সমতল ভূমির আদিবাসীদের রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকার হারানোর বেদনা এবং নীরবে দেশত্যাগের করুণ অধ্যায়। গত কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর একটি হলো গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি আন্দোলন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন কেবল ভূমির অধিকার আদায়ের লড়াই নয়; এটি প্রান্তিক আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতালদের টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অসহায়ত্বের এক করুণ দলিল। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পেরিয়ে গেছে ১০ বছর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো বাগদা ফার্মের সাঁওতালসহ আদিবাসীদের জীবনে স্বস্তি বা স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাদের পৈতৃক জমি উদ্ধার তো দূরের কথা, নিত্যনতুন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে তারা দিন কাটাচ্ছেন উচ্ছেদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়।
বাগদা ফার্মের সংকটের সূত্রপাত ১৯৬২ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের জন্য আখ চাষের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সাঁওতালসহ আদিবাসী ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, কখনো ওই জমিতে আখ চাষ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে জমি মূল মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ২০০৪ সালে লোকসানের মুখে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্ত না মেনে আখ চাষের পরিবর্তে অন্যান্য ফসল চাষ এবং প্রভাবশালীদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া শুরু করে। আদিবাসীরা দেখলেন, তাদের পৈতৃক জমিতে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না। ফলে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও তিন ফসলি জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে তারা গড়ে তোলেন ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, এই ন্যায্য দাবিই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কাছে ৬ নভেম্বর ন্যায়বিচার না পাওয়ার এক কালো অধ্যায়। দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো তারা শিউরে ওঠেন। সেদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ, চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় একদল প্রভাবশালী সশস্ত্র ব্যক্তির যৌথ হামলায় সাঁওতাল পল্লী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল। হামলা শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সাঁওতালদের সহায়-সম্পদ, রিকশা-ভ্যান, মাটির ঘর ও বসতবাড়িতে একযোগে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিওচিত্র পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। শত শত সাঁওতাল পরিবার সবকিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা পাননি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা সাঁওতালদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনে চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) মাধ্যমে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ইপিজেড নির্মিত হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাঁওতাল পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত চাষের জমি হারাবে। আবারও আদিবাসীরা নিজ দেশে গৃহহীন ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠকগুলোতে মূল অংশীজন তথা ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। আদিবাসীদের বাদ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে, তাদের মতামত ও জীবনযাত্রার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারায় আদিবাসীদের দীর্ঘশ্বাস ও কান্নার কোনো প্রতিফলন নেই।
২০২৬ সালের বাস্তবতায় বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের অসহায়ত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কোন্দল ও বিভেদ। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ক্লান্তি, প্রশাসনের চাপ এবং সুযোগসন্ধানী মহলের সূক্ষ্ম উসকানিতে ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির মধ্যে ভাঙন ধরেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদা ফার্মের নিয়ন্ত্রণ ও আন্দোলনের পথ নিয়ে সাঁওতালদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী সমাজের মধ্যে যখন অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা জায়গা করে নেয় এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মূল দাবিগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ তাদের অসহায়ত্বকে আরও প্রকট করেছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার হতাশা থেকেই মূলত এই পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।
বর্তমানে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া এলাকার সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে। কৃষিই যাদের একমাত্র জীবিকা, সেই তিন ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তারা কোথায় যাবে, কীভাবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবে—তার কোনো সদুত্তর রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নেই। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার আইনিভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী। সাঁওতালদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অস্তিত্বের ভিত্তি। ভূমি হারালে তাদের সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য, জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের আশ্রয় লাভের নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৩ক অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
বাগদা ফার্মের এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট ও আদিবাসীদের অসহায়ত্ব দূর করতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৬২ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী, চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমির মালিকানা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করে প্রকৃত সাঁওতাল ও আদিবাসী মালিকদের উত্তরাধিকারীদের কাছে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যাবে না। তিন ফসলি জমিতে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, ২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ হত্যার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের আন্দোলন কেবল এক টুকরো জমির মালিকানার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের আদিবাসীদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতীক। রক্তের দাগ মাখা এই তিন ফসলি জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হলে তা দেশের মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হবে। রাষ্ট্রকে শক্তি প্রদর্শনের পথ পরিহার করে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের দিকে তাকাতে হবে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়ে তাদের পৈতৃক ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে রাষ্ট্রের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক ও মানবিক দায়িত্ব।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ নভেম্বর ২০২৬
সমতল ভূমির আদিবাসীদের রয়েছে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অধিকার হারানোর বেদনা এবং নীরবে দেশত্যাগের করুণ অধ্যায়। গত কয়েক দশকে সবচেয়ে আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনাগুলোর একটি হলো গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের জমি আন্দোলন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলন কেবল ভূমির অধিকার আদায়ের লড়াই নয়; এটি প্রান্তিক আদিবাসী, বিশেষ করে সাঁওতালদের টিকে থাকার সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ের লড়াই এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অসহায়ত্বের এক করুণ দলিল। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বরের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পেরিয়ে গেছে ১০ বছর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনো বাগদা ফার্মের সাঁওতালসহ আদিবাসীদের জীবনে স্বস্তি বা স্থায়ী সমাধান আসেনি। তাদের পৈতৃক জমি উদ্ধার তো দূরের কথা, নিত্যনতুন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে তারা দিন কাটাচ্ছেন উচ্ছেদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায়।
বাগদা ফার্মের সংকটের সূত্রপাত ১৯৬২ সালে। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মহিমাগঞ্জ চিনিকলের জন্য আখ চাষের উদ্দেশ্যে স্থানীয় সাঁওতালসহ আদিবাসী ও বাঙালিদের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৪২ দশমিক ৩০ একর কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল, কখনো ওই জমিতে আখ চাষ বন্ধ হয়ে গেলে কিংবা চিনিকল বন্ধ হয়ে গেলে জমি মূল মালিক বা তাদের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। ২০০৪ সালে লোকসানের মুখে চিনিকলটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কর্তৃপক্ষ চুক্তির শর্ত না মেনে আখ চাষের পরিবর্তে অন্যান্য ফসল চাষ এবং প্রভাবশালীদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া শুরু করে। আদিবাসীরা দেখলেন, তাদের পৈতৃক জমিতে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না। ফলে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ও তিন ফসলি জমি ফেরত পাওয়ার দাবিতে তারা গড়ে তোলেন ‘সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’। পরিস্থিতি দেখে মনে হয়, এই ন্যায্য দাবিই যেন তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কাছে ৬ নভেম্বর ন্যায়বিচার না পাওয়ার এক কালো অধ্যায়। দিনটির কথা মনে পড়লে এখনো তারা শিউরে ওঠেন। সেদিন আখ কাটাকে কেন্দ্র করে পুলিশ, চিনিকল কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয় একদল প্রভাবশালী সশস্ত্র ব্যক্তির যৌথ হামলায় সাঁওতাল পল্লী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন শ্যামল হেমব্রম, মঙ্গল মার্ডি ও রমেশ টুডু নামের তিন সাঁওতাল। হামলা শুধু হত্যাকাণ্ডেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সাঁওতালদের সহায়-সম্পদ, রিকশা-ভ্যান, মাটির ঘর ও বসতবাড়িতে একযোগে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার ভিডিওচিত্র পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিবেককে নাড়া দেয়। শত শত সাঁওতাল পরিবার সবকিছু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত আদিবাসীরা পাননি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্থবিরতা সাঁওতালদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সামনে চরম অসহায়ত্বের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের রক্তভেজা তিন ফসলি জমিতে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) মাধ্যমে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনের সরকারি সিদ্ধান্ত নতুন সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ইপিজেড নির্মিত হলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ সাঁওতাল পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত চাষের জমি হারাবে। আবারও আদিবাসীরা নিজ দেশে গৃহহীন ও উদ্বাস্তুতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্রকল্প নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় প্রশাসনের বৈঠকগুলোতে মূল অংশীজন তথা ক্ষতিগ্রস্ত সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে না। আদিবাসীদের বাদ দেওয়ার এই প্রবণতা প্রমাণ করে, তাদের মতামত ও জীবনযাত্রার চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারায় আদিবাসীদের দীর্ঘশ্বাস ও কান্নার কোনো প্রতিফলন নেই।
২০২৬ সালের বাস্তবতায় বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের অসহায়ত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কোন্দল ও বিভেদ। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের ক্লান্তি, প্রশাসনের চাপ এবং সুযোগসন্ধানী মহলের সূক্ষ্ম উসকানিতে ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির মধ্যে ভাঙন ধরেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসেও বাগদা ফার্মের নিয়ন্ত্রণ ও আন্দোলনের পথ নিয়ে সাঁওতালদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একসময়ের ঐক্যবদ্ধ আদিবাসী সমাজের মধ্যে যখন অবিশ্বাস, সন্দেহ ও অর্থনৈতিক অস্বচ্ছতা জায়গা করে নেয় এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে, তখন তাদের মূল দাবিগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদ তাদের অসহায়ত্বকে আরও প্রকট করেছে। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও ন্যায্য অধিকার না পাওয়ার হতাশা থেকেই মূলত এই পরিস্থিতির জন্ম হয়েছে।
বর্তমানে মাদারপুর ও জয়পুরপাড়া এলাকার সাঁওতাল পরিবারগুলো চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদ হওয়ার ভয় তাদের তাড়া করে ফিরছে। কৃষিই যাদের একমাত্র জীবিকা, সেই তিন ফসলি জমি থেকে উচ্ছেদ করা হলে তারা কোথায় যাবে, কীভাবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবে—তার কোনো সদুত্তর রাষ্ট্র বা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নেই। আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার আইনিভাবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় তারা আজ নিজ ভূমিতেই পরবাসী। সাঁওতালদের মতো প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ভূমি শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এটি তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও অস্তিত্বের ভিত্তি। ভূমি হারালে তাদের সামাজিক কাঠামো, ঐতিহ্য, জীবিকা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎও হুমকির মুখে পড়ে। বাংলাদেশের সংবিধান সব নাগরিকের সমান অধিকার ও আইনের আশ্রয় লাভের নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ২৩ক অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশের কথা বলা হয়েছে। এসব সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
বাগদা ফার্মের এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট ও আদিবাসীদের অসহায়ত্ব দূর করতে রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। ১৯৬২ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী, চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জমির মালিকানা ও অধিকারসংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তি করে প্রকৃত সাঁওতাল ও আদিবাসী মালিকদের উত্তরাধিকারীদের কাছে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আদিবাসীদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া যাবে না। তিন ফসলি জমিতে সাঁওতালদের উচ্ছেদ করে জোরপূর্বক ইপিজেড নির্মাণের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী প্রতিনিধিদের সরাসরি অংশগ্রহণ ও তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, ২০১৬ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শ্যামল, মঙ্গল ও রমেশ হত্যার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর উপযুক্ত পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের আন্দোলন কেবল এক টুকরো জমির মালিকানার লড়াই নয়; এটি বাংলাদেশের আদিবাসীদের মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতীক। রক্তের দাগ মাখা এই তিন ফসলি জমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ করা হলে তা দেশের মানবাধিকার ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হবে। রাষ্ট্রকে শক্তি প্রদর্শনের পথ পরিহার করে সহমর্মিতা ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে বাগদা ফার্মের সাঁওতালদের দিকে তাকাতে হবে। আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়ে তাদের পৈতৃক ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়াই হবে রাষ্ট্রের অন্যতম বড় গণতান্ত্রিক ও মানবিক দায়িত্ব।
(লেখকের নিজস্ব মত)
[লেখক: কলামিস্ট]

আপনার মতামত লিখুন