উন্নয়নশীলের পথে বিরতি: সিদ্ধান্তের পেছনের প্রশ্ন
চলতি বছর নভেম্বর মাসে বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত’ দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে ‘উন্নয়নশীল’ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরদিনই স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর পিছিয়ে দেয়ার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। বিএনপি সরকার তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেছে যে, দেশি-বিদেশি নানাবিধ অভিঘাতের ফলে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে,- জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়েছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কর-জিডিপি অনুপাত কমেছে, কমেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি। আরও আছে, যেমন- সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাওয়ায় মানুষ কর্মহীন বা বেকার হয়েছে ব্যাপকভাবে, সুশাসনের অভাবে ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সারা পৃথিবীর দেশগুলোকে জাতিসংঘ উন্নত ও উন্নয়নশীল এই দুই শ্রেণীতে বিভাজন করতো। উন্নয়নশীল তালিকার পেছনের দুর্বল দেশগুলোকে নিয়ে ১৯৭১ সনে প্রথম আরেকটি তালিকা করা হয়, নাম দেয়া হয় স্বল্পোন্নত দেশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ এতো ব্যাপক ছিল যে, বাংলাদেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই ছিল কঠিন। এই অবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায়ও ছিল না, এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫ সনে, বঙ্গবন্ধুর আমলে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি লাভের পর বাংলাদেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হয়, বাংলাদেশের ওপর বিভিন্ন দেশের আস্থা তৈরি হয়, বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে নানা সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হতে থাকে।১৯৭৫ সন থেকে বিগত পাঁচ দশক ধরে জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় রয়ে গেছে বাংলাদেশ। পরনির্ভরশীল হয়ে বেঁচে থাকার এই অবস্থা দেশ ও দেশের জনগণের মানমর্যাদার জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। কিছুদিন আগেও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো আমাদের সম্বোধন করতো ‘মিসকিন’ নামে ; আর উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে চিনতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত প্লাবনের দেশ হিসেবে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় স্থান পাওয়ার পর দেশের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল হলেও স্বল্পোন্নত দেশও গরীব, নুন আনতে পান্তা ফুরায়। স্বল্পোন্নত দেশের অধিকাংশ মানুষের খাবার থাকে না, থাকে না বসতিঘর, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা। স্বল্পোন্নত দেশের কৃষি সম্পূর্ণ প্রকৃতির খেয়ালখুশির উপর নির্ভরশীল, শিল্প উৎপাদনে বিরাজ করে অস্থিরতা। বর্তমানে এই তালিকায় যে ৪৪টি দেশ রয়েছে তার মধ্যে ৩২টি দেশের অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশে। এশিয়া মহাদেশের স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান, কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, লাওস, মিয়ানমার, নেপাল, ইয়েমেন এবং বাংলাদেশ। ১৯৭১ সন থেকে অদ্যাবধি মালদ্বীপ এবং ভুটানসহ ৮টি দেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে গেছে।১৯৭৫ সন থেকেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভের প্রত্যাশায় তার আর্থ-সামাজিক অবস্থান উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছে এবং এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি আসে ২০১৮ সনে, এই বছর বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশ করা হয়। বিভিন্ন সরকারের আমলে বিশেষ করে ২০০৮ সনে থেকে বাংলাদেশে দরিদ্র ও হতদরিদ্রের সংখ্যা কমতে থাকে, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বাড়তে থাকে, মাথাপিছু আয় ও দেশজ সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে, জন্ম ও মৃত্যুহার কমতে থাকে, শিক্ষার হার বাড়তে থাকে, সুষম খাবার ও স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারিত হওয়ায় মানুষের আয়ুও বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বের নানাবিধ দুর্যোগ মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতাও এই সময়ে বাংলাদেশের বেড়ে গিয়েছিল। সক্ষমতা বেড়েছিল বলেই করোনার সময়ও বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৮ শতাংশ, অথচ তখন বহু উন্নত দেশের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। দুর্যোগ মোকাবিলা করার সামর্থ বৃদ্ধি পেয়েছিল বলেই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার মতো দেউলিয়া হয়ে যায়নি।কোনো দেশ ইচ্ছে করলেই তার অবস্থানগত শ্রেণী পরিবর্তন করতে পারে না, কোন দেশ স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হবে তা নির্ধারণ করে জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি’ বা সিডিপি। প্রতি তিন বছর পরপর স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ৩টি সূচক- মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা মূল্যায়ন করা হয়, পরপর দু’টি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্ধারিত মান অর্জন করলে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের করার জন্য সুপারিশ করে কমিটি। সুপারিশের পরও সংশ্লিষ্ট দেশকে প্রস্তুতির জন্য তিন বছর সময় দেয়া হয় এবং তিন বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে অনুমোদনের পর উন্নয়নশীল দেশের কাতারে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠে যায়। বাংলাদেশ ২০১৮ ও ২০২১ সনের দুইটি ত্রিবার্ষিক মানদণ্ডের মূল্যায়নে তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়। ফলে ২০২১ সনের সুপারিশের ভিত্তিতে তিন বছর পর ২০২৪ সনে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে আসার কথা, কিন্তু করোনার কারণে প্রস্তুতির জন্য আরও দুই বছর পিছিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু ইউনূসের সৃষ্ট অরাজকতার কারণে ২০২৬ সনেও বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হতে পারলো না।অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশ এত দ্রুত পেছনের দিকে হেঁটেছে যে বর্তমান বিএনপি সরকারের আবেদনে প্রার্থীত আগামী তিন বছরেও বাংলাদেশকে আগের পর্যায়ে আনা কঠিন হবে। বিএনপি আবেদন করে ঠিক কাজটি করেছে, এখন উন্নয়নশীল দেশের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হলে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে প্রাপ্ত শুল্ক সুবিধা আর পাবে না, রপ্তানি তীব্র প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হবে, ওষুধ আবিস্কারক বিদেশি কোম্পানিগুলোকে রয়্যালটি দিতে হবে, রয়্যালটি দিলে বাংলাদেশে ওষুধের দাম বেড়ে যাবে, কোন পণ্যে ভর্তুকি দেয়া যাবে না, প্রবাসীদের রেমিট্যান্সে নগদ সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি ওঠবে, কম সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া যাবে না, শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক বৃত্তি কমে যাবে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রদেয় চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যাবে। অথচ এই সব বাধাবিপত্তি কাটানোর সক্ষমতা দুই বছর আগেও বাংলাদেশের ছিল, ইউনূস এই সক্ষমতা তলানিতে নামিয়ে দিয়ে গেছেন। এটা আমার কথা নয়, ইউনূস সাহেবের গর্বের শ্বেতপত্রের কথা।বাংলাদেশ হলো একমাত্র ও প্রথম দেশ, যে দেশ তিনটি সূচকেই জাতিসংঘের দু’টি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য উত্তীর্ণ হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতি ও অর্থ পাচার নিয়ে মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়েছে তাতে তিনটি সূচকেই বাংলাদেশের উত্তীর্ণ হওয়ার স্বীকৃতি রয়েছে। শ্বেতপত্র রচয়িতা বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদদের অভিমত ছিল, এলডিসি বা স্বল্পোন্নত পর্যায় থেকে উত্তরণের পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক এবং যে সব সূচকের ওপর ভিত্তি করে এলডিসি থেকে উত্তরণ হয়, তা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সুসংহত। শ্বেতপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘বাংলাদেশ মানদণ্ডের বিচারে অনেক ওপরে আছে’। বিগত ১৭ বছরের উন্নয়ন নিয়ে শ্বেতপত্রের প্রধান কাণ্ডারি দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য আরও বলেছেন, ‘আমরা আবেদন করে যোগ্য হইনি, আন্তর্জাতিক বিচারে প্রতিষ্ঠিত মাপকাঠিতে যোগ্য হয়েছি।’এভাবেই বিগত ১৭ বছর ধরে দেশকে ধ্বংস করার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে মোহাম্মদ ইউনূসের ৪০০ পৃষ্ঠার শ্বেতপত্র।(লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]