সংবাদ

তাপপ্রবাহের বলি ইউরোপ: এক গ্রীষ্মেই মৃত্যু ৫০ হাজার


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

তাপপ্রবাহের বলি ইউরোপ: এক গ্রীষ্মেই মৃত্যু ৫০ হাজার
ছবি : সংগৃহীত

ইউরোপের ৮৫৪ শহরে গ্রীষ্মের তাপে প্রাণহানির অনুমান ৫০ হাজারের বেশি। এর প্রায় ৩২ হাজার ৬০০টি মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন প্রবল। বিজ্ঞান সতর্ক করছে, কিন্তু বিশ্ব কি সময়মতো পদক্ষেপ নেবে?

ইউরোপের এবারের গ্রীষ্ম শুধু রেকর্ড তাপমাত্রার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে না। এটি স্মরণ করিয়ে দেবে, জলবায়ু পরিবর্তন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর মূল্য মানুষ এখনই দিচ্ছে—জীবন দিয়ে।

২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরে তাপজনিত কারণে আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যুর জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন গবেষকেরা। অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের কর্মকাণ্ডে বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক উষ্ণতা।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার হেলথ-এ। যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকেরা তাপমাত্রা, জনসংখ্যা এবং তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ অনুমান করেছেন। 

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে হিসাব করা গ্রীষ্মগুলোর মধ্যে এবারের তাপজনিত প্রাণহানি সর্বোচ্চ হতে পারে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ৫০ হাজার ৩৯১ জনের প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ সরাসরি তাপপ্রবাহ হিসেবে নথিভুক্ত—গবেষণাটি এমন দাবি করছে না। 

এটি বিভিন্ন শহরের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যানগত অনুমান। আর ৩২ হাজার ৬১৯ সংখ্যাটি বোঝাচ্ছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে যে তাপমাত্রা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত হতো, তার তুলনায় কতগুলো অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তাপমাত্রা বাড়ছে, মৃত্যুঝুঁকিও

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বারবার তীব্র তাপপ্রবাহের মুখে পড়ে। পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ১৯৯১–২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রার ব্যবধান স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হয়েছে।

বিশেষ করে ১৭ জুন থেকে ১ জুলাইয়ের তীব্র তাপপ্রবাহে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। পুরো গ্রীষ্মের আনুমানিক মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে।

তাপমাত্রা যত বাড়ে, শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর চাপ তত বাড়ে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকলে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, কিডনির সমস্যা এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুযোগহীন মানুষের ঝুঁকি আরও বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুঝুঁকিতে ছিলেন ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা। তবে বিপদ শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ, তীব্র গরম কেবল দুর্বল শরীরের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিস্তৃত সংকট।

ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলক শীতল অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত যুক্তরাজ্যেও তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান কয়েক হাজার। এতে বোঝা যায়, যে অঞ্চলগুলো ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘ তাপপ্রবাহের সঙ্গে কম পরিচিত, সেখানেও ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।

জলবায়ু মৃত্যুর কারণ

জীবাশ্ম জ্বালানি—কয়লা, তেল ও গ্যাস—পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ে। এই গ্যাস পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি অংশ আটকে রাখে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। উষ্ণ পৃথিবীতে অনেক অঞ্চলে তীব্র গরমের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং আগের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

সেপ্টেম্বরে নেচার হেলথ-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ ইউরোপে ২০২২ সালের মতো প্রাণঘাতী তাপজনিত মৃত্যুর ঘটনা প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় গড়ে ২৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। গবেষণাটি ৩৪টি ইউরোপীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ, অতীতের কোনো ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়; উষ্ণতা বাড়তে থাকলে একই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গবেষণাপত্র, নেচার হেলথ

১.৫ ডিগ্রির সীমা কি শেষ

ইউরোপে মৃত্যুর এই হিসাব সামনে এসেছে জাতিসংঘের নতুন জলবায়ু প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যে। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি—ইউএনইপির এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬ বলছে, প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন প্রবল।

বিশ্বের দেশগুলো বর্তমানে ঘোষিত জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা শতাব্দীজুড়ে প্রায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে তা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির লক্ষ্যকে পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা ঠিক হবে না। ইউএনইপি বলছে, উষ্ণতা সাময়িকভাবে ওই সীমা ছাড়িয়ে গেলেও শতাব্দীর শেষ নাগাদ আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে বা তার নিচে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সে জন্য বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমাতে হবে।

শুধু সম্মেলনে নতুন ঘোষণা দিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন এখনই নিঃসরণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো।

তাপপ্রবাহের মৃত্যু অনেক সময় যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা বড় দুর্ঘটনার মতো দৃশ্যমান হয় না। কোনো বিস্ফোরণ নেই, ধ্বংসস্তূপের ছবি নেই, এক জায়গায় পড়ে থাকা অসংখ্য মরদেহও নেই। মানুষ হয়তো ঘরে, হাসপাতালে কিংবা কর্মস্থলে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তাই তাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কিন্তু মৃত্যুর দৃশ্যমানতা কম বলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায় না।

এখানে দায়ের প্রশ্নটি কয়েক স্তরের। জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার, দীর্ঘদিনের জ্বালানিনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেল এবং নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত—সবই বৃহত্তর আলোচনার অংশ। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, হাসপাতালের সক্ষমতা, শহরে গাছপালা ও ছায়া, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সহায়তাও জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

৫০ হাজার মৃত্যু, জলবায়ু পরিবর্তনের দায়: বিশ্ব কি বিপর্যয় ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে?

তবে গবেষণার ফলাফল থেকে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ টানা যায় না। বরং প্রমাণভিত্তিক প্রশ্ন হলো—ঝুঁকি সম্পর্কে জানা থাকার পরও কোথায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, কোন নীতির কারণে বিপদ বেড়েছে এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে কী করা সম্ভব ছিল?

বিপদ সবার সমান নয়

তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগে মানুষের অভিজ্ঞতা নির্ভর করে বয়স, স্বাস্থ্য, পেশা, বাসস্থান ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কিংবা অতিরিক্ত গরমে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ যাদের নেই, তাদের ঝুঁকি বেশি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে পরিবেশগত, জনস্বাস্থ্যগত ও সামাজিক বৈষম্যের সংকট।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র গরমে রাস্তায় কাজ করা শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, বয়স্ক মানুষ এবং টিনের ছাউনির ঘরে থাকা পরিবারগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শহরে গাছপালা কমে যাওয়া, কংক্রিটের বিস্তার, ঘনবসতি এবং ঘরের ভেতর তাপ আটকে থাকার প্রবণতা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ইউরোপের ঘটনা দেখায়, তুলনামূলকভাবে উন্নত অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাসম্পন্ন অঞ্চলও তীব্র তাপের ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাই বাংলাদেশের জন্য গরমকে কেবল মৌসুমি অস্বস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা, স্থানীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা, শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং শহর ও বসতিতে তাপ কমানোর পরিকল্পনা।

এখনই পদক্ষেপ

বিশ্বের হাতে এখনো কিছু সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সুযোগ থাকা আর তা কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা—এসব পদক্ষেপের ফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও পরিসরের ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সচেতন ঘাতক নয়; এটি মানুষের কর্মকাণ্ডে ত্বরান্বিত একটি বিপর্যয়, যার ক্ষতি নীতিনির্ধারণ ও সামাজিক প্রস্তুতির মাধ্যমে কমানো সম্ভব। কিন্তু বিপদের মাত্রা জানা থাকার পরও যদি বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ পিছিয়ে দেয়, তবে ভবিষ্যতের মৃত্যুর একটি অংশকে আর অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে পাশ কাটানো যাবে না। সূত্র: সিএনএন

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬


তাপপ্রবাহের বলি ইউরোপ: এক গ্রীষ্মেই মৃত্যু ৫০ হাজার

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ইউরোপের ৮৫৪ শহরে গ্রীষ্মের তাপে প্রাণহানির অনুমান ৫০ হাজারের বেশি। এর প্রায় ৩২ হাজার ৬০০টি মৃত্যুর পেছনে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। অন্যদিকে জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন প্রবল। বিজ্ঞান সতর্ক করছে, কিন্তু বিশ্ব কি সময়মতো পদক্ষেপ নেবে?

ইউরোপের এবারের গ্রীষ্ম শুধু রেকর্ড তাপমাত্রার জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে না। এটি স্মরণ করিয়ে দেবে, জলবায়ু পরিবর্তন আর দূর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এর মূল্য মানুষ এখনই দিচ্ছে—জীবন দিয়ে।

২০২৬ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপের ৩০টি দেশের ৮৫৪টি শহরে তাপজনিত কারণে আনুমানিক ৫০ হাজার ৩৯১ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৬১৯টি মৃত্যুর জন্য মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন গবেষকেরা। অর্থাৎ, হিসাব অনুযায়ী তাপজনিত মৃত্যুর প্রায় ৬৫ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মানুষের কর্মকাণ্ডে বেড়ে যাওয়া বৈশ্বিক উষ্ণতা।

গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার হেলথ-এ। যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষকেরা তাপমাত্রা, জনসংখ্যা এবং তাপমাত্রার সঙ্গে মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে এ অনুমান করেছেন। 

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে হিসাব করা গ্রীষ্মগুলোর মধ্যে এবারের তাপজনিত প্রাণহানি সর্বোচ্চ হতে পারে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি। ৫০ হাজার ৩৯১ জনের প্রত্যেকের মৃত্যুর কারণ সরাসরি তাপপ্রবাহ হিসেবে নথিভুক্ত—গবেষণাটি এমন দাবি করছে না। 

এটি বিভিন্ন শহরের তাপমাত্রা ও মৃত্যুহারের সম্পর্কের ভিত্তিতে তৈরি পরিসংখ্যানগত অনুমান। আর ৩২ হাজার ৬১৯ সংখ্যাটি বোঝাচ্ছে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন না ঘটলে যে তাপমাত্রা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত হতো, তার তুলনায় কতগুলো অতিরিক্ত মৃত্যুর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তাপমাত্রা বাড়ছে, মৃত্যুঝুঁকিও

২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিক থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বারবার তীব্র তাপপ্রবাহের মুখে পড়ে। পশ্চিম ইউরোপে গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা ১৯৯১–২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। কোনো কোনো দেশে নির্দিষ্ট দিনে তাপমাত্রার ব্যবধান স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি হয়েছে।

বিশেষ করে ১৭ জুন থেকে ১ জুলাইয়ের তীব্র তাপপ্রবাহে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শহরগুলোতে স্বাভাবিকের তুলনায় গড় তাপমাত্রা প্রায় ৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। পুরো গ্রীষ্মের আনুমানিক মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটেছে এই সময়ের মধ্যে।

তাপমাত্রা যত বাড়ে, শরীরের স্বাভাবিক তাপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ওপর চাপ তত বাড়ে। দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত গরমে থাকলে পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, কিডনির সমস্যা এবং হৃদ্‌যন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা দেখা দিতে পারে। আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক মানুষ, বাইরে কাজ করা শ্রমিক এবং শীতাতপনিয়ন্ত্রণের সুযোগহীন মানুষের ঝুঁকি আরও বেশি।

গবেষণা অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি মৃত্যুঝুঁকিতে ছিলেন ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সীরা। তবে বিপদ শুধু প্রবীণদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ৮০০ জনেরও বেশি মানুষের তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান করা হয়েছে। অর্থাৎ, তীব্র গরম কেবল দুর্বল শরীরের সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের বিস্তৃত সংকট।

ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন ও জার্মানিতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। তুলনামূলক শীতল অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত যুক্তরাজ্যেও তাপজনিত মৃত্যুর অনুমান কয়েক হাজার। এতে বোঝা যায়, যে অঞ্চলগুলো ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘ তাপপ্রবাহের সঙ্গে কম পরিচিত, সেখানেও ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে।

জলবায়ু মৃত্যুর কারণ

জীবাশ্ম জ্বালানি—কয়লা, তেল ও গ্যাস—পোড়ানোর ফলে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ে। এই গ্যাস পৃথিবী থেকে নির্গত তাপের একটি অংশ আটকে রাখে, ফলে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। উষ্ণ পৃথিবীতে অনেক অঞ্চলে তীব্র গরমের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে, দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে এবং আগের চেয়ে বেশি তাপমাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

সেপ্টেম্বরে নেচার হেলথ-এ প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ ইউরোপে ২০২২ সালের মতো প্রাণঘাতী তাপজনিত মৃত্যুর ঘটনা প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় গড়ে ২৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি সম্ভাব্য হয়ে উঠেছে। গবেষণাটি ৩৪টি ইউরোপীয় দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। অর্থাৎ, অতীতের কোনো ভয়াবহ তাপপ্রবাহ ভবিষ্যতের জন্য একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম নয়; উষ্ণতা বাড়তে থাকলে একই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। গবেষণাপত্র, নেচার হেলথ

১.৫ ডিগ্রির সীমা কি শেষ

ইউরোপে মৃত্যুর এই হিসাব সামনে এসেছে জাতিসংঘের নতুন জলবায়ু প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক দিনের মধ্যে। গত ২১ অক্টোবর প্রকাশিত জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক কর্মসূচি—ইউএনইপির এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬ বলছে, প্রাক্‌-শিল্প যুগের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এখন প্রবল।

বিশ্বের দেশগুলো বর্তমানে ঘোষিত জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করলেও উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা শতাব্দীজুড়ে প্রায় ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান নীতিগুলো অব্যাহত থাকলে তা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির লক্ষ্যকে পুরোপুরি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা ঠিক হবে না। ইউএনইপি বলছে, উষ্ণতা সাময়িকভাবে ওই সীমা ছাড়িয়ে গেলেও শতাব্দীর শেষ নাগাদ আবার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে বা তার নিচে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সে জন্য বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ, ২০৩৫ সালের মধ্যে ৪৫ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৬৯ শতাংশ কমাতে হবে।

শুধু সম্মেলনে নতুন ঘোষণা দিয়ে বা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করে আর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না। প্রয়োজন এখনই নিঃসরণ কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ানো।

তাপপ্রবাহের মৃত্যু অনেক সময় যুদ্ধ, সন্ত্রাস বা বড় দুর্ঘটনার মতো দৃশ্যমান হয় না। কোনো বিস্ফোরণ নেই, ধ্বংসস্তূপের ছবি নেই, এক জায়গায় পড়ে থাকা অসংখ্য মরদেহও নেই। মানুষ হয়তো ঘরে, হাসপাতালে কিংবা কর্মস্থলে অসুস্থ হয়ে মারা যায়। তাই তাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কিন্তু মৃত্যুর দৃশ্যমানতা কম বলে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব কমে যায় না।

এখানে দায়ের প্রশ্নটি কয়েক স্তরের। জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার, দীর্ঘদিনের জ্বালানিনীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রচলিত মডেল এবং নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত—সবই বৃহত্তর আলোচনার অংশ। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার প্রস্তুতি, আগাম সতর্কতা, হাসপাতালের সক্ষমতা, শহরে গাছপালা ও ছায়া, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সহায়তাও জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

৫০ হাজার মৃত্যু, জলবায়ু পরিবর্তনের দায়: বিশ্ব কি বিপর্যয় ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে?

তবে গবেষণার ফলাফল থেকে কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত হত্যার অভিযোগ টানা যায় না। বরং প্রমাণভিত্তিক প্রশ্ন হলো—ঝুঁকি সম্পর্কে জানা থাকার পরও কোথায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, কোন নীতির কারণে বিপদ বেড়েছে এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে কী করা সম্ভব ছিল?

বিপদ সবার সমান নয়

তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগে মানুষের অভিজ্ঞতা নির্ভর করে বয়স, স্বাস্থ্য, পেশা, বাসস্থান ও আর্থিক সামর্থ্যের ওপর। শীতাতপনিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ কিংবা অতিরিক্ত গরমে কাজ বন্ধ রাখার সুযোগ যাদের নেই, তাদের ঝুঁকি বেশি। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন একই সঙ্গে পরিবেশগত, জনস্বাস্থ্যগত ও সামাজিক বৈষম্যের সংকট।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। তীব্র গরমে রাস্তায় কাজ করা শ্রমিক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক, বয়স্ক মানুষ এবং টিনের ছাউনির ঘরে থাকা পরিবারগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শহরে গাছপালা কমে যাওয়া, কংক্রিটের বিস্তার, ঘনবসতি এবং ঘরের ভেতর তাপ আটকে থাকার প্রবণতা পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

ইউরোপের ঘটনা দেখায়, তুলনামূলকভাবে উন্নত অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাসম্পন্ন অঞ্চলও তীব্র তাপের ভয়াবহ প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাই বাংলাদেশের জন্য গরমকে কেবল মৌসুমি অস্বস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন তাপপ্রবাহের স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত করা, স্থানীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা, শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং শহর ও বসতিতে তাপ কমানোর পরিকল্পনা।

এখনই পদক্ষেপ

বিশ্বের হাতে এখনো কিছু সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সুযোগ থাকা আর তা কাজে লাগানো এক বিষয় নয়। নিঃসরণ দ্রুত কমানো, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা—এসব পদক্ষেপের ফল নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গতি ও পরিসরের ওপর।

জলবায়ু পরিবর্তন কোনো সচেতন ঘাতক নয়; এটি মানুষের কর্মকাণ্ডে ত্বরান্বিত একটি বিপর্যয়, যার ক্ষতি নীতিনির্ধারণ ও সামাজিক প্রস্তুতির মাধ্যমে কমানো সম্ভব। কিন্তু বিপদের মাত্রা জানা থাকার পরও যদি বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ পিছিয়ে দেয়, তবে ভবিষ্যতের মৃত্যুর একটি অংশকে আর অনিবার্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে পাশ কাটানো যাবে না। সূত্র: সিএনএন


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত