শরীয়তপুর সংলগ্ন পদ্মা ও মেঘনা নদীতে ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও জেলের জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ ধরা পড়ছে না। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে এই জেলায় ইলিশের উৎপাদন ৮২৩ মেট্রিক টন কমে গেছে।
মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, নাব্যতা-সংকট, শিল্পবর্জ্যে পানি দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইলিশের বিচরণ কমেছে। এতে চরম লোকসানে পড়েছেন জেলার ২৫ হাজারেরও বেশি জেলে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত প্রায় ৮০ কিলোমিটার নদীপথের মধ্যে ৫০ কিলোমিটার পদ্মা এবং ৩০ কিলোমিটার মেঘনা নদীর অংশ। এসব নদীতে ৯ হাজার ৩০০টি নৌকায় প্রায় ২৫ হাজার ২০০ জন জেলে জীবিকা নির্বাহ করেন। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশের প্রধান মৌসুম ধরা হলেও এবার চিত্র ভিন্ন।
মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে জেলায় ৪ হাজার ৫২৮ মেট্রিক টন ইলিশ আহরণ করা হয়েছিল। ২০২২ সালে ৪ হাজার ৪৪৫ মেট্রিক টন, ২০২৩ সালে ৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন এবং ২০২৪ সালে তা কমে ৪ হাজার ১ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে উৎপাদন আরও কমে ৩ হাজার ৭০৫ মেট্রিক টনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে উৎপাদন কমেছে ৮২৩ মেট্রিক টন।
পদ্মার দুর্গম কাচিকাটা ইউনিয়নের জেলে কাওসার সংবাদকে বলেন, ‘একেকটি নৌকায় ১০ থেকে ১২ জন জেলে কাজ করি। নৌকার জ্বালানি ও আমাদের খাবারের পেছনে প্রতিদিন বড় অংকের খরচ হয়। কিন্তু সারা দিন জাল ফেলেও কখনো মাত্র দুই-তিনটি ইলিশ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। মাছ না থাকায় এখন আমাদের সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
নদীতে মাছ না থাকায় এর প্রভাব পড়েছে জেলার মাছের আড়তগুলোতেও। গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর মাছ আড়তের ব্যবসায়ী মানিক মিয়া বলেন, ‘বর্ষাকাল হলেও নদীতে এবার কাঙ্ক্ষিত পানি নেই। অনেক স্থানে ডুবোচর জেগে উঠেছে। ফলে জেলেরা আগের মতো মাছ পাচ্ছেন না। অনেক জেলে আড়তে ইলিশ ছাড়াই ফিরে আসছেন। পানি বাড়লে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে আমরা আশা করছি।’
সুরেশ্বর পদ্মা তীরের আড়তদার রিয়াজ মুন্সি বলেন, ‘জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত আড়তগুলো ইলিশে জমজমাট থাকার কথা। এবার মৌসুমের শুরু থেকেই সরবরাহ অনেক কম। নদীর গভীরতা কমে যাওয়া আর ডুবোচর বেড়ে যাওয়াই এর মূল কারণ।’
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব সংবাদকে বলেন, শরীয়তপুর অংশের পদ্মা ও মেঘনা নদীতে বর্তমানে অন্তত ৩০টি ছোট-বড় ডুবোচর রয়েছে, যা ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
সংকটের আরও কিছু কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে এসে পানি দূষিত করছে। পাশাপাশি নদীর পানির তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়েছে। ইলিশ সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার পানিতে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করে। বর্তমানে তাপমাত্রা বেশি থাকায় সমুদ্র থেকে পর্যাপ্ত ইলিশ নদীতে প্রবেশ করছে না।’
আপনার মতামত লিখুন