উজানের ভারি বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত বর্ষণের প্রভাবে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলার নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরও জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের সব বিভাগেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা, সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে অথবা বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত থাকবে। এর প্রভাবে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানিও ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ ও নাটোর জেলার নিম্নাঞ্চলে সাময়িক প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের পাশাপাশি ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক দিনে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও ওইসব এলাকায় একই ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের উজানভাগের নদীগুলোতে পড়ছে। বিশেষ করে মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনা অঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সোমবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী কয়েক দিন আরও বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় ইতোমধ্যে বন্যা চলছে, সেখানে পানির উচ্চতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানিও আগামী দুই দিনে দ্রুত বাড়তে পারে। এতে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের মেঘালয়ের বিভিন্ন স্থানে গত ২৪ ঘণ্টায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উইলিয়ামনগরে ৩৭১ মিলিমিটার, আর কে এম সোহরায় ২৮২ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ২৭৯ মিলিমিটার এবং তুরায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আসামের গৌহাটিতে ১৩৮ মিলিমিটার এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসব উজান এলাকা থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
উত্তরাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে সোমবার সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজান থেকে আরও পানি নেমে এলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই তিস্তার পানিতে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। সেই পানি পুরোপুরি না নামতেই আবারও নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করায় স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক এখনও আমনের চারা রোপণ করতে পারেননি। জমিতে অতিরিক্ত পানি ও কাদা থাকায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানিও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের করতোয়া, আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী ও ঘাঘট নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের মতে, আগামী তিন দিনের মধ্যে নওগাঁ ও নাটোর জেলার কিছু এলাকায় আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বন্যার প্রভাব ইতোমধ্যে শেরপুরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারি বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার অন্তত তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার দুপুরে নালিতাবাড়ী উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের নয়াপাড়া দক্ষিণ সন্ন্যাসীভিটা এলাকায় চেল্লাখালী নদীর ওপর নির্মিত একটি লোহার বেইলি ব্রিজ পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। এ সময় দুই শিশুসহ তিনজন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। ব্রিজটি ধসে পড়ায় কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে চেল্লাখালী নদীর পানি সড়কের ওপর উঠে আসায় শেরপুর-নালিতাবাড়ী-গাজীরখামার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সোমেশ্বরী নদীর ভাঙনে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। মহারশি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঝিনাইগাতী সদর বাজারের বিভিন্ন দোকানেও পানি ঢুকে পড়ে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টায় চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৩২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বিকেলে কিছুটা কমে আসে। তবে নতুন করে ভারি বৃষ্টি বা উজানের ঢল এলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের সব বিভাগেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম তিন দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি বর্ষণ হতে পারে। পরবর্তী দুই দিনে বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরেও এটি মাঝারি মাত্রায় সক্রিয়। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে নীলফামারীর ডিমলায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। যেসব জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে সেখানে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুলাই ২০২৬
উজানের ভারি বৃষ্টি ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অব্যাহত বর্ষণের প্রভাবে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে আবারও বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ১০টি জেলায় বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে কয়েকটি জেলার নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হতে পারে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরও জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের সব বিভাগেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে ইতোমধ্যে বন্যাকবলিত এলাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সোমবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনের মধ্যে তিস্তা, ধরলা, সুরমা, কুশিয়ারা, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে অথবা বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত থাকবে। এর প্রভাবে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানিও ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ ও নাটোর জেলার নিম্নাঞ্চলে সাময়িক প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর স্থানীয় প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের পাশাপাশি ভারতের আসাম, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গে গত কয়েক দিনে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও ওইসব এলাকায় একই ধরনের বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব বাংলাদেশের উজানভাগের নদীগুলোতে পড়ছে। বিশেষ করে মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল সিলেট, সুনামগঞ্জ, শেরপুর ও নেত্রকোনা অঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সোমবার সকাল ৯টার তথ্য অনুযায়ী, সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জের ছাতক পয়েন্টে বিপৎসীমার ১৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে কুশিয়ারা নদীর পানি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার এবং সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে ৩ সেন্টিমিটার ওপরে ছিল। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী নদীর পানিও বিপৎসীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী কয়েক দিন আরও বাড়তে পারে। এতে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় ইতোমধ্যে বন্যা চলছে, সেখানে পানির উচ্চতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, সোমেশ্বরী, ভুগাই ও কংস নদীর পানিও আগামী দুই দিনে দ্রুত বাড়তে পারে। এতে শেরপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের মেঘালয়ের বিভিন্ন স্থানে গত ২৪ ঘণ্টায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। উইলিয়ামনগরে ৩৭১ মিলিমিটার, আর কে এম সোহরায় ২৮২ মিলিমিটার, চেরাপুঞ্জিতে ২৭৯ মিলিমিটার এবং তুরায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আসামের গৌহাটিতে ১৩৮ মিলিমিটার এবং পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়িতে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এসব উজান এলাকা থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
উত্তরাঞ্চলেও বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি গত ২৪ ঘণ্টায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, আগামী দুই দিন এসব নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বা স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে সোমবার সকাল ৯টায় তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উজান থেকে আরও পানি নেমে এলে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে।
মাত্র এক সপ্তাহ আগেই তিস্তার পানিতে নীলফামারীর ডিমলা ও জলঢাকা উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। সেই পানি পুরোপুরি না নামতেই আবারও নদীর পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করায় স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেক কৃষক এখনও আমনের চারা রোপণ করতে পারেননি। জমিতে অতিরিক্ত পানি ও কাদা থাকায় কৃষিকাজ ব্যাহত হচ্ছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার পানিও ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। আগামী তিন দিনের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন পয়েন্টে নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। নদী-সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের করতোয়া, আত্রাই, টাঙ্গন, পুনর্ভবা, মহানন্দা, যমুনেশ্বরী ও ঘাঘট নদীর পানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের মতে, আগামী তিন দিনের মধ্যে নওগাঁ ও নাটোর জেলার কিছু এলাকায় আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর পানি সতর্কসীমার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।
বন্যার প্রভাব ইতোমধ্যে শেরপুরে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারি বর্ষণ ও ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বেড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী উপজেলার অন্তত তিন শতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
সোমবার দুপুরে নালিতাবাড়ী উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের নয়াপাড়া দক্ষিণ সন্ন্যাসীভিটা এলাকায় চেল্লাখালী নদীর ওপর নির্মিত একটি লোহার বেইলি ব্রিজ পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভেসে যায়। এ সময় দুই শিশুসহ তিনজন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান। ব্রিজটি ধসে পড়ায় কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
একই সঙ্গে চেল্লাখালী নদীর পানি সড়কের ওপর উঠে আসায় শেরপুর-নালিতাবাড়ী-গাজীরখামার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সোমেশ্বরী নদীর ভাঙনে কয়েকটি এলাকায় নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিয়েছে। মহারশি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ঝিনাইগাতী সদর বাজারের বিভিন্ন দোকানেও পানি ঢুকে পড়ে।
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টায় চেল্লাখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ৩২৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও বিকেলে কিছুটা কমে আসে। তবে নতুন করে ভারি বৃষ্টি বা উজানের ঢল এলে পরিস্থিতি আবারও খারাপ হতে পারে।
এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী পাঁচ দিন দেশের সব বিভাগেই বজ্রসহ বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রথম তিন দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি বর্ষণ হতে পারে। পরবর্তী দুই দিনে বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, মৌসুমি বায়ু বর্তমানে দেশের উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরেও এটি মাঝারি মাত্রায় সক্রিয়। এর প্রভাবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে নীলফামারীর ডিমলায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। যেসব জেলায় বন্যার আশঙ্কা রয়েছে সেখানে স্থানীয় প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদী-তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদেরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন