সংবাদ

ক্ষেতমজুরদের মজুরি, সেকাল-একাল


হাবিবুর রহমান স্বপন
হাবিবুর রহমান স্বপন
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১১ পিএম

ক্ষেতমজুরদের মজুরি, সেকাল-একাল
গরু আর লাঙলের চাষাবাদ এখন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। ছবি: প্রতিনিধি

ষাটের দশকে একজন ক্ষেতমজুরের মজুরি কত ছিল?আমি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত দেখেছি, একজন ক্ষেতমজুরের দিনমান শ্রমের মজুরি ছিল বারো আনা থেকে এক টাকা।  এক টাকায় তখন ১ কেজি চাউল, এক সের দুধ এবং শাক সবজি কেনা যেতো। তাতে তিনজনের সংসারে খাবার খরচ হতো। অন্যান্য সাংসারিক প্রয়োজন মেটানো যেতো না। কাপড়, ওষুধের মতো অত্যাবশকীয় পণ্যের জন্য ধার-কর্জ করতে হতো।

আর সেই ধার-কর্জ সংগ্রহ করতে দ্বারস্থ হতে হতো অবস্থাপন্ন গৃহস্থের কাছে। ঋণ নিতে হতো। আর সে ঝণ পরিশোধ করতে হতো আগাম শ্রম বিক্রি করে। অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ এবং ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে জমিতে কাজ থাকতো না। কৃষি জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় আবাদ হতো না। কৃষক পরিবারকে বসে থাকতে হতো বন্যার পানি সরে যওয়া পর্যন্ত। অতএব কর্মহীন বেকার ক্ষেতমজুর জীবিকার তাগিদে আগাম শ্রম বিক্রি করে নগদ অর্থ নিতো গৃহস্থের কাছ থেকে।

আখ থেকে গুড় তৈরি

ষাট-সত্তুরের দশকে ক্ষেতমজুরদের কাজের ধরন ছিল এখনকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। গৃহস্থ বাড়ি থেকে মাথায় করে ধামা কিম্বা বস্তায় করে গোবর সার, বীজ নিতে হতো। এখন ভ্যানরিকশা যেমন প্রচুর এবং প্রায় সব গ্রামীণ সড়ক পাকা, তখন তা ছিল না। তখন পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম ছিল গরু বা মহিষের গাড়ি ও নৌকা। 

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন দিনমজুরকে কাজ করতে হতো। বিনিময়ে তিন বেলা খাবার মিলতো। সে খাবারের মান ছিল খুবই নিম্ন। ধানের চাউলের সঙ্গে ভুরা ও কাউনের চাউল মেশানো ভাত এবং তার সঙ্গে একটু ডাউল কিম্বা মরিচ ভর্তা। আলু এখনকার মতো সহজলভ্য ছিল না। তবে কোনো কোনো কৃষক পরিবারে মাছ মিলতো। মাছ পাওয়া যেতো বিল-বাওর, নদী-নালা ও পুকুরে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ বাড়িতে তেলের পিঠা (চাউলের আটা ও গুড় দিয়ে তৈরি) এবং পায়েস দেওয়া হতো শ্রমিকদের। সে পায়েস রান্না হতো দুধ ছাড়া, শুধুমাত্র গুড় দিয়ে। 

নারী শ্রমিক

আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে পানিতে ডুবে থাকতো জমি। জমিতে দুটি ফসল হতো। আবার বহু জমিতে হতো এক ফসল। তখন ধান, পাট আর ডাউল জাতীয় ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করতে হতো। ভোরে গরু ও হাল-লাঙল নিয়ে ক্ষেত শ্রমিক জমি চাষ দিতো। সকালের নাশতা হয় ডাউল ভর্তা অথবা মাছের চর্চরি দিয়ে পান্তা ভাত অথবা গরম ভাতের সঙ্গে একটু কাঁচকলা ভর্তা, আলু ভর্তা কিম্বা মরিচ ভর্তা। ক্ষেতের আইলে বসেই সকালের নাশতা করে। হুকো কিম্বা বিড়িতে টান দিয়েই লাঙলের ফালে উঠে আসা বড় বড় ঠিলা ভাঙতে হতো ইটামুগুর দিয়ে। কোদাল ও ইটামুগুর ছিল কৃষকের অন্যতম কৃষি উপকরণ। একজন ক্ষেতমজুরকে হাত-পা সমানে চালাতে হতো। অসুস্থ হলেই ক্ষতি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া ছিল দুষ্কর! 

সত্তুর দশকে দেশে শুরু হয় ইরি ধানের আবাদ। বোরা ধানকেই বলা হতো ইরি। ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হতো দোন পদ্ধতিতে। পানি উঠিয়ে জমিতে দিতে সারাদিন লেগে যেতো। কঠিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত কৃষি শ্রমিক সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়তো।  যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হতো সেই তুলনায় ক্যালরি যুক্ত খাদ্য জুটতো না। আবার দিনশেষে পারিশ্রমিক যা মিলতো তা দিয়ে সংসার চলতো না। সংসারে নিত্যদিনের অভাব ও অসুখ লেগে থাকতো প্রতিটি কৃষিজীবী পরিবারে। তখন (১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত) সোনার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা ভরি। টাকার মান ছিল অনেক। অথচ শ্রমজীবীদের আয় ছিল নগণ্য। 

পাট শ্রমিক

আগাম শ্রম বিক্রির কথা এখন ভাবাই যায় না। এখন গতরখাটা মানুষের দাম অনেক। বিশেষ করে ক্ষেতমজুরদের অনেক মজুরি। দিনে ৮/৯ ঘণ্টা কাজ করে একজন ক্ষেতমজুর এখন পারিশ্রমিক পাচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। পাট কাটা ও ধোয়ার কাজে পারিশ্রমিক আরও বেশি। পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও নাটোর-কুষ্টিয়া এলাকায় প্রতিদিন পাট ধোয়ার কাজ করে একজন দক্ষ ক্ষেতমজুর আয় করছে প্রতিদিন ১২০০ টাকা।শ্রমিকদের পরিবারে স্বচ্ছলতা দেখা দিয়েছে। তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। অনেক ক্ষেতমজুরের সন্তান গ্রাজুয়েশন করে দেশে-বিদেশে চাকরি করছে।

ষাটের দশক ও সত্তুরের দশকে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। স্বাধীনতার পর দেশে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কাছাকাছি এলাকার মধ্যেই হাসপাতাল ও কমিউনিটি হাসপাতাল হয়েছে। গরুর গাড়ি ও নৌকার ব্যবহার আশি শতাংশ কমেছে। এখন রিকশা ভ্যান ছাড়াও যন্ত্রচালিত অটোরিকশা, দেশীয় প্রযুক্তির নসিমন, করিমন ইত্যাদি যানবাহন ঘরে ঘরে। 

মহিষের গাড়ি

ক্ষেতমজুরদের আর গৃহস্থের ফসল হাটে-বাজারে পরিবহন করতে মাথায় ও বাঁকে করে বহন করতে হয় না। অর্থাৎ শারীরিক কষ্ট বহুলাংশে লাঘব হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের। এখন যান্ত্রিক চাষাবাদ হচ্ছে। আগের মতো হালচাষ করতে হয় না। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরে সহজে স্বল্প সময়ের মধ্যেই জমি কর্ষণ কাজ হয়ে যাচ্ছে। জমিতে সেচ দেওয়া হয় শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে এবং ডিপ টিউবওয়েল দিয়ে। জমি আছে যাদের তারা যদি জমিতে নিজে আবাদ না করে তাহলে কৃষি জমি তার জন্য সুখকর না। জমিতে শ্রম দিয়ে ফসল ফলাতে নিজে শ্রম দিতে হবে। শ্রমিক দিয়ে আবাদ করে কোনোভাবেই লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। 

ক্ষেতমজুর ও শ্রমিক সংকট এখন কৃষি কাজের জন্য তীব্র। আগে বৃহত্তর রংপুর (কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর এবং নীলফামারী) এলাকা থেকে অনেক ক্ষেতমজুর আসতো পাবন, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর জেলায়। এখন আর তারা শ্রম বিক্রি করতে আসে না। আশির দশকেও এসেছে এবং নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পেঁয়াজ লাগানোর মৌসুমে রংপুরের শ্রমিকরা আসতো চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এখন আর তারা আসে না। সেখানেও শ্রমিক সংকট। বিশেষ করে ক্ষেতমজুর সংকট। 

বীজ বপন

দিন বদলে যাচ্ছে। পেক্ষাপট পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হচ্ছে। ক্ষেতমজুরদের বাড়ি-ঘরের উন্নতি হচ্ছে। সমস্যা একটাই তারা পরিবার পরিকল্পনা থেকে দূরে। একটি পরিবারে চার পাঁচটি সন্তান। সন্তানদের স্কুলে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সম্পর্কেও তারা সচেতন না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া ঠিক মতো হয় না। শিক্ষক সংকট প্রতিটি স্কুলে। শিক্ষা উপকরণের (খাতা, কলম) মূল্য অনেক। হাসপাতালে ওষুধ সংকট। 

শ্রমজীবীদের জন্য রাষ্ট্রের যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া উচিত যা আমাদের সংবিধানে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এতে বৈষম্য বাড়ছে। যদিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উল্লেখ করা হয়েছে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার। সেই অঙ্গিকার থেকে আমরা এখনও বহু দূরে। বিদেশে দক্ষ কৃষি শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা। সরকার সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশে কৃষি শ্রমিক পাঠাতে পারলে আমরা প্রচুর মূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করতে পারবো।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬


ক্ষেতমজুরদের মজুরি, সেকাল-একাল

প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ষাটের দশকে একজন ক্ষেতমজুরের মজুরি কত ছিল?আমি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত দেখেছি, একজন ক্ষেতমজুরের দিনমান শ্রমের মজুরি ছিল বারো আনা থেকে এক টাকা।  এক টাকায় তখন ১ কেজি চাউল, এক সের দুধ এবং শাক সবজি কেনা যেতো। তাতে তিনজনের সংসারে খাবার খরচ হতো। অন্যান্য সাংসারিক প্রয়োজন মেটানো যেতো না। কাপড়, ওষুধের মতো অত্যাবশকীয় পণ্যের জন্য ধার-কর্জ করতে হতো।

আর সেই ধার-কর্জ সংগ্রহ করতে দ্বারস্থ হতে হতো অবস্থাপন্ন গৃহস্থের কাছে। ঋণ নিতে হতো। আর সে ঝণ পরিশোধ করতে হতো আগাম শ্রম বিক্রি করে। অর্থাৎ আষাঢ়-শ্রাবণ এবং ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে জমিতে কাজ থাকতো না। কৃষি জমি পানিতে তলিয়ে থাকায় আবাদ হতো না। কৃষক পরিবারকে বসে থাকতে হতো বন্যার পানি সরে যওয়া পর্যন্ত। অতএব কর্মহীন বেকার ক্ষেতমজুর জীবিকার তাগিদে আগাম শ্রম বিক্রি করে নগদ অর্থ নিতো গৃহস্থের কাছ থেকে।

আখ থেকে গুড় তৈরি

ষাট-সত্তুরের দশকে ক্ষেতমজুরদের কাজের ধরন ছিল এখনকার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কঠোর পরিশ্রম করতে হতো। গৃহস্থ বাড়ি থেকে মাথায় করে ধামা কিম্বা বস্তায় করে গোবর সার, বীজ নিতে হতো। এখন ভ্যানরিকশা যেমন প্রচুর এবং প্রায় সব গ্রামীণ সড়ক পাকা, তখন তা ছিল না। তখন পণ্য পরিবহনের অন্যতম মাধ্যম ছিল গরু বা মহিষের গাড়ি ও নৌকা। 

সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত একজন দিনমজুরকে কাজ করতে হতো। বিনিময়ে তিন বেলা খাবার মিলতো। সে খাবারের মান ছিল খুবই নিম্ন। ধানের চাউলের সঙ্গে ভুরা ও কাউনের চাউল মেশানো ভাত এবং তার সঙ্গে একটু ডাউল কিম্বা মরিচ ভর্তা। আলু এখনকার মতো সহজলভ্য ছিল না। তবে কোনো কোনো কৃষক পরিবারে মাছ মিলতো। মাছ পাওয়া যেতো বিল-বাওর, নদী-নালা ও পুকুরে। অবস্থাপন্ন গৃহস্থ বাড়িতে তেলের পিঠা (চাউলের আটা ও গুড় দিয়ে তৈরি) এবং পায়েস দেওয়া হতো শ্রমিকদের। সে পায়েস রান্না হতো দুধ ছাড়া, শুধুমাত্র গুড় দিয়ে। 

নারী শ্রমিক

আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে পানিতে ডুবে থাকতো জমি। জমিতে দুটি ফসল হতো। আবার বহু জমিতে হতো এক ফসল। তখন ধান, পাট আর ডাউল জাতীয় ফসলের জন্য জমি তৈরি করতে লাঙল দিয়ে জমি চাষ করতে হতো। ভোরে গরু ও হাল-লাঙল নিয়ে ক্ষেত শ্রমিক জমি চাষ দিতো। সকালের নাশতা হয় ডাউল ভর্তা অথবা মাছের চর্চরি দিয়ে পান্তা ভাত অথবা গরম ভাতের সঙ্গে একটু কাঁচকলা ভর্তা, আলু ভর্তা কিম্বা মরিচ ভর্তা। ক্ষেতের আইলে বসেই সকালের নাশতা করে। হুকো কিম্বা বিড়িতে টান দিয়েই লাঙলের ফালে উঠে আসা বড় বড় ঠিলা ভাঙতে হতো ইটামুগুর দিয়ে। কোদাল ও ইটামুগুর ছিল কৃষকের অন্যতম কৃষি উপকরণ। একজন ক্ষেতমজুরকে হাত-পা সমানে চালাতে হতো। অসুস্থ হলেই ক্ষতি। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া ছিল দুষ্কর! 

সত্তুর দশকে দেশে শুরু হয় ইরি ধানের আবাদ। বোরা ধানকেই বলা হতো ইরি। ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হতো দোন পদ্ধতিতে। পানি উঠিয়ে জমিতে দিতে সারাদিন লেগে যেতো। কঠিন পরিশ্রমের পর ক্লান্ত কৃষি শ্রমিক সন্ধ্যায় ঘুমিয়ে পড়তো।  যে পরিমাণ পরিশ্রম করতে হতো সেই তুলনায় ক্যালরি যুক্ত খাদ্য জুটতো না। আবার দিনশেষে পারিশ্রমিক যা মিলতো তা দিয়ে সংসার চলতো না। সংসারে নিত্যদিনের অভাব ও অসুখ লেগে থাকতো প্রতিটি কৃষিজীবী পরিবারে। তখন (১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত) সোনার দাম ছিল ৮৫ থেকে ৯০ টাকা ভরি। টাকার মান ছিল অনেক। অথচ শ্রমজীবীদের আয় ছিল নগণ্য। 

পাট শ্রমিক

আগাম শ্রম বিক্রির কথা এখন ভাবাই যায় না। এখন গতরখাটা মানুষের দাম অনেক। বিশেষ করে ক্ষেতমজুরদের অনেক মজুরি। দিনে ৮/৯ ঘণ্টা কাজ করে একজন ক্ষেতমজুর এখন পারিশ্রমিক পাচ্ছে ৮০০ থেকে ১০০০ টাকা। পাট কাটা ও ধোয়ার কাজে পারিশ্রমিক আরও বেশি। পাবনা-সিরাজগঞ্জ ও নাটোর-কুষ্টিয়া এলাকায় প্রতিদিন পাট ধোয়ার কাজ করে একজন দক্ষ ক্ষেতমজুর আয় করছে প্রতিদিন ১২০০ টাকা।শ্রমিকদের পরিবারে স্বচ্ছলতা দেখা দিয়েছে। তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছে। অনেক ক্ষেতমজুরের সন্তান গ্রাজুয়েশন করে দেশে-বিদেশে চাকরি করছে।

ষাটের দশক ও সত্তুরের দশকে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থা ছিল খুবই খারাপ। স্বাধীনতার পর দেশে শিক্ষা, চিকিৎসা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়েছে। কাছাকাছি এলাকার মধ্যেই হাসপাতাল ও কমিউনিটি হাসপাতাল হয়েছে। গরুর গাড়ি ও নৌকার ব্যবহার আশি শতাংশ কমেছে। এখন রিকশা ভ্যান ছাড়াও যন্ত্রচালিত অটোরিকশা, দেশীয় প্রযুক্তির নসিমন, করিমন ইত্যাদি যানবাহন ঘরে ঘরে। 

মহিষের গাড়ি

ক্ষেতমজুরদের আর গৃহস্থের ফসল হাটে-বাজারে পরিবহন করতে মাথায় ও বাঁকে করে বহন করতে হয় না। অর্থাৎ শারীরিক কষ্ট বহুলাংশে লাঘব হয়েছে শ্রমজীবী মানুষের। এখন যান্ত্রিক চাষাবাদ হচ্ছে। আগের মতো হালচাষ করতে হয় না। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরে সহজে স্বল্প সময়ের মধ্যেই জমি কর্ষণ কাজ হয়ে যাচ্ছে। জমিতে সেচ দেওয়া হয় শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে এবং ডিপ টিউবওয়েল দিয়ে। জমি আছে যাদের তারা যদি জমিতে নিজে আবাদ না করে তাহলে কৃষি জমি তার জন্য সুখকর না। জমিতে শ্রম দিয়ে ফসল ফলাতে নিজে শ্রম দিতে হবে। শ্রমিক দিয়ে আবাদ করে কোনোভাবেই লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। 

ক্ষেতমজুর ও শ্রমিক সংকট এখন কৃষি কাজের জন্য তীব্র। আগে বৃহত্তর রংপুর (কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর এবং নীলফামারী) এলাকা থেকে অনেক ক্ষেতমজুর আসতো পাবন, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর জেলায়। এখন আর তারা শ্রম বিক্রি করতে আসে না। আশির দশকেও এসেছে এবং নব্বই দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত পেঁয়াজ লাগানোর মৌসুমে রংপুরের শ্রমিকরা আসতো চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকায়। এখন আর তারা আসে না। সেখানেও শ্রমিক সংকট। বিশেষ করে ক্ষেতমজুর সংকট। 

বীজ বপন

দিন বদলে যাচ্ছে। পেক্ষাপট পরিবর্তন হচ্ছে। মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হচ্ছে। ক্ষেতমজুরদের বাড়ি-ঘরের উন্নতি হচ্ছে। সমস্যা একটাই তারা পরিবার পরিকল্পনা থেকে দূরে। একটি পরিবারে চার পাঁচটি সন্তান। সন্তানদের স্কুলে উপযুক্ত শিক্ষা দেয়ার দায়িত্ব সম্পর্কেও তারা সচেতন না। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া ঠিক মতো হয় না। শিক্ষক সংকট প্রতিটি স্কুলে। শিক্ষা উপকরণের (খাতা, কলম) মূল্য অনেক। হাসপাতালে ওষুধ সংকট। 

শ্রমজীবীদের জন্য রাষ্ট্রের যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া উচিত যা আমাদের সংবিধানে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতি তা যথাযথভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। এতে বৈষম্য বাড়ছে। যদিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উল্লেখ করা হয়েছে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার। সেই অঙ্গিকার থেকে আমরা এখনও বহু দূরে। বিদেশে দক্ষ কৃষি শ্রমিকের প্রচুর চাহিদা। সরকার সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে বিদেশে কৃষি শ্রমিক পাঠাতে পারলে আমরা প্রচুর মূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রা অর্জন করতে পারবো।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত