জাপানের
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি| তার উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে
গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বারবার তিনি নোবেল পুরস্কারের
শর্ট লিস্টে স্থান পেলেও আলোচিত এই লেখকের ভাগ্যের
শিকে ছেঁড়েনি|
দি
নিউইয়র্ক টাইমস ২০১৯ সালের ১০
ফেব্রুয়ারি জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার
প্রকাশ করে| সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন
আরেক বিখ্যাত মার্কিন লেখক এবং দি
নিউইয়র্ক টাইমসের ফিকশন এডিটর : ডবোরাহ ট্রিয়েজম্যান| সেই কথোপকথনের চুম্বক
অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো—
হারুকি
মুরাকামি: প্রায় দশ বছর আগে
আপনাকে আমি একটি সাক্ষাৎকার
দিয়েছিলাম| এই দশ বছরে
বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে| উদাহারণ
স্বরূপ বলা যায়, আমার
বয়স বেড়েছে দশ বছর| অন্তত
আমার জন্য এ বিষয়টি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দিনে দিনে আমার
বয়স বাড়ছে; আমি বৃদ্ধ হচ্ছি|
আমার চিন্তার ধরন বদলেছে| তরুণ
বয়সে যেমন ভাবতাম সেরকম
নয়| এখন আমি নিজেকে
ভদ্রলোক হিশেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি|
আপনি হয়তো জানেন, একজন
ভদ্রলোকের একজন ঔপন্যাসিক হওয়া
খুব সহজ নয়| এটা
অনেকটাই রাজনীতিকদের মতো, বারাক ওবামা
কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প হওয়ার চেষ্টা করা| তবে আমার
কাছে ভদ্রলোক ঔপন্যাসিকের একটা সংজ্ঞা আছে:
প্রথমত, তিনি যে আয়কর
প্রদান করেছেন সে সম্পর্কে কোনো
কথা বলেন না; দ্বিতীয়ত,
সে নিজের সাবেক প্রেমিকা কিংবা সাবেক স্ত্রীর সম্পর্কে কিছুই লেখেন না; তৃতীয়ত, তিনি
সাহিত্য চর্চার জন্য নোবেল পুরস্কারের
আশা করেন না| অতএব
ডেবোরাহ, দয়া করে এই
তিন বিষয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন
না| জিজ্ঞেস করলে আমি সমস্যায়
পড়ে যাবো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি শুরুতেই আমার
প্রশ্নের ভাণ্ডারে আঘাত হেনেছেন! আসলে
আমি আলোচনা শুরু করতে চাই
আপনার সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ, নতুন উপন্যাস ‘কিলিং
কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে; যে উপন্যাসের এক
চরিত্র— যাকে তার স্ত্রী
ত্যাগ করে| তিনি শেষ
পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ শিল্পী,
চিত্রকরের বাড়িতে বসবাস করতেন| প্রথম যখন তিনি চিত্রকরের
বাড়িতে যান, তখন যত
সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে|
আর সে সবের কিছু
ঘটনা একটা মাটির গর্ত
বা এক ধরনের শূন্য
কূপ থেকে উত্থিত বলে
মনে হয়| আমি ভাবছি
এই উপন্যাসের এমন ভিত্তি আপনি
নির্মাণ করলেন কীভাবে?
হারুকি
মুরাকামি: আপনি জানেন এটি
একটি বৃহৎ উপন্যাস| এটি
রচনা করতে আমার দেড়
বছরের বেশি সময় লাগে|
এটি রচনা শুরু হয়েছিলো
এক কিংবা দুটো অনুচ্ছেদ দিয়ে|
দুটো অনুচ্ছেদ লেখার পর তা আমি
ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে দিই এবং
এ লেখা সম্পর্কে আমি
ভুলে যাই| এরপর সম্ভবত
তিন কিংবা ছয় মাসের সময়
আমার চিন্তায় এলো বিষয়টি এবং
মনে হলো সেই দুই
অনুচ্ছেদকে একটি উপন্যাসে রূপ
দেয়া সম্ভব| যে ভাবা সেই
কাজ— আমি উপন্যাসটি লিখতে
শুরু করলাম| এর জন্য আমার
কোনো নির্ধারিত সময় কিংবা পরিকল্পনা
ছিলো না| এমনকি এর
জন্য আমার কোনো স্টোরি
লাইনও ছিলো না| কেবলমাত্র
লিখিত দুই অনুচ্ছেদের ওপর
ভিত্তি করেই লিখতে শুরু
করি| গল্পটি আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে
নিয়ে গেছে| লেখা শুরু করার
সময় যদি আপনি জানেন
শেষটা কী হবে— তাহলে
সে উপন্যাস লেখার সময় আপনি আনন্দ
পাবেন না| আপনি নিশ্চই
জানেন, একজন চিত্রকর চিত্রাঙ্কনের
আগে স্কেচ করে নেন— যা
আমি পারি না| শুরুর
সময় আমার ক্যানভাস থাকে
সাদা, সেখানে আমি রঙ-তুলি
ও ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকতে
শুরু করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার উপন্যাসে একটা চরিত্র আছে—
মুজার্ট অপেরার নায়ক ডন জিওভানি,
যার থেকে উপন্যাসটি একটি
আকৃতি পেতে শুরু করে|
উপন্যাসের কেন্দ্রে কেনো আপনার এই
ধারণা কিংবা চরিত্রের উপস্থাপন?
হারুকি
মুরাকামি: সচরাচর, আমি শিরোনাম ঠিক
করে উপন্যাস লিখতে শুরু করি| এই
উপন্যাসটি লেখার আগে আমি শিরোনাম
পেলাম, ‘কিলিং কমেন্ডেটরে/— সেই সাথে লিখলাম
গ্রন্থের প্রথম অনুচ্ছেদ| এরপর ভাবলাম এই
শিরোনাম কিংবা লেখার প্রথম অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করে
আমি কোনো গল্প লিখতে
পারি| জাপানে ‘কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই|
তবে সেই শিরোনামের মধ্যে
আমি এক ধরনের গতি
দেখতে পেয়েছি, আমি সেই গতি
কিংবা শক্তিকেই গ্রহণ করেছি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: অপেরা ‘ডন জিওভানি’ কি
আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
হারুকি
মুরাকামি: চরিত্র আমার কাছে সব
সময় জরুরি| আমি সাধারণত অনুকরণীয়
কিছু ব্যবহার করি না| আমার
লেখক জীবনে, শুধুমাত্র একবার একটি অনুকরণীয় বা
অনুরূপ চরিত্র ব্যবহার করেছি— সে একজন খারাপ
লোক— তাকে আমি খুব
পছন্দ করি না, কেবল
একবার তাকে নিয়ে আমি
লিখতে চেয়েছি| এছাড়া অন্যান্য চরিত্র আমি নির্মাণ করেছি
একটি আঁচড় কিংবা শূন্য
থেকে| একবার আমি একটি চরিত্র
নির্মাণ করলে, ছেলে কিংবা মেয়ে
চরিত্র স্বাভাবিকভাবে এগুতে থাকে— আমাকে যা করতে হয়
তা হলো তাদের চলাফেরা
দেখা, তাদের সাথে কথা বলা
এবং কাজ করা| আমি
লেখক, আমি লিখছি, কিন্তু
একইসাথে মনে হয় আমি
উত্তেজনাপূর্ণ কোনো বই পাঠ
করছি| অতএব আমি লেখা
উপভোগ করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি উল্লেখ করেছেন
যে, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অপেরার পাশাপাশি অন্যান্য সঙ্গীতও শোনে| প্রায়ই আপনার চরিত্রগুলো, নির্দিষ্ট ব্যান্ড কিংবা ঘরানার সঙ্গীত শোনে| এটা কি আপনাকে
সহায়তা করে আবিষ্কার করতে
যে, তারা কারা?
হারুকি
মুরাকামি: লেখার সময় আমি গান
শুনি| ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই
সঙ্গীত আমার লেখায় চলে
আসে| আমি খুব একটা
ভাবি না যে কোন
ধরনের সঙ্গীত আমি শুনছি, গান
আমার কাছে এক ধরনের
খাবার, যা আমাকে লেখার
শক্তি দেয়| আমি প্রায়ই
সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি, বেশিরভাগ আমি আমার পছন্দের
সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি— যা আমার স্বাস্থ্যের
জন্যেও ভালো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: সঙ্গীত কি আপনাকে সুস্থ-সবল রাখে?
হারুকি
মুরাকামি: অবশ্যই, খুব সুস্থ রাখে|
সঙ্গীত এবং বিড়াল— এরা
আমাকে অনেক সহায়তা করেছে|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার ক’টা বিড়াল
আছে?
হারুকি
মুরাকামি: আমার নিজের কোনো
বিড়াল নেই| আমি প্রতিদিন
ভোরে বাড়ির পাশে জগিং করতে
যাই, তখন আমি তিন-চারটি বিড়াল দেখি— তারা আমার বন্ধু|
আমি দাঁড়াই এবং তাদের ডাকি,
তারা আমার ডাক শুনে
আসে— আমরা একে অপরকে
খুব ভালো করে জানি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: নিউ ইয়র্কার যখন
‘কিলিং কমেন্ডেটরে’ থেকে একটি উদ্ধৃতি
প্রকাশ করেছিলো তখন আমি আপনার
কাজের অবাস্তব উপাদনগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম| আপনি বলেছিলেন, “যখন
আমি উপন্যাস লিখি, তখন বাস্তবতা এবং
অবাস্তবতা প্রাকৃতিকভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| এটা
এমন না যে তেমন
কিছু আমার পরিকল্পনায় ছিলো|
আমি লিখতে গিয়ে তা অনুসরণ
করেছি, তবে আমি চেষ্টা
করি বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে বাস্তব উপায়ে|
তবে অবাস্তব পৃথিবী আরো বেশি অবিচ্ছিন্নভাবে
আভিভূত হতে থাকে| উপন্যাস
আমার কাছে একটি আনন্দানুষ্ঠান|
কেউ যদি যোগ দিতে
চায় তাহলে দিতে পারে, আর
যে কেউ যে কোনো
সময়ে চাইলে চলেও যেতে পারে|”
তাহলে আপনি কীভাবে মানুষ
এবং বিষয়কে আমন্ত্রণ জানাবেন? লেখার সময় আপনি এমন
একটা স্থান কোথায় পাবেন, যেখানে তারা আমন্ত্রণ ছাড়াই
আসতে পারবে?
হারুকি
মুরাকামি: পাঠকরা আমাকে সব সময় বলে,
আমার লেখার মধ্যে অবাস্তব জগত আছে— যাতে
নায়ক অবাস্তব পৃথিবী থেকে ঘুরে আবার
বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসে| কিন্তু
আমি সব সময় বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যে কোনো সীমারেখা দেখতে
পাই না| সুতরাং অনেক
ক্ষেত্রে তারা মিলেমিশে একাকার|
আমি মনে করি জাপানে,
অন্যান্য বিশ্ব বাস্তব বিশ্বের খুব কাছাকাছি| তবে
যদি আমরা মনে করি
অবাস্তব পৃথিবীর দিকে যাবো, তাও
কিন্তু তেমন কঠিন কিছু
নয়| তবে আমি যে
ধারণা অর্জন করেছি তা হচ্ছে পশ্চিমা
বিশ্বে বাস্তবতার বাইরে যাওয়া কঠিন; সেখানে অন্য জগতে যাওয়ার
জন্য আপনাকে কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার
মধ্য দিয়ে যেতে হবে|
কিন্তু জাপানে আপনি যদি সেখানে
যেতে চান, যেতে পারেন
সহজে| আমার গল্পে, আপনি
যদি কূপের তলদেশে যান তাহলে দেখবেন
ভিন্ন একটি জগৎ| অগত্যা
আপনি বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যকার পার্থক্য করতে পারবেন না|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: অন্যপ্রান্ত অর্থাৎ অবাস্তব জগৎ তো অন্ধকার|
হারুকি
মুরাকামি: না সব সময়
তা নয়| আমি মনে
করি কৌতূহলের সাথে আরো বেশি
কিছু করার আছে| যদি
সেখানে কোনো দরজা থাকে,
এবং তা আপনি খুলে
যদি অন্যপ্রান্তে প্রবেশ করতে চান, আপনি
পারবেন| এটা শুধুই কৌতূহল|
অভ্যন্তরে কী? কী সেখানে?
এই কাজটিই আমি করি প্রতিদিন|
উপন্যাস লেখার সময় আমি ভোর
চারটায় ঘুম থেকে জেগে,
লেখার টেবিলে বসি এবং লিখতে
শুরু করি| এটা বাস্তব
পৃথিবীতেই ঘটছে| আমি কড়া কফি
পান করি| কিন্তু আমি
যখন লিখতে শুরু করি, তখন
অন্য কোথাও চলে যাই| আমি
দরজা খুলে সেখানে প্রবেশ
করি এবং দেখি কি
ঘটছে সেখানে? আমি জানি না—
বা তোয়াক্কা করি না যে
সেটা বাস্তব বিশ্ব নাকি অবাস্তব| আমি
গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে
যাই, এক ধরনের ভূগর্ভে
বসে লেখায় মনোনিবেশ করি| আমি যখন
সেখানে থাকি তখন, অদ্ভুত
কিছুর সম্মুখীন হই| কিন্তু যখন
তাদের নিজ চক্ষে দেখি,
মনে হয় বাস্তব কিছু
দেখছি| জানেন, যদি
সেখানে কোনো অন্ধকার থাকে,
সে অন্ধকার আমার কাছে আসে
এবং সম্ভবত কিছু বার্তা বয়ে
নিয়ে আসে| আমি সে
বার্তা বোঝার চেষ্টা করি| আর সেই
বিশ্বকে পুরোপুরি অবলোকন করি এবং যা
দেখেছি তা বর্ণনা করে,
ফিরে আসি নিজ জগতে|
ফিরে আসাটা জরুরি| যদি আপনি ফিরে
আসতে না পারেন তা
হবে ভয়ংকর| আমি এ বিষয়ে
খুবই অভ্যস্ত| আমি ফিরে আসতে পারি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি কি সেসব
বিষয় বা ঘটনা সাথে
নিয়ে আসেন?
হারুকি
মুরাকামি: আরে না, তাহলে
তো তা হবে ভয়ানক|
আমি সেখানেই সব ফেলে আসি
যেখানে তারা ছিলো| যখন
লিখি না তখন আমি
অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ| আমি প্রতিদিনের রুটিনকে
খুব গুরুত্ব দিই| ঘুম থেকে
প্রতিদিন ভোরে উঠে যাই|
বেসবল খেলা যদি না
থাকে, তাহলে আমি রাত ন’টার মধ্যেই ঘুমোতে
যাই| সকালে জেগে আমি দৌড়াই
কিংবা সাঁতার কাটি| হাঁটার সময় কেউ কেউ
বলেন, ‘মুরাকামি তোমার সাথে দেখা হওয়াতে
ভালো লাগছে|’ এতে আমার অদ্ভুত
অনুভূতি হয়| আমি বিশেষ
কিছুই নই| সে কেন
আমার সাথে দেখা করতে
পেরে আনন্দিত| তবে যখন লিখতে
বসি তখন আমি বিশেষ
কিছু কিংবা অদ্ভুত কিছু|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি বলেছিলেন যে,
আপনার প্রথম দু’টি উপন্যাস
লিখতে তেমন বেগ পেতে
হয়নি| কিন্তু এরপর থেকে লিখতে
গেলেই আপনি আগের মতো
সহজে উপন্যাস বা গল্প লিখতে
পারতেন না| কেন? কোন
বিষয়টির কারণে আপনি এমন সমস্যার
মুখোমুখি হতেন?
হারুকি
মুরাকামি: আমার
প্রথম দু’টি গ্রন্থ
‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’
এবং ‘পিনবল ১৯৭৩’ খুব সহজেই লিখে
ফেলেছিলাম| কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার
পর আমি ওই গ্রন্থ
দুটো বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি নি|
এখনো আমি সে দুটো
গ্রন্থ নিয়ে সন্তুষ্ট নই|
গ্রন্থ দুটো রচনার পর
আমি আরো বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী
হয়ে উঠি| আমার প্রথম
পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’| (আগের দুটো ছিলো
নভেলা)| পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসটি রচনা শেষ করতে
আমার তিন থেকে চার
বছর সময় লেগেছে| আরাধ্য
বসন্তের দেখা পেতে আমাকে
একটি দীর্ঘ
গর্ত খনন করতে হয়েছে|
আমি মনে করি ‘এ
ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’ থেকে
আমার প্রকৃত লেখক সত্তার সূচনা|
আমার প্রথম তিন বছরের লেখালেখিগুলো
করেছিলাম যখন আমি জাজ
ক্লাবের মালিক ছিলাম| আমি কাজ শেষ
করতাম ভোর দুটোয় এবং
লিখতে বসে যেতাম রান্নাঘরের
টেবিলে— যা আমার জন্য
অত্যন্ত পরিশ্রমের ছিলো| প্রথম দু’টি গ্রন্থ
রচনার পর আমি জাজ ক্লাব বিক্রি
করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম| ঠিক করলাম আমি
ফুল টাইম লেখালেখি করবো|
কিন্তু সে সময় জাজ
ক্লাব ভালোই ব্যবসা করছিলো| বন্ধুবান্ধবরা ক্লাব বিক্রি না করার পরামর্শ
দিয়েছিলো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: দিনের কাজ কি ছেড়ে
দিয়েছিলেন?
হারুকি
মুরাকামি: এরপর আমি লিখি
উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’| আমি একটি বৃহৎ
গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলাম|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: তো বৃহৎ গ্রন্থ
রচনা কি সহজ ছিলো?
নাকি সে কাজটি চ্যালেঞ্জিং
ছিলো?
হারুকি
মুরাকামি: ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’ রচনার পর আমি উন্মাদনার
মধ্যে ছিলাম| কারণ আমি জানি
না পরবর্তীতে কী আছে আমার|
আমি পরের দিন আসার
জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি| ফলে
আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি পরবর্তীতে
কী হবে| আমি পাতা
ওল্টানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না| কারণ আমাকে
সে পাতাগুলোয় লিখতে হবে|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার এমন কোনো দিন
এসেছিলো কি, যে নিজেই
জানেন না পরবর্তীতে কী
হবে| এমনকি সেদিন লেখার টেবিলে বসেও আপনি লিখতে
পারেননি কিছুই|
হারুকি
মুরাকামি: আমার কখনো লেখালেখিতে
বিরতি (রাইটার্স ব্লক) হয়নি| আমি লেখার টেবিলে
বসার পর, প্রাকৃতিকভাবেই বলতে
পারি পরে কী হবে|
আমি যদি নিজে থেকেই
মনে করি যে লিখবো
না, লিখবো না| বিভিন্ন ম্যাগাজিন
থেকে আমাকে প্রায়ই লেখার জন্য তাগাদা দেয়,
আমি লিখি না| না
বলে দিই| আমি নিজের
ইচ্ছেতেই লিখি, পছন্দের বিষয়ে লিখি| আমি এভাবেই লিখতে
পছন্দ করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি
কি ঘুমের মধ্যেই গল্পের প্লট তৈরি করেন?
হারুকি
মুরাকামি: না| আমি তা
মনে করি না| আমি
স্বপ্ন দেখি না| গল্প
তো গল্পই আর স্বপ্ন তো
স্বপ্নই| আমার কাছে লেখালেখি
স্বপ্নে দেখার মতোই| আমি যখন লিখতে
বসি, তখন ইচ্ছে করে
স্বপ্ন দেখি| আমি লেখা শুরু
করতে পারি, আবার থামিয়ে দিতে
পারি, আবার ইচ্ছে করলে
পরের দিন পর্যন্ত লেখা
জারি রাখতে পারি| আপনি যখন ঘুমান
এবং স্বপ্নে দেখেন যে একখণ্ড মাংস
(স্টেক) খাচ্ছেন, অথবা পান করছেন
উপাদেয় পানীয় কিংবা স্বপ্ন দেখছেন একজন সুন্দরী রমণীকে,
ঘুম থেকে ওঠার পর
সবই উধাও হয়ে যায়|
কিন্তু আমি লেখার টেবিলে
বসে যে স্বপ্ন দেখি
তার ফলে ইচ্ছে করলে
পরের দিন পর্যন্ত লেখা
জারি রাখতে পারি|

শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
জাপানের
বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামি| তার উপন্যাস বিশ্বসাহিত্যে
গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন| বারবার তিনি নোবেল পুরস্কারের
শর্ট লিস্টে স্থান পেলেও আলোচিত এই লেখকের ভাগ্যের
শিকে ছেঁড়েনি|
দি
নিউইয়র্ক টাইমস ২০১৯ সালের ১০
ফেব্রুয়ারি জাপানি ঔপন্যাসিক হারুকি মুরাকামির একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার
প্রকাশ করে| সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন
আরেক বিখ্যাত মার্কিন লেখক এবং দি
নিউইয়র্ক টাইমসের ফিকশন এডিটর : ডবোরাহ ট্রিয়েজম্যান| সেই কথোপকথনের চুম্বক
অংশ এখানে উপস্থাপন করা হলো—
হারুকি
মুরাকামি: প্রায় দশ বছর আগে
আপনাকে আমি একটি সাক্ষাৎকার
দিয়েছিলাম| এই দশ বছরে
বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে| উদাহারণ
স্বরূপ বলা যায়, আমার
বয়স বেড়েছে দশ বছর| অন্তত
আমার জন্য এ বিষয়টি
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| দিনে দিনে আমার
বয়স বাড়ছে; আমি বৃদ্ধ হচ্ছি|
আমার চিন্তার ধরন বদলেছে| তরুণ
বয়সে যেমন ভাবতাম সেরকম
নয়| এখন আমি নিজেকে
ভদ্রলোক হিশেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি|
আপনি হয়তো জানেন, একজন
ভদ্রলোকের একজন ঔপন্যাসিক হওয়া
খুব সহজ নয়| এটা
অনেকটাই রাজনীতিকদের মতো, বারাক ওবামা
কিংবা ডোনাল্ড ট্রাম্প হওয়ার চেষ্টা করা| তবে আমার
কাছে ভদ্রলোক ঔপন্যাসিকের একটা সংজ্ঞা আছে:
প্রথমত, তিনি যে আয়কর
প্রদান করেছেন সে সম্পর্কে কোনো
কথা বলেন না; দ্বিতীয়ত,
সে নিজের সাবেক প্রেমিকা কিংবা সাবেক স্ত্রীর সম্পর্কে কিছুই লেখেন না; তৃতীয়ত, তিনি
সাহিত্য চর্চার জন্য নোবেল পুরস্কারের
আশা করেন না| অতএব
ডেবোরাহ, দয়া করে এই
তিন বিষয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন
না| জিজ্ঞেস করলে আমি সমস্যায়
পড়ে যাবো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি শুরুতেই আমার
প্রশ্নের ভাণ্ডারে আঘাত হেনেছেন! আসলে
আমি আলোচনা শুরু করতে চাই
আপনার সম্প্রতি প্রকাশিত গ্রন্থ, নতুন উপন্যাস ‘কিলিং
কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে; যে উপন্যাসের এক
চরিত্র— যাকে তার স্ত্রী
ত্যাগ করে| তিনি শেষ
পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ শিল্পী,
চিত্রকরের বাড়িতে বসবাস করতেন| প্রথম যখন তিনি চিত্রকরের
বাড়িতে যান, তখন যত
সব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে থাকে|
আর সে সবের কিছু
ঘটনা একটা মাটির গর্ত
বা এক ধরনের শূন্য
কূপ থেকে উত্থিত বলে
মনে হয়| আমি ভাবছি
এই উপন্যাসের এমন ভিত্তি আপনি
নির্মাণ করলেন কীভাবে?
হারুকি
মুরাকামি: আপনি জানেন এটি
একটি বৃহৎ উপন্যাস| এটি
রচনা করতে আমার দেড়
বছরের বেশি সময় লাগে|
এটি রচনা শুরু হয়েছিলো
এক কিংবা দুটো অনুচ্ছেদ দিয়ে|
দুটো অনুচ্ছেদ লেখার পর তা আমি
ডেস্কের ড্রয়ারে রেখে দিই এবং
এ লেখা সম্পর্কে আমি
ভুলে যাই| এরপর সম্ভবত
তিন কিংবা ছয় মাসের সময়
আমার চিন্তায় এলো বিষয়টি এবং
মনে হলো সেই দুই
অনুচ্ছেদকে একটি উপন্যাসে রূপ
দেয়া সম্ভব| যে ভাবা সেই
কাজ— আমি উপন্যাসটি লিখতে
শুরু করলাম| এর জন্য আমার
কোনো নির্ধারিত সময় কিংবা পরিকল্পনা
ছিলো না| এমনকি এর
জন্য আমার কোনো স্টোরি
লাইনও ছিলো না| কেবলমাত্র
লিখিত দুই অনুচ্ছেদের ওপর
ভিত্তি করেই লিখতে শুরু
করি| গল্পটি আমাকে শেষ পর্যন্ত টেনে
নিয়ে গেছে| লেখা শুরু করার
সময় যদি আপনি জানেন
শেষটা কী হবে— তাহলে
সে উপন্যাস লেখার সময় আপনি আনন্দ
পাবেন না| আপনি নিশ্চই
জানেন, একজন চিত্রকর চিত্রাঙ্কনের
আগে স্কেচ করে নেন— যা
আমি পারি না| শুরুর
সময় আমার ক্যানভাস থাকে
সাদা, সেখানে আমি রঙ-তুলি
ও ব্রাশ দিয়ে ছবি আঁকতে
শুরু করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার উপন্যাসে একটা চরিত্র আছে—
মুজার্ট অপেরার নায়ক ডন জিওভানি,
যার থেকে উপন্যাসটি একটি
আকৃতি পেতে শুরু করে|
উপন্যাসের কেন্দ্রে কেনো আপনার এই
ধারণা কিংবা চরিত্রের উপস্থাপন?
হারুকি
মুরাকামি: সচরাচর, আমি শিরোনাম ঠিক
করে উপন্যাস লিখতে শুরু করি| এই
উপন্যাসটি লেখার আগে আমি শিরোনাম
পেলাম, ‘কিলিং কমেন্ডেটরে/— সেই সাথে লিখলাম
গ্রন্থের প্রথম অনুচ্ছেদ| এরপর ভাবলাম এই
শিরোনাম কিংবা লেখার প্রথম অনুচ্ছেদের ওপর নির্ভর করে
আমি কোনো গল্প লিখতে
পারি| জাপানে ‘কমেন্ডেটরে’ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই|
তবে সেই শিরোনামের মধ্যে
আমি এক ধরনের গতি
দেখতে পেয়েছি, আমি সেই গতি
কিংবা শক্তিকেই গ্রহণ করেছি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: অপেরা ‘ডন জিওভানি’ কি
আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
হারুকি
মুরাকামি: চরিত্র আমার কাছে সব
সময় জরুরি| আমি সাধারণত অনুকরণীয়
কিছু ব্যবহার করি না| আমার
লেখক জীবনে, শুধুমাত্র একবার একটি অনুকরণীয় বা
অনুরূপ চরিত্র ব্যবহার করেছি— সে একজন খারাপ
লোক— তাকে আমি খুব
পছন্দ করি না, কেবল
একবার তাকে নিয়ে আমি
লিখতে চেয়েছি| এছাড়া অন্যান্য চরিত্র আমি নির্মাণ করেছি
একটি আঁচড় কিংবা শূন্য
থেকে| একবার আমি একটি চরিত্র
নির্মাণ করলে, ছেলে কিংবা মেয়ে
চরিত্র স্বাভাবিকভাবে এগুতে থাকে— আমাকে যা করতে হয়
তা হলো তাদের চলাফেরা
দেখা, তাদের সাথে কথা বলা
এবং কাজ করা| আমি
লেখক, আমি লিখছি, কিন্তু
একইসাথে মনে হয় আমি
উত্তেজনাপূর্ণ কোনো বই পাঠ
করছি| অতএব আমি লেখা
উপভোগ করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি উল্লেখ করেছেন
যে, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অপেরার পাশাপাশি অন্যান্য সঙ্গীতও শোনে| প্রায়ই আপনার চরিত্রগুলো, নির্দিষ্ট ব্যান্ড কিংবা ঘরানার সঙ্গীত শোনে| এটা কি আপনাকে
সহায়তা করে আবিষ্কার করতে
যে, তারা কারা?
হারুকি
মুরাকামি: লেখার সময় আমি গান
শুনি| ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই
সঙ্গীত আমার লেখায় চলে
আসে| আমি খুব একটা
ভাবি না যে কোন
ধরনের সঙ্গীত আমি শুনছি, গান
আমার কাছে এক ধরনের
খাবার, যা আমাকে লেখার
শক্তি দেয়| আমি প্রায়ই
সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি, বেশিরভাগ আমি আমার পছন্দের
সঙ্গীত সম্পর্কে লিখি— যা আমার স্বাস্থ্যের
জন্যেও ভালো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: সঙ্গীত কি আপনাকে সুস্থ-সবল রাখে?
হারুকি
মুরাকামি: অবশ্যই, খুব সুস্থ রাখে|
সঙ্গীত এবং বিড়াল— এরা
আমাকে অনেক সহায়তা করেছে|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার ক’টা বিড়াল
আছে?
হারুকি
মুরাকামি: আমার নিজের কোনো
বিড়াল নেই| আমি প্রতিদিন
ভোরে বাড়ির পাশে জগিং করতে
যাই, তখন আমি তিন-চারটি বিড়াল দেখি— তারা আমার বন্ধু|
আমি দাঁড়াই এবং তাদের ডাকি,
তারা আমার ডাক শুনে
আসে— আমরা একে অপরকে
খুব ভালো করে জানি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: নিউ ইয়র্কার যখন
‘কিলিং কমেন্ডেটরে’ থেকে একটি উদ্ধৃতি
প্রকাশ করেছিলো তখন আমি আপনার
কাজের অবাস্তব উপাদনগুলো সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলাম| আপনি বলেছিলেন, “যখন
আমি উপন্যাস লিখি, তখন বাস্তবতা এবং
অবাস্তবতা প্রাকৃতিকভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়| এটা
এমন না যে তেমন
কিছু আমার পরিকল্পনায় ছিলো|
আমি লিখতে গিয়ে তা অনুসরণ
করেছি, তবে আমি চেষ্টা
করি বাস্তবতাকে উপস্থাপন করতে বাস্তব উপায়ে|
তবে অবাস্তব পৃথিবী আরো বেশি অবিচ্ছিন্নভাবে
আভিভূত হতে থাকে| উপন্যাস
আমার কাছে একটি আনন্দানুষ্ঠান|
কেউ যদি যোগ দিতে
চায় তাহলে দিতে পারে, আর
যে কেউ যে কোনো
সময়ে চাইলে চলেও যেতে পারে|”
তাহলে আপনি কীভাবে মানুষ
এবং বিষয়কে আমন্ত্রণ জানাবেন? লেখার সময় আপনি এমন
একটা স্থান কোথায় পাবেন, যেখানে তারা আমন্ত্রণ ছাড়াই
আসতে পারবে?
হারুকি
মুরাকামি: পাঠকরা আমাকে সব সময় বলে,
আমার লেখার মধ্যে অবাস্তব জগত আছে— যাতে
নায়ক অবাস্তব পৃথিবী থেকে ঘুরে আবার
বাস্তব পৃথিবীতে ফিরে আসে| কিন্তু
আমি সব সময় বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যে কোনো সীমারেখা দেখতে
পাই না| সুতরাং অনেক
ক্ষেত্রে তারা মিলেমিশে একাকার|
আমি মনে করি জাপানে,
অন্যান্য বিশ্ব বাস্তব বিশ্বের খুব কাছাকাছি| তবে
যদি আমরা মনে করি
অবাস্তব পৃথিবীর দিকে যাবো, তাও
কিন্তু তেমন কঠিন কিছু
নয়| তবে আমি যে
ধারণা অর্জন করেছি তা হচ্ছে পশ্চিমা
বিশ্বে বাস্তবতার বাইরে যাওয়া কঠিন; সেখানে অন্য জগতে যাওয়ার
জন্য আপনাকে কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার
মধ্য দিয়ে যেতে হবে|
কিন্তু জাপানে আপনি যদি সেখানে
যেতে চান, যেতে পারেন
সহজে| আমার গল্পে, আপনি
যদি কূপের তলদেশে যান তাহলে দেখবেন
ভিন্ন একটি জগৎ| অগত্যা
আপনি বাস্তব-অবাস্তব পৃথিবীর মধ্যকার পার্থক্য করতে পারবেন না|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: অন্যপ্রান্ত অর্থাৎ অবাস্তব জগৎ তো অন্ধকার|
হারুকি
মুরাকামি: না সব সময়
তা নয়| আমি মনে
করি কৌতূহলের সাথে আরো বেশি
কিছু করার আছে| যদি
সেখানে কোনো দরজা থাকে,
এবং তা আপনি খুলে
যদি অন্যপ্রান্তে প্রবেশ করতে চান, আপনি
পারবেন| এটা শুধুই কৌতূহল|
অভ্যন্তরে কী? কী সেখানে?
এই কাজটিই আমি করি প্রতিদিন|
উপন্যাস লেখার সময় আমি ভোর
চারটায় ঘুম থেকে জেগে,
লেখার টেবিলে বসি এবং লিখতে
শুরু করি| এটা বাস্তব
পৃথিবীতেই ঘটছে| আমি কড়া কফি
পান করি| কিন্তু আমি
যখন লিখতে শুরু করি, তখন
অন্য কোথাও চলে যাই| আমি
দরজা খুলে সেখানে প্রবেশ
করি এবং দেখি কি
ঘটছে সেখানে? আমি জানি না—
বা তোয়াক্কা করি না যে
সেটা বাস্তব বিশ্ব নাকি অবাস্তব| আমি
গভীর থেকে গভীরে তলিয়ে
যাই, এক ধরনের ভূগর্ভে
বসে লেখায় মনোনিবেশ করি| আমি যখন
সেখানে থাকি তখন, অদ্ভুত
কিছুর সম্মুখীন হই| কিন্তু যখন
তাদের নিজ চক্ষে দেখি,
মনে হয় বাস্তব কিছু
দেখছি| জানেন, যদি
সেখানে কোনো অন্ধকার থাকে,
সে অন্ধকার আমার কাছে আসে
এবং সম্ভবত কিছু বার্তা বয়ে
নিয়ে আসে| আমি সে
বার্তা বোঝার চেষ্টা করি| আর সেই
বিশ্বকে পুরোপুরি অবলোকন করি এবং যা
দেখেছি তা বর্ণনা করে,
ফিরে আসি নিজ জগতে|
ফিরে আসাটা জরুরি| যদি আপনি ফিরে
আসতে না পারেন তা
হবে ভয়ংকর| আমি এ বিষয়ে
খুবই অভ্যস্ত| আমি ফিরে আসতে পারি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি কি সেসব
বিষয় বা ঘটনা সাথে
নিয়ে আসেন?
হারুকি
মুরাকামি: আরে না, তাহলে
তো তা হবে ভয়ানক|
আমি সেখানেই সব ফেলে আসি
যেখানে তারা ছিলো| যখন
লিখি না তখন আমি
অত্যন্ত সাদাসিধে মানুষ| আমি প্রতিদিনের রুটিনকে
খুব গুরুত্ব দিই| ঘুম থেকে
প্রতিদিন ভোরে উঠে যাই|
বেসবল খেলা যদি না
থাকে, তাহলে আমি রাত ন’টার মধ্যেই ঘুমোতে
যাই| সকালে জেগে আমি দৌড়াই
কিংবা সাঁতার কাটি| হাঁটার সময় কেউ কেউ
বলেন, ‘মুরাকামি তোমার সাথে দেখা হওয়াতে
ভালো লাগছে|’ এতে আমার অদ্ভুত
অনুভূতি হয়| আমি বিশেষ
কিছুই নই| সে কেন
আমার সাথে দেখা করতে
পেরে আনন্দিত| তবে যখন লিখতে
বসি তখন আমি বিশেষ
কিছু কিংবা অদ্ভুত কিছু|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি বলেছিলেন যে,
আপনার প্রথম দু’টি উপন্যাস
লিখতে তেমন বেগ পেতে
হয়নি| কিন্তু এরপর থেকে লিখতে
গেলেই আপনি আগের মতো
সহজে উপন্যাস বা গল্প লিখতে
পারতেন না| কেন? কোন
বিষয়টির কারণে আপনি এমন সমস্যার
মুখোমুখি হতেন?
হারুকি
মুরাকামি: আমার
প্রথম দু’টি গ্রন্থ
‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’
এবং ‘পিনবল ১৯৭৩’ খুব সহজেই লিখে
ফেলেছিলাম| কিন্তু লেখা শেষ হওয়ার
পর আমি ওই গ্রন্থ
দুটো বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারি নি|
এখনো আমি সে দুটো
গ্রন্থ নিয়ে সন্তুষ্ট নই|
গ্রন্থ দুটো রচনার পর
আমি আরো বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী
হয়ে উঠি| আমার প্রথম
পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’| (আগের দুটো ছিলো
নভেলা)| পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসটি রচনা শেষ করতে
আমার তিন থেকে চার
বছর সময় লেগেছে| আরাধ্য
বসন্তের দেখা পেতে আমাকে
একটি দীর্ঘ
গর্ত খনন করতে হয়েছে|
আমি মনে করি ‘এ
ওয়াইল্ড শিপ চেইজ’ থেকে
আমার প্রকৃত লেখক সত্তার সূচনা|
আমার প্রথম তিন বছরের লেখালেখিগুলো
করেছিলাম যখন আমি জাজ
ক্লাবের মালিক ছিলাম| আমি কাজ শেষ
করতাম ভোর দুটোয় এবং
লিখতে বসে যেতাম রান্নাঘরের
টেবিলে— যা আমার জন্য
অত্যন্ত পরিশ্রমের ছিলো| প্রথম দু’টি গ্রন্থ
রচনার পর আমি জাজ ক্লাব বিক্রি
করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম| ঠিক করলাম আমি
ফুল টাইম লেখালেখি করবো|
কিন্তু সে সময় জাজ
ক্লাব ভালোই ব্যবসা করছিলো| বন্ধুবান্ধবরা ক্লাব বিক্রি না করার পরামর্শ
দিয়েছিলো|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: দিনের কাজ কি ছেড়ে
দিয়েছিলেন?
হারুকি
মুরাকামি: এরপর আমি লিখি
উপন্যাস ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’| আমি একটি বৃহৎ
গ্রন্থ রচনা করতে চেয়েছিলাম|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: তো বৃহৎ গ্রন্থ
রচনা কি সহজ ছিলো?
নাকি সে কাজটি চ্যালেঞ্জিং
ছিলো?
হারুকি
মুরাকামি: ‘এ ওয়াইল্ড শিপ
চেইজ’ রচনার পর আমি উন্মাদনার
মধ্যে ছিলাম| কারণ আমি জানি
না পরবর্তীতে কী আছে আমার|
আমি পরের দিন আসার
জন্য অপেক্ষা করতে পারিনি| ফলে
আমি আবিষ্কার করতে পেরেছি পরবর্তীতে
কী হবে| আমি পাতা
ওল্টানোর চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না| কারণ আমাকে
সে পাতাগুলোয় লিখতে হবে|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনার এমন কোনো দিন
এসেছিলো কি, যে নিজেই
জানেন না পরবর্তীতে কী
হবে| এমনকি সেদিন লেখার টেবিলে বসেও আপনি লিখতে
পারেননি কিছুই|
হারুকি
মুরাকামি: আমার কখনো লেখালেখিতে
বিরতি (রাইটার্স ব্লক) হয়নি| আমি লেখার টেবিলে
বসার পর, প্রাকৃতিকভাবেই বলতে
পারি পরে কী হবে|
আমি যদি নিজে থেকেই
মনে করি যে লিখবো
না, লিখবো না| বিভিন্ন ম্যাগাজিন
থেকে আমাকে প্রায়ই লেখার জন্য তাগাদা দেয়,
আমি লিখি না| না
বলে দিই| আমি নিজের
ইচ্ছেতেই লিখি, পছন্দের বিষয়ে লিখি| আমি এভাবেই লিখতে
পছন্দ করি|
ডেবোরাহ
ট্রিয়েজম্যান: আপনি
কি ঘুমের মধ্যেই গল্পের প্লট তৈরি করেন?
হারুকি
মুরাকামি: না| আমি তা
মনে করি না| আমি
স্বপ্ন দেখি না| গল্প
তো গল্পই আর স্বপ্ন তো
স্বপ্নই| আমার কাছে লেখালেখি
স্বপ্নে দেখার মতোই| আমি যখন লিখতে
বসি, তখন ইচ্ছে করে
স্বপ্ন দেখি| আমি লেখা শুরু
করতে পারি, আবার থামিয়ে দিতে
পারি, আবার ইচ্ছে করলে
পরের দিন পর্যন্ত লেখা
জারি রাখতে পারি| আপনি যখন ঘুমান
এবং স্বপ্নে দেখেন যে একখণ্ড মাংস
(স্টেক) খাচ্ছেন, অথবা পান করছেন
উপাদেয় পানীয় কিংবা স্বপ্ন দেখছেন একজন সুন্দরী রমণীকে,
ঘুম থেকে ওঠার পর
সবই উধাও হয়ে যায়|
কিন্তু আমি লেখার টেবিলে
বসে যে স্বপ্ন দেখি
তার ফলে ইচ্ছে করলে
পরের দিন পর্যন্ত লেখা
জারি রাখতে পারি|

আপনার মতামত লিখুন