সংবাদ

আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন


বাবুল রবিদাস
বাবুল রবিদাস
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৩:১৫ পিএম

আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন
বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ

বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। 

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। 

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। 

পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। 

২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। 

সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। 

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। 

বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। 

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


আদিবাসী ভূমি অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

বর্তমানে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ শব্দটি রাষ্ট্রীয় ও আইনি পরিসরে বহুল ব্যবহৃত হলেও অনেক সম্প্রদায় নিজেদের পরিচয় হিসেবে ‘আদিবাসী’ শব্দটিকেই অধিক গ্রহণযোগ্য মনে করে। সাধারণভাবে আদিবাসী বলতে সেই জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা দীর্ঘকাল ধরে নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, রীতি-নীতি ও জীবনধারা বহন করে আসছে এবং যাদের ঐতিহ্যগত পরিচয় আজও টিকে আছে। 

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বসতি স্থাপনের জন্য আনা হয়েছিল। তারা বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে অনাবাদি জমিকে কৃষিযোগ্য করে তোলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূমি দখল ও বঞ্চনার নানা ঘটনা তাদের জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে ১৮৫৫-৫৬ সালে সংঘটিত হয় ঐতিহাসিক ‘সাঁওতাল বিদ্রোহ’। ভূমি ও অধিকার রক্ষার দাবিতে সংঘটিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী কঠোরভাবে দমন করে। সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরবসহ বহু নেতা প্রাণ হারান। 

পরবর্তীকালে ব্রিটিশ সরকার ১৮৮৫ সালে বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইন প্রণয়ন করে। এই আইনের ৪৯ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি সুরক্ষার বিষয়ে বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া আদিবাসী মালিকানাধীন জমি হস্তান্তর করা যেত না। অবৈধভাবে সম্পত্তি ক্রয় করা হলে তা বাতিল বলে গণ্য হওয়ার বিধানও ছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষা করা। 

পাকিস্তান আমলে ১৯৫০ সালে প্রণীত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনেও আদিবাসী ভূমি সুরক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এই আইনের ৯৭ ধারায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের জমি হস্তান্তরের বিষয়ে বিশেষ বিধান রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংশোধনী এলেও মূল লক্ষ্য ছিল তাদের ভূমি অধিকার সংরক্ষণ। 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ভূমি সংক্রান্ত এসব আইনি কাঠামোর অনেক অংশ কার্যকর রয়েছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যায়, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে এসেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও সামাজিক সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ভূমি দখল, জটিল আইনি প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে অনেক পরিবার তাদের ঐতিহ্যগত জমি হারিয়েছে। 

২০১০ সালে জাতীয় সংসদে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন পাস করা হয়। এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। তবে এই আইন সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত; ভূমি অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত আইনগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যপরিধি এক নয়। 

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩ (ক) অনুচ্ছেদে উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশে রাষ্ট্রের দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার পাশাপাশি ভূমি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশ্নও সমান গুরুত্ব বহন করে। 

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ বসবাস করে। তাদের জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার একটি ছোট অংশ হলেও দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে ভূমি অধিকার সুরক্ষা, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি এবং একটি কার্যকর ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। 

সম্প্রতি রাজশাহীতে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আদিবাসী নেতারা ভূমি সুরক্ষা, বেদখল জমি পুনরুদ্ধার এবং ভূমি কমিশন গঠনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সরকারি প্রতিনিধিরাও ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। 

১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় আদিবাসী পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে কাজ করে যাচ্ছে। তাদের দাবি, ভূমি, সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হলে বিদ্যমান আইন কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি। 

বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ, ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ জনগোষ্ঠীর ন্যায়সঙ্গত অধিকার নিশ্চিত করা গেলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও সামাজিক সম্প্রীতিকেও আরও শক্তিশালী করবে। 

[লেখক: আইনজীবী, জজ কোর্ট, জয়পুরহাট]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত