বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”
এই একটি বাক্যেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জনগণের আত্মপরিচয়ের মূল কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি আজ সেই ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করছে?
গত ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কেবল একটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগও ছিল। যে চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা?
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ-এসব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। আর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি অধ্যায়কে আড়াল করে বা কোনো ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না।
এখানেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন। দলটি নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁরই সন্তান। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দলটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রশ্ন উঠছে-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ইতিহাসের মূল্যায়নসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? জাতীয় চার নেতার স্মরণে একটি প্রদর্শনী নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা লড়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জীবন দিয়েছেন-তাঁদের অবদান বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত গবেষণা, তথ্য-প্রমাণ ও মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে- কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে, কোনো স্মরণানুষ্ঠান সংকুচিত করে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে নয়।
বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের মনোনীত ইতিহাস চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস। কারণ ইতিহাসের মালিক কোনো সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়-ইতিহাসের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের জনগণ।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ নভেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশের সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা, বাংলাদেশের জনগণ, ১৯৭১ খ্রীষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করিয়াছি।”
এই একটি বাক্যেই বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাস, রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং জনগণের আত্মপরিচয়ের মূল কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র কি আজ সেই ইতিহাসকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করছে?
গত ৩ নভেম্বর জাতীয় চার নেতাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পূর্বনির্ধারিত একটি বিশেষ প্রদর্শনী উদ্বোধনের আগমুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি ৩ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত চলার কথা ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুরোধে প্রদর্শনীটি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এটি কেবল একটি প্রদর্শনীর আয়োজন ছিল না, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাতীয় চার নেতার অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি উদ্যোগও ছিল। যে চার নেতা-সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান-১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়েছিলেন, তাঁদের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ভূমিকা স্মরণ করা কি রাষ্ট্রের জন্য কোনো অস্বস্তির বিষয় হওয়ার কথা?
ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বিবেচনা করলে বিষয়গুলো আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ গ্রহণ-এসব আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গৃহীত হয় বাংলাদেশের সংবিধান। আর ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারের অভ্যন্তরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। ঘটনাগুলো ভিন্ন সময়ের হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কোনো একটি অধ্যায়কে আড়াল করে বা কোনো ব্যক্তির অবদানকে খাটো করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনা করা যায় না।
এখানেই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমান সরকার বিএনপির নেতৃত্বাধীন। দলটি নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি হিসেবে দাবী করে। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁরই সন্তান। ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের প্রতি দলটির রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা থাকা স্বাভাবিক। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রশ্ন উঠছে-অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৈরি হওয়া ইতিহাসের মূল্যায়নসংক্রান্ত বিতর্ক ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার কী উদ্যোগ নিচ্ছে? জাতীয় চার নেতার স্মরণে একটি প্রদর্শনী নিরাপত্তাজনিত কারণে স্থগিত হওয়ার ঘটনা সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের একক সম্পত্তি নয়। স্বাধীনতার পক্ষে যাঁরা লড়েছেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন, জীবন দিয়েছেন-তাঁদের অবদান বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাসের অংশ। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কও হতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সমাধান হওয়া উচিত গবেষণা, তথ্য-প্রমাণ ও মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে- কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে, কোনো স্মরণানুষ্ঠান সংকুচিত করে কিংবা কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে নয়।
বাংলাদেশের জনগণ কোনো দলের মনোনীত ইতিহাস চায় না। তারা চায় সত্যনিষ্ঠ, পূর্ণাঙ্গ ও পক্ষপাতহীন ইতিহাস। কারণ ইতিহাসের মালিক কোনো সরকার নয়, কোনো রাজনৈতিক দলও নয়-ইতিহাসের উত্তরাধিকারী বাংলাদেশের জনগণ।
লেখক: বিশেষ প্রতিনিধি, মাছরাঙা টেলিভিশন

আপনার মতামত লিখুন