ষাটের দশকের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের ভিপি, ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষের ডাকসুর জিএস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর দুটি বছর পার হয়ে গেল। নীরবে-নিভৃতে তার মৃত্যুদিন পার হলেও বারবার মনে পড়ছিল, এই বিশাল বাংলাদেশে ইউনূস আমলে মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদের নিজের জন্য আলাদা করে কবরের জায়গা হলো না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান। তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন বা শহীদ মিনারের পাদদেশে নিতে দেওয়া হয়নি। এ দুঃখবোধ অনেককেই পীড়িত করে। হতে পারে, তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের দল নয়। মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জীবনে সৎ বহু মানুষও এই দল করেন, এখনো দলকে ভালোবাসেন। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ যা-ই থাকুক, এই দল তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর ইউনূসের অন্তর্বর্তী দেড় বছর এবং তৎপরবর্তী আট মাসের শাসন দেখে তো স্পষ্ট যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে, দলবাজি আর দখলদারত্বে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে, অর্থনীতিতে লুটেরা ধারা অব্যাহত রাখতে—কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান।
ষাটের দশকে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা বক্তৃতা সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদিতে কাঁপন ধরাত। ‘৬৭ সালে আপত্তিকর বক্তৃতা করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগানের সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাই স্লোগানও ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার যে উদ্দীপ্ত ভাষণ, সেই উদ্দীপ্ত ভাষণ তাকে অগ্নিকন্যার রূপ দিয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের কিছু গৌরবান্বিত অধ্যায়ে তার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইয়ুব খানের আমলে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশেও বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময়ে তাকে একাধিকবার কারান্তরালে থাকতে হয়েছে।
মতিয়া চৌধুরীকে প্রথম দেখেছি দূর থেকে ১৯৭০ সালে খুলনায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক জনসভায়। আর খুব কাছ থেকেও দেখি ১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জের থানাপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে। ন্যাপের জনসভা শেষে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য বাসা ও বাসার সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। তাই কথা বলার মতো সুযোগ পাইনি।
কথা বলার এবং তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ হয় ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে। তখন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এবং সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে আসীন জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ মুক্তিযুদ্ধকালের মুক্তিবাহিনীপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে প্রার্থী করে। গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের কার্যালয় ছিল বঙ্গভবনের পেছনের দিকটায় ওয়ারীতে ঢোকার মুখের রাস্তায়। মতিয়া আপার বাসা সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের নাসিরুদ্দিন লেনের একটি ভাড়া বাসায় তিনি দীর্ঘকাল বসবাস করতেন। মতিয়া আপা অধিকাংশ দিনই নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ঢাকার বাইরে থাকতেন। যেদিন ঢাকায় থাকতেন এবং সন্ধ্যায় ঐক্যজোট অফিসে আসতেন, তখন প্রায়ই আমার ডাক পড়ত মতিয়া আপাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই পৌঁছে দেওয়ার পথে তার সঙ্গে পরিচয়টা গড়ে ওঠে।
এরপর ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মতিয়া আপাকে অতিথি করায় তাকে বাসা বা ন্যাপ অফিস থেকে নিয়ে আসতাম এবং পরে বাসায় পৌঁছে দিতাম। তখন রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো। আমার মতামত ওনার পছন্দ হতো না। ধমক দিতেন। ডাকসু নির্বাচনও তখন খুবই সন্নিকটে। ছাত্র ইউনিয়ন এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে তিনি আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন—যেন আমিই নীতিনির্ধারক! যাহোক, আমার কাছ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী কৌশল জানার পর কয়েক দিন আমার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। মতিয়া আপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েকটি হলের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।
এর অল্প কিছুদিন পরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগদানের দু-এক দিন আগে সিপিবি অফিসে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় দেখলাম, চোখ ছলছল। অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেন না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। এরপর আর মতিয়া আপার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী হওয়ার পরও নয়। মন্ত্রীদের বাসায় যেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। তবে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে সচিবালয় অভিমুখে তার গাড়ি যাওয়ার সময় দেখতাম, গাড়ির ভেতরে বসে আছেন। কোনো রকম পুলিশি প্রহরা ছাড়াই তিনি চলাচল করতেন।
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী হিসেবে এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তিনি যে সৎ, দক্ষ এবং সফল ছিলেন, তা তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও বলে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে ছিলেন, সেই দল দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে কারচুপি-কারসাজির ভোট অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। মতিয়া চৌধুরীকে সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পক্ষে নিঃশর্ত ওকালতি করতে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এটা তার জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যায় না। তবে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তিনি বাম আদর্শ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। এটা একান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পাঁচ বছর মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী ছিলাম। তিনি তখন মন্ত্রী। আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেরানি হয়েও থাকতাম ১,৬০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। আর মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী থাকতেন ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।
মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদকে সম্মান না জানিয়ে সেদিন ইউনূস তার ছোট মনের পরিচয়কেই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। জীবন অবসানের পর পত্রপত্রিকায় মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী ও নির্লোভ জীবন নিয়ে সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ইউনূস ডাস্টবিন শফিক হিসেবে খ্যাত তার প্রেস সচিবকে দিয়ে পত্রিকাগুলোকে ধমক দিয়ে ও উপহাস করে স্ট্যাটাস দেওয়ান যে, ‘মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ দেখে মনে হচ্ছে একজন মুরিদ তার পীর সম্বন্ধে লিখছেন’।
অবশ্য শুধুমাত্র মতিয়া চৌধুরী ইস্যু নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে ইউনূস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট মনের পরিচয় দিয়ে তার কিশোর বাহিনীর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা উসকে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ধ্বংস, সবকিছুই হয়েছে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ও সমর্থনে। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বললেন, তার সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নীতিতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু নিষিদ্ধ আয়োজন সম্পন্ন করতে নিজ সরকারি বাসভবনের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তার কিশোর-তরুণ বাহিনী ও উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নামিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে যার যত মতান্তর থাকুক না কেন, তিনি নোবেল বিজয়ী হয়ে নিজেকে একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনকালে নিজেই তা আবার ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। তিনি ইতিহাসের রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে এমন কিশোর-তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন, যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছবি কালি দিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে। তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দুর্গাপূজা উৎসবের এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ‘গরু জবাই ও গরু ভোজের’ মহোৎসব করছে। ইউনূসীয় দীক্ষায় এ কোন তরুণদের আবির্ভাব হলো! এরা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের নবহিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ইসলামী সংস্করণ। দেশকে ধর্মীয় বিভাজনের পথে নিয়ে যাওয়ার এ দায় প্রধানত ইউনূসের ওপরই বর্তায়। আর ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সমাজে যে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করায় বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের যে বিকৃত উত্থান হয়েছে—শেখ হাসিনা ও তার দলও কি এ দায় এড়াতে পারবেন?
অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সৃষ্টি। ইতিহাস মতিয়া চৌধুরীকে সমালোচনাসহ তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু রিসেট ‘বাটন টেপনেওয়ালাদের’ জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম সাহেবই ইতিহাসের ডাস্টবিন প্রস্তুত করে যাবেন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬
ষাটের দশকের প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেত্রী, ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের ১৯৬১-৬২ শিক্ষাবর্ষের ভিপি, ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষের ডাকসুর জিএস এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি মতিয়া চৌধুরীর মৃত্যুর পর দুটি বছর পার হয়ে গেল। নীরবে-নিভৃতে তার মৃত্যুদিন পার হলেও বারবার মনে পড়ছিল, এই বিশাল বাংলাদেশে ইউনূস আমলে মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদের নিজের জন্য আলাদা করে কবরের জায়গা হলো না, পেলেন না মুক্তিযোদ্ধার অন্তিম সম্মান। তার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবন বা শহীদ মিনারের পাদদেশে নিতে দেওয়া হয়নি। এ দুঃখবোধ অনেককেই পীড়িত করে। হতে পারে, তিনি আওয়ামী লীগের নেত্রী ছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো শুধুমাত্র দুর্নীতিগ্রস্তদের দল নয়। মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তি জীবনে সৎ বহু মানুষও এই দল করেন, এখনো দলকে ভালোবাসেন। আমাদের পছন্দ-অপছন্দ যা-ই থাকুক, এই দল তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। আর ইউনূসের অন্তর্বর্তী দেড় বছর এবং তৎপরবর্তী আট মাসের শাসন দেখে তো স্পষ্ট যে কর্তৃত্ববাদী মনোভাবে, দলবাজি আর দখলদারত্বে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বজায় রাখতে, অর্থনীতিতে লুটেরা ধারা অব্যাহত রাখতে—কেহ কারে নাহি পারে সমানে সমান।
ষাটের দশকে মতিয়া চৌধুরীর অগ্নিঝরা বক্তৃতা সামরিক শাসক আইয়ুব খানের গদিতে কাঁপন ধরাত। ‘৬৭ সালে আপত্তিকর বক্তৃতা করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করার পর থেকে শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগানের সঙ্গে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরীর মুক্তি চাই স্লোগানও ছাত্র আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান ছিল। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তার যে উদ্দীপ্ত ভাষণ, সেই উদ্দীপ্ত ভাষণ তাকে অগ্নিকন্যার রূপ দিয়েছিল। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে আশির দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনসহ ইতিহাসের কিছু গৌরবান্বিত অধ্যায়ে তার নাম উজ্জ্বল হয়ে আছে। আইয়ুব খানের আমলে তিনি চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশেও বিভিন্ন সামরিক সরকারের সময়ে তাকে একাধিকবার কারান্তরালে থাকতে হয়েছে।
মতিয়া চৌধুরীকে প্রথম দেখেছি দূর থেকে ১৯৭০ সালে খুলনায় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির এক জনসভায়। আর খুব কাছ থেকেও দেখি ১৯৭২ সালে গোপালগঞ্জের থানাপাড়ায় আমার মামাবাড়িতে। ন্যাপের জনসভা শেষে বিশ্রাম নিতে এসেছিলেন। মতিয়া চৌধুরীকে কাছ থেকে দেখার জন্য বাসা ও বাসার সামনের মাঠ লোকে লোকারণ্য। তাই কথা বলার মতো সুযোগ পাইনি।
কথা বলার এবং তার ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ হয় ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময়ে। তখন জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী এবং সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি পদে আসীন জেনারেল জিয়ার বিরুদ্ধে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট’ মুক্তিযুদ্ধকালের মুক্তিবাহিনীপ্রধান মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানীকে প্রার্থী করে। গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের কার্যালয় ছিল বঙ্গভবনের পেছনের দিকটায় ওয়ারীতে ঢোকার মুখের রাস্তায়। মতিয়া আপার বাসা সেখান থেকে খুব একটা দূরে নয়। পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডের নাসিরুদ্দিন লেনের একটি ভাড়া বাসায় তিনি দীর্ঘকাল বসবাস করতেন। মতিয়া আপা অধিকাংশ দিনই নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ঢাকার বাইরে থাকতেন। যেদিন ঢাকায় থাকতেন এবং সন্ধ্যায় ঐক্যজোট অফিসে আসতেন, তখন প্রায়ই আমার ডাক পড়ত মতিয়া আপাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এই পৌঁছে দেওয়ার পথে তার সঙ্গে পরিচয়টা গড়ে ওঠে।
এরপর ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি হলের ছাত্র ইউনিয়ন সম্মেলনে মতিয়া আপাকে অতিথি করায় তাকে বাসা বা ন্যাপ অফিস থেকে নিয়ে আসতাম এবং পরে বাসায় পৌঁছে দিতাম। তখন রাজনীতি নিয়ে অনেক আলাপ হতো। আমার মতামত ওনার পছন্দ হতো না। ধমক দিতেন। ডাকসু নির্বাচনও তখন খুবই সন্নিকটে। ছাত্র ইউনিয়ন এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে শুনে তিনি আমাকে বকাঝকা শুরু করলেন—যেন আমিই নীতিনির্ধারক! যাহোক, আমার কাছ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের নির্বাচনী কৌশল জানার পর কয়েক দিন আমার ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে গেল। মতিয়া আপা অনিচ্ছা সত্ত্বেও কয়েকটি হলের সম্মেলনে অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন।
এর অল্প কিছুদিন পরেই তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। যোগদানের দু-এক দিন আগে সিপিবি অফিসে ফরহাদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন। বের হওয়ার সময় দেখলাম, চোখ ছলছল। অন্য কারও সঙ্গে কথা বললেন না। ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেলেন। এরপর আর মতিয়া আপার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী হওয়ার পরও নয়। মন্ত্রীদের বাসায় যেতে আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম না। তবে মাঝেমধ্যেই বাসা থেকে সচিবালয় অভিমুখে তার গাড়ি যাওয়ার সময় দেখতাম, গাড়ির ভেতরে বসে আছেন। কোনো রকম পুলিশি প্রহরা ছাড়াই তিনি চলাচল করতেন।
আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রী হিসেবে এবং মন্ত্রণালয় পরিচালনায় তিনি যে সৎ, দক্ষ এবং সফল ছিলেন, তা তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও বলে থাকেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে যে দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বে ছিলেন, সেই দল দেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ করে কারচুপি-কারসাজির ভোট অনুষ্ঠিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ছিল। মতিয়া চৌধুরীকে সেই স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পক্ষে নিঃশর্ত ওকালতি করতে দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। এটা তার জীবন ও সংগ্রামের সঙ্গে যায় না। তবে কোনো সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় তিনি বাম আদর্শ ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেননি। এটা একান্তই তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। আমি পাঁচ বছর মগবাজার রমনা অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে তার প্রতিবেশী ছিলাম। তিনি তখন মন্ত্রী। আমি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কেরানি হয়েও থাকতাম ১,৬০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। আর মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী থাকতেন ৮০০ স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে। ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত নির্লোভ, সাদামাটা ও সততার প্রতীক হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন।
মতিয়া চৌধুরীর মতো রাজনীতিবিদকে সম্মান না জানিয়ে সেদিন ইউনূস তার ছোট মনের পরিচয়কেই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। জীবন অবসানের পর পত্রপত্রিকায় মতিয়া চৌধুরীর সংগ্রামী ও নির্লোভ জীবন নিয়ে সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হলে ইউনূস ডাস্টবিন শফিক হিসেবে খ্যাত তার প্রেস সচিবকে দিয়ে পত্রিকাগুলোকে ধমক দিয়ে ও উপহাস করে স্ট্যাটাস দেওয়ান যে, ‘মতিয়া চৌধুরীকে নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ ও নিবন্ধ দেখে মনে হচ্ছে একজন মুরিদ তার পীর সম্বন্ধে লিখছেন’।
অবশ্য শুধুমাত্র মতিয়া চৌধুরী ইস্যু নয়, ক্ষমতাসীন হয়ে ইউনূস অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছোট মনের পরিচয় দিয়ে তার কিশোর বাহিনীর মাধ্যমে রাজনীতির ময়দানে ক্রোধ ও প্রতিহিংসা উসকে দিয়েছিলেন। ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি ভাঙাসহ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্মারক ধ্বংস, সবকিছুই হয়েছে তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিতে ও সমর্থনে। তিনি বিদেশি সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকারে বললেন, তার সরকার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নীতিতে বিশ্বাসী নয়, কিন্তু নিষিদ্ধ আয়োজন সম্পন্ন করতে নিজ সরকারি বাসভবনের সামনে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে তার কিশোর-তরুণ বাহিনী ও উগ্রবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নামিয়ে দিলেন। তার সঙ্গে যার যত মতান্তর থাকুক না কেন, তিনি নোবেল বিজয়ী হয়ে নিজেকে একটা অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী শাসনকালে নিজেই তা আবার ধুলার সঙ্গে মিশিয়ে গেলেন। তিনি ইতিহাসের রিসেট বাটনে চাপ দিয়ে এমন কিশোর-তরুণ বাহিনী সৃষ্টি করে গেছেন, যারা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের ছবি কালি দিয়ে লেপ্টে দিচ্ছে। তারা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে, তাদের ভীতসন্ত্রস্ত করে দুর্গাপূজা উৎসবের এই সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাসে ‘গরু জবাই ও গরু ভোজের’ মহোৎসব করছে। ইউনূসীয় দীক্ষায় এ কোন তরুণদের আবির্ভাব হলো! এরা ঠিক যেন পশ্চিমবঙ্গের নবহিন্দুত্ববাদী নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ইসলামী সংস্করণ। দেশকে ধর্মীয় বিভাজনের পথে নিয়ে যাওয়ার এ দায় প্রধানত ইউনূসের ওপরই বর্তায়। আর ভোটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের সব পথ বন্ধ করে দেওয়ায় সমাজে যে ধর্মীয় উগ্রপন্থার উত্থান হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলোতে গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করায় বিক্ষুব্ধ তারুণ্যের যে বিকৃত উত্থান হয়েছে—শেখ হাসিনা ও তার দলও কি এ দায় এড়াতে পারবেন?
অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী এ দেশের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র আন্দোলনের সৃষ্টি। ইতিহাস মতিয়া চৌধুরীকে সমালোচনাসহ তার প্রাপ্য সম্মান দেবে। কিন্তু রিসেট ‘বাটন টেপনেওয়ালাদের’ জন্য হয়তো শেষ পর্যন্ত শফিকুল ইসলাম সাহেবই ইতিহাসের ডাস্টবিন প্রস্তুত করে যাবেন।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা]

আপনার মতামত লিখুন