সংবাদ

শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ ও আহমদুল কবিরের স্মৃতি


সংগ্রাম দত্ত, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
সংগ্রাম দত্ত, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ১ জুন ২০২৬, ০৭:৫৯ পিএম

শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ ও আহমদুল কবিরের স্মৃতি
শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্য, যার নেপথ্যে জড়িয়ে আছে বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আহমদুল কবির ও সাতগাঁও চা বাগানের নাম। ছবি : সংবাদ

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে শ্রীমঙ্গলের দিকে এগোতেই চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর ভাস্কর্য। মাথায় ঝুড়ি, হাতে চা-পাতা তোলার ভঙ্গি-দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন তিনি পথিকদের স্বাগত জানাচ্ছেন চায়ের দেশে।

শ্রীমঙ্গলের পরিচিত এই ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মুছাই এলাকায় সাতগাঁও চা বাগানের পাশে এর অবস্থান। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সাতগাঁও চা বাগানের অর্থায়নে ২০০৯ সালে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২৪ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্যের কাজ সম্পন্ন হয়। চা-শ্রমিকদের শ্রম ও অবদানকে সম্মান জানাতে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি এখন শ্রীমঙ্গলের অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এই নান্দনিক উদ্যোগের নেপথ্যে থাকা সাতগাঁও চা বাগানের ইতিহাস ও এর স্বত্বাধিকারী আহমদুল কবিরের জীবন ও কর্ম অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় আহমদুল কবির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ১৯২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশাল জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তার নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পায় এবং ১৯৪৫-৪৬ মেয়াদে তিনি ডাকসুর প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

আহমদুল কবিরের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় যোগদানের মাধ্যমে। দেশভাগের পর তিনি ইস্ট পাকিস্তান ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে সরকারি চাকরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ১৯৫৪ সালে তিনি ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পথিকৃৎ। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) এবং আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এসেন্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ, ভিটা কোলা ও বেঙ্গল বেভারেজসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার হাত ধরেই বিকাশ লাভ করে।

জাতীয় রাজনীতিতেও তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক আহমদুল কবির ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬৫ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে নরসিংদী-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাংবাদিকতার জগতেও তার অবদান অবিস্মরণীয়; তিনি দীর্ঘকাল দৈনিক ‘সংবাদ’-এর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের স্বপক্ষে কাজ করেছেন।

২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান ঘটে। আজ শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি যেমন চা-শ্রমিকদের শ্রমের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আহমদুল কবিরের দূরদর্শী চিন্তা ও কর্মময় স্মৃতিকেও অম্লান করে রাখে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬


শ্রীমঙ্গলের ‘চা কন্যা’ ও আহমদুল কবিরের স্মৃতি

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ধরে শ্রীমঙ্গলের দিকে এগোতেই চোখে পড়ে সবুজ পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারীর ভাস্কর্য। মাথায় ঝুড়ি, হাতে চা-পাতা তোলার ভঙ্গি-দূর থেকে দেখলে মনে হয়, যেন তিনি পথিকদের স্বাগত জানাচ্ছেন চায়ের দেশে।

শ্রীমঙ্গলের পরিচিত এই ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি এখন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার মুছাই এলাকায় সাতগাঁও চা বাগানের পাশে এর অবস্থান। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং সাতগাঁও চা বাগানের অর্থায়নে ২০০৯ সালে ভাস্কর্যটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ২৪ ফুট উঁচু এই ভাস্কর্যের কাজ সম্পন্ন হয়। চা-শ্রমিকদের শ্রম ও অবদানকে সম্মান জানাতে নির্মিত এই ভাস্কর্যটি এখন শ্রীমঙ্গলের অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এই নান্দনিক উদ্যোগের নেপথ্যে থাকা সাতগাঁও চা বাগানের ইতিহাস ও এর স্বত্বাধিকারী আহমদুল কবিরের জীবন ও কর্ম অত্যন্ত বর্ণাঢ্য। দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় আহমদুল কবির এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। ১৯২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশাল জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তার নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পায় এবং ১৯৪৫-৪৬ মেয়াদে তিনি ডাকসুর প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।

আহমদুল কবিরের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় যোগদানের মাধ্যমে। দেশভাগের পর তিনি ইস্ট পাকিস্তান ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের প্রধান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে সরকারি চাকরির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে ১৯৫৪ সালে তিনি ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম পথিকৃৎ। ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংক (বর্তমানে পূবালী ব্যাংক) এবং আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালকদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। এসেন্সিয়াল ইন্ডাস্ট্রিজ, ভিটা কোলা ও বেঙ্গল বেভারেজসহ একাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার হাত ধরেই বিকাশ লাভ করে।

জাতীয় রাজনীতিতেও তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। প্রগতিশীল রাজনীতির ধারক আহমদুল কবির ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬৫ সালে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এবং স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ ও ১৯৮৬ সালে নরসিংদী-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাংবাদিকতার জগতেও তার অবদান অবিস্মরণীয়; তিনি দীর্ঘকাল দৈনিক ‘সংবাদ’-এর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং মুক্তচিন্তা ও গণতন্ত্রের স্বপক্ষে কাজ করেছেন।

২০০৩ সালের ২৪ নভেম্বর এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জীবনাবসান ঘটে। আজ শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চা বাগানের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘চা কন্যা’ ভাস্কর্যটি যেমন চা-শ্রমিকদের শ্রমের কথা মনে করিয়ে দেয়, তেমনি এর পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আহমদুল কবিরের দূরদর্শী চিন্তা ও কর্মময় স্মৃতিকেও অম্লান করে রাখে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত