(পূর্ব প্রকাশের পর)
দশ.
আনিসদের
কেড়াই নৌকায় যে মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন
লাগানো হয় না, তা
নয়| তার বাবা সুন্দর
ভুঁইয়া বেঁচে থাকতে কারণে-অকারণেই নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে চালাত| এমনকি মীরবহরি বাজারে তার সারের দোকানটায়
যেতেও নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে ভটভট শব্দ তুলে
যেত| এতে সে নিজেকে
অভিজাত শ্রেণির কেউ একজন ভাবত|
যদিও ভুঁইয়া বাড়ি শুধু নামেই
ভুঁইয়া বাড়ি| গ্রামে তাদের তেমন প্রতিপত্তি বা
দাপট নেই| ভুঁইয়া বাড়ির
মধ্যে আনিসদেরই জায়গাজমি বেশি| তা-ও ঐতিহ্যগতভাবে
নয়| সুন্দর ভুঁইয়ার জমি কেনার নেশা
বেশি ছিল বলে|
আনিসের
ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ
খুব একটা পছন্দ নয়|
সে পছন্দ করে লগি ঠেলে
বা বৈঠা দিয়ে নৌকা
চালাতে| বশির যখন কট
কট শব্দে লগি ঠেলে বা
জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ
তুলে বৈঠা বেয়ে নৌকা
চালায়, সেখানে সে কী এক
ছন্দ খুঁজে পায়| জীবনের ছন্দ|
কবিতার ছন্দের সঙ্গে যার মিল আছে|
নৌকাটা যখন মৃদু মৃদু
দোলে, তার মনে একটা
অদ্ভুত শিহরন জাগায়| এই শিহরনও কবিতার
শিহরন| চোখের সামনে জলের সিঁথি কাটা,
দু’পাশে সরু স্রোতের
রেখা প্রশস্ত হতে হতে একসময়
জলেই মিলিয়ে যাওয়া, তার কাছে মৃত্যুর
মিলটা যেন সেখানেই|
আনিস
ভাবল, এ তো বিলের
শান্ত জলের শান্ত জীবনের
গল্প| গোমতী নদীর জলে নৌকা
বাওয়ার গল্পটা তো অন্যরকম| গোমতীর
সুদিনে একরূপ, বর্ষার মওসুমে অন্যরূপ| গোমতীর ভাটিতে সুদিন বলা হয় সাধারণত
শুকনো মওসুমকে| তখন নদীটা শান্ত
হয়ে যায়| ভাটির দিকে
নৌকা চলে এক তালে,
উজানে চলে অন্য তালে|
বর্ষার মওসুমে উত্তাল গোমতীর সঙ্গে নৌকাটাও উত্তাল হয়ে ওঠে| নৌকার
সামনে সিঁথিকাটা জল উছলে পড়ে|
জীবনের রূপ তখন অন্যভাবে
দেখা দেয়|
কবিতা
লেখার খাতাটা সবসময় তার কাঁধে ঝোলানো
ব্যাগটায় থাকে| নৌকায় উঠলে তো কোনো
কথাই নেই| ঢেউয়ের কলকল
শব্দ, প্রশস্ত জলের বুক চিরে
বয়ে আসা হিলহিল বাতাস
ও নৌকার মৃদুমন্দ দুলুনি, তাকে কবিতার জগতে
এমনিতেই টেনে নিয়ে যায়|
সে বেশ কয়েকটা কবিতা
এই নৌকায় বসে লিখেছে| সেগুলো
তার প্রথম ও দ্বিতীয় কবিতার
বইতে স্থান পেয়েছে| আর এই নৌকায়
বসেই সেতারা বেগমকে নিয়ে সে লিখেছিল
প্রকৃতির কবিতা, জলের গান| সেদিন
তার বাম হাতটা মুঠো
করা ছিল সেতারার দুই
হাতে| তিন দিন আগে
রাতে নৌকায় করে সেতারা বেগমের
লাশ খুঁজতে গিয়েই তো ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজ
কবিতার ভাবনাটা মাথায় নিয়ে আসে| গত
দুই দিনে লিখে ফেলে
নয়টি কবিতা|
আনিস
থানায় যাচ্ছে| সে আজ মনসুর
পাগলার সঙ্গে দেখা করবে| তার
ইচ্ছে ছিল গতকালই যাওয়ার|
কিন্তু গতকাল সে তার মাকে
নিয়ে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখায়|
ডাক্তারের কাছে বেশি দেরি
না হলেও ল্যাবে মা’র কয়েকটা টেস্ট,
এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়ে থানা
সদরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়|
সে রাতে আর মনসুর
পাগলাকে দেখতে থানায় যায়নি|
বাড়ি
থেকে আনিস সকালের নাস্তা
করে বের হয়েছে| আজ
সে শুধু মনসুর পাগলার
সঙ্গে থানায় দেখা করবে না,
উপজেলা সদরের ডা. জাহিদের সঙ্গেও
দেখা করবে| গতকাল কুমিল্লা থেকে ফিরে ডা.
জাহিদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব
হয়নি| মা’র বিষয়ে
তার জরুরি কিছু আলাপ আছে|
কুমিল্লার বড় ডাক্তার বলেছে,
তার মা বিছানায় শুয়ে
থাকতে থাকতে নড়াচড়া কম হয়েছে বলে
পায়ে ও শরীরের বিভিন্ন
অংশে নাকি রক্ত জমাট
বাঁধতে শুরু করেছে| যার
চিহ্ন হিসেবে শরীরের স্থানে স্থানে শক্ত হয়ে ফুলে
উঠেছে| একে বলা হয়,
ডিপ ভেইন থ্র¤ে^াসিস| বড় ডাক্তার সন্দেহ
করছে, এই জমাট রক্ত
ফুসফুসে চলে গেছে| যার
কারণে তার মা’র
ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট দেখা
দিচ্ছে| এই জমাট রক্ত
যদি বেশি পরিমাণে ফুসফুসে
জমা হয়, তাহলে রাহেলা
খানমের মৃত্যুর কারণ হতে পারে|
এজন্য গতকাল সন্ধ্যা অব্দি আনিস বড় ডাক্তারের
পরামর্শ অনুযায়ী তার মা’র
বিভিন্ন টেস্ট, এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়েছে|
আনিস
জানে, এত তাড়াতাড়ি টেস্ট,
এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফির রেজাল্ট আসবে
না| কমপক্ষে তিন দিন লাগবে|
এই সবের রেজাল্ট ওরা
সরাসরি ডা. জাহিদের কাছে
পাঠাবে| তারপরও সে মাকে প্রয়োজনে
ঢাকা নিবে কি না
এ নিয়ে ডা. জাহিদের
সঙ্গে আজ আলাপ করবে|
অবশ্য সে শুধুমাত্র এই
আলাপের জন্য উপজেলা সদরে
যাচ্ছে, তা নয়| এই
আলাপ সে ফোনেই সেরে
ফেলতে পারত| কিন্তু থানায় মনসুর পাগলাকে দেখতে যাওয়াটা জরুরি| মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় উন্মুখ
হয়ে আছে| এক পাগলামি
বাদে জীবনের কোনো কাজই সে
তাকে জিজ্ঞেস না বলে করে
না| ছোটবেলা থেকেই সে তার ছায়া
হয়ে ঘোরে|
নৌকাটা
বুইদ্দার খাল পেরিয়ে গোমতী
নদীতে উঠে এল| বশির
এতক্ষণ বুইদ্দার খালে লগি ঠেললেও
গোমতী নদীতে ওঠার আগে সে
লগিটা নৌকার ছইয়ের একপাশে দড়িতে বেঁধে বৈঠা হাতে নিল|
নদীতে বর্ষার বান থাকলেও স্রোতের
তীব্রতা খুব বেশি নেই|
উজানে কোথাও বৃষ্টি হলে বর্ষার বান
বেড়ে যায়| গত চারদিন
ধরে বৃষ্টি নেই| আজ আকাশে
ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ থাকলেও রোদ
উঠেছে স্পষ্ট হয়ে|
পেছনের
গলুইতে বসে বশির বৈঠা
বাইছে| নৌকাটা পশ্চিমে ভাটির দিকে যাচ্ছে বলে
নদীর জলে বৈঠা মারার
শব্দ খুব একটা হচ্ছে
না| তারপরও আনিসের কানে জলের শব্দ
আসছে— ঝপাৎ ঝপাৎ| নৌকাটা
স্রোতের সঙ্গে মিলে একটু বেশি
গতিতেই এগোচ্ছে| বিচ্ছিন্ন কচুরিপানা নৌকার গা ঘেঁষে একে
একে পেছনে চলে যাচ্ছে| গোমতী
নদীতে তাদের নৌকার আশেপাশে আর কোনো নৌকা
নেই| খুব সকালে গোমতী
নদীতে জেলেদের মাছধরার বড় বড় ডিঙি
নৌকা আর বিলে-বাদাড়ে
গৃহস্থের মাছ ধরার ছোট্ট
ডিঙি বা কোষা নৌকা
দেখা গেলেও এখন সকালটা গড়িয়ে
সূর্যটা আকাশে উঠে গেছে বেশ|
তবে দুপুর হতে এখনও অনেকটা
সময় বাকি|
আনিস
এই রোদের মধ্যেই নৌকার সামনের গলুইতে বসেছে| সামনের গলুইটা খানিকটা উঁচু| সে বসেছে সামনের
গলুইর সরু মাথার দু’পাশে দুটো পা
ঝুলিয়ে| পরনের প্যান্টটা গুটানো| খালি পা| নদীর
ঢেউ ও বৈঠা মারার
তালে তালে তার পা
দুটো একবার জলে ভিজছে, পরক্ষণ
আবার জল থেকে উপরে
উঠে যাচ্ছে| পা দুটো যখন
জলে ভিজছে, তখন সত্যি সত্যি
তার শরীরে একটা শিহরন দিচ্ছে|
সে এক অন্য রকম
শিহরন| নদীর জল একেবারে
শীতল না হলেও জলের
স্পর্শে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে| এছাড়া নদী বেয়ে আসা
হিলহিল বাতাস তার মুখে ও
শরীরে নরম স্পর্শ দিচ্ছে|
মাথার ওপর তার তেতে
ওঠা রোদ, শ্রাবণের ভ্যাপসা
গরমটাও বেশ, কিন্তু জলের
এই নরম স্পর্শ ও
নদীর হিলহিল বাতাসের কারণে রোদ-ভ্যাপসা গরম
তাকে কোনো যন্ত্রণা দিচ্ছে
না|
আনিসের
মাথায় এখন অবশ্য কবিতার
ভাবের চেয়ে তার মা’র অসুখের চিন্তাটাই
ঘুরপাক খাচ্ছে বেশি| আর ঘুরপাক খাচ্ছে
সেতারা বেগম ও মনসুর
পাগলার বিষয়টা| আরেকজনের বিষয়টাও তার মাথায় ঘুরপাক
খাচ্ছে, সেটা হলো মনসুর
পাগলার মা কমলা খাতুন|
তার অসুস্থ মা গতকাল নৌকায়
যেতে যেতে কমলা খাতুনকে
নিয়ে বেশ কিছু কথা
বলেছে| কথাগুলো খুব যে গুরুত্বপূর্ণ,
তা নয়| সে এসব
কথার অনেকটাই জানে| তারপরও মা’র অসুস্থ
গলার স্বর ও অনেকটা
বেঁকে যাওয়া মুখে কথাগুলো শুনতে
শুনতে তার বেশ খারাপ
লেগেছিল| মনটা রেগে ফেঁপে
উঠেছিল| কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত
রাগটা মনে চেপে রাখেনি|
সে বিশ্বাস করে, কবিদের রাগতে
নেই| কবিদের ক্ষমা করতে শিখতে হয়|
আনিস
অবশ্য কমলা খাতুনকে অনেক
আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে| তবে
মন থেকে মুছে ফেলতে
পারেনি| এই মুছে না
ফেলার কারণ, তার মা রাহেলা
খানমের ওপর তার বাবা
সুন্দর ভুঁইয়ার মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার|
সেই মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার
সহ্য করতে না পেরেই
তার মা’র ব্রেন
স্ট্রোক করে| মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত
হয়| তারপর দীর্ঘ এতগুলো বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে
বিছানায় পড়ে আছে|
আনিসের
বয়স তখন কত ছিল?
আট কি নয়|
রাহেলা
বেগম ছিল কাকবন্ধ্যা| বিয়ের
নয় বছর পর্যন্ত তার
কোনো বাচ্চা হয়নি| সবাই ধরে নিয়েছিল
তার আর বাচ্চাকাচ্চা হবে
না| কিন্তু সাতাশ বছর বয়সে তার
পেটে বাচ্চা আসে| এই খুশিতে
সে মস্তানের দরগায় গিয়ে মানত দিয়ে
আসে| বাড়িতে ডেকে ফকির খাওয়ায়|
ঠিক তখনই সে জানতে
পারে, স্বামী তার দোস্ত আসমত
আলী ব্যাপারির বউ কমলা খাতুনের
সঙ্গে বেশ অনেকদিন ধরে
গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে| কমলা
খাতুনের ছিল আগুনরঙা রূপ|
কিছুদিন পর স্বামীর এই
গোপন সম্পর্ক গ্রামে চাউর হয়ে যায়|
এরই মধ্যে কমলা খাতুনের একটা
ছেলে হয়| ছেলেটা দেখতে
একদম সুন্দর ভুঁইয়ার মতো| তার ছেলে
আনিসেরও জন্ম হয় সেই
সময়টায়|
রাহেলা
খানম ভেবেছিল, ছেলের জন্মের পর তার স্বামী
ঘরে ফিরবে| কিন্তু সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল দ্বিচারণ মনোভাব|
ওদিকে কমলা খাতুনের ব্যাপারে
দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারিকে
একধরনের বুঝ দিত, ঘরে
এসে তাকে দিত অন্য
রকম বুঝ| কোনো প্রতিবাদ
করলেই করত শারীরিক অত্যাচার|
মানসিক অত্যাচার তো হরহামেশাই করত|
শেষে একদিন ঘাড়ের পেছনে লাঠির আঘাত পেয়ে সেই
যে ব্রেন স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়,
আর কোনো সেরে ওঠেনি|
ওদিকে বছর ঘুরতে না
ঘুরতেই কমলা খাতুনের স্বামী
আসমত আলী ব্যাপারিও নিখোঁজ
হয়ে যায়| গ্রামে রব
ওঠে, আসমত আলী ব্যাপারিকে
ডাকাতরা মেরে ফেলে লাশ
গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে| কিন্তু এ ব্যাপারে সঠিক
প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি|
পুলিশও না|
রাহেলা
খাতুনের প্রথম থেকেই মনে হয়, আসমত
আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলেনি| তার
মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে
তার স্বামী সুন্দর ভুঁইয়ার হাত আছে| এমনকি
কি কমলা খাতুনেরও হাত
থাকতে পারে| আসমত আলীর লাশ
আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি...|
নৌকাটা
মোল্লাকান্দির বটতলা পেরিয়ে ছল্লাকান্দিতে ঢুকেছে| ছল্লাকান্দি গ্রামটা একেবারেই ছোট, একটা পাড়া
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| ছল্লাকান্দি আগে
মোল্লাকান্দিরই একটা পাড়া ছিল|
ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজের
পাইক ছলিম উদ্দিন নিজেকে
জাহির করার জন্য মোল্লাকান্দি
থেকে তার পাড়াটা আলাদা
নিজে নিজে নতুন একটা
গ্রামের ঘোষণা দেয়| গ্রামের নাম
দেয় নিজের নামে— ছলিমকান্দি| এই ছলিমকান্দি এখন
ছল্লাকান্দি হয়ে গেছে|
গোমতী
নদীটা এদিকে ছল্লাকান্দির পাশ দিয়ে দক্ষিণে
বাঁক নিয়েছে| ছল্লাকান্দি পেরোতেই আবার মোল্লাকান্দি| মোল্লাকান্দির
পর মীরবহরি| আনিস এবার নৌকার
গলুইতে পা তুলে বসল|
বাইরের রোদটা এখন বেশ তেতে
উঠেছে| যদিও নদী থেকে
বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস
তাকে আলতো স্পর্শ দিচ্ছে,
কিন্তু তার শরীর ঘামছে|
সে ছইয়ার নিচে যাবে বলে
ভাবল| ভাবতেই ভাবতেই সে উঠে দাঁড়াল|
নৌকাটা ঠিক তখনই একটু
বেশি দুলে উঠল|
আনিস
শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ছইয়ের
নিচে গিয়ে বসল| প্রথমে
সে হাঁটু গেড়ে বসলেও পরক্ষণ
পা দুটো ছড়িয়ে দিল|
রোদ লাগছে না বলে ছইয়ের
নিচে তার বেশ আরামবোধ
হচ্ছে| সে সামনে দিঘল
দৃষ্টি মেলে নদীর আরও
ভাটিতে তাকাল| যদিও চার-পাঁচদিন
ধরে কোনো বৃষ্টি নেই,
তারপরও গোমতীর জল বেশ ঘোলা|
নদীর ধার উপচে বিলের
ˆথথৈ জল দিগন্ত বিস্তৃত
বিছিয়ে রয়েছে| বৃষ্টি হোক আর না
হোক, উত্তরের জোয়ারের জল এখনই কমবে
না| ভাদ্র মাসে গিয়ে কমবে|
আশ্বিন মাসে জোয়ারের জল
একেবারে নেমে যাবে| কার্তিকে
বিল পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে| অগ্রহায়ণে ধান কাটা হবে|
মূলত কার্তিক মাস থেকেই সুদিন
মাস শুরু হয়|
আনিস
নিঃসীম দৃষ্টিতে কী একটা খুঁজে
হঠাৎ নিজে নিজে নড়ে
উঠল| তখনই তার মনে
একটা প্রশ্ন এসে বিঁধল, সে
তার বাবার মতো একই অপরাধ
করেনি তো? তার বাবা
কমলা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল| অথচ
তার বাবা ও আসমত
আলী ব্যাপারি সেই ছোটবেলা থেকে
খুব কাছের বন্ধু ছিল| একে অপরের
প্রতি নির্ভরতা ছিল বেশ| এদিকে
সে নিজে সেতারা বেগমের
সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে| মনসুর
পাগলা তার সেই ছোটবেলার
বন্ধু| যদিও নির্ভরতার বেশ
হেরফের আছে| তারপরও কথা
কিন্তু একই দাঁড়ায়!
গত
পরশু দিনের আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ
সফুরা বিবির কথাটা আনিসের মনে পড়ল| সফুরা
বিবি কটাক্ষ করে বলেছিল, ‘ভুঁইয়ার
পুত, তুমি তোমার বাপের
লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা
ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’
আনিস
নিজে নিজে মাথা ঝাঁকাল|
ভাবল, আসলেই কি তাই? পরক্ষণ
সে মাথা নাড়ল| নাহ,
কথা একই দাঁড়ালেও সে
কোনো অপরাধ করেনি| কবিরা কখনও অপরাধ করতেই
পারে না| ওরা যা
কিছু করে, কবিতার জন্যই
করে| আর সেতারা বেগমের
প্রতি তার ভালোবাসা তো
মনের অধিক শরীরের| ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
দশ.
আনিসদের
কেড়াই নৌকায় যে মাঝেমধ্যে ইঞ্জিন
লাগানো হয় না, তা
নয়| তার বাবা সুন্দর
ভুঁইয়া বেঁচে থাকতে কারণে-অকারণেই নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে চালাত| এমনকি মীরবহরি বাজারে তার সারের দোকানটায়
যেতেও নৌকায় ইঞ্জিন লাগিয়ে ভটভট শব্দ তুলে
যেত| এতে সে নিজেকে
অভিজাত শ্রেণির কেউ একজন ভাবত|
যদিও ভুঁইয়া বাড়ি শুধু নামেই
ভুঁইয়া বাড়ি| গ্রামে তাদের তেমন প্রতিপত্তি বা
দাপট নেই| ভুঁইয়া বাড়ির
মধ্যে আনিসদেরই জায়গাজমি বেশি| তা-ও ঐতিহ্যগতভাবে
নয়| সুন্দর ভুঁইয়ার জমি কেনার নেশা
বেশি ছিল বলে|
আনিসের
ইঞ্জিনের ভট ভট শব্দ
খুব একটা পছন্দ নয়|
সে পছন্দ করে লগি ঠেলে
বা বৈঠা দিয়ে নৌকা
চালাতে| বশির যখন কট
কট শব্দে লগি ঠেলে বা
জলে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ
তুলে বৈঠা বেয়ে নৌকা
চালায়, সেখানে সে কী এক
ছন্দ খুঁজে পায়| জীবনের ছন্দ|
কবিতার ছন্দের সঙ্গে যার মিল আছে|
নৌকাটা যখন মৃদু মৃদু
দোলে, তার মনে একটা
অদ্ভুত শিহরন জাগায়| এই শিহরনও কবিতার
শিহরন| চোখের সামনে জলের সিঁথি কাটা,
দু’পাশে সরু স্রোতের
রেখা প্রশস্ত হতে হতে একসময়
জলেই মিলিয়ে যাওয়া, তার কাছে মৃত্যুর
মিলটা যেন সেখানেই|
আনিস
ভাবল, এ তো বিলের
শান্ত জলের শান্ত জীবনের
গল্প| গোমতী নদীর জলে নৌকা
বাওয়ার গল্পটা তো অন্যরকম| গোমতীর
সুদিনে একরূপ, বর্ষার মওসুমে অন্যরূপ| গোমতীর ভাটিতে সুদিন বলা হয় সাধারণত
শুকনো মওসুমকে| তখন নদীটা শান্ত
হয়ে যায়| ভাটির দিকে
নৌকা চলে এক তালে,
উজানে চলে অন্য তালে|
বর্ষার মওসুমে উত্তাল গোমতীর সঙ্গে নৌকাটাও উত্তাল হয়ে ওঠে| নৌকার
সামনে সিঁথিকাটা জল উছলে পড়ে|
জীবনের রূপ তখন অন্যভাবে
দেখা দেয়|
কবিতা
লেখার খাতাটা সবসময় তার কাঁধে ঝোলানো
ব্যাগটায় থাকে| নৌকায় উঠলে তো কোনো
কথাই নেই| ঢেউয়ের কলকল
শব্দ, প্রশস্ত জলের বুক চিরে
বয়ে আসা হিলহিল বাতাস
ও নৌকার মৃদুমন্দ দুলুনি, তাকে কবিতার জগতে
এমনিতেই টেনে নিয়ে যায়|
সে বেশ কয়েকটা কবিতা
এই নৌকায় বসে লিখেছে| সেগুলো
তার প্রথম ও দ্বিতীয় কবিতার
বইতে স্থান পেয়েছে| আর এই নৌকায়
বসেই সেতারা বেগমকে নিয়ে সে লিখেছিল
প্রকৃতির কবিতা, জলের গান| সেদিন
তার বাম হাতটা মুঠো
করা ছিল সেতারার দুই
হাতে| তিন দিন আগে
রাতে নৌকায় করে সেতারা বেগমের
লাশ খুঁজতে গিয়েই তো ‘গোমতীকন্যা’ সিরিজ
কবিতার ভাবনাটা মাথায় নিয়ে আসে| গত
দুই দিনে লিখে ফেলে
নয়টি কবিতা|
আনিস
থানায় যাচ্ছে| সে আজ মনসুর
পাগলার সঙ্গে দেখা করবে| তার
ইচ্ছে ছিল গতকালই যাওয়ার|
কিন্তু গতকাল সে তার মাকে
নিয়ে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখায়|
ডাক্তারের কাছে বেশি দেরি
না হলেও ল্যাবে মা’র কয়েকটা টেস্ট,
এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়ে থানা
সদরে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়|
সে রাতে আর মনসুর
পাগলাকে দেখতে থানায় যায়নি|
বাড়ি
থেকে আনিস সকালের নাস্তা
করে বের হয়েছে| আজ
সে শুধু মনসুর পাগলার
সঙ্গে থানায় দেখা করবে না,
উপজেলা সদরের ডা. জাহিদের সঙ্গেও
দেখা করবে| গতকাল কুমিল্লা থেকে ফিরে ডা.
জাহিদের সঙ্গে দেখা করা সম্ভব
হয়নি| মা’র বিষয়ে
তার জরুরি কিছু আলাপ আছে|
কুমিল্লার বড় ডাক্তার বলেছে,
তার মা বিছানায় শুয়ে
থাকতে থাকতে নড়াচড়া কম হয়েছে বলে
পায়ে ও শরীরের বিভিন্ন
অংশে নাকি রক্ত জমাট
বাঁধতে শুরু করেছে| যার
চিহ্ন হিসেবে শরীরের স্থানে স্থানে শক্ত হয়ে ফুলে
উঠেছে| একে বলা হয়,
ডিপ ভেইন থ্র¤ে^াসিস| বড় ডাক্তার সন্দেহ
করছে, এই জমাট রক্ত
ফুসফুসে চলে গেছে| যার
কারণে তার মা’র
ঘন ঘন শ্বাসকষ্ট দেখা
দিচ্ছে| এই জমাট রক্ত
যদি বেশি পরিমাণে ফুসফুসে
জমা হয়, তাহলে রাহেলা
খানমের মৃত্যুর কারণ হতে পারে|
এজন্য গতকাল সন্ধ্যা অব্দি আনিস বড় ডাক্তারের
পরামর্শ অনুযায়ী তার মা’র
বিভিন্ন টেস্ট, এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফি করিয়েছে|
আনিস
জানে, এত তাড়াতাড়ি টেস্ট,
এমআরআই ও ইলেক্ট্রোমায়োগ্রাফির রেজাল্ট আসবে
না| কমপক্ষে তিন দিন লাগবে|
এই সবের রেজাল্ট ওরা
সরাসরি ডা. জাহিদের কাছে
পাঠাবে| তারপরও সে মাকে প্রয়োজনে
ঢাকা নিবে কি না
এ নিয়ে ডা. জাহিদের
সঙ্গে আজ আলাপ করবে|
অবশ্য সে শুধুমাত্র এই
আলাপের জন্য উপজেলা সদরে
যাচ্ছে, তা নয়| এই
আলাপ সে ফোনেই সেরে
ফেলতে পারত| কিন্তু থানায় মনসুর পাগলাকে দেখতে যাওয়াটা জরুরি| মনসুর পাগলা নিশ্চয়ই তার অপেক্ষায় উন্মুখ
হয়ে আছে| এক পাগলামি
বাদে জীবনের কোনো কাজই সে
তাকে জিজ্ঞেস না বলে করে
না| ছোটবেলা থেকেই সে তার ছায়া
হয়ে ঘোরে|
নৌকাটা
বুইদ্দার খাল পেরিয়ে গোমতী
নদীতে উঠে এল| বশির
এতক্ষণ বুইদ্দার খালে লগি ঠেললেও
গোমতী নদীতে ওঠার আগে সে
লগিটা নৌকার ছইয়ের একপাশে দড়িতে বেঁধে বৈঠা হাতে নিল|
নদীতে বর্ষার বান থাকলেও স্রোতের
তীব্রতা খুব বেশি নেই|
উজানে কোথাও বৃষ্টি হলে বর্ষার বান
বেড়ে যায়| গত চারদিন
ধরে বৃষ্টি নেই| আজ আকাশে
ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ থাকলেও রোদ
উঠেছে স্পষ্ট হয়ে|
পেছনের
গলুইতে বসে বশির বৈঠা
বাইছে| নৌকাটা পশ্চিমে ভাটির দিকে যাচ্ছে বলে
নদীর জলে বৈঠা মারার
শব্দ খুব একটা হচ্ছে
না| তারপরও আনিসের কানে জলের শব্দ
আসছে— ঝপাৎ ঝপাৎ| নৌকাটা
স্রোতের সঙ্গে মিলে একটু বেশি
গতিতেই এগোচ্ছে| বিচ্ছিন্ন কচুরিপানা নৌকার গা ঘেঁষে একে
একে পেছনে চলে যাচ্ছে| গোমতী
নদীতে তাদের নৌকার আশেপাশে আর কোনো নৌকা
নেই| খুব সকালে গোমতী
নদীতে জেলেদের মাছধরার বড় বড় ডিঙি
নৌকা আর বিলে-বাদাড়ে
গৃহস্থের মাছ ধরার ছোট্ট
ডিঙি বা কোষা নৌকা
দেখা গেলেও এখন সকালটা গড়িয়ে
সূর্যটা আকাশে উঠে গেছে বেশ|
তবে দুপুর হতে এখনও অনেকটা
সময় বাকি|
আনিস
এই রোদের মধ্যেই নৌকার সামনের গলুইতে বসেছে| সামনের গলুইটা খানিকটা উঁচু| সে বসেছে সামনের
গলুইর সরু মাথার দু’পাশে দুটো পা
ঝুলিয়ে| পরনের প্যান্টটা গুটানো| খালি পা| নদীর
ঢেউ ও বৈঠা মারার
তালে তালে তার পা
দুটো একবার জলে ভিজছে, পরক্ষণ
আবার জল থেকে উপরে
উঠে যাচ্ছে| পা দুটো যখন
জলে ভিজছে, তখন সত্যি সত্যি
তার শরীরে একটা শিহরন দিচ্ছে|
সে এক অন্য রকম
শিহরন| নদীর জল একেবারে
শীতল না হলেও জলের
স্পর্শে শরীরটা জুড়িয়ে যাচ্ছে| এছাড়া নদী বেয়ে আসা
হিলহিল বাতাস তার মুখে ও
শরীরে নরম স্পর্শ দিচ্ছে|
মাথার ওপর তার তেতে
ওঠা রোদ, শ্রাবণের ভ্যাপসা
গরমটাও বেশ, কিন্তু জলের
এই নরম স্পর্শ ও
নদীর হিলহিল বাতাসের কারণে রোদ-ভ্যাপসা গরম
তাকে কোনো যন্ত্রণা দিচ্ছে
না|
আনিসের
মাথায় এখন অবশ্য কবিতার
ভাবের চেয়ে তার মা’র অসুখের চিন্তাটাই
ঘুরপাক খাচ্ছে বেশি| আর ঘুরপাক খাচ্ছে
সেতারা বেগম ও মনসুর
পাগলার বিষয়টা| আরেকজনের বিষয়টাও তার মাথায় ঘুরপাক
খাচ্ছে, সেটা হলো মনসুর
পাগলার মা কমলা খাতুন|
তার অসুস্থ মা গতকাল নৌকায়
যেতে যেতে কমলা খাতুনকে
নিয়ে বেশ কিছু কথা
বলেছে| কথাগুলো খুব যে গুরুত্বপূর্ণ,
তা নয়| সে এসব
কথার অনেকটাই জানে| তারপরও মা’র অসুস্থ
গলার স্বর ও অনেকটা
বেঁকে যাওয়া মুখে কথাগুলো শুনতে
শুনতে তার বেশ খারাপ
লেগেছিল| মনটা রেগে ফেঁপে
উঠেছিল| কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত
রাগটা মনে চেপে রাখেনি|
সে বিশ্বাস করে, কবিদের রাগতে
নেই| কবিদের ক্ষমা করতে শিখতে হয়|
আনিস
অবশ্য কমলা খাতুনকে অনেক
আগেই ক্ষমা করে দিয়েছে| তবে
মন থেকে মুছে ফেলতে
পারেনি| এই মুছে না
ফেলার কারণ, তার মা রাহেলা
খানমের ওপর তার বাবা
সুন্দর ভুঁইয়ার মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার|
সেই মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার
সহ্য করতে না পেরেই
তার মা’র ব্রেন
স্ট্রোক করে| মা পক্ষাঘাতগ্রস্ত
হয়| তারপর দীর্ঘ এতগুলো বছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে
বিছানায় পড়ে আছে|
আনিসের
বয়স তখন কত ছিল?
আট কি নয়|
রাহেলা
বেগম ছিল কাকবন্ধ্যা| বিয়ের
নয় বছর পর্যন্ত তার
কোনো বাচ্চা হয়নি| সবাই ধরে নিয়েছিল
তার আর বাচ্চাকাচ্চা হবে
না| কিন্তু সাতাশ বছর বয়সে তার
পেটে বাচ্চা আসে| এই খুশিতে
সে মস্তানের দরগায় গিয়ে মানত দিয়ে
আসে| বাড়িতে ডেকে ফকির খাওয়ায়|
ঠিক তখনই সে জানতে
পারে, স্বামী তার দোস্ত আসমত
আলী ব্যাপারির বউ কমলা খাতুনের
সঙ্গে বেশ অনেকদিন ধরে
গোপন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে| কমলা
খাতুনের ছিল আগুনরঙা রূপ|
কিছুদিন পর স্বামীর এই
গোপন সম্পর্ক গ্রামে চাউর হয়ে যায়|
এরই মধ্যে কমলা খাতুনের একটা
ছেলে হয়| ছেলেটা দেখতে
একদম সুন্দর ভুঁইয়ার মতো| তার ছেলে
আনিসেরও জন্ম হয় সেই
সময়টায়|
রাহেলা
খানম ভেবেছিল, ছেলের জন্মের পর তার স্বামী
ঘরে ফিরবে| কিন্তু সুন্দর ভুঁইয়ার ছিল দ্বিচারণ মনোভাব|
ওদিকে কমলা খাতুনের ব্যাপারে
দোস্ত আসমত আলী ব্যাপারিকে
একধরনের বুঝ দিত, ঘরে
এসে তাকে দিত অন্য
রকম বুঝ| কোনো প্রতিবাদ
করলেই করত শারীরিক অত্যাচার|
মানসিক অত্যাচার তো হরহামেশাই করত|
শেষে একদিন ঘাড়ের পেছনে লাঠির আঘাত পেয়ে সেই
যে ব্রেন স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়,
আর কোনো সেরে ওঠেনি|
ওদিকে বছর ঘুরতে না
ঘুরতেই কমলা খাতুনের স্বামী
আসমত আলী ব্যাপারিও নিখোঁজ
হয়ে যায়| গ্রামে রব
ওঠে, আসমত আলী ব্যাপারিকে
ডাকাতরা মেরে ফেলে লাশ
গোমতী নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে| কিন্তু এ ব্যাপারে সঠিক
প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি|
পুলিশও না|
রাহেলা
খাতুনের প্রথম থেকেই মনে হয়, আসমত
আলী ব্যাপারিকে ডাকাতরা মেরে ফেলেনি| তার
মৃত্যুর পেছনে কোনো না কোনোভাবে
তার স্বামী সুন্দর ভুঁইয়ার হাত আছে| এমনকি
কি কমলা খাতুনেরও হাত
থাকতে পারে| আসমত আলীর লাশ
আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি...|
নৌকাটা
মোল্লাকান্দির বটতলা পেরিয়ে ছল্লাকান্দিতে ঢুকেছে| ছল্লাকান্দি গ্রামটা একেবারেই ছোট, একটা পাড়া
নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| ছল্লাকান্দি আগে
মোল্লাকান্দিরই একটা পাড়া ছিল|
ব্রিটিশ আমলে এক ইংরেজের
পাইক ছলিম উদ্দিন নিজেকে
জাহির করার জন্য মোল্লাকান্দি
থেকে তার পাড়াটা আলাদা
নিজে নিজে নতুন একটা
গ্রামের ঘোষণা দেয়| গ্রামের নাম
দেয় নিজের নামে— ছলিমকান্দি| এই ছলিমকান্দি এখন
ছল্লাকান্দি হয়ে গেছে|
গোমতী
নদীটা এদিকে ছল্লাকান্দির পাশ দিয়ে দক্ষিণে
বাঁক নিয়েছে| ছল্লাকান্দি পেরোতেই আবার মোল্লাকান্দি| মোল্লাকান্দির
পর মীরবহরি| আনিস এবার নৌকার
গলুইতে পা তুলে বসল|
বাইরের রোদটা এখন বেশ তেতে
উঠেছে| যদিও নদী থেকে
বেয়ে আসা হিলহিল বাতাস
তাকে আলতো স্পর্শ দিচ্ছে,
কিন্তু তার শরীর ঘামছে|
সে ছইয়ার নিচে যাবে বলে
ভাবল| ভাবতেই ভাবতেই সে উঠে দাঁড়াল|
নৌকাটা ঠিক তখনই একটু
বেশি দুলে উঠল|
আনিস
শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করতে করতে ছইয়ের
নিচে গিয়ে বসল| প্রথমে
সে হাঁটু গেড়ে বসলেও পরক্ষণ
পা দুটো ছড়িয়ে দিল|
রোদ লাগছে না বলে ছইয়ের
নিচে তার বেশ আরামবোধ
হচ্ছে| সে সামনে দিঘল
দৃষ্টি মেলে নদীর আরও
ভাটিতে তাকাল| যদিও চার-পাঁচদিন
ধরে কোনো বৃষ্টি নেই,
তারপরও গোমতীর জল বেশ ঘোলা|
নদীর ধার উপচে বিলের
ˆথথৈ জল দিগন্ত বিস্তৃত
বিছিয়ে রয়েছে| বৃষ্টি হোক আর না
হোক, উত্তরের জোয়ারের জল এখনই কমবে
না| ভাদ্র মাসে গিয়ে কমবে|
আশ্বিন মাসে জোয়ারের জল
একেবারে নেমে যাবে| কার্তিকে
বিল পুরোপুরি শুকিয়ে যাবে| অগ্রহায়ণে ধান কাটা হবে|
মূলত কার্তিক মাস থেকেই সুদিন
মাস শুরু হয়|
আনিস
নিঃসীম দৃষ্টিতে কী একটা খুঁজে
হঠাৎ নিজে নিজে নড়ে
উঠল| তখনই তার মনে
একটা প্রশ্ন এসে বিঁধল, সে
তার বাবার মতো একই অপরাধ
করেনি তো? তার বাবা
কমলা খাতুনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল| অথচ
তার বাবা ও আসমত
আলী ব্যাপারি সেই ছোটবেলা থেকে
খুব কাছের বন্ধু ছিল| একে অপরের
প্রতি নির্ভরতা ছিল বেশ| এদিকে
সে নিজে সেতারা বেগমের
সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে| মনসুর
পাগলা তার সেই ছোটবেলার
বন্ধু| যদিও নির্ভরতার বেশ
হেরফের আছে| তারপরও কথা
কিন্তু একই দাঁড়ায়!
গত
পরশু দিনের আবদেল আলীর বৃদ্ধ বউ
সফুরা বিবির কথাটা আনিসের মনে পড়ল| সফুরা
বিবি কটাক্ষ করে বলেছিল, ‘ভুঁইয়ার
পুত, তুমি তোমার বাপের
লাহানই হইছ| দোস্ত ডাইকা
ঘরে ঢোকো| বাইরের থাইকা কিচ্ছুই করো না|’
আনিস
নিজে নিজে মাথা ঝাঁকাল|
ভাবল, আসলেই কি তাই? পরক্ষণ
সে মাথা নাড়ল| নাহ,
কথা একই দাঁড়ালেও সে
কোনো অপরাধ করেনি| কবিরা কখনও অপরাধ করতেই
পারে না| ওরা যা
কিছু করে, কবিতার জন্যই
করে| আর সেতারা বেগমের
প্রতি তার ভালোবাসা তো
মনের অধিক শরীরের| ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন