সংবাদ

নববর্ষ সংখ্যা ১৪৩৩

নববর্ষের পদাবলি


প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

নববর্ষের পদাবলি
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

এই চৈত্রে

মহাদেব সাহা

এমন চৈত্রের রাতে আমি লিখি শ্রাবণের গান

বর্ষণ থামেনি আজো দুই চোখ জলে ভাসমান,

সবাই উল্লাসে মাতে, চৈত্রনিশি করে উদ্যাপন

আমর ফাল্গুন নেই চৈত্রে নামে অঝোর শ্রাবণ।

এই চৈত্রে আমি বড়ো ভয়ানক মনঃকষ্টে আছি

এতো যে ফুটেছে ফুল আমি তবু দুঃখ পেয়ে বাঁচি,

সকলেই চৈত্রে সব দেখে-শোনে, আয়োজন করে

আমি এই চৈত্রে আরো মরে যাই বাহিরে-ভিতরে।

সবাই এনেছে ফুল, সকলেই শুনেছে আহ্বান

আমাকে ডাকেনি কেউ আমি কারো শুনি নাই গান,

এমন চৈত্রের রাতে দুঃখ পাই, কাঁদে বড়ো মন

সবার ফুলের মাস এই চৈত্রে আমার শ্রাবণ।



গ্রহণ

নির্মলেন্দু গুণ

ঘরের দেয়াল জুড়ে ছায়া ফেলে চাঁদের গ্রহণ।

কে ওখানে?

রাতের উদ্বেলশিখা কেঁপে ওঠে শঙ্খিনীর মতো।

দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ হতে হতে বক্র হয়। 

কে ওখানে?

উলঙ্গ মাংসের মূর্তি লাশঘরে হা-মুখে তাকায়;

মনে হয় প্রেতচ্ছায়া, যৌবনের কৃষ্ণ-কাপালিক,

যেন গভীর অরণ্য ছেড়ে এসেছে পালিয়ে জনপদে।

দেয়াল ও ইটের মাঝে নিজের ছায়াকে দেখে

কেঁপে উঠি সামান্য নাড়ায়। কে ওখানে?

স্বগত সঙ্গীতে বাজে অনিঃশেষ রাতের কঙ্কণ,

ঘরের দেয়াল জুড়ে ছায়া ফেলে অনির্দিষ্ট অমা।

বুঝি প্রেম পেয়েছে প্রাণের স্পর্শ,

অন্ধকার কামের গুহায় প্রবেশ করেছে প্রিয়তমা। 



ভালোও লাগে, কষ্টও লাগে

আবদুর রাজ্জাক

বৃষ্টিও অনশনে থাকে, আত্মদর্শনের বৃষ্টি দেশে দেশে

আনন্দভ্রমণে যায়। সেইসব উড়ালবৃষ্টির আয়ত্বে রয়েছে

রাষ্ট্রভ্রমণের ভাষা।

তোমার নিস্তব্ধতা আমাকে দগ্ধ করে, সীমানা ছেড়ে

উড়ালে যেতে যেতে— মনে হয় যেন কালের কালো

অন্ধকার চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে।

এ মাটির গন্ধ ছেড়ে কখনই পরবাসে যাবো না— আমার

নয়ন জুড়ে এ-মাটির মানুষের চাওয়া পাওয়া,

আর তাদের অফুরন্ত ভালোবাসা!

এইসব মানুষের ভিতরেই আমার যাপিত জীবন, আহারে!

আমার সোনার খনি কে বা কারা জোর করে কেড়ে নিয়েছে,

আর এক অন্তিম পুরুষ যার

বিস্মিত ভালোবাসা আমাকে আজীবন সশ্রদ্ধ রেখেছে।

কোথায় গেছে সে ফুটফুটে চাঁদ! পরম প্রিয় সীমানা

পেরুতে পারিনি। তার দুঃখের ভাষা আমার আত্মহত্যার

প্রবণতাকে গ্রাস করেছে।

হৃদয়হীনতার শীতল স্রোত সর্বত্র বহমান,

একটি অলাতচক্রের চিত্র সর্বক্ষণ সংরক্ষণ করছি

আমার অন্তঃগৃহে।

পিয়ানো হাত এক একনিষ্ঠ পাহারাদার নরকের দরোজায়

বসে অপেক্ষা করছি, সে এসে নরকের দরোজার কড়া

অবশ্যই নাড়বে। আমি কী তখন দরোজা না খুলে পারবো?



একলব্য একতারা

মাহফুজ আল-হোসেন

বৈশাখী পৌরাণিক ড্রাগন নিঃশ্বাসের হল্কায় এঁকে দেয়—

বিস্রস্ত সূর্যের লাভাতপ্ত কপালে লাল টিপ,

আর নৈঋতের গোপন দহন থেকে নিমেষেই তুলে আনে

অজস্র অগ্নির অভিমানী স্বাক্ষর।

এই যে ঋতুচক্রের কালিক শ্রুতিলিখন সে শুধু মনোসিজ অন্তর্দহন নয়—

এ যেন বাউলের আখড়ায় গীত এক ঝাঁঝালো বৈতালিক কোরাস,

যার অচিন মায়াটানে কম্পিত ধরিত্রী যেন তার সুতপ্ত 

শরীর থেকে নিংড়ে ফেলে প্রতিটি অগ্নিবিন্দু;

আর সঞ্চারিতে এসে আত্মস্থ করে নতুন প্রত্যুষের মানবিক ভাষা।

একলব্য একতারাও কী আজ তবে আদ্বিজ চণ্ডালের নতুন ঝকমারিতে সুতন্ত্রিত:

“মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি...” 



নির্জনতা

মিহির মুসাকী

নিশ্চুপ একটা বারান্দায়

নির্জনতার মুখোমুখি,

কথা না বললেও প্রকৃতি নিশ্চুপ নয়,

পাখির কলকাকলিতে মুখর বনভূমি

নদীর পাশে গেলে শুনতে পাই জলের গান

পাহাড়েও জুম-কৃষির শব্দ।

শব্দ মানুষের জীবনের অনুষঙ্গ,

শব্দহীনতার মাঝেও শব্দ থাকে

সেই শব্দ মনোশব্দ-মনোভাষা

একা থাকবো বলে যেখানেই যাই,

ভেঙে দিই সেখানের নির্জনতা,

যেন বস্তুবিশ্ব তাকিয়ে আমার দিকে

মনোশব্দে বলে, কেন ভেঙে দিলে

আমাদের ধ্যান, আমাদের নির্জনতা?



অন্য বসন্ত প্রিয়

সোহরাব পাশা

উচ্ছৃঙ্খল মেঘ

নিঃসঙ্গ রুগ্ন সময়,

সৌন্দর্য নিয়তই জন্মান্ধ

স্পর্শ তৃষ্ণায় নিদ্রিত

          অবসন্ন নারী;

উড়ন্ত বসন্ত -ছায়নটে

আগুনের ফুল ফোটে

অন্যপক্ষ অন্ধকার,

নৈঃশব্দ্যের দীর্ঘগল্প তুমি

ছায়াদৃশ্যে মুদ্রণ প্রমাদ

বন্ধন ছেঁড়া রৌদ্রদিন

উজ্জ্বল শূন্যতা

ওড়ে গীতবিতানের পাতা;

দুঃখিত সকাল

দুঃখগুলি কী  অগণতান্ত্রিক?

    সন্ধ্যা নামছে তীব্র,

শস্যের বন্দনা বিনয়ী রোদ্দুর

তোমার চোখ অন্য বসন্ত প্রিয়। 



প্রতিযোগী  

গোলাম কিবরিয়া পিনু

ওদের স্টেডিয়ামে গিয়ে

ওদের আয়োজিত কোনো ইভেন্টে

    আমার অংশ নেওয়ার ইচ্ছে নেই!

না হাডুডু খেলায়

      না দৌড় প্রতিযোগিতায়!

ওদের ইচ্ছেমতো

  কোনো টিমে অংশ নিয়ে

    ওদের নির্দেশমতো কোনো ইউনিফর্ম

পরতে পারবো না!

ওদের টেবিলে গিয়ে

     দাবাখেলায় কিস্তিমাত করতে চাই না!

ওদের সুইমিংপুলে গিয়ে

     ফ্রিস্টাইলে সাঁতার কাটতে চাই না!

ওদের ক্রিকেট মাঠে গিয়ে  

     কোনো উইকেট নেওয়ার ইচ্ছে নেই!

ওদের ফুটবল মাঠে গিয়ে  

               ফরোয়ার্ড পাস দিয়ে, 

গোল দেওয়ার অভিলাষ নেই!

ওদের কোনো প্রতিযোগিতায়

কখনো অংশগ্রহণ করিনি,

      ভবিষ্যতেও অংশ নেব না!

ট্রফি, মেডেল ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে

        কোনো লাভ নেই!

কীসের কোর্য়াটার ফাইনাল?

           কীসের সেমি ফাইনাল? 

                  কীসের ফাইনাল?

ওদের প্রতিযোগিতায় কোনো প্রতিযোগী হয়ে

কারো বগলে কাতুকতু দিতে চাই না!

কে গেল আমোদ-প্রমোদে প্রমোদতরীতে

             তা দেখার সময় ও ইচ্ছে নেই!  

কে ঢ্যাঁড়া পেটাল ও আতশবাজি ফোটাল

তা দেখার সময় ও ইচ্ছে নেই!



বৈশাখলগ্নে দেবী প্রজ্ঞা পারমিতা

তুষার গায়েন

একটা গান আমাকে বহন করে নিয়ে চলে গুনগুন স্বরে

গুঞ্জরিত মর্মমূলে— প্রতিভাত হয় এক মুখচ্ছবি ধ্বংসপ্রাপ্ত

পাহাড়পুরের বৌদ্ধস্তূপে; চৈত্রের অবসানে বৈশাখের প্রথম প্রহর

তখনো ফোটেনি আলো সূর্যোদয়ের, শুশ্রূষার মতো মৃদু বাতাস

যেতেছে বহে, পদ্মাসনে উপবিষ্টা বৌদ্ধদেবী প্রজ্ঞা পারমিতা

ধ্যানমগ্ন নিমীলিত চোখ খুলে যখন ধীরে ধীরে তাকালেন

আমার দিকে প্রেম আর করুণার দৃষ্টিপাতে, আমার অন্তর থেকে

নেমে গেল শোক— একাকীত্বের জমাট পাথর; খনিজের মতো

জমে থাকা বহু যুদ্ধস্মৃতি, স্তরে স্তরে চেপে বসা দাগ ঔপনিবেশিক—

ভেঙে ফেলা পোড়ামাটি ও কষ্টি পাথরের ভাস্কর্য নান্দনিক

অভয়মুদ্রায় উত্থিত দেবীর আঙুল, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি

বলেন সান্দ্রস্বরে, ‘অহিংসা পরম ধর্ম, ভরাট করে দেবে

অনন্তর যত ক্ষয়, মুছে দেবে আরোপিত সব অন্যায়!’

চিত্রার্পিত অসহায় আমি বলি, ‘ক্ষমাধর্মে নিঃশেষিত ক্ষাত্রতেজ

করেনি কি এ ভূমিকে বারংবার বিদেশী বর্বরের লীলাভূমি?’

সেই রক্তবীজ ঝাড়ে বংশে বেড়ে আজ পথে পথে করে মব সন্ত্রাস

ধানক্ষেতে ফেলে রাখে অপহৃতা ধর্ষিতা কিশোরীর লাশ—

বিধর্মী তরুণীগণ সিলিং ফ্যান থেকে প্রায়শই ঝুলে পড়ে

পেণ্ডুলামের মতো, পথের ধুলায় লুটায় স্মারক ভাস্কর্য যত!

চিন্তার গাঢ় ভাঁজ পড়ে দেবীর যুগল কালো ভ্রুর ওপর

চোখের পাতার ভারে ধীরে ধীরে মুদে আসে চোখ, ধ্যানস্থ হয়ে

তিনি যাবেন বুদ্ধ সকাশে পেতে আমার প্রশ্নোত্তরের খোঁজ—

অন্তর্হিতা তিনি নিমিষেই, ফোটে আলো বৈশাখের ভোরে

দূর থেকে শোনা যায় গান, ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে!’ 



রক্তে লেখা পাণ্ডুলিপি

আবদুর রব

বিপুল এ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে, দাঁড়ানোর মতো মাটি তুমি কোথায় পাবে? তোমার ত্বকে আঁকা রয়েছে দৃশ্যমান ক্ষতের মানচিত্র, আর হাড়ের ভেতর অদৃশ্য কম্পন।

গভীর ঘুমের ভিতরে হঠাৎ বিভীষিকা, ত্রাস-বন্ধ দরজায় সেই তীব্র ঝনঝনানি। এই ছায়ারা বছরের পর বছর তোমাকে তাড়া করে ফিরবে, আর কাঁচের মতো গুঁড়িয়ে যাবে তোমার দিনগুলো।

নীরবে, তোমার রক্ত লিখে চলবে সেই পাণ্ডুলিপি যা কেউ কখনো পড়তে পারবে না। তীব্র আকাশফাটা শব্দে তোমার বোবা আর শ্রবণ প্রতিবন্ধী সন্তানের নিষ্পাপ দৃষ্টির মাঝে, এক না-লড়া যুদ্ধের প্রতিধ্বনি জেগে উঠবে, স্মৃতি পরম্পরা।

ক্ষতবিক্ষত সেই স্মৃতির গভীরে, জেগে ওঠে গোপন এক প্রতিরোধশক্তি। একটি ফিসফিসানি, একটি গান, চিরচেনা গন্ধ, যা এই শূন্য পৃথিবীতে ধীরে ধীরে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়।

ধ্বংস কেবল ক্ষতচিহ্ন নয়; এক বেদনাদায়ক, অনিবার্য রূপান্তর। যন্ত্রণা ও নিস্তব্ধতার এই দীর্ঘ দহনের মধ্য দিয়ে, আমরা কেবল শিখে নেই বেঁচে থাকার নীরব শিল্প।



কী দেবে আগামী বছর

চয়ন শায়েরী

নতুন বছর কিছু দেবে না—

পাখিরা ধোঁকা খায় সূর্যগ্রহণে

তাদের থাকে না মনে।

নেতারা বিশ্বাস ভেঙেছিল কতবার,

ভেঙে গেছে প্রেমের গাঙের পাড়—

শুনেছে কি এক পাড় অন্য পাড়টির হাহাকার?

এখনও কি ছোঁ মারে সাদাবুকচিল কারও উঠোনে?

মুরগির ছানাটির জেগেছিল আতঙ্কে বিস্ময়—

নতুন বছরেও জেগে থাকে অন্তর্গত মৃত্যুভয়।

নিজের ভাগ্যটা কর্মফলে রূপান্তরণের পথে—

তকদির বদলাতে না-ও যদি পারো,

নিজেকে সম্ভব বদলানো আরও

নতুন বছরে।


কী সুন্দর কুঁচফলের মালা

রকিবুল হাসান

বৈশাখে কত সুন্দর কুঁচফলে মালা গেঁথে 

সেই কবে থেকে অপেক্ষায় দেউড়িতে

কান পেতে আছি, কখন আসবে তুমি!

  দ্যাখো পায়ে আলতা পরেছি, 

লজ্জায় বলতে পারবো না, রোদচোখে

ওরকম করে তাকাবে না কিন্তু!

ইলিশ কিনতে পারবে না, জানি;

মন খারাপ করো না,

তাঁতের একটা লাল শাড়ি কিনে দিও

সেটা পরেই তোমার হাত ধরে 

মেলাতে ঘুরতে যাবো, ঢেউচোখে

গলার মালার দিকে তুমি বারবার তাকাবে না,

আলতা পায়ের দিকেও না, লজ্জা লাগে।

বৈশাখেতে বৃষ্টি হবে, ঝড়ও উঠতে পারে

ভিজবো এবার— উড়বো তোমার সঙ্গে

আমার শরম লাগে, তাকাইও না। 

কুঁচফলের মালাটা পরে অপেক্ষায় আছি, 

চোখ পড়ে আছে পথে, তপ্তদহন বৈশাখে। 

 


নববর্ষ

দুলাল সরকার

নববর্ষ, গতানুগতিকতার আবর্জনার স্তূপে

মহাকালে রাত্রির ঘুম অবয়বে কৃষকের

ঘাড় থেকে নামে না পুরাতন বোঝা,

রাজন্যের দস্যুতায় মুনিষ মানুষের

আর্তনাদে লেখা হয় ভুল ইতিহাস;

একটি পংক্তিতেই যেন শেষ হয় বটতলা

বিলাসের সব  ব্রত  কথা— খোলস ছাড়ার

সব পুরাণ কাহিনী, উল্লাসের অভিনয়ে

কিছু অসংলগ্ন হাঙরের দাপটে ভিজে নদী

ফুঁটো মাটির কলসে ফুঁ ঢালে

নামকোয়াস্তে আনুষ্ঠানিকতার ভুল পাঠ— 



দুঃখহরণ

হাসান ওয়াহিদ

কেন বর্ষা-বিকেলে ভুল করে গেয়েছি বসন্তের গান

এসব ভেবে এখন আর দুঃখ পাই না,

মনে পড়ে না জোনাকিদের আকাশময় ওড়াউড়ি,

নীল জলে ডুবে মরবার ঢেউয়ের মতো তার স্পর্শ,

ম্লান সব ধুলোবালি, সব উড়ে যাওয়া আঁচল।

আসলে শিশিরের কখনো অসুখ হয় না

রোদ্দুরের কখনো মন খারাপ হয় না।

সব অবহেলা সয়ে আমার হাড়-পাঁজর

শিশির আর রোদ্দুর হয়ে গেছে—

এখন আর কোনো দুঃখ পাই না। 



এই বৈশাখে

মুশাররাত

আমি চমকে উঠি ভেবে যে

ইদানীং আমার কাঁদতে ভালো লাগে

চারদিকে  যখন বৈসাবীর আয়োজন

সাংগ্রাই বা চৈত্রসংক্রান্তিও শেষ

তখন আমার কাঁদতে লাগছে বেশ

ভিড়ের মাঝে একলা হওয়ার খেলা

অদৃশ্য এক মানুষ যেন—

কেউ দেখেনা তাকে

কেউ বোঝে না যাকে

পুব-পশ্চিম, উত্তর-দখিন

সব দিকই যার খোলা

বুকের দেয়াল বিমূর্ত এক

ঝাপসা মুখের ছবি, যায় না তাকেও ভোলা

যখন তুমি নাই কোথাও আর

একটুও নও আমার

খুঁজতে থাকি তারপরেও, উদাস চারিধার

বটমূলে বিশ্বকবির বিস্মিত সেই বাণী

শুভকামনার সুরে জেগে ওঠে  বিশ্ব যেন আবার

ইষাণ কোণের কালো মেঘে কাল-বোশেখীর ধার

তখন আমার অশ্রুপাতই তৃপ্ত সুখের খামার

লালপেড়ে শাড়ি

ঘিয়ে রঙের আভিজাত্য

নৃত্যরত রেশমি চুড়ি বা চাঁদ কপালে টিপ

তোমাকে সাজায় রমণীয় যখন  তখনও আমার

বেশ কাঁদতে ভালো লাগে

ছুঁয়ে দিলেও কেন  পাওয়া হয় না তেমনই অনুরাগে

প্রতি ফোঁটা এই অশ্রুজলে তুমি মিশে থাকো বলে

এই বৈশাখের রুদ্র সুখে কাঁদতে ভালো লাগে।



অরণ্যগামী

মঈনুল হাসান

সুষুপ্তির ভেতরে অনেকেই মগ্ন থেকেছে খুব

কেউ থেকে গেছে চিরদিন, বোধজমা শীতলে;

অথচ তখন বন পুড়ে যায়, রোদ-ঝাঁঝাঁ-পিতলে

অরণ্য দেখেনি তারা; শুধু ঘুমতৃষ্ণায় দেয় ডুব।

বনের গায়ে শব্দ করে একটা দরজা খুলে যায়

পাতার জামা গায়ে নিখুঁত দাঁড়িয়ে থাকে পথ;

ঝাঁঝাঁ রোদে মাজা প্রাণির শরীর তখন অগ্নিরথ

ভেঙেচুরে সব, বৃক্ষের মতো গ্রীবা উঁচু করে ধায়।

বনতিতিরের গায়েও সেদিন ময়ূরপেখম জামা

কে যেন ডাকে, “দেখে চারদিকে প্রস্তুত হয়ে নাও”,

রথের সঙ্গে পথে নাচে আজ, দক্ষিণমুখী বাও

নিদ্রা ভেঙে ধ্যানেও বসেছে, বনবিবি পুথিনামা।

সেই আহ্বানে গান গেয়ে ফিরে তিতিক্ষু সন্ন্যাসী

জাগরণ থেকে উঁকি দিয়ে বলে, অরণ্যে যত সুখ

রৌদ্রস্নানে তেতে পুড়ে ভিজে, তবু তারা ঊন্মুখ;

সিঁদুর বসন গেরুয়া চায় না, হয়ে রবে বনদাসী।

সংশয়ী বোধ চূর্ণ করে তবে এসো পথে নামি

রোদের বীর্য টুপটাপ করে খসে পড়ে যায় রোজ

জাগরণ ভোলা কিছু মানুষেরা সেসব করেনি খোঁজ

ঋষি হবে নাকি সন্ন্যাসী, হও অরণ্যের অনুগামী।



বোশেখ-স্মৃতি

মুমির সরকার

সমুদ্দুর শরীরে বয়ে আনা

লোনাজল-ঢেউ,

পাথর-বালুকাবেলা ছুঁতেই

ভেংগে-ভেংগে থেমে যায় 

শেষে যেন অস্পষ্ট ঠাহরে

স্পষ্টতই দেখা,

ক্ষয়িষ্ণু সে বোশেখ-স্মৃতি:

নাম-ধাম সমেত সর্ব-সাং

শনাক্তহীন নয় যে কিছুই

বুঝিবা বলা চলে বিরল!

বোশেখ-ক্যানভাস জুড়ে 

আঙুল-এর ডগায় আঁকা

যে ছবির রেখাচিত্র হয়নি

স্থায়ী, মুছেও ফেলা যায়।

চওড়া লাল-পাড় ক্রিমরঙা

শাড়ি পরিধানে একটিমাত্র

অবয়ব— বাম চিবুকে নেমে

আসা চিকণ ঘামে ভিজছে 

দু’তিনটি অবাধ্য সরু চুল;

অথচ নির্লিপ্ত তুমি,

যে আমাকে পোড়াচ্ছিলে

আরও পুড়ছিল বেশ কিছু 

পুরানো স্মৃতি: বোশেখের!

বোশেখ-স্মৃতি:

তখনও তুমি ছিলে 

একটি অলীক ছবি;

শুধু চিবুকের চিকন ঘামে

ধুসর এ আমি,

ভিজতেই চলছি এখনও!



তবুও নববর্ষ চাই

আব্দুল্লাহ জামিল

এই পৃথিবী এখন নষ্টদের হাতে

ন্যায়কে অন্যায় এবং অন্যায়কে ন্যায় মেনে

মুখ বুজে আমরা তাতে বসবাস করছি।

কোথাও বিদ্যুতের কাঁপানো চমক

সাথে শীলা-বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস

কোথাও প্রস্তর-নিক্ষিপ্ত ব্যভিচারীর আর্তনাদ।

শীলা-বৃষ্টিসহ কালবোশেখীর পরে

খুলছে সবাই নতুন হালখাতা

আর অপেক্ষায় আছি নবরূপে নববর্ষের।



প্রবীণ বৃক্ষের কাছে

মতিন রায়হান

হে প্রবীণ বৃক্ষ

তোমার ছায়ায় আমাকে একটু বসতে দাও।

আমি ভারি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত!

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি

তোমার মায়াবী সবুজ ভুবনে

          ক্ষণকালের জন্য

             আমাকে তুমি নিজের করে নাও;

এই চৈত্রশেষে বৈশাখের ভোরে

তোমার পিঠতোলা শিকড়ে বসে

                 চোখ বন্ধ করে 

          আমি একটু ধ্যানমগ্ন হতে চাই;

এই অস্থির পৃথিবীতে হেরার সত্যে 

স্থিত হতে চাই আমি! 

জাবালে নূরের মতো আমাকে গ্রহণ করো!

হে প্রবীণ ডানাওয়ালা বৃক্ষ 

তোমার চারপাশে ঘুরছে

কুঠার ও করাতের সহস্র প্ররোচনা

তুমি মুখ তুলে দেখো

বিবস্ত্র শহরের পা থেকে ঝরছে পুঁজরক্ত

ভনভন করছে মক্ষিকারা 

আমি এই বীভৎস সময়ের প্রতিকূলে 

             গড়ে তুলতে চাই

সহজ ও প্রশান্ত জীবনের বিস্তৃত বেলাভূমি—

যেখানে হরিণশিশুরা সবুজের ছন্দে নৃত্য করবে!

হে প্রবীণ বৃক্ষ

তোমার ডালায় আমাকে একটু বসতে দাও

আমি এক মুহূর্তকে আজ অনন্ত মহাকালের প্রতীক করে তুলবো

কারণ আমি তৃতীয় বিশ্বের ঘূর্ণিবাত্যাপীড়িত এক কবি!



সংযোগরেখা

অনিল সেন

আমার এই আমিত্বের দেয়াল ভেঙে

কখন যে মিশে গেছি মহাজাগতিক স্রোতে,

ঠিক জানি না।

হয়তো তোমার ওই চোখের গহীন মায়ায়—

যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম আজ আর কেবল আমার নেই,

তা হয়ে উঠেছে এক বিশাল বিশ্বপ্রেমের সংযোগরেখা।

ভোরের অবাধ্য আলো যখন ঘাসের ডগায় নামে,

কিংবা ধূলিকণার সাথে মিতালি করে ক্ষুদ্রতম কীট—

আমি তাদের স্পন্দনে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই।

সীমাবদ্ধ এই ‘আমি’র বিসর্জনে

জেগে ওঠে এক অসীম ‘আমরা’।

ভালোবাসা মানে তো তবে স্রেফ পাওয়া নয়,

ভালোবাসা মানে এই চরাচরের সাথে একাত্ম হওয়া;

তোমার হাত ধরে আমি আসলে ছুঁয়েছি

নক্ষত্রের নিঃশ্বাস আর মহাকালের মৌনতা।


ম্যানিফেস্টো

আশরাফুল কবীর

একটি শান্ত সন্ধ্যার পরেই হয়তো

আসন্ন ঝড়ের আশংকা পেণ্ডুলামের ন্যায় দোলে;

খানিকটা এপাশ-ওপাশ, কিয়ৎকাল, সর্বকাল

ঘটে পূর্বাভাসের অবলুপ্তি, ধ্যানযোগী হয়ে থাকা

কিছু জটিল সমীকরণ কুয়াশা বাড়িয়ে চলে

গা ঝাড়া দিতে থাকে ভাদুরে উত্তাপ—

মিইয়ে যেতে যেতে নীল লিটমাসে রঞ্জিত হয়

ভাতশালিকের মুখ

অবিভক্ত সময়ে আর্জি তুলি হাওয়ার কাছে

বইয়ে দাও সেই আদিম ঝড় যা এখনো বহ্নিমান

সুশীতল হতে এখনো অপেক্ষায় তাবৎ পৃথিবীর

সকল উত্তপ্ত বনাঞ্চল। 



ছায়ামানবী যে শব্দ

রাহমান ওয়াহিদ

একটি শব্দ খুঁজছি। পাঁজরের প্রাচীন হাড়ে 

নিঃশব্দে বসে থেকে যে কুট কুট করে 

কাটতে থাকবে হৃদশরীরের সমস্ত অনু পরমাণু। 

শব্দটি আমার হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটিতে 

ওম্ দেবে, যেন আমি রূপান্তরিত হতে পারি 

যে কোন অবয়বে; শাসনের দণ্ড নিয়ে দাঁড়াবে না,

দাঁড়াতে দেবেও না হিম পাহাড়ের গায়ে 

ক্লান্তি জুড়োতে।

শব্দটি কোথায়, কে জানে, তবু খুঁজছি আমি তাকেই

ছায়ামানবী হারানোর মতো ভীষণ ত্রস্ততায়।

কাঁঠালতলায় একবারই সে দাঁড়িয়েছিল 

বড় নিঃশব্দে, তার নিঃশ্বাসে টের পেতাম 

টেনে নেবার মতো আশ্চর্য বন্যতা! 

আহা, তেমন একটি শব্দই কেন যে খুঁজে চলেছি 

এইসব বারুদগন্ধময় বিবমিষায়,

অজস্র ভাঙচুরের বিবর্ণ বিষাদে, আহা কেন যে...



শতাব্দী অধ্যায়ের পাতা

জলিল আহমেদ

শতাব্দী অধ্যায়ের পাতা উল্টিয়ে

রঙে রঙে সেজেছে প্রকৃতি

কোকিলেরা সেধেছে নতুন সুর

রঙধনু মিশে আছে শিশুদের মনে

পাখিরা নেচেছে নতুন ঢঙে, সাধের বৈরাগী হয়ে,

পথে পথে প্রকৃতি-বৈচিত্র্যের সাজানো মিছিল, মানব মঙ্গল,

নক্ষত্র চেয়ে থাকে বঙ্গের আনন্দখানায়...

 

অবশেষে ভোর আসে রঙে রঙে

কোকিলের কণ্ঠে নামে, যুগ যুগ যুগ ধরে অবিশ্রান্ত

নববর্ষের কাঙ্ক্ষিত রবীন্দ্রনাথ...

এসো হে-বৈশাখ।



আমি জানি পয়লা বৈশাখ এলে

দিলীপ কির্ত্তুনিয়া

আমি জানি পয়লা বৈশাখ এলে

এক গভীর প্রাণবন্ত মেলা জমবে।

পয়লা বোশেখের শুভাগমনে

মানুষের মনে একটু হলেও কষ্ট কমবে।

সবার চোখে কিছুটা হলেও খুশি খুশি ভাব

নতুন দিনের স্বপ্ন দেখবে।

বড়রা হয়তো এই খুশিতে চুপচাপ

শান্ত উদযাপন তাদের

কিন্তু কিশোর শিশুরা অনেকটা পাগলপারা

অনেকটা আত্মহারা।

গাঢ় ঘন তমসা মুখর ভগ্ন জীবন থেকে

এই দিন একটু পালাবার পথ করে দেবে

দুঃখ দুশ্চিন্তার কিছুটা লাঘব হবে।

আসুন স্বপ্ন দেখি—

স্বপ্নের মধ্যে অনেক সবুজ

স্বপ্ন সোনার আলোয় মোড়া।

যে যত জীবন খুঁজে পেতে চায়

তাকে বেশি বেশি স্বপ্ন দেখতে হয়

স্বপ্নে বিষণ্নতা কমে।

স্বপ্নমুখর পহেলা বৈশাখ

উদযাপনে রাঙা হোক।

 


সিসিফাসের জীবন

সঞ্জয় দেওয়ান

মনের ভেতর বাজে জয়ডঙ্কা

বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষার অবসান

ঘড়ঘড় শব্দে ট্রলার ছুটে মিশমিশে কালো জলে

সাইরেন বাজে অভিশপ্ত নগরে।

প্রতেউস ক্ষোভ ঝাড়ে অতর্কিতে

দুই লঞ্চের ফেন্ডারে চাপা পড়ে ট্রলার

সোহেল ফকির-এর চোখেমুখে উৎকণ্ঠা

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা রুবা!

পিতা মিরাজ ফকির-এর প্রাণান্ত প্রয়াস

অবিরাম চলে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা।

ব্যর্থ সোহেল  নির্বিকার তাকিয়ে থাকে

ছেঁড়া শরীরের যাতনা নিয়ে

জনতার হৃদয়ে বয়ে যায় লু-হাওয়া।

লঞ্চের ফেন্ডারে রক্তরেখা

বড় বড় ঢেউ তুলে পালায় দানব সম্রাট

কালচক্রে জয়ী হয় এরোস। 



কিষানি আঁচলে বোশেখের ঝড়

মনজুর শামস

কুলায় তুলে হাওয়ায় ওড়ান তিনি মাড়াই করা ধান

খড়ের যতো সোনালি কণা উড়ে চলে যায় দূরে 

তার পায়ের কাছে কেবলই জমতে থাকে

স্বপ্নবীজ, রাশি রাশি সোনাবরণ ধান

শাড়ির আঁচলে কালবোশেখি

ঝেঁটিয়ে যতো দুঃখগুলো

জমাতে থাকে

স্বপ্নে দেখা

সুখ

আশা

বুকে বেঁধে

কিষান সোয়ামি

বস্তায় ভরে সে ধান 

মুক্তাপুরের হাটে নিয়ে 

বিক্রি করতে গেলে হঠাৎ 

করেই দাম পড়ে যায় ধানের

পরিবারে নেমে আসে সর্বনাশা দুখ



টাইফুন রঙের শাড়ি

দ্বীপ সরকার

দূরে, কালবৈশাখী জমে উঠেছে

দূরে কোথাও শব্দ হচ্ছে শন শন শন

সিনেম্যাটিক হাওয়া কারিশমা দেখাচ্ছে ঢের

অথচ, এই হাওয়া— কতোকাল ছন্নছাড়া!

পশের বাড়ির টিনগুলো কোথায় গিয়ে দাপাদাপি করছে

কোথাও আবার, গিরিখাদের দৃশ্যের মতোন

হুমড়ি খাচ্ছে কাঠঠোকরার কুঁড়েঘর

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রান্ড ক্যানিওন এসে জড়ো হচ্ছে আমাদের এখানে

হাওয়াদের কোন ঘর-দোর নেই

সেকারণে ঘর দেখলেই ওরা টাইফুন রঙের

শাড়ি পরে আছড়ে পড়ে ঘরে ঘরে

যেনো, ঘর-দোর ওদের চির শত্রু!

যৈবুতি কন্যার মতো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে

গাছে গাছে উঠে লাফাচ্ছে

ছাদের কার্নিশে একটা দুধখেকো চড়ুই ঝুলে আছে

টিনের চালে আটপৌরে একটা গাছ পড়ে ঝুলে আছে

জানালার পর্দায় ঝুলে আছে প্রিয়তমার চোখ

কালবৈশাখ আমাকেও ফিসফিসিয়ে বলছে

“তোমার কবিগিরিও ছাড়াবো”



পার্থক্য 

রফিকুল ইসলাম আধার

অনিন্দিতা, আমি চাইলেই কি আর

হতে পারি তোমার মতন?

গোধূলির এই শেষ বেলায়—

ঈশ্বর যখন তোমায় দিয়েছেন

অনায়াসে সব ভুলে যাওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা!

আর আমাকে?

যাকে তুমি নিঃশেষে করেছো হরণ,

ঈশ্বর তাকেই দিয়েছেন এক অমোঘ দণ্ড:

কেবলই তোমায় মনে রাখার আজন্ম অর্পণ।

এখানেই আমাদের ব্যবধান, পরম স্বাতন্ত্র্য,

দুজনের প্রেমের ব্যাকরণও তাই ভিন্ন;

রচিত হোক তবে এই অদ্ভুত উপাখ্যান

কারোর ভুলে যাওয়া 

আর কারোর ভুলতে না পারার।



এক টুকরো বিকেল

আকেল হায়দার

খামে পুরে এক টুকরো বিকেল পাঠালে

অম্নি চোখের পাটাতনে ঘুমন্ত সন্ধ্যাটা

তুমুল ইচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজল...

অবাক হয়ে দেখছি ঋতুর কারুকাজ—

মন ও মননের অলৌকিক যোগফল।

মেঘের বাহুমূলে সন্ধ্যালগ্ন বিকেলটা

উঠতি বয়সী কিশোরীর কুশীলবে

লুকোচুরি খেলছে খেয়ালিপনায়—

মুহুর্মুহু ফুটছে সফেদ জলজ ফুল।

আমি চলে যাই, তবু—

হৃদয় কার্নিশে ফুটে থাকা

সব ফুলের মালিকানা

লিখে দিয়ে যাই তোমার নামে। 



নতুন বৈশাখ

আমির হামজা

চৈত্র সংক্রান্তির গ্লানি মুছে দিয়ে

যখন ভোরের আকাশ রাঙিয়ে ওঠে

তখন নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর মাটির সরাচিত্রের রঙে জেগে ওঠে বাংলাদেশ।

পান্তা-ইলিশের স্বাদ আর লাল-সাদা শাড়ির মিছিলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ধর্ম-বর্ণ।

হালখাতার নতুন খেরোখাতায় শুরু হয় আগামীর স্বপ্ন বোনা

বৈশাখী মেলার বাঁশির সুরে প্রতিধ্বনিত হয় একসাথে বেঁচে থাকার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক গান।  

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬


নববর্ষের পদাবলি

প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

এই চৈত্রে

মহাদেব সাহা

এমন চৈত্রের রাতে আমি লিখি শ্রাবণের গান

বর্ষণ থামেনি আজো দুই চোখ জলে ভাসমান,

সবাই উল্লাসে মাতে, চৈত্রনিশি করে উদ্যাপন

আমর ফাল্গুন নেই চৈত্রে নামে অঝোর শ্রাবণ।

এই চৈত্রে আমি বড়ো ভয়ানক মনঃকষ্টে আছি

এতো যে ফুটেছে ফুল আমি তবু দুঃখ পেয়ে বাঁচি,

সকলেই চৈত্রে সব দেখে-শোনে, আয়োজন করে

আমি এই চৈত্রে আরো মরে যাই বাহিরে-ভিতরে।

সবাই এনেছে ফুল, সকলেই শুনেছে আহ্বান

আমাকে ডাকেনি কেউ আমি কারো শুনি নাই গান,

এমন চৈত্রের রাতে দুঃখ পাই, কাঁদে বড়ো মন

সবার ফুলের মাস এই চৈত্রে আমার শ্রাবণ।



গ্রহণ

নির্মলেন্দু গুণ

ঘরের দেয়াল জুড়ে ছায়া ফেলে চাঁদের গ্রহণ।

কে ওখানে?

রাতের উদ্বেলশিখা কেঁপে ওঠে শঙ্খিনীর মতো।

দীর্ঘ হয়। দীর্ঘ হতে হতে বক্র হয়। 

কে ওখানে?

উলঙ্গ মাংসের মূর্তি লাশঘরে হা-মুখে তাকায়;

মনে হয় প্রেতচ্ছায়া, যৌবনের কৃষ্ণ-কাপালিক,

যেন গভীর অরণ্য ছেড়ে এসেছে পালিয়ে জনপদে।

দেয়াল ও ইটের মাঝে নিজের ছায়াকে দেখে

কেঁপে উঠি সামান্য নাড়ায়। কে ওখানে?

স্বগত সঙ্গীতে বাজে অনিঃশেষ রাতের কঙ্কণ,

ঘরের দেয়াল জুড়ে ছায়া ফেলে অনির্দিষ্ট অমা।

বুঝি প্রেম পেয়েছে প্রাণের স্পর্শ,

অন্ধকার কামের গুহায় প্রবেশ করেছে প্রিয়তমা। 



ভালোও লাগে, কষ্টও লাগে

আবদুর রাজ্জাক

বৃষ্টিও অনশনে থাকে, আত্মদর্শনের বৃষ্টি দেশে দেশে

আনন্দভ্রমণে যায়। সেইসব উড়ালবৃষ্টির আয়ত্বে রয়েছে

রাষ্ট্রভ্রমণের ভাষা।

তোমার নিস্তব্ধতা আমাকে দগ্ধ করে, সীমানা ছেড়ে

উড়ালে যেতে যেতে— মনে হয় যেন কালের কালো

অন্ধকার চারিদিক থেকে আমাকে ঘিরে ফেলেছে।

এ মাটির গন্ধ ছেড়ে কখনই পরবাসে যাবো না— আমার

নয়ন জুড়ে এ-মাটির মানুষের চাওয়া পাওয়া,

আর তাদের অফুরন্ত ভালোবাসা!

এইসব মানুষের ভিতরেই আমার যাপিত জীবন, আহারে!

আমার সোনার খনি কে বা কারা জোর করে কেড়ে নিয়েছে,

আর এক অন্তিম পুরুষ যার

বিস্মিত ভালোবাসা আমাকে আজীবন সশ্রদ্ধ রেখেছে।

কোথায় গেছে সে ফুটফুটে চাঁদ! পরম প্রিয় সীমানা

পেরুতে পারিনি। তার দুঃখের ভাষা আমার আত্মহত্যার

প্রবণতাকে গ্রাস করেছে।

হৃদয়হীনতার শীতল স্রোত সর্বত্র বহমান,

একটি অলাতচক্রের চিত্র সর্বক্ষণ সংরক্ষণ করছি

আমার অন্তঃগৃহে।

পিয়ানো হাত এক একনিষ্ঠ পাহারাদার নরকের দরোজায়

বসে অপেক্ষা করছি, সে এসে নরকের দরোজার কড়া

অবশ্যই নাড়বে। আমি কী তখন দরোজা না খুলে পারবো?



একলব্য একতারা

মাহফুজ আল-হোসেন


বৈশাখী পৌরাণিক ড্রাগন নিঃশ্বাসের হল্কায় এঁকে দেয়—

বিস্রস্ত সূর্যের লাভাতপ্ত কপালে লাল টিপ,

আর নৈঋতের গোপন দহন থেকে নিমেষেই তুলে আনে

অজস্র অগ্নির অভিমানী স্বাক্ষর।

এই যে ঋতুচক্রের কালিক শ্রুতিলিখন সে শুধু মনোসিজ অন্তর্দহন নয়—

এ যেন বাউলের আখড়ায় গীত এক ঝাঁঝালো বৈতালিক কোরাস,

যার অচিন মায়াটানে কম্পিত ধরিত্রী যেন তার সুতপ্ত 

শরীর থেকে নিংড়ে ফেলে প্রতিটি অগ্নিবিন্দু;

আর সঞ্চারিতে এসে আত্মস্থ করে নতুন প্রত্যুষের মানবিক ভাষা।

একলব্য একতারাও কী আজ তবে আদ্বিজ চণ্ডালের নতুন ঝকমারিতে সুতন্ত্রিত:

“মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই মূল হারাবি...” 



নির্জনতা

মিহির মুসাকী


নিশ্চুপ একটা বারান্দায়

নির্জনতার মুখোমুখি,

কথা না বললেও প্রকৃতি নিশ্চুপ নয়,

পাখির কলকাকলিতে মুখর বনভূমি

নদীর পাশে গেলে শুনতে পাই জলের গান

পাহাড়েও জুম-কৃষির শব্দ।

শব্দ মানুষের জীবনের অনুষঙ্গ,

শব্দহীনতার মাঝেও শব্দ থাকে

সেই শব্দ মনোশব্দ-মনোভাষা

একা থাকবো বলে যেখানেই যাই,

ভেঙে দিই সেখানের নির্জনতা,

যেন বস্তুবিশ্ব তাকিয়ে আমার দিকে

মনোশব্দে বলে, কেন ভেঙে দিলে

আমাদের ধ্যান, আমাদের নির্জনতা?



অন্য বসন্ত প্রিয়

সোহরাব পাশা


উচ্ছৃঙ্খল মেঘ

নিঃসঙ্গ রুগ্ন সময়,


সৌন্দর্য নিয়তই জন্মান্ধ

স্পর্শ তৃষ্ণায় নিদ্রিত

          অবসন্ন নারী;


উড়ন্ত বসন্ত -ছায়নটে

আগুনের ফুল ফোটে

অন্যপক্ষ অন্ধকার,


নৈঃশব্দ্যের দীর্ঘগল্প তুমি

ছায়াদৃশ্যে মুদ্রণ প্রমাদ


বন্ধন ছেঁড়া রৌদ্রদিন

উজ্জ্বল শূন্যতা

ওড়ে গীতবিতানের পাতা;


দুঃখিত সকাল

দুঃখগুলি কী  অগণতান্ত্রিক?

    সন্ধ্যা নামছে তীব্র,


শস্যের বন্দনা বিনয়ী রোদ্দুর

তোমার চোখ অন্য বসন্ত প্রিয়। 



প্রতিযোগী  

গোলাম কিবরিয়া পিনু


ওদের স্টেডিয়ামে গিয়ে

ওদের আয়োজিত কোনো ইভেন্টে

    আমার অংশ নেওয়ার ইচ্ছে নেই!

না হাডুডু খেলায়

      না দৌড় প্রতিযোগিতায়!

ওদের ইচ্ছেমতো

  কোনো টিমে অংশ নিয়ে

    ওদের নির্দেশমতো কোনো ইউনিফর্ম

পরতে পারবো না!


ওদের টেবিলে গিয়ে

     দাবাখেলায় কিস্তিমাত করতে চাই না!

ওদের সুইমিংপুলে গিয়ে

     ফ্রিস্টাইলে সাঁতার কাটতে চাই না!

ওদের ক্রিকেট মাঠে গিয়ে  

     কোনো উইকেট নেওয়ার ইচ্ছে নেই!

ওদের ফুটবল মাঠে গিয়ে  

               ফরোয়ার্ড পাস দিয়ে, 

গোল দেওয়ার অভিলাষ নেই!


ওদের কোনো প্রতিযোগিতায়

কখনো অংশগ্রহণ করিনি,

      ভবিষ্যতেও অংশ নেব না!

ট্রফি, মেডেল ও পুরস্কারের লোভ দেখিয়ে

        কোনো লাভ নেই!

কীসের কোর্য়াটার ফাইনাল?

           কীসের সেমি ফাইনাল? 

                  কীসের ফাইনাল?


ওদের প্রতিযোগিতায় কোনো প্রতিযোগী হয়ে

কারো বগলে কাতুকতু দিতে চাই না!

কে গেল আমোদ-প্রমোদে প্রমোদতরীতে

             তা দেখার সময় ও ইচ্ছে নেই!  

কে ঢ্যাঁড়া পেটাল ও আতশবাজি ফোটাল

তা দেখার সময় ও ইচ্ছে নেই!



বৈশাখলগ্নে দেবী প্রজ্ঞা পারমিতা

তুষার গায়েন


একটা গান আমাকে বহন করে নিয়ে চলে গুনগুন স্বরে

গুঞ্জরিত মর্মমূলে— প্রতিভাত হয় এক মুখচ্ছবি ধ্বংসপ্রাপ্ত

পাহাড়পুরের বৌদ্ধস্তূপে; চৈত্রের অবসানে বৈশাখের প্রথম প্রহর

তখনো ফোটেনি আলো সূর্যোদয়ের, শুশ্রূষার মতো মৃদু বাতাস

যেতেছে বহে, পদ্মাসনে উপবিষ্টা বৌদ্ধদেবী প্রজ্ঞা পারমিতা

ধ্যানমগ্ন নিমীলিত চোখ খুলে যখন ধীরে ধীরে তাকালেন

আমার দিকে প্রেম আর করুণার দৃষ্টিপাতে, আমার অন্তর থেকে

নেমে গেল শোক— একাকীত্বের জমাট পাথর; খনিজের মতো

জমে থাকা বহু যুদ্ধস্মৃতি, স্তরে স্তরে চেপে বসা দাগ ঔপনিবেশিক—

ভেঙে ফেলা পোড়ামাটি ও কষ্টি পাথরের ভাস্কর্য নান্দনিক

অভয়মুদ্রায় উত্থিত দেবীর আঙুল, ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি

বলেন সান্দ্রস্বরে, ‘অহিংসা পরম ধর্ম, ভরাট করে দেবে

অনন্তর যত ক্ষয়, মুছে দেবে আরোপিত সব অন্যায়!’


চিত্রার্পিত অসহায় আমি বলি, ‘ক্ষমাধর্মে নিঃশেষিত ক্ষাত্রতেজ

করেনি কি এ ভূমিকে বারংবার বিদেশী বর্বরের লীলাভূমি?’

সেই রক্তবীজ ঝাড়ে বংশে বেড়ে আজ পথে পথে করে মব সন্ত্রাস

ধানক্ষেতে ফেলে রাখে অপহৃতা ধর্ষিতা কিশোরীর লাশ—

বিধর্মী তরুণীগণ সিলিং ফ্যান থেকে প্রায়শই ঝুলে পড়ে

পেণ্ডুলামের মতো, পথের ধুলায় লুটায় স্মারক ভাস্কর্য যত!

চিন্তার গাঢ় ভাঁজ পড়ে দেবীর যুগল কালো ভ্রুর ওপর

চোখের পাতার ভারে ধীরে ধীরে মুদে আসে চোখ, ধ্যানস্থ হয়ে

তিনি যাবেন বুদ্ধ সকাশে পেতে আমার প্রশ্নোত্তরের খোঁজ—

অন্তর্হিতা তিনি নিমিষেই, ফোটে আলো বৈশাখের ভোরে

দূর থেকে শোনা যায় গান, ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে!’ 



রক্তে লেখা পাণ্ডুলিপি

আবদুর রব

বিপুল এ ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেরিয়ে, দাঁড়ানোর মতো মাটি তুমি কোথায় পাবে? তোমার ত্বকে আঁকা রয়েছে দৃশ্যমান ক্ষতের মানচিত্র, আর হাড়ের ভেতর অদৃশ্য কম্পন।

গভীর ঘুমের ভিতরে হঠাৎ বিভীষিকা, ত্রাস-বন্ধ দরজায় সেই তীব্র ঝনঝনানি। এই ছায়ারা বছরের পর বছর তোমাকে তাড়া করে ফিরবে, আর কাঁচের মতো গুঁড়িয়ে যাবে তোমার দিনগুলো।

নীরবে, তোমার রক্ত লিখে চলবে সেই পাণ্ডুলিপি যা কেউ কখনো পড়তে পারবে না। তীব্র আকাশফাটা শব্দে তোমার বোবা আর শ্রবণ প্রতিবন্ধী সন্তানের নিষ্পাপ দৃষ্টির মাঝে, এক না-লড়া যুদ্ধের প্রতিধ্বনি জেগে উঠবে, স্মৃতি পরম্পরা।

ক্ষতবিক্ষত সেই স্মৃতির গভীরে, জেগে ওঠে গোপন এক প্রতিরোধশক্তি। একটি ফিসফিসানি, একটি গান, চিরচেনা গন্ধ, যা এই শূন্য পৃথিবীতে ধীরে ধীরে আবার প্রাণ ফিরিয়ে দেয়।

ধ্বংস কেবল ক্ষতচিহ্ন নয়; এক বেদনাদায়ক, অনিবার্য রূপান্তর। যন্ত্রণা ও নিস্তব্ধতার এই দীর্ঘ দহনের মধ্য দিয়ে, আমরা কেবল শিখে নেই বেঁচে থাকার নীরব শিল্প।



কী দেবে আগামী বছর

চয়ন শায়েরী

নতুন বছর কিছু দেবে না—

পাখিরা ধোঁকা খায় সূর্যগ্রহণে

তাদের থাকে না মনে।

নেতারা বিশ্বাস ভেঙেছিল কতবার,

ভেঙে গেছে প্রেমের গাঙের পাড়—

শুনেছে কি এক পাড় অন্য পাড়টির হাহাকার?

এখনও কি ছোঁ মারে সাদাবুকচিল কারও উঠোনে?

মুরগির ছানাটির জেগেছিল আতঙ্কে বিস্ময়—

নতুন বছরেও জেগে থাকে অন্তর্গত মৃত্যুভয়।

নিজের ভাগ্যটা কর্মফলে রূপান্তরণের পথে—

তকদির বদলাতে না-ও যদি পারো,

নিজেকে সম্ভব বদলানো আরও

নতুন বছরে।



কী সুন্দর কুঁচফলের মালা

রকিবুল হাসান

বৈশাখে কত সুন্দর কুঁচফলে মালা গেঁথে 

সেই কবে থেকে অপেক্ষায় দেউড়িতে

কান পেতে আছি, কখন আসবে তুমি!

  দ্যাখো পায়ে আলতা পরেছি, 

লজ্জায় বলতে পারবো না, রোদচোখে

ওরকম করে তাকাবে না কিন্তু!

ইলিশ কিনতে পারবে না, জানি;

মন খারাপ করো না,

তাঁতের একটা লাল শাড়ি কিনে দিও

সেটা পরেই তোমার হাত ধরে 

মেলাতে ঘুরতে যাবো, ঢেউচোখে

গলার মালার দিকে তুমি বারবার তাকাবে না,

আলতা পায়ের দিকেও না, লজ্জা লাগে।

বৈশাখেতে বৃষ্টি হবে, ঝড়ও উঠতে পারে

ভিজবো এবার— উড়বো তোমার সঙ্গে

আমার শরম লাগে, তাকাইও না। 

কুঁচফলের মালাটা পরে অপেক্ষায় আছি, 

চোখ পড়ে আছে পথে, তপ্তদহন বৈশাখে। 

 


নববর্ষ

দুলাল সরকার

নববর্ষ, গতানুগতিকতার আবর্জনার স্তূপে

মহাকালে রাত্রির ঘুম অবয়বে কৃষকের

ঘাড় থেকে নামে না পুরাতন বোঝা,

রাজন্যের দস্যুতায় মুনিষ মানুষের

আর্তনাদে লেখা হয় ভুল ইতিহাস;

একটি পংক্তিতেই যেন শেষ হয় বটতলা

বিলাসের সব  ব্রত  কথা— খোলস ছাড়ার

সব পুরাণ কাহিনী, উল্লাসের অভিনয়ে

কিছু অসংলগ্ন হাঙরের দাপটে ভিজে নদী

ফুঁটো মাটির কলসে ফুঁ ঢালে

নামকোয়াস্তে আনুষ্ঠানিকতার ভুল পাঠ— 



দুঃখহরণ

হাসান ওয়াহিদ


কেন বর্ষা-বিকেলে ভুল করে গেয়েছি বসন্তের গান

এসব ভেবে এখন আর দুঃখ পাই না,

মনে পড়ে না জোনাকিদের আকাশময় ওড়াউড়ি,

নীল জলে ডুবে মরবার ঢেউয়ের মতো তার স্পর্শ,

ম্লান সব ধুলোবালি, সব উড়ে যাওয়া আঁচল।


আসলে শিশিরের কখনো অসুখ হয় না

রোদ্দুরের কখনো মন খারাপ হয় না।

সব অবহেলা সয়ে আমার হাড়-পাঁজর

শিশির আর রোদ্দুর হয়ে গেছে—

এখন আর কোনো দুঃখ পাই না। 



এই বৈশাখে

মুশাররাত

আমি চমকে উঠি ভেবে যে

ইদানীং আমার কাঁদতে ভালো লাগে

চারদিকে  যখন বৈসাবীর আয়োজন

সাংগ্রাই বা চৈত্রসংক্রান্তিও শেষ

তখন আমার কাঁদতে লাগছে বেশ

ভিড়ের মাঝে একলা হওয়ার খেলা

অদৃশ্য এক মানুষ যেন—

কেউ দেখেনা তাকে

কেউ বোঝে না যাকে

পুব-পশ্চিম, উত্তর-দখিন

সব দিকই যার খোলা

বুকের দেয়াল বিমূর্ত এক

ঝাপসা মুখের ছবি, যায় না তাকেও ভোলা

যখন তুমি নাই কোথাও আর

একটুও নও আমার

খুঁজতে থাকি তারপরেও, উদাস চারিধার

বটমূলে বিশ্বকবির বিস্মিত সেই বাণী

শুভকামনার সুরে জেগে ওঠে  বিশ্ব যেন আবার

ইষাণ কোণের কালো মেঘে কাল-বোশেখীর ধার

তখন আমার অশ্রুপাতই তৃপ্ত সুখের খামার

লালপেড়ে শাড়ি

ঘিয়ে রঙের আভিজাত্য

নৃত্যরত রেশমি চুড়ি বা চাঁদ কপালে টিপ

তোমাকে সাজায় রমণীয় যখন  তখনও আমার

বেশ কাঁদতে ভালো লাগে

ছুঁয়ে দিলেও কেন  পাওয়া হয় না তেমনই অনুরাগে

প্রতি ফোঁটা এই অশ্রুজলে তুমি মিশে থাকো বলে

এই বৈশাখের রুদ্র সুখে কাঁদতে ভালো লাগে।



অরণ্যগামী

মঈনুল হাসান

সুষুপ্তির ভেতরে অনেকেই মগ্ন থেকেছে খুব

কেউ থেকে গেছে চিরদিন, বোধজমা শীতলে;

অথচ তখন বন পুড়ে যায়, রোদ-ঝাঁঝাঁ-পিতলে

অরণ্য দেখেনি তারা; শুধু ঘুমতৃষ্ণায় দেয় ডুব।

বনের গায়ে শব্দ করে একটা দরজা খুলে যায়

পাতার জামা গায়ে নিখুঁত দাঁড়িয়ে থাকে পথ;

ঝাঁঝাঁ রোদে মাজা প্রাণির শরীর তখন অগ্নিরথ

ভেঙেচুরে সব, বৃক্ষের মতো গ্রীবা উঁচু করে ধায়।

বনতিতিরের গায়েও সেদিন ময়ূরপেখম জামা

কে যেন ডাকে, “দেখে চারদিকে প্রস্তুত হয়ে নাও”,

রথের সঙ্গে পথে নাচে আজ, দক্ষিণমুখী বাও

নিদ্রা ভেঙে ধ্যানেও বসেছে, বনবিবি পুথিনামা।

সেই আহ্বানে গান গেয়ে ফিরে তিতিক্ষু সন্ন্যাসী

জাগরণ থেকে উঁকি দিয়ে বলে, অরণ্যে যত সুখ

রৌদ্রস্নানে তেতে পুড়ে ভিজে, তবু তারা ঊন্মুখ;

সিঁদুর বসন গেরুয়া চায় না, হয়ে রবে বনদাসী।

সংশয়ী বোধ চূর্ণ করে তবে এসো পথে নামি

রোদের বীর্য টুপটাপ করে খসে পড়ে যায় রোজ

জাগরণ ভোলা কিছু মানুষেরা সেসব করেনি খোঁজ

ঋষি হবে নাকি সন্ন্যাসী, হও অরণ্যের অনুগামী।



বোশেখ-স্মৃতি

মুমির সরকার


সমুদ্দুর শরীরে বয়ে আনা

লোনাজল-ঢেউ,

পাথর-বালুকাবেলা ছুঁতেই

ভেংগে-ভেংগে থেমে যায় 

শেষে যেন অস্পষ্ট ঠাহরে

স্পষ্টতই দেখা,

ক্ষয়িষ্ণু সে বোশেখ-স্মৃতি:

নাম-ধাম সমেত সর্ব-সাং

শনাক্তহীন নয় যে কিছুই

বুঝিবা বলা চলে বিরল!

বোশেখ-ক্যানভাস জুড়ে 

আঙুল-এর ডগায় আঁকা

যে ছবির রেখাচিত্র হয়নি

স্থায়ী, মুছেও ফেলা যায়।


চওড়া লাল-পাড় ক্রিমরঙা

শাড়ি পরিধানে একটিমাত্র

অবয়ব— বাম চিবুকে নেমে

আসা চিকণ ঘামে ভিজছে 

দু’তিনটি অবাধ্য সরু চুল;

অথচ নির্লিপ্ত তুমি,

যে আমাকে পোড়াচ্ছিলে

আরও পুড়ছিল বেশ কিছু 

পুরানো স্মৃতি: বোশেখের!


বোশেখ-স্মৃতি:

তখনও তুমি ছিলে 

একটি অলীক ছবি;

শুধু চিবুকের চিকন ঘামে

ধুসর এ আমি,

ভিজতেই চলছি এখনও!



তবুও নববর্ষ চাই

আব্দুল্লাহ জামিল

এই পৃথিবী এখন নষ্টদের হাতে

ন্যায়কে অন্যায় এবং অন্যায়কে ন্যায় মেনে

মুখ বুজে আমরা তাতে বসবাস করছি।

কোথাও বিদ্যুতের কাঁপানো চমক

সাথে শীলা-বৃষ্টি, ঝড়ো বাতাস

কোথাও প্রস্তর-নিক্ষিপ্ত ব্যভিচারীর আর্তনাদ।

শীলা-বৃষ্টিসহ কালবোশেখীর পরে

খুলছে সবাই নতুন হালখাতা

আর অপেক্ষায় আছি নবরূপে নববর্ষের।



প্রবীণ বৃক্ষের কাছে

মতিন রায়হান

হে প্রবীণ বৃক্ষ

তোমার ছায়ায় আমাকে একটু বসতে দাও।

আমি ভারি ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত!

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি

তোমার মায়াবী সবুজ ভুবনে

          ক্ষণকালের জন্য

             আমাকে তুমি নিজের করে নাও;

এই চৈত্রশেষে বৈশাখের ভোরে

তোমার পিঠতোলা শিকড়ে বসে

                 চোখ বন্ধ করে 

          আমি একটু ধ্যানমগ্ন হতে চাই;

এই অস্থির পৃথিবীতে হেরার সত্যে 

স্থিত হতে চাই আমি! 

জাবালে নূরের মতো আমাকে গ্রহণ করো!

হে প্রবীণ ডানাওয়ালা বৃক্ষ 

তোমার চারপাশে ঘুরছে

কুঠার ও করাতের সহস্র প্ররোচনা

তুমি মুখ তুলে দেখো

বিবস্ত্র শহরের পা থেকে ঝরছে পুঁজরক্ত

ভনভন করছে মক্ষিকারা 

আমি এই বীভৎস সময়ের প্রতিকূলে 

             গড়ে তুলতে চাই

সহজ ও প্রশান্ত জীবনের বিস্তৃত বেলাভূমি—

যেখানে হরিণশিশুরা সবুজের ছন্দে নৃত্য করবে!

হে প্রবীণ বৃক্ষ

তোমার ডালায় আমাকে একটু বসতে দাও

আমি এক মুহূর্তকে আজ অনন্ত মহাকালের প্রতীক করে তুলবো

কারণ আমি তৃতীয় বিশ্বের ঘূর্ণিবাত্যাপীড়িত এক কবি!



সংযোগরেখা

অনিল সেন

আমার এই আমিত্বের দেয়াল ভেঙে

কখন যে মিশে গেছি মহাজাগতিক স্রোতে,

ঠিক জানি না।

হয়তো তোমার ওই চোখের গহীন মায়ায়—

যেখানে ব্যক্তিগত প্রেম আজ আর কেবল আমার নেই,

তা হয়ে উঠেছে এক বিশাল বিশ্বপ্রেমের সংযোগরেখা।

ভোরের অবাধ্য আলো যখন ঘাসের ডগায় নামে,

কিংবা ধূলিকণার সাথে মিতালি করে ক্ষুদ্রতম কীট—

আমি তাদের স্পন্দনে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাই।

সীমাবদ্ধ এই ‘আমি’র বিসর্জনে

জেগে ওঠে এক অসীম ‘আমরা’।

ভালোবাসা মানে তো তবে স্রেফ পাওয়া নয়,

ভালোবাসা মানে এই চরাচরের সাথে একাত্ম হওয়া;

তোমার হাত ধরে আমি আসলে ছুঁয়েছি

নক্ষত্রের নিঃশ্বাস আর মহাকালের মৌনতা।



ম্যানিফেস্টো

আশরাফুল কবীর


একটি শান্ত সন্ধ্যার পরেই হয়তো

আসন্ন ঝড়ের আশংকা পেণ্ডুলামের ন্যায় দোলে;

খানিকটা এপাশ-ওপাশ, কিয়ৎকাল, সর্বকাল

ঘটে পূর্বাভাসের অবলুপ্তি, ধ্যানযোগী হয়ে থাকা

কিছু জটিল সমীকরণ কুয়াশা বাড়িয়ে চলে

গা ঝাড়া দিতে থাকে ভাদুরে উত্তাপ—

মিইয়ে যেতে যেতে নীল লিটমাসে রঞ্জিত হয়

ভাতশালিকের মুখ

অবিভক্ত সময়ে আর্জি তুলি হাওয়ার কাছে

বইয়ে দাও সেই আদিম ঝড় যা এখনো বহ্নিমান

সুশীতল হতে এখনো অপেক্ষায় তাবৎ পৃথিবীর

সকল উত্তপ্ত বনাঞ্চল। 



ছায়ামানবী যে শব্দ

রাহমান ওয়াহিদ


একটি শব্দ খুঁজছি। পাঁজরের প্রাচীন হাড়ে 

নিঃশব্দে বসে থেকে যে কুট কুট করে 

কাটতে থাকবে হৃদশরীরের সমস্ত অনু পরমাণু। 

শব্দটি আমার হারিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটিতে 

ওম্ দেবে, যেন আমি রূপান্তরিত হতে পারি 

যে কোন অবয়বে; শাসনের দণ্ড নিয়ে দাঁড়াবে না,

দাঁড়াতে দেবেও না হিম পাহাড়ের গায়ে 

ক্লান্তি জুড়োতে।

শব্দটি কোথায়, কে জানে, তবু খুঁজছি আমি তাকেই

ছায়ামানবী হারানোর মতো ভীষণ ত্রস্ততায়।

কাঁঠালতলায় একবারই সে দাঁড়িয়েছিল 

বড় নিঃশব্দে, তার নিঃশ্বাসে টের পেতাম 

টেনে নেবার মতো আশ্চর্য বন্যতা! 

আহা, তেমন একটি শব্দই কেন যে খুঁজে চলেছি 

এইসব বারুদগন্ধময় বিবমিষায়,

অজস্র ভাঙচুরের বিবর্ণ বিষাদে, আহা কেন যে...



শতাব্দী অধ্যায়ের পাতা

জলিল আহমেদ

শতাব্দী অধ্যায়ের পাতা উল্টিয়ে

রঙে রঙে সেজেছে প্রকৃতি

কোকিলেরা সেধেছে নতুন সুর

রঙধনু মিশে আছে শিশুদের মনে

পাখিরা নেচেছে নতুন ঢঙে, সাধের বৈরাগী হয়ে,

পথে পথে প্রকৃতি-বৈচিত্র্যের সাজানো মিছিল, মানব মঙ্গল,

নক্ষত্র চেয়ে থাকে বঙ্গের আনন্দখানায়...

 

অবশেষে ভোর আসে রঙে রঙে

কোকিলের কণ্ঠে নামে, যুগ যুগ যুগ ধরে অবিশ্রান্ত

নববর্ষের কাঙ্ক্ষিত রবীন্দ্রনাথ...

এসো হে-বৈশাখ।



আমি জানি পয়লা বৈশাখ এলে

দিলীপ কির্ত্তুনিয়া

আমি জানি পয়লা বৈশাখ এলে

এক গভীর প্রাণবন্ত মেলা জমবে।

পয়লা বোশেখের শুভাগমনে

মানুষের মনে একটু হলেও কষ্ট কমবে।

সবার চোখে কিছুটা হলেও খুশি খুশি ভাব

নতুন দিনের স্বপ্ন দেখবে।

বড়রা হয়তো এই খুশিতে চুপচাপ

শান্ত উদযাপন তাদের

কিন্তু কিশোর শিশুরা অনেকটা পাগলপারা

অনেকটা আত্মহারা।

গাঢ় ঘন তমসা মুখর ভগ্ন জীবন থেকে

এই দিন একটু পালাবার পথ করে দেবে

দুঃখ দুশ্চিন্তার কিছুটা লাঘব হবে।

আসুন স্বপ্ন দেখি—

স্বপ্নের মধ্যে অনেক সবুজ

স্বপ্ন সোনার আলোয় মোড়া।

যে যত জীবন খুঁজে পেতে চায়

তাকে বেশি বেশি স্বপ্ন দেখতে হয়

স্বপ্নে বিষণ্নতা কমে।

স্বপ্নমুখর পহেলা বৈশাখ

উদযাপনে রাঙা হোক।

 


সিসিফাসের জীবন

সঞ্জয় দেওয়ান

মনের ভেতর বাজে জয়ডঙ্কা

বাড়ি ফেরার প্রতীক্ষার অবসান

ঘড়ঘড় শব্দে ট্রলার ছুটে মিশমিশে কালো জলে

সাইরেন বাজে অভিশপ্ত নগরে।

প্রতেউস ক্ষোভ ঝাড়ে অতর্কিতে

দুই লঞ্চের ফেন্ডারে চাপা পড়ে ট্রলার

সোহেল ফকির-এর চোখেমুখে উৎকণ্ঠা

সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা রুবা!

পিতা মিরাজ ফকির-এর প্রাণান্ত প্রয়াস

অবিরাম চলে সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা।

ব্যর্থ সোহেল  নির্বিকার তাকিয়ে থাকে

ছেঁড়া শরীরের যাতনা নিয়ে

জনতার হৃদয়ে বয়ে যায় লু-হাওয়া।

লঞ্চের ফেন্ডারে রক্তরেখা

বড় বড় ঢেউ তুলে পালায় দানব সম্রাট

কালচক্রে জয়ী হয় এরোস। 



কিষানি আঁচলে বোশেখের ঝড়

মনজুর শামস

কুলায় তুলে হাওয়ায় ওড়ান তিনি মাড়াই করা ধান

খড়ের যতো সোনালি কণা উড়ে চলে যায় দূরে 

তার পায়ের কাছে কেবলই জমতে থাকে

স্বপ্নবীজ, রাশি রাশি সোনাবরণ ধান

শাড়ির আঁচলে কালবোশেখি

ঝেঁটিয়ে যতো দুঃখগুলো

জমাতে থাকে

স্বপ্নে দেখা

সুখ

আশা

বুকে বেঁধে

কিষান সোয়ামি

বস্তায় ভরে সে ধান 

মুক্তাপুরের হাটে নিয়ে 

বিক্রি করতে গেলে হঠাৎ 

করেই দাম পড়ে যায় ধানের

পরিবারে নেমে আসে সর্বনাশা দুখ



টাইফুন রঙের শাড়ি

দ্বীপ সরকার

দূরে, কালবৈশাখী জমে উঠেছে

দূরে কোথাও শব্দ হচ্ছে শন শন শন

সিনেম্যাটিক হাওয়া কারিশমা দেখাচ্ছে ঢের

অথচ, এই হাওয়া— কতোকাল ছন্নছাড়া!

পশের বাড়ির টিনগুলো কোথায় গিয়ে দাপাদাপি করছে

কোথাও আবার, গিরিখাদের দৃশ্যের মতোন

হুমড়ি খাচ্ছে কাঠঠোকরার কুঁড়েঘর

যুক্তরাষ্ট্রের গ্রান্ড ক্যানিওন এসে জড়ো হচ্ছে আমাদের এখানে

হাওয়াদের কোন ঘর-দোর নেই

সেকারণে ঘর দেখলেই ওরা টাইফুন রঙের

শাড়ি পরে আছড়ে পড়ে ঘরে ঘরে

যেনো, ঘর-দোর ওদের চির শত্রু!

যৈবুতি কন্যার মতো উচ্ছৃঙ্খল হয়ে

গাছে গাছে উঠে লাফাচ্ছে

ছাদের কার্নিশে একটা দুধখেকো চড়ুই ঝুলে আছে

টিনের চালে আটপৌরে একটা গাছ পড়ে ঝুলে আছে

জানালার পর্দায় ঝুলে আছে প্রিয়তমার চোখ

কালবৈশাখ আমাকেও ফিসফিসিয়ে বলছে

“তোমার কবিগিরিও ছাড়াবো”



পার্থক্য 

রফিকুল ইসলাম আধার

অনিন্দিতা, আমি চাইলেই কি আর

হতে পারি তোমার মতন?

গোধূলির এই শেষ বেলায়—

ঈশ্বর যখন তোমায় দিয়েছেন

অনায়াসে সব ভুলে যাওয়ার ঐশ্বরিক ক্ষমতা!

আর আমাকে?

যাকে তুমি নিঃশেষে করেছো হরণ,

ঈশ্বর তাকেই দিয়েছেন এক অমোঘ দণ্ড:

কেবলই তোমায় মনে রাখার আজন্ম অর্পণ।

এখানেই আমাদের ব্যবধান, পরম স্বাতন্ত্র্য,

দুজনের প্রেমের ব্যাকরণও তাই ভিন্ন;

রচিত হোক তবে এই অদ্ভুত উপাখ্যান

কারোর ভুলে যাওয়া 

আর কারোর ভুলতে না পারার।



এক টুকরো বিকেল

আকেল হায়দার

খামে পুরে এক টুকরো বিকেল পাঠালে

অম্নি চোখের পাটাতনে ঘুমন্ত সন্ধ্যাটা

তুমুল ইচ্ছে বৃষ্টিতে ভিজল...

অবাক হয়ে দেখছি ঋতুর কারুকাজ—

মন ও মননের অলৌকিক যোগফল।

মেঘের বাহুমূলে সন্ধ্যালগ্ন বিকেলটা

উঠতি বয়সী কিশোরীর কুশীলবে

লুকোচুরি খেলছে খেয়ালিপনায়—

মুহুর্মুহু ফুটছে সফেদ জলজ ফুল।

আমি চলে যাই, তবু—

হৃদয় কার্নিশে ফুটে থাকা

সব ফুলের মালিকানা

লিখে দিয়ে যাই তোমার নামে। 



নতুন বৈশাখ

আমির হামজা

চৈত্র সংক্রান্তির গ্লানি মুছে দিয়ে

যখন ভোরের আকাশ রাঙিয়ে ওঠে

তখন নাগরদোলার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ আর মাটির সরাচিত্রের রঙে জেগে ওঠে বাংলাদেশ।

পান্তা-ইলিশের স্বাদ আর লাল-সাদা শাড়ির মিছিলে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় ধর্ম-বর্ণ।

হালখাতার নতুন খেরোখাতায় শুরু হয় আগামীর স্বপ্ন বোনা

বৈশাখী মেলার বাঁশির সুরে প্রতিধ্বনিত হয় একসাথে বেঁচে থাকার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক গান।  



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত