সংবাদ

গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া


হোসেন আবদুল মান্নান
হোসেন আবদুল মান্নান
প্রকাশ: ২ জুন ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব কোরবানির ঈদের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনো এর আমেজ রয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটে হাজার হাজার তরুণ তরুণীর অবাধ চলাফেরা, হোন্ডার পিঠে চেপে  ছুটছে এদিক ওদিক। চারদিকে হর্ণ বাজছে নিরন্তর। ধীরে ধীরে গ্রামও হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক শহুরে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজলি বাতি, চা, কফির দোকান হয়েছে, চলছে অন্তহীন আড্ডা। এখন জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠশালা এগুলো। বাহ্যিক ভাবে দেখলে মনে হবে, মানুষ ভাবলেশহীন, নির্ভার প্রাণোচ্ছল জীবন কাটাচ্ছে। নিত্য দুর্ঘটনা মাথায় নিয়ে যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযানে সয়লাব হয়ে গেছে সারাদেশ। এর সহজলভ্যতা যদি উন্নয়নের মাপকাঠি হয় তবে  বর্তমান বাংলাদেশ নিশ্চয় একটা উন্নত দেশ। বলা যায়, ঘরে ঘরে জনপ্রতি একটি হোন্ডার দেশ। একসময় গণচীনকে বলা হত, যত মানুষ তত বাইসাইকেলের দেশের আরেক নাম মহাচীন।

২.

ঈদের পরে গ্রামজুড়ে একটা করুণ চিত্র দেখলাম। পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থোকা থোকা পড়ে আছে জবাই করা গোরুর চামড়া। দুয়েকজন গ্রাম্য ছোট ক্রেতা চামড়া কিনতে আসলেও খুব বেশি আগ্রহভরে নয়। এসে দাম বলতেও নারাজ ভাব প্রদর্শন করছে। যেন এটা মূল্যহীন এক পঁচনশীল বস্তু। হয় সামান্য দামে বিক্রি করুন অথবা দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করন। চোখের সামনে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গোরুর চামড়া নিয়ে গেল ৫শ’ টাকায়। তা-ও ক্রেতার দয়ার বদৌলতে বাড়ির আঙিনার পরিবেশকে বাসযোগ্য করা গেল। ফলে ক্রেতা অল্প পুঁজিতে অনেক সংখ্যক চামড়া ক্রয় করতে সক্ষম হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সে ক্রয়কৃত চামড়াগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবন সংযোগ না করে অপেক্ষাকৃত বড় ক্রেতার জন্যে বসে থেকে চামড়ার গুণাবলি নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথে পড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনার চিত্র ভেসে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো এক এলাকায় কোরবানির অসংখ্য  চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার সংবাদ পড়ে বেদনার্ত হলাম। অবস্থা যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, আগামী দিনগুলোতে গোরুর দাম ক্রমাগত বেড়ে চলবে আর বিপরীতক্রমে চামড়ার মূল্য ২০০/১০০ টাকায় নেমে আসবে। এবং মানুষ হতাশ হয়ে বিক্রি না করে এগুলোকে মাটিতে সমাধিস্থ করে দিবে।

৩.

পশুর চামড়ার ভাগ্যে পাটের পরিণতির ভয়ংকর চিত্রকল্প দিব্য চোখে ভাসছে। একসময় এ পূর্ববঙ্গ পরিচিত ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। এদেশের পাটের খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। এদেশ থেকে পাট নারায়ণগঞ্জ হয়ে নৌপথে  ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে পৌঁছে যেত। কথিত আছে বৃটিশরা রেলপথ আবিষ্কার করেছিল মূলত পাট পরিবহনের জন্যে। দুনিয়ার বাহারি বস্ত্র আর পাটজাত পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ছিল এই সোনালি আঁশ। এদেশেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পৃথিবীর সেরা পাটকল আদমজী। এর লভ্যাংশ দিয়ে গড়ে উঠেছিল লতিফ বাওয়ানী, করিম, ইউএমসি’র মতন আরও অনেক  বিখ্যাত জুটমিলস। কালক্রমে পাটের গুরুত্ব কমে যায়, জাতীয়করণ নীতি, শ্রমিক ফেডারেশন/ ইউনিয়নের অপ রাজনীতি, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি,পাটের বিকল্প দ্রব্য সৃষ্টি হওয়া এসব নানাবিধ কারণে দেশের পাট এবং পাট-শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে।

একই কথা শোনা গেল সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখ থেকেও। চামড়ার মূল্যহীনতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা আমার কাজ নয়, আমার কাজ জবাইয়ের আগের। আমি প্রাণিসম্পদ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘পৃথিবীতে চামড়ার বিকল্প সিনথেটিক জাতীয় দ্রব্যের চাহিদা বেশি থাকায় এর উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না'। এতে দেখা গেল, পাটের সঙ্গে এর একটা অদ্ভুত ও চমৎকার মিল আছে। পাট শিল্পের মতো চামড়াও বিশ্ববাজারের আধুনিক  প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে যাচ্ছে। অথচ এদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলতে একসময় পাটের পরে চামড়ার নাম ছিল। বর্তমানে পোশাকশিল্পের কথা বাদ দিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ শতকোটি ডলার আয় করতে পারতো। চামড়া বা লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর অধিকতর জোর দেয়া হতো। বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকার ঈদের আগে কোরবানির চামড়ার ফুট প্রতি একটা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এতে শহরে এবং গ্রামের সর্বনিম্ন দাম বলা হয়েছিল। কোনো কিছুই কাজ করেনি চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছর ধরে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত ছিল কোরবানির চামড়া এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একটা ˆদনিক পত্রিকার সংবাদে প্রাপ্ত এমন তথ্য যে, ‘এক কাপ চায়ের দামে মিলেছে ছাগলের কাঁচা চামড়া। দেশের কিছু এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ের কোনো ক্রেতাই পাওয়া যায় নি।  বিক্রি করতে না পেরে শত শত কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে’।

৪.

চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের এমন দুর্বিষহ অবস্থার জন্যে দায়ী কে? সাধারণ মানুষ কাকে দায়ী করবে, তারা যাবে কোথায়? জানা যায়, এবারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তারল্য সংকটের কারণে। ট্যানারি কারখানাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর কোনো না কোনো অযুহাতকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড়ায়। তারা বলছে, ব্যাংক থেকে তারা প্রয়োজনীয় টাকা ঋণ হিসেবে পায়নি। পূর্বের তুলনায় এক চতুর্থাংশ টাকাও ব্যাংক সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে গ্রাম পর্যায়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে অর্থ সরবরাহ করতে পারেনি। দেশের মানুষও চামড়ার যথোপযুক্ত দাম পায়নি। এখন বাজেট প্রনয়ণ ও ঘোষণার সময় সরকার বাজেট নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত। বড় বাজেটই সব। কোরবানির আগেই চামড়া বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল বলে সচেতন সমাজ মনে করে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে যথেষ্ট পূর্বেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা করা হয়নি। ফলে সারা দেশে বিপুল সংখ্যক কাঁচা চামড়ার এমন অপচয় ও অবর্ণনীয় আর্থিক ক্ষতি হলো। এটা ব্যক্তিক নয় জাতীয় ক্ষতি। এর দায় সরকারকে নিতে হবে এবং দিন শেষে সবই সরকারের ক্ষতি। সাধারণ মানুষের নয়।

সরকার আসে সরকার যায়। মানুষ একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। এবার নতুন কিছু হবে, আমূল পরিবর্তন আসবে। জনপ্রশাসনে, নীতিতে, শাসণে, সুশাসনের সর্বত্র মঙ্গলছায়ায় জনসাধারণ সিক্ত হবে। এটা বেশি কিছু চাওয়া নয়, খুব স্বাভাবিক চাওয়া। মানুষ গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে চায়। এটাও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এদেশে অনেকদিন যাবৎ একই ধারার সমাজ বাস্তবতা, রাজনীতি, অর্থনীতি আর অপ-সংস্কৃতি চলমান আছে। মানুষ এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাইরের  জগতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে চাইবে, এটা কোনো অভিনব বিষয় নয়।

৫.

দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়াকে বাঁচাতে হবে, জরুরি রপ্তানিতে কাজে লাগাতে হবে। চামড়াজাত পণ্য জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ছাড়াও নানা প্রকার অভিজাত দ্রব্যাদি তৈরিতে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ঈদুল আজহার মৌসুমের পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়ার সঠিক ব্যবহার করতে না পারা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়  ব্যর্থতার শামিল হবে। সিন্ডিকেট করে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা যায় না। এটা পাপের পর্যায়ে পড়ে। তাছাড়া কোরবানির চামড়ার মূল্যের প্রকৃত মালিক হল সমাজের গরিব, মিসকিন, অসহায় মানুষ। তারাই এর হকদার। এদেরকে ঠকানোর অর্থ ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসনকে অমান্য করা। এ বিষয়ে দলমতের ঊর্ধে ওঠে সকলকে সোচ্চার হতে হবে, সচেতন হতে হবে। চোখের সামনেই পশুর চামড়াজাত পণ্যে সারা দুনিয়া চলছে। মানুষের হাতে হাতে এ-সব পণ্য। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আভিজাত্যের প্রতীক মানে চামড়ার তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সেখানে এদেশে কাঁচা চামড়াকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত করে ভাগাড়ে ফেলে দেয়া কী স্বাভাবিক কোনো ঘটনা? কাজেই একটুও বিলম্ব না করে, সরকারকে এখনই ভাবতে হবে, কোরবানি থেকে পাওয়া কোটি কোটি কাঁচা চামড়ার ভবিষ্যৎ সদ্ব্যবহার কেমন করে  হবে?

[লেখক: গল্পকার]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬


গ্রামে ঈদ এবং কোরবানির চামড়া

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব কোরবানির ঈদের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। তবে গ্রামেগঞ্জে এখনো এর আমেজ রয়ে গেছে। রাস্তা ঘাটে হাজার হাজার তরুণ তরুণীর অবাধ চলাফেরা, হোন্ডার পিঠে চেপে  ছুটছে এদিক ওদিক। চারদিকে হর্ণ বাজছে নিরন্তর। ধীরে ধীরে গ্রামও হয়ে উঠেছে যান্ত্রিক শহুরে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে বিজলি বাতি, চা, কফির দোকান হয়েছে, চলছে অন্তহীন আড্ডা। এখন জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির পাঠশালা এগুলো। বাহ্যিক ভাবে দেখলে মনে হবে, মানুষ ভাবলেশহীন, নির্ভার প্রাণোচ্ছল জীবন কাটাচ্ছে। নিত্য দুর্ঘটনা মাথায় নিয়ে যন্ত্রচালিত দ্বিচক্রযানে সয়লাব হয়ে গেছে সারাদেশ। এর সহজলভ্যতা যদি উন্নয়নের মাপকাঠি হয় তবে  বর্তমান বাংলাদেশ নিশ্চয় একটা উন্নত দেশ। বলা যায়, ঘরে ঘরে জনপ্রতি একটি হোন্ডার দেশ। একসময় গণচীনকে বলা হত, যত মানুষ তত বাইসাইকেলের দেশের আরেক নাম মহাচীন।

২.

ঈদের পরে গ্রামজুড়ে একটা করুণ চিত্র দেখলাম। পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থোকা থোকা পড়ে আছে জবাই করা গোরুর চামড়া। দুয়েকজন গ্রাম্য ছোট ক্রেতা চামড়া কিনতে আসলেও খুব বেশি আগ্রহভরে নয়। এসে দাম বলতেও নারাজ ভাব প্রদর্শন করছে। যেন এটা মূল্যহীন এক পঁচনশীল বস্তু। হয় সামান্য দামে বিক্রি করুন অথবা দুর্গন্ধময় পরিবেশ সৃষ্টি করন। চোখের সামনে ১ লাখ ৪০ হাজার টাকার গোরুর চামড়া নিয়ে গেল ৫শ’ টাকায়। তা-ও ক্রেতার দয়ার বদৌলতে বাড়ির আঙিনার পরিবেশকে বাসযোগ্য করা গেল। ফলে ক্রেতা অল্প পুঁজিতে অনেক সংখ্যক চামড়া ক্রয় করতে সক্ষম হলো। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, সে ক্রয়কৃত চামড়াগুলোতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ লবন সংযোগ না করে অপেক্ষাকৃত বড় ক্রেতার জন্যে বসে থেকে চামড়ার গুণাবলি নষ্ট করে ফেলেছে। ফলে ছোট চামড়া ব্যবসায়ীরা প্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পথে পড়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চামড়া নিয়ে বিড়ম্বনার চিত্র ভেসে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কোনো এক এলাকায় কোরবানির অসংখ্য  চামড়া ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার সংবাদ পড়ে বেদনার্ত হলাম। অবস্থা যেদিকে গড়াচ্ছে, তাতে মনে হয়, আগামী দিনগুলোতে গোরুর দাম ক্রমাগত বেড়ে চলবে আর বিপরীতক্রমে চামড়ার মূল্য ২০০/১০০ টাকায় নেমে আসবে। এবং মানুষ হতাশ হয়ে বিক্রি না করে এগুলোকে মাটিতে সমাধিস্থ করে দিবে।

৩.

পশুর চামড়ার ভাগ্যে পাটের পরিণতির ভয়ংকর চিত্রকল্প দিব্য চোখে ভাসছে। একসময় এ পূর্ববঙ্গ পরিচিত ছিল সোনালি আঁশের দেশ হিসেবে। এদেশের পাটের খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী। এদেশ থেকে পাট নারায়ণগঞ্জ হয়ে নৌপথে  ইংল্যান্ডের ডান্ডিতে পৌঁছে যেত। কথিত আছে বৃটিশরা রেলপথ আবিষ্কার করেছিল মূলত পাট পরিবহনের জন্যে। দুনিয়ার বাহারি বস্ত্র আর পাটজাত পণ্য তৈরির অন্যতম প্রধান কাঁচামাল ছিল এই সোনালি আঁশ। এদেশেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে পৃথিবীর সেরা পাটকল আদমজী। এর লভ্যাংশ দিয়ে গড়ে উঠেছিল লতিফ বাওয়ানী, করিম, ইউএমসি’র মতন আরও অনেক  বিখ্যাত জুটমিলস। কালক্রমে পাটের গুরুত্ব কমে যায়, জাতীয়করণ নীতি, শ্রমিক ফেডারেশন/ ইউনিয়নের অপ রাজনীতি, সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া, আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি,পাটের বিকল্প দ্রব্য সৃষ্টি হওয়া এসব নানাবিধ কারণে দেশের পাট এবং পাট-শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে।

একই কথা শোনা গেল সরকারের একজন মন্ত্রীর মুখ থেকেও। চামড়ার মূল্যহীনতা বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘এটা আমার কাজ নয়, আমার কাজ জবাইয়ের আগের। আমি প্রাণিসম্পদ’। তিনি আরও বলেছেন, ‘পৃথিবীতে চামড়ার বিকল্প সিনথেটিক জাতীয় দ্রব্যের চাহিদা বেশি থাকায় এর উপযুক্ত মূল্য পাওয়া যাচ্ছে না'। এতে দেখা গেল, পাটের সঙ্গে এর একটা অদ্ভুত ও চমৎকার মিল আছে। পাট শিল্পের মতো চামড়াও বিশ্ববাজারের আধুনিক  প্রতিযোগিতায় মার খেয়ে যাচ্ছে। অথচ এদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্য বলতে একসময় পাটের পরে চামড়ার নাম ছিল। বর্তমানে পোশাকশিল্পের কথা বাদ দিলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ শতকোটি ডলার আয় করতে পারতো। চামড়া বা লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজি বিষয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের ওপর অধিকতর জোর দেয়া হতো। বলা বাহুল্য, বর্তমান সরকার ঈদের আগে কোরবানির চামড়ার ফুট প্রতি একটা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল। এতে শহরে এবং গ্রামের সর্বনিম্ন দাম বলা হয়েছিল। কোনো কিছুই কাজ করেনি চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে। বিগত কয়েক বছর ধরে যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যে পতিত ছিল কোরবানির চামড়া এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। একটা ˆদনিক পত্রিকার সংবাদে প্রাপ্ত এমন তথ্য যে, ‘এক কাপ চায়ের দামে মিলেছে ছাগলের কাঁচা চামড়া। দেশের কিছু এলাকায় কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়ের কোনো ক্রেতাই পাওয়া যায় নি।  বিক্রি করতে না পেরে শত শত কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটেছে’।

৪.

চামড়ার মূল্য বিপর্যয়ের এমন দুর্বিষহ অবস্থার জন্যে দায়ী কে? সাধারণ মানুষ কাকে দায়ী করবে, তারা যাবে কোথায়? জানা যায়, এবারে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় তারল্য সংকটের কারণে। ট্যানারি কারখানাগুলোর সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা প্রতিবছর কোনো না কোনো অযুহাতকে সামনে নিয়ে এসে দাঁড়ায়। তারা বলছে, ব্যাংক থেকে তারা প্রয়োজনীয় টাকা ঋণ হিসেবে পায়নি। পূর্বের তুলনায় এক চতুর্থাংশ টাকাও ব্যাংক সরবরাহ করতে পারেনি। ফলে গ্রাম পর্যায়ে তারা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে অর্থ সরবরাহ করতে পারেনি। দেশের মানুষও চামড়ার যথোপযুক্ত দাম পায়নি। এখন বাজেট প্রনয়ণ ও ঘোষণার সময় সরকার বাজেট নিয়ে ত্রস্তব্যস্ত। বড় বাজেটই সব। কোরবানির আগেই চামড়া বাঁচানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি ছিল বলে সচেতন সমাজ মনে করে। এক্ষেত্রে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে যথেষ্ট পূর্বেই সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা করা হয়নি। ফলে সারা দেশে বিপুল সংখ্যক কাঁচা চামড়ার এমন অপচয় ও অবর্ণনীয় আর্থিক ক্ষতি হলো। এটা ব্যক্তিক নয় জাতীয় ক্ষতি। এর দায় সরকারকে নিতে হবে এবং দিন শেষে সবই সরকারের ক্ষতি। সাধারণ মানুষের নয়।

সরকার আসে সরকার যায়। মানুষ একবুক আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। এবার নতুন কিছু হবে, আমূল পরিবর্তন আসবে। জনপ্রশাসনে, নীতিতে, শাসণে, সুশাসনের সর্বত্র মঙ্গলছায়ায় জনসাধারণ সিক্ত হবে। এটা বেশি কিছু চাওয়া নয়, খুব স্বাভাবিক চাওয়া। মানুষ গতানুগতিক ধারা থেকে বের হতে চায়। এটাও মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। এদেশে অনেকদিন যাবৎ একই ধারার সমাজ বাস্তবতা, রাজনীতি, অর্থনীতি আর অপ-সংস্কৃতি চলমান আছে। মানুষ এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে বাইরের  জগতের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হতে চাইবে, এটা কোনো অভিনব বিষয় নয়।

৫.

দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়াকে বাঁচাতে হবে, জরুরি রপ্তানিতে কাজে লাগাতে হবে। চামড়াজাত পণ্য জুতা, ব্যাগ, বেল্ট ছাড়াও নানা প্রকার অভিজাত দ্রব্যাদি তৈরিতে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। ট্যানারি শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ঈদুল আজহার মৌসুমের পর্যাপ্ত কাঁচা চামড়ার সঠিক ব্যবহার করতে না পারা রাষ্ট্রীয় ও জাতীয়  ব্যর্থতার শামিল হবে। সিন্ডিকেট করে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর সাধারণ মানুষকে বঞ্চিত করা যায় না। এটা পাপের পর্যায়ে পড়ে। তাছাড়া কোরবানির চামড়ার মূল্যের প্রকৃত মালিক হল সমাজের গরিব, মিসকিন, অসহায় মানুষ। তারাই এর হকদার। এদেরকে ঠকানোর অর্থ ধর্মীয় বিধান ও অনুশাসনকে অমান্য করা। এ বিষয়ে দলমতের ঊর্ধে ওঠে সকলকে সোচ্চার হতে হবে, সচেতন হতে হবে। চোখের সামনেই পশুর চামড়াজাত পণ্যে সারা দুনিয়া চলছে। মানুষের হাতে হাতে এ-সব পণ্য। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়েও পৃথিবীর দেশে দেশে আভিজাত্যের প্রতীক মানে চামড়ার তৈরি ব্যবহার্য জিনিসপত্র। সেখানে এদেশে কাঁচা চামড়াকে অপ্রয়োজনীয় বস্তুতে পরিণত করে ভাগাড়ে ফেলে দেয়া কী স্বাভাবিক কোনো ঘটনা? কাজেই একটুও বিলম্ব না করে, সরকারকে এখনই ভাবতে হবে, কোরবানি থেকে পাওয়া কোটি কোটি কাঁচা চামড়ার ভবিষ্যৎ সদ্ব্যবহার কেমন করে  হবে?

[লেখক: গল্পকার]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত