মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম সম্ভবত এই যে, সে ক্ষয়কে ধ্বংস বলে মনে করে। যা হারিয়ে যায়, তাকে সে অনুপস্থিতির অন্ধকারে নির্বাসিত করে; যা ভেঙে পড়ে, তাকে সে সমাপ্তির সমার্থক ভাবতে শেখে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম ভাষা আমাদের অন্য এক সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে পতন মানে অবসান নয়, বরং রূপান্তর; শূন্যতা মানে নিঃশেষ নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত এক নীরব অবকাশ।
জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা ধরা যায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বাইরের কোনো প্রাচীর নয়; বরং অন্তরের ধূলিকতা। এই ধূলি জমে থাকে অভ্যাসের অন্ধত্বে, অহংকারের আবরণে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের স্তরে, এবং সেইসব মোহে, যাদের আমরা সত্য বলে আঁকড়ে ধরি। ধূলির স্বভাবই হলো দৃষ্টিকে মলিন করা। সে পথকে পরিবর্তন করে না, কিন্তু পথ দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষ পথ হারায় না, হারায় পথ চিনবার সামর্থ্য।
এই কারণেই জীবনের বহু প্রতিকূলতা, যেগুলোকে আমরা অভিশাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো এক একটি পরিশোধনের আয়োজন। সময় কখনো কখনো এমন নির্মমতার মুখোশ পরে আসে, যা আমাদের প্রিয় সব নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ ভস্মীভূত হয়, অর্জনের অলঙ্কার মলিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা মনে করি, জীবন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু অনেক পরে, দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পর, উপলব্ধি হয়—সময়ের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়; তার উদ্দেশ্য ছিল আবরণ অপসারণ।
প্রকৃতির দিকে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজকে অঙ্কুরিত হতে হলে তার কঠিন আবরণ ভেদ করতে হয়। মুক্তো জন্ম নেয় এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের ভেতর। নদী তার সুর খুঁজে পায় বাঁধ ভাঙার পর। এমনকি নক্ষত্রও আলো ছড়ানোর পূর্বে অগণিত অভ্যন্তরীণ দহন অতিক্রম করে। সৃষ্টির ইতিহাস আসলে রূপান্তরের ইতিহাস; আর রূপান্তরের পূর্বশর্ত হলো কোনো না কোনো স্তরে ভাঙন।
কিন্তু মানুষ ভাঙনকে ভয় পায়। কারণ ভাঙন তার পরিচিত সীমানাকে বিপন্ন করে। মানুষ পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে কম ভালোবাসে। সে নিজের নির্মিত কারাগারকে স্বাধীনতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত মনে করে। ফলে যখন জীবনের কোনো অদৃশ্য কারিগর সেই কারাগারের প্রাচীরে আঘাত হানে, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ যে দেয়াল ভেঙে পড়ছে, সেটিই হয়তো আকাশ দেখার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল।
দর্শনের এক গভীর শিক্ষা হলো—অস্তিত্ব কখনো স্থির নয়। সবকিছুই প্রবাহমান। নদী যেমন একই থাকে না, মানুষও তেমনি প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের মন স্থায়িত্বের মায়া সৃষ্টি করে। সে পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে চায়, সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে বিশ্বাস করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অধিকাংশ বেদনা। কারণ জীবন প্রবাহ, আর মানুষ তাকে পাথরে পরিণত করতে চায়।
তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। যখন সমস্ত বাহ্যিক ভরসা একে একে সরে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তর্লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়। কূন্যতা তখন আর ভয়াবহ থাকে না; বরং এক গভীর আয়নায় পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখে—সমাজের দেওয়া পরিচয়ে নয়, অর্জনের অলংকারে নয়, বরং অস্তিত্বের নগ্ন সত্যে।
জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। সে কখনো সরাসরি শিক্ষা দেয় না। সে রূপকের আড়ালে কথা বলে, প্রতীকের অন্তরালে ইঙ্গিত করে। একটি ঝরা পাতা, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী, একটি ভাঙা ঘর কিংবা একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো মহৎ শিক্ষা। যারা কেবল ঘটনাকে দেখে, তারা কষ্ট পায়; যারা ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থকে দেখতে শেখে, তারা প্রজ্ঞা অর্জন করে।
অতএব, জীবনের প্রতিটি হারানোকে অভিশাপ ভাবার আগে আমাদের থেমে ভাবা উচিত—এ কি সত্যিই ক্ষতি, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া? যে দরজা বন্ধ হয়েছে, সেটি কি আমাদের বন্দিত্বের কারণ ছিল না? যে সম্পর্ক চলে গেছে, সেটি কি আমাদের আত্মবিকাশকে থামিয়ে রাখেনি? যে ব্যর্থতা আজ অপমানের মতো মনে হচ্ছে, সেটিই কি আগামী দিনের উপলব্ধির ভিত্তি হয়ে উঠবে না?
সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প সম্ভবত এই যে, সে ধ্বংসের ছদ্মবেশে উন্মোচন ঘটায়। সে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় দেখার নতুন দৃষ্টি। আর একদিন, দীর্ঘ পথচলার শেষে, মানুষ আবিষ্কার করে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো আসলে জন্ম নিয়েছিল সেইসব মুহূর্তে, যেগুলোকে সে একদিন সর্বনাশ বলে ভেবেছিল।
তখন সে বুঝতে শেখে, জীবন কখনো পথ কেড়ে নেয় না; জীবন কেবল পথের ওপর জমে থাকা ধূলি সরিয়ে দেয়। আর সেই ধূলি সরে গেলে দিগন্ত হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্মল, প্রসারিত, আলোকময়।
[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]
সম্পাদিত / অনন্ত
আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন
বাবুল রবিদাস
বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ˆভরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে।
২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।
সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি।
বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬
মানুষের সবচেয়ে বড় ভ্রম সম্ভবত এই যে, সে ক্ষয়কে ধ্বংস বলে মনে করে। যা হারিয়ে যায়, তাকে সে অনুপস্থিতির অন্ধকারে নির্বাসিত করে; যা ভেঙে পড়ে, তাকে সে সমাপ্তির সমার্থক ভাবতে শেখে। অথচ প্রকৃতির গভীরতম ভাষা আমাদের অন্য এক সত্যের দিকে আহ্বান জানায়। সেখানে পতন মানে অবসান নয়, বরং রূপান্তর; শূন্যতা মানে নিঃশেষ নয়, বরং নতুন সৃষ্টির জন্য প্রস্তুত এক নীরব অবকাশ।
জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ পথযাত্রা ধরা যায়, তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বাইরের কোনো প্রাচীর নয়; বরং অন্তরের ধূলিকতা। এই ধূলি জমে থাকে অভ্যাসের অন্ধত্বে, অহংকারের আবরণে, ভ্রান্ত বিশ্বাসের স্তরে, এবং সেইসব মোহে, যাদের আমরা সত্য বলে আঁকড়ে ধরি। ধূলির স্বভাবই হলো দৃষ্টিকে মলিন করা। সে পথকে পরিবর্তন করে না, কিন্তু পথ দেখার ক্ষমতাকে আচ্ছন্ন করে। ফলে মানুষ পথ হারায় না, হারায় পথ চিনবার সামর্থ্য।
এই কারণেই জীবনের বহু প্রতিকূলতা, যেগুলোকে আমরা অভিশাপ মনে করি, প্রকৃতপক্ষে সেগুলো এক একটি পরিশোধনের আয়োজন। সময় কখনো কখনো এমন নির্মমতার মুখোশ পরে আসে, যা আমাদের প্রিয় সব নিশ্চয়তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সম্পর্কের দেয়াল ভেঙে যায়, আকাঙ্ক্ষার প্রাসাদ ভস্মীভূত হয়, অর্জনের অলঙ্কার মলিন হয়ে পড়ে। তখন আমরা মনে করি, জীবন আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। কিন্তু অনেক পরে, দীর্ঘ আত্মসমীক্ষার পর, উপলব্ধি হয়—সময়ের উদ্দেশ্য ধ্বংস নয়; তার উদ্দেশ্য ছিল আবরণ অপসারণ।
প্রকৃতির দিকে তাকালে এই সত্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বীজকে অঙ্কুরিত হতে হলে তার কঠিন আবরণ ভেদ করতে হয়। মুক্তো জন্ম নেয় এক যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতের ভেতর। নদী তার সুর খুঁজে পায় বাঁধ ভাঙার পর। এমনকি নক্ষত্রও আলো ছড়ানোর পূর্বে অগণিত অভ্যন্তরীণ দহন অতিক্রম করে। সৃষ্টির ইতিহাস আসলে রূপান্তরের ইতিহাস; আর রূপান্তরের পূর্বশর্ত হলো কোনো না কোনো স্তরে ভাঙন।
কিন্তু মানুষ ভাঙনকে ভয় পায়। কারণ ভাঙন তার পরিচিত সীমানাকে বিপন্ন করে। মানুষ পরিচয়ের চেয়ে সত্যকে কম ভালোবাসে। সে নিজের নির্মিত কারাগারকে স্বাধীনতার চেয়েও বেশি সুরক্ষিত মনে করে। ফলে যখন জীবনের কোনো অদৃশ্য কারিগর সেই কারাগারের প্রাচীরে আঘাত হানে, তখন সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ যে দেয়াল ভেঙে পড়ছে, সেটিই হয়তো আকাশ দেখার পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় ছিল।
দর্শনের এক গভীর শিক্ষা হলো—অস্তিত্ব কখনো স্থির নয়। সবকিছুই প্রবাহমান। নদী যেমন একই থাকে না, মানুষও তেমনি প্রতিক্ষণে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু মানুষের মন স্থায়িত্বের মায়া সৃষ্টি করে। সে পরিবর্তনকে অস্বীকার করতে চায়, সময়কে থামিয়ে রাখতে চায়, ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী বলে বিশ্বাস করতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় অধিকাংশ বেদনা। কারণ জীবন প্রবাহ, আর মানুষ তাকে পাথরে পরিণত করতে চায়।
তবু বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিগুলো জন্ম নেয় অনিশ্চয়তার ভেতর থেকে। যখন সমস্ত বাহ্যিক ভরসা একে একে সরে যায়, তখনই মানুষ নিজের অন্তর্লোকের সঙ্গে পরিচিত হয়। কূন্যতা তখন আর ভয়াবহ থাকে না; বরং এক গভীর আয়নায় পরিণত হয়। সেখানে মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেকে দেখে—সমাজের দেওয়া পরিচয়ে নয়, অর্জনের অলংকারে নয়, বরং অস্তিত্বের নগ্ন সত্যে।
জীবনের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই। সে কখনো সরাসরি শিক্ষা দেয় না। সে রূপকের আড়ালে কথা বলে, প্রতীকের অন্তরালে ইঙ্গিত করে। একটি ঝরা পাতা, একটি শুকিয়ে যাওয়া নদী, একটি ভাঙা ঘর কিংবা একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে কোনো না কোনো মহৎ শিক্ষা। যারা কেবল ঘটনাকে দেখে, তারা কষ্ট পায়; যারা ঘটনার অন্তর্নিহিত অর্থকে দেখতে শেখে, তারা প্রজ্ঞা অর্জন করে।
অতএব, জীবনের প্রতিটি হারানোকে অভিশাপ ভাবার আগে আমাদের থেমে ভাবা উচিত—এ কি সত্যিই ক্ষতি, নাকি কোনো অদৃশ্য পরিশুদ্ধির প্রক্রিয়া? যে দরজা বন্ধ হয়েছে, সেটি কি আমাদের বন্দিত্বের কারণ ছিল না? যে সম্পর্ক চলে গেছে, সেটি কি আমাদের আত্মবিকাশকে থামিয়ে রাখেনি? যে ব্যর্থতা আজ অপমানের মতো মনে হচ্ছে, সেটিই কি আগামী দিনের উপলব্ধির ভিত্তি হয়ে উঠবে না?
সময়ের সবচেয়ে সূক্ষ্ম শিল্প সম্ভবত এই যে, সে ধ্বংসের ছদ্মবেশে উন্মোচন ঘটায়। সে আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে যায়, কিন্তু তার বিনিময়ে ফিরিয়ে দেয় দেখার নতুন দৃষ্টি। আর একদিন, দীর্ঘ পথচলার শেষে, মানুষ আবিষ্কার করে—তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলো আসলে জন্ম নিয়েছিল সেইসব মুহূর্তে, যেগুলোকে সে একদিন সর্বনাশ বলে ভেবেছিল।
তখন সে বুঝতে শেখে, জীবন কখনো পথ কেড়ে নেয় না; জীবন কেবল পথের ওপর জমে থাকা ধূলি সরিয়ে দেয়। আর সেই ধূলি সরে গেলে দিগন্ত হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নির্মল, প্রসারিত, আলোকময়।
[লেখক: প্রভাষক, সমাজকর্ম, কচুয়া সরকারি ডিগ্রি কলেজ, চাঁদপুর]
সম্পাদিত / অনন্ত
আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন
বাবুল রবিদাস
বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ˆভরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা।
পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে।
২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে।
সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি।
বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে।
[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন