সংবাদ

বাণিজ্য, স্বচ্ছতা ও রূপান্তর


এম এ হোসাইন
এম এ হোসাইন
প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম

বাণিজ্য, স্বচ্ছতা ও রূপান্তর
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের রপ্তানি সচল রেখেছে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে

বাংলাদেশকে প্রায়শই এশিয়ার অন্যতম সফল উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দেশটি দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র পীড়িত থেকে একটি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শীর্ষস্থানীয় পোশাক শিল্পের অবস্থান এবং যার অর্থনৈতিক উত্থান অনেক সংশয়বাদীকে অবাক করেছে। কিন্তু সফলতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। স্বল্পব্যয়ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি চিরকাল যথেষ্ট নয়। দেশগুলোকে একসময় কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: তারা কি যত দ্রুত কারখানা সম্প্রসারণ করেছিল, তত দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে পারে?

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও শ্রম সংস্কারের উদীয়মান কাঠামো একটি উত্তর ইঙ্গিত করে। যদি এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এ ব্যবস্থাগুলো কেবল কূটনৈতিক চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশ কীভাবে বাণিজ্য, শ্রম, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব পরিচালনা করে, সেই ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন চিহ্নিত করবে। এটি ওয়াশিংটনকে খুশি করার চেয়ে বাংলাদেশকে জাতীয় উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করার সম্ভাবনা বেশি। 

সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের অগ্রাহ্য সত্য: শ্রমিকের মর্যাদা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি অস্থিতিশীল অগ্রগতি। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রপ্তানি সচল রেখেছে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিদেশে এই শিল্পটি দুর্বল শ্রমিক সুরক্ষা, বিতর্কিত মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতার প্রতীকও হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন অদক্ষতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু সুনামের ঝুঁকি তারা অনির্দিষ্টকাল সহ্য করে না। আর এজন্যই বাংলাদেশ শ্রম আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর গুরুত্ব এত গভীর। 

ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীদের হার ২০ শতাংশে কমানো শুধু একটা ছোটখাটো নিয়ম পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে বড় কারখানাগুলোতে আইনগতভাবে ইউনিয়ন করা যে প্রায় অসম্ভব ছিল, সেই বাধাই দূর হয়েছে। নিবন্ধনের শর্তগুলো সহজ করা (যেমন কারখানার আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ করা) এবং এই বাস্তবতাকেই মেনে নেওয়া যে, আমলাতন্ত্র প্রায়শই নীরব ভেটো হিসেবে কাজ করে। আর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) মধ্যেও যদি প্রকৃত শ্রম অধিকার বাড়ানো যায়, তাহলে সেই ˆদ্বত ব্যবস্থার অবসান ঘটবে, যেখানে কিছু শ্রমিক সুরক্ষা পেত, যা অন্যদের থেকে অস্বীকার করা হতো। 

ইতিহাস এখানে একটি পরিষ্কার শিক্ষা দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান কেবল বেশি পণ্য রপ্তানি করে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়নি। তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত শ্রম সুরক্ষা ও একটি বিস্তৃত সামাজিক চুক্তি গড়ে তুলেছিল। সুরক্ষা পাওয়া শ্রমিকরা আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ এবং তুলনামূলক কম অস্থিরতাপ্রবণ হয়। বাংলাদেশের সেই শিক্ষাটি যত্নসহকারে পাঠ নেয়া উচিত। 

একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৩ সালের মজুরি প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ফৌজদারি মামলাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি। সরকারের শৃঙ্খলা রক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যখন শ্রমবিরোধ আক্ষরিক অর্থে অপরাধী করে ফেলে, তখন বিশ্বাস ভেঙে যায়। ভয়ের মাধ্যমে একটি কারখানা ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে করা যায় না। এটি কেবল বৈধতার মাধ্যমেই পরিচালিত হতে পারে। 

এরপর আসে দ্বিতীয় স্তম্ভ: নিয়ন্ত্রক আধুনিকীকরণ। ওষুধ ও মেডিকেল সরঞ্জামের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ-র অনুমোদন বাংলাদেশ মেনে নিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে অহেতুক দাপিয়ে বাণিজ্য বন্ধ রাখার জায়গা থেকে সরে আসার একটা ইতিবাচক সংকেত। বিশ্বস্ত বিদেশি অনুমোদন যদি মানসম্মত ওষুধ ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত প্রবেশের পথ খুলে দেয়, তাহলে ভোক্তারা লাভবান হন এবং ব্যবসায়ীরা পান আশার আলো। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির সুরক্ষা মান স্বীকার করার মাধ্যমে যানবাহনের উন্নত মান নিয়েও একই যুক্তি খাটে। মানগুলোর সামঞ্জস্যতা মানে সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়া নয়। বরং কাগজপত্রের জটিল অনুষ্ঠানের চেয়ে দক্ষতা বেছে নেয়া। 

অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভুল বোঝে—তারা মনে করে নিয়মকানুন বাড়ালেই অগ্রগতি হয়। তারা ফর্ম, লাইসেন্স আর অনুমোদনের পাহাড় দাঁড় করায়, আর জটিলতাকে দক্ষতা বলে ভ্রম সৃষ্টি করে। আসল নিয়মকানুন জনগণকে রক্ষা করে। ভুয়া নিয়মকানুন রক্ষা করে দালালচক্রকে। 

কৃষিতে আরেকটি সুযোগ। পোকা-মাকড় আর রোগবালাই সংক্রান্ত নিয়ম একীভূত করা, মাংস ও জলজ পণ্যের বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেট প্রচলন করা, এবং ˆজবপ্রযুক্তির জন্য নিয়ম তৈরি করা—এসব বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে ও একইসঙ্গে দেশের খাদ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে। যেসব দেশ বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম প্রত্যাখ্যান করে, তারা প্রায়ই তা করে জাতীয়তাবাদের নামে। শেষ পর্যন্ত তাদের দেশেই দেখা দেয় অভাব, উচ্চমূল্য আর দারিদ্রতা। 

ডিজিটাল অর্থনীতির সংস্কারগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে। বাংলাদেশ এখন এমন এক যুগে পা রাখছে, যেখানে তথ্য ব্যবস্থাপনা (ডেটা গভর্নেন্স) ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা জরুরি ছিল একসময় বন্দরের অবকাঠামো। সীমান্ত পেরিয়ে তথ্যের গোপনীয়তার নিয়ম মেনে নেয়া এবং হস্তক্ষেপকারী সাইবার নিরাপত্তা বিধিগুলো পুনর্বিবেচনা করা—এটাই নির্ধারণ করবে যে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে দেখবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলার মাথাব্যথা হিসেবে। বিনিয়োগকারীরা সেই বাজার খোঁজে যেখানে তথ্য নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় সুরক্ষিত থাকে, আর এনক্রিপশনকে সহজেই দুর্বল করা হয় না। 

শেষের কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। এনক্রিপশনে ব্যাকডোর বা সীমাহীন প্রবেশাধিকার দাবি করা আমলাতন্ত্রের কাছে কার্যকরী মনে হতে পারে, কিন্তু তা সবার জন্য আস্থা কমিয়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে ডিজিটাল আত্মবিশ্বাস একটি জাতীয় সম্পদ। 

একইভাবে, বড় বড় আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে মেধাসম্পদ সুরক্ষা জোরদার করা বাংলাদেশকে ঠিকাদারি উৎপাদন (কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং) থেকে সরে এসে উদ্ভাবনের পথে এগোতে সাহায্য করবে। দেশগুলো আকস্মিকভাবে শিক্ষিত অর্থনীতিতে পরিণত হয় না। তারা আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলে—যেখানে ধারণা, ব্র্যান্ড আর আবিষ্কারগুলোর রক্ষণীয় মূল্য থাকে। 

তারপর রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা—যা কম আলোচিত, কিন্তু উপেক্ষা করা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, গম ও সয়াবিন তেলের ক্রয় বাড়ানোর দিকে ঝোঁক বাংলাদেশের জন্য একটি বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের প্রতিফলন। একই কথা যায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উপর বেশি নির্ভরতা এবং লগিংক-এর মতো চীনা ডিজিটাল লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ, অন্যান্য মধ্যম শক্তির মতো, শিখছে যে সস্তা নির্ভরশীলতা ব্যয়বহুল দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। 

এর মানে চীনের প্রতি বিদ্বেষ নয়। এটা বাস্তববাদ। দেশগুলো তখনই লাভবান হয় যখন তারা ব্যাপকভাবে বাণিজ্য করে কিন্তু কারও ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল হয় না। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে উঠে নানা বিকল্পের মাধ্যমে। 

কিছু সমালোচক বলবেন এই সংস্কারগুলো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। এটা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বাইরের চাপ সংস্কারের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু টেকসই করতে হবে দেশের নিজের স্বার্থেই। মুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন, কঠোর নিয়মকানুন, স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ, বা শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা। বাংলাদেশের এগুলোর দরকার কারণ আমেরিকা চায় এজন্য নয় বরং এগুলোর দরকার বাংলাদেশের নিজের ভবিষ্যৎ সেগুলো চায়। 

বিদেশি বিনিয়োগের কথা ভাবুন। বিনিয়োগকারীরা দেশ তুলনা করে শুধু মজুরির ভিত্তিতে নয়, বরং পূর্বানুমানের ভিত্তিতেও। বিবাদ কি ন্যায্যভাবে মীমাংসা হয়? নিয়মকানুন কি স্বচ্ছ? গোপন ব্যবসায়িক তথ্য কি সুরক্ষিত? ঘুষ বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া কি অনুমোদন পাওয়া যায়? যেসব দেশ ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়, তারা দীর্ঘমেয়াদি মূলধন টানে। যেসব দেশ ‘না’ বলে, তারা শুধু সুযোগসন্ধানী লোভীদের টানে। 

পরিবেশগত বিষয়গুলোর প্রতিও নজর দেয়া জরুরি। বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার আর অপচয়ী উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপগুলোকে প্রায়ই উড়িয়ে দেয়া হয় অভিজাত শ্রেণীর উদ্বেগ বলে। এটা ঠিক নয়। পরিবেশের ক্ষয়ের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য আছে—বন্যা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, রফতানি বাধা, আর জমির অবক্ষয়। বৃত্তাকার অর্থনীতি (সার্কুলার ইকোনমি) ফ্যাশনের শব্দ নয়; এটা সম্পদের শৃঙ্খলা। 

তবে, এসব সংস্কার যদি শুধু অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কিছুতেই লাভ হবে না। বাংলাদেশ আগেও সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এখন পার্থক্য গড়ে দিতে হবে কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। শ্রম পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় সংস্থান দিতে হবে। আদালতের দরকার স্বাধীনতা। মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত খসড়া নিয়মাবলি উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা। সংস্থাগুলোকে ‘বিবেচনাধীন ক্ষমতা’ কে আয়ের উৎস বানানোর বদঅভ্যাসকে চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। সংস্কার সফল হয় যৌথ বিবৃতিতে নয়, বরং ˆদনন্দিন প্রশাসনিক কাজে। এটাই আসল পরীক্ষা। 

বাংলাদেশ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা অনেক উদীয়মান দেশের কাছে পরিচিত: একটি প্রবৃদ্ধির মডেল বজায় রাখা—যা গড়ে উঠেছে সস্তা দাম, অস্বচ্ছতা আর ব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে, নাকি সেটাকে উন্নত করে গড়ে তোলা হবে উৎপাদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তিতে। প্রথম মডেল চালাতে পারে এক দশক। দ্বিতীয় মডেল চালাতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। 

যদি এই সংস্কারগুলো প্রতীকী নয়, বরং কঠিন আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর করবে না—বরং নিজেকেই আধুনিক করে তুলবে। আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬


বাণিজ্য, স্বচ্ছতা ও রূপান্তর

প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশকে প্রায়শই এশিয়ার অন্যতম সফল উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্ধশতাব্দীর মধ্যে দেশটি দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র পীড়িত থেকে একটি বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র, শীর্ষস্থানীয় পোশাক শিল্পের অবস্থান এবং যার অর্থনৈতিক উত্থান অনেক সংশয়বাদীকে অবাক করেছে। কিন্তু সফলতা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। স্বল্পব্যয়ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি চিরকাল যথেষ্ট নয়। দেশগুলোকে একসময় কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়: তারা কি যত দ্রুত কারখানা সম্প্রসারণ করেছিল, তত দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক করতে পারে?

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য ও শ্রম সংস্কারের উদীয়মান কাঠামো একটি উত্তর ইঙ্গিত করে। যদি এগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এ ব্যবস্থাগুলো কেবল কূটনৈতিক চুক্তি নয়, বরং বাংলাদেশ কীভাবে বাণিজ্য, শ্রম, প্রযুক্তি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব পরিচালনা করে, সেই ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন চিহ্নিত করবে। এটি ওয়াশিংটনকে খুশি করার চেয়ে বাংলাদেশকে জাতীয় উন্নয়নের পরবর্তী ধাপের জন্য প্রস্তুত করার সম্ভাবনা বেশি। 

সংস্কারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি দীর্ঘদিনের অগ্রাহ্য সত্য: শ্রমিকের মর্যাদা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি অস্থিতিশীল অগ্রগতি। বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প রপ্তানি সচল রেখেছে এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বিদেশে এই শিল্পটি দুর্বল শ্রমিক সুরক্ষা, বিতর্কিত মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন গঠনে প্রতিবন্ধকতার প্রতীকও হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা কিছুদিন অদক্ষতা সহ্য করতে পারে, কিন্তু সুনামের ঝুঁকি তারা অনির্দিষ্টকাল সহ্য করে না। আর এজন্যই বাংলাদেশ শ্রম আইনে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলোর গুরুত্ব এত গভীর। 

ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীদের হার ২০ শতাংশে কমানো শুধু একটা ছোটখাটো নিয়ম পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে বড় কারখানাগুলোতে আইনগতভাবে ইউনিয়ন করা যে প্রায় অসম্ভব ছিল, সেই বাধাই দূর হয়েছে। নিবন্ধনের শর্তগুলো সহজ করা (যেমন কারখানার আইডি, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন গ্রহণ করা) এবং এই বাস্তবতাকেই মেনে নেওয়া যে, আমলাতন্ত্র প্রায়শই নীরব ভেটো হিসেবে কাজ করে। আর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোর (ইপিজেড) মধ্যেও যদি প্রকৃত শ্রম অধিকার বাড়ানো যায়, তাহলে সেই ˆদ্বত ব্যবস্থার অবসান ঘটবে, যেখানে কিছু শ্রমিক সুরক্ষা পেত, যা অন্যদের থেকে অস্বীকার করা হতো। 

ইতিহাস এখানে একটি পরিষ্কার শিক্ষা দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান কেবল বেশি পণ্য রপ্তানি করে উন্নত অর্থনীতিতে পরিণত হয়নি। তারা ধীরে ধীরে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত শ্রম সুরক্ষা ও একটি বিস্তৃত সামাজিক চুক্তি গড়ে তুলেছিল। সুরক্ষা পাওয়া শ্রমিকরা আরও উৎপাদনশীল, দক্ষ এবং তুলনামূলক কম অস্থিরতাপ্রবণ হয়। বাংলাদেশের সেই শিক্ষাটি যত্নসহকারে পাঠ নেয়া উচিত। 

একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হলো ২০২৩ সালের মজুরি প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত ফৌজদারি মামলাগুলোর সমাধানের প্রতিশ্রুতি। সরকারের শৃঙ্খলা রক্ষার অধিকার রয়েছে। কিন্তু যখন শ্রমবিরোধ আক্ষরিক অর্থে অপরাধী করে ফেলে, তখন বিশ্বাস ভেঙে যায়। ভয়ের মাধ্যমে একটি কারখানা ব্যবস্থাপনা দক্ষতার সঙ্গে করা যায় না। এটি কেবল বৈধতার মাধ্যমেই পরিচালিত হতে পারে। 

এরপর আসে দ্বিতীয় স্তম্ভ: নিয়ন্ত্রক আধুনিকীকরণ। ওষুধ ও মেডিকেল সরঞ্জামের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ-র অনুমোদন বাংলাদেশ মেনে নিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে অহেতুক দাপিয়ে বাণিজ্য বন্ধ রাখার জায়গা থেকে সরে আসার একটা ইতিবাচক সংকেত। বিশ্বস্ত বিদেশি অনুমোদন যদি মানসম্মত ওষুধ ও স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে দ্রুত প্রবেশের পথ খুলে দেয়, তাহলে ভোক্তারা লাভবান হন এবং ব্যবসায়ীরা পান আশার আলো। যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ির সুরক্ষা মান স্বীকার করার মাধ্যমে যানবাহনের উন্নত মান নিয়েও একই যুক্তি খাটে। মানগুলোর সামঞ্জস্যতা মানে সার্বভৌমত্ব ছেড়ে দেয়া নয়। বরং কাগজপত্রের জটিল অনুষ্ঠানের চেয়ে দক্ষতা বেছে নেয়া। 

অনেক উন্নয়নশীল দেশ ভুল বোঝে—তারা মনে করে নিয়মকানুন বাড়ালেই অগ্রগতি হয়। তারা ফর্ম, লাইসেন্স আর অনুমোদনের পাহাড় দাঁড় করায়, আর জটিলতাকে দক্ষতা বলে ভ্রম সৃষ্টি করে। আসল নিয়মকানুন জনগণকে রক্ষা করে। ভুয়া নিয়মকানুন রক্ষা করে দালালচক্রকে। 

কৃষিতে আরেকটি সুযোগ। পোকা-মাকড় আর রোগবালাই সংক্রান্ত নিয়ম একীভূত করা, মাংস ও জলজ পণ্যের বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেট প্রচলন করা, এবং ˆজবপ্রযুক্তির জন্য নিয়ম তৈরি করা—এসব বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা কমাতে পারে ও একইসঙ্গে দেশের খাদ্য ব্যবস্থার উন্নতি করতে পারে। যেসব দেশ বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়ম প্রত্যাখ্যান করে, তারা প্রায়ই তা করে জাতীয়তাবাদের নামে। শেষ পর্যন্ত তাদের দেশেই দেখা দেয় অভাব, উচ্চমূল্য আর দারিদ্রতা। 

ডিজিটাল অর্থনীতির সংস্কারগুলো আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে। বাংলাদেশ এখন এমন এক যুগে পা রাখছে, যেখানে তথ্য ব্যবস্থাপনা (ডেটা গভর্নেন্স) ঠিক ততটাই জরুরি, যতটা জরুরি ছিল একসময় বন্দরের অবকাঠামো। সীমান্ত পেরিয়ে তথ্যের গোপনীয়তার নিয়ম মেনে নেয়া এবং হস্তক্ষেপকারী সাইবার নিরাপত্তা বিধিগুলো পুনর্বিবেচনা করা—এটাই নির্ধারণ করবে যে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশকে ভবিষ্যতের অংশীদার হিসেবে দেখবে, নাকি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে চলার মাথাব্যথা হিসেবে। বিনিয়োগকারীরা সেই বাজার খোঁজে যেখানে তথ্য নিরাপদে চলাচল করতে পারে, বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত মাত্রায় সুরক্ষিত থাকে, আর এনক্রিপশনকে সহজেই দুর্বল করা হয় না। 

শেষের কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। এনক্রিপশনে ব্যাকডোর বা সীমাহীন প্রবেশাধিকার দাবি করা আমলাতন্ত্রের কাছে কার্যকরী মনে হতে পারে, কিন্তু তা সবার জন্য আস্থা কমিয়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীতে ডিজিটাল আত্মবিশ্বাস একটি জাতীয় সম্পদ। 

একইভাবে, বড় বড় আন্তর্জাতিক চুক্তি মেনে মেধাসম্পদ সুরক্ষা জোরদার করা বাংলাদেশকে ঠিকাদারি উৎপাদন (কন্ট্রাক্ট ম্যানুফ্যাকচারিং) থেকে সরে এসে উদ্ভাবনের পথে এগোতে সাহায্য করবে। দেশগুলো আকস্মিকভাবে শিক্ষিত অর্থনীতিতে পরিণত হয় না। তারা আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলে—যেখানে ধারণা, ব্র্যান্ড আর আবিষ্কারগুলোর রক্ষণীয় মূল্য থাকে। 

তারপর রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক মাত্রা—যা কম আলোচিত, কিন্তু উপেক্ষা করা অসম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি, গম ও সয়াবিন তেলের ক্রয় বাড়ানোর দিকে ঝোঁক বাংলাদেশের জন্য একটি বৈচিত্র্যকরণ কৌশলের প্রতিফলন। একই কথা যায় মার্কিন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার উপর বেশি নির্ভরতা এবং লগিংক-এর মতো চীনা ডিজিটাল লজিস্টিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ, অন্যান্য মধ্যম শক্তির মতো, শিখছে যে সস্তা নির্ভরশীলতা ব্যয়বহুল দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে। 

এর মানে চীনের প্রতি বিদ্বেষ নয়। এটা বাস্তববাদ। দেশগুলো তখনই লাভবান হয় যখন তারা ব্যাপকভাবে বাণিজ্য করে কিন্তু কারও ওপর অতি মাত্রায় নির্ভরশীল হয় না। কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন গড়ে উঠে নানা বিকল্পের মাধ্যমে। 

কিছু সমালোচক বলবেন এই সংস্কারগুলো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া। এটা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি। বাইরের চাপ সংস্কারের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু টেকসই করতে হবে দেশের নিজের স্বার্থেই। মুক্ত ট্রেড ইউনিয়ন, কঠোর নিয়মকানুন, স্বচ্ছ নীতিনির্ধারণ, বা শক্তিশালী দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা। বাংলাদেশের এগুলোর দরকার কারণ আমেরিকা চায় এজন্য নয় বরং এগুলোর দরকার বাংলাদেশের নিজের ভবিষ্যৎ সেগুলো চায়। 

বিদেশি বিনিয়োগের কথা ভাবুন। বিনিয়োগকারীরা দেশ তুলনা করে শুধু মজুরির ভিত্তিতে নয়, বরং পূর্বানুমানের ভিত্তিতেও। বিবাদ কি ন্যায্যভাবে মীমাংসা হয়? নিয়মকানুন কি স্বচ্ছ? গোপন ব্যবসায়িক তথ্য কি সুরক্ষিত? ঘুষ বা রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া কি অনুমোদন পাওয়া যায়? যেসব দেশ ‘হ্যাঁ’ উত্তর দেয়, তারা দীর্ঘমেয়াদি মূলধন টানে। যেসব দেশ ‘না’ বলে, তারা শুধু সুযোগসন্ধানী লোভীদের টানে। 

পরিবেশগত বিষয়গুলোর প্রতিও নজর দেয়া জরুরি। বন উজাড়, বন্যপ্রাণী পাচার আর অপচয়ী উৎপাদন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে পদক্ষেপগুলোকে প্রায়ই উড়িয়ে দেয়া হয় অভিজাত শ্রেণীর উদ্বেগ বলে। এটা ঠিক নয়। পরিবেশের ক্ষয়ের বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য আছে—বন্যা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, রফতানি বাধা, আর জমির অবক্ষয়। বৃত্তাকার অর্থনীতি (সার্কুলার ইকোনমি) ফ্যাশনের শব্দ নয়; এটা সম্পদের শৃঙ্খলা। 

তবে, এসব সংস্কার যদি শুধু অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে কিছুতেই লাভ হবে না। বাংলাদেশ আগেও সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে। এখন পার্থক্য গড়ে দিতে হবে কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমে। শ্রম পরিদর্শকদের প্রয়োজনীয় সংস্থান দিতে হবে। আদালতের দরকার স্বাধীনতা। মন্ত্রণালয়গুলোর উচিত খসড়া নিয়মাবলি উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা। সংস্থাগুলোকে ‘বিবেচনাধীন ক্ষমতা’ কে আয়ের উৎস বানানোর বদঅভ্যাসকে চিরতরে ত্যাগ করতে হবে। সংস্কার সফল হয় যৌথ বিবৃতিতে নয়, বরং ˆদনন্দিন প্রশাসনিক কাজে। এটাই আসল পরীক্ষা। 

বাংলাদেশ সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যা অনেক উদীয়মান দেশের কাছে পরিচিত: একটি প্রবৃদ্ধির মডেল বজায় রাখা—যা গড়ে উঠেছে সস্তা দাম, অস্বচ্ছতা আর ব্যবস্থাপকের নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে, নাকি সেটাকে উন্নত করে গড়ে তোলা হবে উৎপাদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও আস্থার ভিত্তিতে। প্রথম মডেল চালাতে পারে এক দশক। দ্বিতীয় মডেল চালাতে পারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। 

যদি এই সংস্কারগুলো প্রতীকী নয়, বরং কঠিন আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্ক গভীর করবে না—বরং নিজেকেই আধুনিক করে তুলবে। আর সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারিত্ব। 

(লেখকের নিজস্ব মত)

[লেখক: প্রাবন্ধিক]



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত