সংবাদ

তাইমের বাবাকে এসআই শাহাদাত

‘উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক
প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

‘উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’
জুলাই জুলাই আন্দোলনে নিহত ইমাম হাসান তাইম

জুলাই জুলাই আন্দোলনে নিহত ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশের ছোড়া গুলির তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। একই সঙ্গে ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে’ তার ছেলে মারা গেছে বলে সুরতহাল প্রতিবেদন স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন যাত্রাবাড়ীতে নিহত হওয়া তাইমের বাবা।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এ কথা উল্লেখ করেন। 

জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন ময়নাল হোসেন। বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত তিনি। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউশনের চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার জবানবন্দিতে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৪ সালের ২১ জুলাই সকালে পরিবারের সদস্য-সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অবস্থান করি আমি। তাইমের মরদেহ সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আমার সঙ্গে দেখা করেন শাহবাগ থানার এসআই শাহাদাত। তখন পরিচয় দিয়ে তাইমকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে বলে জানাই। একইসঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলি। কিন্তু একই পেশার সহকর্মী হিসেবে কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে আরেকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি।’

তাইমের বাবার দাবি তিনি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলেও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিতে অকারণে দেরি করতে থাকেন এসআই শাহাদাত। পরে দুপুর ১২টার দিকে সুরতহাল করতে যান তিনি। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন বলে জবানবন্দিতে জানান তাইমের বাবা। 

তিনি বলেন,  আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি- ‘আপনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন’। জবাবে এসআই শাহাদাত বলেন ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে’। এই বলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। এতে আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই।

এ সময় তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান ‘আমার ছেলে মারা গেছে। চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। মরদেহে প্রায় পচন ধরে গেছে। । সুরতহাল শেষে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা পার হলেও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ নিয়ে এসআই শাহাদাতের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি। বিকেল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সাড়ে ৪টার পর সম্পন্ন হলে আমরা তাইমের মরদেহটি বুঝে পাই।’

এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দু’জন। তাদের সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী। পলাতকরা হলেন, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, মঈনুল করিমসহ অন্যরা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬


‘উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’

প্রকাশের তারিখ : ১৫ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

জুলাই জুলাই আন্দোলনে নিহত ইমাম হাসান তাইমের সুরতহাল প্রতিবেদনে পুলিশের ছোড়া গুলির তথ্য গোপন করা হয়েছে বলে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দিতে জানিয়েছেন তার বাবা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) ময়নাল হোসেন ভূঁইয়া। একই সঙ্গে ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে’ তার ছেলে মারা গেছে বলে সুরতহাল প্রতিবেদন স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন যাত্রাবাড়ীতে নিহত হওয়া তাইমের বাবা।

বুধবার (১৫ এপ্রিল) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীরের একক বেঞ্চে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি এ কথা উল্লেখ করেন। 

জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন ময়নাল হোসেন। বর্তমানে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে কল্যাণ ও ফোর্স বিভাগে এসআই হিসেবে কর্মরত তিনি। ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তার ছেলেকে হত্যা করা হয় বলে প্রসিকিউশনের চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার জবানবন্দিতে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘২০২৪ সালের ২১ জুলাই সকালে পরিবারের সদস্য-সহকর্মীদের নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে অবস্থান করি আমি। তাইমের মরদেহ সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া হয়। এর মধ্যেই আমার সঙ্গে দেখা করেন শাহবাগ থানার এসআই শাহাদাত। তখন পরিচয় দিয়ে তাইমকে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে বলে জানাই। একইসঙ্গে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করার কথা বলি। কিন্তু একই পেশার সহকর্মী হিসেবে কোনো সান্ত্বনা না দিয়ে আরেকজনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন তিনি।’

তাইমের বাবার দাবি তিনি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এলেও সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরিতে অকারণে দেরি করতে থাকেন এসআই শাহাদাত। পরে দুপুর ১২টার দিকে সুরতহাল করতে যান তিনি। সুরতহাল করার সময় পুলিশের গুলিবিদ্ধ হওয়ার চিহ্নগুলো না লিখে কিছু ছিদ্র ও কালো স্পট থাকার কথা লিপিবদ্ধ করেন বলে জবানবন্দিতে জানান তাইমের বাবা। 

তিনি বলেন,  আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি- ‘আপনি পুলিশের গুলিতে বিদ্ধ হওয়ার কথা না লিখে স্পট থাকার কথা কেন লিখলেন’। জবাবে এসআই শাহাদাত বলেন ‘এটা উপরের অর্ডার, আমি গুলির কথা লিখতে পারব না’। তিনি আরও বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আঘাতে ও গুলিতে আপনার ছেলে মারা গেছে’। এই বলে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আমাকে স্বাক্ষর করতে বলেন। এতে আমি অনেক চিন্তায় পড়ে যাই।

এ সময় তিনি সুরতহাল প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করে এই পুলিশ কর্মকর্তা জানান ‘আমার ছেলে মারা গেছে। চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ছেলের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। মরদেহে প্রায় পচন ধরে গেছে। । সুরতহাল শেষে প্রায় দুই-তিন ঘণ্টা পার হলেও ময়নাতদন্ত করা হয়নি। এ নিয়ে এসআই শাহাদাতের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু তিনি কোনো সহযোগিতা করেননি। বিকেল ৪টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য নির্ধারিত কক্ষে নেওয়া হয়। সাড়ে ৪টার পর সম্পন্ন হলে আমরা তাইমের মরদেহটি বুঝে পাই।’

এ মামলায় ১১ আসামির মধ্যে গ্রেপ্তার রয়েছেন দু’জন। তাদের সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন- যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও সাবেক এসআই শাহাদাত আলী। পলাতকরা হলেন, ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারী জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো. মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) জাকির হোসেন, পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন ও এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, মঈনুল করিমসহ অন্যরা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত