কালীপূজা: শক্তির আরাধনা
কালীপূজা সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। দুর্গাপূজা যেমন দুর্গোৎসব হিসেবে উদ্যাপিত হয়, কালীপূজা তেমনভাবে উৎসব নয়। তবে কালীপূজার সঙ্গে উৎসবের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। সেটি দীপাবলির উৎসব। বাঙালির কাছে যা দীপান্বিতা নামে পরিচিত। দীপান্বিতা অমাবস্যার গভীর রাতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ রাতে হিন্দুদের ঘরে ঘরে জ্বলে ওঠে অসংখ্য প্রদীপ। আলোর বন্যায় আলোকিত হয়ে ওঠে চারদিক। প্রদীপের শিখা যেন প্রাণের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। সেই প্রাণ অন্ধকার থেকে আলোয় যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। এ কারণে এ রাত দীপাবলি, দীপাবলী বা দীপান্বিতার রাত হিসেবে পরিচিত।কালীপূজা মূলত শক্তির আরাধনা। এটি তান্ত্রিক ধারার অন্যতম প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। শক্তিসাধক ও তন্ত্রানুসারীরা বিশ্বাস করেন, সৃষ্টির মূলে রয়েছেন আদ্যাশক্তি মহামায়া। নির্গুণ পরমব্রহ্ম যখন সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠেন, তখন তাঁর মধ্যে গুণের প্রকাশ ঘটে। এই গুণই মহাশক্তি। সৃষ্টির শুরু আছে, শেষও আছে। সৃষ্টির শেষ হচ্ছে ধ্বংস, আর মাঝখানে রয়েছে স্থিতিকাল। মহাশক্তি এই সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের অধিশ্বরী। তিনি মহাকালী, মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী নামেও পূজিতা।আদিকাল থেকেই সনাতন হিন্দুধর্মাবলম্বীদের আধ্যাত্মিক চেতনার দুটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে বেদ ও তন্ত্র স্বীকৃত। বৈদিক ধারায় যাগযজ্ঞের পাশাপাশি যোগসাধনার বিকাশ ঘটে। এর মূলসূত্র ‘সো-অহং’। অর্থাৎ, স্রষ্টাকে পরম সত্য হিসেবে উপলব্ধি করে ‘আমি কে’—তা জানার চেষ্টাই যোগসাধনা। অন্যদিকে, তন্ত্রসাধনার মূলসূত্র ‘অহং-স’। এখানে ‘আমি’কে উপলব্ধির মধ্য দিয়ে ‘তিনি’ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের চেষ্টা করা হয়। বৈদিক ধারার নির্যাস শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা এবং তান্ত্রিক ধারার অন্যতম নির্যাস শ্রীশ্রীচণ্ডী। চণ্ডীতে বিভিন্ন কাহিনির মধ্য দিয়ে আদ্যাশক্তির পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে।মহাশক্তিকে কালীরূপে আরাধনার বিষয়ে বিভিন্ন কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। একটি কাহিনি অনুসারে, হিমালয়দুহিতা পার্বতী জন্মসূত্রে কৃষ্ণবর্ণা ছিলেন। শিব একবার তাঁকে ‘কালী’ বলে বিদ্রূপ করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পার্বতী দীর্ঘদিন সাধনা করে গৌরবর্ণ লাভ করেন। পরে তিনি গৌরী নামে পরিচিত হন।শাস্ত্রমতে, দুর্গার দশমহাবিদ্যার মধ্যে কালী অন্যতম প্রধান রূপ। বিবসনা, নৃমুণ্ডমালিনী কালী ভীষণ সৌন্দর্যের প্রতীক। তিনি একদিকে ভক্তকে বর ও অভয় দান করেন, অন্যদিকে অসুর নিধনের মধ্য দিয়ে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করেন। এই মাতৃকাশক্তির আরাধনার মধ্য দিয়ে সাধক নিজেও শক্তিমান হয়ে ওঠেন। তাঁর শুভশক্তি নিয়োজিত হয় জগতের কল্যাণে।সৃষ্টির আদি কারণ হিসেবে মাতৃকাশক্তিকে গ্রহণ করা আধ্যাত্মিক ভাবনার এক অনন্য দিক। মা ও সন্তানের নৈকট্য সৃষ্টির সবচেয়ে নিবিড় বন্ধন। স্রষ্টা ও সৃষ্টির এই বন্ধনের অনুভূতি মানুষের মনে যথার্থভাবে জাগ্রত হলে অন্যায় পথে পা বাড়ানোর সুযোগ থাকে না।শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব আধ্যাত্মিক সাধনার বিভিন্ন পথের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি মূলত কালীসাধক ছিলেন। বহুবার তিনি নিজেকে ‘ন্যাংটা মায়ের ন্যাংটা ছেলে’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। এই উক্তির মধ্য দিয়ে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, তাঁর পাওয়ার কিছু নেই, হারানোরও কিছু নেই।প্রতিবছর দুর্গাপূজার পর আসে কালীপূজা। বিজয়া দশমীর পরবর্তী পূর্ণিমা তিথিতে হয় লক্ষ্মীপূজা। লক্ষ্মীপূর্ণিমার পরের অমাবস্যা কালীপূজার তিথি হিসেবে নির্ধারিত। দুর্গাপূজা মূলত বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সেই তুলনায় কালীপূজার প্রচলন অনেক ব্যাপক। অঞ্চলভেদে কালীপূজার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা লোকজ উপাদান।গ্রামবাংলায় কালীপূজার আগে পক্ষকালব্যাপী আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। লম্বা বাঁশের মাথায় একটি প্রদীপ বা লণ্ঠন লাগিয়ে উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ সময় আমাদের দেশে পোকার উপদ্রব বাড়ে। মনে হতে পারে, পোকামাকড় ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই আকাশপ্রদীপ জ্বালানোর প্রচলন হয়েছে। তবে এর সঙ্গে ধর্মীয় ও লোকজ বিশ্বাসও জড়িয়ে রয়েছে।কালী তান্ত্রিক ধারার প্রধান আরাধ্যা দেবী। সাধক অজ্ঞানের অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের আলো লাভের জন্য ব্যাকুল থাকেন। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার প্রতীক হিসেবেই কালীপূজার নির্ধারিত সময় অমাবস্যার গভীর অন্ধকার রাত। একই কারণে কালীর গাত্রবর্ণও কালো। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছেন—“সকল জ্ঞানের অতীত যে মা তাইতো কালো আমার শ্যামা,জ্ঞানরূপী শিব চরণে তাঁর লুটিয়ে পড়ে রয়,আমার নাই আঁধারের ভয়।”কালীর পদে লুটিয়ে থেকে যিনি জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছেন, তাঁর অবস্থান সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে।লেখক: সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ।