সংবাদ

ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরার রাজনৈতিক দর্শন এবং আমাদের গন্তব্য


প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরার রাজনৈতিক দর্শন এবং আমাদের গন্তব্য
অনেকেই প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সূত্র ছাড়াই বলে থাকেন ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরা অশ্লীল শব্দাবলীর চর্চা করে যেতেন নিয়মিত


যারা মানুষের আচরণের সংস্কৃতি বিষয়ে কৌতূহলী এবং মনোযোগী তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন, স্বভাবিক কথা মালায় আমাদের স্বর অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। সমাজে বিভেদ, বিভক্তি যতো বেড়ে যায় প্রতিহিংসা ও সমতালে বৃদ্ধি পায়। মানুষের স্বাভাবিক স্বর অস্বাভাবিক ভাবে উঁচুতে উঠতে থাকে। আক্রমনাত্মক হয়ে যায় কণ্ঠস্বর।  বাঙালি স্বভাবজাত ভাবে কিছুটা উচ্চস্বরে যোগাযোগে অভ্যস্থ।সমসাময়িক কালে রাজনৈতিক সভা সমাবেশে মার্জিত, চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য খুব কম শুনা যায়।সকলেই ভাবেন স্বর যতো উচ্চ হবে শ্রোতাদের কাছ বক্তব্য ততো গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।আলোচনার বিষয় বস্তু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করলেও চলে, বক্তব্যের শালীনতাও চিন্তা যোগ্য নয়। অশালীন শব্দের অধিকতর ব্যবহার বক্তব্যকে ক্ষমতায়িত  করে বলে  অনেকেই বিশ্বাস করেন।অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের  পেছনে যুক্তির কোন অভাব নেই। ফরাসী বিপ্লব থেকে শুরু কর বিশ্বখ্যাত বিপ্লবীদের কথাও শুনে থাকি। অনেকেই প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সূত্র ছাড়াই বলে থাকেন ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরা অশ্লীল শব্দাবলীর চর্চা করে যেতেন নিয়মিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাই আমরা মহাজ্ঞানী চে কিংবা কাস্ত্রোর মতো গড়ে তুলছি। তাই মনে হয় সংস্কৃতি বিনির্মানের পথের পথিকদের আমাদের ‘চরৈবেতি’ বলা মহৎ কর্ম। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উর্বর  ক্ষেত্রে আমরা মহানন্দে মুক্তভাবে অশ্লীলতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি বাক স্বাধীনতার নামে।

ষাটের দশকে জন্ম। লেখা পড়ার দৌড় খুব সীমিত। চে গুয়েভেরার অশ্লীলতা শব্দ চর্চার দর্শনের কথা জানা নেই। তবে মানুষ হিসেবে এতোটুকু বুঝি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যতই অশ্লীলতা প্রবেশ করবে, সামাজিক সংস্কৃতি ততই অগ্রণযোগ্য এবং পশ্চাদপদ হতে থাকবে দ্রুত। যেহেতু ষাটের দশকে জন্ম আন্দোলন, অভূত্থান, যুদ্ধ দেখেই  বড় হয়েছি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন কী ভাবে সংগঠিত হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিক্ষা স্বয়ংক্রিয় ভাবে হয়ে গেছে। বড় বড় জাতীয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার  এবং বক্তব্য শুনার সৌভাগ্য হয়েছে। রসসিক্ত, ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। এসব মহান নেতাদের মেঠো বক্তৃতাতেও কখনো সুক্ষ কিংবা স্থুল অশ্লীলতার ইঙ্গিত পাইনি। মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান,  অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, মনি সিংহের বক্তব্যে সৌজন্য, শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখিনি। ভিন্ন আদর্শের নেতাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করেতে দেখেছি কিন্তু এ’কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কোন বক্তব্য শুনতে পাইনি। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতির মাঠের মেঠো বক্তৃতা, দেয়াল লিখন, স্লোগানে যখন উচ্চারণ অযোগ্য খিস্তি খেঁউড়ের দৌরাত্ম দেখি তখন মনে হয় সময়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছি বোধ হয় আমরা বহু মানুষ।আশার কথা এখনও অগণন রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য  বিশ্বাস করেন এসব খিস্তি খেঁউড় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ নয়। মানুষের মুখের ভাষাই মূলত রাজনীতি এবং সমাজের ভাষা। নির্লিপ্ত ভাবে উচ্চারিত এসব অশ্লীল শব্দাবলী ক্ষণিকের জন্য চমক সৃষ্টির উপাদান মাত্র, এসব বক্তব্য দীর্ঘ মেয়াদী আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে।

ভাষা, শ্রেণী, সমাজের একটি সভ্য কাঠামো রয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে যাওয়ার জন্য দুঃখবোধ, ভাঙন রোধের জন্য সামজিক অভিভাবকদের নির্লিপ্ততা, উদাসীন,আচরণ মোটেই কাম্য নয়। ভয়ের দিক হলো সমাজের বাতিঘর হিসেবে যাদেরকে আমরা চিহ্নিত করে রেখেছিলাম তারা কেউ এর প্রতিবাদ করছেন না। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বলার চেষ্টা করছেন এটি ভাষার রূপান্তর বা বদলে যাওয়া। এটি নতুন প্রজন্মের নতুন অভিব্যক্তি। যদিও তারা গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম অস্বাবিক বাঁক বদলের নজির কখনো দেখা যায়নি।

অশ্লীলতার বৈধকরন যারা করছেন তারা অনেকেই সমাজের জ্ঞানী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তারা সমাজের নৈতিকতার দেয়ালকে ভাঙ্গার জন্য উৎসাহ প্রদান করছেন। নেতৃত্বের আসন থেকে ‘অশ্লীলতা বৈধ’ এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী প্রজন্ম এবং সমাজকে নিশ্চিত ভাবে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে, গবেষণা না করেই এ’কথাটি বলা যায়।

আশ্চর্যের বিষয় অশ্লীল শব্দ এবং বাক্য গুলো ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি নারীদের উদ্দেশে। আমাদের দেশের নৈতিকতায় মাতৃজাতির প্রতি অভাবনীয় শ্রদ্ধার জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিলো এবং এ’বিষয়ে সমাজের সকলেই একই সুরে কথা বলতেন। সংবেদনশীল কোন মানুষ যখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে অশ্রাব্য শব্দে মাতৃজাতির প্রতি অপমান সূচক স্লোগান তোলেন তখন আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির মানের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পারা যায়না। অসভ্যতাকে পরোক্ষ ভাবে সমর্থন দেয়া কিংবা নীরবতার সংস্কৃতি পালন করাকে দায়িত্বশীল, দেশ প্রেমিক নাগরিকের লক্ষন হিসেবে মেনে নেয়া যায়না। দায় না থাকলে সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক অভিভাবকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যায়না। নির্লিপ্ততা, এড়িয়ে যাওয়া, উদাসীনতার দায় কিংবা জবাবদিহিতা সামজিক অভিভাবকদের একসময় বহন করতে হবে এ’কথাটি মনে রাখা উচিত।  

রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্রুত অধঃপতনের এই সময়ে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা নিয়ত শুনে থাকি। তবে যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলে থাকেন তারা  নিশ্চয় জানেন যে আক্রমনাত্মক যোগাযোগ সমাজে প্রতিহিংসাকে বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনীতিতে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এরকম অস্থির এক সময়ে নানা ভাবে বিভক্ত সমাজে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি চর্চার কথা অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক বয়ান বলে মনে হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন।সব কিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিশুদ্ধকরন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের সদস্য, সাংস্কৃতিক সংগঠণের কর্মীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ১২  ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে আমাদের সামনে হাজির হয়ে ছিলেন। সাধারণ নাগরিকদের কর্ণকূহরে বহু মধুর শব্দ এবং বাক্য এখনও অনুকরণ করে বেড়াচ্ছে। নির্বাচনের পর সব পথ সব মত বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ আমরা শুনেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে।

গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচনী জনসভায় আমরা ডানপন্থী দলগুলোর কাছ থেকেও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর নবগঠিত জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেছিলেন  একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে আস্তিক-নাস্তিক, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তারা অনেকেই এরকম সাহসী উচ্চারণ শুনে নড়েচড়ে উঠেন।

সাত চল্লিশের পর থেকে আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের অঙ্গীকারের কথা শুনে আসছি। পাকিস্তানের তেইশ’ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছর অতিক্রম করার  সময়ও আমরা একই অঙ্গীকারের কথা শুনছি। প্রশ্ন হলো আমরা কী অনেক দূর অতিক্রম করেও যাত্রা শুরুর বিন্দুতেই অবস্থা করছি। মনে রাখতে হবে ভৌতিক কাঠামোর উন্নয়নের থেকে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান উন্নয়ন হলো গুরুত্বপূর্ণ। ভৌতিক কাঠামো উন্নয়নের সাথে যদি আমাদের সংস্কৃতির উন্নয়ন না ঘটে তাহলে উন্নয়ন কখনো টেকসই হবেনা। ভৌতিক কাঠামো বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাবে।

ফিরে আসি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোচনায়। অশ্লীলতার নহর বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধ , সভ্য, গণতান্ত্রিক জাতি গঠণ কী সম্ভব। এ’জন্য রাজনীতিবিজ্ঞান, প্ল্যাটো, এরিস্টোটল, মার্ক্স পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। জাতিকে কদর্য পথ থেকে ফেরানোর জন্য সামাজিক অভিভাবক বিশেষ করে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিকসহ সব শ্রেণীর মানুষের সচেতন প্রয়াস খুব জরুরি। রাজনৈতিক ভাষার বিবর্তন, রুপান্তর ঘটবে এ’কথা মনে রেখেই  এগোতে হবে। বিবর্তন মানে বিপথে গমণ নয়। বিবর্তন হলো কাক্সিক্ষত, জাতীয় স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনাকাক্সিক্ষত লক্ষ্যহীন বিবর্তন চাইনা। আমরা চাই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে আলোচনার গভীরতা থাকবে, সব শ্রেণীপেশার মানুষের অংশ গ্রহণ থাকবে। মার্জিত, রুচিসম্পন্ন স্লোগান, দেয়াল লিখন, মেঠো বক্তৃতায় জাতি নতুন পথের সন্ধান পাবে। এরকম লক্ষ্যে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে না ওঠে, তাহলে আমাদের সার্বিক উন্নয়নের সব চেষ্টা যে দূর আকাশে উবে যাবে এরকম উপসংহারে পৌঁছায় অন্যায় কোনো কাজ হবে বলে মনে হয়না।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক] 



আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬


ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরার রাজনৈতিক দর্শন এবং আমাদের গন্তব্য

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬

featured Image


যারা মানুষের আচরণের সংস্কৃতি বিষয়ে কৌতূহলী এবং মনোযোগী তারা নিশ্চয় লক্ষ্য করে থাকবেন, স্বভাবিক কথা মালায় আমাদের স্বর অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। সমাজে বিভেদ, বিভক্তি যতো বেড়ে যায় প্রতিহিংসা ও সমতালে বৃদ্ধি পায়। মানুষের স্বাভাবিক স্বর অস্বাভাবিক ভাবে উঁচুতে উঠতে থাকে। আক্রমনাত্মক হয়ে যায় কণ্ঠস্বর।  বাঙালি স্বভাবজাত ভাবে কিছুটা উচ্চস্বরে যোগাযোগে অভ্যস্থ।সমসাময়িক কালে রাজনৈতিক সভা সমাবেশে মার্জিত, চিন্তা উদ্রেককারী বক্তব্য খুব কম শুনা যায়।সকলেই ভাবেন স্বর যতো উচ্চ হবে শ্রোতাদের কাছ বক্তব্য ততো গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।আলোচনার বিষয় বস্তু নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করলেও চলে, বক্তব্যের শালীনতাও চিন্তা যোগ্য নয়। অশালীন শব্দের অধিকতর ব্যবহার বক্তব্যকে ক্ষমতায়িত  করে বলে  অনেকেই বিশ্বাস করেন।অশ্লীল শব্দ ব্যবহারের  পেছনে যুক্তির কোন অভাব নেই। ফরাসী বিপ্লব থেকে শুরু কর বিশ্বখ্যাত বিপ্লবীদের কথাও শুনে থাকি। অনেকেই প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সূত্র ছাড়াই বলে থাকেন ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভেরা অশ্লীল শব্দাবলীর চর্চা করে যেতেন নিয়মিত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি তাই আমরা মহাজ্ঞানী চে কিংবা কাস্ত্রোর মতো গড়ে তুলছি। তাই মনে হয় সংস্কৃতি বিনির্মানের পথের পথিকদের আমাদের ‘চরৈবেতি’ বলা মহৎ কর্ম। রাজনৈতিক সংস্কৃতির উর্বর  ক্ষেত্রে আমরা মহানন্দে মুক্তভাবে অশ্লীলতার চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি বাক স্বাধীনতার নামে।

ষাটের দশকে জন্ম। লেখা পড়ার দৌড় খুব সীমিত। চে গুয়েভেরার অশ্লীলতা শব্দ চর্চার দর্শনের কথা জানা নেই। তবে মানুষ হিসেবে এতোটুকু বুঝি, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যতই অশ্লীলতা প্রবেশ করবে, সামাজিক সংস্কৃতি ততই অগ্রণযোগ্য এবং পশ্চাদপদ হতে থাকবে দ্রুত। যেহেতু ষাটের দশকে জন্ম আন্দোলন, অভূত্থান, যুদ্ধ দেখেই  বড় হয়েছি। ঊনসত্তরের গণআন্দোলন কী ভাবে সংগঠিত হয়েছে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনের শিক্ষা স্বয়ংক্রিয় ভাবে হয়ে গেছে। বড় বড় জাতীয় নেতাকে সামনে থেকে দেখার  এবং বক্তব্য শুনার সৌভাগ্য হয়েছে। রসসিক্ত, ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছি। এসব মহান নেতাদের মেঠো বক্তৃতাতেও কখনো সুক্ষ কিংবা স্থুল অশ্লীলতার ইঙ্গিত পাইনি। মাওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান,  অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, মনি সিংহের বক্তব্যে সৌজন্য, শিষ্টাচারের সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখিনি। ভিন্ন আদর্শের নেতাদের মতাদর্শের বিরোধিতা করেতে দেখেছি কিন্তু এ’কারণে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কোন বক্তব্য শুনতে পাইনি। সাম্প্রতিক কালের রাজনীতির মাঠের মেঠো বক্তৃতা, দেয়াল লিখন, স্লোগানে যখন উচ্চারণ অযোগ্য খিস্তি খেঁউড়ের দৌরাত্ম দেখি তখন মনে হয় সময়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছি বোধ হয় আমরা বহু মানুষ।আশার কথা এখনও অগণন রাজনৈতিক নেতা, নাগরিক সমাজের সদস্য  বিশ্বাস করেন এসব খিস্তি খেঁউড় বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির অংশ নয়। মানুষের মুখের ভাষাই মূলত রাজনীতি এবং সমাজের ভাষা। নির্লিপ্ত ভাবে উচ্চারিত এসব অশ্লীল শব্দাবলী ক্ষণিকের জন্য চমক সৃষ্টির উপাদান মাত্র, এসব বক্তব্য দীর্ঘ মেয়াদী আবেদন সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হবে।

ভাষা, শ্রেণী, সমাজের একটি সভ্য কাঠামো রয়েছে। এই কাঠামো ভেঙে যাওয়ার জন্য দুঃখবোধ, ভাঙন রোধের জন্য সামজিক অভিভাবকদের নির্লিপ্ততা, উদাসীন,আচরণ মোটেই কাম্য নয়। ভয়ের দিক হলো সমাজের বাতিঘর হিসেবে যাদেরকে আমরা চিহ্নিত করে রেখেছিলাম তারা কেউ এর প্রতিবাদ করছেন না। আমাদের বুদ্ধিজীবীদের ক্ষুদ্র একটি অংশ বলার চেষ্টা করছেন এটি ভাষার রূপান্তর বা বদলে যাওয়া। এটি নতুন প্রজন্মের নতুন অভিব্যক্তি। যদিও তারা গ্রহণযোগ্য কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছেন না। বাংলা ভাষার হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম অস্বাবিক বাঁক বদলের নজির কখনো দেখা যায়নি।

অশ্লীলতার বৈধকরন যারা করছেন তারা অনেকেই সমাজের জ্ঞানী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তারা সমাজের নৈতিকতার দেয়ালকে ভাঙ্গার জন্য উৎসাহ প্রদান করছেন। নেতৃত্বের আসন থেকে ‘অশ্লীলতা বৈধ’ এই বার্তা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী প্রজন্ম এবং সমাজকে নিশ্চিত ভাবে আরও গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে, গবেষণা না করেই এ’কথাটি বলা যায়।

আশ্চর্যের বিষয় অশ্লীল শব্দ এবং বাক্য গুলো ব্যবহৃত হচ্ছে সরাসরি নারীদের উদ্দেশে। আমাদের দেশের নৈতিকতায় মাতৃজাতির প্রতি অভাবনীয় শ্রদ্ধার জায়গা নির্দিষ্ট করা ছিলো এবং এ’বিষয়ে সমাজের সকলেই একই সুরে কথা বলতেন। সংবেদনশীল কোন মানুষ যখন উন্মুক্ত আকাশের নিচে অশ্রাব্য শব্দে মাতৃজাতির প্রতি অপমান সূচক স্লোগান তোলেন তখন আমাদের সামগ্রিক সংস্কৃতির মানের অবস্থান নিয়ে দুশ্চিন্তা না করে পারা যায়না। অসভ্যতাকে পরোক্ষ ভাবে সমর্থন দেয়া কিংবা নীরবতার সংস্কৃতি পালন করাকে দায়িত্বশীল, দেশ প্রেমিক নাগরিকের লক্ষন হিসেবে মেনে নেয়া যায়না। দায় না থাকলে সামাজিক, রাষ্ট্রনৈতিক অভিভাবকত্বের যোগ্যতা অর্জন করা যায়না। নির্লিপ্ততা, এড়িয়ে যাওয়া, উদাসীনতার দায় কিংবা জবাবদিহিতা সামজিক অভিভাবকদের একসময় বহন করতে হবে এ’কথাটি মনে রাখা উচিত।  

রাজনৈতিক সংস্কৃতির দ্রুত অধঃপতনের এই সময়ে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির কথা নিয়ত শুনে থাকি। তবে যারা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতির জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলে থাকেন তারা  নিশ্চয় জানেন যে আক্রমনাত্মক যোগাযোগ সমাজে প্রতিহিংসাকে বাড়িয়ে দেয় এবং রাজনীতিতে সকল শ্রেণীপেশার মানুষের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। এরকম অস্থির এক সময়ে নানা ভাবে বিভক্ত সমাজে অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনীতি চর্চার কথা অনেক ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক বয়ান বলে মনে হয়।

অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার জন্য অন্তর্ভুক্তি মূলক রাজনৈতিক চর্চার প্রয়োজন।সব কিছুর পূর্বশর্ত হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিশুদ্ধকরন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের সদস্য, সাংস্কৃতিক সংগঠণের কর্মীরা অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে ১২  ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পূর্বে আমাদের সামনে হাজির হয়ে ছিলেন। সাধারণ নাগরিকদের কর্ণকূহরে বহু মধুর শব্দ এবং বাক্য এখনও অনুকরণ করে বেড়াচ্ছে। নির্বাচনের পর সব পথ সব মত বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি হবে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিষয়ে সবচেয়ে সাহসী উচ্চারণ আমরা শুনেছি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে।

গণতন্ত্রের মৌলবাণী হচ্ছে শত ফুল বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। নির্বাচনী জনসভায় আমরা ডানপন্থী দলগুলোর কাছ থেকেও অন্তর্ভুক্তি মূলক সমাজ এবং রাজনীতি নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে ৫ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাম প্রগতিশীল দলগুলোর নবগঠিত জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান বলেছিলেন  একটি আধুনিক ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে আস্তিক-নাস্তিক, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী কিংবা সংশয়বাদী সব শ্রেণীর মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে। যারা রাজনীতিতে সক্রিয় নন, উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন তারা অনেকেই এরকম সাহসী উচ্চারণ শুনে নড়েচড়ে উঠেন।

সাত চল্লিশের পর থেকে আমরা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিকিকরণের অঙ্গীকারের কথা শুনে আসছি। পাকিস্তানের তেইশ’ বছর, স্বাধীন বাংলাদেশের পঞ্চান্ন বছর অতিক্রম করার  সময়ও আমরা একই অঙ্গীকারের কথা শুনছি। প্রশ্ন হলো আমরা কী অনেক দূর অতিক্রম করেও যাত্রা শুরুর বিন্দুতেই অবস্থা করছি। মনে রাখতে হবে ভৌতিক কাঠামোর উন্নয়নের থেকে সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির মান উন্নয়ন হলো গুরুত্বপূর্ণ। ভৌতিক কাঠামো উন্নয়নের সাথে যদি আমাদের সংস্কৃতির উন্নয়ন না ঘটে তাহলে উন্নয়ন কখনো টেকসই হবেনা। ভৌতিক কাঠামো বালির বাঁধের মতো ভেঙে যাবে।

ফিরে আসি রাজনৈতিক সংস্কৃতির আলোচনায়। অশ্লীলতার নহর বয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতর থেকে ঐক্যবদ্ধ , সভ্য, গণতান্ত্রিক জাতি গঠণ কী সম্ভব। এ’জন্য রাজনীতিবিজ্ঞান, প্ল্যাটো, এরিস্টোটল, মার্ক্স পড়ার কোন প্রয়োজন নেই। জাতিকে কদর্য পথ থেকে ফেরানোর জন্য সামাজিক অভিভাবক বিশেষ করে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, বিবেকসম্পন্ন সাংবাদিকসহ সব শ্রেণীর মানুষের সচেতন প্রয়াস খুব জরুরি। রাজনৈতিক ভাষার বিবর্তন, রুপান্তর ঘটবে এ’কথা মনে রেখেই  এগোতে হবে। বিবর্তন মানে বিপথে গমণ নয়। বিবর্তন হলো কাক্সিক্ষত, জাতীয় স্বপ্নের গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অনাকাক্সিক্ষত লক্ষ্যহীন বিবর্তন চাইনা। আমরা চাই এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে আলোচনার গভীরতা থাকবে, সব শ্রেণীপেশার মানুষের অংশ গ্রহণ থাকবে। মার্জিত, রুচিসম্পন্ন স্লোগান, দেয়াল লিখন, মেঠো বক্তৃতায় জাতি নতুন পথের সন্ধান পাবে। এরকম লক্ষ্যে যদি জাতীয় ঐক্য গড়ে না ওঠে, তাহলে আমাদের সার্বিক উন্নয়নের সব চেষ্টা যে দূর আকাশে উবে যাবে এরকম উপসংহারে পৌঁছায় অন্যায় কোনো কাজ হবে বলে মনে হয়না।

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক ও উন্নয়ন গবেষক] 




সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত