পোশাক খাতে অস্থিরতা: প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমাধান
ঢাকা-গাজীপুর-সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের অসন্তোষ ক্রমশ সহিংস রূপ নিয়েছে। ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি, কালো তালিকাভুক্তি বন্ধ ও ছাঁটাই বাতিল—এই তিন দফা দাবিতে শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করছেন। কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। পুলিশ ও বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ইতোমধ্যে সাভারে তিন প্লাটুন এবং গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে ১২ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সরকার ১ নভেম্বর মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ৪ নভেম্বর বোর্ড ডিসেম্বর থেকে নতুন কাঠামো কার্যকর এবং জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে, কিন্তু কত টাকা বাড়বে, তা এখনো ঘোষণা করেনি। এ কারণে মাঠের উত্তাপ কমেনি। এই শিল্প ৮০ শতাংশ রপ্তানি আয়ের উৎস। প্রায় ৪০ লাখ মানুষের জীবিকা এর ওপর নির্ভরশীল। বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫২৯টি কারখানার ১০ লাখ শ্রমিকের কাজ ব্যাহত হয়েছে। তাই এই অস্থিরতার দ্রুত ও শান্তিপূর্ণ সমাধান জাতীয় স্বার্থেই জরুরি।এই আন্দোলনে বহিরাগত অনুপ্রবেশের প্রমাণ মিলছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া ৪০ জনের কেউই শ্রমিক নন, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী। আবার মাঠে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদেরও লাঠি হাতে রাস্তায় দেখা গেছে—এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশ্ন হলো, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন লাঠি হাতে নামলে তা যদি পুলিশকে সহায়তা হয়, তবে অন্য দলের ক্ষেত্রে তা অপরাধ কেন হবে? শ্রমিকের ন্যায্য দাবির আড়ালে কোনো রাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক পক্ষের লাঠি হাতে রাস্তায় নামার আইনগত ভিত্তি নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব একমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। অতীতে পাকিস্তান আমলের এনএসএফ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারের আমলেই দলীয় লোকজন দিয়ে আন্দোলন দমনের সংস্কৃতি ছিল, যার পরিণতি ভালো হয়নি। মোনায়েম খানের পেটোয়া বাহিনীর সদস্য পাঁচপাত্তু ছুরিকাঘাতে মারা গেছেন, খোকার লাশ পড়ে ছিল তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি—সবাই একই ভুল করেছে। এবারও সেই পথে হাঁটা ঠিক হচ্ছে না। কারণ, এতে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।এই অস্থিরতার মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিকের মৃত্যু। তার বড় ভাই জানিয়েছেন, সোমবার আন্দোলনে হামলার ঘটনা মুঠোফোনে ভিডিও করার চেষ্টা করায় হামলাকারীরা তার ওপর চড়াও হয়। তাকে বেধড়ক মারধর করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। পরে আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাকে উদ্ধার করে শিন-শিন জাপান হাসপাতালে ভর্তি করান। সেখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু হয়। বাবা-হারা এই তরুণ পাঁচ বছর ধরে গাজীপুরে থেকে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। একজন শ্রমিক যখন অন্যায়ের প্রমাণ রাখতে গিয়ে প্রাণ হারান, তখন বুঝতে হবে আন্দোলন আর সাধারণ শ্রমিকদের হাতে নেই; এর মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ ঘটেছে।সরকারের দুই উপদেষ্টার দুই রকম বক্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান ৩ নভেম্বর সচিবালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেছেন, পুলিশের আইনি অধিকারের মধ্যে কাউকে হত্যা করার অধিকার আছে, যদি সে ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বর্তমান বিএনপি সরকার কি এ ধরনের আইনের প্রয়োগ মেনে নিয়েছে? মেনে নেয়নি। তাহলে এখন পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনের সময় এ কথা কেন আসছে? এই বক্তব্য রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তা ছাড়া, এই বক্তব্য মাঠপর্যায়ের পুলিশকে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে উৎসাহিত করতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান ফেসবুকে দাবি করেছেন, শ্রমিক পরিচয়ধারী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দুর্বৃত্তরাই তৌফিকের হত্যাকারী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের অনেকে যখন বলেন, আওয়ামী লীগ মৃত এবং ভারতে কবর হয়েছে, তখন এই ‘দুর্বৃত্তরা’ আসে কোথা থেকে?আন্দোলন হলেই ষড়যন্ত্রের গল্প হাজির করা আমাদের পুরোনো ও সুবিধাজনক অভ্যাস। বলা হয়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ধ্বংস করে এই ব্যবসা ভারত নিয়ে যেতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত হলেও আমরা বলি, ইহুদি ষড়যন্ত্র। কিন্তু আমাদের জ্ঞানের এত বড় দুর্ভিক্ষ যে ষড়যন্ত্র ধরার ক্ষমতাও নেই, অক্ষমতার লজ্জাও নেই। সত্য হলো, এই ব্যবসা বাংলাদেশ থেকে চলে গেলে শুধু ভারতে যাবে না, চীন, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের কাছেও যাবে। প্রতিযোগীরা কাউকে ছাড় দেয় না। ভিডিওচিত্রের যুগে, যেখানে প্রতিটি হামলার দৃশ্য ধারণ করা হচ্ছে, সেখানে কল্পিত ষড়যন্ত্রের অবতারণা করে সাময়িক নিষ্কৃতি পাওয়া গেলেও সমস্যা ছাইচাপা আগুনের মতো থেকে যাবে এবং পরে আরও বড় হয়ে ফিরে আসবে। তাই আসল কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।আমি ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা-জয়দেবপুর যাতায়াতের পথে পোশাকশ্রমিকদের ভোরবেলা ছোট পুঁটলি হাতে কারখানার দিকে ছুটে যেতে দেখেছি। দেখেছি, বৃষ্টিতে ভিজে কাজে যোগ দিয়ে গায়ের কাপড় পাখার বাতাসে শুকাতে। দেখেছি, সন্ধ্যায় ছুটির পর ক্লান্ত শরীরেও হাসি-ঠাট্টা করতে। একবার তাদের আন্দোলনের আক্রোশ থেকে বাঁচতে সহকর্মীদের নিয়ে গ্রামের মেঠোপথে দৌড়াতে হয়েছে। আবার পুলিশের তাড়াও খেয়েছি। তাদের বেতন কম, কিন্তু তারা অল্পতেই তুষ্ট থাকেন। আজ দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে ১২ হাজার ৫০০ টাকায় সংসার চালানো যে অসম্ভব, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তাদের কষ্টটা বাস্তব।এই প্রেক্ষাপটে মন্ত্রী জুনায়েদ সাকিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে বিদ্রূপ হচ্ছে, তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আওয়ামী লীগ আমলে বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ‘ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন, ২৫ হাজার টাকার মজুরির সংগ্রামকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে।’ আজ তিনি নিজেই মন্ত্রী, কিন্তু শ্রমিকদের পক্ষে তার একটি কথাও শোনা যাচ্ছে না। রাজনীতি এমনই—বিরোধী দলে থাকলে এক রকম কথা, সরকারে গেলে সুর বদলে যায়। এই দ্বিচারিতাই মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সরকার জাতীয় বেতন স্কেলে কর্মচারীদের মূল বেতন গ্রেডভেদে ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে, যা মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সঠিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ শুধু সরকারি চাকরিজীবীরা নন, পোশাকশ্রমিকসহ সর্বস্তরের মানুষই মোকাবিলা করছেন। তাই তাদেরও আয় বৃদ্ধি করা দরকার।ষড়যন্ত্র বা আওয়ামী লীগের ইন্ধন খুঁজে সময় নষ্ট না করে ডিসেম্বরের আশ্বাসকে স্পষ্ট অঙ্কে পরিণত করতে হবে। আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে দ্রুত সমাধানই দেশের স্বার্থ, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষা করবে।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]