সংবাদ

ধারাবাহিক উপন্যাস ০৭

গোমতীকন্যা


মহিবুল আলম
মহিবুল আলম
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ০১:০১ এএম

গোমতীকন্যা
শিল্পী: সঞ্জয় দে রিপন



(পূর্ব প্রকাশের পর

 

দশ.

আনিসদের কেড়াই নৌকায় যে মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন লাগানো হয় না, তা নয়| তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া বেঁচে থাকতে কারণে-অকারণেই নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে চালাত| এমনকি মীরবহরি বাজারে তার সারের দোকানটায় যেতেও নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে ভটভট শব্দ তুলে যেত| এতে সে নিজেকে অভিজাত শ্রেণির কেউ একজন ভাবত| যদিও ভুঁইয়া বাড়ি শুধু নামেই ভুঁইয়া বাড়ি| গ্রামে তাদের তেমন প্রতিপত্তি বা দাপট নেই| ভুঁইয়া বাড়ির মধ্যে আনিসদেরই জায়গাজমি বেশি| তা- ঐতিহ্যগতভাবে নয়| সুন্দর ভুঁইয়ার জমি কেনার নেশা বেশি ছিল বলে|

আনিসের ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ খুব একটা পছন্দ নয়| সে পছন্দ করে লগি ঠেলে বা বৈঠা দিয়ে নৌকা চালাতে| বশির যখন কট কট শব্দে লগি ঠেলে বা জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে বৈঠা বেয়ে নৌকা চালায়, সেখানে সে কী এক ছন্দ খুঁজে পায়| জীবনের ছন্দ| কবিতার ছন্দের সঙ্গে যার মিল আছে| নৌকাটা যখন মৃদু মৃদু দোলে, তার মনে একটা অদ্ভুত শিহরন জাগায়| এই শিহরনও কবিতার শিহরন| চোখের সামনে জলের সিঁথি কাটা, দুপাশে সরু স্রোতের রেখা প্রশস্ত হতে হতে একসময় জলেই মিলিয়ে যাওয়া, তার কাছে মৃত্যুর মিলটা যেন সেখানেই|

আনিস ভাবল, তো বিলের শান্ত জলের শান্ত জীবনের গল্প| গোমতী নদীর জলে নৌকা বাওয়ার গল্পটা তো অন্যরকম| গোমতীর সুদিনে একরূপ, বর্ষার মওসুমে অন্যরূপ| গোমতীর ভাটিতে সুদিন বলা হয় সাধারণত শুকনো মওসুমকে| তখন নদীটা শান্ত হয়ে যায়| ভাটির দিকে নৌকা চলে এক তালে, উজানে চলে অন্য তালে| বর্ষার মওসুমে উত্তাল গোমতীর সঙ্গে নৌকাটাও উত্তাল হয়ে ওঠে| নৌকার সামনে সিঁথিকাটা জল উছলে পড়ে| জীবনের রূপ তখন অন্যভাবে দেখা দেয়|

কবিতা লেখার খাতাটা সবসময় তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটায় থাকে| নৌকায় উঠলে তো কোনো কথাই নেই| ঢেউয়ের কলকল শব্দ, প্রশস্ত জলের বুক চিরে বয়ে আসা হিলহিল বাতাস নৌকার মৃদুমন্দ দুলুনি, তাকে কবিতার জগতে এমনিতেই টেনে নিয়ে যায়| সে বেশ কয়েকটা কবিতা এই নৌকায় বসে লিখেছে| সেগুলো তার প্রথম দ্বিতীয় কবিতার বইতে স্থান পেয়েছে| আর এই নৌকায় বসেই সেতারা বেগমকে নিয়ে সে লিখেছিল প্রকৃতির কবিতা, জলের গান| সেদিন তার বাম হাতটা মুঠো করা ছিল সেতারার দুই হাতে| তিন দিন আগে রাতে নৌকায় করে সেতারা বেগমের লাশ খুঁজতে গিয়েই তোগোমতীকন্যাসিরিজ কবিতার ভাবনাটা মাথায় নিয়ে আসে| গত দুই দিনে লিখে ফেলে নয়টি কবিতা|

আনিস থানায় যাচ্ছে| সে আজ মনসুর পাগলার সঙ্গে দেখা করবে| তার ইচ্ছে ছিল গতকালই যাওয়ার| কিন্তু গতকাল সে তার মাকে নিয়ে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখায়| ডাক্তারের কাছে বেশি দেরি না হলেও ল্যাবে মা কয়েকটা টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়ে থানা সদরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়| সে রাতে আর মনসুর পাগলাকে দেখতে থানায় যায়নি|

বাড়ি থেকে আনিস সকালের নাস্তা করে বের হয়েছে| আজ সে শুধু মনসুর পাগলার সঙ্গে থানায় দেখা করবে না, উপজেলা সদরের ডা. জাহিদের সঙ্গেও দেখা করবে| গতকাল কুমিল্লা থেকে ফিরে ডা. জাহিদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি| মা বিষয়ে তার জরুরি কিছু আলাপ আছে| কুমিল্লার বড় ডাক্তার বলেছে, তার মা বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে নড়াচড়া কম হয়েছে বলে পায়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে নাকি রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে| যার চিহ্ন হিসেবে শরীরের স্থানে স্থানে শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে| একে বলা হয়, ডিপ ভেইন থ্র¤^াসিস| বড় ডাক্তার সন্দেহ করছে, এই জমাট রক্ত ফুসফুসে চলে গেছে| যার কারণে তার মা ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে| এই জমাট রক্ত যদি বেশি পরিমাণে ফুসফুসে জমা হয়, তাহলে রাহেলা খানমের মৃত্যুর কারণ হতে পারে| এজন্য গতকাল সন্ধ্যা অব্দি আনিস বড় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তার মা বিভিন্ন টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়েছে|

আনিস জানে, এত তাড়াতাড়ি টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফির রেজাল্ট আসবে না| কমপক্ষে তিন দিন লাগবে| এই সবের রেজাল্ট ওরা সরাসরি ডা. জাহিদের কাছে পাঠাবে| তারপরও সে মাকে প্রয়োজনে ঢাকা নিবে কি না নিয়ে ডা. জাহিদের সঙ্গে আজ আলাপ করবে| অবশ্য সে শুধুমাত্র এই আলাপের জন্য উপজেলা সদরে যাচ্ছে, তা নয়| এই আলাপ সে ফোনেই সেরে ফেলতে পারত| কিন্তু থানায় মনসুর পাগলাকে দেখতে যাওয়াটা জরুরি| মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে| এক পাগলামি বাদে জীবনের কোনো কাজই সে তাকে জিজ্ঞেস না বলে করে না| ছোটবেলা থেকেই সে তার ছায়া হয়ে ঘোরে|

নৌকাটা বুইদ্দার খাল পেরিয়ে গোমতী নদীতে উঠে এল| বশির এতক্ষণ বুইদ্দার খালে লগি ঠেললেও গোমতী নদীতে ওঠার আগে সে লগিটা নৌকার ছইয়ের একপাশে দড়িতে বেঁধে বৈঠা হাতে নিল| নদীতে বর্ষার বান থাকলেও স্রোতের তীব্রতা খুব বেশি নেই| উজানে কোথাও বৃষ্টি হলে বর্ষার বান বেড়ে যায়| গত চারদিন ধরে বৃষ্টি নেই| আজ আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ থাকলেও রোদ উঠেছে স্পষ্ট হয়ে|

পেছনের গলুইতে বসে বশির বৈঠা বাইছে| নৌকাটা পশ্চিমে ভাটির দিকে যাচ্ছে বলে নদীর জলে বৈঠা মারার শব্দ খুব একটা হচ্ছে না| তারপরও আনিসের কানে জলের শব্দ আসছেঝপাৎ ঝপাৎ| নৌকাটা স্রোতের সঙ্গে মিলে একটু বেশি গতিতেই এগোচ্ছে| বিচ্ছিন্ন কচুরিপানা নৌকার গা ঘেঁষে একে একে পেছনে চলে যাচ্ছে| গোমতী নদীতে তাদের নৌকার আশেপাশে আর কোনো নৌকা নেই| খুব সকালে গোমতী নদীতে জেলেদের মাছধরার বড় বড় ডিঙি নৌকা আর বিলে-বাদাড়ে গৃহস্থের মাছ ধরার ছোট্ট ডিঙি বা কোষা নৌকা দেখা গেলেও এখন সকালটা গড়িয়ে সূর্যটা আকাশে উঠে গেছে বেশ| তবে দুপুর হতে এখনও অনেকটা সময় বাকি|

আনিস এই রোদের মধ্যেই নৌকার সামনের গলুইতে বসেছে| সামনের গলুইটা খানিকটা উঁচু| সে বসেছে সামনের গলুইর সরু মাথার দুপাশে দুটো পা ঝুলিয়ে| পরনের প্যান্টটা গুটানো| খালি পা| নদীর ঢেউ বৈঠা মারার তালে তালে তার পা দুটো একবার জলে ভিজছে, পরক্ষণ আবার জল থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে| পা দুটো যখন জলে ভিজছে, তখন সত্যি সত্যি তার শরীরে একটা শিহরন দিচ্ছে| সে এক অন্য রকম শিহরন| নদীর জল একেবারে শীতল না হলেও জলের স্পর্শে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে| এছাড়া নদী বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস তার মুখে শরীরে নরম স্পর্শ দিচ্ছে| মাথার ওপর তার তেতে ওঠা রোদ, শ্রাবণের ভ্যাপসা গরমটাও বেশ, কিন্তু জলের এই নরম স্পর্শ নদীর হিলহিল বাতাসের কারণে রোদ-ভ্যাপসা গরম তাকে কোনো যন্ত্রণা দিচ্ছে না|

আনিসের মাথায় এখন অবশ্য কবিতার ভাবের চেয়ে তার মা অসুখের চিন্তাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে বেশি| আর ঘুরপাক খাচ্ছে সেতারা বেগম মনসুর পাগলার বিষয়টা| আরেকজনের বিষয়টাও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হলো মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন| তার অসুস্থ মা গতকাল নৌকায় যেতে যেতে কমলা খাতুনকে নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছে| কথাগুলো খুব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়| সে এসব কথার অনেকটাই জানে| তারপরও মা অসুস্থ গলার স্বর অনেকটা বেঁকে যাওয়া মুখে কথাগুলো শুনতে শুনতে তার বেশ খারাপ লেগেছিল| মনটা রেগে ফেঁপে উঠেছিল| কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত রাগটা মনে চেপে রাখেনি| সে বিশ্বাস করে, কবিদের রাগতে নেই| কবিদের ক্ষমা করতে শিখতে হয়|

আনিস অবশ্য কমলা খাতুনকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে| তবে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি| এই মুছে না ফেলার কারণ, তার মা রাহেলা খানমের ওপর তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার মানসিক শারীরিক অত্যাচার| সেই মানসিক শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরেই তার মা ব্রেন স্ট্রোক করে| মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়| তারপর দীর্ঘ এতগুলো বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে|

আনিসের বয়স তখন কত ছিল? আট কি নয়|

রাহেলা বেগম ছিল কাকবন্ধ্যা| বিয়ের নয় বছর পর্যন্ত তার কোনো বাচ্চা হয়নি| সবাই ধরে নিয়েছিল তার আর বাচ্চাকাচ্চা হবে না| কিন্তু সাতাশ বছর বয়সে তার পেটে বাচ্চা আসে| এই খুশিতে সে মস্তানের দরগায় গিয়ে মানত দিয়ে আসে| বাড়িতে ডেকে ফকির খাওয়ায়| ঠিক তখনই সে জানতে পারে, স্বামী তার দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারির বউ কমলা খাতুনের সঙ্গে বেশ অনেকদিন ধরে গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে| কমলা খাতুনের ছিল আগুনরঙা রূপ| কিছুদিন পর স্বামীর এই গোপন সম্পর্ক গ্রামে চাউর হয়ে যায়| এরই মধ্যে কমলা খাতুনের একটা ছেলে হয়| ছেলেটা দেখতে একদম সুন্দর ভুঁইয়ার মতো| তার ছেলে আনিসেরও জন্ম হয় সেই সময়টায়|

রাহেলা খানম ভেবেছিল, ছেলের জন্মের পর তার স্বামী ঘরে ফিরবে| কিন্তু সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল দ্বিচারণ মনোভাব| ওদিকে কমলা খাতুনের ব্যাপারে দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারিকে একধরনের বুঝ দিত, ঘরে এসে তাকে দিত অন্য রকম বুঝ| কোনো প্রতিবাদ করলেই করত শারীরিক অত্যাচার| মানসিক অত্যাচার তো হরহামেশাই করত| শেষে একদিন ঘাড়ের পেছনে লাঠির আঘাত পেয়ে সেই যে ব্রেন স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়, আর কোনো সেরে ওঠেনি| ওদিকে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কমলা খাতুনের স্বামী আসমত আলী ব্যাপারিও নিখোঁজ হয়ে যায়| গ্রামে রব ওঠে, আসমত আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলে লাশ গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে| কিন্তু ব্যাপারে সঠিক প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি| পুলিশও না|

রাহেলা খাতুনের প্রথম থেকেই মনে হয়, আসমত আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলেনি| তার মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে তার স্বামী সুন্দর ভুঁইয়ার হাত আছে| এমনকি কি কমলা খাতুনেরও হাত থাকতে পারে| আসমত আলীর লাশ আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি...|

নৌকাটা মোল্লাকান্দির বটতলা পেরিয়ে ছল্লাকান্দিতে ঢুকেছে| ছল্লাকান্দি গ্রামটা একেবারেই ছোট, একটা পাড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| ছল্লাকান্দি আগে মোল্লাকান্দিরই একটা পাড়া ছিল| ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজের পাইক ছলিম উদ্দিন নিজেকে জাহির করার জন্য মোল্লাকান্দি থেকে তার পাড়াটা আলাদা নিজে নিজে নতুন একটা গ্রামের ঘোষণা দেয়| গ্রামের নাম দেয় নিজের নামেছলিমকান্দি| এই ছলিমকান্দি এখন ছল্লাকান্দি হয়ে গেছে|

গোমতী নদীটা এদিকে ছল্লাকান্দির পাশ দিয়ে দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে| ছল্লাকান্দি পেরোতেই আবার মোল্লাকান্দি| মোল্লাকান্দির পর মীরবহরি| আনিস এবার নৌকার গলুইতে পা তুলে বসল| বাইরের রোদটা এখন বেশ তেতে উঠেছে| যদিও নদী থেকে বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস তাকে আলতো স্পর্শ দিচ্ছে, কিন্তু তার শরীর ঘামছে| সে ছইয়ার নিচে যাবে বলে ভাবল| ভাবতেই ভাবতেই সে উঠে দাঁড়াল| নৌকাটা ঠিক তখনই একটু বেশি দুলে উঠল|

আনিস শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ছইয়ের নিচে গিয়ে বসল| প্রথমে সে হাঁটু গেড়ে বসলেও পরক্ষণ পা দুটো ছড়িয়ে দিল| রোদ লাগছে না বলে ছইয়ের নিচে তার বেশ আরামবোধ হচ্ছে| সে সামনে দিঘল দৃষ্টি মেলে নদীর আরও ভাটিতে তাকাল| যদিও চার-পাঁচদিন ধরে কোনো বৃষ্টি নেই, তারপরও গোমতীর জল বেশ ঘোলা| নদীর ধার উপচে বিলের ˆথথৈ জল দিগন্ত বিস্তৃত বিছিয়ে রয়েছে| বৃষ্টি হোক আর না হোক, উত্তরের জোয়ারের জল এখনই কমবে না| ভাদ্র মাসে গিয়ে কমবে| আশ্বিন মাসে জোয়ারের জল একেবারে নেমে যাবে| কার্তিকে বিল পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে| অগ্রহায়ণে ধান কাটা হবে| মূলত কার্তিক মাস থেকেই সুদিন মাস শুরু হয়|

আনিস নিঃসীম দৃষ্টিতে কী একটা খুঁজে হঠাৎ নিজে নিজে নড়ে উঠল| তখনই তার মনে একটা প্রশ্ন এসে বিঁধল, সে তার বাবার মতো একই অপরাধ করেনি তো? তার বাবা কমলা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল| অথচ তার বাবা আসমত আলী ব্যাপারি সেই ছোটবেলা থেকে খুব কাছের বন্ধু ছিল| একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ছিল বেশ| এদিকে সে নিজে সেতারা বেগমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে| মনসুর পাগলা তার সেই ছোটবেলার বন্ধু| যদিও নির্ভরতার বেশ হেরফের আছে| তারপরও কথা কিন্তু একই দাঁড়ায়!

গত পরশু দিনের আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ সফুরা বিবির কথাটা আনিসের মনে পড়ল| সফুরা বিবি কটাক্ষ করে বলেছিল, ‘ভুঁইয়ার পুত, তুমি তোমার বাপের লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’

আনিস নিজে নিজে মাথা ঝাঁকাল| ভাবল, আসলেই কি তাই? পরক্ষণ সে মাথা নাড়ল| নাহ, কথা একই দাঁড়ালেও সে কোনো অপরাধ করেনি| কবিরা কখনও অপরাধ করতেই পারে না| ওরা যা কিছু করে, কবিতার জন্যই করে| আর সেতারা বেগমের প্রতি তার ভালোবাসা তো মনের অধিক শরীরের| ক্রমশ... 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬


গোমতীকন্যা

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬

featured Image



(পূর্ব প্রকাশের পর

 

দশ.

আনিসদের কেড়াই নৌকায় যে মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন লাগানো হয় না, তা নয়| তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়া বেঁচে থাকতে কারণে-অকারণেই নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে চালাত| এমনকি মীরবহরি বাজারে তার সারের দোকানটায় যেতেও নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে ভটভট শব্দ তুলে যেত| এতে সে নিজেকে অভিজাত শ্রেণির কেউ একজন ভাবত| যদিও ভুঁইয়া বাড়ি শুধু নামেই ভুঁইয়া বাড়ি| গ্রামে তাদের তেমন প্রতিপত্তি বা দাপট নেই| ভুঁইয়া বাড়ির মধ্যে আনিসদেরই জায়গাজমি বেশি| তা- ঐতিহ্যগতভাবে নয়| সুন্দর ভুঁইয়ার জমি কেনার নেশা বেশি ছিল বলে|

আনিসের ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ খুব একটা পছন্দ নয়| সে পছন্দ করে লগি ঠেলে বা বৈঠা দিয়ে নৌকা চালাতে| বশির যখন কট কট শব্দে লগি ঠেলে বা জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ তুলে বৈঠা বেয়ে নৌকা চালায়, সেখানে সে কী এক ছন্দ খুঁজে পায়| জীবনের ছন্দ| কবিতার ছন্দের সঙ্গে যার মিল আছে| নৌকাটা যখন মৃদু মৃদু দোলে, তার মনে একটা অদ্ভুত শিহরন জাগায়| এই শিহরনও কবিতার শিহরন| চোখের সামনে জলের সিঁথি কাটা, দুপাশে সরু স্রোতের রেখা প্রশস্ত হতে হতে একসময় জলেই মিলিয়ে যাওয়া, তার কাছে মৃত্যুর মিলটা যেন সেখানেই|

আনিস ভাবল, তো বিলের শান্ত জলের শান্ত জীবনের গল্প| গোমতী নদীর জলে নৌকা বাওয়ার গল্পটা তো অন্যরকম| গোমতীর সুদিনে একরূপ, বর্ষার মওসুমে অন্যরূপ| গোমতীর ভাটিতে সুদিন বলা হয় সাধারণত শুকনো মওসুমকে| তখন নদীটা শান্ত হয়ে যায়| ভাটির দিকে নৌকা চলে এক তালে, উজানে চলে অন্য তালে| বর্ষার মওসুমে উত্তাল গোমতীর সঙ্গে নৌকাটাও উত্তাল হয়ে ওঠে| নৌকার সামনে সিঁথিকাটা জল উছলে পড়ে| জীবনের রূপ তখন অন্যভাবে দেখা দেয়|

কবিতা লেখার খাতাটা সবসময় তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটায় থাকে| নৌকায় উঠলে তো কোনো কথাই নেই| ঢেউয়ের কলকল শব্দ, প্রশস্ত জলের বুক চিরে বয়ে আসা হিলহিল বাতাস নৌকার মৃদুমন্দ দুলুনি, তাকে কবিতার জগতে এমনিতেই টেনে নিয়ে যায়| সে বেশ কয়েকটা কবিতা এই নৌকায় বসে লিখেছে| সেগুলো তার প্রথম দ্বিতীয় কবিতার বইতে স্থান পেয়েছে| আর এই নৌকায় বসেই সেতারা বেগমকে নিয়ে সে লিখেছিল প্রকৃতির কবিতা, জলের গান| সেদিন তার বাম হাতটা মুঠো করা ছিল সেতারার দুই হাতে| তিন দিন আগে রাতে নৌকায় করে সেতারা বেগমের লাশ খুঁজতে গিয়েই তোগোমতীকন্যাসিরিজ কবিতার ভাবনাটা মাথায় নিয়ে আসে| গত দুই দিনে লিখে ফেলে নয়টি কবিতা|

আনিস থানায় যাচ্ছে| সে আজ মনসুর পাগলার সঙ্গে দেখা করবে| তার ইচ্ছে ছিল গতকালই যাওয়ার| কিন্তু গতকাল সে তার মাকে নিয়ে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখায়| ডাক্তারের কাছে বেশি দেরি না হলেও ল্যাবে মা কয়েকটা টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়ে থানা সদরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়| সে রাতে আর মনসুর পাগলাকে দেখতে থানায় যায়নি|

বাড়ি থেকে আনিস সকালের নাস্তা করে বের হয়েছে| আজ সে শুধু মনসুর পাগলার সঙ্গে থানায় দেখা করবে না, উপজেলা সদরের ডা. জাহিদের সঙ্গেও দেখা করবে| গতকাল কুমিল্লা থেকে ফিরে ডা. জাহিদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি| মা বিষয়ে তার জরুরি কিছু আলাপ আছে| কুমিল্লার বড় ডাক্তার বলেছে, তার মা বিছানায় শুয়ে থাকতে থাকতে নড়াচড়া কম হয়েছে বলে পায়ে শরীরের বিভিন্ন অংশে নাকি রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করেছে| যার চিহ্ন হিসেবে শরীরের স্থানে স্থানে শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে| একে বলা হয়, ডিপ ভেইন থ্র¤^াসিস| বড় ডাক্তার সন্দেহ করছে, এই জমাট রক্ত ফুসফুসে চলে গেছে| যার কারণে তার মা ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট দেখা দিচ্ছে| এই জমাট রক্ত যদি বেশি পরিমাণে ফুসফুসে জমা হয়, তাহলে রাহেলা খানমের মৃত্যুর কারণ হতে পারে| এজন্য গতকাল সন্ধ্যা অব্দি আনিস বড় ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তার মা বিভিন্ন টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়েছে|

আনিস জানে, এত তাড়াতাড়ি টেস্ট, এমআরআই ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফির রেজাল্ট আসবে না| কমপক্ষে তিন দিন লাগবে| এই সবের রেজাল্ট ওরা সরাসরি ডা. জাহিদের কাছে পাঠাবে| তারপরও সে মাকে প্রয়োজনে ঢাকা নিবে কি না নিয়ে ডা. জাহিদের সঙ্গে আজ আলাপ করবে| অবশ্য সে শুধুমাত্র এই আলাপের জন্য উপজেলা সদরে যাচ্ছে, তা নয়| এই আলাপ সে ফোনেই সেরে ফেলতে পারত| কিন্তু থানায় মনসুর পাগলাকে দেখতে যাওয়াটা জরুরি| মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে| এক পাগলামি বাদে জীবনের কোনো কাজই সে তাকে জিজ্ঞেস না বলে করে না| ছোটবেলা থেকেই সে তার ছায়া হয়ে ঘোরে|

নৌকাটা বুইদ্দার খাল পেরিয়ে গোমতী নদীতে উঠে এল| বশির এতক্ষণ বুইদ্দার খালে লগি ঠেললেও গোমতী নদীতে ওঠার আগে সে লগিটা নৌকার ছইয়ের একপাশে দড়িতে বেঁধে বৈঠা হাতে নিল| নদীতে বর্ষার বান থাকলেও স্রোতের তীব্রতা খুব বেশি নেই| উজানে কোথাও বৃষ্টি হলে বর্ষার বান বেড়ে যায়| গত চারদিন ধরে বৃষ্টি নেই| আজ আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ থাকলেও রোদ উঠেছে স্পষ্ট হয়ে|

পেছনের গলুইতে বসে বশির বৈঠা বাইছে| নৌকাটা পশ্চিমে ভাটির দিকে যাচ্ছে বলে নদীর জলে বৈঠা মারার শব্দ খুব একটা হচ্ছে না| তারপরও আনিসের কানে জলের শব্দ আসছেঝপাৎ ঝপাৎ| নৌকাটা স্রোতের সঙ্গে মিলে একটু বেশি গতিতেই এগোচ্ছে| বিচ্ছিন্ন কচুরিপানা নৌকার গা ঘেঁষে একে একে পেছনে চলে যাচ্ছে| গোমতী নদীতে তাদের নৌকার আশেপাশে আর কোনো নৌকা নেই| খুব সকালে গোমতী নদীতে জেলেদের মাছধরার বড় বড় ডিঙি নৌকা আর বিলে-বাদাড়ে গৃহস্থের মাছ ধরার ছোট্ট ডিঙি বা কোষা নৌকা দেখা গেলেও এখন সকালটা গড়িয়ে সূর্যটা আকাশে উঠে গেছে বেশ| তবে দুপুর হতে এখনও অনেকটা সময় বাকি|

আনিস এই রোদের মধ্যেই নৌকার সামনের গলুইতে বসেছে| সামনের গলুইটা খানিকটা উঁচু| সে বসেছে সামনের গলুইর সরু মাথার দুপাশে দুটো পা ঝুলিয়ে| পরনের প্যান্টটা গুটানো| খালি পা| নদীর ঢেউ বৈঠা মারার তালে তালে তার পা দুটো একবার জলে ভিজছে, পরক্ষণ আবার জল থেকে উপরে উঠে যাচ্ছে| পা দুটো যখন জলে ভিজছে, তখন সত্যি সত্যি তার শরীরে একটা শিহরন দিচ্ছে| সে এক অন্য রকম শিহরন| নদীর জল একেবারে শীতল না হলেও জলের স্পর্শে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে| এছাড়া নদী বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস তার মুখে শরীরে নরম স্পর্শ দিচ্ছে| মাথার ওপর তার তেতে ওঠা রোদ, শ্রাবণের ভ্যাপসা গরমটাও বেশ, কিন্তু জলের এই নরম স্পর্শ নদীর হিলহিল বাতাসের কারণে রোদ-ভ্যাপসা গরম তাকে কোনো যন্ত্রণা দিচ্ছে না|

আনিসের মাথায় এখন অবশ্য কবিতার ভাবের চেয়ে তার মা অসুখের চিন্তাটাই ঘুরপাক খাচ্ছে বেশি| আর ঘুরপাক খাচ্ছে সেতারা বেগম মনসুর পাগলার বিষয়টা| আরেকজনের বিষয়টাও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, সেটা হলো মনসুর পাগলার মা কমলা খাতুন| তার অসুস্থ মা গতকাল নৌকায় যেতে যেতে কমলা খাতুনকে নিয়ে বেশ কিছু কথা বলেছে| কথাগুলো খুব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়| সে এসব কথার অনেকটাই জানে| তারপরও মা অসুস্থ গলার স্বর অনেকটা বেঁকে যাওয়া মুখে কথাগুলো শুনতে শুনতে তার বেশ খারাপ লেগেছিল| মনটা রেগে ফেঁপে উঠেছিল| কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত রাগটা মনে চেপে রাখেনি| সে বিশ্বাস করে, কবিদের রাগতে নেই| কবিদের ক্ষমা করতে শিখতে হয়|

আনিস অবশ্য কমলা খাতুনকে অনেক আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে| তবে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেনি| এই মুছে না ফেলার কারণ, তার মা রাহেলা খানমের ওপর তার বাবা সুন্দর ভুঁইয়ার মানসিক শারীরিক অত্যাচার| সেই মানসিক শারীরিক অত্যাচার সহ্য করতে না পেরেই তার মা ব্রেন স্ট্রোক করে| মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়| তারপর দীর্ঘ এতগুলো বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে|

আনিসের বয়স তখন কত ছিল? আট কি নয়|

রাহেলা বেগম ছিল কাকবন্ধ্যা| বিয়ের নয় বছর পর্যন্ত তার কোনো বাচ্চা হয়নি| সবাই ধরে নিয়েছিল তার আর বাচ্চাকাচ্চা হবে না| কিন্তু সাতাশ বছর বয়সে তার পেটে বাচ্চা আসে| এই খুশিতে সে মস্তানের দরগায় গিয়ে মানত দিয়ে আসে| বাড়িতে ডেকে ফকির খাওয়ায়| ঠিক তখনই সে জানতে পারে, স্বামী তার দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারির বউ কমলা খাতুনের সঙ্গে বেশ অনেকদিন ধরে গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে| কমলা খাতুনের ছিল আগুনরঙা রূপ| কিছুদিন পর স্বামীর এই গোপন সম্পর্ক গ্রামে চাউর হয়ে যায়| এরই মধ্যে কমলা খাতুনের একটা ছেলে হয়| ছেলেটা দেখতে একদম সুন্দর ভুঁইয়ার মতো| তার ছেলে আনিসেরও জন্ম হয় সেই সময়টায়|

রাহেলা খানম ভেবেছিল, ছেলের জন্মের পর তার স্বামী ঘরে ফিরবে| কিন্তু সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল দ্বিচারণ মনোভাব| ওদিকে কমলা খাতুনের ব্যাপারে দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারিকে একধরনের বুঝ দিত, ঘরে এসে তাকে দিত অন্য রকম বুঝ| কোনো প্রতিবাদ করলেই করত শারীরিক অত্যাচার| মানসিক অত্যাচার তো হরহামেশাই করত| শেষে একদিন ঘাড়ের পেছনে লাঠির আঘাত পেয়ে সেই যে ব্রেন স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়, আর কোনো সেরে ওঠেনি| ওদিকে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কমলা খাতুনের স্বামী আসমত আলী ব্যাপারিও নিখোঁজ হয়ে যায়| গ্রামে রব ওঠে, আসমত আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলে লাশ গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে| কিন্তু ব্যাপারে সঠিক প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি| পুলিশও না|

রাহেলা খাতুনের প্রথম থেকেই মনে হয়, আসমত আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলেনি| তার মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে তার স্বামী সুন্দর ভুঁইয়ার হাত আছে| এমনকি কি কমলা খাতুনেরও হাত থাকতে পারে| আসমত আলীর লাশ আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি...|

নৌকাটা মোল্লাকান্দির বটতলা পেরিয়ে ছল্লাকান্দিতে ঢুকেছে| ছল্লাকান্দি গ্রামটা একেবারেই ছোট, একটা পাড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| ছল্লাকান্দি আগে মোল্লাকান্দিরই একটা পাড়া ছিল| ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজের পাইক ছলিম উদ্দিন নিজেকে জাহির করার জন্য মোল্লাকান্দি থেকে তার পাড়াটা আলাদা নিজে নিজে নতুন একটা গ্রামের ঘোষণা দেয়| গ্রামের নাম দেয় নিজের নামেছলিমকান্দি| এই ছলিমকান্দি এখন ছল্লাকান্দি হয়ে গেছে|

গোমতী নদীটা এদিকে ছল্লাকান্দির পাশ দিয়ে দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে| ছল্লাকান্দি পেরোতেই আবার মোল্লাকান্দি| মোল্লাকান্দির পর মীরবহরি| আনিস এবার নৌকার গলুইতে পা তুলে বসল| বাইরের রোদটা এখন বেশ তেতে উঠেছে| যদিও নদী থেকে বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস তাকে আলতো স্পর্শ দিচ্ছে, কিন্তু তার শরীর ঘামছে| সে ছইয়ার নিচে যাবে বলে ভাবল| ভাবতেই ভাবতেই সে উঠে দাঁড়াল| নৌকাটা ঠিক তখনই একটু বেশি দুলে উঠল|

আনিস শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ছইয়ের নিচে গিয়ে বসল| প্রথমে সে হাঁটু গেড়ে বসলেও পরক্ষণ পা দুটো ছড়িয়ে দিল| রোদ লাগছে না বলে ছইয়ের নিচে তার বেশ আরামবোধ হচ্ছে| সে সামনে দিঘল দৃষ্টি মেলে নদীর আরও ভাটিতে তাকাল| যদিও চার-পাঁচদিন ধরে কোনো বৃষ্টি নেই, তারপরও গোমতীর জল বেশ ঘোলা| নদীর ধার উপচে বিলের ˆথথৈ জল দিগন্ত বিস্তৃত বিছিয়ে রয়েছে| বৃষ্টি হোক আর না হোক, উত্তরের জোয়ারের জল এখনই কমবে না| ভাদ্র মাসে গিয়ে কমবে| আশ্বিন মাসে জোয়ারের জল একেবারে নেমে যাবে| কার্তিকে বিল পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে| অগ্রহায়ণে ধান কাটা হবে| মূলত কার্তিক মাস থেকেই সুদিন মাস শুরু হয়|

আনিস নিঃসীম দৃষ্টিতে কী একটা খুঁজে হঠাৎ নিজে নিজে নড়ে উঠল| তখনই তার মনে একটা প্রশ্ন এসে বিঁধল, সে তার বাবার মতো একই অপরাধ করেনি তো? তার বাবা কমলা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল| অথচ তার বাবা আসমত আলী ব্যাপারি সেই ছোটবেলা থেকে খুব কাছের বন্ধু ছিল| একে অপরের প্রতি নির্ভরতা ছিল বেশ| এদিকে সে নিজে সেতারা বেগমের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে| মনসুর পাগলা তার সেই ছোটবেলার বন্ধু| যদিও নির্ভরতার বেশ হেরফের আছে| তারপরও কথা কিন্তু একই দাঁড়ায়!

গত পরশু দিনের আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ সফুরা বিবির কথাটা আনিসের মনে পড়ল| সফুরা বিবি কটাক্ষ করে বলেছিল, ‘ভুঁইয়ার পুত, তুমি তোমার বাপের লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’

আনিস নিজে নিজে মাথা ঝাঁকাল| ভাবল, আসলেই কি তাই? পরক্ষণ সে মাথা নাড়ল| নাহ, কথা একই দাঁড়ালেও সে কোনো অপরাধ করেনি| কবিরা কখনও অপরাধ করতেই পারে না| ওরা যা কিছু করে, কবিতার জন্যই করে| আর সেতারা বেগমের প্রতি তার ভালোবাসা তো মনের অধিক শরীরের| ক্রমশ... 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত