অণুজীবদেরও
আন্দোলন হয়, বিপ্লব হয়,
তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, যাকে
মানুষ নাম দেয় মহামারি,
অতিমারি— শত্রুতা মেশালে কোনো কিছু যেমন
হয়| তো মানুষের হৃদয়ের
অণুজীবের উত্থানকে কী নামে ডাকা
যায়? হৃদয়মারি? করোনার মতো পিষে দেওয়া
ছোঁয়াচে হৃদয় থেকে মানুষ
মুক্তির জন্য প্রাণপণ কী
চেষ্টাই না করেন| অথচ
এই হৃদয় কার? মানুষেরই
তো, তাই না| এ
হৃদয় মাটির নয়, এ হৃদয়
পাখির নয়, এ হৃদয়
গাছের নয়, এ হৃদয়
হাওয়ার নয়, এ হৃদয়
রোদেরও না, এ হৃদয়
লতাগুল্মেরও নয়, এই হৃদয়মারি
হৃদয়ও মানুষেরই| এমন সংক্রমণ ছড়াতে
শুরু করলে আক্রান্তের আকাশও
ছোট হয়ে যায়, হাসপাতালগুলো
বোবা হয়ে যায়, ডাক্তারেরা
আকাশ আর সমুদ্রের দিকে
তাকিয়ে থাকে, সবুজ বনানীর দিকে
তাকিয়ে থাকে| আর এসব বালাই
যদি নিজের হেরেমেই নেমে আসে, তাহলে
উপায় কী? জীবন তাহলে
কত গভীর দগ্ধতার গহিনে
নেমে যেতে পারে, ভাবতে
পারছি না|
মাহফুজা
অনন্যার ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’র কবিতাগুলো পড়া
শুরু করতেই এই ভাবনাগুলো বুনো
মেঘের মতো উড়ে উড়ে
নিজের ভাবনার উঠানে হাজির হয়েছে| অস্তিত্বগত সংকটে এই গৃহ কোনো
বস্তুগৃহ নয়, রক্ত-মাংসের
গৃহ, অবদমিত হৃদয়ের ছাপচিত্রের গ্যালারি, যেখানে রূপকের ভেতর দিয়ে যৌথ
যাপনের হেরেম খুলে বেরিয়ে পড়ে
নিজের সমূহ দরোজা, প্রকাশ
পায় বিষাক্ত নীরব কলহ, মানসিক
জটিলতা, সম্পর্কের শীতল টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক
সমরে হৃদয়ের উত্তাল ঢেউয়ে সম্পর্কের ক্রমাগত পাড়ভাঙন| ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’ নামের কবিতাটি যেন এই বইয়ের
কাণ্ড| এর কিছু শব্দজোড়
উল্লেখ করলে আরও পরিষ্কার
বোঝা যাবে, যেমন ‘নোনা নীরবতা’, ‘কান্নার
ছত্রাক’, ‘নিঃশব্দ অনুতাপ’, ‘ভালোবাসার জীবাণু’, ‘অবহেলার সংক্রমণ’, ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’, ‘নীরব মহামারি’ ইত্যাদি|
গৃহ যে মরচে ধরা
অভিমানের ইট-সুরকিতে পড়ো-পড়ো হতে পারে,
তা অনন্যার কবিতার পরতে পরতে লক্ষ
করা যায়|
এই
যে কলাহলপূর্ণ সম্পর্কবাহী আধুনিক জীবন, এখানে নদীর উচ্ছল ঢেউও
যেন ক্যাওসে রূপ নেয়, বিবর্ধিত
মানসবেদনার জলে আকীর্ণ হয়,
সর্বদা ভালোবাসা, ভয় ও অবিশ্বাস
পাশাপাশি ভেলার মতো ভাসতে থাকে,
ঘনিষ্ঠ সংযোগও অজানা আতঙ্কে ঢাকা পড়ে যায়,
প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ চাঁদ হয়ে যাওয়ার
নীরব ভয়ও প্রকট হয়,
নির্মল তরুণ-তরুণীপূর্ব জীবনের
সম্পর্ক এসে উঁকি দেয়
যাপিত বর্তমান অপুষ্ট সম্পর্কের জাঁতাকলের সংসারে| এই ধরনের বিট্রেয়াল
ট্রমায় যেন আজকের দুনিয়া
হাবুডুবু খাচ্ছে [গর্ভাশয়ের ভিতর রক্তকবরী ফুল/
অন্ধকারের যোনি ছিঁড়ে আলোয়
আসার পর/ হাতে থাকে
একগুচ্ছ ভুলের তোড়া!]|
ব্যক্তির
অস্তিত্বগত উদ্বেগের সঙ্গে যখন সমাজ ও
রাষ্ট্রের ‘হত্যাবিদ্যা’র উৎসব যুক্ত
হয়, তখন তা রূপ
নেয় মনস্তত্ত্বে ঘটে যাওয়া এক
মহাজাগতিক বিপর্যয়ে| অনন্যার কবিতার এইটা একটা রূপ,
যেখানে ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি ও
বিপন্নতাবোধ মিশে যায় সামষ্টিক
মানুষিক দুর্যোগায়িত দৃশ্যকল্পে, মারাত্মক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভুতুড়ে পরিবেশে ছেয়ে যায় তার
প্রতিবেশ [মুণ্ডু থেঁতলে যবনিকা উৎসব/ বধির বেটোফেন ফজলুল
হক হল’]| সময়ের করুণ ও হতাশাজনক
ছাপও তার কবিতায় ফুটে
ওঠে| চরম জাতীয় বিপন্নতা
ও বধির সময়ে সুশীল
সমাজও কতটা কানহীন হয়ে
পড়ে, বোবা বনে যায়,
সেটাও করুণ ব্যঙ্গাত্মকভাবে এসেছে
অনন্যার কবিতায় [ নিরুত্তর ফুটপাথ, ওপরে ছাত্রসমাজ/ বাইরে
ইলিশেরে মতো হা করে
থাকো সুশীল]|
দুনিয়ার
বীভৎসতম মানব-চাপ যে
কখনো কখনো কোনো কোনো
সময়কে বিপর্যয়চূড়া করে তার একটা
উদাহরণ যেন চব্বিশের জুলাই-আগস্ট| কবি এখানে এসে
মানুষের যে বোধোহয় হয়,
মাটির কাছের মানুষেরা যে অবহেলিত হতে
হতে অবশেষে নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের বন্দুকের নলের সামনে বুক
টানটান করে দাঁড়ায়, প্রতিরোধ
চূড়া ˆতরি করে, তাতে
কবি নিজেও শরিক হন, কারণ
সেও তো সকলের যাতনার
সামষ্টিক গরল ধারণ করেন|
দ্বিচারিতা
যে এই মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত, ষড়রিপুর
তাড়ায় বিক্ষিপ্ত দুনিয়ায় আরেক মারি, তা
কবি নিজের স্বদেশের, নিজের ভূখণ্ডের মানুষের মনোবিকলন থেকে পরিষ্কার বুঝেছেন
[ভাস্কর্য ভাঙলে যারা কাঁদে/ খুলি
উড়ে গেলে তারা উল্লাস
করে...নির্জীবের মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি]| আর
মানুষ যে সহজ বিস্মরণগামী,
তা-ও আক্ষেপের সঙ্গে
ব্যক্ত করেছেন ‘রক্তে আঁকা গ্রাফিতি’ নামের
কবিতায়|
জল
পাথরকে ডুবিয়ে দিতে পারে, কিন্তু
তাকে ভেদ করতে পারে
না| এই মর্ম মাহফুজা
অনন্যা খুব করে বুঝেছিল|
মানুষও এমন কিছু অভিজ্ঞানের
মুখোমুখি হয় যা অবিদীর্ণ
দেয়ালে ঘেরা থাকে| হৃদয়ের
কিছু ভূগোল থাকে, সেই ভূগোলের কিছু
শস্য থাকে যা ভেদ
করা যায় না— যাকে
কবি ‘বুলেটপ্রুফ দুঃখ’ বলে অভিহিত করেন|
কিছু দুঃখ এমন, যা
পুরাহৃদয়ের এক খনি, যার
অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে ফেলতে গেলে নিজের অস্তিত্বই
বিলীন করতে প্রস্তুত হয়|
তবু জীবন আকাশের মতো
বহমান, কিছু রোদ, কিছু
বৃষ্টি এসে ‘ছুঁলেই জ্বলে
ওঠে শরীরের মানচিত্র’|
মাহফুজা
অনন্যার চিন্তাদরিয়ায় যে পরিবেশ-সচেতনতার
ঢেউও আছে, তা টের
পাওয়া তার কবিতার আইল
ধরে হাঁটলে [নদীগুলো দড়ির মতো শুকিয়ে
যাচ্ছে]| জীবনের অন্ধকার স্তরগুলো যেন কবি খুব
কাছ থেকে অবলোকন করেছেন,
বুঝেছেন আঁধারই পরম সত্য, পর্দার
মতো আগলে রাখে নিজের
সব মুদ্রাদোষকেও [পুড়তে হলে অন্ধকারই ভালো]|
তিনি দেখেন, আধুনিক সম্পর্ক-জমিনের সবকিছুই ঠিকঠাক আছে— উর্বর, ফসলি
জমি; কিন্তু কোনো বীজও জন্মায়
না সেখানে, অনেক বীজের ভ্রূণই
হয় না, কোনোটার হলেও
তা পাতা হওয়া অবধি
[না, তা প্রেম নয়,
আত্মার মিসফায়ার/ প্রেম ছিল না, ছিল
একটা থার্ড পার্টি অ্যাপ]| মানবহৃদয় যেন আজ অজানা
এক রোগে আক্রান্ত, এই
একুশের মানবজমিন যেন ইটভাটার নিকটবর্তী
খেত, সহজে ফসল ফলতে
চায় না [আমাদের শরীর
যেন চুক্তিবদ্ধ দেশ/ যেখানে ঠোঁটের
ওপর স্থাপিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি]|
রোমান্টিক
দুনিয়ার সংকট যা, আমাদের
একেকজন মানুষের জীবনেও বুঝি তা-ই—
উত্তাল দরিয়া, যেখানে এই শান্ত ফিনফিনে
বাতাস, হিমেল ছোঁয়া, এই উন্মাদ ঝড়,
এই মেঘের মিছিল; তবু মানুষ সমুদ্র
চায়, প্রেমে পড়ে, কিন্তু সেখানে
থাকে নীরব ঘাতক, মুখোশের
মুখোশ [যেখানে তুমি ছিলে স্নাইপার
চুমু...ভালোবাসা’ শব্দটা/ একধরনের সাইলেন্ট মিসাইল]| জটিলতর রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো প্রেম, সংসার
ও পেশাগত জীবন— বহু প্রতিক্রিয়ায়, বহু
অবহেলায় গ্রীষ্মকালীন মাঠ হয়ে যায়
যেন মাটির নরোম স্তনগুলো, শুঁটকির
মতো শুকিয়ে যায়| তো অনন্যার
কবিতা যত খোঁড়া হবে
ততই মানবজীবনের এটারনাল অ্যাংজাইটির লাভা বেরিয়ে আসবে,
উত্তরাধুনিক জীবনের নানা রূপ ও
দিক বেরিয়ে আসবে| তার কিছু কবিতাংশ
পড়া যাক— ‘অবহেলার পঞ্চম সংকলন’, ‘জীবন এখন একটা
অ্যাপ/ ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড/ ডু নট শেয়ার
উইথ এনিওয়ান—/ তবু হ্যাক হয়ে
যায় মাঝে মাঝে’, ‘জীবন
একটা সার্চ ইঞ্জিন/ অর্থ খুঁজতে গিয়ে
ভুল লিংকে ঢুকে যাই’, ‘হৃদয়
: ড্যামেজড হার্ডড্রাইভ’, ‘বুকের ভেতর যা আছে/
তা একটা করাপ্টেড ডিস্ক/
একটা ব্লু-স্কিনড সফটওয়্যার/
যেকোনো মুহূর্তে ক্র্যাশ হতে পারে’, ‘কেউ
যদি একদিন আমার বুক চিরে
দেখে/ পাবে শুধু ড্যামেজড
সার্কিট আর/ একটা লো
ব্যাটারির ওয়ার্নিং...’|
লোগোহীন
ভাষায়, প্রচলিত আঙ্গিকেও যে হৃদয়গ্রাহী ও
জীবনপ্লাবী কবিতা লেখা যায়, তার
উদহারণ ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’| আমার ধারণা, কাব্য
চাষে মাহফুজা অনন্যার সার্থকতা এখানেই| রোমান্টিক ও গীতি ধারার
কবিদের সম্ভবত স্বীয় হৃদয়ের কালি ও দোয়াতই
বড় কৃষিযন্ত্র| এ যন্ত্রেই বোনা
হয় ˆনর্ব্যক্তিক চেতনার সঙ্গে ব্যক্তির ˆজবিক ও আত্মিক
সংকট ও রসায়নের বীজ|

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
অণুজীবদেরও
আন্দোলন হয়, বিপ্লব হয়,
তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে, যাকে
মানুষ নাম দেয় মহামারি,
অতিমারি— শত্রুতা মেশালে কোনো কিছু যেমন
হয়| তো মানুষের হৃদয়ের
অণুজীবের উত্থানকে কী নামে ডাকা
যায়? হৃদয়মারি? করোনার মতো পিষে দেওয়া
ছোঁয়াচে হৃদয় থেকে মানুষ
মুক্তির জন্য প্রাণপণ কী
চেষ্টাই না করেন| অথচ
এই হৃদয় কার? মানুষেরই
তো, তাই না| এ
হৃদয় মাটির নয়, এ হৃদয়
পাখির নয়, এ হৃদয়
গাছের নয়, এ হৃদয়
হাওয়ার নয়, এ হৃদয়
রোদেরও না, এ হৃদয়
লতাগুল্মেরও নয়, এই হৃদয়মারি
হৃদয়ও মানুষেরই| এমন সংক্রমণ ছড়াতে
শুরু করলে আক্রান্তের আকাশও
ছোট হয়ে যায়, হাসপাতালগুলো
বোবা হয়ে যায়, ডাক্তারেরা
আকাশ আর সমুদ্রের দিকে
তাকিয়ে থাকে, সবুজ বনানীর দিকে
তাকিয়ে থাকে| আর এসব বালাই
যদি নিজের হেরেমেই নেমে আসে, তাহলে
উপায় কী? জীবন তাহলে
কত গভীর দগ্ধতার গহিনে
নেমে যেতে পারে, ভাবতে
পারছি না|
মাহফুজা
অনন্যার ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’র কবিতাগুলো পড়া
শুরু করতেই এই ভাবনাগুলো বুনো
মেঘের মতো উড়ে উড়ে
নিজের ভাবনার উঠানে হাজির হয়েছে| অস্তিত্বগত সংকটে এই গৃহ কোনো
বস্তুগৃহ নয়, রক্ত-মাংসের
গৃহ, অবদমিত হৃদয়ের ছাপচিত্রের গ্যালারি, যেখানে রূপকের ভেতর দিয়ে যৌথ
যাপনের হেরেম খুলে বেরিয়ে পড়ে
নিজের সমূহ দরোজা, প্রকাশ
পায় বিষাক্ত নীরব কলহ, মানসিক
জটিলতা, সম্পর্কের শীতল টানাপোড়েন, মনস্তাত্ত্বিক
সমরে হৃদয়ের উত্তাল ঢেউয়ে সম্পর্কের ক্রমাগত পাড়ভাঙন| ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’ নামের কবিতাটি যেন এই বইয়ের
কাণ্ড| এর কিছু শব্দজোড়
উল্লেখ করলে আরও পরিষ্কার
বোঝা যাবে, যেমন ‘নোনা নীরবতা’, ‘কান্নার
ছত্রাক’, ‘নিঃশব্দ অনুতাপ’, ‘ভালোবাসার জীবাণু’, ‘অবহেলার সংক্রমণ’, ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’, ‘নীরব মহামারি’ ইত্যাদি|
গৃহ যে মরচে ধরা
অভিমানের ইট-সুরকিতে পড়ো-পড়ো হতে পারে,
তা অনন্যার কবিতার পরতে পরতে লক্ষ
করা যায়|
এই
যে কলাহলপূর্ণ সম্পর্কবাহী আধুনিক জীবন, এখানে নদীর উচ্ছল ঢেউও
যেন ক্যাওসে রূপ নেয়, বিবর্ধিত
মানসবেদনার জলে আকীর্ণ হয়,
সর্বদা ভালোবাসা, ভয় ও অবিশ্বাস
পাশাপাশি ভেলার মতো ভাসতে থাকে,
ঘনিষ্ঠ সংযোগও অজানা আতঙ্কে ঢাকা পড়ে যায়,
প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃসঙ্গ চাঁদ হয়ে যাওয়ার
নীরব ভয়ও প্রকট হয়,
নির্মল তরুণ-তরুণীপূর্ব জীবনের
সম্পর্ক এসে উঁকি দেয়
যাপিত বর্তমান অপুষ্ট সম্পর্কের জাঁতাকলের সংসারে| এই ধরনের বিট্রেয়াল
ট্রমায় যেন আজকের দুনিয়া
হাবুডুবু খাচ্ছে [গর্ভাশয়ের ভিতর রক্তকবরী ফুল/
অন্ধকারের যোনি ছিঁড়ে আলোয়
আসার পর/ হাতে থাকে
একগুচ্ছ ভুলের তোড়া!]|
ব্যক্তির
অস্তিত্বগত উদ্বেগের সঙ্গে যখন সমাজ ও
রাষ্ট্রের ‘হত্যাবিদ্যা’র উৎসব যুক্ত
হয়, তখন তা রূপ
নেয় মনস্তত্ত্বে ঘটে যাওয়া এক
মহাজাগতিক বিপর্যয়ে| অনন্যার কবিতার এইটা একটা রূপ,
যেখানে ব্যক্তির আবেগ-অনুভূতি ও
বিপন্নতাবোধ মিশে যায় সামষ্টিক
মানুষিক দুর্যোগায়িত দৃশ্যকল্পে, মারাত্মক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভুতুড়ে পরিবেশে ছেয়ে যায় তার
প্রতিবেশ [মুণ্ডু থেঁতলে যবনিকা উৎসব/ বধির বেটোফেন ফজলুল
হক হল’]| সময়ের করুণ ও হতাশাজনক
ছাপও তার কবিতায় ফুটে
ওঠে| চরম জাতীয় বিপন্নতা
ও বধির সময়ে সুশীল
সমাজও কতটা কানহীন হয়ে
পড়ে, বোবা বনে যায়,
সেটাও করুণ ব্যঙ্গাত্মকভাবে এসেছে
অনন্যার কবিতায় [ নিরুত্তর ফুটপাথ, ওপরে ছাত্রসমাজ/ বাইরে
ইলিশেরে মতো হা করে
থাকো সুশীল]|
দুনিয়ার
বীভৎসতম মানব-চাপ যে
কখনো কখনো কোনো কোনো
সময়কে বিপর্যয়চূড়া করে তার একটা
উদাহরণ যেন চব্বিশের জুলাই-আগস্ট| কবি এখানে এসে
মানুষের যে বোধোহয় হয়,
মাটির কাছের মানুষেরা যে অবহেলিত হতে
হতে অবশেষে নিষ্ঠুর রাষ্ট্রযন্ত্রের বন্দুকের নলের সামনে বুক
টানটান করে দাঁড়ায়, প্রতিরোধ
চূড়া ˆতরি করে, তাতে
কবি নিজেও শরিক হন, কারণ
সেও তো সকলের যাতনার
সামষ্টিক গরল ধারণ করেন|
দ্বিচারিতা
যে এই মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিপর্যস্ত, ষড়রিপুর
তাড়ায় বিক্ষিপ্ত দুনিয়ায় আরেক মারি, তা
কবি নিজের স্বদেশের, নিজের ভূখণ্ডের মানুষের মনোবিকলন থেকে পরিষ্কার বুঝেছেন
[ভাস্কর্য ভাঙলে যারা কাঁদে/ খুলি
উড়ে গেলে তারা উল্লাস
করে...নির্জীবের মূল্য জীবনের চেয়ে বেশি]| আর
মানুষ যে সহজ বিস্মরণগামী,
তা-ও আক্ষেপের সঙ্গে
ব্যক্ত করেছেন ‘রক্তে আঁকা গ্রাফিতি’ নামের
কবিতায়|
জল
পাথরকে ডুবিয়ে দিতে পারে, কিন্তু
তাকে ভেদ করতে পারে
না| এই মর্ম মাহফুজা
অনন্যা খুব করে বুঝেছিল|
মানুষও এমন কিছু অভিজ্ঞানের
মুখোমুখি হয় যা অবিদীর্ণ
দেয়ালে ঘেরা থাকে| হৃদয়ের
কিছু ভূগোল থাকে, সেই ভূগোলের কিছু
শস্য থাকে যা ভেদ
করা যায় না— যাকে
কবি ‘বুলেটপ্রুফ দুঃখ’ বলে অভিহিত করেন|
কিছু দুঃখ এমন, যা
পুরাহৃদয়ের এক খনি, যার
অস্তিত্ব হুমকির মধ্যে ফেলতে গেলে নিজের অস্তিত্বই
বিলীন করতে প্রস্তুত হয়|
তবু জীবন আকাশের মতো
বহমান, কিছু রোদ, কিছু
বৃষ্টি এসে ‘ছুঁলেই জ্বলে
ওঠে শরীরের মানচিত্র’|
মাহফুজা
অনন্যার চিন্তাদরিয়ায় যে পরিবেশ-সচেতনতার
ঢেউও আছে, তা টের
পাওয়া তার কবিতার আইল
ধরে হাঁটলে [নদীগুলো দড়ির মতো শুকিয়ে
যাচ্ছে]| জীবনের অন্ধকার স্তরগুলো যেন কবি খুব
কাছ থেকে অবলোকন করেছেন,
বুঝেছেন আঁধারই পরম সত্য, পর্দার
মতো আগলে রাখে নিজের
সব মুদ্রাদোষকেও [পুড়তে হলে অন্ধকারই ভালো]|
তিনি দেখেন, আধুনিক সম্পর্ক-জমিনের সবকিছুই ঠিকঠাক আছে— উর্বর, ফসলি
জমি; কিন্তু কোনো বীজও জন্মায়
না সেখানে, অনেক বীজের ভ্রূণই
হয় না, কোনোটার হলেও
তা পাতা হওয়া অবধি
[না, তা প্রেম নয়,
আত্মার মিসফায়ার/ প্রেম ছিল না, ছিল
একটা থার্ড পার্টি অ্যাপ]| মানবহৃদয় যেন আজ অজানা
এক রোগে আক্রান্ত, এই
একুশের মানবজমিন যেন ইটভাটার নিকটবর্তী
খেত, সহজে ফসল ফলতে
চায় না [আমাদের শরীর
যেন চুক্তিবদ্ধ দেশ/ যেখানে ঠোঁটের
ওপর স্থাপিত সাময়িক যুদ্ধবিরতি]|
রোমান্টিক
দুনিয়ার সংকট যা, আমাদের
একেকজন মানুষের জীবনেও বুঝি তা-ই—
উত্তাল দরিয়া, যেখানে এই শান্ত ফিনফিনে
বাতাস, হিমেল ছোঁয়া, এই উন্মাদ ঝড়,
এই মেঘের মিছিল; তবু মানুষ সমুদ্র
চায়, প্রেমে পড়ে, কিন্তু সেখানে
থাকে নীরব ঘাতক, মুখোশের
মুখোশ [যেখানে তুমি ছিলে স্নাইপার
চুমু...ভালোবাসা’ শব্দটা/ একধরনের সাইলেন্ট মিসাইল]| জটিলতর রাসায়নিক বিক্রিয়ার মতো প্রেম, সংসার
ও পেশাগত জীবন— বহু প্রতিক্রিয়ায়, বহু
অবহেলায় গ্রীষ্মকালীন মাঠ হয়ে যায়
যেন মাটির নরোম স্তনগুলো, শুঁটকির
মতো শুকিয়ে যায়| তো অনন্যার
কবিতা যত খোঁড়া হবে
ততই মানবজীবনের এটারনাল অ্যাংজাইটির লাভা বেরিয়ে আসবে,
উত্তরাধুনিক জীবনের নানা রূপ ও
দিক বেরিয়ে আসবে| তার কিছু কবিতাংশ
পড়া যাক— ‘অবহেলার পঞ্চম সংকলন’, ‘জীবন এখন একটা
অ্যাপ/ ইউজারনেম, পাসওয়ার্ড/ ডু নট শেয়ার
উইথ এনিওয়ান—/ তবু হ্যাক হয়ে
যায় মাঝে মাঝে’, ‘জীবন
একটা সার্চ ইঞ্জিন/ অর্থ খুঁজতে গিয়ে
ভুল লিংকে ঢুকে যাই’, ‘হৃদয়
: ড্যামেজড হার্ডড্রাইভ’, ‘বুকের ভেতর যা আছে/
তা একটা করাপ্টেড ডিস্ক/
একটা ব্লু-স্কিনড সফটওয়্যার/
যেকোনো মুহূর্তে ক্র্যাশ হতে পারে’, ‘কেউ
যদি একদিন আমার বুক চিরে
দেখে/ পাবে শুধু ড্যামেজড
সার্কিট আর/ একটা লো
ব্যাটারির ওয়ার্নিং...’|
লোগোহীন
ভাষায়, প্রচলিত আঙ্গিকেও যে হৃদয়গ্রাহী ও
জীবনপ্লাবী কবিতা লেখা যায়, তার
উদহারণ ‘সংক্রামিত গৃহবেদনা’| আমার ধারণা, কাব্য
চাষে মাহফুজা অনন্যার সার্থকতা এখানেই| রোমান্টিক ও গীতি ধারার
কবিদের সম্ভবত স্বীয় হৃদয়ের কালি ও দোয়াতই
বড় কৃষিযন্ত্র| এ যন্ত্রেই বোনা
হয় ˆনর্ব্যক্তিক চেতনার সঙ্গে ব্যক্তির ˆজবিক ও আত্মিক
সংকট ও রসায়নের বীজ|

আপনার মতামত লিখুন