সংবাদ

ঈদের চাঁদ রাতে পুড়লো স্বপ্ন


বাকী বিল্লাহ
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশ: ১ জুন ২০২৬, ০৬:০৭ পিএম

ঈদের চাঁদ রাতে পুড়লো স্বপ্ন

  • দূর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে মাদ্রাসা শিক্ষকের বাড়ি পুড়ে ছাই
  • দরজা আটকে ১১ সদস্যকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
  • এক কাপড়ে ঈদ কাটল পরিবারের
  • পরিবারের দাবি: পরিকল্পিত ভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদেরকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
  • থানার ওসি বলছেন ভিন্ন কথা: রান্নাঘর থেকে আগুন লাগার আশঙ্কা
  • বাদি বলছেন গত ২ বছর ধরে ওই রান্নাঘরে রান্না করা হচ্ছে না, সেটি পরিত্যক্ত রান্নাঘর
  • বিভাগীয় ডিআইজির ফোনে তদন্ত শুরু করলেন থানার ওসি

চারিদিকে তখন ঈদের আনন্দ। পরদিনই কোরবানির ঈদ। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বারগাঁও ইউনিয়নের নতুন বাড়ির বাতাসে তখন আনন্দের সুবাস পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস আর দুর্বৃত্তদের পৈশাচিকতায় সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত নরকে।

ঈদের আগের দিন, গত ২৭ মে দিবাগত গভীর রাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা টিনসেড বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় অজ্ঞাত পরিচয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে একটি পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু। নিঃস্ব হয়ে গেছে মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল হাই তার দুই ছেলে মনির আহমেদ এবং মইনুদ্দিনসহ পরিবারের ১১জন। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি তো হয়েছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে এই পরিবারের সদস্যদের মনে। যে ঈদ উৎসবের আলোয় রঙিন হওয়ার কথা ছিলো, সেই ঈদ তারা কাটিয়েছেন এক কাপড়ে, অন্যের দেওয়া আশ্রয়ে, তীব্র আতঙ্ক আর কান্নায়।

তাহাজ্জুদের আলো বনাম দুর্বৃত্তদের লেলিহান শিখা

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এখনো শিউরে উঠছেন পরিবারের সদস্যরা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন পরিবারের ১১ জন সদস্য। রাত তখন আনুমানিক তিনটা। চারিদিকে নিঝুম অন্ধকার। ওই বাড়ির বাসিন্দা, পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল হাই গভীর রাতে বিছানা ছাড়েন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য। ওযু করার জন্য প্রস্তুত হতেই তিনি লক্ষ্য করেন ঘরের ভেতর হু হু করে ঢুকছে কালো ধোঁয়া, নাকে আসছে পোড়া গন্ধ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, কোথাও আগুন লেগেছে।

আতঙ্কিত শিক্ষক চিৎকার করে পরিবারের অন্য সদস্যদের জাগিয়ে তোলেন। বৃদ্ধ বাবা, নারী শিশুসহ সবাই যখন প্রাণভয়ে প্রধান দুটি দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, তখনই আবিষ্কৃত হয় এক শিউরে ওঠার মতো সত্য। দুর্বৃত্তরা কেবল আগুনই দেয়নি, যাতে ভেতরের কেউ বেঁচে ফিরতে না পারে, সেজন্য বাহির থেকে ঘরের দুটি প্রধান দরজার ছিটকিনি শক্ত করে আটকে দিয়েছিলো। চারপাশ পাকা ওপরে টিন দেওয়া আট রুমের এই বিশাল ঘরের ভেতরে তখন আগুনের উত্তাপ বাড়ছে।

আব্দুল হাই জানান, মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন আল্লাহর অশেষ রহমতে ঘরের পেছনের একটি ছোট দরজা দিয়ে কোনোমতে একে একে বের হয়ে আসেন পরিবারের ১১ জন সদস্য। ঘর থেকে তারা একটি সুতোও বের করতে পারেননি। চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে তাদের প্রিয় বসতভিটা। পরিবারের সদস্যদের গগনবিদারী আর্তনাদে ছুটে আসেন আশপাশের প্রতিবেশীরা। তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে এবং ফায়ারে সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রান্নাঘর বসতঘরের সিংহভাগ।

পুড়ে গেছে বই-কিতাব, ধ্বংসস্তূপে এক কাপড়ের ঈদ

সোমবার ঘটনাস্থল থেকে পাঠানো ছবি ভিডিও ফুটেজে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা যেকোনো মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেবে। ঘরের চারপাশে পাকা দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও ওপরে টিনগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। পুড়ে গেছে ঘরের দরজা, জানালায় ধরেছে বড় বড় ফাটল। ঘরের ভেতর যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া আসবাবপত্রের কঙ্কাল। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিলো মাদ্রাসার শিক্ষকের প্রিয় বই ধর্মীয় কিতাবগুলোর পোড়া স্তূপ। জ্ঞানের আলো ছড়ানো যে বইগুলো শিক্ষকের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছিলো, সেগুলো আজ কয়লা। বাড়ির চারপাশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালাও আগুনের তীব্রতায় ঝলসে কালো হয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মো. মনির আহমদ সোমবার দুপুরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “২৭ মে ঈদের চাঁদ রাতে দুষ্কৃতকারীরা আমাদের পাক (রান্না) ঘর বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়েছে। দুর্বৃত্তরা বাহির থেকে ছিটকিনি আটকে দিয়েছিলো। পেছনের ছোট দরজা দিয়ে কোনোমতে বের হয়ে দেখি পুরো ঘরে আগুন ধরে গেছে। যার কারণে ঘর থেকে আমরা কিছুই বের করতে পারিনি। এক কাপড়ে জানটা নিয়ে বের হয়েছি। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে, এই ঈদে আমাদের কোনো আনন্দ ছিলো না, শুধু ছিলো কান্না।

রান্নাঘরের সূত্রপাত নাকি পরিকল্পিত নাশকতা!

ঘটনার পর থেকে এলাকায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে রান্নাঘরের আগুন বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিবার তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। রান্নাঘর থেকে আগুন লেগেছে কি না জানতে চাইলে মনির আহমদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “গত দুই বছর ধরে আমাদের ওই রান্না ঘরে কোনো রান্না হয় না। সে ঘরকে এখন শুধু লাকড়ির ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। দুইটা ঘরে একসঙ্গে আগুন দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। আমাদের জানামতে কোনো শত্রু নেই, তাই থানায় অভিযোগে কারও নাম উল্লেখ করিনি। কিন্তু রান্নাঘর থেকে রাত তিনটায় আগুন লাগবে কীভাবে? রান্নাঘর তো আরও দূরে। দুষ্কৃতকারীরা ঘরের বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে ঘরে আগুন দিয়েছে। আমাদের বাবা যদি নামাজ পড়তে না উঠতেন, তবে আজ আমরা ১১ জনই ঘরের ভেতর পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।

ঊর্ধ্বতন পুলিশের হস্তক্ষেপে নড়েচড়ে বসলো প্রশাসন

ঘটনার পর ঈদের দিন কেটে গেলেও স্থানীয় সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঈদের পর শনিবার জসিম নামের একজন দারোগা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। স্থানীয় চেয়ারম্যান ইউপি সদস্যদের জানিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে পরিবারের কিছুটা বিলম্ব হয়।

পরবর্তীতে এই লোমহর্ষক ঘটনার তথ্য পুড়ে যাওয়া বাড়ির ছবি-ভিডিও চট্টগ্রাম বিভাগের পুলিশের ডিআইজি অতিরিক্ত ডিআইজিকে জানানো হলে টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। ডিআইজির পক্ষ থেকে সরাসরি সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই নড়েচড়ে বসে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ।

গতকাল সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী থানার ওসি কবির হোসেন নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ওসি কবির হোসেন বলেন, “আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আগুন লাগার বিষয় নিয়ে আমরা গভীরভাবে তদন্ত করছি। পরিবারের দাবি দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়েছে, তবে রান্নাঘর থেকে আগুন লেগেছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাদীর অভিযোগপত্রটি মামলা হিসেবে নেওয়া হবে এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মনির আহমদকে থানায় এসে কথা বলার জন্য আশ্বস্ত করেছেন।

তদন্তে নামছে পিবিআই, রাসায়নিক পরীক্ষার সম্ভাবনা

বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রধান কার্যালয়ের মিডিয়া শাখা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এটি কি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নাকি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা নাশকতা, তা সুক্ষ্ম তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘটনাস্থল থেকে পোড়া আলামত জব্দ করে রাসায়নিক পরীক্ষা (Chemical Test) করা হলে কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ বা পেট্রোল ব্যবহার করা হয়েছিলো কি না, তা সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং বের হয়ে আসবে আসল ক্লু।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০১ জুন ২০২৬


ঈদের চাঁদ রাতে পুড়লো স্বপ্ন

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

  • দূর্বৃত্তদের দেওয়া আগুনে মাদ্রাসা শিক্ষকের বাড়ি পুড়ে ছাই
  • দরজা আটকে ১১ সদস্যকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
  • এক কাপড়ে ঈদ কাটল পরিবারের
  • পরিবারের দাবি: পরিকল্পিত ভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় তাদেরকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা
  • থানার ওসি বলছেন ভিন্ন কথা: রান্নাঘর থেকে আগুন লাগার আশঙ্কা
  • বাদি বলছেন গত ২ বছর ধরে ওই রান্নাঘরে রান্না করা হচ্ছে না, সেটি পরিত্যক্ত রান্নাঘর
  • বিভাগীয় ডিআইজির ফোনে তদন্ত শুরু করলেন থানার ওসি

চারিদিকে তখন ঈদের আনন্দ। পরদিনই কোরবানির ঈদ। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বারগাঁও ইউনিয়নের নতুন বাড়ির বাতাসে তখন আনন্দের সুবাস পাওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস আর দুর্বৃত্তদের পৈশাচিকতায় সেই আনন্দ রূপ নিয়েছে এক জীবন্ত নরকে।

ঈদের আগের দিন, গত ২৭ মে দিবাগত গভীর রাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা টিনসেড বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় অজ্ঞাত পরিচয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে একটি পরিবারের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু। নিঃস্ব হয়ে গেছে মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল হাই তার দুই ছেলে মনির আহমেদ এবং মইনুদ্দিনসহ পরিবারের ১১জন। আগুনে ঘরের আসবাবপত্র, নগদ টাকা, স্বর্ণালঙ্কারসহ প্রায় ২৫ লাখ টাকার ক্ষতি তো হয়েছেই, কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে এই পরিবারের সদস্যদের মনে। যে ঈদ উৎসবের আলোয় রঙিন হওয়ার কথা ছিলো, সেই ঈদ তারা কাটিয়েছেন এক কাপড়ে, অন্যের দেওয়া আশ্রয়ে, তীব্র আতঙ্ক আর কান্নায়।

তাহাজ্জুদের আলো বনাম দুর্বৃত্তদের লেলিহান শিখা

ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে এখনো শিউরে উঠছেন পরিবারের সদস্যরা। প্রতিদিনের মতো সেদিনও রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন পরিবারের ১১ জন সদস্য। রাত তখন আনুমানিক তিনটা। চারিদিকে নিঝুম অন্ধকার। ওই বাড়ির বাসিন্দা, পেশায় মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল হাই গভীর রাতে বিছানা ছাড়েন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য। ওযু করার জন্য প্রস্তুত হতেই তিনি লক্ষ্য করেন ঘরের ভেতর হু হু করে ঢুকছে কালো ধোঁয়া, নাকে আসছে পোড়া গন্ধ। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, কোথাও আগুন লেগেছে।

আতঙ্কিত শিক্ষক চিৎকার করে পরিবারের অন্য সদস্যদের জাগিয়ে তোলেন। বৃদ্ধ বাবা, নারী শিশুসহ সবাই যখন প্রাণভয়ে প্রধান দুটি দরজা দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, তখনই আবিষ্কৃত হয় এক শিউরে ওঠার মতো সত্য। দুর্বৃত্তরা কেবল আগুনই দেয়নি, যাতে ভেতরের কেউ বেঁচে ফিরতে না পারে, সেজন্য বাহির থেকে ঘরের দুটি প্রধান দরজার ছিটকিনি শক্ত করে আটকে দিয়েছিলো। চারপাশ পাকা ওপরে টিন দেওয়া আট রুমের এই বিশাল ঘরের ভেতরে তখন আগুনের উত্তাপ বাড়ছে।

আব্দুল হাই জানান, মৃত্যু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন আল্লাহর অশেষ রহমতে ঘরের পেছনের একটি ছোট দরজা দিয়ে কোনোমতে একে একে বের হয়ে আসেন পরিবারের ১১ জন সদস্য। ঘর থেকে তারা একটি সুতোও বের করতে পারেননি। চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে তাদের প্রিয় বসতভিটা। পরিবারের সদস্যদের গগনবিদারী আর্তনাদে ছুটে আসেন আশপাশের প্রতিবেশীরা। তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরে এবং ফায়ারে সার্ভিসে খবর দেন। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোর আগেই স্থানীয়দের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে যায় রান্নাঘর বসতঘরের সিংহভাগ।

পুড়ে গেছে বই-কিতাব, ধ্বংসস্তূপে এক কাপড়ের ঈদ

সোমবার ঘটনাস্থল থেকে পাঠানো ছবি ভিডিও ফুটেজে যে দৃশ্য দেখা গেছে, তা যেকোনো মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেবে। ঘরের চারপাশে পাকা দেয়ালগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও ওপরে টিনগুলো দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। পুড়ে গেছে ঘরের দরজা, জানালায় ধরেছে বড় বড় ফাটল। ঘরের ভেতর যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুড়ে যাওয়া আসবাবপত্রের কঙ্কাল। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিলো মাদ্রাসার শিক্ষকের প্রিয় বই ধর্মীয় কিতাবগুলোর পোড়া স্তূপ। জ্ঞানের আলো ছড়ানো যে বইগুলো শিক্ষকের প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছিলো, সেগুলো আজ কয়লা। বাড়ির চারপাশের বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালাও আগুনের তীব্রতায় ঝলসে কালো হয়ে গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য মো. মনির আহমদ সোমবার দুপুরে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, “২৭ মে ঈদের চাঁদ রাতে দুষ্কৃতকারীরা আমাদের পাক (রান্না) ঘর বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে আগুন দিয়েছে। দুর্বৃত্তরা বাহির থেকে ছিটকিনি আটকে দিয়েছিলো। পেছনের ছোট দরজা দিয়ে কোনোমতে বের হয়ে দেখি পুরো ঘরে আগুন ধরে গেছে। যার কারণে ঘর থেকে আমরা কিছুই বের করতে পারিনি। এক কাপড়ে জানটা নিয়ে বের হয়েছি। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে, এই ঈদে আমাদের কোনো আনন্দ ছিলো না, শুধু ছিলো কান্না।

রান্নাঘরের সূত্রপাত নাকি পরিকল্পিত নাশকতা!

ঘটনার পর থেকে এলাকায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে। স্থানীয় পুলিশ প্রাথমিকভাবে এটিকে রান্নাঘরের আগুন বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও পরিবার তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। রান্নাঘর থেকে আগুন লেগেছে কি না জানতে চাইলে মনির আহমদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “গত দুই বছর ধরে আমাদের ওই রান্না ঘরে কোনো রান্না হয় না। সে ঘরকে এখন শুধু লাকড়ির ঘর হিসেবে ব্যবহার করা হতো। দুইটা ঘরে একসঙ্গে আগুন দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। আমাদের জানামতে কোনো শত্রু নেই, তাই থানায় অভিযোগে কারও নাম উল্লেখ করিনি। কিন্তু রান্নাঘর থেকে রাত তিনটায় আগুন লাগবে কীভাবে? রান্নাঘর তো আরও দূরে। দুষ্কৃতকারীরা ঘরের বাহির থেকে দরজা লাগিয়ে ঘরে আগুন দিয়েছে। আমাদের বাবা যদি নামাজ পড়তে না উঠতেন, তবে আজ আমরা ১১ জনই ঘরের ভেতর পুড়ে কয়লা হয়ে যেতাম।

ঊর্ধ্বতন পুলিশের হস্তক্ষেপে নড়েচড়ে বসলো প্রশাসন

ঘটনার পর ঈদের দিন কেটে গেলেও স্থানীয় সোনাইমুড়ী থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঈদের পর শনিবার জসিম নামের একজন দারোগা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও পরবর্তীতে পুলিশের পক্ষ থেকে আর কোনো খোঁজখবর নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। স্থানীয় চেয়ারম্যান ইউপি সদস্যদের জানিয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে পরিবারের কিছুটা বিলম্ব হয়।

পরবর্তীতে এই লোমহর্ষক ঘটনার তথ্য পুড়ে যাওয়া বাড়ির ছবি-ভিডিও চট্টগ্রাম বিভাগের পুলিশের ডিআইজি অতিরিক্ত ডিআইজিকে জানানো হলে টনক নড়ে স্থানীয় প্রশাসনের। ডিআইজির পক্ষ থেকে সরাসরি সোনাইমুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপরই নড়েচড়ে বসে সোনাইমুড়ী থানা পুলিশ।

গতকাল সন্ধ্যায় সোনাইমুড়ী থানার ওসি কবির হোসেন নিজেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলেন। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে ওসি কবির হোসেন বলেন, “আমি নিজে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। আগুন লাগার বিষয় নিয়ে আমরা গভীরভাবে তদন্ত করছি। পরিবারের দাবি দুর্বৃত্তরা আগুন লাগিয়েছে, তবে রান্নাঘর থেকে আগুন লেগেছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাদীর অভিযোগপত্রটি মামলা হিসেবে নেওয়া হবে এবং যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।তিনি ক্ষতিগ্রস্ত মনির আহমদকে থানায় এসে কথা বলার জন্য আশ্বস্ত করেছেন।

তদন্তে নামছে পিবিআই, রাসায়নিক পরীক্ষার সম্ভাবনা

বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) প্রধান কার্যালয়ের মিডিয়া শাখা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এটি কি সাধারণ কোনো অগ্নিকাণ্ড নাকি কোনো গভীর ষড়যন্ত্র বা নাশকতা, তা সুক্ষ্ম তদন্তে বেরিয়ে আসবে। তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, ঘটনাস্থল থেকে পোড়া আলামত জব্দ করে রাসায়নিক পরীক্ষা (Chemical Test) করা হলে কোনো ধরনের দাহ্য পদার্থ বা পেট্রোল ব্যবহার করা হয়েছিলো কি না, তা সহজেই নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং বের হয়ে আসবে আসল ক্লু।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত