(কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে নিবেদিত)
এ আমার রক্ত পলাশের নৈবেদ্য—এ আমার একান্ত অনার্য ফ্ল্যামেনকো।
আর আমি রক্ত আর ঘামে ভেজা একতারা হাতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি সদুশাহ'র নিঃসীম শূন্যের গ্ৰাউন্ড জিরোতে—আমার শৈশবের গহীন গড়চাপড়ায় আর টকটকে লাল আনারের আন্দালুসিয়ার মধ্যবর্তী এক অনন্ত আরশিনগরে—পরাবাস্তব গোধূলিতে যেন তোমার মুখোমুখি আলহাম্বরার সম্মুখে।
গড়চাপড়ার খড়ের বাচড়ায় শূন্যধামে উড়াল দেয়ার কালে সেই যে সদুশাহ বলেছিলেন: 'দুঃখই মানুষের একমাত্র পৃথিবী, আর আনন্দ তার ক্ষণস্থায়ী অতিথি';
তাই তো মাটির কলসিতে এখন আর জল নয়—আমরা অশ্রুরই বীজ বুনে রাখি যেন আগামী বর্ষায় বুকের জমিনে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে করুণাসিন্ধু আউশ ধান।
প্রিয় লোরকা, তোমার জিপসি ব্যালাডের ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি আজও আমরা শুনতে পাই ছেঁড়া পালের আক্রান্ত ছেউড়িয়ায়—লালন সাঁইজির আখড়ায়—সে পুণ্যধামের প্রেমময় পথে আগুয়ান মহিষের গাড়ির ক্লান্তিহীন ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজে, কিংবা হাছন রাজার গ্ৰামের ধার ঘেঁষে বুলফাইটিংয়ের বুনো ষাঁড়ের মতো ফিবছর ধেয়ে আসা বানের জলে এক নিমেষে রাজা থেকে ভিখিরি বনে যাওয়া মানুষের দিঘল দীর্ঘশ্বাসে অথবা চৈত্রের খরায় চৌচির হয়ে যাওয়া কুড়িগ্রামের বর্গাচাষির ফাটা কপালের ফল্টলাইনে।
আর তোমার সৃষ্টিমুখর দৃষ্টিসীমায় ঝুলে থাকা সকরুণ স্তনসদৃশ টিনের চাঁদ চুকনগর কিংবা সোহাগপুরের বধ্যভূমিতে বিধবার নিভে যাওয়া চোখে পঞ্চান্ন বছর ধরে 'সকল দুখের প্রদীপ' হয়ে জ্বলছে—জ্বলবে অনন্তকাল।
সুপ্রিয় ফেদেরিকো তোমার হেঁটে চলা বন্ধুর পথের পদপ্রান্তে পড়ে থাকা সুতপ্ত নুড়িপাথরে সেঁকে নেয়া আঙুলে বিষাদের ঝড় তোলা সেই কালো গিটারখানি আজ অবধি আমাদের দুঃখপিয়াসী দোতারা হয়ে অবিরাম কেঁদে চলেছে পড়শীর বিচ্ছেদ বেদনায় ।
হে গর্বিত গ্ৰীবার গার্সিয়া চিরকালীন মানবমুক্তির কোন ফ্ল্যামেনকোকে তুমি কণ্ঠে ধারণ করে মহার্ঘ মৃত্যুকে হেমলকের মতো অবলীলায় পান করেছো আর হয়ে উঠেছ চিরঞ্জীব?
যে মুহূর্তে ডেস্পটের বুলেটবিদ্ধ তোমার নশ্বর দেহটি প্রেমার্দ্র মাটির বুকে ফিরে গেল, সেই মুহূর্তেই হয়তোবা উত্তর থেকে দক্ষিণে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সমস্ত পৃথিবীর তাবৎ কবিরা তোমার অসমাপ্ত পঙ্ক্তির উত্তরাধিকারী হয়ে উঠল।
আর বাউলের হাহাকার, স্পেনীয় জিপসির কালো রাত্রি—সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে একই বাঁশির সুরে গেয়ে উঠলো পরমতম দুঃখ জাগানিয়া দেহভঙ্গিতে:
যতদিন আন্দালুসিয়ায় দোরা নদী পাথরের বুক চিরে পাহাড়ি ঝর্নাধারার মতো কুলুকুলু বয়ে যাবে;
যতদিন ধরে ক্ষীণতোয়া গড়াই বাংলার কাদামাটি, কাশবন আর স্মৃতিকে বুকে নিয়ে নিঃশব্দে প্রমত্তা পদ্মাকে আলিঙ্গন করে বঙ্গপোসাগরে মিশে যাবে;
যতদিন পর্যন্ত শেষ সলতের নিভু নিভু শিখায় বিপ্লবের দীপশিখা আলো জ্বেলে যাবে দিকচিহ্নহীন লোকালয়ে—
মহামতি লোরকা সুনিশ্চিত জেনে রাখো, এইসব অনাগত দিনরাত্রিতে কেউ না কেউ অধুনাবাদী দুয়েন্দের নৃত্যপর নতুন সুর-ধ্বনিতে বলবে—
এ আমার নৈবেদ্য—এ আমার অনার্য ফ্ল্যামেনকো।
আমিনা'স পার্ল, মিরপুর, ঢাকা।
৭ জুন ২০২৬

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
(কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে নিবেদিত)
এ আমার রক্ত পলাশের নৈবেদ্য—এ আমার একান্ত অনার্য ফ্ল্যামেনকো।
আর আমি রক্ত আর ঘামে ভেজা একতারা হাতে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছি সদুশাহ'র নিঃসীম শূন্যের গ্ৰাউন্ড জিরোতে—আমার শৈশবের গহীন গড়চাপড়ায় আর টকটকে লাল আনারের আন্দালুসিয়ার মধ্যবর্তী এক অনন্ত আরশিনগরে—পরাবাস্তব গোধূলিতে যেন তোমার মুখোমুখি আলহাম্বরার সম্মুখে।
গড়চাপড়ার খড়ের বাচড়ায় শূন্যধামে উড়াল দেয়ার কালে সেই যে সদুশাহ বলেছিলেন: 'দুঃখই মানুষের একমাত্র পৃথিবী, আর আনন্দ তার ক্ষণস্থায়ী অতিথি';
তাই তো মাটির কলসিতে এখন আর জল নয়—আমরা অশ্রুরই বীজ বুনে রাখি যেন আগামী বর্ষায় বুকের জমিনে লকলকিয়ে বেড়ে ওঠে করুণাসিন্ধু আউশ ধান।
প্রিয় লোরকা, তোমার জিপসি ব্যালাডের ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি আজও আমরা শুনতে পাই ছেঁড়া পালের আক্রান্ত ছেউড়িয়ায়—লালন সাঁইজির আখড়ায়—সে পুণ্যধামের প্রেমময় পথে আগুয়ান মহিষের গাড়ির ক্লান্তিহীন ক্যাঁচ ক্যাঁচ আওয়াজে, কিংবা হাছন রাজার গ্ৰামের ধার ঘেঁষে বুলফাইটিংয়ের বুনো ষাঁড়ের মতো ফিবছর ধেয়ে আসা বানের জলে এক নিমেষে রাজা থেকে ভিখিরি বনে যাওয়া মানুষের দিঘল দীর্ঘশ্বাসে অথবা চৈত্রের খরায় চৌচির হয়ে যাওয়া কুড়িগ্রামের বর্গাচাষির ফাটা কপালের ফল্টলাইনে।
আর তোমার সৃষ্টিমুখর দৃষ্টিসীমায় ঝুলে থাকা সকরুণ স্তনসদৃশ টিনের চাঁদ চুকনগর কিংবা সোহাগপুরের বধ্যভূমিতে বিধবার নিভে যাওয়া চোখে পঞ্চান্ন বছর ধরে 'সকল দুখের প্রদীপ' হয়ে জ্বলছে—জ্বলবে অনন্তকাল।
সুপ্রিয় ফেদেরিকো তোমার হেঁটে চলা বন্ধুর পথের পদপ্রান্তে পড়ে থাকা সুতপ্ত নুড়িপাথরে সেঁকে নেয়া আঙুলে বিষাদের ঝড় তোলা সেই কালো গিটারখানি আজ অবধি আমাদের দুঃখপিয়াসী দোতারা হয়ে অবিরাম কেঁদে চলেছে পড়শীর বিচ্ছেদ বেদনায় ।
হে গর্বিত গ্ৰীবার গার্সিয়া চিরকালীন মানবমুক্তির কোন ফ্ল্যামেনকোকে তুমি কণ্ঠে ধারণ করে মহার্ঘ মৃত্যুকে হেমলকের মতো অবলীলায় পান করেছো আর হয়ে উঠেছ চিরঞ্জীব?
যে মুহূর্তে ডেস্পটের বুলেটবিদ্ধ তোমার নশ্বর দেহটি প্রেমার্দ্র মাটির বুকে ফিরে গেল, সেই মুহূর্তেই হয়তোবা উত্তর থেকে দক্ষিণে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সমস্ত পৃথিবীর তাবৎ কবিরা তোমার অসমাপ্ত পঙ্ক্তির উত্তরাধিকারী হয়ে উঠল।
আর বাউলের হাহাকার, স্পেনীয় জিপসির কালো রাত্রি—সব যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে একই বাঁশির সুরে গেয়ে উঠলো পরমতম দুঃখ জাগানিয়া দেহভঙ্গিতে:
যতদিন আন্দালুসিয়ায় দোরা নদী পাথরের বুক চিরে পাহাড়ি ঝর্নাধারার মতো কুলুকুলু বয়ে যাবে;
যতদিন ধরে ক্ষীণতোয়া গড়াই বাংলার কাদামাটি, কাশবন আর স্মৃতিকে বুকে নিয়ে নিঃশব্দে প্রমত্তা পদ্মাকে আলিঙ্গন করে বঙ্গপোসাগরে মিশে যাবে;
যতদিন পর্যন্ত শেষ সলতের নিভু নিভু শিখায় বিপ্লবের দীপশিখা আলো জ্বেলে যাবে দিকচিহ্নহীন লোকালয়ে—
মহামতি লোরকা সুনিশ্চিত জেনে রাখো, এইসব অনাগত দিনরাত্রিতে কেউ না কেউ অধুনাবাদী দুয়েন্দের নৃত্যপর নতুন সুর-ধ্বনিতে বলবে—
এ আমার নৈবেদ্য—এ আমার অনার্য ফ্ল্যামেনকো।
আমিনা'স পার্ল, মিরপুর, ঢাকা।
৭ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন