সংবাদ

জানাজা এক মঞ্চে, উৎসব অন্য মঞ্চে


জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

জানাজা এক মঞ্চে, উৎসব অন্য মঞ্চে
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজার পর নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি লোক জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। ইরানিদের মতে এই শোকসভা ও জানাজা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’। ৩ জুলাই শুক্রবার থেকে তার মরদেহ তেহরানের গ্র্যাণ্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা ছিল। গতকাল থেকে তিন দিন তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তেহরানের আকাশসীমাও বন্ধ ছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ খামেনির জানাজায় যোগ দিয়েছেন। প্রায় ৮০ বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করেছেন। জানাজা নিয়ে বর্তমানে রাজনীতি হয়। বিরাট আকারের জানাজা জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জনপ্রিয় হলেও জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা ও দাফন সবার ভাগ্যে জোটে না। জোটেনি আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনের ভাগ্যেও। তাকে হত্যা করেছে আমেরিকা। কোনো দেশ তার মরদেহ গ্রহণ করতে রাজি ছিল না, সউদি আরবের সম্মতিতে তাকে সমুদ্রে সমাহিত করা হয়। জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা জোটেনি ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফির ভাগ্যেও। এই দুইজন শাসক নিজ দেশে জনপ্রিয় ছিলেন। খামেনির ভাগ্যেও এমন জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জুটত না, যদি আমেরিকা বিজয়ী হতো। গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কবরের মাটিও পায়নি। প্রকৃতপক্ষে অনুকূল পরিবেশ হলে জানাজা বড় হয়, ঐতিহাসিক হয়, আর প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর মরদেহের গোসল হয়েছিল ‘বাংলা’ সাবান দিয়ে। অনুকূল পরিবেশের জন্য ইরান চার মাস অপেক্ষা করেছে। এই চার মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, হাজার হাজার ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, শত শত ইরানি মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু ইরান পরাজিত হয়নি। পৃথিবীর দুটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান একটি অনুকূল পরিবেশে আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করল। আলী খামেনির জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করে ইরান সারা পৃথিবীর সমীহ আদায় করে নিয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্র নেতা, বেসামরিক ব্যক্তি। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি। তারপরও তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ইরানের অভিযোগ। এই হত্যার বিচার চাওয়ার সাহস কেউ দেখাচ্ছে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বেচ্ছাচারিতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রভাবশালী অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাল মেলায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তৃতীয় বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে ধমক দিতে পারে, ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। প্রতিবাদের জায়গা কম। ইরান কিন্তু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ও নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান না থাকা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দফায় দফায় হামলা করে ইরানের সরকারবিরোধী শক্তিকে সরকার উৎখাতে ডেকেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। কারণ ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী মত দমনে রাষ্ট্র কঠোর ছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য ইরানিকে গুলি করে, ফাঁসি দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে আমেরিকার ডাকে সাড়া না দেওয়ার প্রধান কারণ সরকারের নিষ্ঠুরতম দমন-পীড়ন নয়, ইরানিদের স্বদেশ প্রেম। লিবিয়া, ইরাক, ভেনিজুয়েলার মতো সরকারবিরোধী দেশত্যাগী ইরানি বেশি নয়, বরং খোমেনি সরকারের ভয়ে যারা দেশ ছেড়েছিলেন, যুদ্ধের সময় অনেকে ফিরে এসেছে। মাইশা আমিনীর মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই বিদ্রোহীরাও যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে রাস্তায় নামেনি। আমেরিকার বিরুদ্ধে এটাই ইরানের প্রতিবাদের অভিনবত্ব। ইরানের আরও নাটকীয় বিষয় হলো, খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ’তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর দিনে। এমন দিনে পাকিস্তান ও তুরস্ক ছাড়া আর কোনো মুসলিম দেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠায়নি। এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিভাজন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রভীতি ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি দুটোই কাজ করেছে। শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে কূটনৈতিক হুমকিও দিয়েছে যেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। সাদ্দাম বা গাদ্দাফির মতো সাহস দেখাতে গেলে বিএনপির ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। ইরান বিএনপি সরকারের জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়, ইরান শুধু কম দামে তেল দিতে পারে, কিন্তু সেই তেল কিনতেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি লাগে। তাই বর্তমান সরকারের যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি বাস্তবতার হিসাব। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই প্রীতি দরকার। বাংলাদেশ সরকারের ভয় আর প্রীতির ধরন ভিন্ন। ‘ঢাকা না দিল্লি’ স্লোগান ঠুনকো। দিল্লিকে খুশি রাখতে আম আর ইলিশ যায়, ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়। এমন নির্লজ্জ আয়োজন বাংলাদেশ আগে আর দেখেনি। অবশ্য ক্ষমতা নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে সরকারের জন্য এটি কৌশলও হতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন মার্কিন জাতীয় সঙ্গীতের তালে দাঁড়িয়ে পতাকাকে সম্মান জানাল, তা বোধগম্য নয়, অথচ জামায়াতের অনেকেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়াতে চান না। বিএনপি আর জামায়াতের নীতি ও স্বার্থ এখন এক ও অভিন্ন জায়গায় মিলেছে। এই মিলন কিন্তু দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই মিলিত নীরবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম চুক্তি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এই মিলিত সুরে সরকার ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে। তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। ট্রাম্প বলেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। দুই ফার্স্টের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়েছে। পারস্পরিক অংশীদারিত্বে তখন কূটনৈতিক বাক্য ছাড়া আর কিছু থাকে না। বিএনপি আগেও যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করেছে। আমেরিকা অসন্তুষ্ট হবে এই ভয়ে গাজায় হতাহতের নিন্দা করেনি বিএনপি। আশ্চর্যের বিষয়, বাম ও ইসলামপন্থীদের একটি অংশও এখন একই পথে। যারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে কথা বলে, তারাই এখন প্যালেস্টাইন ও ইরানের বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন করছে। জামায়াতের আমির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। তার মতে, পরীক্ষিত বন্ধু ১৯৭১ থেকেই। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জবাব আসে ‘তখন আমি ছোট ছিলাম’। কিন্তু একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তার মনে আছে। সত্য হলো, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তান ও রাজাকারদের। সেই অস্ত্রের আঘাতে মরেছে বাঙালি ও আদিবাসী। বাংলাদেশের স্বার্থে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কখনো পরীক্ষা দেয়নি। চীনের কারণে ১৯৭৪ সালের আগে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাঝসমুদ্র থেকে গমের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছিল। খামেনির জানাজা শুধু একটি মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল শক্তির প্রদর্শনীও। যারা ভেঙেছে তারাই আবার জড়ো করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শোক আর উৎসব পাশাপাশি চলে। নীতির প্রশ্ন তখন ক্ষমতার হিসাবের কাছে হেরে যায়। আমরা যখন অন্যের ট্র্যাজেডিতে নীরব আর অন্যের উৎসবে সরব হই, তখন নিজেদের অবস্থানটাই দুর্বল হয়। কারণ ইতিহাস জানাজাও মনে রাখে, আবার নীরবতাও। (লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬


জানাজা এক মঞ্চে, উৎসব অন্য মঞ্চে

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর গত বৃহস্পতিবার ৯ জুলাই ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজার পর নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হয়েছে। প্রায় ২ কোটি লোক জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে। ইরানিদের মতে এই শোকসভা ও জানাজা ‘শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’। ৩ জুলাই শুক্রবার থেকে তার মরদেহ তেহরানের গ্র্যাণ্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা ছিল। গতকাল থেকে তিন দিন তেহরানের সরকারি ও বেসরকারি অফিস এবং ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তেহরানের আকাশসীমাও বন্ধ ছিল। বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং মন্ত্রী অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ খামেনির জানাজায় যোগ দিয়েছেন। প্রায় ৮০ বিদেশি সাংবাদিক এই অনুষ্ঠান কভার করেছেন। জানাজা নিয়ে বর্তমানে রাজনীতি হয়। বিরাট আকারের জানাজা জনপ্রিয়তার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জনপ্রিয় হলেও জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা ও দাফন সবার ভাগ্যে জোটে না। জোটেনি আল কায়দার নেতা ওসামা বিন লাদেনের ভাগ্যেও। তাকে হত্যা করেছে আমেরিকা। কোনো দেশ তার মরদেহ গ্রহণ করতে রাজি ছিল না, সউদি আরবের সম্মতিতে তাকে সমুদ্রে সমাহিত করা হয়। জাঁকজমকপূর্ণ জানাজা জোটেনি ইরাকের সাদ্দাম হোসেন বা লিবিয়ার গাদ্দাফির ভাগ্যেও। এই দুইজন শাসক নিজ দেশে জনপ্রিয় ছিলেন। খামেনির ভাগ্যেও এমন জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া জুটত না, যদি আমেরিকা বিজয়ী হতো। গাজায় হাজার হাজার ফিলিস্তিনি কবরের মাটিও পায়নি। প্রকৃতপক্ষে অনুকূল পরিবেশ হলে জানাজা বড় হয়, ঐতিহাসিক হয়, আর প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর মরদেহের গোসল হয়েছিল ‘বাংলা’ সাবান দিয়ে। অনুকূল পরিবেশের জন্য ইরান চার মাস অপেক্ষা করেছে। এই চার মাসে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে, হাজার হাজার ভবন মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, শত শত ইরানি মৃত্যুবরণ করেছে, কিন্তু ইরান পরাজিত হয়নি। পৃথিবীর দুটি শক্তিশালী দেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইরান একটি অনুকূল পরিবেশে আলী খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করল। আলী খামেনির জাঁকজমকপূর্ণ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করে ইরান সারা পৃথিবীর সমীহ আদায় করে নিয়েছে। আয়াতুল্লাহ খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ও রাষ্ট্র নেতা, বেসামরিক ব্যক্তি। তিনি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি। তারপরও তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে ইরানের অভিযোগ। এই হত্যার বিচার চাওয়ার সাহস কেউ দেখাচ্ছে না। কারণ বর্তমান বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের স্বেচ্ছাচারিতা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটো, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়াসহ প্রভাবশালী অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তাল মেলায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তৃতীয় বিশ্বের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে ধমক দিতে পারে, ক্ষমতাচ্যুত করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। প্রতিবাদের জায়গা কম। ইরান কিন্তু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা ও নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান না থাকা সত্ত্বেও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে ছেড়ে কথা বলেনি। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দফায় দফায় হামলা করে ইরানের সরকারবিরোধী শক্তিকে সরকার উৎখাতে ডেকেছে, কিন্তু কাজ হয়নি। কারণ ইরানের ভেতরে সরকারবিরোধী মত দমনে রাষ্ট্র কঠোর ছিল। সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য ইরানিকে গুলি করে, ফাঁসি দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। তবে আমেরিকার ডাকে সাড়া না দেওয়ার প্রধান কারণ সরকারের নিষ্ঠুরতম দমন-পীড়ন নয়, ইরানিদের স্বদেশ প্রেম। লিবিয়া, ইরাক, ভেনিজুয়েলার মতো সরকারবিরোধী দেশত্যাগী ইরানি বেশি নয়, বরং খোমেনি সরকারের ভয়ে যারা দেশ ছেড়েছিলেন, যুদ্ধের সময় অনেকে ফিরে এসেছে। মাইশা আমিনীর মৃত্যুর পর যে আন্দোলন হয়েছিল, সেই বিদ্রোহীরাও যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে রাস্তায় নামেনি। আমেরিকার বিরুদ্ধে এটাই ইরানের প্রতিবাদের অভিনবত্ব। ইরানের আরও নাটকীয় বিষয় হলো, খামেনির দাফনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আড়াইশ’তম স্বাধীনতা বার্ষিকীর দিনে। এমন দিনে পাকিস্তান ও তুরস্ক ছাড়া আর কোনো মুসলিম দেশ সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠায়নি। এর পেছনে রয়েছে ধর্মীয় বিভাজন। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রভীতি ও যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি দুটোই কাজ করেছে। শোনা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে কূটনৈতিক হুমকিও দিয়েছে যেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি চ্যালেঞ্জ করার মতো অবস্থা আমাদের নেই। সাদ্দাম বা গাদ্দাফির মতো সাহস দেখাতে গেলে বিএনপির ক্ষমতা নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। ইরান বিএনপি সরকারের জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়, ইরান শুধু কম দামে তেল দিতে পারে, কিন্তু সেই তেল কিনতেও যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি লাগে। তাই বর্তমান সরকারের যুক্তরাষ্ট্রপ্রীতি বাস্তবতার হিসাব। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এই প্রীতি দরকার। বাংলাদেশ সরকারের ভয় আর প্রীতির ধরন ভিন্ন। ‘ঢাকা না দিল্লি’ স্লোগান ঠুনকো। দিল্লিকে খুশি রাখতে আম আর ইলিশ যায়, ওয়াশিংটনকে খুশি রাখতে জাতীয় সংসদ ভবন চত্বরে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন হয়। এমন নির্লজ্জ আয়োজন বাংলাদেশ আগে আর দেখেনি। অবশ্য ক্ষমতা নির্বিঘ্ন রাখার স্বার্থে সরকারের জন্য এটি কৌশলও হতে পারে। কিন্তু বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন মার্কিন জাতীয় সঙ্গীতের তালে দাঁড়িয়ে পতাকাকে সম্মান জানাল, তা বোধগম্য নয়, অথচ জামায়াতের অনেকেই দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সময় দাঁড়াতে চান না। বিএনপি আর জামায়াতের নীতি ও স্বার্থ এখন এক ও অভিন্ন জায়গায় মিলেছে। এই মিলন কিন্তু দেশের জন্য অশনিসংকেত। এই মিলিত নীরবতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি অসম চুক্তি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। এই মিলিত সুরে সরকার ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠবে। তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’। ট্রাম্প বলেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। দুই ফার্স্টের লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থই অগ্রাধিকার পেয়েছে। পারস্পরিক অংশীদারিত্বে তখন কূটনৈতিক বাক্য ছাড়া আর কিছু থাকে না। বিএনপি আগেও যুক্তরাষ্ট্রকে তুষ্ট করেছে। আমেরিকা অসন্তুষ্ট হবে এই ভয়ে গাজায় হতাহতের নিন্দা করেনি বিএনপি। আশ্চর্যের বিষয়, বাম ও ইসলামপন্থীদের একটি অংশও এখন একই পথে। যারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলে, ভারতীয় আধিপত্য নিয়ে কথা বলে, তারাই এখন প্যালেস্টাইন ও ইরানের বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ থাকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস পালন করছে। জামায়াতের আমির বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু। তার মতে, পরীক্ষিত বন্ধু ১৯৭১ থেকেই। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জবাব আসে ‘তখন আমি ছোট ছিলাম’। কিন্তু একাত্তরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা তার মনে আছে। সত্য হলো, ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন অস্ত্র দিয়েছে পাকিস্তান ও রাজাকারদের। সেই অস্ত্রের আঘাতে মরেছে বাঙালি ও আদিবাসী। বাংলাদেশের স্বার্থে চীন বা যুক্তরাষ্ট্র কখনো পরীক্ষা দেয়নি। চীনের কারণে ১৯৭৪ সালের আগে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। ১৯৭৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাঝসমুদ্র থেকে গমের জাহাজ ফিরিয়ে নিয়ে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ তৈরি করেছিল। খামেনির জানাজা শুধু একটি মৃত্যুর আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, এটি ছিল শক্তির প্রদর্শনীও। যারা ভেঙেছে তারাই আবার জড়ো করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন আমাদের মনে করিয়ে দিল, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শোক আর উৎসব পাশাপাশি চলে। নীতির প্রশ্ন তখন ক্ষমতার হিসাবের কাছে হেরে যায়। আমরা যখন অন্যের ট্র্যাজেডিতে নীরব আর অন্যের উৎসবে সরব হই, তখন নিজেদের অবস্থানটাই দুর্বল হয়। কারণ ইতিহাস জানাজাও মনে রাখে, আবার নীরবতাও। (লেখকের নিজস্ব মত) [লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক]

সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত