সেটা কয়েকটা দুর্ভিক্ষের সময় হয়েছে। 

রাশেদ আহমেদ : ওই দুর্ভিক্ষগুলো কি মানুষ সৃষ্ট ?

ড. সেলিম জাহান: পৃথিবীর সব দুর্ভিক্ষই মনুষ্য সৃষ্ট। কারণ দুর্ভিক্ষের প্রথম দিকে হয়তো প্রাকৃতিক কারণে হয় কিন্তু পরে মানুষ তার নিজের স্বার্থে কোনো কোনো গোষ্ঠী সেই দুর্ভিক্ষটাকে কাজে লাগায়। আপনি যদি বাংলার ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের দিকে তাকান, সেই সময় কিন্তু বাংলাদেশে ধান বা খাদ্যশস্যের কোনো অভাব ছিল না, সামগ্রিকভাবে। কিন্তু সেগুলোকে নানাভাবে সরিয়ে দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে গিয়ে একটা কৃত্রিম ঘাটতির তৈরি করা হয়েছে সেটা থেকে দুর্ভিক্ষ হয়েছে। আফ্রিকাতেও তাই, চীনেও তাই। তো আমি যদি আপনার ওই জায়গাটায় যাই যে সোনার বাংলা কেন বলা হতো, ১ হচ্ছে প্রতীকী অর্থে বলা হতো আর সোনার বাংলা বলা হতো যে মানুষের একটা স্বস্তিকর শান্তিপূর্ণ জীবন ছিল।

রাশেদ আহমেদ : আবার একটু বলুন, আপনি দারিদ্র্যকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ?

ড. সেলিম জাহান: আমার কাছে দারিদ্র্যের সংজ্ঞাটা হচ্ছে, বহু দিক থেকে এক ধরনের বঞ্চনা, যে বঞ্চনার কারণে মানুষ তার সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না, তার সক্ষমতা নষ্ট হয়। আমি একটা খুব ভালো কথা বহু আগে যেটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল, এক ব্রাজিলীয় রমণী আমাকে বলেছিলেন যে দারিদ্র্যের আসলে কোনো সংজ্ঞা নেই। দারিদ্র্য হচ্ছে আগুনের মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া। যে সেখান দিয়ে হেঁটে না গেছে সে কখনো দারিদ্র্যকে বুঝতে পারবে না।

রাশেদ আহমেদ : তাহলে এই অঞ্চলের দারিদ্র্য বলতে আপনার নিজস্ব কিছু ধারণা আছে, নিজস্ব কিছু সংজ্ঞা আছে, আমি সেই বিষয়গুলো জানতে চাচ্ছি।

ড. সেলিম জাহান: আমি দারিদ্র্যকে দুই দিক থেকে দেখি। এক দিক থেকে দেখি যে সুযোগের বঞ্চনা আর এক দিক থেকে দেখি ফলাফলের বঞ্চনা। তো সুযোগের বঞ্চনা বলতে আমি কি বোঝাচ্ছি? আমি সুযোগের বঞ্চনা বলতে বোঝাচ্ছি যে এই যে আমরা বলি আয় দারিদ্র্য, সম্পদের দারিদ্র্য। এই আয় দারিদ্র্য বা সম্পদের দারিদ্র্য সেই সময় পর্যন্তই যাবে যে সময় পর্যন্ত আমরা মানুষকে সুযোগ দিতে পারবো না। কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারবো না, সত্যিকার অর্থে উদ্যোগের সুযোগ দিতে পারবো না। এই সুযোগের একটা ঘাটতি যদি থেকে যায় সেখানে দারিদ্র্যের আপাতন হতে পারে। আর একটা হচ্ছে ফলাফলের দিক থেকে এবং ফলাফলের দিক থেকে আমি মনে করি যে সাধারণত অর্থনীতিবিদেরা সব সময় আয় দিয়ে দারিদ্র্য পরিমাপ করেন বা সম্পদ দিয়ে দারিদ্র্য পরিমাপ করেন। আমার মনে হয় বঞ্চনাটা শুধু আয় বা সম্পদে নয়, বঞ্চনাটা আসলে থাকে সুযোগে এবং শিক্ষার সুযোগে। একটা দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠী এক রকমের সুবিধা পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্যের সুযোগে আমরা জানি যে বাংলাদেশে ত্রিধারা চারধারার স্বাস্থ্য সুবিধা রয়েছে। একটা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তার চাইতেও যারা বিত্তবান তারা বাইরে গিয়ে স্বাস্থ্য সুবিধানিতে পারছেন। তো এই যে বঞ্চনাগুলো এগুলো আমার মনে হয় সুযোগের বঞ্চনা। সুযোগের বঞ্চনাকে যদি আমরা আরও একটু বিস্তৃত করি সেটা হচ্ছে যে আসলে শুধু মাত্র মানুষের কুশল বা বস্তুগত জিনিসের ঘাটতিই কিন্তু দারিদ্র্য নয়। আপনার যদি কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা না থাকে, আপনার যদি অংশ গ্রহণের স্বাধীনতানা থাকে, আপনার যদি সেই জায়গায় রাজনৈতিক অধিকারের যে বলয়টা সেটা যদি আপনার সীমিত থাকে তাহলেও কিন্তু আপনি বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সেটাও কিন্তু দারিদ্র্য। আর শেষ কথা যেটা আমি আরও একটু বিস্তৃত করি সেটা আমি মনে করি যে দারিদ্র্যের একটা বিশেষ মাত্রিকতা হচ্ছে মানুষের অসম্মান এবং মানুষের যে শ্রদ্ধার প্রাপ্তি সেটির যদি একটা ঘাটতি তৈরি হয়ে যায় এবং আমরা যদি মানুষকে যে অবস্থায় তিনি থাকুন না কেন, যে আর্থ-সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যেই তিনি পড়ুন না কেন তাকে যখন আমরা সম্মান না করব, তার প্রতি যখন আমরা শ্রদ্ধা না দেখাবো তাকে আমরা দরিদ্র করে দিই।

রাশেদ আহমেদ : আপনি যেগুলো বললেন এটার সমাধানটা কিভাবে আসবে ?

ড. সেলিম জাহান: এটার সমাধান নানা পর্যায়ে হবে। একটা পর্যায় হচ্ছে যে প্রথম এটার দায়-দায়িত্বটা পড়বে রাষ্ট্রের ওপরে। যেটাকে আমরা বলে থাকি যে রাষ্ট্র একটা পরিবেশ তৈরি করতে পারে। একটা উপরি কাঠামো তৈরি করতে পারে। সেই উপরি কাঠামো এবং পরিবেশ যদি দারিদ্র্য দূরীকরণের জন্যে না থাকে তাহলে কিন্তু দারিদ্র্য যাবে না। এটা গেল রাষ্ট্রের কথা। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের নীতিমালার মধ্যে এমন কিছু বিষয় থাকতে হবে যেটা অনেকে বলেন দারিদ্র্যবান্ধব, আমি বলি দারিদ্র্য অভিমুখী। কারণ দারিদ্র্য নিরসনের জন্যে কতগুলো নীতিমালা কতগুলো ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি এবং সেই জিনিসগুলো রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। যারা কোনো রকমের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড করতে পারছে না বিভিন্ন কারণে নানা রকমের প্রতিবন্ধকতা তাদের থাকতে পারে কিংবা তারা একেবারে প্রান্তিক মানুষ থাকতে পারেন তাদের দারিদ্র্য দূরীকরণে যে ধরনের সুরক্ষা বলয় বা সামাজিক সুরক্ষা বলয় প্রয়োজন আছে রাষ্ট্র সেটা দিতে পারছে কি না। গেল রাষ্ট্রের দিকে। 

সমাজের একটা ভূমিকা আছে এবং সত্যিকার অর্থে আমাদের এই উপমহাদেশের সমাজে সমাজ কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণে একটা বিরাট ভূমিকা পালন করেছে এবং রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন যে এখানে আমরা সবসময় রাষ্ট্র এবং সমাজের মধ্যে একটা পার্থক্য করেছি। রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বহুকিছু হয়েছে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নানা কিছু হয়েছে কিন্তু সেটা ভারতীয় সমাজ ব্যবস্থার যে মূল কাঠামো সেটাকে নষ্ট করতে পারেনি। সেই মূল কাঠামোর যদি একটা দিকে আমি আসি সেটা হচ্ছে দারিদ্র্য দূরীকরণের দিকে তাহলে দেখা যাবে যে সমাজে বিভিন্ন গোষ্ঠী কিন্তু তার যে দরিদ্র অন্যান্য গোষ্ঠী রয়েছেন তাদের সাহায্য করতে কিন্তু নানাভাবে এগিয়ে এসেছেন। সেটা দুর্যোগের সময়ও করেছেন সেটা শান্তির সময়ও করেছেন। প্রতিবেশী প্রতিবেশীর খোঁজ নিয়েছেন, প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে সাহায্য করেছেন। তো এই যে একটা সামাজিক বন্ধন, সামাজিক কাঠামো এটা দারিদ্র্যদূরীকরণে সাহায্য করে। আমাদের দেশে ইদানিং আমরা সামাজিক সুরক্ষার কথা বলছি, অর্থনৈতিক সুরক্ষার কথা বলছি আসলে আমাদেরতো ঠিক পশ্চিমা দেশের মতো এরকম সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। আমাদের পরিবার ছিল আমাদের সুরক্ষার একটা ঢাল, আমাদের সমাজ ছিল সুরক্ষার একটা বলয়। তো তারা একটা ভূমিকা পালন করেছে। আর তৃতীয় পর্যায়ে আমি মনে করি ব্যক্তি মানুষের একটা ভূমিকা আছে। অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণ বাদ দিয়ে সামাজিক কারণ বাদ দিয়ে এই যে দারিদ্র্যের যে মাত্রিকতা আমি বললাম যে মানুষকে সম্মান করা, মানুষকে অশ্রদ্ধা না করা, মানুষের প্রতি সহনশীল হওয়া, মানুষকে তার কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতাটা দেওয়া, তার কথা শোনা এই জিনিসগুলো কিন্তু আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে করতে পারি। কিন্তু অনেক সময় আমরা দেখিযে ক্ষমতার কারণে বা অর্থের কারণে আমরা অনেক সময় যারা প্রান্তিক মানুষ দরিদ্র জনগণ তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করি, তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেই না, মানুষ হিসেবে। এটা কিন্তু তাদেরকে দরিদ্রতর করে। এখানে আমার মনে হয় ব্যক্তি মানুষের একটা ভূমিকা আছে।

রাশেদ আহমেদ : আর একটি বিষয় সম্পদের সুষম বণ্টন না হলেই তো সেটি একটি দারিদ্র্য একটি শ্রেণিকে দরিদ্র করে দেয় নিশ্চিত। কিন্তু আমরা তো পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে আছি। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এটি এখন সম্ভব কি না?

ড. সেলিম জাহান: খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছেন এবং আমার মনে হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় আমরা সনাতনভাবে বলে এসেছি যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় পুঁজিপতিরাই লাভবান হবেন, শ্রমিকদেরকে শোষণ করবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আমার মনে হয় পুঁজিবাদের যে সনাতন যে সংজ্ঞা বা সনাতন যে কাঠামো সেটা পরিবর্তিত হয়েছে। এখন পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জন্য যে জিনিসটির সবচাইতে বিস্তার দরকার বা আমরা ঐতিহাসিক ভাবে দেখেছি সেটা হচ্ছে বাজার এবং মুক্ত প্রতিযোগিতা। বাজার এবং মুক্ত প্রতিযোগিতা না থাকলে পরে পুঁজিবাদ সম্প্রসারিত হতে পারে না। তো এর আগে সবাই বলেছেন অর্থনীতিরা বলেছেন যে বাজারে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া যাবে না। বাজারকে বাজারের মতো থাকতে দিতে হবে এবং সেখান থেকে যে লাভবান হবে সে লাভবান হবে। সাম্প্রতিককালে বা বেশ কিছুদিন ধরে আমরা যে কথাটা শুনেছি যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে কিংবা ধরা যাক ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে সেটা হচ্ছে যে কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের একটা ধারণা। এখন কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সবচাইতে বড় কাজ হচ্ছে যে আসলে যেখানে বাজার কাজ করছে যেখানে প্রতিযোগিতা কাজ করছে সেই জায়গাটাকে সমতল করে দেওয়া, যাতে সবার সেই সুযোগটা থাকে।

রাশেদ আহমেদ : যেটা ইউরোপের অনেক কান্ট্রিতে সেগুলো আছে। হ্যাঁ করেছেওতো।

ড. সেলিম জাহান: যেমন জার্মানিতে আছে। এগুলোতে রাষ্ট্র করতে পারে। যেমন জার্মানিতে বলুন, যুক্তরাজ্যে বলুন বা নরওয়ে, সুইডেনে বলুন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটা সবার জন্যে অবারিত। শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো রকমের ত্রিধারা চতুর্ধারার ব্যবস্থা নেই, একই রকমের শিক্ষা ব্যবস্থা। একটা পর্যায় পর্যন্ত রাষ্ট্র জনগণের স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার দায়-দায়িত্ব নেয়। এখন এটার জন্য যে অর্থায়নের দরকার সেই জন্য সেই সমস্ত দেশে কিন্তু করের হারও অত্যন্ত বেশি। আপনি যদি নরওয়ে বা সুইডেনে যান আপনার আয়ের ৪০ শতাংশ আপনাকে কর হিসেবে দিতে হচ্ছে ।

রাশেদ আহমেদ : যার আয় বেশি তার কর বেশি।

ড. সেলিম জাহান: বেশি হচ্ছে। কিন্তু কর নিয়ে রাষ্ট্র এগুলোকে অন্য জায়গায় খরচ করছে না। ওই করের বিনিময়ে আপনি কতগুলো সুবিধা পাচ্ছেন সার্বজনীন সুবিধা পাচ্ছেন সেবার এবং স্বাস্থ্য সেবার শিক্ষাসেবার সুতরাং ওই জায়গায় কিন্তু আর আপনার খরচ নেই।

রাশেদ আহমেদ : আমাদের দেশে এখন একটি বড় জনগোষ্ঠী বেকার। এই যে বেকার কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না পাচ্ছে না এটা জনসংখ্যা একটি বড় বাধা?

ড. সেলিম জাহান: আমার মনে হয় আপনি তিনটে দিকে উল্লেখ করেছেন একটা হচ্ছে যে জনসংখ্যার একটা চাপ আছে। এই চাপ বহু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বহু নীতিমালাকে কিন্তু ভঙ্গুর করে দেবে। এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আবার জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ কিন্তু তরুণ এটাও খেয়াল রাখতে হবে। তো স্বাভাবিকভাবেই জনসংখ্যার এইচাপটা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বা বেকারত্ব দূরীকরণের ক্ষেত্রে একটা বড় চাপের সৃষ্টি করবে। এবং একটা কথা এখানে টিকা হিসেবে আমি ব্যবহার করতে চাই জনসংখ্যার হার কিন্তু বাংলাদেশে এখন বাড়ছে। বহু দিন যাবত প্রায় ধরা যাক ৩০-৪০ বছর যাবত জনসংখ্যার হারটা কমে এসেছিল এবং বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে যে এটা ২ দশমিক ১ এ আর থাকছে না।এটা বেড়ে যাচ্ছে। এটা একটা শঙ্কার বিষয়। দ্বিতীয়ত যে দুটো অন্য বিষয় আপনি বলেছেন যে এই যে বেকারত্ব কর্মসংস্থানের যে একটা ঘাটতি আছে কোত্থেকে আসছে। এটা দুদিক থেকে আসছে কারণ একটা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চাহিদার একটা ব্যাপার আছে আপনার যোগানের একটা ব্যাপার আছে। এখন চাহিদার দিক থেকেই অর্থনীতির মধ্যে আমরা জানি যে নানা রকমের পরিবর্তন হচ্ছে কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা যদি শিল্পের দিকে তাকাই শিল্পের কাঠামো উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন হচ্ছে। আমরা যদি কৃষির দিকে তাকাই যেটা দীর্ঘদিন যাবত বাংলাদেশে অবহেলিত। কৃষিতে একটা সুযোগ আছে কিন্তু সেটার আপনার সদব্যবহার করছে না। আমরা মূলত বাণিজ্য এবং সেবাখাত দিয়েই কিন্তু চলছি। এবং বাংলাদেশে জাতীয় আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি সেবা খাত বা বাণিজ্য খাত থেকে এসেছে। তো এভাবেই যদি চলে তাহলে পরে দেখা যাবে যে চাহিদার দিক থেকে যে জাতীয় চাহিদা আছে সেটা আমরা মেটাতে পারছি না। কারণ চাহিদা তো বদলাচ্ছে এবং এই চাহিদা আরও বদলাবে। যতই পৃথিবীর অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাঠামো বদলাবে তার সাথে চাহিদা বদলাবে। আমরা তথ্য প্রযুক্তির জগতে বাস করছি তথ্য প্রযুক্তিতে প্রচুর লোক লাগছে সেখানে চাহিদা বদলাবে। আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কথা বলছি কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা যদি আজকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে আরও ব্যবহৃত হয় সেখানে একটা বেকারত্ব দেখা দেবে। তো সুতরাং আমাদের মানব সম্পদের একটা পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে যে এই যে চাহিদা বদলাচ্ছে এই চাহিদার সঙ্গে আমরা কি তাল মেলাতে চাচ্ছি, পারছি কিনা। আমরা কি এখনো সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি আমরা কি বিভিন্ন বিষয় যেগুলো আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে পড়ানো হয় তার চাহিদা বিদেশে আছে কি না। কারণ আপনি যদি বিভিন্ন উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পখাতের সেবা খাতের তারা কিন্তু প্রায়ই বলে যে যে জাতীয় দক্ষতার তাদের প্রয়োজন সে জাতীয় দক্ষতা তারা পারছে না। আমরা মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠাচ্ছি, অদক্ষ শ্রমিক। দক্ষ শ্রমিক নয়। তো যেখানে শ্রীলঙ্কা ভারত ফিলিপাইন তারা দক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছে এবং সেই সমস্ত দক্ষ শ্রমিকের আয় কিন্তু অদক্ষ শ্রমিকের চাইতে অনেক বেশি। গত ৪০ বছর যাবত আমরা শ্রমিক পাঠাচ্ছি মধ্যপ্রাচ্যে এখনো পর্যন্ত আমরা দক্ষ শ্রমিক পাঠাতে পারছি না। আমি পেশাজীবীদের কথা বলছি না আমি দক্ষ শ্রমিকের কথা বলছি। তো সেইজন্য আমার মনে হয় চাহিদার যে একটা মূল্যায়ন দেশে কি প্রয়োজন, বিদেশে কি প্রয়োজন সেটা আমাদেরকে দেখতে হবে। আপনি সনদ দিয়ে ছাত্রছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বার করে দিচ্ছেন প্রশ্ন হচ্ছে যে জাতীয় দক্ষতা তাদের অর্জন করার কথা ছিল সেই দক্ষতা তারা পেয়েছে কি না।

রাশেদ আহমেদ : তাহলে তো সাবজেক্ট পরিবর্তন করতে হবে, যুগোপযোগী সাবজেক্ট যুক্ত করতে হবে।

ড. সেলিম জাহান: নিশ্চয়ই এখন আপনি যদি দেখেন এর মধ্যে কিএকটা সমীক্ষা হয়েছে সেটা দেখা গেছে যে ইংরেজিতে যারা বিশ্ববিদ্যালয়থেকে পাশ করে বের হয় তাদের চাহিদা অনেক বেশি। কারণ ভালো ইংরেজি জানা লোক আপনার শুধুমাত্র যে আন্তর্জাতিক সংস্থায় লাগবে তা নয় এটা কিন্তু উদ্যোক্তাদেরও লাগবে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানে লাগছে। কারণ আপনি তো শুধু ব্যবসা আপনার দেশের চৌহদ্দির মধ্যে করছেন না আপনি বিদেশের সঙ্গে করছেন। তারপরে ধরা যাক যেটাকে আমরা বলি যে বিজ্ঞান প্রযুক্তি অংক কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা এই ব্যাপারগুলো সেখানে আপনার লাগবে। শিক্ষাকে এতদিন পর্যন্ত আমার একটা মর্যাদামূলক জায়গায় রেখে দিয়েছি। আমরা প্রচুর মানুষকে শিক্ষা ব্যবস্থায় নিচ্ছি, প্রচুর ছাত্রছাত্রীকে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সার্টিফিকেট দিচ্ছি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে সেই সমস্ত শিক্ষার গুণগত মান কি। এটা কোনো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই আপনি যদি রাস্তাঘাটে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলেন সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেন সর্বস্তরে শিক্ষারগুণগত মান পড়ে গেছে। সুতরাং আপনার প্রশ্নের জায়গায় যদি আসি তাহলে এই যে কর্মসংস্থান বেকারত্বের জন্যে আমার মনে হয় চাহিদার দিকটা দেখতে হবে এবং চাহিদাতে যে ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন তার একটা মূল্যায়ন করে আমাদেরকে ভাবতে হবে সেই চাহিদা দেশের মধ্যে দেশের বাইরে।

রাশেদ আহমেদ : আর একটি বলছিলেন আপনি জনসংখ্যা। আমাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে বলছিলেন। কিন্তু এই যে তরুণ একটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে অনেকে বলে যে এটা আমাদের সম্পদ । আমি বিভিন্ন জনের কাছ থেকে শুনেছি গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ডক্টর ইউনুস বলেছিলেন এটি বিশাল একটি অ্যাসেট। তার আগের সরকারের সময় শুনেছি আপনার কাছে কি মনে হয় এটা অ্যাসেট নাকি বোঝা।

ড. সেলিম জাহান: এটা নির্ভর করবে আপনি এটাকে কিভাবে ব্যবহার করবেন। আমরা সবসময় জনমিতিক লভ্যাংশের কথা বলে থাকি এবং বলে থাকি যে তরুণেরাই হচ্ছে আমাদের সম্পদ। কিন্তু তরুণেরা আপনার সম্পদ হতে পারে তরুণেরা আপনার দায়ও হতে পারে। এবং এটা নির্ভর করবে আপনি এই তরুণদের জন্য তরুণদেরকে কিভাবেব্যবহার করছেন। বহু ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে তরুণেরা রাজনৈতিক কারণে ব্যবহৃত হয়েছে। এটা সত্য কথা। এবং তরুণদেরকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহার করার জন্য আমরা তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছি আমরা তাদের মূল্যবোধ নষ্ট করেছি এবং আমরা তাদের লক্ষ্যকে অন্যভাবে অন্য দিকে চালিত করেছি। আজকের তরুণেরা আপনি যদি রাস্তায় কথা বলেন বা অন্য জায়গায় কথা বলেন তাদের অনেকেই ভাবছে যে শিক্ষার কি দরকার আছে। আমি যদি একটা মব তৈরি করে এক ঘণ্টার মধ্যে ১ কোটি টাকা পেয়ে যেতে পারি কিংবা আমি যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে অথবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যদি মাসে ১০ লাখ টাকা করে যদি আয় হয় তাহলে আমি লেখাপড়া করে কি করব। এটা অনেকেই বলছেন এবং যার জন্য তরুণেরা কিন্তু বর্তমান অবস্থায় শিক্ষা বিমুখ হয়ে গেছে। যেমন আমি এটা যদি বলি যে এই যে জুলাই অভ্যুত্থান হয়ে গেল। জুলাই অভ্যুত্থান হওয়ার পরে আমরা একটা জায়গায় দাঁড়ালাম। সেক্ষেত্রে সবচাইতে যেকথাটা প্রথমে বলা উচিত ছিল যারা তরুণ এই অভ্যুত্থানের মূল চালিকাশক্তি তাদেরকে বলা উচিত ছিল তোমরা তোমাদের কাজ করেছ তোমরা এখন তোমাদের যে জায়গায় তোমরা ছিলে সেই জায়গায় ফেরত যাও। আমরা তো সেটা করিনি নেপালে তো সেটা করেছে। নেপালে অভ্যুত্থানের পরেই বলা হয়েছে যে তোমরা তোমাদের বিশ্ববিদ্যালয়বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় ফেরত যাও। বাকি যেটা এটা আমরা করছি। কিন্তু আমরা তো তরুণদেরকে বলেছি যে তোমরাই সম্পদ তোমরাই ভবিষ্যৎ আমরা আমাদেরকে তোমরাই প্রতিষ্ঠিত করেছ এবং তোমরাই বললে আমরা চলে যাব। এই জাতীয় একটা কথা বললে পরে আপনি তরুণদের ভূমিকাটা সেটাকে কিন্তু আপনি নষ্ট করছেন। তাদের একটামহৎ এবং আমি মনে করি যে একটা উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল যে ভূমিকানিয়ে আমরা গর্ব করতে পারতাম। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের যেকর্মকাণ্ড এবং তারা যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দিয়ে তাতে কিন্তু তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে শ্রদ্ধাবোধ তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের যে সৌহার্দ্য সেটা কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট হয়ে গেছে।

রাশেদ আহমেদ : তরুণরা ক্ষমতার অংশীদার হলো কেন, এটা তাদেরও একটা যুক্তি আছে সেই যুক্তিটা তারা এভাবে বলে তা না হলে তো রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না, টার্গেট নিয়ে রাষ্ট্র যাচ্ছে না এবং রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন দরকার রাষ্ট্রের অনেক কিছুর পরিবর্তন দরকার সেটির জন্য তারা ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। 

ড. সেলিম জাহান: না এখন এই যে আপনি কথাটা ব্যবহার করলেন যে ক্ষমতার অংশীদার হওয়া মানে অংশীদারী হওয়া। ক্ষমতার অংশীদার কিন্তু নানাভাবে হওয়া যায় সেটা ক্ষমতার ভেতরে থেকে আপনি অংশীদার হতে পারেন ক্ষমতার বাইরে থেকেও আপনি অংশীদার হতে পারেন। এখন যদি তরুণদের ভূমিকাটা যদি এই হতো যে আমরা ক্ষমতার ভেতরের মধ্যে ঢুকব না কিন্তু আমরা ক্ষমতার বাইরে থেকে যাচাই-বাছাই করব আমরা একটা খবরদারি রাখব যেটা বলা চলে  নাগরিক সমাজ করে থাকে। তরুণেরা যদি সেই ভূমিকাটা নিত যে আমরা ক্ষমতা কিভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে রাষ্ট্র কিভাবে চলছে সরকার কিভাবে চলছে সেটার ওপরে আমরা নজর রাখব। এবং যে সমস্ত লক্ষ্য নিয়ে যে সমস্ত মূল্যবোধ নিয়ে অভ্যুত্থান হয়েছিল সেটা সত্যিকার অর্থে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না সেটার দিকে আমরা নজর রাখব। তাহলে কিন্তু ক্ষমতায় তাদের ভূমিকা কিন্তু অনেক বড় হতো এবং তারা আরও বেশি শক্তিশালী হতো।

রাশেদ আহমেদ : কি ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে এই জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল আপনি যেটি বলছিলেন?

ড. সেলিম জাহান: প্রথমেই যেটার কারণে জুলাই অভ্যুত্থানটা আসলো দু তিনটে কারণের প্রথমটা বলছি সেটা হচ্ছে যে একটা অসমতার ব্যাপার একটা বৈষম্যের ব্যাপার সেটাতো প্রথমেই শুরু হয়েছিল। এখন সেই বৈষম্যটা আমরা বলে থাকি যে কোটা বৈষম্য নিয়ে শুরু। কিন্তু পরে যেটা স্থাপিত হলো যে বৈষম্যটা শুধু কোটার মধ্যে নয় বৈষম্যটা সারা সমাজে এবং অর্থনৈতিক সুযোগে বৈষম্য আছে সুবিধায় বৈষম্য আছে একটা গোষ্ঠী পুরো রাষ্ট্রকে লুণ্ঠন করে নিয়ে গেছে অন্যরা বলা চলে বঞ্চনার শিকার হয়েছে সেটা একটা মূল্যবোধ আছে। দ্বিতীয়ত যে কথাটা আমি আগে বলেছি আবারও এখানে আসি যে মানুষ সবসময়চায় একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশে থাকতে। মানুষ সবসময় চায় এমন একটা পরিবেশের মধ্যে বসবাস করতে যেখানে তার কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা আছে যেখানে সে বলতে পারে। এখন এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে নাযে গত ১৫-১৬ বছর যাবত আমরা দেখেছি যে একটা অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বারবার ভাঙা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে যে জাতীয় সুশাসন জবাবদিহিতা দৃশ্যমানতা থাকা দরকার সেটা হয়নি। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে যে উপাত্ত ব্যবহার করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হচ্ছে সেই উপাত্ত কতখানি গ্রহণযোগ্য সেটা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সুতরাং এক ধরনের অর্থনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে রাজনৈতিক স্বেচ্ছাচারিতা হয়েছে। আর তৃতীয়তআমার মনে হয় যে মূল্যবোধটা হয়েছিল যে অর্থনৈতিক দিক থেকেএকটা শৃঙ্খলা আসবে একটা কাঠামোগত সুশাসন আসবে এক ধরনের দৃশ্যমানতা এবং এক ধরনের জবাবদিহিতা থাকবে।

রাশেদ আহমেদ : সেটি কি হয়েছে এই ২৪ এর পরে?

ড. সেলিম জাহান: না হয়নি। নিশ্চয়ই হয়নি। এটারও অনেক কারণ আছে একটা কারণ হচ্ছে যে আপনার প্রথমেই বলতে হবে যে একটিঅন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ কি তার এক্তিয়ার কতখানি সেটাআপনাকে দেখতে হবে। আমি মনে করি যে একটা অন্তর্বর্তীকালীনসরকারের যেটা নেপালেও দেখা গেছে এক্তিয়ার হচ্ছে যে একটি সুষ্ঠু জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন আয়োজন করা যার ফলে একটা স্বাভাবিক রাজনৈতিক উত্তরণ হয়ে একটি জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেওয়া। এইটা হচ্ছে তার মৌলিক এক্তিয়ার। আমরা তো দেখেছি যে এই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েএই এক্তিয়ারের বাইরে বহু কিছু করা হয়েছে। যে সমস্ত সংস্কারের পেছনে সংসদের অনুমোদন লাগবে সেই সমস্ত সংস্কারের মধ্যেও অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে ঢুকেছে। আচ্ছা গেল একটা এই ব্যাপার। দ্বিতীয়ত রাজনৈতিক দিক থেকে তারা যতখানি সক্রিয় ছিল অর্থনীতিকে ঠিককরার ব্যাপারে তাদের মনোযোগ সেইভাবে ছিল না। তো এটা যদি নাথাকে তখন পর্যন্ত তখন দেখা গেছে যে সাধারণ মানুষ কিন্তু নানা রকমের চাপের শিকার হয়েছে। আপনি মূল্যস্ফীতির কথা বলেন মূল্যস্ফীতির চাপের শিকার হয়েছে সেবার যে প্রসারণ ছিল সেবাটা সংকুচিত হয়েছে। আজকে যে হামের আমি এটাকে অতিমারিই বলি মহামারিও না এটা অতিমারি আমরা দেখতে পাচ্ছি এটা এখন দেখা যাচ্ছে যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টিকা ব্যবস্থা দেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের শিশু প্রতিষ্ঠান থেকে বলা হচ্ছে পাঁচ বার ১০ বারসরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে তারা এটা করেনি। তো সুতরাং স্বাভাবিকভাবে যে জাতীয় কার্যক্রম তাদের করার কথা ছিল সেটাকরেনি। তৃতীয় এবং শেষ কথাটা হচ্ছে একটা অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই বিদেশের কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করতে পারে না যে চুক্তির নানা রকমের দিক থাকবে যেগুলো গোপনীয়তার মধ্যে থাকবে এটা করা যেতে পারে না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদকাল শেষ হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই জাতীয় একটা চুক্তি হয়েছে। একটা বাণিজ্য চুক্তি হতে পারে কোনো অসুবিধা নেই একটা বাণিজ্য চুক্তি দৃশ্যমান বাণিজ্য চুক্তি একটা দেশেরসঙ্গে আরেকটা দেশের হতেই পারে। এবং সেখানে শুল্কের তারতম্য থাকতে পারে সুবিধার তারতম্য থাকতে পারে হতে পারে। সেটার জন্য যদি আমাদের সুবিধা কম হতো আমরা হয়তো সমালোচনা করতে পারতাম। কিন্তু একটা বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে তার পেছনে নানা রকমের গোপনীয়তার চুক্তি হয়েছে যেখানে আমাদের বহু কর্মকাণ্ড আমরা একটি দেশের অনুমোদন ছাড়া করতে পারব না। এবং সেই কর্মকাণ্ডগুলো অর্থনৈতিক নয় অর্থনীতির বাইরে। তো এটা যখন হয়ে যায় তখন তো সত্যিকার অর্থে আপনার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে আপনি বিক্রি করে দিলেন। এবং এর ফলে যেটা হয়েছে যে আজকে যে নির্বাচিত সরকার এসেছে তারা বহু দিক থেকে তাদের হাত পা বাধা।

রাশেদ আহমেদ : কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অনেকে বলেছে যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনার ভিত্তিতেই হয়েছে এই চুক্তিটা।

ড. সেলিম জাহান: কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তো সরকার নয় রাজনৈতিক দলগুলো তো সংসদও নয়। রাজনৈতিক দলের সাথেআপনি আলাপ করতে পারেন কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো তো একটাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে না। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না একটা সরকার এবং একটা সংসদ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক। এখন আপনিরাজনৈতিক দলের সাথে করলে এটা করতে পারেন আপনি পেশাজীবী সমিতির সঙ্গে আপনার আলাপ আলোচনা করতে পারেন আপনি সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করতে পারেন কিন্তু সেটা আপনার কাজ এবং আপনার কার্যবিধিকে বৈধতা দেয় না। কেন তারা এই জাতীয় কাজ করলেন এবং সেখানে কোনো রাজনৈতিক কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না এইটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। 

রাশেদ আহমেদ : তো এই যে সংস্কার তারা বলছিল যে সংস্কার কিছু করতে হবে কারণ রাজনৈতিক দলগুলো 

এটি করেনা। তাই সংস্কারের উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছিলো। আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

ড. সেলিম জাহান: না আমি এটা এভাবে ব্যাখ্যা করব যে আপনি সেই জাতীয় সংস্কার করবেন যে জাতীয় সংস্কার আপনার একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে প্রয়োজন। আপনি নির্বাচন কমিশনেরসংস্কার করবেন অবশ্যই, আপনি নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার যদি প্রয়োজন হয় অবশ্যই করবেন। নিত্যনৈমিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হলে যে জাতীয় সংস্কার করতে হবে অবশ্যই। আপনি তো করের আওতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো সংস্কার করলেন না। আপনি তো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এটাকে মানে বিভাজিত করার জন্যে যে সংস্কার করতে চেয়েছিলেন আপনি সেটা করলেন না। তো যে সংস্কার প্রয়োজন ছিল সেগুলো আপনি করলেন না কিন্তু আপনি এমন সংস্কারের জায়গায় গেলেন যে সংস্কারগুলো আপনার আওতার বাইরে এক্তিয়ারের বাইরে তখন তো জিনিসটা একটা অন্য রকমের হয়। সংস্কারের দোহাই দিয়ে আমি কাজ করেছি এই কাজগুলো করেছি এটা হতে পারেনা। তাহলে পরে আপনি সংস্কারগুলো ওই জায়গায় করতেন যে সংস্কারগুলো আপনার যে কাজের যে পরিধি এবং যে কাজের জন্যে অন্তর্বর্তী সরকারকে আমরা নিয়ে এসেছি সেই কাজগুলো করার জন্যে যে সংস্কার সেগুলো তো আপনার করতেই হচ্ছে সেই জায়গায় আপনি যাননি আপনি সংস্কার অন্য জায়গায় করতে গেছেন এবং তাতে বৈধতা দেওয়ার জন্যে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনার কথা বলেছেন একাধিক কমিশন আপনি গঠন করেছেন নানা রকম শ্বেতপত্র বার করেছেন যেগুলো এখন প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে ইত্যাদি আপনি করেছেন। এত সংস্কারের কথা বলা হলো এত সংস্কার করা হলো কই শিক্ষা সংস্কারের জন্য তো কোনো কমিশন গঠন করা হয়নি। আপনি যদি আজকে বাংলাদেশের সব সমস্যার মধ্যে আমাকে একটা সমস্যাকে চিহ্নিত করতে বলেন আমি তো বলব যে শিক্ষার সমস্যা। ওটা যদি আমরা সমাধান করতে পারি বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। নারীর জন্যে সংস্কার কমিশন করেননি।

রাশেদ আহমেদ : নারীর জন্যে করেছে কিন্তু বাস্তবায়ন করা যায়নি।

ড. সেলিম জাহান: বাস্তবায় করে তো করেনি হ্যাঁ সেটি আচ্ছা ঠিক আছে করেছে। শিক্ষার জন্যে কোনো সংস্কার কমিশন হয়নি কৃষির জন্যে কোনো সংস্কার কমিশন হয়নি। তো এটাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

রাশেদ আহমেদ : তাহলে কেন তারা এই সংস্কার সংস্কার কাজগুলো করতে গেছে?

ড. সেলিম জাহান: এটা অনেক কারণে হয়েছে কারণ কথা হচ্ছে যে তাদের পেছনেও তো বহু লোকজন ছিল যারা এই সংস্কারের ধোয়া তুলেবহু কিছু অর্জন করতে চেয়েছে তাদের হয়তো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল এবং আমরা যে বহু প্রস্তাব পরবর্তী সময়ে আমরা দেখেছি সেইগুলো একটা জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সংসদে আলোচিত হয়ে বিবেচিত হয়েভোটের মাধ্যমে সেগুলো আইনে পরিণত হবে এবং সেগুলো তারপর বাস্তবায়ন করা হবে। এখন সংস্কার নিয়ে একটা ব্যাপার হচ্ছে যে অনেক মানুষের নানা রকমের উদ্দেশ্য ছিল সেগুলো তারা সাধন করতে চেয়েছেএটা একটা হতে পারে। আর একটা হচ্ছে যে সংস্কারের কথা বলে সংস্কারের কথা বারবার উচ্চারণ করে তারা তাদের যে আসল কাজ সেটাথেকে মানুষের দৃষ্টি দূরে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে সেটাও হতে পারে। সুতরাং এটা কি কারণে এই সংস্কার নিয়ে কথা হয়েছে এটা বলা খুব মুশকিল। আপনি জানেন যে সংবাদপত্র বা সংবাদ মাধ্যমের জন্যে একটা সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছিল কামাল আহমেদ সেটারনেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কামাল আহমেদ নিজে বলেছেন যে ওই সংস্কার কমিশনের কোনো কিছুই বাস্তবায়ন করা হয়নি। এটা বোধহয় সব সংস্কারকমিশনের ক্ষেত্রে সত্য। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটা শ্বেতপত্র বারকরা হয়েছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির কি অবস্থা সেটার ওপরে। দেবপ্রিয় নিজেও বলেছে যে এটার কোনো কিছুই আলোচিত হয়নি বা এটাকরা হয়নি। সুতরাং শেষ পর্যন্ত তো আমরা দেখেছি যখনঅন্তর্বর্তীকালীন সরকার চলে গেছে সংস্কার কমিশনের রিপোর্টগুলো রয়েগেছে কিন্তু সেই ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি কোনো জায়গাতেই আমরাদেখতে পাচ্ছি না।

রাশেদ আহমেদ : তারা তো জনগণের সমর্থনের জন্যে একটি গণভোটও দিয়েছেন যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করি যে গণভোটটা আসলে সঠিক হয়েছে কি না?

ড. সেলিম জাহান: প্রথমত যতদূর আমি জানি আমি সংবিধান বিশেষজ্ঞ নই কিন্তু বাংলাদেশ সংবিধানে কোনো গণভোটের ব্যবস্থা নেই এক সময় ছিল তারপর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গণভোট কখন দেওয়াহয়? গণভোট দেওয়া হয় সাধারণত যে আপনি একটা বিষয় সংসদেআলাপ আলোচনা করছেন সে বিষয়ের কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছে না এবংসংসদ মনে করছে যে তারা জনপ্রতিনিধি হিসেবে এটার কোনো নিষ্পত্তি করতে পারছে না তারা জনগণের কাছে যেতে হবে। তখন গণভোট হয় যেসংসদ এটার কোনো নিষ্পত্তি করতে পারছে না যে কোনো কারণেই হোকএবং জনগণের রায় নিতে হবে তখন গণভোট করা উচিত। এই গণভোটতো আপনি নিজের থেকে ঠিক করেছেন যে একটা গণভোট হবে। তো এইগণভোটে সেই জন্য এই গণভোট সম্পর্কে যারা সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞতারা অনেক ভাবে প্রশ্ন করেছেন এবং আপনি এখন দেখতে পাচ্ছেন যেসংসদের মধ্যে বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে কিন্তু এই গণভোটসম্পর্কে উচ্চবাচ্য অনেক কম। অতএব আগামীতে কি হবে গণভোটসম্পর্কে এ সম্পর্কে প্রশ্ন আছে। তারপরে শেষ কথা যেটা বলছি গণভোট সাধারণত একটা প্রশ্নের ব্যাপারে হ্যাঁ কিংবা না। যেমন আপনি ‘ক’ কে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখতে চান কি তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাখতে চান না অথবা ‘ক’ এর প্রতি আপনার জনসমর্থন আছে কি না রাষ্ট্রপতির প্রতি অথবা না হ্যাঁ কি না। সবাই বলেছেন এটার মধ্যে চারটা ব্যাপার ছিল। চারটা ব্যাপারের মধ্যে অনেকগুলো বিষয় ছিল। এখন যে জায়গায় আপনার অন্ত দ্বন্দ্বমূলক ব্যবস্থাটা চলে আসছে সেটা হচ্ছে যে কেউ যদি মনে করেন যে আমি তিনটে হ্যাঁ একটা না বা দুটো হ্যাঁ আর দুটো নাতাহলে তিনি কিভাবে ভোট দেবেন? হয় তাকে পুরোটা হ্যাঁ বলতে হবেঅথবা তাকে পুরোটা না বলতে হবে তো আপনি তো মানুষের গণভোটের যে গণতান্ত্রিক অধিকার সেটার ওপরে আপনি চড়াও হয়েছেন। তাহলেপরে এটা কিভাবে আপনি গণভোটকে বৈধতা দেবেন বা যৌক্তিক বলে মনে করবেন?

রাশেদ আহমেদ : আপনি যেটি এর আগে বলছিলেন যে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছে একটি মূল্যবোধের ওপরে ভিত্তি করে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান হলো ৫ ই আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটল। তারপরে দেখলাম রাতারাতি বাংলাদেশের অনেক ম্যুরাল ভাঙা হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করা হলো। তো এটাকে মূল্যবোধের সাথে মেলাতে পারছি না। আপনি কি মেলাতে পারছেন?

ড. সেলিম জাহান: না আমি মেলাতে পারছি না। আমি মেলাতে পারছিনা এবং এটার মানে অনেকে যেভাবে ব্যাখ্যা করে থাকেন অভ্যুত্থান যেটাহয়েছে আমরা জানি যে এটা কোনো সমসত্ত্ব সম্পন্ন একটা দল করেনি একটা গোষ্ঠী করেনি। এখানে নানা রকমের গোষ্ঠী এবং নানা রকমের দল তাদের নানা রকমের মত এবং তাদের নানা রকমের উদ্দেশ্য নিয়ে একত্রিত হয়েছে এবং সেখানে একটা যেটা আমি বলব যে সবাই যেটাতেঅভিন্ন মত ছিল সেটা হচ্ছে যে এই একটা স্বৈরাচারমূলক একটা ব্যবস্থারঅবসান করতে হবে। কিন্তু এইটা করতে গিয়ে এই যে বিভিন্ন দল এবংবিভিন্ন মতের মধ্যে যে মতপার্থক্য আছে তারই একটা দল হতে পারেউপদল হতে পারে তারা এই যে একাত্তরের যে চেতনা বা মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম এটার বহু কিছুই হয়তো তারা আত্মস্থ করতে পারেনি। এবং এটা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে আমাদেরমুক্তিযুদ্ধের সময় একটা দল একটা গোষ্ঠী ছিল যারা বাংলাদেশের অস্তিত্ব বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে স্বীকার করেনি এবং পরবর্তী সময়েও স্বীকার করেনি। তো সেই কারণে তাদের পক্ষে হয়তো এই যে ম্যুরাল ভাঙাএই যে নানা রকমের লুণ্ঠন এবং এই যে নানা রকমের কার্যকলাপ যেগুলোকে আপনি সমর্থন করতে পারেন না এটা হয়েছে। নেপালে তো এটা হয়নি। নেপালে প্রথম থেকেই সরকার বলে দিয়েছিলেন যে আর যাইকরা হোক ভালো কথা অভ্যুত্থান হয়েছে ইত্যাদি কিন্তু কোনো মন্দির বামূর্তি কিন্তু ভাঙা যাবে না। তো আমাদের এখানে তো আমরা অনেক সময় অনেকেই বলেছেন যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেপারতেন কিন্তু সেটা তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তো এই যে ম্যুরাল ভাঙা এটার একটা রাজনৈতিক দিক আছে এটার একটা হয়তো সাংস্কৃতিক দিকও আছে। এবং অনেক যারা অত্যন্ত চরমপন্থী কোনো একটা ধর্মবিশ্বাসে বিশ্বাস করেন তারা ভেঙেছেন অনেকে রাজনৈতিক কারণে ভেঙেছেন। সুতরাং আমি মনে করি যে এটা আসলে ওই যে অভ্যুত্থানের সময় যে সমাবেশ বা অভ্যুত্থানের সময় যে দলগুলো সামনেগিয়েছিল তাদের মধ্যে তাদের বিশ্বাসে তাদের মূল্যবোধে তাদের লক্ষ্যেরমধ্যে যে বিভাজন সেই বিভাজনেরই একটা প্রতিফলন আমরা দেখেছি।

রাশেদ আহমেদ : নতুন একটি সরকার এসেছে নির্বাচনের মাধ্যমেই তো আসলো এবং অনেক ভোটে তারা জয়ী হয়ে এসেছে। তাদের অর্থনৈতিক আউটলুকটা এখন কেমন দেখছেন তারা কোন দিকে যাচ্ছে যেহেতু আপনি অর্থনীতিবিদ।

ড. সেলিম জাহান: আমি মনে করি যে অর্থনৈতিক দিক থেকে তাদের যে ব্যবস্থাগুলো তারা এই পর্যন্ত নিয়েছেন তার একটা বড় অংশ হচ্ছে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কি ছিল। যেমন আমরা ফ্যামিলি কার্ডের কথাদেখেছি কৃষক কার্ডের কথা দেখেছি। এবং সেটা আমি মনে করি যেএকটা সামাজিক সুরক্ষাকে আরও ভালো ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করারজন্যে তারা এটা বলেছেন। সুতরাং এটার ফলে প্রান্তিক মানুষ দরিদ্রমানুষ উপকৃত হবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখা দরকারযে এই সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে সঙ্গে অর্থনীতিতে একটা গতিময়তারসৃষ্টি করতে হবে। কারণ সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজনীয় কিন্তু এটা পর্যাপ্তশর্ত নয়। দারিদ্র্য থেকে মুক্তির জন্যে আমাদের আয় বাড়ানোর জন্যেমাথাপিছু এবং সার্বিক আয় বাড়ানোর জন্যে আমাদের অর্থনীতিতেএকটা গতিময়তা সৃষ্টি করতে হবে। এবং বর্তমানে আমাদের অর্থনীতি যেজায়গায় আছে খুব মোটা দাগে যদি বলি যে আমাদের প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কম। আমাদের উৎপাদনে যেখানে আমরা ছিলাম সেখানেএখনো আমরা যেতে পারছি না। বহু কলকারখানা এখনো বন্ধ। আমাদের পোশাক শিল্পের রপ্তানিও স্থবির। আমাদের কর্মসংস্থানেরক্ষেত্রে একটা ঘাটতি রয়েছে। সুতরাং অর্থনীতিতে একটা শ্লথতা আছে। এই অর্থনৈতিক শ্লথতা থেকে কাটিয়ে ওঠার জন্যে কি জাতীয় ব্যবস্থানেওয়া হবে তার দুটো দিকে আমরা তাকিয়ে আছি। একটা দিক হচ্ছে যেকদিন আগে সরকার একটা ৫ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আচ্ছা। আর একটা দিক হচ্ছে আগামীতে বাজেট দেওয়া হচ্ছে। তো ৫ বছরের পরিকল্পনাটা দীর্ঘমেয়াদী এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই আমিবাজেটটাকে দেখি যেটা এক বছরের। তো এখানে সরকারের কাছ থেকেএখনো খুব পরিস্ফুট কোনো বার্তা সাধারণত আমাদের কাছে পৌঁছায়নি বা আমরা দেখতে পাইনি সেটা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্যে কি কিব্যবস্থা করা হবে। এবং কোন কোন জায়গায় এখানে আপনার জোর দেওয়া হবে। এবং কোন কোন জায়গায় এখানে সত্যিকার অর্থে একটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে এটা আমরা দেখতে পাইনি। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আমরা অনেকগুলো লক্ষ্যমাত্রা দেখেছি ১০ লাখ নতুন কাজ সৃষ্টি করা হবে ইত্যাদি ইত্যাদি কিন্তু সেটা কোথায় করা হবে কেমন করে করা হবেকোন কৌশলে করা হবে সে ব্যাপারে কিন্তু আমরা এখনো অপেক্ষা করছি। তার মধ্যে বাজেট দেওয়া হচ্ছে এবং মনে রাখা দরকার যে একটা সংকটকালের মধ্যেই এই বাজেটটা দেওয়া হচ্ছে। এবং এটা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত এবং দুঃখজনক যে তারা ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যেই বৈশ্বিক চালচিত্র বদলে গেছে। যেখানে ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দেখা দিয়েছে। এবং এটা তো আমাদের অর্থনীতির ওপর একটা বিরাট আঘাত। এবং সেই বিরাট আঘাতের একটা হচ্ছে যে সত্যিকারঅর্থে যে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে যদি আঘাত পড়ে তাহলে পরেআমাদের যে শ্রম আয় যেটা সেটার ওপরে একটা আঘাত পড়বে এবং সেটা আমাদের অর্থনীতির দুটো স্তম্ভ পোশাক শিল্পের থেকে যে আয়এবং শ্রমিকের কাছ থেকে আয় তার একটা বড় স্তম্ভ সেখানে আঘাত পড়বে। দ্বিতীয়ত আমরা জ্বালানি নির্ভর এবং আমরা জ্বালানিআমদানি করি। জ্বালানির মূল্য বেড়ে গেলে এটা বেড়ে যাবে। তবে এইক্ষেত্রে যেখানে আমি মনে করি যে সরকারের একটা সাফল্য উল্লেখ করা দরকার সেটা হচ্ছে যে বেশ কিছুদিন আগে আমরা দেখছিলাম যে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে গাড়ির সারি। এবং একটা সময় মনে হয়েছিল যে সরকারবোধ হয় এটাকে সামাল দিতে পারবে না। কিন্তু দেখা গেছে যে এই জ্বালানির ব্যবস্থাপনা দিয়ে সরকার এটাকে সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তুখেয়াল রাখতে হবে যে দীর্ঘমেয়াদী আমাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কিনা। আমরা কি তেল গ্যাস অনুসন্ধানের জন্যে নতুন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণকরব কি না। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেযে জাতীয় সামগ্রিক বা পণ্যকে আমরা বলি যে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি তার কোনো মজুদ নেই। সেরকম মজুদ নেই আপনি একসপ্তাহ এক মাস তিন মাসের কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী কোনো রকমের মজুদ নেই। তেলের ক্ষেত্রে এটা সত্য সেই জাতীয় মজুদ আপনি তৈরি করতে পারবেনকি না। তো সেই জাতীয় দেখতে হবে। চতুর্থত হচ্ছে যে একটা বড় প্রশ্নসেটা ৫ বছরের পরিকল্পনার জন্যও সত্য হবে বাজেটের জন্যও সত্য হবেসেটা হলো অর্থায়ন। টাকা কোত্থেকে আসবে। এবং আজকে এখনআমরা যেখানে কাজ করছি মানে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের বাজেটতৈরি করছি আমরা জানি যে আমাদের করের যে ভূমি সেটা অত্যন্ত কম। আমাদের কর জাতীয় আয়ের অনুপাত হচ্ছে ৬ থেকে ৭ শতাংশ এটাএশিয়ার মধ্যে সবচাইতে কম এবং বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম। সুতরাংআপনি আয় পাচ্ছেন না সেখানে। ব্যয়ের দিক থেকে দেখলে ব্যয় কিন্তুবহু বহু। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তারা যাওয়ার আগে সরকারিকর্মচারীদের বেতন এবং ভাতা বাড়িয়ে দিয়ে গেছেন। এবং এটা বর্তমানসরকারকে এটাকে বাস্তবায়ন করতে হবে অর্থ লাগবে। আপনি বর্তমানসময়ে এই যে তেলের দাম জ্বালানির দাম সারের দাম বেড়ে গেছে। তোএটার জন্য আপনার যে ভর্তুকি প্রচুর পরিমাণে ভর্তুকি দেওয়া হয়। তোসেই ভর্তুকি আপনি তুলে নিলে পরে জনগণ কিন্তু একটা অসুবিধার মধ্যে পড়বে। আপনি যদি না তুলে নিতে পারেন এর মধ্যে বা কমিয়ে না আনতে পারেন আপনার কিন্তু অর্থায়নের একটা সমস্যা দেখা দেবে। বাংলাদেশে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বিরাট। এবং এই বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ একটি বড় বোঝা।

রাশেদ আহমেদ : ডক্টর সেলিম জাহান আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদেরকে সময় দেওয়ার জন্য।

ড. সেলিম জাহান: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ এই সুযোগ দেওয়ার জন্যে ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত