দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পাকিস্তান বর্তমানে ক্ষুধা ও দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি মোকাবিলায় আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স—জিএইচআই) দেশটির অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১০৬তম স্থানে এবং তাদের বর্তমান স্কোর বেড়ে হয়েছে ২৫ দশমিক ৫।
যেখানে ২০১৮ সালে এই স্কোর ছিল ২৪, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষুধা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো বিগত দুই দশকে ধারাবাহিক উন্নতি অব্যাহত রাখলেও পাকিস্তানের অগ্রগতির চাকা একেবারেই থমকে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানে কর্মসংস্থানে নারীদের সীমিত সুযোগ, শিশুদের সুদীর্ঘকালীন অপুষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং মারাত্মক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান বিষয়টির কারণ ব্যাখ্যা করে নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, "বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা একদম ঘরে ঘরে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। স্যানিটেশন ও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।"
অন্যদিকে ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজা মন্তব্য করেন, "পাকিস্তানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন খাতে কখনোই পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে যাদের এই সেবাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে এগুলো কোনোদিনই পৌঁছায় না।"
এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বেসামাল মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের নরফোক স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিবিদ আসমা হায়দার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে গমের আটার দাম আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ এবং পেঁয়াজের দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "এসব তীব্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।"
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাভেদ হাসান আরও যুক্ত করেন, "বিশেষ করে আটার মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের এই আকাশছোঁয়া দামের চাপ সাধারণ পরিবারগুলো আর কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছে না। ফলে তারা শুরুতেই খাদ্যের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ডাল, দুধ ও ডিমের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, যা ছোট শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধিতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
একইসাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনও পাকিস্তানের কৃষিতে মরণাঘাত হানছে। এ প্রসঙ্গে ইসলামাবাদের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও সার্কুলার ইকোনমি বিভাগের প্রধান জয়নাব নাঈম বলেন, "প্রচণ্ড গরমে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এরপর আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা মাঠের উৎপাদিত ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে।"
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মনে করেন, "প্রতিটি বন্যার পর খাবার জোগাড় করতে কোনো পরিবারকে যেন তার উৎপাদনশীল মূল সম্পদ বিক্রি করতে না হয়, সেই সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।"
শিশুদের ক্রমবর্ধমান অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থনীতিবিদ আসমা হায়দার বলেন, "১৪ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত প্রতিটি সূচককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।"
তিনি হুশিয়ারি দিয়ে যোগ করেন, "শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শারীরিক বিকাশ আগামী দিনে পাকিস্তানের সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।"
বিষয়টি নিয়ে একই সুরে অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজাও সখেদে মন্তব্য করেন, "পাকিস্তানের ক্ষুধার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে বাবা-মায়ের চূড়ান্ত দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকট তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় পাকিস্তান বর্তমানে ক্ষুধা ও দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টি মোকাবিলায় আশঙ্কাজনকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে (গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স—জিএইচআই) দেশটির অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১০৬তম স্থানে এবং তাদের বর্তমান স্কোর বেড়ে হয়েছে ২৫ দশমিক ৫।
যেখানে ২০১৮ সালে এই স্কোর ছিল ২৪, যা স্পষ্ট নির্দেশ করে যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ক্ষুধা পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি হচ্ছে। বিপরীতে বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো বিগত দুই দশকে ধারাবাহিক উন্নতি অব্যাহত রাখলেও পাকিস্তানের অগ্রগতির চাকা একেবারেই থমকে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানে কর্মসংস্থানে নারীদের সীমিত সুযোগ, শিশুদের সুদীর্ঘকালীন অপুষ্টি, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবারের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি এবং মারাত্মক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে।
লন্ডনভিত্তিক আর্থিক বিশ্লেষক জাভেদ হাসান বিষয়টির কারণ ব্যাখ্যা করে নিক্কেই এশিয়াকে বলেন, "বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাতে নারীদের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা একদম ঘরে ঘরে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। স্যানিটেশন ও মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে।"
অন্যদিকে ইসলামাবাদভিত্তিক স্বাধীন অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজা মন্তব্য করেন, "পাকিস্তানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পানি ও স্যানিটেশন খাতে কখনোই পর্যাপ্ত অর্থ ব্যয় করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে যাদের এই সেবাগুলো সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছে এগুলো কোনোদিনই পৌঁছায় না।"
এর পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর বেসামাল মূল্যবৃদ্ধি নতুন করে বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের নরফোক স্টেট ইউনিভার্সিটির সঙ্গে যুক্ত অর্থনীতিবিদ আসমা হায়দার জানান, সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে গমের আটার দাম আগের বছরের তুলনায় ২৮ শতাংশ এবং পেঁয়াজের দাম ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, "এসব তীব্র মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন আয়ের ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর পক্ষে পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার কেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।"
পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জাভেদ হাসান আরও যুক্ত করেন, "বিশেষ করে আটার মতো প্রধান খাদ্যপণ্যের এই আকাশছোঁয়া দামের চাপ সাধারণ পরিবারগুলো আর কোনোভাবেই সামাল দিতে পারছে না। ফলে তারা শুরুতেই খাদ্যের বৈচিত্র্য কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। ডাল, দুধ ও ডিমের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খাদ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ছে, যা ছোট শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধিতে ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।"
একইসাথে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনও পাকিস্তানের কৃষিতে মরণাঘাত হানছে। এ প্রসঙ্গে ইসলামাবাদের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও সার্কুলার ইকোনমি বিভাগের প্রধান জয়নাব নাঈম বলেন, "প্রচণ্ড গরমে কৃষি উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে। এরপর আকস্মিক শিলাবৃষ্টি ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা মাঠের উৎপাদিত ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করছে।"
পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি মনে করেন, "প্রতিটি বন্যার পর খাবার জোগাড় করতে কোনো পরিবারকে যেন তার উৎপাদনশীল মূল সম্পদ বিক্রি করতে না হয়, সেই সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।"
শিশুদের ক্রমবর্ধমান অপুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থনীতিবিদ আসমা হায়দার বলেন, "১৪ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যার দিক থেকে পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত প্রতিটি সূচককে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।"
তিনি হুশিয়ারি দিয়ে যোগ করেন, "শিশুদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শারীরিক বিকাশ আগামী দিনে পাকিস্তানের সার্বিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সরাসরি প্রভাবিত করবে।"
বিষয়টি নিয়ে একই সুরে অর্থনীতিবিদ নিয়াজ মুর্তাজাও সখেদে মন্তব্য করেন, "পাকিস্তানের ক্ষুধার এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান স্পষ্ট দেখিয়ে দিচ্ছে, কীভাবে বাবা-মায়ের চূড়ান্ত দারিদ্র্য ও আর্থিক সংকট তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"

আপনার মতামত লিখুন