ফারুক,
তাকিয়ে দেখো
বিমল
গুহ
[কবি
ফারুক মাহমুদের ৭৫তম জন্মদিনে]
ফারুক,
তাকিয়ে দেখো তোমার উঠোনে
আজ স্রোতঃস্বিনী ধারা
বাড়ির
সীমানা জুড়ে নৌকোর আকার
সারি
সারি পাল, পঙক্তি-আঁকা
কবিতার পাল
—যা
তুমি উড়িয়েছিলে বাতাসের স্রোতে একদিন
দুরন্ত
মেঘের মতন|
কী
তুমুল মাড়িয়ে এসেছো পথ, মনে পড়ে?
সহজ
তো ছিলো না কিছুই
আজ
এতকাল পর তাকিয়ে কি
দেখেছো একবার
কোন
সে মায়াবী টানে গৃহত্যাগী সন্তের
মতন দিকভোলা
ঘুরেছো
প্রান্তরে অন্ধ আবেগে তখন?
এখন
অনেক বেলা|
রবীন্দ্রনাথের
মতো বলতে কি পারো
‘খ্যাপা
খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ পাথর’—
সেই ঘোরলাগা শ্লোক?
আঙিনায়
দেখো কারা বসে আছে
চুপ,
হাত
তুলে কারা নাচে উল্লাস-বেলায় এই দিনে?
বলি—
সত্তরের শব্দকারিগর আমরাই তো দাঁড়িয়ে দুপুর-রাস্তায়
সমবেত
উচ্চারণে পৃথিবীর ঘুম ভাঙিয়েছি
সাজিয়েছি
রংয়ের বেসাতি খোলামাঠে লাইন-বাই-লাইন
দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলনের ব্যবচ্ছেদে
—এই
তো সেদিন!
আজ
তাকিয়ে দেখি পৃথিবীর বয়স
বেড়েছে|
বরণীয়
বরষা
শামস
হক
কবির
অন্তরে তুমি কাঙ্ক্ষিত সমাদৃত,
বর্ষা—
গায়কের
কণ্ঠে মেঘমল্লার রাগ;
তাপিত
ধরণীর কাছে হিমেল পরশ
পত্রপল্লবকুলে
শুচি শ্যামলিমা স্নিগ্ধতাদায়িনী
মৃত্তিকার
তুমি শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা
নিমেষেই
চুষে নেয় তোমাকে সুতীব্র
চুম্বনে|
তোমার
আগমনে কারো রসনা তৃপ্ত
ভুনা
খিচুড়ি-মাংসের ব্যঞ্জনায়
ভেকেরা
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্বাগত জানায়
ঝিল্লির
উল্লাসে বিদূরিত রাতের নিস্তব্ধতা|
অথচ
দেখো— অতি নগণ্য কচুর
পাতাটিও
কীভাবে
তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে!
কখনো
তুমি বিনষ্টের হোতা, পঙ্কিল কর্দমাক্ত পথঘাট
কেঁচো
কিলবিল কদর্য বরষা!
অতিবর্ষণ
মানুষকে করে বিনিদ্র: মাঠের
পর মাঠ
শুধু
ˆথ ˆথ পানি, অজস্র ফসলের হানি
তোমার
প্রবল তোড়ে ভেসে যায়
প্রান্তজনের পর্ণ কুঠির
কখনো
তুমি একচোখা, স্বজনপ্রিয়
তুমি
চেরাপুঞ্জির প্রেয়সী আর মরুদেশের কাছে
প্রবাসী
খেটে
খাওয়া মানুষের কাছে তুমি এক
শঙ্কা মহাভয়!
তারা
কাজহীন প্রতিদিন|
তবুও
তুমি বরেণ্য হে বরষা
কদম
ফুলের ডালি সাজিয়ে মেঘকন্যাকে
করছি বরণ
শুধু
পারিনি, তাদের কিছু দিতে যাদের
অশ্রুতে
বর্ষা
নামে সারাটি বছর|
***
অস্তিত্বের
গোপন ভাষা
রোকেয়া
ইসলাম
বৃষ্টি
নামে অনুচ্চারিত শব্দের ভেতর
প্রতিটি
ফোঁটা যেন সময়ের বিচূর্ণ
আয়না,
নিজের
ক্ষতচিহ্ন দেখে চমকে উঠি
মেঘেরও নির্বাসন
অত্যাবশ্যক
পৃথিবীর
বুকে অশ্রু চিহ্ন রেখে যায়|
বর্ষার
নদী সমুদ্র সমর্পণে
নিজেকে
হারানোর মহৎ শিল্প|
গাছেরা
বৃষ্টির জল ছুঁয়ে সবুজ
উচ্চারণ করে,
মানুষের
কাছে উত্তরহীন অসমাপ্ত প্রশ্ন|
বৃষ্টিভেজা
সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে
হঠাৎ
মনে হয় স্মৃতির দীর্ঘ
ক্যানভাসে
দরজার
ওপাশে একটি অনুপস্থিত মুখ|
দুই
শ’ ষাটে জেগে থাকা
সোডিয়াম আলো
আষাঢ়ের
সরবে ঝরে পড়ে অবিরাম,
জমাট
ভালবাসা একদিন
হৃদ
আকাশে গভীর মেঘ হতে
চায়...
মানব-হৃদয়
সুহিতা
সুলতানা
হাঁটতে
হাঁটতে বহুদূর চলে যেতে ইচ্ছে
করে
হোক
জনপদ জনশূন্য! জীবনে বেঁচে থাকার
জন্য
স্থবিরতা ভাল| মধ্যদুপুরে রূঢ়
সমুদ্রের
নীল
জলের কথা মনে করিয়ে
দেয়| শহর
ছেড়ে
বিচূর্ণ হতে হতে প্রাচীন
নগরের
ধ্বংসস্তূপের
পাশে দাঁড়িয়ে আমারও মনে হতে
থাকে
মানুষের রক্তাক্ত চোখের চেয়ে ˆজ্যষ্ঠের
তাতানো
ইতস্তত ছায়া ঢের ভাল!
এই যে
মানুষের
আদিম উল্লাস আর তালকানা খেলা
বড়
প্রাণহীন, অনুভূতিহীন অমীমাংসিত পক্ষপাত
কৃত্রিম
হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে বিবর্ণ
মানব-হৃদয়
আর
তার পরিণতি! বোধহীন মানুষের ইতিহাস
বড়
বেদনার কেবলি হৃদয়হীন দৃশ্যের সংকল্প
যেদিকে
তাকাই আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মুখ
ও
মুখোশ!
লোভী রমণীদের স্বার্থের কাছে জীবনও
স্তব্ধ
প্রতিভাহীন| যতদূর চোখ যায় আষাঢ়ে
গল্পর
মতো অনুশীলন! তারপরও অপেক্ষা ও
যুক্তির
কোনো মূল্য নেই! সত্যটা আসলে
কী?
কবিতার
মতো অনিবার্য শব্দের কাছে হাঁটুমুড়ে
বসে
থাকলেই কি দূর আকাশ
দেখা যায়?
সারি
সারি প্রাসাদের প্রতিযোগিতায় ঢেকে
গেছে
নীল আকাশ, মুখ থুবড়ে পড়েছে
স্বপ্নের
ধ্বনি!
অকূলে জীবনও বেঁকেচুরে যায়! অর্ধেক
জীবনের
জন্য আর কারও প্রয়োজন
নেই!
***
স্যামন
রান
জুনান
নাশিত
এসবই
একদিন নিয়ম হয়ে যায়
তুমি
শোক ভুলে যাবে
সবুজ
ঘাসে ঢেকে যাবে দূরের
স্যানোটাফ
মাথার
ওপর ওড়ানো ছাই শেষের বিন্দুতে
মিলে গেলেও
বুকের
পাঁজর ভাঙা দীর্ঘশ্বাস
দিনদিনই
নতজানু হবে
রেলিঙ
থেকে ঝুলে থাকা পাতার
ভাঁজে পোকার দাপট উপেক্ষা করেই
পিলপিল
হেঁটে যাবে বৃক্ষের বাড়ন্ত
শরীর|
এসব
জেনেই বর্ষার বিমুগ্ধ সংসার আমাদের হাতের তালুতে ফোটে
কখনও
রোদ, কখনও বৃষ্টির ছাঁট
মুখে নিয়ে
জীবন
একাকী হাঁটে তপস্যার ভিড়ে
মাঝরাতে
মেঘের ফাঁকে উঁকি দেয়া চাঁদ
আমাদেরও
লক্ষ্য করে
বেদনার
লগ্নিতে শূন্য বুকের ভেতর কতোটা তাপ,
কতোটা হাহাকার
জমে
জমে শুদ্ধ সারং হয়ে ওঠে
রোদের
চাবুক তা জেনেই আরো
প্রখর আরো আগ্রাসী হবে
একদিন
রেলিঙ থেকে ঝুলে থাকা
সুবজের ঘ্রাণ আটকে দেবে
চাবুক
তোলা রোদের দু’হাত|
তাই
ভেঙে পড়ো না, অপেক্ষা
করো
সহ্য
করো শোকের বিষাদ
একদিন
সবকিছু নিয়ম হয়ে যাবে
তখন
মনেই হবে না
স্যামন
রান কতো যে কষ্টকর!
***
গার্হস্থ্য
নাও
সঞ্জয়
দেওয়ান
বরফের
চাঙ্গড় ভাঙে দেহ আঙ্গিনায়
হাড্ডিসার
শরীরে শীতল হাওয়া
সুষুপ্ত
শিরায় বিয়াসের মৃতরেখা|
স্বচ্ছ
জলের ধারায় বৈঠা হাতে পৃথুলা
তরুণী
হাতের
চেটোয় কালঘাম
আদি
প্রেমিক ছিটায় এক কোষ জল
পাটাতনের
বুকপাঁজর কাঁপে জলবাসরে|
মেডুসার
অভিশপ্ত প্রেমিক
প্রথম
অভিসারে অন্ধ হয়ে
অদ্যাবধি
টেনে চলছে গার্হস্থ্য নাও|
***
যিশুর
মতো লটকে থাকা ঘুড়ি
সুমন
শামস
গোঁত্তা
খেয়ে ঘুড়িটা হঠাৎ আটকে গেছে|
ছুটবার শেষ চেষ্টার পর
আত্মসমর্পণ| সংগোপনে তবুও সে পালাতে
চায়| বাতাসের একটু দোলাতেই সাপ
বেজির লড়াই| ক্লান্ত অবসন্ন সে লড়াই থিতিয়ে
এলে ঘুড়িটা আবার জিভ ছেড়ে
দেয়া লাশের মতো ঝুলে পড়ে|
পালাবার জন্য প্রতিদিন লড়তে
লড়তে ঘুড়িটা আরও বেশি পেঁচিয়ে
যেতে থাকে| তারপর ছিঁড়েখুঁড়ে যিশুর মতো লটকে থাকে
অনন্তকাল|
মুক্তিপাগল
মানুষরাও পেরেকবিদ্ধ যিশু হয়ে যায়
পালাতে পালাতে এভাবেই একদিন|
***
তিল
ঊর্মি রহমান
আমাকে পাওয়ার আগে,
তুমি আমাকে আবিষ্কার করতে চাইতে|
আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, যখন জানলাম
তুমি আমার ঠোঁটের তিল দেখেই
একজন্ম কাটিয়ে দেবে বলে ভেবেছ|
আমিও প্রেমে পড়লাম|
নিজেকে আবিষ্কৃত হতে দেখার বাসনা হলো আমার|
তুমি আবিষ্কার করলে
আমার আরও দুটো গভীর কালো তিল!
তারপর আরও দুটো|
এখন আর আমার ঠোঁটের তিল তোমায় টানে না|
মৃদু আলোয় তুমি আরও
চারটে তিল খুঁজতে থাকো|
নতুন কিছুর খোঁজ না পেয়ে হতাশ হও!
অথচ তুমি জানোই না, ভালোবাসলে
একটা তিলকেই বারবার আবিষ্কারের
আনন্দ পাওয়া যায়|
***
প্রেম
নিজেই সালোকসংশ্লেষ
রোখসানা
ইয়াসমিন মণি
আজ
বৃষ্টিতে ভিজবে বলে
কিছু
রৌদ্র আনফ্রেন্ড করেছিলে,
অথচ
তোমার পাতায় তুমি
রৌদ্রের
কাছেই ক্লোরোফিল চেয়েছিলে|
এই
অহর্নিশ বাষ্প-বিলাসী খেলায়
আমাকেও
নিয়েছো জলের মেলায়;
চারিপাশে
আজ এক মোহগ্রস্ত ঊর্ধ্বশ্বাস,
আমিও
হয়েছি পাগল অবুঝ চারাগাছ|
যে
বৃষ্টির লোভে তুমি বিবাগী
হলে,
অথচ
শিকড়ের অমোঘ সালোকসংশ্লেষণে—
ভুল
করে আলোক-বিমুখ ছায়ায়
চড়ে,
নিজের
সবুজটুকুই সঁপে দিলে মরণে|
আমাকে
দিয়েছো আজ তোমার সমস্ত
আলো,
সবুজ
হারানোর ক্ষতটাই তুমি বেসেছ ভালো;
অবশেষে
রোদ্দুরের মরীচিকার দিন শেষে
প্রেমকেই
বাঁচিয়েছ তুমি আমার সংশ্লেষে|
***
হাসনাহেনার
গন্ধ
ফরিদা
ফারহানা
নিরুত্তর
কিছু প্রশ্ন সারাজীবন
ধোঁয়াশার
এক জাল হয়ে ঝুলে
থাকে
পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝপথে|
হাজারো
শূন্যতার বিস্তার
যেন
রোজই সেখানে ফুল
হয়ে
ফোটে|
তুমি
মাঝরাতের অন্ধকার হয়ে নেমে যাও
মনের
অলিগলিতে|
স্নানের
শেষে ভেজা গামছায়
ভেসে
ওঠে তোমার চোখের দৃষ্টি|
আমি
এখনো খুঁজে যাই
সলজ্জ
প্রশান্তির সেই মুখের গঠন|
তুমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মদিনে
হাসনাহেনার
গন্ধ হয়ে
আমাকে
বিভোর করে দেবে
আর
সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পথ
এখনো
বুঝি বাকি|
***
আগন্তুক
নয়ন
আহমেদ
মটমট
করে ভেঙে যাচ্ছে হরিৎ
যোগাযোগ| সম্পর্কের রেণু|
দ্যাখো
ভঙ্গুর কালের বর্ণমালা!
খেঁজুর
পাতার মতো চিরল চিরল
গভীরতা কাঁদছে একাকী|
কাঁদছে
সমূহ ধানখেত|
তার
শব্দ শোনো| আহা!
আশ্রয়
কামনা করে খালি হাতে
ফিরে গেছে সবুজ আগুন|
তুমি
প্রেম কাকে বলো? কাকে
বলে সভ্যতা?
পথে
পথে গড়াগড়ি খায় চোখ ও
দৃশ্যের মাতৃভাষা|
সবই
আহত|
হায়
পঙ্গুকাল!
যুদ্ধ
ও ঘৃণার বিপরীতে কোনো ফুল ফোটানো
গেল না|
তবুও
অপেক্ষা করো|
হয়তো
নিজেকেই ভালোবেসে পরিচর্যা করছে সূর্যমুখীর মতো
কোনও আগন্তুক|
***
তবু
জেগে থাকে
ফেরদাউসী
কুঈন
তোমাকে মুছে
দিতে উদ্যত আরেকটি তুমি
খুব
নীরবে খুব সন্তর্পণে| আমি
বিস্ময়ে দেখি;
উজ্জ্বল
জোছনার ঠিকরে পড়া আলো
সব
কিছু গিলে নেয় আপন
সৌন্দর্য|
হয়ত
ভীষণ অপেক্ষায় ছিলাম—
আলো
নিভে দিতে জ্বলুক আরেকটি
আলো,
ঝুম
বৃষ্টি ঝরুক শান্ত নদীর
জলে|
এই
যে রেলের ঝিকঝিক শব্দ,
নদীর
তীরে ঠেউদোলানো কাশফুলের বন্যা,
শান্ত
নদীর জলে সোনাগলা আলোয়
পাখিদের
ফেরার গান, স্মৃতির ˆসন্যদল
ঝাঁকে ঝাঁকে উঁকি দেয় ইথারে,
হারানো
সুর তবু হারায় না—
মিষ্টি দোয়েল হয়ে রয়ে যায়
কোথাও...

বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুলাই ২০২৬
ফারুক,
তাকিয়ে দেখো
বিমল
গুহ
[কবি
ফারুক মাহমুদের ৭৫তম জন্মদিনে]
ফারুক,
তাকিয়ে দেখো তোমার উঠোনে
আজ স্রোতঃস্বিনী ধারা
বাড়ির
সীমানা জুড়ে নৌকোর আকার
সারি
সারি পাল, পঙক্তি-আঁকা
কবিতার পাল
—যা
তুমি উড়িয়েছিলে বাতাসের স্রোতে একদিন
দুরন্ত
মেঘের মতন|
কী
তুমুল মাড়িয়ে এসেছো পথ, মনে পড়ে?
সহজ
তো ছিলো না কিছুই
আজ
এতকাল পর তাকিয়ে কি
দেখেছো একবার
কোন
সে মায়াবী টানে গৃহত্যাগী সন্তের
মতন দিকভোলা
ঘুরেছো
প্রান্তরে অন্ধ আবেগে তখন?
এখন
অনেক বেলা|
রবীন্দ্রনাথের
মতো বলতে কি পারো
‘খ্যাপা
খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ পাথর’—
সেই ঘোরলাগা শ্লোক?
আঙিনায়
দেখো কারা বসে আছে
চুপ,
হাত
তুলে কারা নাচে উল্লাস-বেলায় এই দিনে?
বলি—
সত্তরের শব্দকারিগর আমরাই তো দাঁড়িয়ে দুপুর-রাস্তায়
সমবেত
উচ্চারণে পৃথিবীর ঘুম ভাঙিয়েছি
সাজিয়েছি
রংয়ের বেসাতি খোলামাঠে লাইন-বাই-লাইন
দাঁড়ি-কমা-সেমিকোলনের ব্যবচ্ছেদে
—এই
তো সেদিন!
আজ
তাকিয়ে দেখি পৃথিবীর বয়স
বেড়েছে|
বরণীয়
বরষা
শামস
হক
কবির
অন্তরে তুমি কাঙ্ক্ষিত সমাদৃত,
বর্ষা—
গায়কের
কণ্ঠে মেঘমল্লার রাগ;
তাপিত
ধরণীর কাছে হিমেল পরশ
পত্রপল্লবকুলে
শুচি শ্যামলিমা স্নিগ্ধতাদায়িনী
মৃত্তিকার
তুমি শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা
নিমেষেই
চুষে নেয় তোমাকে সুতীব্র
চুম্বনে|
তোমার
আগমনে কারো রসনা তৃপ্ত
ভুনা
খিচুড়ি-মাংসের ব্যঞ্জনায়
ভেকেরা
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে স্বাগত জানায়
ঝিল্লির
উল্লাসে বিদূরিত রাতের নিস্তব্ধতা|
অথচ
দেখো— অতি নগণ্য কচুর
পাতাটিও
কীভাবে
তোমাকে প্রত্যাখ্যান করে!
কখনো
তুমি বিনষ্টের হোতা, পঙ্কিল কর্দমাক্ত পথঘাট
কেঁচো
কিলবিল কদর্য বরষা!
অতিবর্ষণ
মানুষকে করে বিনিদ্র: মাঠের
পর মাঠ
শুধু
ˆথ ˆথ পানি, অজস্র ফসলের হানি
তোমার
প্রবল তোড়ে ভেসে যায়
প্রান্তজনের পর্ণ কুঠির
কখনো
তুমি একচোখা, স্বজনপ্রিয়
তুমি
চেরাপুঞ্জির প্রেয়সী আর মরুদেশের কাছে
প্রবাসী
খেটে
খাওয়া মানুষের কাছে তুমি এক
শঙ্কা মহাভয়!
তারা
কাজহীন প্রতিদিন|
তবুও
তুমি বরেণ্য হে বরষা
কদম
ফুলের ডালি সাজিয়ে মেঘকন্যাকে
করছি বরণ
শুধু
পারিনি, তাদের কিছু দিতে যাদের
অশ্রুতে
বর্ষা
নামে সারাটি বছর|
***
অস্তিত্বের
গোপন ভাষা
রোকেয়া
ইসলাম
বৃষ্টি
নামে অনুচ্চারিত শব্দের ভেতর
প্রতিটি
ফোঁটা যেন সময়ের বিচূর্ণ
আয়না,
নিজের
ক্ষতচিহ্ন দেখে চমকে উঠি
মেঘেরও নির্বাসন
অত্যাবশ্যক
পৃথিবীর
বুকে অশ্রু চিহ্ন রেখে যায়|
বর্ষার
নদী সমুদ্র সমর্পণে
নিজেকে
হারানোর মহৎ শিল্প|
গাছেরা
বৃষ্টির জল ছুঁয়ে সবুজ
উচ্চারণ করে,
মানুষের
কাছে উত্তরহীন অসমাপ্ত প্রশ্ন|
বৃষ্টিভেজা
সন্ধ্যায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে
হঠাৎ
মনে হয় স্মৃতির দীর্ঘ
ক্যানভাসে
দরজার
ওপাশে একটি অনুপস্থিত মুখ|
দুই
শ’ ষাটে জেগে থাকা
সোডিয়াম আলো
আষাঢ়ের
সরবে ঝরে পড়ে অবিরাম,
জমাট
ভালবাসা একদিন
হৃদ
আকাশে গভীর মেঘ হতে
চায়...
মানব-হৃদয়
সুহিতা
সুলতানা
হাঁটতে
হাঁটতে বহুদূর চলে যেতে ইচ্ছে
করে
হোক
জনপদ জনশূন্য! জীবনে বেঁচে থাকার
জন্য
স্থবিরতা ভাল| মধ্যদুপুরে রূঢ়
সমুদ্রের
নীল
জলের কথা মনে করিয়ে
দেয়| শহর
ছেড়ে
বিচূর্ণ হতে হতে প্রাচীন
নগরের
ধ্বংসস্তূপের
পাশে দাঁড়িয়ে আমারও মনে হতে
থাকে
মানুষের রক্তাক্ত চোখের চেয়ে ˆজ্যষ্ঠের
তাতানো
ইতস্তত ছায়া ঢের ভাল!
এই যে
মানুষের
আদিম উল্লাস আর তালকানা খেলা
বড়
প্রাণহীন, অনুভূতিহীন অমীমাংসিত পক্ষপাত
কৃত্রিম
হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে বিবর্ণ
মানব-হৃদয়
আর
তার পরিণতি! বোধহীন মানুষের ইতিহাস
বড়
বেদনার কেবলি হৃদয়হীন দৃশ্যের সংকল্প
যেদিকে
তাকাই আগুনে ঝলসে যাচ্ছে মুখ
ও
মুখোশ!
লোভী রমণীদের স্বার্থের কাছে জীবনও
স্তব্ধ
প্রতিভাহীন| যতদূর চোখ যায় আষাঢ়ে
গল্পর
মতো অনুশীলন! তারপরও অপেক্ষা ও
যুক্তির
কোনো মূল্য নেই! সত্যটা আসলে
কী?
কবিতার
মতো অনিবার্য শব্দের কাছে হাঁটুমুড়ে
বসে
থাকলেই কি দূর আকাশ
দেখা যায়?
সারি
সারি প্রাসাদের প্রতিযোগিতায় ঢেকে
গেছে
নীল আকাশ, মুখ থুবড়ে পড়েছে
স্বপ্নের
ধ্বনি!
অকূলে জীবনও বেঁকেচুরে যায়! অর্ধেক
জীবনের
জন্য আর কারও প্রয়োজন
নেই!
***
স্যামন
রান
জুনান
নাশিত
এসবই
একদিন নিয়ম হয়ে যায়
তুমি
শোক ভুলে যাবে
সবুজ
ঘাসে ঢেকে যাবে দূরের
স্যানোটাফ
মাথার
ওপর ওড়ানো ছাই শেষের বিন্দুতে
মিলে গেলেও
বুকের
পাঁজর ভাঙা দীর্ঘশ্বাস
দিনদিনই
নতজানু হবে
রেলিঙ
থেকে ঝুলে থাকা পাতার
ভাঁজে পোকার দাপট উপেক্ষা করেই
পিলপিল
হেঁটে যাবে বৃক্ষের বাড়ন্ত
শরীর|
এসব
জেনেই বর্ষার বিমুগ্ধ সংসার আমাদের হাতের তালুতে ফোটে
কখনও
রোদ, কখনও বৃষ্টির ছাঁট
মুখে নিয়ে
জীবন
একাকী হাঁটে তপস্যার ভিড়ে
মাঝরাতে
মেঘের ফাঁকে উঁকি দেয়া চাঁদ
আমাদেরও
লক্ষ্য করে
বেদনার
লগ্নিতে শূন্য বুকের ভেতর কতোটা তাপ,
কতোটা হাহাকার
জমে
জমে শুদ্ধ সারং হয়ে ওঠে
রোদের
চাবুক তা জেনেই আরো
প্রখর আরো আগ্রাসী হবে
একদিন
রেলিঙ থেকে ঝুলে থাকা
সুবজের ঘ্রাণ আটকে দেবে
চাবুক
তোলা রোদের দু’হাত|
তাই
ভেঙে পড়ো না, অপেক্ষা
করো
সহ্য
করো শোকের বিষাদ
একদিন
সবকিছু নিয়ম হয়ে যাবে
তখন
মনেই হবে না
স্যামন
রান কতো যে কষ্টকর!
***
গার্হস্থ্য
নাও
সঞ্জয়
দেওয়ান
বরফের
চাঙ্গড় ভাঙে দেহ আঙ্গিনায়
হাড্ডিসার
শরীরে শীতল হাওয়া
সুষুপ্ত
শিরায় বিয়াসের মৃতরেখা|
স্বচ্ছ
জলের ধারায় বৈঠা হাতে পৃথুলা
তরুণী
হাতের
চেটোয় কালঘাম
আদি
প্রেমিক ছিটায় এক কোষ জল
পাটাতনের
বুকপাঁজর কাঁপে জলবাসরে|
মেডুসার
অভিশপ্ত প্রেমিক
প্রথম
অভিসারে অন্ধ হয়ে
অদ্যাবধি
টেনে চলছে গার্হস্থ্য নাও|
***
যিশুর
মতো লটকে থাকা ঘুড়ি
সুমন
শামস
গোঁত্তা
খেয়ে ঘুড়িটা হঠাৎ আটকে গেছে|
ছুটবার শেষ চেষ্টার পর
আত্মসমর্পণ| সংগোপনে তবুও সে পালাতে
চায়| বাতাসের একটু দোলাতেই সাপ
বেজির লড়াই| ক্লান্ত অবসন্ন সে লড়াই থিতিয়ে
এলে ঘুড়িটা আবার জিভ ছেড়ে
দেয়া লাশের মতো ঝুলে পড়ে|
পালাবার জন্য প্রতিদিন লড়তে
লড়তে ঘুড়িটা আরও বেশি পেঁচিয়ে
যেতে থাকে| তারপর ছিঁড়েখুঁড়ে যিশুর মতো লটকে থাকে
অনন্তকাল|
মুক্তিপাগল
মানুষরাও পেরেকবিদ্ধ যিশু হয়ে যায়
পালাতে পালাতে এভাবেই একদিন|
***
তিল
ঊর্মি রহমান
আমাকে পাওয়ার আগে,
তুমি আমাকে আবিষ্কার করতে চাইতে|
আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, যখন জানলাম
তুমি আমার ঠোঁটের তিল দেখেই
একজন্ম কাটিয়ে দেবে বলে ভেবেছ|
আমিও প্রেমে পড়লাম|
নিজেকে আবিষ্কৃত হতে দেখার বাসনা হলো আমার|
তুমি আবিষ্কার করলে
আমার আরও দুটো গভীর কালো তিল!
তারপর আরও দুটো|
এখন আর আমার ঠোঁটের তিল তোমায় টানে না|
মৃদু আলোয় তুমি আরও
চারটে তিল খুঁজতে থাকো|
নতুন কিছুর খোঁজ না পেয়ে হতাশ হও!
অথচ তুমি জানোই না, ভালোবাসলে
একটা তিলকেই বারবার আবিষ্কারের
আনন্দ পাওয়া যায়|
***
প্রেম
নিজেই সালোকসংশ্লেষ
রোখসানা
ইয়াসমিন মণি
আজ
বৃষ্টিতে ভিজবে বলে
কিছু
রৌদ্র আনফ্রেন্ড করেছিলে,
অথচ
তোমার পাতায় তুমি
রৌদ্রের
কাছেই ক্লোরোফিল চেয়েছিলে|
এই
অহর্নিশ বাষ্প-বিলাসী খেলায়
আমাকেও
নিয়েছো জলের মেলায়;
চারিপাশে
আজ এক মোহগ্রস্ত ঊর্ধ্বশ্বাস,
আমিও
হয়েছি পাগল অবুঝ চারাগাছ|
যে
বৃষ্টির লোভে তুমি বিবাগী
হলে,
অথচ
শিকড়ের অমোঘ সালোকসংশ্লেষণে—
ভুল
করে আলোক-বিমুখ ছায়ায়
চড়ে,
নিজের
সবুজটুকুই সঁপে দিলে মরণে|
আমাকে
দিয়েছো আজ তোমার সমস্ত
আলো,
সবুজ
হারানোর ক্ষতটাই তুমি বেসেছ ভালো;
অবশেষে
রোদ্দুরের মরীচিকার দিন শেষে
প্রেমকেই
বাঁচিয়েছ তুমি আমার সংশ্লেষে|
***
হাসনাহেনার
গন্ধ
ফরিদা
ফারহানা
নিরুত্তর
কিছু প্রশ্ন সারাজীবন
ধোঁয়াশার
এক জাল হয়ে ঝুলে
থাকে
পাওয়া-না-পাওয়ার মাঝপথে|
হাজারো
শূন্যতার বিস্তার
যেন
রোজই সেখানে ফুল
হয়ে
ফোটে|
তুমি
মাঝরাতের অন্ধকার হয়ে নেমে যাও
মনের
অলিগলিতে|
স্নানের
শেষে ভেজা গামছায়
ভেসে
ওঠে তোমার চোখের দৃষ্টি|
আমি
এখনো খুঁজে যাই
সলজ্জ
প্রশান্তির সেই মুখের গঠন|
তুমি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর জন্মদিনে
হাসনাহেনার
গন্ধ হয়ে
আমাকে
বিভোর করে দেবে
আর
সেই দীর্ঘ অপেক্ষার পথ
এখনো
বুঝি বাকি|
***
আগন্তুক
নয়ন
আহমেদ
মটমট
করে ভেঙে যাচ্ছে হরিৎ
যোগাযোগ| সম্পর্কের রেণু|
দ্যাখো
ভঙ্গুর কালের বর্ণমালা!
খেঁজুর
পাতার মতো চিরল চিরল
গভীরতা কাঁদছে একাকী|
কাঁদছে
সমূহ ধানখেত|
তার
শব্দ শোনো| আহা!
আশ্রয়
কামনা করে খালি হাতে
ফিরে গেছে সবুজ আগুন|
তুমি
প্রেম কাকে বলো? কাকে
বলে সভ্যতা?
পথে
পথে গড়াগড়ি খায় চোখ ও
দৃশ্যের মাতৃভাষা|
সবই
আহত|
হায়
পঙ্গুকাল!
যুদ্ধ
ও ঘৃণার বিপরীতে কোনো ফুল ফোটানো
গেল না|
তবুও
অপেক্ষা করো|
হয়তো
নিজেকেই ভালোবেসে পরিচর্যা করছে সূর্যমুখীর মতো
কোনও আগন্তুক|
***
তবু
জেগে থাকে
ফেরদাউসী
কুঈন
তোমাকে মুছে
দিতে উদ্যত আরেকটি তুমি
খুব
নীরবে খুব সন্তর্পণে| আমি
বিস্ময়ে দেখি;
উজ্জ্বল
জোছনার ঠিকরে পড়া আলো
সব
কিছু গিলে নেয় আপন
সৌন্দর্য|
হয়ত
ভীষণ অপেক্ষায় ছিলাম—
আলো
নিভে দিতে জ্বলুক আরেকটি
আলো,
ঝুম
বৃষ্টি ঝরুক শান্ত নদীর
জলে|
এই
যে রেলের ঝিকঝিক শব্দ,
নদীর
তীরে ঠেউদোলানো কাশফুলের বন্যা,
শান্ত
নদীর জলে সোনাগলা আলোয়
পাখিদের
ফেরার গান, স্মৃতির ˆসন্যদল
ঝাঁকে ঝাঁকে উঁকি দেয় ইথারে,
হারানো
সুর তবু হারায় না—
মিষ্টি দোয়েল হয়ে রয়ে যায়
কোথাও...

আপনার মতামত লিখুন