নির্বাচনকালীন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সেটিকে পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেছেন, দেশের রাজনীতিবিদেরা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের ওপর নিজেরাই অনাস্থা প্রকাশ করছেন, যা মোটেও ভালো কথা নয়।
রবিবার (১২ জুলাই) ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নেহরীন খান স্মৃতি বক্তৃতা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান ২০২৬’-এ বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সাবেক এই গভর্ণরের মতে, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারসহ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা গেলে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হবে।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ফরাসউদ্দিন ‘সাংবিধানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শিরোনামের লিখিত বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা এবং সাংবিধানের সংস্কারের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব দেন।
ইলেকটোরাল কলেজ
বর্তমানে দেশে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়, সেটি কেবল সংসদ সদস্যদের (এমপি) ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি একটি বৃহৎ ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
তার প্রস্তাব অনুযায়ি, ইলেকটোরাল কলেজে এমপিদের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন অথরিটির প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশনের মেয়র-কমিশনার, জেলা-উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও থাকবেন। এতে রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা ও ভারসাম্যমূলক ক্ষমতা বাড়বে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সব সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, তবে নিয়োগের আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শের শর্ত দেন তিনি।
সংসদে উচ্চকক্ষ
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন লিখিত বক্তব্যে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত (পঞ্চম সংসদ থেকে দ্বাদশ সংসদ) নির্বাচনগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘উইনার টেকস অল’ নীতির কারণে ভোটের ব্যবধান সামান্য হলেও আসনের ব্যবধান বহুগুণ বেড়ে যায়।
জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, “দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংবিধান সংশোধন ও গুরুত্বপূর্ণ বিল পর্যালোচনার ক্ষমতা থাকবে উচ্চকক্ষের।”
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখন একরকম নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব দেন। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “ঘন ঘন ‘ফ্লোর ক্রসিং’ ঠেকাতে এই ধারা (৭০ অনুচ্ছেদ) করা হয়েছিল।”
তার প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন, অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থবিল- এ তিন বিষয় ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দলীয় হুইপের (নির্দেশের) বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। কোনো সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য পৃথক ব্লক গঠন করতে চাইলে তা অনুমোদনযোগ্য হবে। তবে মূল দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারে দলীয় নেতৃত্বের সম্মতি লাগবে।
রাজনীতিতে নারী
সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী নারী না হলে দলীয় নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব দেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, “প্রতিটি দলের নারী প্রার্থীর হার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা দরকার।”
নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে জামানতের অঙ্ক কমানো এবং নির্বাচনী খরচের একাংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচনী খরচের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
আমলাতন্ত্র সংস্কার
বক্তব্যে আমলাতন্ত্র সংস্কারে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার মতে, অদক্ষ কর্মকর্তাদের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের’ মাধ্যমে অবসরে পাঠাতে হবে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি পদ শূন্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরপেক্ষভাবে পদগুলো পূরণ করা গেলে কর্মহীনতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
ঋণ খেলাপি
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের হিসাবে, দেশে খেলাপি ঋণ ১৯৯০ সালে ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ বেড়ে বর্তমানে ৬ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় খেলাপি ঋণের সুদ আলাদা হিসাবে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, “১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ঋণ পুনঃ তফসিলের জন্য নগদে ১০ শতাংশ অগ্রিম জমার নিয়ম ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে।”
তিনি বলেন, “একই পরিবার থেকে ব্যাংক পরিচালক থাকার সংখ্যা ২ জন থেকে বাড়িয়ে ৪ জন এবং মেয়াদ ৪ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছে।”
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা
সাবেক এই গভর্ণরের মতে, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ অবস্থায় কর প্রশাসন পূর্ণাঙ্গ ‘অটোমেশনের’ আওতায় আনার তাগিদ দেন তিনি।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের জিডিপি ১৯৭২ সালে ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।” তার আশা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
‘অহেতুক’ বিতর্ক
জাতির পিতা ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা ‘অহেতুক’ বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “বিতর্কের মীমাংসা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া ভাষণের মধ্যেই রয়েছে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধাও সব সময় অকৃত্রিম ছিল।”
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
সংস্কার প্রশ্নে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “দেশের কোনো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজনীতির বাইরে রাখার বা বাদ দেওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অবশ্যই সর্বজনীন হতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামস রহমান। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ফকরুল আলম, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও নেহরীন খান স্মৃতি তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি এয়ার কমোডর (অবসরপ্রাপ্ত) ইসফাক ইলাহী চৌধুরী।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ‘নেহরীন খান স্মৃতি তহবিল’ নামে সাহিত্যিক সম্মাননা ও শিক্ষার্থীবৃত্তি দেয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রয়াত আকবর আলি খান ও সানবিমস স্কুলের শিক্ষক প্রয়াত হামীম খান দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিলেন নেহরীন খান।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পর নেহরীন খান দেশে ফিরে আসেন। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
নির্বাচনকালীন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সেটিকে পুরোপুরি আমলাতান্ত্রিক অব্যবস্থা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন।
তিনি বলেছেন, দেশের রাজনীতিবিদেরা এ ব্যবস্থার মাধ্যমে নিজেদের ওপর নিজেরাই অনাস্থা প্রকাশ করছেন, যা মোটেও ভালো কথা নয়।
রবিবার (১২ জুলাই) ঢাকায় একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নেহরীন খান স্মৃতি বক্তৃতা ও সম্মাননা অনুষ্ঠান ২০২৬’-এ বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সাবেক এই গভর্ণরের মতে, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কারসহ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগির ব্যবস্থা করা গেলে অবস্থার অনেকটা উন্নতি হবে।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ফরাসউদ্দিন ‘সাংবিধানিক সংস্কার ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শিরোনামের লিখিত বক্তব্য দেন। বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা এবং সাংবিধানের সংস্কারের লক্ষ্যে একগুচ্ছ প্রস্তাব দেন।
ইলেকটোরাল কলেজ
বর্তমানে দেশে যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়, সেটি কেবল সংসদ সদস্যদের (এমপি) ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি একটি বৃহৎ ‘ইলেকটোরাল কলেজ’ গঠনের প্রস্তাব দেন।
তার প্রস্তাব অনুযায়ি, ইলেকটোরাল কলেজে এমপিদের পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন অথরিটির প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশনের মেয়র-কমিশনার, জেলা-উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও থাকবেন। এতে রাষ্ট্রপতি পদের মর্যাদা ও ভারসাম্যমূলক ক্ষমতা বাড়বে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সব সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, তবে নিয়োগের আগে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পরামর্শের শর্ত দেন তিনি।
সংসদে উচ্চকক্ষ
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন লিখিত বক্তব্যে ১৯৯১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত (পঞ্চম সংসদ থেকে দ্বাদশ সংসদ) নির্বাচনগুলোর উদাহরণ টেনে বলেন, ‘উইনার টেকস অল’ নীতির কারণে ভোটের ব্যবধান সামান্য হলেও আসনের ব্যবধান বহুগুণ বেড়ে যায়।
জাতীয় সংসদে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, “দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষে সদস্য নির্বাচিত হবেন। সংবিধান সংশোধন ও গুরুত্বপূর্ণ বিল পর্যালোচনার ক্ষমতা থাকবে উচ্চকক্ষের।”
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এখন একরকম নিপীড়নের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব দেন। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “ঘন ঘন ‘ফ্লোর ক্রসিং’ ঠেকাতে এই ধারা (৭০ অনুচ্ছেদ) করা হয়েছিল।”
তার প্রস্তাব, সংবিধান সংশোধন, অনাস্থা প্রস্তাব ও অর্থবিল- এ তিন বিষয় ছাড়া অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের দলীয় হুইপের (নির্দেশের) বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার অধিকার থাকা উচিত। কোনো সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য পৃথক ব্লক গঠন করতে চাইলে তা অনুমোদনযোগ্য হবে। তবে মূল দলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারে দলীয় নেতৃত্বের সম্মতি লাগবে।
রাজনীতিতে নারী
সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী নারী না হলে দলীয় নিবন্ধন বাতিলের বিধান রাখার প্রস্তাব দেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তিনি বলেন, “প্রতিটি দলের নারী প্রার্থীর হার ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা দরকার।”
নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণে জামানতের অঙ্ক কমানো এবং নির্বাচনী খরচের একাংশ সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি। নিরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচনী খরচের বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি।
আমলাতন্ত্র সংস্কার
বক্তব্যে আমলাতন্ত্র সংস্কারে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। তার মতে, অদক্ষ কর্মকর্তাদের ‘গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের’ মাধ্যমে অবসরে পাঠাতে হবে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ সরকারি পদ শূন্য রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিরপেক্ষভাবে পদগুলো পূরণ করা গেলে কর্মহীনতার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
ঋণ খেলাপি
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের হিসাবে, দেশে খেলাপি ঋণ ১৯৯০ সালে ছিল প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণ বেড়ে বর্তমানে ৬ লাখ কোটি টাকা বা মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় খেলাপি ঋণের সুদ আলাদা হিসাবে রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি বলেন, “১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ঋণ পুনঃ তফসিলের জন্য নগদে ১০ শতাংশ অগ্রিম জমার নিয়ম ছিল। বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে।”
তিনি বলেন, “একই পরিবার থেকে ব্যাংক পরিচালক থাকার সংখ্যা ২ জন থেকে বাড়িয়ে ৪ জন এবং মেয়াদ ৪ বছর থেকে বাড়িয়ে ১২ বছর করা হয়েছে।”
রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা
সাবেক এই গভর্ণরের মতে, রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ অবস্থায় কর প্রশাসন পূর্ণাঙ্গ ‘অটোমেশনের’ আওতায় আনার তাগিদ দেন তিনি।
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, “বাংলাদেশের জিডিপি ১৯৭২ সালে ছিল ১০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে ৪৬০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।” তার আশা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩৬ সালের মধ্যে দেশ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে।
‘অহেতুক’ বিতর্ক
জাতির পিতা ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, তা ‘অহেতুক’ বলে মন্তব্য করেন মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “বিতর্কের মীমাংসা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ কালুরঘাটের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে দেওয়া ভাষণের মধ্যেই রয়েছে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার শ্রদ্ধাও সব সময় অকৃত্রিম ছিল।”
অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি
সংস্কার প্রশ্নে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “দেশের কোনো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজনীতির বাইরে রাখার বা বাদ দেওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। রাজনৈতিক প্রক্রিয়া অবশ্যই সর্বজনীন হতে হবে, কাউকে বাদ দিয়ে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শামস রহমান। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ফকরুল আলম, সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও নেহরীন খান স্মৃতি তহবিলের ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি এয়ার কমোডর (অবসরপ্রাপ্ত) ইসফাক ইলাহী চৌধুরী।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ‘নেহরীন খান স্মৃতি তহবিল’ নামে সাহিত্যিক সম্মাননা ও শিক্ষার্থীবৃত্তি দেয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রয়াত আকবর আলি খান ও সানবিমস স্কুলের শিক্ষক প্রয়াত হামীম খান দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিলেন নেহরীন খান।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনার পর নেহরীন খান দেশে ফিরে আসেন। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ২০১৬ সালে ৩৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

আপনার মতামত লিখুন