বেশ ক’দিন ধরে গ্রামের বাড়িতে আছি। প্রকৃতি ভীষণ বেজার। দিনভর ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। গাছপালা, পত্রপল্লব যেন স্নাত-স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। গাঢ় সবুজে শোভিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। সূর্যালোকের টানা অনুপস্থিতির কারণে ছোট ছোট পথে-ঘাটের ওপর খানিক জলাবদ্ধতা লেগেছে। এটা বর্ষা আর আষাঢ়ের চিরচেনা রূপ। আষাঢ় আসবে আবার নিভৃতে চলে যাবে, তা কী করে হয়? বাদলের ধারা বিহীন আষাঢ় শ্রাবণের কী মূল্য আছে ?
রাজধানী শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতাকে পেছনে রেখে হঠাৎ করে গ্রামে এসে আশ্রয় নিই। সেখানে স্বপ্রতিষ্ঠিত কলেজের পাঠদান বিষয়ে খোঁজ নিই, অফিসে বসে পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রাখি, না হয় লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকি। এটা অনেকদিন যাবৎ করে চলেছি। নিভৃতচারী নিঃসঙ্গতা জয়ের জন্যে এর চেয়ে নিরাপদ আর কোনো মাধ্যম নেই। গ্রামে জন্ম, গ্রামে বেড়ে ওঠা এবং গ্রাম অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবে আর যাবই বা কোথায়? শহুরে নাগরিক জীবনের একগুঁয়েমির বিকল্প হল বিদেশ-বিভূঁই থেকে ঘুরে আসা। কিন্তু অনেকের জন্যে গ্রামই এর বিকল্প। তাছাড়া বিদেশে যাবার সুযোগ ও সামর্থ ক’জনের থাকে? বিদেশ ভ্রমণ মানে সহজ বিষয় নয়, চাইলেন আর যাত্রা করলেন। এমন সুবিধা বিশেষ কিছু মানুষের থাকলেও সকলের নয়। ভিসা, টিকিট, ফ্লাইট ইত্যাদি পেতে শত ঝামেলা পোহাতে হবে। আবার সবকিছু ঠিক করে বিমান বন্দর বা স্থল বন্দর যেখানেই গেলেন না কেন, শতভাগ গ্যারান্টি কোথায় আপনি সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন? আপনি হয়তো কিছুই জানেন না, হঠাৎ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আপনাকে বলা হল, ‘সরি স্যার, ইউ আর নট অ্যালাউড টু মুভ আউট। কারো কিছু করার নেই। সবাই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে। উপরন্তু, মিডিয়া কোনো কর্মীর নজরে পড়লে তো বাইরের সকলকে জানানোর দায়িত্ব সে একাই নিয়ে নিবে। সুতরাং স্বদেশের ভেতরে থাকুন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বলয়ে থাকুন, পারলে যৎকিঞ্চিত সমাজকর্ম করুন, আপনজনের সান্নিধ্যে সময় কাটান। দেখবেন দেশের সবকিছু সহনীয়।
২.
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে। শুরুর আগেই গ্রামে চলে আসি। ফুটবল বাঙালির আজন্ম শখের খেলা। গত এক শতাব্দীর হিসাবে সকল খেলাকে ছাপিয়ে ফুটবলই শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। জনপ্রিয়তার বিচারে ইউরোপের পরে এশিয়ার স&হান হলেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফ্যান, সমর্থকের দীর্ঘতম পতাকা, বৃহত্তম ফুটবল, বিচিত্র জার্সি, আনন্দ মিছিল, উল্লাসের মহোৎসব যতসব নজরকাড়া রেকর্ড বাঙালিরাই বেশি করছে। এখন গ্রামও এমন উন্মাদনার বাইরে নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড, ইতালির বাইরের দেশের নাম অনেকেই জানে না। কিন্তু বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের নাম সকলের জানা। এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ হয়নি এমন অনেক গ্রামীণ তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের আদ্যান্ত জানে। এমনকি এদের ক্লাবের নাম এবং ফুটবলের ইতিহাসও বলতে পারে। এর জন্যে এককভাবে ধন্যবাদ পাবে এদের হাতের শোভা এন্ড্রয়েড ফোন। এরা ফোনেও খেলার হালনাগাদ তথ্য কণিকা মুখস্থ করে চলেছে। গত দু'দিন ধরে সকলের মুখে মুখে লিওনেল মেসির নাম। বলা যায়, গোটা পৃথিবী এখন মেসিময়। ইতোমধ্যেই হ্যাট্রিক করা আর্জেন্টাইন এ তারকা বয়সের বিচারে ও বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এক খেলোয়াড়ের নাম। ফুটবল ইতিহাসের অতীতে গড়া রেকর্ডসমূহকে অবলীলায় পদদলিত করার এক সুবর্ণ সুযোগও এখন তার নাগালের ভেতরে। সবকিছু যথারীতি চললে মেসি কোথায় গিয়ে থামবে তা কেবল তার সময়ই বলতে পারবে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, গ্রামের ফুটবল প্রেমীরা আরও অনেক খ্যাতিমান ফুটবল তারকার নাম জানে। তারা রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার জুনিয়র এমনকি অখ্যাত এক দেশের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিয়ানের নামও জানে।
৩.
মনে পড়ে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দু’বার খেলা দেখার আনন্দ বেদনার কথা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র ছিলাম। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ ছিল। ১৯৮৬ সালেও সেই ছাত্রত্ব বহাল ছিল। দুটো বিশ্বকাপের বেশ ক'টি ম্যাচ দেখেছিলাম মুহসীন হলের টিভি রুমের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে। তখন উচ্ছ্বসিত উত্তেজনায় ফেটে পড়েছিল সবার তারুণ্য। সামনের চেয়ারে আসন পাওয়ার জন্যে চাবি রেখে স্থান দখলে নেয়ার কারণে প্রথমে কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি এমনকি দুয়েকজন বন্ধু সহপাঠী শারিরীকভাবে লাঞ্চনারও শিকার হয়েছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৮২ সালেই বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম সাদাকালো টিভিতে। তবে সবচেয়ে জমজমাট বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো উপভোগ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে। তখন গোটা পৃথিবী সন্মোহিত হয়ে পড়েছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার যাদুতে। সেই থেকে আর্জেন্টিনা নামক দেশ এবং ম্যারাডোনা সমার্থক হয়ে ওঠে। তার দেয়া সেই বিতর্কিত গোল যাকে তিনি ‘ঈশ্বরের হাতে’ বলেছিলেন। মাঠের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আমরা লাইভ দেখেছিলাম। সে হিসেবে আমাদের প্রজন্মকে অধিকতর ভাগ্যবান বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তার সে গোলকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
মনে হয়, আজকের বিশ্ব ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা ম্যারাডোনারই সৃষ্টি। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরেই দেশটি বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩৬ বছর। এখন মুখ্যত আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত গোটা দুনিয়া।
৪.
গ্রামে গ্রামে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গল্প গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।
কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার পদে লড়বেন তা নিয়ে চায়ের দোকানে সকাল সন্ধ্যায় সংসদ বসছে, ভাঙছে, মুলতবী হচ্ছে। আলোচ্য বিষয়, দলীয় নেতা কর্মীদের প্রার্থীতা, দলীয় প্রতীক হবে কিনা, সকল দল নির্বাচন করতে পারবে কিনা ইত্যাদি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মী নির্বাচনে সুযোগ পাবে কিনা এটা বড় এক ইস্যু। এ প্রসঙ্গ সামনে আসছে মূলত বর্তমান সরকারের দু’একজন মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতার মন্তব্যের সূত্র ধরে। একই সঙ্গে কয়েকজন তারকা টকশো ওয়ালার সাহসী বক্তব্যও এমন আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
তবে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিপক্ষে একটা জনমত রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই চায় নির্বাচনে যেন সরকারি দল সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে। এর ফল পূর্বে যেমন ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও বিতর্কের জন্ম দিবে, সাধারণ মানুষকে হতাশ করবে।
তারা চায় গ্রামের অবিতর্কিত দুর্নীতিমুক্ত ভালো মানুষ নির্বাচিত হয়ে আসুক। এর জন্যে দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন হওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। আর যদি নিকট অতীতের সংস্কৃতির চর্চায় সবাই মনোযোগী হয়ে ওঠে তাতে জনগণের কিছু আসবে যাবে না। মঙ্গল অমঙ্গল, শুভ অশুভের দায় যাবে সরকারের ঘাড়ে। কাজেই স&হানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটা সরকারের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রকাশ। আসন্ন স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও ভালো মানুষ চেনার নির্বাচন হোক।
[লেখক: গল্পকার]

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
বেশ ক’দিন ধরে গ্রামের বাড়িতে আছি। প্রকৃতি ভীষণ বেজার। দিনভর ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়ছে। গাছপালা, পত্রপল্লব যেন স্নাত-স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। গাঢ় সবুজে শোভিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। সূর্যালোকের টানা অনুপস্থিতির কারণে ছোট ছোট পথে-ঘাটের ওপর খানিক জলাবদ্ধতা লেগেছে। এটা বর্ষা আর আষাঢ়ের চিরচেনা রূপ। আষাঢ় আসবে আবার নিভৃতে চলে যাবে, তা কী করে হয়? বাদলের ধারা বিহীন আষাঢ় শ্রাবণের কী মূল্য আছে ?
রাজধানী শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতাকে পেছনে রেখে হঠাৎ করে গ্রামে এসে আশ্রয় নিই। সেখানে স্বপ্রতিষ্ঠিত কলেজের পাঠদান বিষয়ে খোঁজ নিই, অফিসে বসে পুরনো বইয়ের পৃষ্ঠায় চোখ রাখি, না হয় লেখালেখিতে নিমগ্ন থাকি। এটা অনেকদিন যাবৎ করে চলেছি। নিভৃতচারী নিঃসঙ্গতা জয়ের জন্যে এর চেয়ে নিরাপদ আর কোনো মাধ্যম নেই। গ্রামে জন্ম, গ্রামে বেড়ে ওঠা এবং গ্রাম অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবে আর যাবই বা কোথায়? শহুরে নাগরিক জীবনের একগুঁয়েমির বিকল্প হল বিদেশ-বিভূঁই থেকে ঘুরে আসা। কিন্তু অনেকের জন্যে গ্রামই এর বিকল্প। তাছাড়া বিদেশে যাবার সুযোগ ও সামর্থ ক’জনের থাকে? বিদেশ ভ্রমণ মানে সহজ বিষয় নয়, চাইলেন আর যাত্রা করলেন। এমন সুবিধা বিশেষ কিছু মানুষের থাকলেও সকলের নয়। ভিসা, টিকিট, ফ্লাইট ইত্যাদি পেতে শত ঝামেলা পোহাতে হবে। আবার সবকিছু ঠিক করে বিমান বন্দর বা স্থল বন্দর যেখানেই গেলেন না কেন, শতভাগ গ্যারান্টি কোথায় আপনি সীমান্ত অতিক্রম করতে পারবেন? আপনি হয়তো কিছুই জানেন না, হঠাৎ ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে আপনাকে বলা হল, ‘সরি স্যার, ইউ আর নট অ্যালাউড টু মুভ আউট। কারো কিছু করার নেই। সবাই নীরব দর্শক হয়ে থাকবে। উপরন্তু, মিডিয়া কোনো কর্মীর নজরে পড়লে তো বাইরের সকলকে জানানোর দায়িত্ব সে একাই নিয়ে নিবে। সুতরাং স্বদেশের ভেতরে থাকুন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বলয়ে থাকুন, পারলে যৎকিঞ্চিত সমাজকর্ম করুন, আপনজনের সান্নিধ্যে সময় কাটান। দেখবেন দেশের সবকিছু সহনীয়।
২.
২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হয়েছে। শুরুর আগেই গ্রামে চলে আসি। ফুটবল বাঙালির আজন্ম শখের খেলা। গত এক শতাব্দীর হিসাবে সকল খেলাকে ছাপিয়ে ফুটবলই শীর্ষ স্থান দখল করে আছে। জনপ্রিয়তার বিচারে ইউরোপের পরে এশিয়ার স&হান হলেও বাংলাদেশ সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। ফ্যান, সমর্থকের দীর্ঘতম পতাকা, বৃহত্তম ফুটবল, বিচিত্র জার্সি, আনন্দ মিছিল, উল্লাসের মহোৎসব যতসব নজরকাড়া রেকর্ড বাঙালিরাই বেশি করছে। এখন গ্রামও এমন উন্মাদনার বাইরে নয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানী, স্পেন, ইংল্যান্ড, ইতালির বাইরের দেশের নাম অনেকেই জানে না। কিন্তু বিশ্বের তারকা ফুটবলারদের নাম সকলের জানা। এটা এক বিস্ময়কর ব্যাপার যে, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার সুযোগ হয়নি এমন অনেক গ্রামীণ তরুণ আন্তর্জাতিক ফুটবলারদের আদ্যান্ত জানে। এমনকি এদের ক্লাবের নাম এবং ফুটবলের ইতিহাসও বলতে পারে। এর জন্যে এককভাবে ধন্যবাদ পাবে এদের হাতের শোভা এন্ড্রয়েড ফোন। এরা ফোনেও খেলার হালনাগাদ তথ্য কণিকা মুখস্থ করে চলেছে। গত দু'দিন ধরে সকলের মুখে মুখে লিওনেল মেসির নাম। বলা যায়, গোটা পৃথিবী এখন মেসিময়। ইতোমধ্যেই হ্যাট্রিক করা আর্জেন্টাইন এ তারকা বয়সের বিচারে ও বিশ্বকাপ ফুটবলের অভিজ্ঞতায় বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আলোচিত এক খেলোয়াড়ের নাম। ফুটবল ইতিহাসের অতীতে গড়া রেকর্ডসমূহকে অবলীলায় পদদলিত করার এক সুবর্ণ সুযোগও এখন তার নাগালের ভেতরে। সবকিছু যথারীতি চললে মেসি কোথায় গিয়ে থামবে তা কেবল তার সময়ই বলতে পারবে। লক্ষ্য করার বিষয় যে, গ্রামের ফুটবল প্রেমীরা আরও অনেক খ্যাতিমান ফুটবল তারকার নাম জানে। তারা রোনালদো, কিলিয়ান এমবাপ্পে, নেইমার জুনিয়র এমনকি অখ্যাত এক দেশের ৪০ বছর বয়সী গোলকিপার ভোজিয়ানের নামও জানে।
৩.
মনে পড়ে, বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে দু’বার খেলা দেখার আনন্দ বেদনার কথা। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষ সম্মানের ছাত্র ছিলাম। সাদাকালো টেলিভিশনের যুগ ছিল। ১৯৮৬ সালেও সেই ছাত্রত্ব বহাল ছিল। দুটো বিশ্বকাপের বেশ ক'টি ম্যাচ দেখেছিলাম মুহসীন হলের টিভি রুমের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে। তখন উচ্ছ্বসিত উত্তেজনায় ফেটে পড়েছিল সবার তারুণ্য। সামনের চেয়ারে আসন পাওয়ার জন্যে চাবি রেখে স্থান দখলে নেয়ার কারণে প্রথমে কথা কাটাকাটি, হাতাহাতি এমনকি দুয়েকজন বন্ধু সহপাঠী শারিরীকভাবে লাঞ্চনারও শিকার হয়েছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, ১৯৮২ সালেই বিশ্বকাপ ফুটবল সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছিল। আমরা দেখেছিলাম সাদাকালো টিভিতে। তবে সবচেয়ে জমজমাট বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচগুলো উপভোগ করেছিলাম ১৯৮৬ সালে। তখন গোটা পৃথিবী সন্মোহিত হয়ে পড়েছিল দিয়াগো ম্যারাডোনার যাদুতে। সেই থেকে আর্জেন্টিনা নামক দেশ এবং ম্যারাডোনা সমার্থক হয়ে ওঠে। তার দেয়া সেই বিতর্কিত গোল যাকে তিনি ‘ঈশ্বরের হাতে’ বলেছিলেন। মাঠের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি আমরা লাইভ দেখেছিলাম। সে হিসেবে আমাদের প্রজন্মকে অধিকতর ভাগ্যবান বলা যেতে পারে। পরবর্তীতে তার সে গোলকে ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছিল।
মনে হয়, আজকের বিশ্ব ফুটবল এবং আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তা ম্যারাডোনারই সৃষ্টি। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার হাত ধরেই দেশটি বিশ্বকাপ জিতেছিল। তারপর তাদেরকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ৩৬ বছর। এখন মুখ্যত আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল শিবিরে বিভক্ত গোটা দুনিয়া।
৪.
গ্রামে গ্রামে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গল্প গুজবের ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।
কে চেয়ারম্যান, কে মেম্বার পদে লড়বেন তা নিয়ে চায়ের দোকানে সকাল সন্ধ্যায় সংসদ বসছে, ভাঙছে, মুলতবী হচ্ছে। আলোচ্য বিষয়, দলীয় নেতা কর্মীদের প্রার্থীতা, দলীয় প্রতীক হবে কিনা, সকল দল নির্বাচন করতে পারবে কিনা ইত্যাদি। বিশেষ করে নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সমর্থক বা কর্মী নির্বাচনে সুযোগ পাবে কিনা এটা বড় এক ইস্যু। এ প্রসঙ্গ সামনে আসছে মূলত বর্তমান সরকারের দু’একজন মন্ত্রী এবং রাজনৈতিক নেতার মন্তব্যের সূত্র ধরে। একই সঙ্গে কয়েকজন তারকা টকশো ওয়ালার সাহসী বক্তব্যও এমন আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
তবে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিপক্ষে একটা জনমত রয়েছে। অধিকাংশ মানুষই চায় নির্বাচনে যেন সরকারি দল সরাসরি হস্তক্ষেপ না করে। এর ফল পূর্বে যেমন ভালো হয়নি, ভবিষ্যতেও বিতর্কের জন্ম দিবে, সাধারণ মানুষকে হতাশ করবে।
তারা চায় গ্রামের অবিতর্কিত দুর্নীতিমুক্ত ভালো মানুষ নির্বাচিত হয়ে আসুক। এর জন্যে দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে একটা উৎসবমুখর নির্বাচন হওয়ার আর কোনো বিকল্প নেই। আর যদি নিকট অতীতের সংস্কৃতির চর্চায় সবাই মনোযোগী হয়ে ওঠে তাতে জনগণের কিছু আসবে যাবে না। মঙ্গল অমঙ্গল, শুভ অশুভের দায় যাবে সরকারের ঘাড়ে। কাজেই স&হানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাধ্যম নয়, এটা সরকারের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ও পরমত সহিষ্ণুতার প্রকাশ। আসন্ন স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ ও ভালো মানুষ চেনার নির্বাচন হোক।
[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন