সংবাদ

অবচেতন, প্রতীক এবং ভাষায় গঠিত আকাঙ্ক্ষা

ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁর সাহিত্যপাঠ


মোহিত কামাল
মোহিত কামাল
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৬ এএম

ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁর সাহিত্যপাঠ
সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং ও জাক লাকাঁ


সাহিত্যের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে আরেকটা অদৃশ্য জগৎ কাজ করে। গল্পে যা বলা হয়েছে, তার পাশাপাশি থাকে যা বলা হয়নি তাও। চরিত্র যা চায়, তার পাশাপাশি থাকে এমন কিছু, নিজেই জানে না যে সে তা চায়। 

কোনো দৃশ্যের প্রকাশ্য অর্থের প্রতীকী অর্থও থাকতে পারে। কখনো স্বপ্ন, কখনো দরজা, কখনো একটা আয়না বা অন্ধকার ঘর কিংবা কোনো চরিত্রের অকারণ নীরবতা আখ্যানের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য অর্থের দরজা খুলে দিতে পারে।

এই অন্তর্লীন জগতকে বোঝার ক্ষেত্রে সাহিত্যে মনস্তত্ত্বের পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। 

সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং এবং জাক লাকাঁ, তিনজনই মানুষের দৃশ্যমান আচরণের আড়ালে থাকা অদৃশ্য মানসিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। সহজ করে বললে, ফ্রয়েড খোঁজেন অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক সংঘাত।

ইয়ুং খোঁজেন আর্কেটাইপ বা আদিরূপ এবং প্রতীকের গভীরতর অর্থ।

লাঁকা খোঁজেন ভাষা, সিগনিফায়ার এবং আকাঙ্ক্ষা গঠনের কাঠামো। সিগনিফায়ার শব্দের বাংলা অর্থ দ্যোতক, সংকেত বা চিহ্ন। এই তিন সূত্র অবশ্যই তিনজনের বিশাল তত্ত্বের পূর্ণ সংজ্ঞা নয়; সাহিত্য পাঠের সুবিধার জন্য তৈরি এক সংক্ষিপ্ত মানচিত্র। কারণ ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষা বা দমনের তত্ত্ব নয়, ইয়ুং বর্ণিত আদিরূপ কেবল কিছু প্রতীকের তালিকা নয়, আর লাকাঁর চিন্তাও কেবল ভাষাতত্ত্বের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবু সাহিত্য পাঠের প্রাথমিক প্রবেশদ্বার হিসেবে এই তিনটি সূত্র কার্যকর।

তিনজনকে পাশাপাশি পড়লে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। সাহিত্যে সৃষ্ট চরিত্রের দৃশ্যমান আচরণ তার সম্পূর্ণ মানসিক সত্য প্রকাশ করে না। 

দৃশ্যমান কাহিনির আড়ালে অদৃশ্য মন

কোনো গল্পে একজন মানুষ হঠাৎ রেগে গেল। আমরা সাধারণত বলি, বলতে পারি, সে রাগ করেছে। কিন্তু সাহিত্যিক পাঠ সেখানেই থেমে থাকে না।

প্রশ্ন ওঠে, সে কেন রাগ করল?

রাগের কারণ কি উদ্দীপক হিসেবে উস্কে দেওয়া নির্দিষ্ট ঘটনা, নাকি আসলে ঘটনাটা তার ভেতরের কোনো পুরোনো ক্ষতকে স্পর্শ করেছে?

একজন চরিত্র বারবার একই ধরনের ভুল করছে। কেন?

সে একজন  মানুষকে ঘৃণা করার কথা বলছে, অথচ অদ্ভুতভাবে সেই মানুষটির মতোই হয়ে উঠছে। কেন?

মৃত মানুষ বারবার স্বপ্নে ফিরে আসছে। কেন? 

দরজা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আয়না বারবার সামনে আসছে, একই শব্দ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, কোনো চরিত্র কোনো কথা বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। কেন?

এসব ‘কেন’-এর উত্তর পেতে মনোবিশ্লেষণী পাঠের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁ একই প্রশ্নের উত্তর দেন না; তাঁরা একই অন্ধকার ঘরে তিনটে ভিন্ন আলো ফেলেন।

ফ্রয়েড : গল্পের অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষা

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে আনকনশাস বা অবচেতন। মানুষের মনের বড় অংশ সচেতনতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, ভয়, কল্পনা ও সংঘাতের কিছু অংশ সচেতন মন থেকে দূরে সরে যেতে পারে; কিন্তু তা সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। অন্য কোনো পথ ধরে তা ফিরে আসতে পারে। স্বপ্ন তার এক গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভুল কথা, আচরণের পুনরাবৃত্তি, উদ্বেগ, কল্পনা, প্রতীক কিংবা বিভিন্ন ধরনের মানসিক উপসর্গও অবচেতন সংঘাতের প্রকাশ ঘটাতে পারে।

১৯০৮ সালে প্রকাশিত ফ্রয়েডের ‘ক্রিয়েটিভ রাইটার্স এ্যান্ড ডে-ড্রিমিং’ প্রবন্ধটি সাহিত্য ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর মনোবিশ্লেষণী চিন্তার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে কল্পনা, দিবাস্বপ্ন, ইচ্ছাপূরণ এবং সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তাই ফ্রয়েডীয় সাহিত্য পাঠের মৌলিক প্রশ্ন হতে পারে, চরিত্রটি আসলে কী চায়?

তার প্রকাশ্য ইচ্ছার নিচে অন্য কোনো ইচ্ছা আছে কি?

সে কি নিজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারছে না?

কাল্পনিক উদাহরণ

ধরা যাক, গল্পের নায়ক বারবার বলছে, ‘আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করি।’

কিন্তু গল্পে দেখা গেল, সে বাবার মতো পোশাক পরে, বাবার পেশা বেছে নেয়, বাবার মতো কথা বলে এবং বাবার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অস্থির।

ফ্রয়েডীয় পাঠ এখানে ‘ঘৃণা’ শব্দটার ওপর থেমে থাকবে না। বরং প্রশ্ন করবে, ঘৃণার নিচে কি আকর্ষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঈর্ষা, পরিচয়-সংকট বা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে? এখানেই ফ্রয়েডীয় পাঠের শক্তি, বাংলা সাহিত্যে ফ্রয়েডীয় প্রভাব লুকিয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ উপন্যাস-কে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া যায়।

চারুলতা, ভূপতি ও অমলের সম্পর্ককে কেবল সামাজিক বা রোমান্টিক সম্পর্ক হিসেবে পড়লে গল্পের একটা  স্তর ধরা পড়ে। কিন্তু মনোবিশ্লেষণমূলক পাঠ আরও প্রশ্ন তুলতে পারে।

চারুলতার নিঃসঙ্গতা কি শুধু স্বামীর অবহেলার ফল?

তার পাঠ, সাহিত্যচর্চা কিংবা অমলের প্রতি আকর্ষণের মধ্যে কি নিজের সত্তাকে আবিষ্কারের কোনো গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে?

অমলের প্রতি আকর্ষণকে শুধু ‘প্রেম’ বলে চিহ্নিত করলে কি তার মানসিক জটিলতা পুরোপুরি ধরা পড়ে?

অবশ্যই এসবকে ফ্রয়েডের ‘চূড়ান্ত ব্যাখ্যা’ বলা যাবে না। বরং একটা ফ্রয়েডীয় সম্ভাব্য পাঠ হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

একইভাবে শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’-এর চরিত্রগুলোর আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক নৈতিকতা, অপরাধবোধ, যৌনতা ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মনোবিশ্লেষণী পাঠের জন্য উর্বর ক্ষেত্র। চরিত্রের ঘোষিত নৈতিক অবস্থান এবং তার বাস্তব আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফাঁক কোথায়? ফ্রয়েডীয় পাঠ সেই ফাঁকটিকে গুরুত্ব দিতে পারে।

ফ্রয়েডীয় পাঠের কেন্দ্রে ‘ফাটল’

মনোবিশ্লেষণী পাঠের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় কী?

চরিত্র নিজেকে যতটা জানে বলে মনে করে, সে হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু বহন করছে।

একজন চরিত্র বলে, ‘আমি, ওকে ভালোবাসি না।’

কিন্তু তার আচরণ বারবার সেই মানুষটির দিকেই ফিরে যায়।

সে বলে, ‘আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।’

কিন্তু তার স্বপ্নে প্রতিশোধের দৃশ্য ফিরে আসে।

সে বলে, ‘আমি বাবার মতো হতে চাই না।’

কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে সে ক্রমেই বাবার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

এই ফাটল মূলত কথা ও কাজের ফাটল, সচেতন ইচ্ছা ও অচেতন আকাঙ্ক্ষার ফাটল। ফ্রয়েডীয় পাঠের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। 

ইয়ুং : ব্যক্তিগত মন থেকে মানবমনের আদিরূপে

ফ্রয়েডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং নিজস্ব ‘এ্যানালিটিক্যাল সাইকোলজি’ নির্মাণ করেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে আসে ‘কালেকটিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতন এবং ‘আর্কেটাইপ’।

ইয়ুংয়ের মতে, মানুষের মানসিক জীবন শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানব জাতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু আদিরূপী বিন্যাস মানুষের মানসিক জগতে কাজ করতে পারে।

‘দ্য আর্কেটাইপ এ্যান্ড দ্য কালেকটিভ আনকনশাস’ তাঁর এই চিন্তার অন্যতম প্রধান উৎস। গ্রন্থটি কালেকটিভ ওয়ার্কস, ভল্যুউম ৯, পার্ট ১ হিসেবে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যে এই ধারণার প্রয়োগ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং-এর তত্ত্বে নারীর অচেতন মনের পুরুষসুলভ অংশকে ‘অ্যানিমাস’ বলা হয়। প্রতিশব্দ সিনোনিমস উঁচু।

তবে এখানে একটা সতর্কতা জরুরি। আর্কেটাইপ-কে কোনো স্থির ‘প্রতীকের অভিধান’ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। অর্থাৎ ‘সাপ মানেই এই’, ‘জল মানেই ওই’— এমন যান্ত্রিক পদ্ধতি ইয়ুংয়ের জটিল চিন্তাকে সরল করে ফেলে। কোনো প্রতীকের অর্থ তার আখ্যানচিত্র ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতের ওপরও নির্ভর করে।

‘ছায়া : নিজের অস্বীকৃত সত্তার মুখোমুখি

ইয়ুংয়ের শ্যাডো ধারণা সাহিত্য পাঠে বিশেষ কার্যকর। ধরা যাক, কোনো গল্পের নায়ক নিজেকে অত্যন্ত সৎ, নৈতিক ও শান্ত মানুষ হিসেবে দেখে। কিন্তু গল্পের কোনো এক পর্যায়ে সে এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হয়, যাকে সে ঘৃণা করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো তার ঘৃণার পাত্রটির আচরণের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেরই কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়।

ইয়ুংয়ীয় পাঠ প্রশ্ন করবে, সে কি অন্যের মধ্যে নিজের অস্বীকৃত সত্তাকে দেখছে?

এখানে ‘অন্য’ চরিত্রটি কেবল ভিলেন নয়; সে নায়কের শ্যাডো-ও হতে পারে।

বিভূতিভূষণের অরণ্য : একটি সম্ভাব্য ইয়ুংয়ীয় পাঠ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাস এই প্রসঙ্গে একটা আকর্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে। উপন্যাসের অরণ্য কেবল এক ভৌগোলিক স্থান নয়; মানুষের সভ্যতা, প্রকৃতি, একাকিত্ব, আকর্ষণ, ভয় ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্কও তৈরি করে। ইয়ুংয়ীয় পাঠে অরণ্যকে মানুষের অচেতন বা অজানা সত্তার প্রতীকী ক্ষেত্র হিসেবে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শহর ও অরণ্যের দ্বন্দ্ব তখন শুধু দুটি ভৌগোলিক পরিসরের দ্বন্দ্ব থাকে না; হয়ে উঠতে পারে পরিচিত ও অচেনা, সচেতন ও অচেতন, সভ্যসত্তা ও আদিমসত্তার দ্বন্দ্ব। এখানেও সতর্কতা জরুরি। 

‘আরণ্যক’কে শুধু ইয়ুং দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও ঐতিহাসিক মাত্রা উপেক্ষিত হবে। তাই ইয়ুং এখানে পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়; একটা অতিরিক্ত পাঠের চশমা। 

লাকাঁ : অবচেতনও ভাষার মতো সংগঠিত

জাক লাকাঁ ফ্রয়েডকে নতুনভাবে পাঠ করেন এবং মনোবিশ্লেষণের সঙ্গে ভাষাতত্ত্বের সম্পর্ক গভীর করেন। তাঁর বহুল উদ্ধৃত সূত্র: The unconscious is structured like a language.

লাকাঁর চিন্তার ক্ষেত্রে ভাষা, Signifier, Subject, Other এবং Desire অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রয়েড প্রশ্ন করতে পারেন, চরিত্রটি কী দমন করছে?

লাঁকা প্রশ্নটিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন, চরিত্রটি কীভাবে ভাষার মধ্যে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করছে?

কোন শব্দ বারবার ফিরে আসছে? কোন কথা বলতে গিয়ে সে থেমে যাচ্ছে? তার ভাষায় কোথায় অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে?

সে কী বলছে এবং কীভাবে বলছে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? লাকীঁয় সাহিত্য পাঠের বিশেষ শক্তি এখানেই আলো ছড়ায়।

লাকাঁর ইমাজিনারি, সিমবোলিক আই রিয়েল

লাঁকার চিন্তার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার হলো ইমাজিনারি, সিমবোলিক আই রিয়েল। ইমাজিনারি: প্রতিচ্ছবি ও আত্মপরিচয়।

মিরর স্টেজ-এর ধারণায় লাকাঁ দেখান, শিশুর আত্মপরিচয় কীভাবে নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে আইডেন্টিফিকেশনের সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠে।

সাহিত্যে কোনো চরিত্র নিজের যে পরিচয় নির্মাণ করে এবং বাস্তবে সে যে মানুষ; দুইয়ের মধ্যে যদি ফাঁক থাকে, লাকীঁয় পাঠ সেই ফাঁককে অনুসন্ধান করতে পারে।

সিমবোলিক : ভাষা, নিয়ম ও সামাজিক জগৎ

মানুষ শুধু ‘নিজের ভেতর’ থেকে নিজের পরিচয় তৈরি করে না। সে ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি, আইন, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতীকী ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে।

তাই ‘আমি কে?’ প্রশ্নটার উত্তর ব্যক্তিগত নয় শুধু; সামাজিক এবং ভাষাগতও।

রিয়েল: ভাষার সীমা

লাঁকার ‘রিয়েল’কে সাধারণ অর্থে ‘বাস্তবতা’ বলা ভুল হবে।

‘রিয়েল’ এমন এক ক্ষেত্র, যা সিমবোলিক বা ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না।

যখন কোনো অভিজ্ঞতা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না, তখন সিমবোলিক বা ভাষাগত কাঠামোর সীমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ভাষাহীনতা বা নীরবতাও তখন অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

লাকাঁ ও রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’

রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসকে লাকীঁয় চশমা বা লেন্স দিয়ে পড়লে আকর্ষণীয় প্রশ্ন উঠে আসে।

চরিত্রগুলো আসলে কাকে চায়?

বিনোদিনী কি শুধু মহেন্দ্রকে চায়?

মহেন্দ্র কি শুধু বিনোদিনীকে চায়?

আশা কী চায়?

আর প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অন্যের আকাঙ্ক্ষা কতটা কাজ করে?

লাঁকার ‘ডিজায়ার অফ দ্য আদার’ ধারণা দিয়ে এই সম্পর্কগুলোকে পড়লে দেখা যায়, মানুষের আকাঙ্ক্ষা সবসময় সরলভাবে ‘আমি তাকে চাই’ আকারে কাজ করে না। অন্যের দৃষ্টি, স্বীকৃতি, প্রত্যাখ্যান, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অবস্থান নিজের আকাঙ্ক্ষাকে গঠন করে।

বিনোদিনীর আকাঙ্ক্ষাকে তাই শুধু প্রেমের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশ্ন করে পড়া যায়, সে অন্যের কাছে কে হতে চায়? অন্যের চোখে নিজের মূল্য কীভাবে নির্মাণ করে? এটিও অবশ্যই উপন্যাসটির একমাত্র পাঠ নয়।

একই চরিত্র : তিনটি ভিন্ন প্রশ্ন

ধরা যাক, কোনো গল্পে এক নারী চরিত্র বারবার একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ায়।

ফ্রয়েড বলবেন, দরজার ওপারে কী আছে? কোনো আকাঙ্ক্ষা বা স্মৃতি সে দমন করছে? দরজাটা কি নিষিদ্ধ ইচ্ছার প্রতীক?

ইয়ুং বলবেন, দরজাটা কি অচেতন জগতের প্রবেশপথ? নায়িকা কি নিজের অচেনা সত্তার দিকে এগোচ্ছে, দরজা পেরিয়ে? দরজার ওপারের অন্ধকার কি শ্যাডো-এর ক্ষেত্র?

লাকাঁ বলবেন, ‘দরজা’, ‘বন্ধ’, ‘ভেতর’, ‘বাইর’, ‘প্রবেশ’, ‘নিষেধ’— এই সিগনিফায়ারগুলো কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে? এই ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে চরিত্রের ডিজায়ায় কীভাবে গড়ে উঠছে? একটাই দরজা। তিন ধরনের পাঠ, তিনটি ভিন্ন গভীরতা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ও আকাঙ্ক্ষার জটিলতা

তাঁর ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-কে মনোবিশ্লেষণী দৃষ্টিতে পড়লে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জটিল সম্পর্ক সামনে আসে। ফ্রয়েডীয় পাঠ এখানে চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা ও তার সামাজিক নিষেধের সংঘাত অনুসন্ধান করতে পারে। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে উপন্যাসের সামাজিক বাস্তবতা হারিয়ে যাবে।

কারণ মানুষ শুধু অবচেতন আকাঙ্ক্ষার প্রাণি নয়; সে অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণি, সামাজিক বিধিনিষেধ ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যেও বসবাস করে। এই জায়গায় সাহিত্য পাঠের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। মনোবিশ্লেষণী পাঠকে অন্য সব পাঠের বিকল্প বানানো উচিত নয়। বরং মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি, লিঙ্গ ও সংস্কৃতির পাঠকে পাশাপাশি রাখা দরকার।

হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু’ : পরিচয় ও Other-এর দৃষ্টি

হিমু চরিত্রকে লাকীঁয় দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লেও আকর্ষণীয় কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। হিমু প্রচলিত সামাজিক পরিচয়কে প্রত্যাখ্যান করে। সে চাকরি, অর্থ, স্থায়ী সম্পর্ক কিংবা সামাজিক সাফল্যের প্রচলিত কাঠামো থেকে নিজেকে দূরে রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিচয় থেকে পালিয়ে গেলেই কি পরিচয় থেকে মুক্ত হওয়া যায়?

হিমু নিজেকে ‘হিমু’ হিসেবে নির্মাণ করে। তার পোশাক, আচরণ, কথাবার্তা, সামাজিক দূরত্ব, সবই বিশেষ সেল্ফ-ইমেজ তৈরি করে। এখানে ইমাজিনারির প্রশ্ন আসে। আবার সমাজের প্রচলিত নিয়মকে প্রত্যাখ্যান করেও সে সেই নিয়মের ভাষার মধ্যেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। এখানে সিমবোলিকের প্রশ্ন আসে। আর অন্য মানুষের চোখে হিমু কে? এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ‘আমি কে?’ প্রশ্নটা শুধু আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নয়; অন্যের দৃষ্টিতে আমি কে? সেটাও তার অংশ। এখানে লাকাঁর Other-এর ধারণা সম্ভাব্য পাঠের নতুন পথ খুলে দেয়।

‘মিসির আলি’ : যুক্তির বাইরে যে অন্ধকার

হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি চরিত্রকে ফ্রয়েডীয় বা লাকীঁয় পাঠে দেখলেও ভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

মিসির আলি মানুষের অস্বাভাবিক আচরণের ব্যাখ্যা খোঁজেন। তাঁর সামনে আসে স্বপ্ন, স্মৃতি, ভয়, বিভ্রম, অপরাধবোধ, শৈশবের অভিজ্ঞতা ও অজানা মানসিক প্রক্রিয়া।

ফ্রয়েডীয় পাঠ জিজ্ঞাসা করতে পারে, এই আচরণের নিচে কী মানসিক সংঘাত কাজ করছে?

লাকীঁয় পাঠ প্রশ্ন করতে পারে, চরিত্রটি তার নিজের অভিজ্ঞতাকে কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করছে? তার ‘আমি’ কোথায় বিভক্ত?

আর ইয়ুংয়ীয় পাঠ অনুসন্ধান করতে পারে ভয়, অন্ধকার, মা, মৃত্যু, ছায়া কিংবা অজানা সত্তার পুনরাবৃত্তির মধ্যে কোনো আর্কেটাইপাল প্যাটার্ন বা আদিরূপীয় বৈশিষ্ট্য কাজ করছে কি না। এখানেও তিন ধরনের পাঠের মধ্য দিয়ে একই চরিত্রকে তিনটি ভিন্ন দিক থেকে দেখার পর তৈরি করে।

‘মূর্ত’ ও ‘বিমূর্ত’ গল্পের পাঠ

এই তিন মনোবিশ্লেষণী চিন্তকের পদ্ধতি মূর্ত এবং বিমূর্ত, দুই ধরনের গল্পেই প্রয়োগ করা যায়। মূর্ত গল্পে চরিত্র, ঘটনা, স্থান ও বস্তু স্পষ্ট। বিমূর্ত গল্পে অর্থ অনেক সময় প্রতীক, অনুভূতি, স্বপ্ন, ভাষার বিচ্যুতি বা অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ধরা যাক, কোনো বিমূর্ত গল্পে একজন মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখে তার শরীর বিছানায় পড়ে আছে, কিন্তু তার মন ঘরের বাইরে হাঁটছে। এটি বাস্তবতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কিন্তু মনোবিশ্লেষণী পাঠ আরও প্রশ্ন তুলবে। 

ফ্রয়েডীয় পাঠ প্রশ্ন তুলবে, দেহ থেকে মনের বিচ্ছেদ কি কোনো দমন করা সংঘাতের রূপক?

