সংবাদ

গ্রন্থালোচনা

অন্ধকারে মানুষের মুখ খোঁজার আখ্যান

 ‘লালবাতি নীল মানুষ’— অন্ধকারে মানুষের মুখ খোঁজার অনবদ্য আখ্যান| এমন একটি উপন্যাস পাঠককে কেবল পতিতাপল্লীর গল্প শোনায় না বরং সেই অন্ধকারের ভেতর চাপা পড়ে থাকা মানুষগুলোর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়| দাঁড় করিয়ে দেয়— জুবাইদা, লাইলি, ললিতা, বেলি, পাপড়ি, সালেহা, জবা, মাধুরীদের চোখভরা অনুচ্চারিত প্রশ্নের সামনে| যারা বলে— ‘দুনিয়া যার নরক আসমানী নরকে সে কেন ভয় পাবে?’আমাদের সমাজ যাদের জন্য একটিমাত্র শব্দ ছুঁড়ে দিয়ে শেষ করে দিয়েছে দায়, লেখক তাদের রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখানোর কেবল সাহস নয় দেখিয়েছেন স্পর্ধা এবং উদারতা|উপন্যাসের বড় শক্তি এর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি| এখানে যৌনপল্লীর নারীরা করুণার পাত্র নয়— তারা হাসে, ভালোবাসে, স্বপ্ন দেখে, প্রতারিত হয়, প্রতিবাদ করে আবার ভেঙেও পড়ে| তারা কথা বলে নিজস্ব স্বরে, নিজেদের ভাষায়| তাদের জীবনকে কোনো রোমান্টিক আবরণে ঢেকে না রেখে নির্মম বাস্তবতার সাথে তুলে ধরা হয়েছে| ইসলাম ধর্মে মহিমান্বিত রাত হিসেবে আসে সাতাশে রমজানে ‘শবেকদরের রাত’| এই রাত সারা পৃথিবীতে নামে| আলোকিত পাড়ার সাথে সাথে অন্ধকার পাড়াতেও নামবে সেটাই স্বাভাবিক| তো তাদের জীবনেও সেই রাত নামে| কেউ কেউ পুরনো দিনের মতো পালনও করতে চায়| ওই অন্ধকার পাড়ায় এই রাতকে নামিয়ে আনাকেই আমি দুঃসাহসের চোখে দেখি এবং বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ি| এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকে না|আমাদের সমাজ যাদেরকে লজ্জা আর ঘৃণার চোখে দেখতে অভ্যস্ত এই আখ্যান সেই বন্ধ দরজার পেছনের জগতকে টেনে এনেছে আলোর নিচে| এটি কেবল লালসার গল্প নয় বরং এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কান্না, ক্ষুধা এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক করুণ কাব্য|জোবায়দার যন্ত্রণাকাতর এবং প্রতিশোধের পরিকল্পনা প্রগাঢ় বেদনার মধ্যে ডুবিয়ে দেয়| লেখক এই বেদনাকে যেমন অক্ষরের মালায় সাজিয়েছেন, তেমনি তুলিতেও এঁকেছেন|বাস্তবতার নির্মম ক্যানভাসে লেখক কোনো মেকি সহানুভূতি দেখাননি| চুন-সুরকি খসে পড়া দেয়াল, স্যাঁতসেঁতে ঘর, ড্রেনের উৎকট গন্ধ নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন|জবা মেয়েটি প্রচণ্ড ঝড়ে ঘর এবং মা ভাইকে হারিয়ে শহরে পৌঁছালে এক বাড়িতে আশ্রিত হয় কাজের মেয়ে হিসেবে| ভার্সিটিতে পড়া মেয়ের সহকারী হিসেবে তাকে দেখতে পেয়ে ভালো লাগে| কিন্তু ভালোবাসার কাছে নত হওয়া মানুষ বিশেষত তরুণীরা আবার পথ হারায়, ডুবে যায় সেই অনিবার্য পঙ্কিলতায়|তারপরও এদের মধ্যে জেগে থাকে বন্ধুত্ব, মাতৃত্ব এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা|ফলে পাঠক একসময় বুঝতে পারে দেহের ব্যবসা নয়, মানুষ হারানোর ইতিহাসই এই উপন্যাসের মূল বিষয়| লেখক মন খুলে লিখে গেছেন, অপ্রয়োজনীয় আবেগ বা নাটকীয়তা এড়িয়ে এমন বর্ণনাশৈলি ˆতরি করেছেন— যা পাঠককে ধীরে ধীরে আখ্যানের গভীরে টেনে নিয়ে যায়| এবং তাদের দুঃখে কখনও মনে হয় মেয়েদের জীবনে এত দুঃখ কেন! এই খেদোক্তি আসে তাদের মুখ থেকেও— ‘আলা যদি বেইশ্যার কথাই শুনত তয় কুনো মাইয়াই বেইশ্যা হইত না’| বর্ণনার ধার পাঠককে কাঁদায়, হাসায়, রক্তাক্ত করে|সংলাপগুলো স্বাভাবিক, চরিত্রগুলো জীবন্ত আর পরিবেশটা এতটাই সাবলীল যে মনে হয় লালবাতির গলিতে দাঁড়িয়ে তাদের দীর্ঘশ্বাস শোনা যাবে, ড্রেনের নাড়িভুঁড়ি উল্টানো গন্ধের সাথে সাথে একেকজন পুরুষের থলথলে শরীরের বমি উদ্রেক করা গন্ধও পাওয়া যাবে|এই উপন্যাস সমাজের মুখোশ, নৈতিকতার আগল খুলে দিয়েছে| যারা দিনের আলোয় নীতির কথা বলে, জগৎ উদ্ধারের কথা বলে তারাই আবার রাতের অন্ধকারে সেই নিষিদ্ধ পল্লীর নিয়মিত পথিক| লেখক এই দ্বিচারিতাকে কোনো বক্তৃতা দিয়ে নয়, চরিত্র ও ঘটনার মধ্য দিয়েই উন্মোচন করেছেন| ভাষা ব্যবহারে কোনো সতর্কতার ধার ধারেননি তা সরল হলেও কখনও তীক্ষ্ণ এবং নির্মোহ| বর্ষা শেষে থিতানো পানির ঢ্যালঢেলে শ্যাওলার মতো| পুনর্বাসনের নামে তাদেরকে ঘিরে কেবল ‘রাজনীতি’ই হয়, পুনর্বাসিত কি হয়!!তাদের খেদোক্তি ‘যে মাগী একবার বাজারে বেইশ্যার খাতায় নাম লেখায়ছে, সে আজীবনই বেইশ্যা’|মানবিক বোধ এবং সামাজিক সমালোচনা বইটির শক্তিশালী দিক| এটি কেবলমাত্র অন্ধকারের গল্প নয়, এটি ক্ষমতা, শ্রেণি, শোষণ, এবং সবচেয়ে বড়কথা সামাজিক ভণ্ডামির এক জীবন্ত দলিল| বাংলা সাহিত্যে প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসের মধ্যে এটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন| এটি আমাদের সমাজ, নৈতিকতা, এবং মানবিকতার আয়নায় নিজের মুখ দেখার দারুণ এক দর্পণ|  পাঠক যদি আয়না হিসেবে দেখতে চান তবে বইটি পাঠ তালিকার শীর্ষে রাখা যেতে পারে| সেখানেও বিপত্তি— বইটি আজ আর পাওয়া যায় না| কোনো প্রকাশনী এটি নিয়ে ভাবতে পারেন|বইটি প্রকাশ করেছিল শৈলি।

অন্ধকারে মানুষের মুখ খোঁজার আখ্যান