সংবাদ

মতামত

সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি

অর্থনৈতিক উন্নয়নের আলোচনায় সাধারণত মূলধন গঠন, শিল্পায়ন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিংবা প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মতো কারিগরি পরিভাষাগুলো প্রাধান্য পায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা আবার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও জবাবদিহিতার ওপর জোর দেন। তবে এই সমস্ত কাঠামোগত ধারণার গভীরে একটি মৌলিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা নিহিত থাকে—তা হলো ‘আস্থা’। নাগরিকরা যখন বিশ্বাস করেন যে তাদের করের টাকা জনকল্যাণে ব্যয় হবে, বিনিয়োগকারীরা যখন চুক্তির সুরক্ষার নিশ্চয়তা পান, আর শ্রমিকরা যখন বিশেষাধিকারের বদলে যোগ্যতার মূল্যায়ন দেখেন, তখনই উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি তৈরি হয়। আস্থার এই মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ভিত্তিকেই বলা যায় ‘সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি’। শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ‘নৈতিক অর্থনীতি’ হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার একটি অলিখিত সামাজিক চুক্তি। এই চুক্তির অধীনেই সরকার কর আদায় করে এবং জনসম্পদ পরিচালনার বৈধতা পায়, যার মূল শর্ত হলো এই ক্ষমতার ব্যবহার হবে জনকল্যাণে। যখন এই সামাজিক চুক্তি লঙ্ঘিত হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা সংকটে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অগ্রগতি থমকে দাঁড়ায়। বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্যায়নে দেখা যায়, সুশাসন কেবল কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং এটি একটি দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ। শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসম্পন্ন দেশগুলো ভৌত অবকাঠামোসর্বস্ব দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। বিশ্বব্যাংকের ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্নেন্স ইন্ডিকেটরস’ ধারাবাহিকভাবে প্রমাণ করেছে যে, সরকারি কার্যকারিতা, আইনের শাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার মতো সূচকগুলোর সঙ্গে একটি দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যয় হ্রাস এবং অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অর্জন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। দেশটি একটি ভঙ্গুর দশা থেকে ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জিডিপিসহ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, নারী শিক্ষা এবং তৈরি পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী সাফল্য এর অন্যতম উদাহরণ। তবে এই অর্জনকে ধরে রেখে উচ্চ-মধ্যম আয়ের স্তরে পৌঁছানোর পথে সবচেয়ে বড় কাঠামোগত বাধা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সুশাসনের ঘাটতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ‘দুর্নীতি ধারণা সূচক ২০২৫’ (যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত)-এ বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪, যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক নিচে। এই সূচককে কেবল একটি ‘ধারণা’ বলে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই, কারণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারী এবং ঋণদাতারা পুঁজি বিনিয়োগের আগে এই সুশাসনের ঝুঁকিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করেন। ফলে, দুর্নীতির এই নেতিবাচক ধারণা সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্নীতিকে কেবল নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখলে এর পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝা যাবে না; এটি মূলত একটি বড় অর্থনৈতিক বিকৃতি। দুর্নীতি উৎপাদনশীল খাত থেকে সম্পদ সরিয়ে নেয় এবং সরকারি প্রকল্পের ব্যয় অন্যায়ভাবে বাড়িয়ে দেয়। দুর্নীতির কারণে অপচয় হওয়া প্রতিটি টাকা আসলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং জলবায়ু অভিযোজনের মতো অতি জরুরি খাতগুলোর বরাদ্দে টান ফেলে। এর চেয়েও বড় ক্ষতি হলো, এটি বাজারে এমন একটি অনিশ্চয়তা তৈরি করে যা দীর্ঘমেয়াদী দেশীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা, যাদের রাজনৈতিক প্রভাব বা বাড়তি পুঁজি নেই, তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যখন মেধার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা প্রভাব খাটিয়ে বাজারে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হয়, তখন উদ্ভাবনী শক্তি নষ্ট হয় এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা স্থবির হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ আর্থিক প্রবাহ বা অর্থ পাচার। ভুল চালান, কর ফাঁকি এবং মুনাফা স্থানান্তরের মাধ্যমে প্রতি বছর দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ বাইরে চলে যাচ্ছে। এই বহিঃপ্রবাহ রাষ্ট্রকে তার অপরিহার্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছে, যা অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণকে দুর্বল করে এবং সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ক্ষতিকর বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সামষ্টিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা হলো জিডিপির তুলনায় করের অত্যন্ত নিম্ন অনুপাত, যা এশিয়ার মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও কর আদায়ের হার আশানুরূপ বাড়েনি। এর মূল কারণও সুশাসনের সংকট। কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের অভাব এবং করদাতাদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কর পরিপালনকে ব্যাহত করে। নাগরিকরা যখন দেখেন যে তাদের করের টাকা স্বচ্ছতার সঙ্গে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে না, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা বা অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি বৃদ্ধি পায়। একইভাবে, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সুশাসনের চরম ঘাটতি দৃশ্যমান। প্রকল্পের ভুল নির্বাচন, কেনাকাটায় অনিয়ম, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল তদারকি সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে। অবকাঠামো খাতে (যেমন পরিবহন ও জ্বালানি প্রকল্প) ব্যাপক বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন হলেও, তা যদি অর্থনৈতিক যৌক্তিকতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীস্বার্থের ভিত্তিতে হয়, তবে তা উৎপাদনশীল সম্পদ না হয়ে উল্টো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল ঋণের বোঝা বা দায়ে পরিণত হয়। বাংলাদেশের আর্থিক খাত, বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত দীর্ঘকাল ধরে সুশাসনের অভাবে ভুগছে। একটি সুস্থ অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলো সঞ্চয় সংগ্রহ করে তা উৎপাদনশীল খাতে বরাদ্দ করে। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল ঋণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং তদারকির অভাবে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। খেলাপি ঋণের এই সংস্কৃতি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে এবং প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সংকুচিত করছে। আর্থিক খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ ও সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে দিচ্ছে। এই শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে কার্যকর করতে আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো দক্ষ জনপ্রশাসন ও স্বাধীন বিচার বিভাগ। জনপ্রশাসনে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও চুক্তি কার্যকরের জন্য আইনের শাসন এবং একটি পূর্বাভাসযোগ্য আইনি পরিবেশ অপরিহার্য। বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অনিশ্চয়তা ব্যবসার লেনদেন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আধুনিক প্রযুক্তি বা ডিজিটাল শাসন একটি বড় হাতিয়ার হতে পারে। ইলেকট্রনিক সরকারি ক্রয় ব্যবস্থা, অনলাইন কর প্রশাসন এবং ডিজিটাল লাইসেন্সিং ব্যবস্থা মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ কমিয়ে দুর্নীতির সুযোগ অনেকাংশে হ্রাস করে। বাংলাদেশ ডিজিটালাইজেশনে অনেক দূর এগিয়ে গেলেও শুধু প্রযুক্তি দিয়ে সব সংকট সমাধান সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা। এখানেই গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা অনস্বীকার্য। স্বাধীন সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং সচেতন নাগরিকদের ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে বাধ্য করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কখনোই স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না, একে নাগরিক সক্রিয়তার মাধ্যমে অর্জন করতে হয়। উন্নয়নের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সম্ভাবনা উভয়ই সমান। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈশ্বিক বাজারে একীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এমন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন যা জটিলতা সামলাতে এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর ইতিহাস দেখায় যে, সুশাসন সংস্কার একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন সুদৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অখণ্ডতা। সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়; এটি সমাজ ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার এক বাস্তবসম্মত পথরেখা। টেকসই উন্নয়নের পথ শুধু উচ্চতর প্রবৃদ্ধির হার বা বড় বাজেটের চটকদার সংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত রয়েছে স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং জনস্বার্থের প্রতি অবিচল অঙ্গীকারের মধ্যে। (লেখকের নিজস্ব মত)[লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী]

সুশাসনের নৈতিক অর্থনীতি