ইয়ুংয়ীয় পাঠ বলবে, দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া কি আত্ম-অনুসন্ধান বা Individuation-এর কোনো প্রতীকী যাত্রা? স্বতন্ত্রীকরণ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, লাভ, পৃথকীকরণ?

লাঁকীয় পাঠ বলবে, ‘দেহ’, ‘মন’, ‘বাইরে’, ‘ভেতরে’— এই সিগনিফায়ারগুলোর সম্পর্ক কীভাবে চরিত্রের সাবজেক্ট-পজিশন তৈরি করছে? অর্থাৎ বিমূর্ততা এখানে অর্থহীনতা নয়। বরং তা অন্য ধরনের অর্থ তৈরির সুযোগ।

তিনটি লেন্স-এর একসঙ্গে ব্যবহার

পরিণত সাহিত্য সমালোচনায় ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে তিনটি আলাদা লেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ধরা যাক, গল্পে একজন মানুষ রাতে তার মৃত মাকে দেখতে পায়। ফ্রয়েড জিজ্ঞাসা করবেন, মায়ের সঙ্গে তার অসমাপ্ত শোক, অপরাধবোধ বা অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আছে কি? ইয়ুং জিজ্ঞাসা করবেন, মা কি এখানে মাদার আর্কেটাইপ-এর প্রকাশ?

লাকাঁ জিজ্ঞাসা করবেন, ‘মা’ সিগনিফায়ার চরিত্রটির ভাষা, পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার কাঠামোয় কী ভূমিকা পালন করছে? এখানে একই ঘটনা তিন স্তর পাঠের আলাদা জানালা খুলে দেয়। তবে একটি সতর্কতা, সবকিছুকে মনোবিশ্লেষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মনোবিশ্লেষণী সাহিত্য পাঠ শক্তিশালী, কিন্তু সর্বগ্রাসী নয়। কোনো গল্পে দরজা থাকলেই সেটি যৌন প্রতীক নয়। অন্ধকার থাকলেই শ্যাডো নয়।  জল থাকলেই অচেতন নয়। 

মা থাকলেই মাদার আর্কেটাইপ নয়।

আর কোনো চরিত্র ‘আমি জানি না’ বললেই তার ভাষার নিচে ‘লাকাঁন রিয়েল’ কাজ করছে— এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। কোনো মনোবিশ্লেষণী পাঠকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে আখ্যানের ভেতরে তার পক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়। চরিত্রের পুনরাবৃত্ত আচরণ, স্বপ্ন, ভাষার পুনরাবৃত্তি, প্রতীকের পুনরাবির্ভাব, কথা ও কাজের বিরোধ, নীরবতা, আখ্যানের কাঠামো, এবং অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক। অর্থাৎ তত্ত্বকে গল্পের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; গল্পের ভেতর থেকে তত্ত্বের সম্ভাবনা আবিষ্কার করাই সাহিত্য বিশ্লেষণের পরিণত পদ্ধতি।

মনোবিশ্লেণী তিন চিন্তকের তিনটি প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত, মূল বিষয়টি তিন ধরনের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে অল্প কথায় মনে রাখা যায়। ফ্রয়েড, চরিত্রটি কী অবদমন করছে? ইয়ুং, চরিত্রের অভিজ্ঞতার পেছনে কোন আর্কেটাইপ প্যাটার্ন কাজ করছে?

লাকাঁ, চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা ভাষা, সিগনিফায়ার আই আদার-এর মধ্য দিয়ে কীভাবে গঠিত হচ্ছে?

আরও সংক্ষেপে বলা যায়—

ফ্রয়েড : অবদমন ও আকাঙ্ক্ষা।

ইয়ুং: আর্কেটাইপ ও সমষ্টিগত অবচেতন।

লাঁকা: ভাষা, সিগনিফায়ার আই ডিজায়ার-এর কাঠামো।

তবে এই সূত্রগুলোকে তিনজনের পূর্ণ তত্ত্ব না ভেবে সাহিত্য পাঠের তিনটা প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

শেষকথা : সাহিত্যের অদৃশ্য ব্যাকরণ

সাহিত্য শুধু মানুষের বাইরের জীবনের বিবরণ নয়। মানুষের ভেতরে এমন অনেক কুঠুরি আছে, যার ভাষা সরাসরি বলা যায় না। সেই অদৃশ্য অঞ্চলের কিছু অংশ স্বপ্নে প্রকাশিত হয়, কিছু প্রতীকে, কিছু আচরণে, কিছু নীরবতায়, কিছু পুনরাবৃত্তিতে, আবার কিছু ভাষার ফাঁকে। ফ্রয়েড আমাদের শেখান, দৃশ্যমান আচরণের নিচে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও সংঘাত খুঁজতে। ইয়ুং আমাদের নিয়ে যান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গভীর থেকে মানবমনের আদিরূপী জগতে। লাঁকা আমাদের দেখান, আকাঙ্ক্ষা কোনো স্বচ্ছ, সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা নয়; ভাষা, Signifier, Other এবং সামাজিক প্রতীকব্যবস্থার মধ্য দিয়েও তা নির্মিত হয়। তাই কোনো গল্পকে শুধু জিজ্ঞাসা করা যথেষ্ট নয়, ‘কী ঘটল? আরও কিছু প্রশ্ন করতে হয়, কেন ঘটল? কী গোপন রইল? কোন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেল না? কোন প্রতীক ফিরে ফিরে এলো? কোন শব্দ নীরব হয়ে গেল? চরিত্রটি নিজের সম্পর্কে যে গল্প বলে, তার নিচে আরেকটা গল্প আছে কি? এসব প্রশ্নই মনোবিশ্লেষণী সাহিত্য পাঠের সৌন্দর্য উন্মোচন করে। ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাঁকা আমাদের হাতে তিন রকমের আলাদা মানচিত্র তুলে দেন। মানচিত্র তিনটার ভূগোল এক নয়। কিন্তু তিনটিই আমাদের দৃশ্যমান কাহিনির নিচে থাকা অদৃশ্য ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে যায়। সেই অর্থে সাহিত্য কেবল গল্প নয়; মানুষের অদৃশ্য মনোজগতেরও এক ধরনের পাঠ।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬


ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁর সাহিত্যপাঠ

প্রকাশের তারিখ : ২০ আগস্ট ২০২৬

featured Image


সাহিত্যের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে আরেকটা অদৃশ্য জগৎ কাজ করে। গল্পে যা বলা হয়েছে, তার পাশাপাশি থাকে যা বলা হয়নি তাও। চরিত্র যা চায়, তার পাশাপাশি থাকে এমন কিছু, নিজেই জানে না যে সে তা চায়। 

কোনো দৃশ্যের প্রকাশ্য অর্থের প্রতীকী অর্থও থাকতে পারে। কখনো স্বপ্ন, কখনো দরজা, কখনো একটা আয়না বা অন্ধকার ঘর কিংবা কোনো চরিত্রের অকারণ নীরবতা আখ্যানের গভীরে লুকিয়ে থাকা অন্য অর্থের দরজা খুলে দিতে পারে।

এই অন্তর্লীন জগতকে বোঝার ক্ষেত্রে সাহিত্যে মনস্তত্ত্বের পাঠের গুরুত্ব অপরিসীম। 

সিগমুন্ড ফ্রয়েড, কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং এবং জাক লাকাঁ, তিনজনই মানুষের দৃশ্যমান আচরণের আড়ালে থাকা অদৃশ্য মানসিক প্রক্রিয়ার দিকে তাকিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। সহজ করে বললে, ফ্রয়েড খোঁজেন অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও মানসিক সংঘাত।

ইয়ুং খোঁজেন আর্কেটাইপ বা আদিরূপ এবং প্রতীকের গভীরতর অর্থ।

লাঁকা খোঁজেন ভাষা, সিগনিফায়ার এবং আকাঙ্ক্ষা গঠনের কাঠামো। সিগনিফায়ার শব্দের বাংলা অর্থ দ্যোতক, সংকেত বা চিহ্ন। এই তিন সূত্র অবশ্যই তিনজনের বিশাল তত্ত্বের পূর্ণ সংজ্ঞা নয়; সাহিত্য পাঠের সুবিধার জন্য তৈরি এক সংক্ষিপ্ত মানচিত্র। কারণ ফ্রয়েডের মনোবিশ্লেষণ কেবল যৌন আকাঙ্ক্ষা বা দমনের তত্ত্ব নয়, ইয়ুং বর্ণিত আদিরূপ কেবল কিছু প্রতীকের তালিকা নয়, আর লাকাঁর চিন্তাও কেবল ভাষাতত্ত্বের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তবু সাহিত্য পাঠের প্রাথমিক প্রবেশদ্বার হিসেবে এই তিনটি সূত্র কার্যকর।

তিনজনকে পাশাপাশি পড়লে এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়। সাহিত্যে সৃষ্ট চরিত্রের দৃশ্যমান আচরণ তার সম্পূর্ণ মানসিক সত্য প্রকাশ করে না। 

দৃশ্যমান কাহিনির আড়ালে অদৃশ্য মন

কোনো গল্পে একজন মানুষ হঠাৎ রেগে গেল। আমরা সাধারণত বলি, বলতে পারি, সে রাগ করেছে। কিন্তু সাহিত্যিক পাঠ সেখানেই থেমে থাকে না।

প্রশ্ন ওঠে, সে কেন রাগ করল?

রাগের কারণ কি উদ্দীপক হিসেবে উস্কে দেওয়া নির্দিষ্ট ঘটনা, নাকি আসলে ঘটনাটা তার ভেতরের কোনো পুরোনো ক্ষতকে স্পর্শ করেছে?

একজন চরিত্র বারবার একই ধরনের ভুল করছে। কেন?

সে একজন  মানুষকে ঘৃণা করার কথা বলছে, অথচ অদ্ভুতভাবে সেই মানুষটির মতোই হয়ে উঠছে। কেন?

মৃত মানুষ বারবার স্বপ্নে ফিরে আসছে। কেন? 

দরজা বারবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আয়না বারবার সামনে আসছে, একই শব্দ বারবার উচ্চারিত হচ্ছে, কোনো চরিত্র কোনো কথা বলতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। কেন?

এসব ‘কেন’-এর উত্তর পেতে মনোবিশ্লেষণী পাঠের সম্ভাবনা তৈরি হয়।

ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁ একই প্রশ্নের উত্তর দেন না; তাঁরা একই অন্ধকার ঘরে তিনটে ভিন্ন আলো ফেলেন।

ফ্রয়েড : গল্পের অন্তর্লীন আকাঙ্ক্ষা

সিগমুন্ড ফ্রয়েডের চিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে আনকনশাস বা অবচেতন। মানুষের মনের বড় অংশ সচেতনতার সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আকাঙ্ক্ষা, স্মৃতি, ভয়, কল্পনা ও সংঘাতের কিছু অংশ সচেতন মন থেকে দূরে সরে যেতে পারে; কিন্তু তা সম্পূর্ণ বিলীন হয় না। অন্য কোনো পথ ধরে তা ফিরে আসতে পারে। স্বপ্ন তার এক গুরুত্বপূর্ণ পথ। ভুল কথা, আচরণের পুনরাবৃত্তি, উদ্বেগ, কল্পনা, প্রতীক কিংবা বিভিন্ন ধরনের মানসিক উপসর্গও অবচেতন সংঘাতের প্রকাশ ঘটাতে পারে।

১৯০৮ সালে প্রকাশিত ফ্রয়েডের ‘ক্রিয়েটিভ রাইটার্স এ্যান্ড ডে-ড্রিমিং’ প্রবন্ধটি সাহিত্য ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে তাঁর মনোবিশ্লেষণী চিন্তার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। সেখানে কল্পনা, দিবাস্বপ্ন, ইচ্ছাপূরণ এবং সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক নিয়ে তিনি আলোচনা করেন। তাই ফ্রয়েডীয় সাহিত্য পাঠের মৌলিক প্রশ্ন হতে পারে, চরিত্রটি আসলে কী চায়?

তার প্রকাশ্য ইচ্ছার নিচে অন্য কোনো ইচ্ছা আছে কি?

সে কি নিজের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা নিজের কাছেই স্বীকার করতে পারছে না?

কাল্পনিক উদাহরণ

ধরা যাক, গল্পের নায়ক বারবার বলছে, ‘আমি আমার বাবাকে ঘৃণা করি।’

কিন্তু গল্পে দেখা গেল, সে বাবার মতো পোশাক পরে, বাবার পেশা বেছে নেয়, বাবার মতো কথা বলে এবং বাবার স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অস্থির।

ফ্রয়েডীয় পাঠ এখানে ‘ঘৃণা’ শব্দটার ওপর থেমে থাকবে না। বরং প্রশ্ন করবে, ঘৃণার নিচে কি আকর্ষণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ঈর্ষা, পরিচয়-সংকট বা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে? এখানেই ফ্রয়েডীয় পাঠের শক্তি, বাংলা সাহিত্যে ফ্রয়েডীয় প্রভাব লুকিয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথের ‘নষ্টনীড়’ উপন্যাস-কে এই দৃষ্টিকোণ থেকে পড়া যায়।

চারুলতা, ভূপতি ও অমলের সম্পর্ককে কেবল সামাজিক বা রোমান্টিক সম্পর্ক হিসেবে পড়লে গল্পের একটা  স্তর ধরা পড়ে। কিন্তু মনোবিশ্লেষণমূলক পাঠ আরও প্রশ্ন তুলতে পারে।

চারুলতার নিঃসঙ্গতা কি শুধু স্বামীর অবহেলার ফল?

তার পাঠ, সাহিত্যচর্চা কিংবা অমলের প্রতি আকর্ষণের মধ্যে কি নিজের সত্তাকে আবিষ্কারের কোনো গভীর আকাঙ্ক্ষা কাজ করছে?

অমলের প্রতি আকর্ষণকে শুধু ‘প্রেম’ বলে চিহ্নিত করলে কি তার মানসিক জটিলতা পুরোপুরি ধরা পড়ে?

অবশ্যই এসবকে ফ্রয়েডের ‘চূড়ান্ত ব্যাখ্যা’ বলা যাবে না। বরং একটা ফ্রয়েডীয় সম্ভাব্য পাঠ হিসেবে ধরে নেয়া যায়।

একইভাবে শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’-এর চরিত্রগুলোর আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক নৈতিকতা, অপরাধবোধ, যৌনতা ও আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব মনোবিশ্লেষণী পাঠের জন্য উর্বর ক্ষেত্র। চরিত্রের ঘোষিত নৈতিক অবস্থান এবং তার বাস্তব আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ফাঁক কোথায়? ফ্রয়েডীয় পাঠ সেই ফাঁকটিকে গুরুত্ব দিতে পারে।

ফ্রয়েডীয় পাঠের কেন্দ্রে ‘ফাটল’

মনোবিশ্লেষণী পাঠের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় কী?

চরিত্র নিজেকে যতটা জানে বলে মনে করে, সে হয়তো তার চেয়েও বেশি কিছু বহন করছে।

একজন চরিত্র বলে, ‘আমি, ওকে ভালোবাসি না।’

কিন্তু তার আচরণ বারবার সেই মানুষটির দিকেই ফিরে যায়।

সে বলে, ‘আমি ক্ষমা করে দিয়েছি।’

কিন্তু তার স্বপ্নে প্রতিশোধের দৃশ্য ফিরে আসে।

সে বলে, ‘আমি বাবার মতো হতে চাই না।’

কিন্তু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে সে ক্রমেই বাবার পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

এই ফাটল মূলত কথা ও কাজের ফাটল, সচেতন ইচ্ছা ও অচেতন আকাঙ্ক্ষার ফাটল। ফ্রয়েডীয় পাঠের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র এখানেই লুকিয়ে রয়েছে। 

ইয়ুং : ব্যক্তিগত মন থেকে মানবমনের আদিরূপে

ফ্রয়েডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পর কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং নিজস্ব ‘এ্যানালিটিক্যাল সাইকোলজি’ নির্মাণ করেন। তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে আসে ‘কালেকটিভ আনকনশাস’ বা সমষ্টিগত অবচেতন এবং ‘আর্কেটাইপ’।

ইয়ুংয়ের মতে, মানুষের মানসিক জীবন শুধু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানব জাতির দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ও মানসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু আদিরূপী বিন্যাস মানুষের মানসিক জগতে কাজ করতে পারে।

‘দ্য আর্কেটাইপ এ্যান্ড দ্য কালেকটিভ আনকনশাস’ তাঁর এই চিন্তার অন্যতম প্রধান উৎস। গ্রন্থটি কালেকটিভ ওয়ার্কস, ভল্যুউম ৯, পার্ট ১ হিসেবে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যে এই ধারণার প্রয়োগ অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং-এর তত্ত্বে নারীর অচেতন মনের পুরুষসুলভ অংশকে ‘অ্যানিমাস’ বলা হয়। প্রতিশব্দ সিনোনিমস উঁচু।

তবে এখানে একটা সতর্কতা জরুরি। আর্কেটাইপ-কে কোনো স্থির ‘প্রতীকের অভিধান’ হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক নয়। অর্থাৎ ‘সাপ মানেই এই’, ‘জল মানেই ওই’— এমন যান্ত্রিক পদ্ধতি ইয়ুংয়ের জটিল চিন্তাকে সরল করে ফেলে। কোনো প্রতীকের অর্থ তার আখ্যানচিত্র ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতের ওপরও নির্ভর করে।

‘ছায়া : নিজের অস্বীকৃত সত্তার মুখোমুখি

ইয়ুংয়ের শ্যাডো ধারণা সাহিত্য পাঠে বিশেষ কার্যকর। ধরা যাক, কোনো গল্পের নায়ক নিজেকে অত্যন্ত সৎ, নৈতিক ও শান্ত মানুষ হিসেবে দেখে। কিন্তু গল্পের কোনো এক পর্যায়ে সে এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হয়, যাকে সে ঘৃণা করে। আশ্চর্যের বিষয় হলো তার ঘৃণার পাত্রটির আচরণের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজেরই কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়।

ইয়ুংয়ীয় পাঠ প্রশ্ন করবে, সে কি অন্যের মধ্যে নিজের অস্বীকৃত সত্তাকে দেখছে?

এখানে ‘অন্য’ চরিত্রটি কেবল ভিলেন নয়; সে নায়কের শ্যাডো-ও হতে পারে।

বিভূতিভূষণের অরণ্য : একটি সম্ভাব্য ইয়ুংয়ীয় পাঠ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাস এই প্রসঙ্গে একটা আকর্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে। উপন্যাসের অরণ্য কেবল এক ভৌগোলিক স্থান নয়; মানুষের সভ্যতা, প্রকৃতি, একাকিত্ব, আকর্ষণ, ভয় ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জটিল সম্পর্কও তৈরি করে। ইয়ুংয়ীয় পাঠে অরণ্যকে মানুষের অচেতন বা অজানা সত্তার প্রতীকী ক্ষেত্র হিসেবে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শহর ও অরণ্যের দ্বন্দ্ব তখন শুধু দুটি ভৌগোলিক পরিসরের দ্বন্দ্ব থাকে না; হয়ে উঠতে পারে পরিচিত ও অচেনা, সচেতন ও অচেতন, সভ্যসত্তা ও আদিমসত্তার দ্বন্দ্ব। এখানেও সতর্কতা জরুরি। 

‘আরণ্যক’কে শুধু ইয়ুং দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তার সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও ঐতিহাসিক মাত্রা উপেক্ষিত হবে। তাই ইয়ুং এখানে পূর্ণ ব্যাখ্যা নয়; একটা অতিরিক্ত পাঠের চশমা। 

লাকাঁ : অবচেতনও ভাষার মতো সংগঠিত

জাক লাকাঁ ফ্রয়েডকে নতুনভাবে পাঠ করেন এবং মনোবিশ্লেষণের সঙ্গে ভাষাতত্ত্বের সম্পর্ক গভীর করেন। তাঁর বহুল উদ্ধৃত সূত্র: The unconscious is structured like a language.

লাকাঁর চিন্তার ক্ষেত্রে ভাষা, Signifier, Subject, Other এবং Desire অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রয়েড প্রশ্ন করতে পারেন, চরিত্রটি কী দমন করছে?

লাঁকা প্রশ্নটিকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন, চরিত্রটি কীভাবে ভাষার মধ্যে নিজের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করছে?

কোন শব্দ বারবার ফিরে আসছে? কোন কথা বলতে গিয়ে সে থেমে যাচ্ছে? তার ভাষায় কোথায় অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে?

সে কী বলছে এবং কীভাবে বলছে, এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? লাকীঁয় সাহিত্য পাঠের বিশেষ শক্তি এখানেই আলো ছড়ায়।

লাকাঁর ইমাজিনারি, সিমবোলিক আই রিয়েল

লাঁকার চিন্তার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেজিস্টার হলো ইমাজিনারি, সিমবোলিক আই রিয়েল। ইমাজিনারি: প্রতিচ্ছবি ও আত্মপরিচয়।

মিরর স্টেজ-এর ধারণায় লাকাঁ দেখান, শিশুর আত্মপরিচয় কীভাবে নিজের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে আইডেন্টিফিকেশনের সম্পর্কের মধ্যে গড়ে ওঠে।

সাহিত্যে কোনো চরিত্র নিজের যে পরিচয় নির্মাণ করে এবং বাস্তবে সে যে মানুষ; দুইয়ের মধ্যে যদি ফাঁক থাকে, লাকীঁয় পাঠ সেই ফাঁককে অনুসন্ধান করতে পারে।

সিমবোলিক : ভাষা, নিয়ম ও সামাজিক জগৎ

মানুষ শুধু ‘নিজের ভেতর’ থেকে নিজের পরিচয় তৈরি করে না। সে ভাষা, পরিবার, সংস্কৃতি, আইন, সামাজিক সম্পর্ক ও প্রতীকী ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে।

তাই ‘আমি কে?’ প্রশ্নটার উত্তর ব্যক্তিগত নয় শুধু; সামাজিক এবং ভাষাগতও।

রিয়েল: ভাষার সীমা

লাঁকার ‘রিয়েল’কে সাধারণ অর্থে ‘বাস্তবতা’ বলা ভুল হবে।

‘রিয়েল’ এমন এক ক্ষেত্র, যা সিমবোলিক বা ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না।

যখন কোনো অভিজ্ঞতা ভাষায় সম্পূর্ণভাবে ধরা যায় না, তখন সিমবোলিক বা ভাষাগত কাঠামোর সীমা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ভাষাহীনতা বা নীরবতাও তখন অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।

লাকাঁ ও রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’

রবীন্দ্রনাথের ‘চোখের বালি’ উপন্যাসকে লাকীঁয় চশমা বা লেন্স দিয়ে পড়লে আকর্ষণীয় প্রশ্ন উঠে আসে।

চরিত্রগুলো আসলে কাকে চায়?

বিনোদিনী কি শুধু মহেন্দ্রকে চায়?

মহেন্দ্র কি শুধু বিনোদিনীকে চায়?

আশা কী চায়?

আর প্রত্যেকের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে অন্যের আকাঙ্ক্ষা কতটা কাজ করে?

লাঁকার ‘ডিজায়ার অফ দ্য আদার’ ধারণা দিয়ে এই সম্পর্কগুলোকে পড়লে দেখা যায়, মানুষের আকাঙ্ক্ষা সবসময় সরলভাবে ‘আমি তাকে চাই’ আকারে কাজ করে না। অন্যের দৃষ্টি, স্বীকৃতি, প্রত্যাখ্যান, আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক অবস্থান নিজের আকাঙ্ক্ষাকে গঠন করে।

বিনোদিনীর আকাঙ্ক্ষাকে তাই শুধু প্রেমের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রশ্ন করে পড়া যায়, সে অন্যের কাছে কে হতে চায়? অন্যের চোখে নিজের মূল্য কীভাবে নির্মাণ করে? এটিও অবশ্যই উপন্যাসটির একমাত্র পাঠ নয়।

একই চরিত্র : তিনটি ভিন্ন প্রশ্ন

ধরা যাক, কোনো গল্পে এক নারী চরিত্র বারবার একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়ায়।

ফ্রয়েড বলবেন, দরজার ওপারে কী আছে? কোনো আকাঙ্ক্ষা বা স্মৃতি সে দমন করছে? দরজাটা কি নিষিদ্ধ ইচ্ছার প্রতীক?

ইয়ুং বলবেন, দরজাটা কি অচেতন জগতের প্রবেশপথ? নায়িকা কি নিজের অচেনা সত্তার দিকে এগোচ্ছে, দরজা পেরিয়ে? দরজার ওপারের অন্ধকার কি শ্যাডো-এর ক্ষেত্র?

লাকাঁ বলবেন, ‘দরজা’, ‘বন্ধ’, ‘ভেতর’, ‘বাইর’, ‘প্রবেশ’, ‘নিষেধ’— এই সিগনিফায়ারগুলো কীভাবে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে? এই ভাষাগত কাঠামোর মধ্যে চরিত্রের ডিজায়ায় কীভাবে গড়ে উঠছে? একটাই দরজা। তিন ধরনের পাঠ, তিনটি ভিন্ন গভীরতা।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ও আকাঙ্ক্ষার জটিলতা

তাঁর ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’-কে মনোবিশ্লেষণী দৃষ্টিতে পড়লে মানুষের আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার জটিল সম্পর্ক সামনে আসে। ফ্রয়েডীয় পাঠ এখানে চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা ও তার সামাজিক নিষেধের সংঘাত অনুসন্ধান করতে পারে। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে উপন্যাসের সামাজিক বাস্তবতা হারিয়ে যাবে।

কারণ মানুষ শুধু অবচেতন আকাঙ্ক্ষার প্রাণি নয়; সে অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণি, সামাজিক বিধিনিষেধ ও ক্ষমতার সম্পর্কের মধ্যেও বসবাস করে। এই জায়গায় সাহিত্য পাঠের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। মনোবিশ্লেষণী পাঠকে অন্য সব পাঠের বিকল্প বানানো উচিত নয়। বরং মনস্তত্ত্বের সঙ্গে সমাজ, ইতিহাস, অর্থনীতি, লিঙ্গ ও সংস্কৃতির পাঠকে পাশাপাশি রাখা দরকার।

হুমায়ূন আহমেদের ‘হিমু’ : পরিচয় ও Other-এর দৃষ্টি

হিমু চরিত্রকে লাকীঁয় দৃষ্টিকোণ থেকে পড়লেও আকর্ষণীয় কিছু প্রশ্ন উঠে আসে। হিমু প্রচলিত সামাজিক পরিচয়কে প্রত্যাখ্যান করে। সে চাকরি, অর্থ, স্থায়ী সম্পর্ক কিংবা সামাজিক সাফল্যের প্রচলিত কাঠামো থেকে নিজেকে দূরে রাখে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরিচয় থেকে পালিয়ে গেলেই কি পরিচয় থেকে মুক্ত হওয়া যায়?

হিমু নিজেকে ‘হিমু’ হিসেবে নির্মাণ করে। তার পোশাক, আচরণ, কথাবার্তা, সামাজিক দূরত্ব, সবই বিশেষ সেল্ফ-ইমেজ তৈরি করে। এখানে ইমাজিনারির প্রশ্ন আসে। আবার সমাজের প্রচলিত নিয়মকে প্রত্যাখ্যান করেও সে সেই নিয়মের ভাষার মধ্যেই নিজের পরিচয় নির্মাণ করে। এখানে সিমবোলিকের প্রশ্ন আসে। আর অন্য মানুষের চোখে হিমু কে? এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ, ‘আমি কে?’ প্রশ্নটা শুধু আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন নয়; অন্যের দৃষ্টিতে আমি কে? সেটাও তার অংশ। এখানে লাকাঁর Other-এর ধারণা সম্ভাব্য পাঠের নতুন পথ খুলে দেয়।

‘মিসির আলি’ : যুক্তির বাইরে যে অন্ধকার

হুমায়ূন আহমেদের মিসির আলি চরিত্রকে ফ্রয়েডীয় বা লাকীঁয় পাঠে দেখলেও ভিন্ন সম্ভাবনা তৈরি হয়।

মিসির আলি মানুষের অস্বাভাবিক আচরণের ব্যাখ্যা খোঁজেন। তাঁর সামনে আসে স্বপ্ন, স্মৃতি, ভয়, বিভ্রম, অপরাধবোধ, শৈশবের অভিজ্ঞতা ও অজানা মানসিক প্রক্রিয়া।

ফ্রয়েডীয় পাঠ জিজ্ঞাসা করতে পারে, এই আচরণের নিচে কী মানসিক সংঘাত কাজ করছে?

লাকীঁয় পাঠ প্রশ্ন করতে পারে, চরিত্রটি তার নিজের অভিজ্ঞতাকে কোন ভাষায় ব্যাখ্যা করছে? তার ‘আমি’ কোথায় বিভক্ত?

আর ইয়ুংয়ীয় পাঠ অনুসন্ধান করতে পারে ভয়, অন্ধকার, মা, মৃত্যু, ছায়া কিংবা অজানা সত্তার পুনরাবৃত্তির মধ্যে কোনো আর্কেটাইপাল প্যাটার্ন বা আদিরূপীয় বৈশিষ্ট্য কাজ করছে কি না। এখানেও তিন ধরনের পাঠের মধ্য দিয়ে একই চরিত্রকে তিনটি ভিন্ন দিক থেকে দেখার পর তৈরি করে।

‘মূর্ত’ ও ‘বিমূর্ত’ গল্পের পাঠ

এই তিন মনোবিশ্লেষণী চিন্তকের পদ্ধতি মূর্ত এবং বিমূর্ত, দুই ধরনের গল্পেই প্রয়োগ করা যায়। মূর্ত গল্পে চরিত্র, ঘটনা, স্থান ও বস্তু স্পষ্ট। বিমূর্ত গল্পে অর্থ অনেক সময় প্রতীক, অনুভূতি, স্বপ্ন, ভাষার বিচ্যুতি বা অস্বাভাবিক ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। ধরা যাক, কোনো বিমূর্ত গল্পে একজন মানুষ ঘুম থেকে উঠে দেখে তার শরীর বিছানায় পড়ে আছে, কিন্তু তার মন ঘরের বাইরে হাঁটছে। এটি বাস্তবতার প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। কিন্তু মনোবিশ্লেষণী পাঠ আরও প্রশ্ন তুলবে। 

ফ্রয়েডীয় পাঠ প্রশ্ন তুলবে, দেহ থেকে মনের বিচ্ছেদ কি কোনো দমন করা সংঘাতের রূপক?

ইয়ুংয়ীয় পাঠ বলবে, দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া কি আত্ম-অনুসন্ধান বা Individuation-এর কোনো প্রতীকী যাত্রা? স্বতন্ত্রীকরণ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, লাভ, পৃথকীকরণ?

লাঁকীয় পাঠ বলবে, ‘দেহ’, ‘মন’, ‘বাইরে’, ‘ভেতরে’— এই সিগনিফায়ারগুলোর সম্পর্ক কীভাবে চরিত্রের সাবজেক্ট-পজিশন তৈরি করছে? অর্থাৎ বিমূর্ততা এখানে অর্থহীনতা নয়। বরং তা অন্য ধরনের অর্থ তৈরির সুযোগ।

তিনটি লেন্স-এর একসঙ্গে ব্যবহার

পরিণত সাহিত্য সমালোচনায় ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাকাঁকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না বানিয়ে তিনটি আলাদা লেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যায়। ধরা যাক, গল্পে একজন মানুষ রাতে তার মৃত মাকে দেখতে পায়। ফ্রয়েড জিজ্ঞাসা করবেন, মায়ের সঙ্গে তার অসমাপ্ত শোক, অপরাধবোধ বা অবদমিত আকাঙ্ক্ষা আছে কি? ইয়ুং জিজ্ঞাসা করবেন, মা কি এখানে মাদার আর্কেটাইপ-এর প্রকাশ?

লাকাঁ জিজ্ঞাসা করবেন, ‘মা’ সিগনিফায়ার চরিত্রটির ভাষা, পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষার কাঠামোয় কী ভূমিকা পালন করছে? এখানে একই ঘটনা তিন স্তর পাঠের আলাদা জানালা খুলে দেয়। তবে একটি সতর্কতা, সবকিছুকে মনোবিশ্লেষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মনোবিশ্লেষণী সাহিত্য পাঠ শক্তিশালী, কিন্তু সর্বগ্রাসী নয়। কোনো গল্পে দরজা থাকলেই সেটি যৌন প্রতীক নয়। অন্ধকার থাকলেই শ্যাডো নয়।  জল থাকলেই অচেতন নয়। 

মা থাকলেই মাদার আর্কেটাইপ নয়।

আর কোনো চরিত্র ‘আমি জানি না’ বললেই তার ভাষার নিচে ‘লাকাঁন রিয়েল’ কাজ করছে— এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। কোনো মনোবিশ্লেষণী পাঠকে গ্রহণযোগ্য করতে হলে আখ্যানের ভেতরে তার পক্ষে প্রমাণ খুঁজতে হয়। চরিত্রের পুনরাবৃত্ত আচরণ, স্বপ্ন, ভাষার পুনরাবৃত্তি, প্রতীকের পুনরাবির্ভাব, কথা ও কাজের বিরোধ, নীরবতা, আখ্যানের কাঠামো, এবং অন্যান্য চরিত্রের সঙ্গে সম্পর্ক। অর্থাৎ তত্ত্বকে গল্পের ওপর চাপিয়ে দেওয়া নয়; গল্পের ভেতর থেকে তত্ত্বের সম্ভাবনা আবিষ্কার করাই সাহিত্য বিশ্লেষণের পরিণত পদ্ধতি।

মনোবিশ্লেণী তিন চিন্তকের তিনটি প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত, মূল বিষয়টি তিন ধরনের প্রশ্নের মধ্য দিয়ে অল্প কথায় মনে রাখা যায়। ফ্রয়েড, চরিত্রটি কী অবদমন করছে? ইয়ুং, চরিত্রের অভিজ্ঞতার পেছনে কোন আর্কেটাইপ প্যাটার্ন কাজ করছে?

লাকাঁ, চরিত্রের আকাঙ্ক্ষা ভাষা, সিগনিফায়ার আই আদার-এর মধ্য দিয়ে কীভাবে গঠিত হচ্ছে?

আরও সংক্ষেপে বলা যায়—

ফ্রয়েড : অবদমন ও আকাঙ্ক্ষা।

ইয়ুং: আর্কেটাইপ ও সমষ্টিগত অবচেতন।

লাঁকা: ভাষা, সিগনিফায়ার আই ডিজায়ার-এর কাঠামো।

তবে এই সূত্রগুলোকে তিনজনের পূর্ণ তত্ত্ব না ভেবে সাহিত্য পাঠের তিনটা প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করাই যুক্তিযুক্ত।

শেষকথা : সাহিত্যের অদৃশ্য ব্যাকরণ

সাহিত্য শুধু মানুষের বাইরের জীবনের বিবরণ নয়। মানুষের ভেতরে এমন অনেক কুঠুরি আছে, যার ভাষা সরাসরি বলা যায় না। সেই অদৃশ্য অঞ্চলের কিছু অংশ স্বপ্নে প্রকাশিত হয়, কিছু প্রতীকে, কিছু আচরণে, কিছু নীরবতায়, কিছু পুনরাবৃত্তিতে, আবার কিছু ভাষার ফাঁকে। ফ্রয়েড আমাদের শেখান, দৃশ্যমান আচরণের নিচে অবদমিত আকাঙ্ক্ষা ও সংঘাত খুঁজতে। ইয়ুং আমাদের নিয়ে যান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গভীর থেকে মানবমনের আদিরূপী জগতে। লাঁকা আমাদের দেখান, আকাঙ্ক্ষা কোনো স্বচ্ছ, সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা নয়; ভাষা, Signifier, Other এবং সামাজিক প্রতীকব্যবস্থার মধ্য দিয়েও তা নির্মিত হয়। তাই কোনো গল্পকে শুধু জিজ্ঞাসা করা যথেষ্ট নয়, ‘কী ঘটল? আরও কিছু প্রশ্ন করতে হয়, কেন ঘটল? কী গোপন রইল? কোন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পেল না? কোন প্রতীক ফিরে ফিরে এলো? কোন শব্দ নীরব হয়ে গেল? চরিত্রটি নিজের সম্পর্কে যে গল্প বলে, তার নিচে আরেকটা গল্প আছে কি? এসব প্রশ্নই মনোবিশ্লেষণী সাহিত্য পাঠের সৌন্দর্য উন্মোচন করে। ফ্রয়েড, ইয়ুং ও লাঁকা আমাদের হাতে তিন রকমের আলাদা মানচিত্র তুলে দেন। মানচিত্র তিনটার ভূগোল এক নয়। কিন্তু তিনটিই আমাদের দৃশ্যমান কাহিনির নিচে থাকা অদৃশ্য ভূখণ্ডের দিকে নিয়ে যায়। সেই অর্থে সাহিত্য কেবল গল্প নয়; মানুষের অদৃশ্য মনোজগতেরও এক ধরনের পাঠ।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত