সংবাদ

বিশ্বের যেসব শহরে এক মিনিটেই সরে যায় বৃষ্টির পানি


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম

বিশ্বের যেসব শহরে এক মিনিটেই সরে যায় বৃষ্টির পানি
ছবি: এআই

ঢাকায় বর্ষা বা শ্রাবণে ঝুমবর্ষণ মানেই নদী বা সাগরের দৃশ্য সামনে হাজির হওয়া। একটু বৃষ্টিতেই পানি জমে অলিগলিতে।অনেক নিচু এলাকায় ঘরে আছড়ে পড়ে বিষাক্ত নোংরা পানির ঢেউ। অফিস ছুটির সময় ঘনমেঘ দেখলেই মানুষ আগে ছাতা খোঁজে না, খোঁজে বিকল্প পথ। যে পথে গেলে হাটু বা কোমর পানি এড়ানো যাবে।

ঢাকাবাসী ভালো করেই জানেন, এক-দুই ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি রাজধানীর অনেক সড়ককে পরিণত করতে পারে অস্থায়ী খালে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে। স্কুলফেরত শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, অনেক এলাকায় বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও দুই দিন পর্যন্ত পানি নেমে যায় না।

অথচ পৃথিবীতে এমন শহরও আছে, যেখানে ভারী বর্ষণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তায় জমা পানি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। বিষয়টি কোনো জাদু নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ আর জবাবদিহির ফল।

নেদারল্যান্ডসের নাম এলে সবার আগে আসে পানির সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস। দেশটির বড় অংশই সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। তারপরও বড় শহরগুলোতে কয়েক মিনিটের বেশি পানি দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক ঘটনা। কারণ সেখানে বৃষ্টির পানি দ্রুত সংগ্রহ ও নিষ্কাশনের জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, পাম্পিং স্টেশন এবং জলাধার একসঙ্গে কাজ করে। কোথাও একটি অংশ ব্যর্থ হলেও অন্য ব্যবস্থা চাপ সামলে নেয়।

জাপানের টোকিও আরেকটি বিস্ময়। প্রবল বর্ষণ ও টাইফুনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শহরের নিচে নির্মিত হয়েছে বিশাল ভূগর্ভস্থ বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো। অতিরিক্ত পানি মুহূর্তের মধ্যে বিশাল সুড়ঙ্গ ও রিজার্ভারে প্রবাহিত হয়। ফলে নাগরিক জীবন খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।

সিঙ্গাপুরে বৃষ্টি প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। কিন্তু শহরটির ড্রেনগুলো শুধু কংক্রিটের নালা নয়; পুরো নগরকে একটি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। পার্ক, খাল, জলাধার, খোলা সবুজ এলাকা এবং ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে ভারী বৃষ্টির পরও অধিকাংশ সড়ক দ্রুত চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মেনে শহরকে নতুন করে সাজিয়েছে। সেখানে অনেক রাস্তা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত পানি নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়ে অস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হতে পারে। এতে বসতিপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না।

এই উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে। কোথাও কেবল বড় ড্রেন বানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়নি। নিয়মিত পরিষ্কার, ভবিষ্যতের বৃষ্টিপাত মাথায় রেখে নকশা, জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখল রোধ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কাজ- এসবই সফলতার ভিত্তি।

এসব জানার পর যদি একবার ঢাকার দিকে তাকানো যায় নিশ্চিত মাথা ঘুরতে পারে। কারণ অভিজ্ঞতা সবার প্রায় একই।রাজধানীতে বৃষ্টি হলেই বোঝা যায় শহরটি প্রকৃতির জন্য নয়। বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধে নির্মিত হয়েছে। বহু খাল ভরাট হয়েছে, জলাধার হারিয়ে গেছে, নিচু এলাকা নির্বিচারে ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসন।

শুধু কি তাই? ড্রেনের বড় অংশ প্লাস্টিক, পলিথিন ও আবর্জনায় বন্ধ। কোথাও ড্রেন আছে, কিন্তু তার সঙ্গে খাল বা প্রধান নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নেই। কোথাও আবার একটি সংস্থা রাস্তা খুঁড়ছে, অন্য সংস্থা ড্রেন বানাচ্ছে, আরেকটি সংস্থা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে- কিন্তু সমন্বয় নেই।

এমন ভয়ঙ্কর সমন্বয়হীনতার ফল ভোগ করেন সাধারণ মানুষ। একজন দিনমজুরের আয় নষ্ট হয়, একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে যায়। হাজারো গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ায়। জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ আর নাগরিক মর্যাদারও প্রশ্ন।

একটি আধুনিক রাজধানীতে নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। অন্তত এটুকু তো প্রত্যাশা করা যায় যে, দুই ঘণ্টার বৃষ্টির পানি দুই দিন ধরে রাস্তায় পড়ে থাকবে না। যে শহর নিজেকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে জলাবদ্ধতা ব্যতিক্রম হতে পারে; নিয়ম নয়।

ঢাকার মানুষ হতাশ সুরে প্রায়ই বলেন, “এটাই আমাদের ভাগ্য।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি ভাগ্যের বিষয় নয়। এটি পরিকল্পনার বিষয়। বিশ্বের বহু শহর আমাদের চেয়ে বেশি বৃষ্টি, বড় নদী কিংবা সমুদ্রের ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে আছে। তবু তারা নগরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যেখানে বৃষ্টি জীবন থামিয়ে দেয় না।

শেষে প্রশ্নটি খুবই সরল- পরিবেশ-প্রকৃতি কি তাহলে ঢাকার বিরুদ্ধে? নাকি আমরা নিজেরাই ঢাকাকে এমন এক শহরে পরিণত করেছি, যেখানে সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিও নাগরিক জীবনকে নরকযন্ত্রণায় ঠেলে দেয়? যদি পৃথিবীর অন্য শহরগুলো কয়েক মিনিটে বৃষ্টির পানি সরিয়ে নিতে পারে, তাহলে ঢাকার মানুষেরও নিশ্চয়ই সেই অধিকার আছে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬


বিশ্বের যেসব শহরে এক মিনিটেই সরে যায় বৃষ্টির পানি

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image

ঢাকায় বর্ষা বা শ্রাবণে ঝুমবর্ষণ মানেই নদী বা সাগরের দৃশ্য সামনে হাজির হওয়া। একটু বৃষ্টিতেই পানি জমে অলিগলিতে।অনেক নিচু এলাকায় ঘরে আছড়ে পড়ে বিষাক্ত নোংরা পানির ঢেউ। অফিস ছুটির সময় ঘনমেঘ দেখলেই মানুষ আগে ছাতা খোঁজে না, খোঁজে বিকল্প পথ। যে পথে গেলে হাটু বা কোমর পানি এড়ানো যাবে।

ঢাকাবাসী ভালো করেই জানেন, এক-দুই ঘণ্টার ভারী বৃষ্টি রাজধানীর অনেক সড়ককে পরিণত করতে পারে অস্থায়ী খালে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি। গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। অ্যাম্বুলেন্স আটকে থাকে। স্কুলফেরত শিশুরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, অনেক এলাকায় বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পরও দুই দিন পর্যন্ত পানি নেমে যায় না।

অথচ পৃথিবীতে এমন শহরও আছে, যেখানে ভারী বর্ষণের কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাস্তায় জমা পানি প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়। বিষয়টি কোনো জাদু নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, প্রকৌশল, রক্ষণাবেক্ষণ আর জবাবদিহির ফল।

নেদারল্যান্ডসের নাম এলে সবার আগে আসে পানির সঙ্গে লড়াইয়ের ইতিহাস। দেশটির বড় অংশই সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে। তারপরও বড় শহরগুলোতে কয়েক মিনিটের বেশি পানি দাঁড়িয়ে থাকা অস্বাভাবিক ঘটনা। কারণ সেখানে বৃষ্টির পানি দ্রুত সংগ্রহ ও নিষ্কাশনের জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল, পাম্পিং স্টেশন এবং জলাধার একসঙ্গে কাজ করে। কোথাও একটি অংশ ব্যর্থ হলেও অন্য ব্যবস্থা চাপ সামলে নেয়।

জাপানের টোকিও আরেকটি বিস্ময়। প্রবল বর্ষণ ও টাইফুনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শহরের নিচে নির্মিত হয়েছে বিশাল ভূগর্ভস্থ বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো। অতিরিক্ত পানি মুহূর্তের মধ্যে বিশাল সুড়ঙ্গ ও রিজার্ভারে প্রবাহিত হয়। ফলে নাগরিক জীবন খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসে।

সিঙ্গাপুরে বৃষ্টি প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। কিন্তু শহরটির ড্রেনগুলো শুধু কংক্রিটের নালা নয়; পুরো নগরকে একটি সমন্বিত জলব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। পার্ক, খাল, জলাধার, খোলা সবুজ এলাকা এবং ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে ভারী বৃষ্টির পরও অধিকাংশ সড়ক দ্রুত চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে।

ডেনমার্কের কোপেনহেগেন জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা মেনে শহরকে নতুন করে সাজিয়েছে। সেখানে অনেক রাস্তা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত পানি নির্দিষ্ট পথে প্রবাহিত হয়ে অস্থায়ীভাবে সংরক্ষিত হতে পারে। এতে বসতিপূর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয় না।

এই উদাহরণগুলোর মধ্যে একটি মিল রয়েছে। কোথাও কেবল বড় ড্রেন বানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা হয়নি। নিয়মিত পরিষ্কার, ভবিষ্যতের বৃষ্টিপাত মাথায় রেখে নকশা, জলাধার সংরক্ষণ, অবৈধ দখল রোধ এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত কাজ- এসবই সফলতার ভিত্তি।

এসব জানার পর যদি একবার ঢাকার দিকে তাকানো যায় নিশ্চিত মাথা ঘুরতে পারে। কারণ অভিজ্ঞতা সবার প্রায় একই।রাজধানীতে বৃষ্টি হলেই বোঝা যায় শহরটি প্রকৃতির জন্য নয়। বরং প্রকৃতির বিরুদ্ধে নির্মিত হয়েছে। বহু খাল ভরাট হয়েছে, জলাধার হারিয়ে গেছে, নিচু এলাকা নির্বিচারে ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসন।

শুধু কি তাই? ড্রেনের বড় অংশ প্লাস্টিক, পলিথিন ও আবর্জনায় বন্ধ। কোথাও ড্রেন আছে, কিন্তু তার সঙ্গে খাল বা প্রধান নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নেই। কোথাও আবার একটি সংস্থা রাস্তা খুঁড়ছে, অন্য সংস্থা ড্রেন বানাচ্ছে, আরেকটি সংস্থা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে- কিন্তু সমন্বয় নেই।

এমন ভয়ঙ্কর সমন্বয়হীনতার ফল ভোগ করেন সাধারণ মানুষ। একজন দিনমজুরের আয় নষ্ট হয়, একজন রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না। একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিক্রি কমে যায়। হাজারো গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে আটকে থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি পোড়ায়। জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ আর নাগরিক মর্যাদারও প্রশ্ন।

একটি আধুনিক রাজধানীতে নাগরিকের প্রত্যাশা খুব বেশি হওয়ার কথা নয়। অন্তত এটুকু তো প্রত্যাশা করা যায় যে, দুই ঘণ্টার বৃষ্টির পানি দুই দিন ধরে রাস্তায় পড়ে থাকবে না। যে শহর নিজেকে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে জলাবদ্ধতা ব্যতিক্রম হতে পারে; নিয়ম নয়।

ঢাকার মানুষ হতাশ সুরে প্রায়ই বলেন, “এটাই আমাদের ভাগ্য।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, এটি ভাগ্যের বিষয় নয়। এটি পরিকল্পনার বিষয়। বিশ্বের বহু শহর আমাদের চেয়ে বেশি বৃষ্টি, বড় নদী কিংবা সমুদ্রের ঝুঁকি নিয়ে বেঁচে আছে। তবু তারা নগরকে এমনভাবে গড়ে তুলেছে, যেখানে বৃষ্টি জীবন থামিয়ে দেয় না।

শেষে প্রশ্নটি খুবই সরল- পরিবেশ-প্রকৃতি কি তাহলে ঢাকার বিরুদ্ধে? নাকি আমরা নিজেরাই ঢাকাকে এমন এক শহরে পরিণত করেছি, যেখানে সামান্য কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিও নাগরিক জীবনকে নরকযন্ত্রণায় ঠেলে দেয়? যদি পৃথিবীর অন্য শহরগুলো কয়েক মিনিটে বৃষ্টির পানি সরিয়ে নিতে পারে, তাহলে ঢাকার মানুষেরও নিশ্চয়ই সেই অধিকার আছে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত