সংবাদ

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি


সমীর কুমার সাহা
সমীর কুমার সাহা
প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৭ পিএম

দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি

বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা ভাবুন— সিলেটের হাওরাঞ্চল কিংবা বরেন্দ্রের মাঠে ঘেরা কোনো জনপদ। সেখানকার কৃষক যখন বুকের ব্যথায় কাতর হন, তখন তার প্রথম গন্তব্য সরকারি হাসপাতাল নয়— স্থানীয় কবিরাজ বা হাকিম। এটা কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়, এটা বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং প্রাপ্যতার গল্প। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষ এখনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আর ২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন, যা ১৬ কোটি মানুষের জন্য অপর্যাপ্ত।

এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ রূপ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করতে পারবো, নাকি এই বিশাল সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেবো?


বর্তমান চিত্র: দুই জগতের মাঝে এক জাতি

বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ধারাটি বহুস্তরীয়। ইউনানি, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি এবং লোকচিকিৎসা — এই পাঁচটি ধারা যুগ যুগ ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই সরকার ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ড গঠন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসকের সংখ্যা ১২,০০০-এরও বেশি। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০০-এরও অধিক বিকল্প চিকিৎসক কর্মরত আছেন। দেশে সরকার অনুমোদিত ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার তৈরি করছে। ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ২০৪টি আয়ুর্বেদিক এবং ২৮৫টি ইউনানি কোম্পানি মিলে ৭,০০০-এরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক (২০২৫) গবেষণা জামালপুরের দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়ে দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ শুধুমাত্র ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন এবং আরও ৫.২ শতাংশ আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন গ্রহণ করেন। গবেষণাটি আরও প্রকাশ করে যে, গ্রামীণ, স্বল্প আয়ের এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি বেশি আগ্রহী।


সংকটের মুখ: যখন বিকল্প পথই একমাত্র পথ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ একটি গভীর দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ভার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী রোগসমূহ মোট রোগের বোঝার প্রায় ৬১ শতাংশ এবং বার্ষিক মৃত্যুর ৫৪ শতাংশের কারণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে (এসডিজি ৩.৪)।

অন্যদিকে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ ৬০ বছরের বেশি বয়সী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১১.৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২১.৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এই বার্ধক্যপ্রবণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপ সামাল দিতে শুধু আধুনিক হাসপাতাল যথেষ্ট নয়।

ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকরা এর কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সহযোগী হিসেবে দেখার সময় এসেছে।

ভবিষ্যতের পথ: সমন্বয়ের পাঁচটি স্তম্ভ

প্রথমত, জাতীয় নীতি ও আইনি কাঠামো সংহত করা। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি দরকার যা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসবে, প্র্যাকটিশনারদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবে এবং ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করবে।

দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ওষুধি গাছপালার গবেষণায় ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিআলসার গুণাবলি প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণাগুলোকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রমাণিত পদ্ধতিগুলোকে মানসম্পন্ন প্রোটোকলে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।

তৃতীয়ত, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা মডেল তৈরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল — সব স্তরে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার ও আধুনিক চিকিৎসকদের পাশাপাশি কাজ করার একটি মডেল গড়ে তোলা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মূলধারার চিকিৎসার পাশাপাশি পরিপূরক থেরাপি হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে গুরুতর রোগে এটি আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।

চতুর্থত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ। ঐতিহ্যবাহী নিরাময়কারীদের জনসচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সামগ্রিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও মান নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বহু অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মানহীন ট্র্যাডিশনাল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। রোগীদের যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে তা নিবন্ধিত কিনা যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।


বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে শিক্ষা

চীন, ভারত এবং শ্রীলংকা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করে কার্যকর ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে সরকারি হাসপাতালে বিকল্প চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এটি সঠিক পদক্ষেপের সূচনা, কিন্তু পরিকল্পনা, গবেষণায় বরাদ্দ এবং নীতিমালার সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই হবে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আরেক অদ্ভুত বাস্তবতা আছে —একই রোগী সকালে আধুনিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আর সন্ধ্যায় ভেষজ বা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। এই দ্বৈততা কোনো বিভ্রান্তি নয়; বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্য সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার প্রতিফলন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদেও ট্রেডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটিজি ২০১৯-২০২৫ -এ স্পষ্টভাবে বলেছে, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের একটি কার্যকর অংশ হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়িত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথির অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের সময় এখনই।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদে অসীম চাহিদা মেটানো। শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া নয়, বরং শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ঐতিহ্যের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের আলোয় পরীক্ষা করে, নিয়মের আওতায় এনে, আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশে দাঁড় করালেই কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কারণ সত্যিকারের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তখনই সম্ভব, যখন কোনো মানুষ— প্রত্যন্ত হাওর থেকে শুরু করে শহরের বস্তি পর্যন্ত— চিকিৎসার বাইরে থাকবেন না।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি

প্রকাশের তারিখ : ২৯ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের কথা ভাবুন— সিলেটের হাওরাঞ্চল কিংবা বরেন্দ্রের মাঠে ঘেরা কোনো জনপদ। সেখানকার কৃষক যখন বুকের ব্যথায় কাতর হন, তখন তার প্রথম গন্তব্য সরকারি হাসপাতাল নয়— স্থানীয় কবিরাজ বা হাকিম। এটা কেবল দারিদ্র্যের গল্প নয়, এটা বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং প্রাপ্যতার গল্প। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ মানুষ এখনও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। আর ২০২২ সালের বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দেশের মাত্র ৬১ শতাংশ মানুষ আধুনিক চিকিৎসার আওতায় আসতে পারেন, যা ১৬ কোটি মানুষের জন্য অপর্যাপ্ত।

এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন বা ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতিকে পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কোনো পূর্ণাঙ্গ রূপ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই শক্তিকে সুনিয়ন্ত্রিতভাবে মূলধারার স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করতে পারবো, নাকি এই বিশাল সম্পদকে অবহেলায় নষ্ট হতে দেবো?


বর্তমান চিত্র: দুই জগতের মাঝে এক জাতি

বাংলাদেশে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের ধারাটি বহুস্তরীয়। ইউনানি, আয়ুর্বেদ, হোমিওপ্যাথি, কবিরাজি এবং লোকচিকিৎসা — এই পাঁচটি ধারা যুগ যুগ ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পরপরই সরকার ইউনানি ও আয়ুর্বেদ চিকিৎসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় এবং ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ড গঠন করে।

বর্তমানে বাংলাদেশ ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক সিস্টেম অব মেডিসিন বোর্ডের তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসকের সংখ্যা ১২,০০০-এরও বেশি। এর পাশাপাশি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০০-এরও অধিক বিকল্প চিকিৎসক কর্মরত আছেন। দেশে সরকার অনুমোদিত ১৫টি প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর প্রায় ৪০০ জন ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার তৈরি করছে। ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে ২০৪টি আয়ুর্বেদিক এবং ২৮৫টি ইউনানি কোম্পানি মিলে ৭,০০০-এরও বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাম্প্রতিক (২০২৫) গবেষণা জামালপুরের দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের ওপর পরিচালিত হয়ে দেখিয়েছে, দীর্ঘস্থায়ী রোগীদের মধ্যে ৮.৩ শতাংশ শুধুমাত্র ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যবহার করেন এবং আরও ৫.২ শতাংশ আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন গ্রহণ করেন। গবেষণাটি আরও প্রকাশ করে যে, গ্রামীণ, স্বল্প আয়ের এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠী ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনের প্রতি বেশি আগ্রহী।


সংকটের মুখ: যখন বিকল্প পথই একমাত্র পথ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা আজ একটি গভীর দ্বন্দ্বের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ভার দ্রুত বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী রোগসমূহ মোট রোগের বোঝার প্রায় ৬১ শতাংশ এবং বার্ষিক মৃত্যুর ৫৪ শতাংশের কারণ। সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে (এসডিজি ৩.৪)।

অন্যদিকে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলাচ্ছে। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৮ শতাংশ ৬০ বছরের বেশি বয়সী, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১১.৫ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ২১.৫ শতাংশে উন্নীত হবে। এই বার্ধক্যপ্রবণ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসার চাপ সামাল দিতে শুধু আধুনিক হাসপাতাল যথেষ্ট নয়।

ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হওয়ার কারণ হিসেবে গবেষকরা এর কার্যকারিতা, সহজলভ্যতা, সাশ্রয়ী মূল্য এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কম ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেন। এই বাস্তবতায় ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, সহযোগী হিসেবে দেখার সময় এসেছে।

ভবিষ্যতের পথ: সমন্বয়ের পাঁচটি স্তম্ভ

প্রথমত, জাতীয় নীতি ও আইনি কাঠামো সংহত করা। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় নীতি দরকার যা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূলধারায় নিয়ে আসবে, প্র্যাকটিশনারদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করবে এবং ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করবে।

দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বিনিয়োগ। বাংলাদেশে ব্যবহৃত ওষুধি গাছপালার গবেষণায় ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ও অ্যান্টিআলসার গুণাবলি প্রমাণিত হয়েছে। এই গবেষণাগুলোকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রমাণিত পদ্ধতিগুলোকে মানসম্পন্ন প্রোটোকলে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি।

তৃতীয়ত, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা মডেল তৈরি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা হাসপাতাল — সব স্তরে ট্র্যাডিশনাল মেডিসিন প্র্যাকটিশনার ও আধুনিক চিকিৎসকদের পাশাপাশি কাজ করার একটি মডেল গড়ে তোলা যায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা মূলধারার চিকিৎসার পাশাপাশি পরিপূরক থেরাপি হিসেবে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, তবে গুরুতর রোগে এটি আধুনিক চিকিৎসার বিকল্প হওয়া উচিত নয়।

চতুর্থত, কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ। ঐতিহ্যবাহী নিরাময়কারীদের জনসচেতনতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার আলোকে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সামগ্রিক ও গ্রহণযোগ্য করে তোলা প্রয়োজন।

পঞ্চমত, ফার্মাকোভিজিল্যান্স ও মান নিয়ন্ত্রণ। বর্তমানে বহু অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান মানহীন ট্র্যাডিশনাল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। রোগীদের যেকোনো ওষুধ গ্রহণের আগে তা নিবন্ধিত কিনা যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এই বাস্তবতায় ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের নজরদারি আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।


বৈশ্বিক উদাহরণ থেকে শিক্ষা

চীন, ভারত এবং শ্রীলংকা ট্র্যাডিশনাল মেডিসিনকে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় একীভূত করে কার্যকর ফল পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ২০১৫ সালে সরকারি হাসপাতালে বিকল্প চিকিৎসকদের নিয়োগ দেয়া শুরু করেছে এবং কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রাকৃতিক চিকিৎসা পদ্ধতির জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে। এটি সঠিক পদক্ষেপের সূচনা, কিন্তু পরিকল্পনা, গবেষণায় বরাদ্দ এবং নীতিমালার সমন্বয় ছাড়া এই উদ্যোগ টেকসই হবে না।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার আরেক অদ্ভুত বাস্তবতা আছে —একই রোগী সকালে আধুনিক চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাড়ি ফেরেন, আর সন্ধ্যায় ভেষজ বা হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার দ্বারস্থ হন। এই দ্বৈততা কোনো বিভ্রান্তি নয়; বরং এটি আমাদের স্বাস্থ্য সংস্কৃতির বহুমাত্রিকতার প্রতিফলন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) তাদেও ট্রেডিশনাল মেডিসিন স্ট্র্যাটিজি ২০১৯-২০২৫ -এ স্পষ্টভাবে বলেছে, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা শুধু সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নয়, বরং এটি জনস্বাস্থ্যের একটি কার্যকর অংশ হতে পারে—যদি তা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে মূল্যায়িত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে আয়ুর্বেদ, ইউনানি ও হোমিওপ্যাথির অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের সময় এখনই।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত সম্পদে অসীম চাহিদা মেটানো। শিকড়ের কাছে ফিরে যাওয়া নয়, বরং শিকড়কে সঙ্গে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। ঐতিহ্যের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের আলোয় পরীক্ষা করে, নিয়মের আওতায় এনে, আধুনিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পাশে দাঁড় করালেই কেবল একটি পূর্ণাঙ্গ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। কারণ সত্যিকারের সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা তখনই সম্ভব, যখন কোনো মানুষ— প্রত্যন্ত হাওর থেকে শুরু করে শহরের বস্তি পর্যন্ত— চিকিৎসার বাইরে থাকবেন না।

[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত