হাজার
বছরের বাংলা কবিতার ধারায় একজন কবির জন্ম
পৃথিবীর অন্যতম আশাবাদ ও বিশুদ্ধ আনন্দের
উপহার, তা বলাই বাহুল্য|
তবে জন্মমুহূর্তে দেবশিশুর মতো দেখালেও শুরুতেই
কেউ কবি হয়ে জন্মায়
না| প্রসঙ্গত মনে পড়ছে এক
অভিজ্ঞ কবি-মায়ের কথা|
তিনি বলতেন, আমার সন্তানকে গর্ভে
নিয়ে প্রায়ই আমি চাঁদ স্বপ্নে
দেখতাম| এবং তখনই ভেবেছিলাম,
আমার গর্ভস্থ এই সন্তান নিশ্চয়
কবি হবে| তিনি আর
কেউ নন, স্বয়ং কবি
রফিক আজাদের মা| মানে আমার
শাশুড়িমা প্রায়ই এই কথাটি বলতেন
আমাকে|
হতে
পারে তিনি হয়তো সেরকম
দিব্যজ্ঞানধারী মা ছিলেন, এজন্যে
বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর গর্ভের সন্তান
রফিক আজাদ একদিন দেশের
অন্যতম প্রধান একজন কবি হবে|
সকল মা হয়তো
এভাবে বুঝতে পারেন না| আমিও কবি
হিসেবে যতটা বুঝতে পারি,
মা হিসেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ ওভাবে হয়তো বলতেই পারবো
না কিছু|
সে
যাই হোক— কবি যিনি
হয়ে ওঠেন, তাঁর গভীরে থাকে
শুক্তির ক্ষত ও ক্ষরণ,
বহু অন্তর্দাহ, মান-অপমান দ্রোহ-বিদ্রোহ, প্রতিবাদ— আরো কত কিছু
মাড়িয়ে জীবন-জীবিকার মহরতে
দাঁড়িয়ে, হঠাৎ একদিন সময়
ও সম্ভাবনার হাত ধরাধরি করে
অবশেষে ভালোবেসে ত্রিভঙ্গ কবিও শিরে পরে
নেন কণ্টক মুকুটখানি তাঁর| বায়ুবীয় এমন শিল্পে নিবেদিত
কবি মাত্রই এক নিরুদ্দেশ শিল্প-যাত্রায় সঙ্গী হিসেবে ধর্মত কামনা করেন প্রকৃত কবিতাকেই|
রবীন্দ্রনাথ নিজেই “জীবনদেবতা”নামে ডেকেছেন— কবিতা
শিল্পের এই অনুরাধা ও
প্রেরণা-দায়িনী সুন্দরীকে|
“আর
কতদূর নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী
বলো,
কোন& পারে ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী”|
এই
স্বপ্নময় কবিতা দেবী কাকে যে
কতদূর নিয়ে যাবে, জীবদ্দশায়
কেউ তা নিশ্চিত করে
কিছু বলতেই পারে না| নইলে
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে “১৪০০ সাল”-এর
মতো কবিতা লিখে শতবর্ষ তাঁর
কবিতা কেউ পড়বে কিনা—
সেই আশঙ্কা ব্যক্ত করতে হতো না|
“আজি
হতে শতবর্ষ পরে
কে
তুমি পড়িছ বসি আমার
কবিতাখানি
কৌতূহলভরে—
আজি হতে শতবর্ষ
পরে|”
২.
কবি
ফারুক মাহমুদ জন্মেছেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের বছরেই—
১৭ জুলাই| মেঘনা নদীর জলপ্রবাহিত কিশোরগঞ্জ
জেলার ˆভরবের সন্তান তিনি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে
স্নাতকোত্তর| কবিদের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, ছড়া
দিয়ে লেখালেখির হাতেখড়ি| ফারুক মাহমুদের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি|
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ভ্রমণ করলেও তার গল্প, প্রবন্ধ,
শিশু-কিশোর সাহিত্য ছাড়িয়ে নিরবছিন্নভাবে
কবিতাতেই তিনি
অবিচল থেকেছেন| পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন| বর্তমানে তার সময় কাটে
লেখালেখিতেই| কবি ও সাংবাদিক
ফারুক মাহমুদের সঙ্গে প্রথম আমার পরিচয় হয়েছিলো
লতা হোসেন কর্তৃক প্রকাশিত পাক্ষিক “পূর্ণতা” পত্রিকার অফিসে| কবি ও ‘পূর্ণতা’র সম্পাদক ফারুক
মাহমুদের নিমন্ত্রণে রফিক আজাদের সঙ্গেই
গেছিলাম সেদিন| আশির দশকে আধুনিক
স্টাইলে পূর্ণতার অফিসটি সাজানো গোছানো ছিলো চমৎকাররূপে| সেদিনই
শিল্প-সংস্কৃতি প্রেমী ধনাঢ্য নারীব্যক্তিত্ব লতা হোসেনের সঙ্গে
পরিচিত হয়েছিলাম| তাঁকেও খুব ভালো লেগেছিলো|
পরবর্তী সময়ে ফারুক মাহমুদের
অনুরোধে রফিক আজাদ ‘পূর্ণতা’র একটি সংখ্যার
অতিথি সম্পাদক ছিলেন| কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
প্রয়াণের পর ‘পূর্ণতা’র
যে বৃহৎ সংখ্যাটি প্রকাশিত
হয়েছিলো— ভারত ও বাংলাদেশ
মিলে এত সমৃদ্ধ সংকলন
আর হয়নি|
অগ্রজ
কবি রফিক আজাদের সঙ্গে
ফারুক মাহমুদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্কের
পরিধি ছিলো বহুবিস্তৃত| কবি
ও সম্পাদকের টেবিল থেকে পানশালার শিশিরভেজা
টলমল টেবিল অবধি| সন্ধ্যার দিকে ফারুক মাহমুদ
আমাদের ধানমণ্ডির বাসায় এলেই আমার বুকের
ভেতর ভীতি ছড়াতো| এই
বুঝি কবিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে চায়ের টেবিল থেকে ফারুক মাহমুদ
সাকুরায় নিয়ে যেতে এসেছে|
হয়তো কবি তাকে আসতে
বলেছে, কিন্তু আমার মনে হতো
ফারুক মাহমুদ না এলে হয়তো
কবি বের হতো না
আজ বাসা থেকে| অনেক
পরে বুঝেছি ফারুক মাহমুদ ছিলো সাকুরার পথে
যেতে, বাসা থেকে বের
হবার ছল বা সাঁকো|
ওর পেছনে ছিলো কবি হাবীবুল্লাহ
সিরাজী এবং কবি শিহাব
সরকার| জানি, এরা দুজনেই কবির
অন্ধ ভক্ত ও ভালোবাসার
মানুষ ছিলেন| একমাত্র শিশিরের টেবিলেই লাজুক স্বভাবের রফিক আজাদ নিজেকে
ঢেলে উজার করে দিয়ে
কথা বলতেন| সেসব কথায় প্রজ্ঞা
ও প্রতিভার সঙ্গে হিউমার বোধের এমন এক মিথস্ক্রিয়া
ঘটতো যে, সঙ্গী সতীর্থেরাও
আনন্দে আন্দোলিত হতেন|
দিন
যত গেছে তত বুঝতে
পেরেছি— সুদিনে দুর্দিনে নিয়তি নির্ধারিত এরাই ছিলো কবির
হরিহর আত্মার মানুষ| তারা কখনো ডাকতে
বাসায় আসতো না বলে
আমি বুঝতে পারতাম না— তবে টলমল
পায়ের বেসামাল রফিক আজাদকে সিরাজী
ভাই কিংবা ফারুক মাহমুদ দরজা অবধি পৌঁছে
দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতেন| বাসায়
উপস্থিত ফারুক মাহমুদের পেছনেও যে আরো কারু
কারু ডাক নেপথ্যে অপেক্ষা
করছে, সে আমি অনেক
পরে বুঝেছি| বেচারা ফারুক মাহমুদকে না বুঝেই বেশি
অপরাধী ভেবেছি| তবে একথা মানতেই
হবে যে, রফিক আজাদকে
যারা ভালোবেসেছে দ্ব্যর্থহীন, দোষ-গুণ বিচার
না করেই— ভালোবাসার জন্যে
ভালোবেসেছে, মায়া করেছে মায়াহরিণের
মতো; তাদের মধ্যে কবি ফারুক মাহমুদসহ
বাকি দুজন কবি অন্যতম
তো বটেই|
যে
কথা বলছিলাম, একসময়ে ‘পূর্ণতা’ ছেড়ে ফারুক মাহমুদ
সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেছিলেন
‘ˆদনিক আমার দেশ’ পত্রিকায়|
এই সময়ে রফিক আজাদ
বেশ কিছুদিন চাকরিহীনতায় নানা রকম বিড়ম্বনায়
সময় পার করছিলেন| তখন
ফারুক মাহমুদ এসে কবিকে গদ্য
লিখতে উৎসাহিত করেন|
ইতোপূর্বে
অলোক বসুর অনুরোধে পাক্ষিক
অনন্যায় “কোনো খেদ নেই”
শিরোনামে আত্মজীবনীর ৬/৭টি কিস্তি
লিখেছিলেন কবি| অনন্যা লেখক-সম্মানী দিতো না, সেজন্যে
বেকার কবি অনন্যায় লেখা
বন্ধ করে দিয়েছিলেন| ফারুক
মাহমুদের অনুরোধে “কোনো খেদ নেই-এর বাকি পর্বগুলো
কবি পুনরায় লিখতে শুরু করেন ˆদনিক
‘আমার দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক
হিসেবে| রফিক আজাদ অনুজ
কবিদের খুব ভালোবাসতেন, বেটা
বলে স¤ে^াধন
করতেন এবং তাদের অনুরোধ
সহসা ফেলতেন না; পারতপক্ষে অকুলান
না হলে| প্রতি বৃহস্পতিবার
সকালে লেখার জন্য নিয়ম করে
ফারুক মাহমুদ ধানমণ্ডির বাসায় আসতেন তখন শুধু লেখাটি
নিতেই| কবি যখন অসুস্থ,
গভীর রাতে ফারুক মাহমুদ
আসতো হাসপাতালে| এক রাতে ফারুক
আইসিওতে গিয়ে কবিকে দেখে
আসলো এপ্রোন পরে| তখন কবিপুত্র
অভিন্ন ফারুকের সঙ্গেই ছিলো| এটাই শেষ দেখা|
কবির
প্রয়াণের পরে বাংলা একাডেমি
থেকে তাঁর জীবনী গ্রন্থ
প্রকাশের উদ্যোগ নিলে তৎকালীন মহাপরিচালক
শামসুজ্জামান খানকে লেখাটির দায়িত্ব কবি ফারুক মাহমুদকে
দিতে আমি অনুরোধ করেছিলাম|
ফারুক মাহমুদ লিখেছেনও| কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক দুঃখের কথা হলো এই
যে, কবি প্রয়াণের দশ
বছর পার হলেও আজো
অবধি বাংলা একাডেমি সেই গ্রন্থটি প্রকাশ
করেনি— সময়ে সময়ে নানামুখী
অজুহাত দেখিয়ে লেখাটি থামিয়ে রাখা হয়েছে বাংলা
একাডেমির সম্পাদনার টেবিলে| তবে বিভিন্ন সময়
ফারুক মাহমুদ তার আন্তর গরজেই
রফিক আজাদের কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ নিয়ে
লিখেছেন বিভিন্ন সময়ে| ২০১৬ সালে রফিক
আজাদ প্রয়াণের পরে, কবির স্মরণে
প্রতিবছর পহেলা ফাল্গুন কবির জন্মোৎসব পালনের
জন্যে “কবি রফিক আজাদ
স্মৃতি পর্ষদ” নামে একটি সংগঠন
করেছি পারিবারিক উদ্যোগে, কবি-সাহিত্িযক ও
সাংস্কৃতিক কর্মীদেরকে নিয়ে| এই স্মৃতি পর্ষদের
উদ্যোগে ২০২১ সাল থেকে
প্রথম “কবি রফিক আজাদ
পুরস্কার” প্রদানের উদ্যোগ নিলে— প্রথম বছর সত্তরের দশকের
বিশিষ্ট কবি ফারুক মাহমুদের
হাতে এই পুরস্কার আমরা
তুলে দিয়েছি| এর পরের বছর
ফারুক মাহমুদ বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন| কবি ফারুক মাহমুদের
লিরিক আমার খুব পছন্দ|
কবিতায় শব্দ ও ছন্দ
ব্যবহারে লাবণ্যময় দ্যুতি সৃষ্টিতে ফারুক মাহমুদের জুড়ি নেই| সর্বশেষ
কবিতার বইয়ের নামটিও দারুণ| “কবি লিখলেন মেঘ”|
এভাবেও কবিতার বইয়ের নাম রাখা যায়—
ফারুক মাহমুদের পক্ষে সম্ভব| সত্তরের দশকের কবি হলেও আবহমান
বাংলা কবিতার ধারায় তিনিও যুক্ত করেছেন নিজেকে| ফারুক মাহমুদ জানেন, রসাত্মক বাক্যই কাব্য— এজন্যে তাঁর
বিষয় ভাবনায় খুঁজে পাওয়া যায় অভিনবত্ব, বলা
যায়, ভাষার স্নিগ্ধ ব্যবহার এবং ছন্দ নিয়ে
তিনি একজন নীরিক্ষাপ্রবণ কবি|
অভিধানে শব্দ পরে থাকে
মৃত মাছির মতো, কবিরাই তাতে
প্রাণ সঞ্চার করে নতুন নতুন
অর্থ প্রদান করেন| বিশ্বাস করি, কবির হাতেই
শব্দের সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে
থাকে| ফারুকের হাতে শব্দের নতুন
নির্মিতি, সহজ-দক্ষতা পরিশেষে
ব্যবহারগুণে তা হয়ে ওঠে
রসোত্তীর্ণ কবিতার উদাহরণ| যেমন—
১.
ভ্রূণপদ্য
পাওয়া-না পাওয়ার হিসেবটা
বাঁকা, যথেষ্ট জটিল
দেখে
শুনে শব্দে স্পর্শে আমি শুধু মুগ্ধ
হতে চাই
২.
কু
ড়া নো কু
সু ম
জানাটা
জরুরি কিছু নয়
দূরত্বে
রয়েছে নাকি কাছে...
পাদদেশ
দেখে বোঝা যায়
শৈলচূড়া
যাথাযথ আছে|
দা
হ্য প্র
তি রো ধ
যদি
আগুনে নিক্ষেপ করো
চোখ
বুজে সহ্য করে যাব
দহনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া!
নাকি
মনের সকল শক্তি
একজোট
ক’রে লাফিয়ে
পড়ব
তোমাদের অধিকৃত মনে
নদী
মাঠ বৃক্ষ পাখি বন-উপবন...
যারা
আমাদের পার্শ্ববাসী চিরকুলজন
মানুষের
এমন দুর্দশা দেখে এসে যাবে|
সব
সাধ্য নিয়ে
গড়ে
তুলবে ছোট-বড় দাহ্যপ্রতিরোধ
ফারুক
মাহমুদের কাঁচা কবিতার মতোই কবি মাত্রেই আর্তি
ধ্বনিত হতে থাকে আকাশ
বাতাস পাতাল মথিত করে|
তেমন
জরুরি কিছু নয়
তবু
তোমাকে শুনতে চাই
তবু
আমাকে শোনাতে চাই
কাব্যভাষার
মতো ফারুক মাহমুদের গদ্যভাষাও প্রাঞ্জল ও সহজগম্য|
পরিশেষে
বলি,কবি রবিউল হুসাইন,
আসাদ চৌধুরীর পরে বর্তমানে রফিক
আজাদ স্মৃতি পরিষদে তিনি সভাপতির দায়িত্ব
পালন করছেন|
এই
জন্মদিনে আমি তার দীর্ঘায়ু,
সুস্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল বেঁচে
থাকা কামনা করি|

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
হাজার
বছরের বাংলা কবিতার ধারায় একজন কবির জন্ম
পৃথিবীর অন্যতম আশাবাদ ও বিশুদ্ধ আনন্দের
উপহার, তা বলাই বাহুল্য|
তবে জন্মমুহূর্তে দেবশিশুর মতো দেখালেও শুরুতেই
কেউ কবি হয়ে জন্মায়
না| প্রসঙ্গত মনে পড়ছে এক
অভিজ্ঞ কবি-মায়ের কথা|
তিনি বলতেন, আমার সন্তানকে গর্ভে
নিয়ে প্রায়ই আমি চাঁদ স্বপ্নে
দেখতাম| এবং তখনই ভেবেছিলাম,
আমার গর্ভস্থ এই সন্তান নিশ্চয়
কবি হবে| তিনি আর
কেউ নন, স্বয়ং কবি
রফিক আজাদের মা| মানে আমার
শাশুড়িমা প্রায়ই এই কথাটি বলতেন
আমাকে|
হতে
পারে তিনি হয়তো সেরকম
দিব্যজ্ঞানধারী মা ছিলেন, এজন্যে
বুঝতে পেরেছিলেন তাঁর গর্ভের সন্তান
রফিক আজাদ একদিন দেশের
অন্যতম প্রধান একজন কবি হবে|
সকল মা হয়তো
এভাবে বুঝতে পারেন না| আমিও কবি
হিসেবে যতটা বুঝতে পারি,
মা হিসেবে সন্তানের ভবিষ্যৎ ওভাবে হয়তো বলতেই পারবো
না কিছু|
সে
যাই হোক— কবি যিনি
হয়ে ওঠেন, তাঁর গভীরে থাকে
শুক্তির ক্ষত ও ক্ষরণ,
বহু অন্তর্দাহ, মান-অপমান দ্রোহ-বিদ্রোহ, প্রতিবাদ— আরো কত কিছু
মাড়িয়ে জীবন-জীবিকার মহরতে
দাঁড়িয়ে, হঠাৎ একদিন সময়
ও সম্ভাবনার হাত ধরাধরি করে
অবশেষে ভালোবেসে ত্রিভঙ্গ কবিও শিরে পরে
নেন কণ্টক মুকুটখানি তাঁর| বায়ুবীয় এমন শিল্পে নিবেদিত
কবি মাত্রই এক নিরুদ্দেশ শিল্প-যাত্রায় সঙ্গী হিসেবে ধর্মত কামনা করেন প্রকৃত কবিতাকেই|
রবীন্দ্রনাথ নিজেই “জীবনদেবতা”নামে ডেকেছেন— কবিতা
শিল্পের এই অনুরাধা ও
প্রেরণা-দায়িনী সুন্দরীকে|
“আর
কতদূর নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরী
বলো,
কোন& পারে ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী”|
এই
স্বপ্নময় কবিতা দেবী কাকে যে
কতদূর নিয়ে যাবে, জীবদ্দশায়
কেউ তা নিশ্চিত করে
কিছু বলতেই পারে না| নইলে
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে “১৪০০ সাল”-এর
মতো কবিতা লিখে শতবর্ষ তাঁর
কবিতা কেউ পড়বে কিনা—
সেই আশঙ্কা ব্যক্ত করতে হতো না|
“আজি
হতে শতবর্ষ পরে
কে
তুমি পড়িছ বসি আমার
কবিতাখানি
কৌতূহলভরে—
আজি হতে শতবর্ষ
পরে|”
২.
কবি
ফারুক মাহমুদ জন্মেছেন বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের বছরেই—
১৭ জুলাই| মেঘনা নদীর জলপ্রবাহিত কিশোরগঞ্জ
জেলার ˆভরবের সন্তান তিনি| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে
স্নাতকোত্তর| কবিদের ক্ষেত্রে সাধারণত যা হয়, ছড়া
দিয়ে লেখালেখির হাতেখড়ি| ফারুক মাহমুদের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হয়নি|
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় ভ্রমণ করলেও তার গল্প, প্রবন্ধ,
শিশু-কিশোর সাহিত্য ছাড়িয়ে নিরবছিন্নভাবে
কবিতাতেই তিনি
অবিচল থেকেছেন| পেশাগত জীবনে দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন| বর্তমানে তার সময় কাটে
লেখালেখিতেই| কবি ও সাংবাদিক
ফারুক মাহমুদের সঙ্গে প্রথম আমার পরিচয় হয়েছিলো
লতা হোসেন কর্তৃক প্রকাশিত পাক্ষিক “পূর্ণতা” পত্রিকার অফিসে| কবি ও ‘পূর্ণতা’র সম্পাদক ফারুক
মাহমুদের নিমন্ত্রণে রফিক আজাদের সঙ্গেই
গেছিলাম সেদিন| আশির দশকে আধুনিক
স্টাইলে পূর্ণতার অফিসটি সাজানো গোছানো ছিলো চমৎকাররূপে| সেদিনই
শিল্প-সংস্কৃতি প্রেমী ধনাঢ্য নারীব্যক্তিত্ব লতা হোসেনের সঙ্গে
পরিচিত হয়েছিলাম| তাঁকেও খুব ভালো লেগেছিলো|
পরবর্তী সময়ে ফারুক মাহমুদের
অনুরোধে রফিক আজাদ ‘পূর্ণতা’র একটি সংখ্যার
অতিথি সম্পাদক ছিলেন| কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের
প্রয়াণের পর ‘পূর্ণতা’র
যে বৃহৎ সংখ্যাটি প্রকাশিত
হয়েছিলো— ভারত ও বাংলাদেশ
মিলে এত সমৃদ্ধ সংকলন
আর হয়নি|
অগ্রজ
কবি রফিক আজাদের সঙ্গে
ফারুক মাহমুদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সম্পর্কের
পরিধি ছিলো বহুবিস্তৃত| কবি
ও সম্পাদকের টেবিল থেকে পানশালার শিশিরভেজা
টলমল টেবিল অবধি| সন্ধ্যার দিকে ফারুক মাহমুদ
আমাদের ধানমণ্ডির বাসায় এলেই আমার বুকের
ভেতর ভীতি ছড়াতো| এই
বুঝি কবিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে চায়ের টেবিল থেকে ফারুক মাহমুদ
সাকুরায় নিয়ে যেতে এসেছে|
হয়তো কবি তাকে আসতে
বলেছে, কিন্তু আমার মনে হতো
ফারুক মাহমুদ না এলে হয়তো
কবি বের হতো না
আজ বাসা থেকে| অনেক
পরে বুঝেছি ফারুক মাহমুদ ছিলো সাকুরার পথে
যেতে, বাসা থেকে বের
হবার ছল বা সাঁকো|
ওর পেছনে ছিলো কবি হাবীবুল্লাহ
সিরাজী এবং কবি শিহাব
সরকার| জানি, এরা দুজনেই কবির
অন্ধ ভক্ত ও ভালোবাসার
মানুষ ছিলেন| একমাত্র শিশিরের টেবিলেই লাজুক স্বভাবের রফিক আজাদ নিজেকে
ঢেলে উজার করে দিয়ে
কথা বলতেন| সেসব কথায় প্রজ্ঞা
ও প্রতিভার সঙ্গে হিউমার বোধের এমন এক মিথস্ক্রিয়া
ঘটতো যে, সঙ্গী সতীর্থেরাও
আনন্দে আন্দোলিত হতেন|
দিন
যত গেছে তত বুঝতে
পেরেছি— সুদিনে দুর্দিনে নিয়তি নির্ধারিত এরাই ছিলো কবির
হরিহর আত্মার মানুষ| তারা কখনো ডাকতে
বাসায় আসতো না বলে
আমি বুঝতে পারতাম না— তবে টলমল
পায়ের বেসামাল রফিক আজাদকে সিরাজী
ভাই কিংবা ফারুক মাহমুদ দরজা অবধি পৌঁছে
দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতেন| বাসায়
উপস্থিত ফারুক মাহমুদের পেছনেও যে আরো কারু
কারু ডাক নেপথ্যে অপেক্ষা
করছে, সে আমি অনেক
পরে বুঝেছি| বেচারা ফারুক মাহমুদকে না বুঝেই বেশি
অপরাধী ভেবেছি| তবে একথা মানতেই
হবে যে, রফিক আজাদকে
যারা ভালোবেসেছে দ্ব্যর্থহীন, দোষ-গুণ বিচার
না করেই— ভালোবাসার জন্যে
ভালোবেসেছে, মায়া করেছে মায়াহরিণের
মতো; তাদের মধ্যে কবি ফারুক মাহমুদসহ
বাকি দুজন কবি অন্যতম
তো বটেই|
যে
কথা বলছিলাম, একসময়ে ‘পূর্ণতা’ ছেড়ে ফারুক মাহমুদ
সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগদান করেছিলেন
‘ˆদনিক আমার দেশ’ পত্রিকায়|
এই সময়ে রফিক আজাদ
বেশ কিছুদিন চাকরিহীনতায় নানা রকম বিড়ম্বনায়
সময় পার করছিলেন| তখন
ফারুক মাহমুদ এসে কবিকে গদ্য
লিখতে উৎসাহিত করেন|
ইতোপূর্বে
অলোক বসুর অনুরোধে পাক্ষিক
অনন্যায় “কোনো খেদ নেই”
শিরোনামে আত্মজীবনীর ৬/৭টি কিস্তি
লিখেছিলেন কবি| অনন্যা লেখক-সম্মানী দিতো না, সেজন্যে
বেকার কবি অনন্যায় লেখা
বন্ধ করে দিয়েছিলেন| ফারুক
মাহমুদের অনুরোধে “কোনো খেদ নেই-এর বাকি পর্বগুলো
কবি পুনরায় লিখতে শুরু করেন ˆদনিক
‘আমার দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক
হিসেবে| রফিক আজাদ অনুজ
কবিদের খুব ভালোবাসতেন, বেটা
বলে স¤ে^াধন
করতেন এবং তাদের অনুরোধ
সহসা ফেলতেন না; পারতপক্ষে অকুলান
না হলে| প্রতি বৃহস্পতিবার
সকালে লেখার জন্য নিয়ম করে
ফারুক মাহমুদ ধানমণ্ডির বাসায় আসতেন তখন শুধু লেখাটি
নিতেই| কবি যখন অসুস্থ,
গভীর রাতে ফারুক মাহমুদ
আসতো হাসপাতালে| এক রাতে ফারুক
আইসিওতে গিয়ে কবিকে দেখে
আসলো এপ্রোন পরে| তখন কবিপুত্র
অভিন্ন ফারুকের সঙ্গেই ছিলো| এটাই শেষ দেখা|
কবির
প্রয়াণের পরে বাংলা একাডেমি
থেকে তাঁর জীবনী গ্রন্থ
প্রকাশের উদ্যোগ নিলে তৎকালীন মহাপরিচালক
শামসুজ্জামান খানকে লেখাটির দায়িত্ব কবি ফারুক মাহমুদকে
দিতে আমি অনুরোধ করেছিলাম|
ফারুক মাহমুদ লিখেছেনও| কিন্তু সবচেয়ে মর্মান্তিক দুঃখের কথা হলো এই
যে, কবি প্রয়াণের দশ
বছর পার হলেও আজো
অবধি বাংলা একাডেমি সেই গ্রন্থটি প্রকাশ
করেনি— সময়ে সময়ে নানামুখী
অজুহাত দেখিয়ে লেখাটি থামিয়ে রাখা হয়েছে বাংলা
একাডেমির সম্পাদনার টেবিলে| তবে বিভিন্ন সময়
ফারুক মাহমুদ তার আন্তর গরজেই
রফিক আজাদের কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ নিয়ে
লিখেছেন বিভিন্ন সময়ে| ২০১৬ সালে রফিক
আজাদ প্রয়াণের পরে, কবির স্মরণে
প্রতিবছর পহেলা ফাল্গুন কবির জন্মোৎসব পালনের
জন্যে “কবি রফিক আজাদ
স্মৃতি পর্ষদ” নামে একটি সংগঠন
করেছি পারিবারিক উদ্যোগে, কবি-সাহিত্িযক ও
সাংস্কৃতিক কর্মীদেরকে নিয়ে| এই স্মৃতি পর্ষদের
উদ্যোগে ২০২১ সাল থেকে
প্রথম “কবি রফিক আজাদ
পুরস্কার” প্রদানের উদ্যোগ নিলে— প্রথম বছর সত্তরের দশকের
বিশিষ্ট কবি ফারুক মাহমুদের
হাতে এই পুরস্কার আমরা
তুলে দিয়েছি| এর পরের বছর
ফারুক মাহমুদ বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেলেন| কবি ফারুক মাহমুদের
লিরিক আমার খুব পছন্দ|
কবিতায় শব্দ ও ছন্দ
ব্যবহারে লাবণ্যময় দ্যুতি সৃষ্টিতে ফারুক মাহমুদের জুড়ি নেই| সর্বশেষ
কবিতার বইয়ের নামটিও দারুণ| “কবি লিখলেন মেঘ”|
এভাবেও কবিতার বইয়ের নাম রাখা যায়—
ফারুক মাহমুদের পক্ষে সম্ভব| সত্তরের দশকের কবি হলেও আবহমান
বাংলা কবিতার ধারায় তিনিও যুক্ত করেছেন নিজেকে| ফারুক মাহমুদ জানেন, রসাত্মক বাক্যই কাব্য— এজন্যে তাঁর
বিষয় ভাবনায় খুঁজে পাওয়া যায় অভিনবত্ব, বলা
যায়, ভাষার স্নিগ্ধ ব্যবহার এবং ছন্দ নিয়ে
তিনি একজন নীরিক্ষাপ্রবণ কবি|
অভিধানে শব্দ পরে থাকে
মৃত মাছির মতো, কবিরাই তাতে
প্রাণ সঞ্চার করে নতুন নতুন
অর্থ প্রদান করেন| বিশ্বাস করি, কবির হাতেই
শব্দের সর্বোত্তম ব্যবহার ঘটে
থাকে| ফারুকের হাতে শব্দের নতুন
নির্মিতি, সহজ-দক্ষতা পরিশেষে
ব্যবহারগুণে তা হয়ে ওঠে
রসোত্তীর্ণ কবিতার উদাহরণ| যেমন—
১.
ভ্রূণপদ্য
পাওয়া-না পাওয়ার হিসেবটা
বাঁকা, যথেষ্ট জটিল
দেখে
শুনে শব্দে স্পর্শে আমি শুধু মুগ্ধ
হতে চাই
২.
কু
ড়া নো কু
সু ম
জানাটা
জরুরি কিছু নয়
দূরত্বে
রয়েছে নাকি কাছে...
পাদদেশ
দেখে বোঝা যায়
শৈলচূড়া
যাথাযথ আছে|
দা
হ্য প্র
তি রো ধ
যদি
আগুনে নিক্ষেপ করো
চোখ
বুজে সহ্য করে যাব
দহনের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া!
নাকি
মনের সকল শক্তি
একজোট
ক’রে লাফিয়ে
পড়ব
তোমাদের অধিকৃত মনে
নদী
মাঠ বৃক্ষ পাখি বন-উপবন...
যারা
আমাদের পার্শ্ববাসী চিরকুলজন
মানুষের
এমন দুর্দশা দেখে এসে যাবে|
সব
সাধ্য নিয়ে
গড়ে
তুলবে ছোট-বড় দাহ্যপ্রতিরোধ
ফারুক
মাহমুদের কাঁচা কবিতার মতোই কবি মাত্রেই আর্তি
ধ্বনিত হতে থাকে আকাশ
বাতাস পাতাল মথিত করে|
তেমন
জরুরি কিছু নয়
তবু
তোমাকে শুনতে চাই
তবু
আমাকে শোনাতে চাই
কাব্যভাষার
মতো ফারুক মাহমুদের গদ্যভাষাও প্রাঞ্জল ও সহজগম্য|
পরিশেষে
বলি,কবি রবিউল হুসাইন,
আসাদ চৌধুরীর পরে বর্তমানে রফিক
আজাদ স্মৃতি পরিষদে তিনি সভাপতির দায়িত্ব
পালন করছেন|
এই
জন্মদিনে আমি তার দীর্ঘায়ু,
সুস্বাস্থ্য এবং সৃজনশীল বেঁচে
থাকা কামনা করি|

আপনার মতামত লিখুন