সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদী যাদুকাটার পাড় কাটা রোধে গত ছয় মাসে ৬৬টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬০ জন। কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতা আর অসাধু চক্রের দৌরাত্ম্যে কিছুতেই থামছে না অবৈধ ড্রেজারের থাবা। এই পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান ও নদীর তীর রক্ষায় নিজস্ব উদ্যোগে বাঁশের বেড়া দিয়েছেন ইজারাদার।
নদীতে সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে কর্মরত শ্রমিক রমজান আলী, বাসু মিয়া ও একলাস নূর সংবাদকে বলেন, তারা ইজারাদারের নির্ধারিত সীমানার ভেতর থেকে বালু তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন। কিন্তু একটি চক্র রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ড্রেজার ও বোমা মেশিন ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ও পাড় কাটছে। এতে নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতু ও শিমুল বাগান ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং সাধারণ শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে। তারা অবৈধ ড্রেজার ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানান।
যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালের ইজারাদার শাহ রুবেল বলেন, ‘সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে আমরা নিয়ম মেনে মহাল ইজারা নিয়েছি। কিন্তু একটি চক্র অবৈধভাবে পাড় কেটে আমাদের ব্যবসার ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং শিমুল বাগান ধ্বংস করছে। আমরা নিজস্ব খরচে নদীর পাড়ে বেড়া দিয়েছি এবং পাহারাদার বসিয়েছি। প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি যেন রাতের আঁধারে যারা ড্রেজার চালায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
ইজারাদারের প্রতিনিধি লোকমান মিয়া ও সাজ্জাদ মিয়া জানান, ইজারা বহির্ভূত এলাকায় শিমুল বাগান ও ঘাগটিয়ার পাড় কাটা রোধে তারা বারবার বাধা দিলেও অবৈধ চক্রটি তৎপর রয়েছে।
পুলিশের তৎপরতা প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) বলেন, নদীর তীর কাটা ও অবৈধ বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রতিনিয়ত মামলা দিচ্ছে। গত জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৬৬টি মামলায় ৭২০ জনকে আসামি করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬০ জনকে।
আইনি জটিলতা তুলে ধরে পুলিশ সুপার বলেন, ‘বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী এই অপরাধটি জামিনযোগ্য। ফলে আসামিরা দ্রুত জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়। এটি বন্ধ করতে টাস্কফোর্স ও মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ নৌযানগুলো স্পটেই ধ্বংস করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ইজারাদাররা যদি রাতে বালু কাটা বন্ধ রেখে কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কাজ করেন, তবে দ্রুত শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, যাদুকাটা নদী একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সম্পদ ও পর্যটন কেন্দ্র। কেউ যেন পাড় কাটতে না পারে, সেজন্য জেলা ও উপজেলা প্রশাসন প্রতিনিয়ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি প্রথম প্রতিরোধটা আসতে হবে স্থানীয়দের কাছ থেকে। স্থানীয় সচেতনতা ছাড়া প্রশাসনের পক্ষে এটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ইজারাদারের বেড়া দেওয়ার উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। পরিবেশ ধ্বংসকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল রয়েছে।’
আপনার মতামত লিখুন