‘করব সমবায়, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ৭ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস। একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ বা ব্যক্তির একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব। সমবায়ের মূল দর্শনই হলো এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’—এই চেতনা ধারণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন সমাজ।
মানুষের সভ্যতার বিকাশে সমবায়ের ভূমিকা বহু পুরোনো। প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ একসময় সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমবায় সেই যৌথ প্রচেষ্টারই একটি পরীক্ষিত রূপ। বিশেষ করে বিত্তহীন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সমবায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র শিল্প, আবাসন, সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমবায় সমিতি কাজ করছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংগ্রহ, উৎপাদন ও পণ্য বিপণনের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষক সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ও বিপণন করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সহজ হবে। একইভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বিতা অর্জনেও সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সমবায় অর্থনীতির সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন, বিপণন ও পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক সমবায় জোটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সমবায় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে সমবায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে যুবসমাজকে যুক্ত করা জরুরি। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা গেলে তারা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে। এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দাদন ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
তবে সমবায় আন্দোলনের বড় বাধা হলো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে সমবায়ের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোথাও সদস্যদের সঞ্চয় আত্মসাৎ করা হচ্ছে, কোথাও আবার কার্যক্রম চলছে নামমাত্র। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা ও তদারকি জোরদার করতে হবে। সদস্যদের অংশগ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের প্রকৃত সুফল পেতে হলে এর পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমবায়কে কেবল আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন যুগোপযোগী নীতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সমবায় হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। এ জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমবায়ের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক সংহতি তত বাড়বে।
[লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম]

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ নভেম্বর ২০২৬
‘করব সমবায়, গড়ব দেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ৭ নভেম্বর পালিত হচ্ছে ৫৫তম জাতীয় সমবায় দিবস। একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে হলে শুধু সরকারের উদ্যোগ বা ব্যক্তির একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব। সমবায়ের মূল দর্শনই হলো এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা। ‘দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’—এই চেতনা ধারণ করেই গড়ে উঠতে পারে একটি স্বনির্ভর ও বৈষম্যহীন সমাজ।
মানুষের সভ্যতার বিকাশে সমবায়ের ভূমিকা বহু পুরোনো। প্রকৃতির প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও জীবনধারণের প্রয়োজনে মানুষ একসময় সংঘবদ্ধ হতে শিখেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, একক প্রচেষ্টার চেয়ে সম্মিলিত উদ্যোগে সাফল্যের সম্ভাবনা বেশি। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সমবায় সেই যৌথ প্রচেষ্টারই একটি পরীক্ষিত রূপ। বিশেষ করে বিত্তহীন ও স্বল্পবিত্ত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক উন্নয়নে সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও সমবায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র শিল্প, আবাসন, সঞ্চয় ও ঋণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমবায় সমিতি কাজ করছে। এর মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি সংগ্রহ, উৎপাদন ও পণ্য বিপণনের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষক সম্মিলিতভাবে উৎপাদন ও বিপণন করতে পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও সহজ হবে। একইভাবে নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাবলম্বিতা অর্জনেও সমবায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে সমবায় অর্থনীতির সফল দৃষ্টান্ত রয়েছে। জার্মানি, ডেনমার্ক, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন, বিপণন ও পণ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আন্তর্জাতিক সমবায় জোটের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ সমবায় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। এসব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে সমবায় একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে সমবায় আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে যুবসমাজকে যুক্ত করা জরুরি। দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণকে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ করা গেলে তারা সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারবে। এ জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ক্ষুদ্র শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে পণ্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে দাদন ও উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
তবে সমবায় আন্দোলনের বড় বাধা হলো অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা। অনেক ক্ষেত্রে সমবায়ের নামে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো সদস্যদের স্বার্থ রক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগত লাভের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোথাও সদস্যদের সঞ্চয় আত্মসাৎ করা হচ্ছে, কোথাও আবার কার্যক্রম চলছে নামমাত্র। এসব অনিয়ম বন্ধ করতে সমবায় সমিতির নিবন্ধন, নিরীক্ষা ও তদারকি জোরদার করতে হবে। সদস্যদের অংশগ্রহণ, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের প্রকৃত সুফল পেতে হলে এর পরিচালনায় গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৯২টি সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঞ্চয়, বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বিপণন কার্যক্রম জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমবায়কে কেবল আনুষ্ঠানিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন যুগোপযোগী নীতি, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা।
দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমিয়ে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সমবায় হতে পারে কার্যকর হাতিয়ার। এ জন্য রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তিপর্যায়ে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। একক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সম্মিলিত কল্যাণকে গুরুত্ব দিতে হবে। সমবায়ের চর্চা যত বিস্তৃত হবে, মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামাজিক সংহতি তত বাড়বে।
[লেখক: শিক্ষক, কধুরখীল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম]

আপনার মতামত লিখুন