গোধূলির নন্দনভাষ্য
পূর্ব প্রকাশের পরপর্ব ২‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামসমান’আলতামিরার অন্ধকার গুহায় যে নামহীন মানুষটি পাথরের গায়ে একটি রেখা টেনে নিজের ক্ষণস্থায়ী জীবনের বাইরে আরেকটি সময় নির্মাণ করেছিল, তারও বহু সহস্র বছর পরে মেসোপটেমিয়ার কোনো এক লিপিকর ভেজা কাদামাটির ফলকের ওপরে কীলকের মতো কয়েকটি চিহ্ন বসাতে শুরু করলেন। গুহার দেয়ালের বাইসনের ছবি আর কাদামাটির ফলকের অক্ষরের মধ্যে সময়ের ব্যবধান এন্তার, অথচ মানুষের আকাঙ্ক্ষার দূরত্ব বিস্ময়করভাবে সামান্যই। গুহা মানবের অভিপ্রায় ছিল দৃশ্যটি যেন হারিয়ে না যায়, লিপিকর চাইলেন কণ্ঠকে। একটি রেখা বলেছিল, আমি দেখেছি; একটি অক্ষর বলল, আমি মনে রেখেছি। এই ‘দেখা’ থেকে ‘মনে রাখা’র যাত্রাই সম্ভবত শিল্পের প্রথম গভীর নন্দনতাত্ত্বিক বিবর্তন। মানুষ যখন দৃশ্যকে চিহ্নে, অভিজ্ঞতাকে আখ্যানে এবং ক্ষণস্থায়ী জীবনকে স্মৃতিতে রূপান্তরিত করে, তখন সে প্রকৃতির অনিবার্য ক্ষয়চক্রের বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। দেহ মাটিতে ফিরে যায়, কিন্তু চিহ্ন কিছুদিন থেকে যেতে পারে— এই আবিষ্কারের মধ্যেই সূচিত হয় শিল্প, সাহিত্য ও সভ্যতার গোপন আত্মীয়তা। আর এই স্মৃতি ও মৃত্যুচেতনার আদিমতম মহাকাব্যিক উচ্চারণগুলোর একটি গিলগামেশ, যেখানে মানুষ সম্ভবত প্রথমবারের মতো সাহিত্যের শৈল্পিক প্রান্তরে দাঁড়িয়ে নিজের মৃত্যুকে নিজেরই প্রশ্নে পরিণত করল: আমাকে যদি অমোঘ মৃত্যুর স্বাদই আস্বাদন করতেই হয়, তবে আমার সমস্ত শক্তি, আমার ক্লান্তি, প্রেম, বন্ধুত্ব, ঘৃণা, ঔদ্ধত্য, নির্মাণের ভাঙচুর, জয়, পরাজয় কিংবা আকাঙ্ক্ষার অর্থ কোথায়?উরুকের রাজা গিলগামেশ শুরুতে ছিলেন এমন এক মানুষ, যে মানুষ নিজের সীমা জ্ঞাত নন। অথচ তার মধ্যে দেবত্বের অংশ আছে, শরীরে রয়েছে অপ্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, সামনে নগরের সুউচ্চ প্রাচীর; কিন্তু এই বাহ্যিক উপলব্ধির গভীরে রয়েছে এক অপ্রশমিত অহং। এখান থেকেই মহাকাব্যটির প্রথম দার্শনিক সূত্রের জন্ম— মানুষের ট্র্যাজেডি তার দুর্বলতা থেকে যতখানি জন্মায়, কখনো কখনো জন্মায় তার সীমাহীন ভ্রম থেকেও। গ্রিকরা পরে এর নাম দিয়েছে hubris, নিজের মানবিক সীমাকে অগ্রাহ্য করার ঔদ্ধত্য। আর সেকারণে গিলগামেশের উরুক শুধুমাত্র এক প্রাচীন নগর নয়, সভ্যতার দ্বৈত রূপক। প্রাচীর মানুষকে বন্যতা থেকে রক্ষা করে, আবার প্রাচীরই ভেতর ও বাইরের মধ্যে তৈরি করে বিভাজন। সভ্যতা মানুষকে নিরাপত্তা দেয়, সেইসাথে ক্ষমতার সিঁড়িও নির্মাণ করে। নগরের ইটের ভেতরেই তাই মানবসভ্যতার আদি দার্শনিক দ্বন্দ্বসমূহ উঠে আসে বাইনারি প্রতিপক্ষ রূপে: মুক্তি ও নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্ব, সৃষ্টি ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব, আশ্রয় ও বন্দিত্বের দ্বন্দ্ব।এই ঔদ্ধত্যের বিপরীতে আসে আরেক নাম এনকিদু। সে এক বন্য প্রকৃতির সন্তান, পশুদের সহচর, মানুষের পরিচিত জগতের বাইরে থাকা এক আদিম প্রাণসত্তা। মানব মানবীর আবেগীয় সংস্পর্শ, যৌনতা, রুটি, মদ, পোশাক ও সামাজিক আচরণের মধ্য দিয়ে সে প্রকৃতি থেকে সভ্যতার দিকে প্রবেশ করে; কিন্তু যে পশুরা তাকে নিজেদের একজন ভাবত, তারা তার কাছ থেকে দূরে সরে যায়। দৃশ্যটি নৃতাত্ত্বিক সাংস্কৃতিক দিক থেকে চমকপ্রদ রূপান্তরের দৃষ্টান্ত হলেও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্মম সত্যের ইঙ্গিতবাহী। মানুষ সভ্য হয়, কিন্তু সভ্য হওয়ার প্রক্রিয়ায় ঘটে যায় তার প্রথম নির্বাসন, সে নির্বাসনটি হলো প্রকৃতির রাজ্য থেকে নির্বাসন। পরবর্তীকালে রুশো সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক অবস্থার বিচ্ছেদের প্রশ্ন তুলেছেন; আধুনিক ইকোক্রিটিসিজম ও ডিপ ইকোলজি মানুষের আত্মকেন্দ্রিক শ্রেষ্ঠত্ববোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে; অথচ তার বহু হাজার বছর আগে এনকিদুর শরীরেই যেন সেই বিচ্ছেদের প্রথম মিথ লেখা হয়ে গিয়েছিল। প্রকৃতির সন্তান মানুষ এমন উন্মত্ততায় স্বসংজ্ঞায়িত সভ্যতাকে এমনভাবে নির্মাণ করতে থাকে, যেন সে কখনোই প্রকৃতির অংশ ছিল না।দেবদারু অরণ্যে হুম্বাবার হত্যার দৃশ্য তাই আজও নতুন করে পড়তে হয়। প্রথাগত মহাকাব্যিক নন্দনে হুম্বাবা দৈত্য, আর দৈত্যবধ বীরত্ব; কিন্তু পরিবেশ-নন্দনতত্ত্বের আলোয় প্রশ্ন জাগে, হুম্বাবা কি তাহলে অরণ্যেরও কণ্ঠ নয়? গিলগামেশ ও এনকিদু দেবদারু কাটে, অরণ্যের প্রহরীকে হত্যা করে, বিজয়ের স্মারক নির্মাণ করে। মানুষের ইতিহাসে ‘সভ্যতার অগ্রগতি’ নামক যে মহা-আখ্যান আমরা লিখে চলেছি, তার নিচে কত নদীর মৃত্যু, কত বনানীর বৃক্ষচ্ছেদ, কত যে প্রাণির বিলুপ্তি চাপা পড়ে আছে, সেই শোক সেই ক্রন্দন তার কর্ণকুহরে পৌছায় না। এখানে নন্দনের সঙ্গে নৈতিকতার সংঘর্ষ ঘটে। দৃশ্যটি বীরত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু তার ছায়ায় পরিবেশগত সহিংসতা আছে। এই দ্বিবাচনিকতাই হলো মহৎ শিল্পের লক্ষণ; কারণ, সে আমাদের একটি মাত্র অর্থে নিশ্চিন্ত থাকতে দেয় না।কিন্তু এনকিদুর সবচেয়ে বড় কাজ গিলগামেশকে যুদ্ধে সাহায্য করা নয়; তাকে ‘অন্য’-এর অস্তিত্ব শেখানো। বন্ধুত্ব এখানে নৈতিক দর্শনের এক আদিম বিদ্যালয়। আমি তো তখনই সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠি, যখন আমার বাইরে আরেকটি ‘আমি’কে স্বীকার করি— যার আনন্দে আমার আনন্দ, যার মৃত্যুতে আমার অস্তিত্ব কেঁপে ওঠে। গিলগামেশ শক্তিশালী ছিল, কিন্তু এনকিদুর আগে সে নিজের ভঙ্গুরতা জানত না। এনকিদুর মৃত্যু তাই কেবল বন্ধুবিয়োগ নয়; গিলগামেশের আত্মচেতনার জন্ম। মৃত বন্ধুর মুখে সে নিজের ভবিষ্যৎ মুখ দেখতে পায়। হাইডেগার বহু সহস্র বছর পরে মানুষকে ‘বিং-টুওয়ার্ড-ডেথ’ হিসেবে এটিকে দেখিয়েছেন— অর্থাৎ মানুষ নিজের মৃত্যুর সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন এমন এক সত্তা, যার জীবন এই সীমাবোধের মধ্যেই অর্থ লাভ করে। গিলগামেশ দর্শনের ভাষা জানত না, কিন্তু এনকিদুর মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে সে যেন প্রথম সেই অস্তিত্ববাদী শীতলতা অনুভব করলো— অন্যের মৃত্যুতে সে সম্বিত ফিরে পেল আর নিজের মৃত্যুর অনিবার্যতা দারুণভাবে উপলব্ধি করলো।এইখানেই বীরত্বের কাহিনি অস্তিত্বের কাহিনিতে পরিণত হলো। গিলগামেশ উরুক ছেড়ে অমরত্বের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে। রাজমুকুটের বদলে ধুলো, প্রাসাদের বদলে প্রান্তর, নিশ্চিত পরিচয়ের বদলে অজানার দীর্ঘ রাস্তা। নন্দনতাত্ত্বিকভাবে এই যাত্রা এক ধরনের ‘সাবলাইম’-এরও মুখোমুখি হওয়া— মানুষ এমন বিশালতা, অন্ধকার ও অজানার সামনে দাঁড়ায় যা তার পরিমাপের ক্ষমতাকে অতিক্রম করে। কান্ট পরে সাবলাইম-এর মধ্যে এমন এক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন— যেখানে প্রকৃতির বিপুলতা আমাদের ক্ষুদ্র করে, অথচ সেই ক্ষুদ্রতার সচেতনতাই মনের অন্য এক মহত্ত্বের অনুভব জাগায়। গিলগামেশের মরুভূমি, পর্বত, মৃত্যুর জল— সবই যেন মানুষের সীমিত শরীরের বিপরীতে অসীমের নীরব স্থাপত্য।তার গন্তব্য উৎনাপিশতিম— মহাপ্লাবন অতিক্রম করে দেবতাদের দেওয়া অমরত্ব লাভকারী মানুষ। প্লাবনের এই মিথ মেসোপটেমিয়ার একান্ত সম্পত্তি নয়; বিভিন্ন সভ্যতায় জল, ধ্বংস ও পুনর্জন্মের আখ্যান হয়ে ফিরে আসে। ভারতীয় পুরাণে মনু ও মৎস্যের প্লাবনকথাও সেই বিশ্বজনীন স্মৃতির আরেক বিন্যাস। কার্ল গুস্তাভ ইয়ুং-এর ভাষায় বললে, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত মিথকে মানবসমষ্টির গভীর মানসিক প্রতিরূপ বা ‘আর্কেটাইপাল প্যাটার্ন’ হিসেবে পড়া যায়— জল ধ্বংস করে, আবার জল থেকেই নতুন পৃথিবীর জন্ম। মিথের নন্দন এখানেই: ইতিহাস যেখানে একটি ঘটনা সংরক্ষণ করে, মিথ সেখানে ঘটনাকে মানুষের চিরকালীন ভয় ও আশার প্রতীকে রূপান্তরিত করে।কিন্তু অমরত্বের সন্ধানে গিলগামেশ ব্যর্থ হয়। ঘুমকে জয় করতে পারে না; যে মৃত্যু জয় করতে এসেছে, সে মৃত্যুর ক্ষুদ্র দৈনিক ছায়া ঘুমের কাছেই পরাজিত। পরে যৌবন ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্ভিদ লাভ করেও তা হারায় সাপের কাছে। সাপ পুরোনো চামড়া ফেলে নবীন হয়; মানুষ নিজের চামড়ার ভেতরেই ক্রমশ বৃদ্ধ হয়। এইখানে মহাকাব্যটি যেন নিষ্ঠুর অথচ মমতাময় একটি সত্য উচ্চারণ করে— মানুষের মহত্ত্ব অমর হওয়ায় নয়, নিজের মরণশীলতা জেনেও অর্থপূর্ণভাবে বেঁচে থাকায়। গিলগামেশ তাই অমরত্ব নিয়ে উরুকে ফেরে না; ফেরে মরণশীলতার জ্ঞান নিয়ে। যে প্রাচীর শুরুতে ক্ষমতার অহংকার ছিল, শেষে সেটিই হয়ে ওঠে মানবসৃষ্টির রূপক। মানুষ মরবে, তার নির্মাণ কিছুদিন থাকবে; সেইসব নির্মাণও একদিন ধ্বংস হবে, কিন্তু তার স্মৃতি হয়তো অন্য কোনো চেতনায় আশ্রয় নিতে পারে।ভারতীয় উপমহাদেশের মহাকাব্যিক কল্পনায় মৃত্যু ও অমরত্ব অন্য এক নৈতিক মাত্রা লাভ করে। রামায়ণ ও মহাভারত কেবল দেবতা, রাজা, যুদ্ধ কিংবা বীরত্বের আখ্যান নয়; এগুলো ধর্ম, কর্তব্য, ন্যায়, নির্বাসন, পরিবার, ক্ষমতা ও কর্মফলের বিশাল নৈতিক গোলকধাঁধা। রামের বনবাসে নগর ও অরণ্য আবার মুখোমুখি হয়; সীতার অগ্নিপরীক্ষা ন্যায় ও সামাজিক নৈতিকতার মধ্যকার নিষ্ঠুর ব্যবধানকে প্রকাশ করে। আর মহাভারত-এর কুরুক্ষেত্রে বিজয় নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ। লক্ষ মৃতদেহের ওপর দাঁড়িয়ে যুধিষ্ঠিরের বিজয় কি সত্যিই বিজয়? অর্জুন যুদ্ধের আগে অস্ত্র নামিয়ে রাখতে চায়— কারণ প্রতিপক্ষের মুখে সে শত্রু নয়, আত্মীয়কে দেখে। এই মুহূর্তে বীরত্বের নন্দন ভেঙে পড়ে নৈতিক দর্শনের সামনে। যুদ্ধ জেতাই যথেষ্ট নয়; যে যুদ্ধ জিতলাম তার নৈতিক মূল্য বহন করতে পারা আরও কঠিন।হোমারের ইলিয়াড-এ অ্যাকিলিসের সামনে রয়েছে দীর্ঘ অথচ অখ্যাত জীবন অথবা সংক্ষিপ্ত কিন্তু গৌরবময় মৃত্যুর সম্ভাবনা। সে বেছে নেয় ‘ক্লিওস’— মৃত্যুর পর মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকা নাম। এনকিদুর মৃত্যু গিলগামেশকে মৃত্যুর কাছ থেকে পালাতে পাঠায়, প্যাট্রোক্লাসের মৃত্যু অ্যাকিলিসকে মৃত্যুর দিকেই ফিরিয়ে আনে। একজন অমরত্ব খোঁজে, অন্যজন খ্যাতির মধ্যে অমরত্ব নির্মাণ করে। আবার ‘ওডেসি’-তে অডিসিউসের সামনে অমরতার সম্ভাবনা থাকলেও তার আকাঙ্ক্ষা ইথাকা, পেনেলোপি, ঘর, মাটি, অর্থাৎ সীমিত মানবজীবন। এই তিন নায়কের মধ্যে অমরত্বের তিন দর্শন: মৃত্যুকে অস্বীকার, স্মৃতির মাধ্যমে মৃত্যুকে অতিক্রম, এবং মৃত্যুসহ জীবনকেই ভালোবাসা।এই মহাকাব্যিক মৃত্যুচেতনা গ্রিক ট্র্যাজেডিতে এসে এক গভীর নন্দনতাত্ত্বিক রূপান্তর লাভ করে। সফোক্লিসের ইডিপাস রেক্স-এ মানুষ ভাগ্য থেকে পালাতে গিয়েই ভাগ্যের দিকে এগিয়ে যায়। ইডিপাসের মহত্ত্ব তার নির্দোষতায় নয়; যে সত্য তাকে ধ্বংস করবে, সেই সত্য জানার আকাঙ্ক্ষা থেকে সে পিছু না হটায়। এখানেই ট্র্যাজিক নন্দনের অসাধারণ বৈপরীত্য— পতনও অনেক সময় মানুষের মহিমাকে প্রকাশ করে। এরিস্টটলের পোয়েটিকস-এ ‘পিটি’ ও ‘ফেয়ার’-এর মধ্য দিয়ে ‘ক্যাথারসিস’-এর যে ধারণা, তার গভীরে রয়েছে এই এক মৌলিক মানবিক উপলব্ধি: অন্যের পতন দেখে আমরা নিজের ভঙ্গুরতাকে চিনতে শিখি। ট্র্যাজেডি আমাদের দুঃখ দেয়, অথচ সেই দুঃখই এক ধরনের নন্দন-জ্ঞান।শেক্সপিয়রের কাছে এসে ট্র্যাজেডির কেন্দ্র আরও অন্তর্মুখি। গ্রিক ট্র্যাজেডির মাথার ওপরে দেবতা, ভবিতব্য ও অনিবার্যতার আকাশ; শেক্সপিয়রের মঞ্চে সেই আকাশ অনেকটাই নেমে আসে মানুষের মনের ভিতরে। হ্যামলেট-এর বিলম্ব, ম্যাকবেথ-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ওথেলোর ঈর্ষা, কিং লেয়ার-এর আত্ম-অন্ধতা, মানুষের পতনের বীজ যেন তার নিজের মধ্যেই নিহিত। গ্রিক ট্র্যাজেডিতে মানুষ নিয়তির গোলকধাঁধায় পথ হারায়; শেক্সপিয়রে মানুষ নিজের মনেই গোলকধাঁধা নির্মাণ করে। কিন্তু দুই নন্দনের মিল এক জায়গায়— মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণ জানে না, নিজের জীবনকেও সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করে না। ট্র্যাজেডির সৌন্দর্য তাই মৃত্যুর মধ্যে নয়; সীমাবদ্ধ মানুষ নিজের সীমার বিরুদ্ধে যে অসম যুদ্ধ করে, তার মধ্যেই।দান্তের ‘ডিভাইন কমেডি’ এই মৃত্যুচেতনাকে আবার মহাজাগতিক নৈতিক স্থাপত্যে রূপান্তরিত করে। গিলগামেশ মৃত্যুকে এড়াতে পৃথিবীর সীমান্তে যায়, দান্তের কাব্যিক যাত্রী মৃত্যুর পরের জগতের মধ্য দিয়েই অগ্রসর হয় নরক, প্রায়শ্চিত্ত ও স্বর্গের দিকে। গিলগামেশের প্রশ্ন ‘আমি কীভাবে মরব না?’ দান্তের কাছে এসে হয়ে ওঠে ‘মৃত্যুর পর আমার অস্তিত্বের নৈতিক অর্থ কী?’ মৃত্যু এখানে সমাপ্তি নয়; বিচার ও রূপান্তরের দ্বার। গিলগামেশের মরুভূমি থেকে দান্তের অন্ধকার অরণ্য— মানুষ আসলে একই প্রশ্নের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, শুধু তার ঈশ্বর চেতনা, মহাবিশ্ব ও আত্মার মানচিত্র বদলে যাচ্ছে ক্রমশ।আর এই মহাকাব্যিক ঐতিহ্য যখন বাংলায় মাইকেল মধুসূদন দত্তের হাতে পৌঁছায়, তখন ঘটে এক বৈপ্লবিক নন্দন-পুনর্নির্মাণ। মেঘনাদবধ কাব্য পরিচিত রামায়ণীয় নৈতিকতার কেন্দ্র সরিয়ে দেয় বিজয়ীর কাছ থেকে পরাজিতের দিকে। মেঘনাদ, রাবণ— যারা প্রচলিত আখ্যানে ‘অপর’, মধুসূদনের কাব্যে তারা ট্র্যাজিক মহিমায় দীপ্ত। এখানে নন্দনতত্ত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্টিত হয়, সেটি হলো শিল্প সবসময় ইতিহাসের রায় মানতে বাধ্য নয়; শিল্প পরাজিতের দিকেও আলো ঘুরিয়ে দিতে পারে। রাবণের পুত্রশোক তাকে সফোক্লিসীয় কিংবা শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজিক উচ্চতার কাছাকছি নিয়ে যায়; মেঘনাদের মৃত্যু বীরত্বকে বিজয় থেকে বিচ্ছিন্ন করে আত্মমর্যাদা ও নিয়তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গে যুক্ত করে। এইখানেই বোধকরি মধুসূদনের আধুনিকতা। তিনি মিথকে পুনরাবৃত্তি করেন না, পুনর্নিমাণ করেন অমিত্রাক্ষর ছন্দে।মানুষ অবশ্য শুধু শব্দে তার অমরত্ব নির্মাণ করেনি। অজন্তার গুহার অন্ধকারে বৌদ্ধ জাতকের কাহিনি, রাজসভা, প্রেম, করুণা ও ত্যাগ রঙের মধ্যে সময়কে স্থির করে রেখেছে; ইলোরায় পাথর কেটে বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন কল্পনা পাশাপাশি শরীর লাভ করেছে। আলতামিরার গুহায় মানুষ পাথরের গায়ে প্রাণি এঁকেছিল; অজন্তা-ইলোরায় মানুষ গুহাকেই একটি মহাকাব্যে রূপান্তর করেছে। আর নালন্দায় অমরত্বের উপাদান রং বা পাথর নয়— দিব্যজ্ঞান। সপ্তম শতকে আচার্য শীলভদ্রের কাছে দূরদেশ থেকে আগত শুয়ানজাং অধ্যয়ন করেন; এক মস্তিষ্কের আলো অন্য মস্তিষ্কে, এক ভাষার জ্ঞান অন্য ভাষায়, এক ভূখণ্ডের চিন্তা অন্য সভ্যতায় চলে যায়। জ্ঞানপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস হতে পারে, পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যেতে পারে, অথচ ধারণার যাত্রা থামে না। এও মৃত্যুর বিরুদ্ধে মানুষের আরেক নন্দন-প্রতিরোধ।এইসব বিচিত্র আখ্যান, মিথ, ট্র্যাজেডি, স্থাপত্য ও স্মৃতির গভীরে একটি সূত্রই বারবার ফিরে ফিরে আসে। মানুষের জীবৎকাল ক্ষণস্থায়ী, অথচ সে তার বিপরীতে স্থায়িত্ব কল্পনা করতে পারে। এই বিরোধ থেকেই শিল্পের জন্ম। নন্দনের মহিমা তাই চিরস্থায়িত্বে নয়; ক্ষয়ের বিরুদ্ধে রূপ নির্মাণে। কাদামাটি ভাঙবে জেনেও মানুষ তাতে লিখেছে, রং বিবর্ণ হবে জেনেও অজন্তায় ছবি এঁকেছে, পাথর ক্ষয়ে যাবে জেনেও ইলোরা কেটেছে, জীবন শেষ হবে জেনেও হোমার, সফোক্লিস, দান্তে, শেক্সপিয়র, মধুসূদন মানুষের মৃত্যু নিয়ে লিখেছেন। শিল্পের গভীরতম সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই, অমরত্ব অসম্ভব জেনেও অমরত্বের দিকে মানুষ তারএক হাত বাড়িয়েই রাখে।গোধূলি নেমে আসে উরুকের প্রাচীরে, সিন্ধুর পরিত্যক্ত নগরে, কুরুক্ষেত্রের নিঃশব্দ রণভূমিতে, ট্রয়ের পোড়া দরজায়, থিবসের রাজপ্রাসাদে, লঙ্কার মৃত যোদ্ধাদের পাশে, দান্তের অন্ধকার অরণ্যে, অজন্তার বিবর্ণ রঙে, ইলোরার শীতল পাথরে, নালন্দার হারিয়ে যাওয়া পাঠকক্ষে। সভ্যতা একে একে সন্ধ্যার দিকে যায়, কিন্তু মানুষের প্রশ্ন থেকে যায়। গিলগামেশ অমরত্বের উদ্ভিদ হারিয়েছিল, অ্যাকিলিস হারিয়েছিল জীবন, ইডিপাস হারিয়েছিল নিজের পরিচয়ের নিরাপদ আলো, রাবণ হারিয়েছিল মেঘনাদকে; অথচ তাদের হারানোর কাহিনিই তাদের ফিরিয়ে আনে প্রতিটি নতুন পাঠকের কাছে। এ যেন শিল্পের সবচেয়ে রহস্যময় নন্দন-পরিহাস হলো মানুষ শত চেষ্টা করেও অমর হতে পারেনি, কিন্তু মানুষের মৃত্যুর গল্প কখনো কখনো মানুষের চেয়েও অবিশ্বাস্য দীর্ঘতর জীবন লাভ করে।আলতামিরার মানুষ পাথরে একটি রেখা রেখে গিয়েছিল; মেসোপটেমিয়ার মানুষ কাদায় লিখেছিল মৃত্যুভয়; অবশ্য সিন্ধুর মানুষ রেখে গেছে অক্ষরবিহীন অনুচ্চারিত কিছু চিহ্ন, যদিও বাঙালি চিহ্নবিজ্ঞানী কবি বহতা অংশমালী মুখোপাধ্যায়-এর বিশ্ব কাঁপানো গবেষণাকর্মে বেরিয়ে এসেছে সেগুলোকে ডিকোড করে কোনো মৃত্যুর বার্তা নয় বরং মৃত্যুভয়কে পদদলিত করে অত্রাঞ্চলের মানুষের জীবনের জয়গানই প্রতিধ্বনিত হয়েছে। চিহ্নগুলোর কোনো কোনোটি কর্মকুশল মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ রাজস্ব আদায়ের সীলমোহর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।ভারতীয় মহাকাব্যও কর্ম ও ধর্মের ভেতর দিয়ে মৃত্যুর অর্থ খুঁজেছে; হোমার মৃত্যুকে ক্লিওস-এর দীপ্তি দিয়েছেন; সফোক্লিস পতনের মধ্যে মানুষের সীমাবোধ আবিষ্কার করেছেন; দান্তে মৃত্যুর ওপারে নৈতিক মহাবিশ্ব নির্মাণ করেছেন; শেক্সপিয়র মানুষের মনের মধ্যেই ট্র্যাজেডির গোপন খাদ খুঁজে পেয়েছেন; মধুসূদন পরাজিতের মৃত্যুর দিকে নন্দনের আলো ঘুরিয়ে দিয়েছেন; অজন্তা-ইলোরা রং ও পাথরে সময়কে থামাতে চেয়েছে; নালন্দা ও শীলভদ্র জ্ঞানের উত্তরাধিকারে জীবনের সীমানা অতিক্রম করেছেন। এত বিচিত্র পথের নিচে একই ক্ষীণ অথচ অনিঃশেষ উচ্চারণ: ‘আমি চলে যাব, কিন্তু আমার দেখা, জানা, ভালোবাসা, শোক, প্রশ্ন ও বিস্ময়ের সবটুকু যেন আমার সঙ্গে চলে না যায়।’ সম্ভবত অমরত্বের সবচেয়ে মানবিক সংজ্ঞা এখানেই। অমরত্ব মৃত্যুহীন জীবন নয়; নিজের মরণশীলতার ভেতরে এমন অর্থ সৃষ্টি করা, যা অন্য কোনো মানুষের চেতনায় পুনর্জন্ম নিতে পারে। কাদামাটি ভেঙে যায়, কিন্তু তার অক্ষর কখনো পোড়ামাটির ফলক হয়ে ফিরে আসে; নগর ধ্বংস হয়, কিন্তু তার কাহিনি থেকে যায়; যখন কোনো মহান শিল্পস্রষ্টার নশ্বর পদচিহ্ন কালের ধূলোয় মিলিয়ে যায় কিন্তু তাঁর শিল্পসুকৃতির সরব পদধ্বনি মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও অনুরণিত হয়: ‘মরণরে তুঁহু মম শ্যামসমান’... ক্রমশ...