আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। তাই সবাইকে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাই। সেই সঙ্গে বিশ্ববাসী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাই যে, বিশ্বে যে অস্ত্রের ঝনঝনানির ব্যবহার চলছে তা পরিহার করে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই, হিংসা নয়, মৈত্রী চাই এই জিনিসটি নিজের মনের মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন-অনুকরণ এবং অনুশীলনের দ্বারা প্রয়োগ করা হলে তাহলে সর্বসাধারণের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে বেশি সময় লাগবে না। এ বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়েছে। মহাকারণিক ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ তার এই ধর্মের সর্বোত্তম বাণী হলোÑ ‘সব্ব পাপস্সা অকরণং কুসালস্স উপসম্পদা/ চিত্তা পরিয়োদপনং এতং বুদ্ধানসাসনং’ ধম্মপদ- ১৮৩ অর্থাৎ, সব প্রকার পাপকর্ম না করা, কুশল বা পুণ্য কর্ম সম্পাদন করা এবং নিজ নিজ চিত্ত সুন্দর বা পরিশুদ্ধ করা-এ সবই হলো বুদ্ধগণের অনুশাসন। এটাই হলো মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধের সর্বজনের প্রতি অহিংসার মৈত্রী ভাব।
এ মহান পবিত্র ‘বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বৌদ্ধ বিশ্বেও একটি অন্যান্য ধর্মোসৎসবের দিন।
বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে এক মহান পবিত্রতম দিন। ভগবান তথাগত বুদ্ধ, তার জীবন ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় তিনটি ঘটনাবলি তথা ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যমান জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ, এবং মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত এই তিনটি ঘটনাকেই নিয়ে বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে তথা বিশ্বের প্রধান দেশে এই দিনটি-কে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সহকারে উদ্?যাপন করে আসছে।
জাতিসংঘ ২০০০ সালে, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ভেসাক ডে’ দিবসটি তার সদর দপ্তর এবং অন্যান্য অফিসে পালন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনে সংঘটিত ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ‘ভেসাক ডে’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই থেকে প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদ্?যাপন ও পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। তারপর থেকেই বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রসমূহে বিপুল সমারোহে এবং জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো সরকারিভাবে এ দিবসটি ভেসাক ডে পালন করছে। জগতে মহাপুরুষের আবির্ভাব অত্যন্ত দুর্লভ। শুভ বৈশাখি পূর্ণিমায় তৎকালীন ভারতবর্ষেও কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে শালবৃক্ষের তলায় রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্ম। তখনি সিদ্ধার্থ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই সপ্ত পদ হেঁটে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন ‘জেট ঠোহস্মিং সেট্ ঠোহস্মিং অয়মন্তিমা জাতিসংঘ’ অর্থাৎ আমিই জোষ্ট, আমিই শ্রেষ্ঠ, এবং এটাই আমার অন্তিম জন্ম। এছাড়াও এ ঐতিহাসিক বর্ষে শুভ বৈশাখি পূর্ণিমা তিথিতে রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্মসহ একই সঙ্গে তথাগত বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ, সাস্ত্রী কালুদায়ী, সহধর্মিণী যশোধরা, সারথি চন্দক, বেগবান, অশ্ব কনক, চারিনিধিকুম্ভ, বিজ্ঞান লাভের মহাবোধি বৃক্ষ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহপরিনির্বাণ প্রাপ্ত। তাই বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে বৈশাখি পূর্ণিমার গুরুত্ব ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। ঋতুর মধ্যে প্রধান হলোÑ বসন্ত, তাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলে থাকে। তিথির মধ্যেও পূর্ণিমা শ্রেষ্ঠ। মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ এই বৈশাখি পূর্ণিমার তিথিতেই তার জন্ম-বুদ্ধত্ব লাভ-মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সেই বৈশাখি পূর্ণিমায় ভগবান তথাগত বুদ্ধের ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। চারটি সত্যের কথা ভগবান বুদ্ধ প্রচার করে গেছেন। সেই চার সত্যকে বলা হয় চার আর্যসত্য। যথা: দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায়। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে ৮টি পথ নির্দেশ করেছেন। সেই আট পথকে বলা হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এগুলো হলো: সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। বুদ্ধ প্রবর্তিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যমপন্থা। পন্থা মানে হলো পথ। এই পন্থা একদিকে ভোগ-সুখময় এবং অন্যদিকে কঠোর তপস্যাময় জীবন থেকে সরিয়ে মানুষকে শান্তির পথে, জ্ঞানমার্গে,
প্রজ্ঞার পথে, বোধি লাভের পথে, পরম সুখ নির্বাণ লাভের পথে পরিচালিত করে। মধ্যমপন্থা প্রকৃতপক্ষে একটি নৈতিক বিধান, সব মানুষের কাছে যা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। সম্যক জীবনাচরণের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন বুদ্ধ। জগতের অনিত্যতা সম্পর্কে জ্ঞান অনুধাবন করলেই মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। ‘বুদ্ধ’ ও ‘বৌদ্ধ’ শব্দ দ্বারা অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। ‘বুদ্ধ’ বলতে জ্ঞানচক্ষু, জ্ঞানলোকে,
প্রাজ্ঞ, প্রবুদ্ধ, সম্বুদ্ধ, পরমজ্ঞান, জ্ঞানী অর্থে বোঝায়। ‘বৌদ্ধ’ অর্থে সাধারণত বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরকে বলা হয়। বুদ্ধ নির্দেশিত বিনয় নীতির ওপর ধর্ম অনুসরণ করে তার জ্ঞান সাধনায় রত থেকে অনুকরণ, অনুশীলন এবং অনুধাবন করে যারা আচরণ করেন তারাই হলেন বৌদ্ধ। জন্মসূত্রে বৌদ্ধ হয় না, কর্মসূত্রেই বৌদ্ধ। বৌদ্ধ একটি সমষ্টিবাচক শব্দ, এই শব্দ দ্বারা একটি পরিবার, সমাজ, সম্প্রদায়, জাতি বোঝায়। কিন্তু বৌদ্ধ জাতিগত অর্থে নয়, জ্ঞান আহরণ অর্থে বোঝায়। বৈশাখি পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে কত বড়ো তাৎপর্যময় তা বোঝাবার নয়। ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ, তার অন্তিমকালে বলেছিলেন ‘হন্দদানি ভিখকবে আমন্তযামি বো, বয়ধম্ম সঙ্খারা অপ্পমাদেনা সম্পাদনার’ অর্থাৎ ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমাদের পুনঃ বলছি, সংস্কার ধর্মসমূহ একান্ত ক্ষয়শীল; তোমরা অপ্রমত্ত
হয়ে স্বীয় কর্তব্য সম্পাদন করো।’ এটাই বুদ্ধের অন্তিম বাণী।
বর্তমান বিশ্বের মধ্যে যে হানাহানি-মারামারি, অস্ত্রের ঝনঝনানি হচ্ছে এবং সেগুলো জীবের সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ দ্বারা সম্পাদন করা হচ্ছে। সেই জন্য মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধের নীতি এখনই অনুসরণ-অনুকরণ এবং অনুশীলনের অতীব প্রয়োজন হয়েছে। তথাগত বুদ্ধ এই ৫টি বাণিজ্য বা ব্যবসা না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন- (১) অস্ত্র ব্যবসা (২) প্রাণী ব্যবসা (৩) নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবসা (৪) বিষ ব্যবসা (৫) মাংস ব্যবসা। এ পাঁচটি বাণিজ্য পরিহার করে সম্যক (সম্যক জীবিকা মানে সঠিক জীবিকা) জীবিকা করার জন্য তথাগত বুদ্ধ তার দেশনায় উপদেশ দিয়েছেন। এই দিনে দান, ধর্মালোচনা, শীল আচরণ ও ধ্যান-সাধনা একাগ্রচিত্তে সম্পাদন করে থাকেন বৌদ্ধ নরনারীর। পরিশেষে দেশের এবং বিশ্বের সব প্রাণীর হিত সুখ ও মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করি, সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। সবাই নিরাপদে অবস্থান করুক। অশান্ত বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক, জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাঙামাটি]

শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ মে ২০২৬
আজ শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা, ২৫৭০ বুদ্ধাব্দ। তাই সবাইকে শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার মৈত্রীময় শুভেচ্ছা জানাই। সেই সঙ্গে বিশ্ববাসী রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে উদাত্ত আহ্বান জানাই যে, বিশ্বে যে অস্ত্রের ঝনঝনানির ব্যবহার চলছে তা পরিহার করে যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই, হিংসা নয়, মৈত্রী চাই এই জিনিসটি নিজের মনের মধ্যে সঠিকভাবে অনুধাবন-অনুকরণ এবং অনুশীলনের দ্বারা প্রয়োগ করা হলে তাহলে সর্বসাধারণের কাছে শান্তির বার্তা পৌঁছে দিতে বেশি সময় লাগবে না। এ বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পড়েছে। মহাকারণিক ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ তার এই ধর্মের সর্বোত্তম বাণী হলোÑ ‘সব্ব পাপস্সা অকরণং কুসালস্স উপসম্পদা/ চিত্তা পরিয়োদপনং এতং বুদ্ধানসাসনং’ ধম্মপদ- ১৮৩ অর্থাৎ, সব প্রকার পাপকর্ম না করা, কুশল বা পুণ্য কর্ম সম্পাদন করা এবং নিজ নিজ চিত্ত সুন্দর বা পরিশুদ্ধ করা-এ সবই হলো বুদ্ধগণের অনুশাসন। এটাই হলো মহাকারুণিক ভগবান বুদ্ধের সর্বজনের প্রতি অহিংসার মৈত্রী ভাব।
এ মহান পবিত্র ‘বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা’ বৌদ্ধ বিশ্বেও একটি অন্যান্য ধর্মোসৎসবের দিন।
বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে এক মহান পবিত্রতম দিন। ভগবান তথাগত বুদ্ধ, তার জীবন ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় তিনটি ঘটনাবলি তথা ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যমান জন্ম, বুদ্ধত্ব লাভ, এবং মহাপরিনির্বাণ প্রাপ্ত এই তিনটি ঘটনাকেই নিয়ে বৈশাখি পূর্ণিমা বা বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে তথা বিশ্বের প্রধান দেশে এই দিনটি-কে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ সহকারে উদ্?যাপন করে আসছে।
জাতিসংঘ ২০০০ সালে, আন্তর্জাতিকভাবে ‘ভেসাক ডে’ দিবসটি তার সদর দপ্তর এবং অন্যান্য অফিসে পালন করার প্রস্তাব গ্রহণ করে। মহামানব গৌতম বুদ্ধের জীবনে সংঘটিত ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধ পূর্ণিমাকে ‘ভেসাক ডে’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। সেই থেকে প্রতিবছর যথাযথ মর্যাদা সহকারে উদ্?যাপন ও পালনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে জাতিসংঘ। তারপর থেকেই বিশ্বের প্রধান রাষ্ট্রসমূহে বিপুল সমারোহে এবং জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো সরকারিভাবে এ দিবসটি ভেসাক ডে পালন করছে। জগতে মহাপুরুষের আবির্ভাব অত্যন্ত দুর্লভ। শুভ বৈশাখি পূর্ণিমায় তৎকালীন ভারতবর্ষেও কপিলাবস্তুর লুম্বিনী কাননে শালবৃক্ষের তলায় রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্ম। তখনি সিদ্ধার্থ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরপরই সপ্ত পদ হেঁটে উদাত্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন ‘জেট ঠোহস্মিং সেট্ ঠোহস্মিং অয়মন্তিমা জাতিসংঘ’ অর্থাৎ আমিই জোষ্ট, আমিই শ্রেষ্ঠ, এবং এটাই আমার অন্তিম জন্ম। এছাড়াও এ ঐতিহাসিক বর্ষে শুভ বৈশাখি পূর্ণিমা তিথিতে রাজ কুমার সিদ্ধার্থের জন্মসহ একই সঙ্গে তথাগত বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ, সাস্ত্রী কালুদায়ী, সহধর্মিণী যশোধরা, সারথি চন্দক, বেগবান, অশ্ব কনক, চারিনিধিকুম্ভ, বিজ্ঞান লাভের মহাবোধি বৃক্ষ, বুদ্ধত্ব লাভ এবং মহপরিনির্বাণ প্রাপ্ত। তাই বিশ্বের বৌদ্ধ সমাজে বৈশাখি পূর্ণিমার গুরুত্ব ব্যাপক তাৎপর্যপূর্ণ। ঋতুর মধ্যে প্রধান হলোÑ বসন্ত, তাই বসন্তকে ঋতুরাজ বলে থাকে। তিথির মধ্যেও পূর্ণিমা শ্রেষ্ঠ। মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধ এই বৈশাখি পূর্ণিমার তিথিতেই তার জন্ম-বুদ্ধত্ব লাভ-মহাপরিনির্বাণ লাভ করেন। সেই বৈশাখি পূর্ণিমায় ভগবান তথাগত বুদ্ধের ত্রি-স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা পরিলক্ষিত হয়। চারটি সত্যের কথা ভগবান বুদ্ধ প্রচার করে গেছেন। সেই চার সত্যকে বলা হয় চার আর্যসত্য। যথা: দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায়। দুঃখ নিরোধের উপায় হিসেবে ৮টি পথ নির্দেশ করেছেন। সেই আট পথকে বলা হয় আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ। এগুলো হলো: সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা, সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি ও সম্যক সমাধি। বুদ্ধ প্রবর্তিত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মধ্যমপন্থা। পন্থা মানে হলো পথ। এই পন্থা একদিকে ভোগ-সুখময় এবং অন্যদিকে কঠোর তপস্যাময় জীবন থেকে সরিয়ে মানুষকে শান্তির পথে, জ্ঞানমার্গে,
প্রজ্ঞার পথে, বোধি লাভের পথে, পরম সুখ নির্বাণ লাভের পথে পরিচালিত করে। মধ্যমপন্থা প্রকৃতপক্ষে একটি নৈতিক বিধান, সব মানুষের কাছে যা গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। সম্যক জীবনাচরণের ওপর বিশেষভাবে জোর দিয়েছিলেন বুদ্ধ। জগতের অনিত্যতা সম্পর্কে জ্ঞান অনুধাবন করলেই মানুষ দুঃখ থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে। ‘বুদ্ধ’ ও ‘বৌদ্ধ’ শব্দ দ্বারা অনেকেই বিভ্রান্তিতে পড়েন। ‘বুদ্ধ’ বলতে জ্ঞানচক্ষু, জ্ঞানলোকে,
প্রাজ্ঞ, প্রবুদ্ধ, সম্বুদ্ধ, পরমজ্ঞান, জ্ঞানী অর্থে বোঝায়। ‘বৌদ্ধ’ অর্থে সাধারণত বুদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরকে বলা হয়। বুদ্ধ নির্দেশিত বিনয় নীতির ওপর ধর্ম অনুসরণ করে তার জ্ঞান সাধনায় রত থেকে অনুকরণ, অনুশীলন এবং অনুধাবন করে যারা আচরণ করেন তারাই হলেন বৌদ্ধ। জন্মসূত্রে বৌদ্ধ হয় না, কর্মসূত্রেই বৌদ্ধ। বৌদ্ধ একটি সমষ্টিবাচক শব্দ, এই শব্দ দ্বারা একটি পরিবার, সমাজ, সম্প্রদায়, জাতি বোঝায়। কিন্তু বৌদ্ধ জাতিগত অর্থে নয়, জ্ঞান আহরণ অর্থে বোঝায়। বৈশাখি পূর্ণিমা বৌদ্ধ সমাজে কত বড়ো তাৎপর্যময় তা বোঝাবার নয়। ভগবান তথাগত সম্যক সম্বুদ্ধ, তার অন্তিমকালে বলেছিলেন ‘হন্দদানি ভিখকবে আমন্তযামি বো, বয়ধম্ম সঙ্খারা অপ্পমাদেনা সম্পাদনার’ অর্থাৎ ‘হে ভিক্ষুগণ, তোমাদের পুনঃ বলছি, সংস্কার ধর্মসমূহ একান্ত ক্ষয়শীল; তোমরা অপ্রমত্ত
হয়ে স্বীয় কর্তব্য সম্পাদন করো।’ এটাই বুদ্ধের অন্তিম বাণী।
বর্তমান বিশ্বের মধ্যে যে হানাহানি-মারামারি, অস্ত্রের ঝনঝনানি হচ্ছে এবং সেগুলো জীবের সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ দ্বারা সম্পাদন করা হচ্ছে। সেই জন্য মহাকারুণিক তথাগত বুদ্ধের নীতি এখনই অনুসরণ-অনুকরণ এবং অনুশীলনের অতীব প্রয়োজন হয়েছে। তথাগত বুদ্ধ এই ৫টি বাণিজ্য বা ব্যবসা না করার নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন- (১) অস্ত্র ব্যবসা (২) প্রাণী ব্যবসা (৩) নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবসা (৪) বিষ ব্যবসা (৫) মাংস ব্যবসা। এ পাঁচটি বাণিজ্য পরিহার করে সম্যক (সম্যক জীবিকা মানে সঠিক জীবিকা) জীবিকা করার জন্য তথাগত বুদ্ধ তার দেশনায় উপদেশ দিয়েছেন। এই দিনে দান, ধর্মালোচনা, শীল আচরণ ও ধ্যান-সাধনা একাগ্রচিত্তে সম্পাদন করে থাকেন বৌদ্ধ নরনারীর। পরিশেষে দেশের এবং বিশ্বের সব প্রাণীর হিত সুখ ও মঙ্গলার্থে প্রার্থনা করি, সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করুন। সবাই নিরাপদে অবস্থান করুক। অশান্ত বিশ্বে শান্তি বর্ষিত হোক, জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।
[লেখক: প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, তুরুক্কে লতা মেমোরিয়াল বই’য়ো বাআ (লাইব্রেরি), রাঙামাটি]

আপনার মতামত লিখুন