সংবাদ

গ্রন্থপাঠ

কারাগারের অন্দরমহলের ইতিহাস-অনুসন্ধান


অরণ্য প্রভা
অরণ্য প্রভা
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম

কারাগারের অন্দরমহলের ইতিহাস-অনুসন্ধান


 

বাংলা ভাষায় কারাগারবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ নেই বললেই চলে| বিশেষত অবিভক্ত ভারতের কারাব্যবস্থার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শাসনের দণ্ডনীতি, কারা প্রশাসনের বিকাশ, বন্দিজীবনের বাস্তবতা এবাং কারাগারকে ঘিরে রাষ্ট্রের ক্ষমতাচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসকে এক মলাটে ধারণ করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত কঠিনই বটে| সেইদিক থেকেকারাগারে অনুসন্ধানএকটি ব্যতিক্রমী গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ|

৬০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে লেখক অবিভক্ত ভারতের কারাব্যবস্থার উৎপত্তি, বিকাশ, রূপান্তর এবাং ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ককে নিবিড়ভাবে আলোচনা করেছেন| গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোএর তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনা এবং ১০৩টি বিরল ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের সংযোজন পাঠককে শুধু পাঠের অভিজ্ঞতাই এনে দেয়নি, বরং অতীতের কারা-বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে|

এই গ্রন্থে লেখক ভারতবর্ষের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ঔপনিবেশিক শাসনের কৌশল স্বাধীনতা আন্দোলনের ভয়াবহতা নিষ্ঠুরতার বাস্তব চিত্র কারা-ইতিহাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন| ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর ঔপনিবেশিক শাসন ভারতে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল কারাব্যবস্থা| এই কারাব্যবস্থা কেবল অপরাধ দমন বা শাস্তি প্রদানের উপায় ছিল না; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, শোষণ রাজনৈতিক দমনের কার্যকর হাতিয়ার| ঔপনিবেশিক ভারতের কারাগারগুলো গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয় দণ্ডতত্ত্ব, সামরিক শৃঙ্খলা জাতিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সমন্বয়ে| ১৮৬৪ ১৮৯৪ সালের কারা আইন এবং সংশ্লিষ্ট জেল কোডের মাধ্যমে বন্দিদের ওপর কঠোর নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম, একাকী বন্দিত্ব শারীরিক-মানসিক শাস্তি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে| বিশেষতকালাপানিবা দ্বীপান্তর দণ্ড, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং কঠোর শ্রম ঔপনিবেশিক শাস্তি দমননীতির চরম বহিঃপ্রকাশ| ব্রিটিশ ভারতের কারাগার কেবর অপরাধীদের আটক রাখার স্থান ছিল না; এটি ছিল শাসনের ভয়, নিয়ন্ত্রণ আনুগত্য আরোপের এক সুসংগঠিত পরিসর| গ্রন্থটি সেই নীরব ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়যেখানে কারাগার শুধু ইট-পাথরের দেওয়াল নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের এক জীবন্ত দলিল|

গ্রন্থের সূচনাপর্বে প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের কারাব্যবস্থা এবং ব্রিটিশদের দ্বৈত শাসনব্যবস্থার সময়কার প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কারাগারের বিবর্তন আলোচনা করা হয়েছে| লেখক যেখানে দেখিয়েছেন, আধুনিক কারাগার কোনো স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রক্ষমতার একটি সুপরিকল্পিত সৃষ্টি| এই আলোচনাগুলো পাঠককে কারাব্যবস্থার ঐতিহাসিক শিকড় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়|

গ্রন্থেরদণ্ড বা শাস্তিঅংশে শাস্তির ধারণা শাস্তির পারস্পরিক সম্পর্ক, শাস্তির ধরন এবং ঔপনিবেশিক সরকারের দণ্ডনীতির বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন| যেখানে কারাগারকে শুধু অপরাধীদের আবদ্ধ রাখার স্থান হিসেবে নং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শাসনের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে| শাস্তি বিধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তাদের ক্ষমতার উৎস সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে|

কারাগার নির্মাণ প্রেক্ষিতঅধ্যায়ে কারাগার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রশাসনিক কারণ বিশ্লেষণ করেছেন| কারাগার কীভাবে একটি শাস্তি বিধায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে, বিনা বিচারে অটক রাখার প্রথা কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অংশে পরিণত এবং কারাগার রাজনীতির সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হয়এইসব বিষয়েরই গভীর আলোচনা করা হয়েছে|

গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কারা প্রশাসন, করা ব্যবস্থাপনা, কারা শাসন, কারা মহাপরিদর্শকের ভূমিকা, কারাবিধি এবং কারাসংস্কার সম্পর্কিত আলোচনা| দীর্ঘ সময় ধরে কারাগার পরিচালনার নীতিমালা প্রশাসনিক রূপান্তরগুলো ধারবাহিক বিবরণ গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান|

কারাগার বন্দিজীবনঅংশে বন্দিদের দৈনন্দিন জীবন, নারী বন্দি, কারাগারে মা শিশু, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং বন্দিদের মানসিক জগতের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে| লেখক বন্দিজীবনের মানবিক দিকগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন| ফলে কারাগারের ইতিহাস এখানে শুধু প্রাশসিক ইতিহাস হয়ে থাকেনি, বরং মানবজীবনের ইতিহাসেও পরিণত হয়েছে|

প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিচারিত নিয়ন্ত্রণ কারাগারের ক্ষমতাঅধ্যায়ে বিচারিত নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বন্দিদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে| এখানে লেখক দেখিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের আড়ালে কীভাবে প্রাশসিনক ক্ষমতা অনেক সময় বিচারিত জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেছে|

গ্রন্থের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো— ‘উপনিবেশিবাদ, আইন সহিংসতা’| ঔপনিবেশিক সন্ত্রাস, নির্জন কারাবাস, সেল-ব্যবস্থা, শারীরিক মানসিক নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নানা রূপ এখানে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপিত হয়েছে| লেখক এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে কারাগারে জনমনে ভীতি আতঙ্ক সৃষ্টির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|

ঔপনিবেশিক অবকাঠামো নির্মাণ বন্দিশ্রমঅধ্যায়ে বন্দিদের শ্রম ব্যবহারের ইতিহাস, বহির্মুখী আবাসিক শ্রমব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে বন্দি শ্রমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে| এই অধ্যায়টি লেখকের গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণামূলক অধ্যায়|

গ্রন্থের শেষেদ্বীপান্তর এবং কয়েদি উপনিবেশঅধ্যায়ে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে| মরিশাস, প্রণালি অঞ্চল এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে কয়েদি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, বন্দিদের জীবনসংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসনের প্রকৃতি এখানে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে| বিশেষত আন্দামান সংক্রান্ত আলোচনা পাঠককে ঔপনিবেশিক দণ্ডব্যবস্থার এক ভয়াবহ অধ্যায়ে মুখোমুখি দাঁড় করায়|

১০৩টি বিরল আলোকচিত্র এবং আংশিক ছবি রঙিন হওয়াতে গ্রন্থটিকে আরো পরিপূর্ণতা দান করেন| সব মিলিয়েকারাগারে অনুসন্ধানগ্রন্থটি শুধু একটি কারা-ইতিহাস নয়, এটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, আইন, ক্ষমতা, শাস্তি এবং মানবজীবনের জটিল সম্পর্কের এক বিস্তৃত দলিল| বাংলা ভাষায় কারাব্যবস্থার আদ্যোপান্ত ইতিহাসমূলক গ্রন্থ নেই বলা যায়| তাই কারাব্যবস্থা বিষয়ক গবেষণার জন্য গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে বলেই আমি মনে করি

কারাগারে অনুসন্ধান| মো. খোসবর আলী| প্রকাশক: পুণ্ড্র প্রকাশন, ঢাকা| প্রকাশকাল: মে ২০২৬| মূল্য: ১৩০০ টাকা|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬


কারাগারের অন্দরমহলের ইতিহাস-অনুসন্ধান

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬

featured Image


 

বাংলা ভাষায় কারাগারবিষয়ক গবেষণাগ্রন্থ নেই বললেই চলে| বিশেষত অবিভক্ত ভারতের কারাব্যবস্থার ইতিহাস, ঔপনিবেশিক শাসনের দণ্ডনীতি, কারা প্রশাসনের বিকাশ, বন্দিজীবনের বাস্তবতা এবাং কারাগারকে ঘিরে রাষ্ট্রের ক্ষমতাচর্চার দীর্ঘ ইতিহাসকে এক মলাটে ধারণ করার প্রচেষ্টা অত্যন্ত কঠিনই বটে| সেইদিক থেকেকারাগারে অনুসন্ধানএকটি ব্যতিক্রমী গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ|

৬০০ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে লেখক অবিভক্ত ভারতের কারাব্যবস্থার উৎপত্তি, বিকাশ, রূপান্তর এবাং ঔপনিবেশিক শাসনের সাথে এর নিবিড় সম্পর্ককে নিবিড়ভাবে আলোচনা করেছেন| গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলোএর তথ্যসমৃদ্ধ উপস্থাপনা এবং ১০৩টি বিরল ঐতিহাসিক আলোকচিত্রের সংযোজন পাঠককে শুধু পাঠের অভিজ্ঞতাই এনে দেয়নি, বরং অতীতের কারা-বাস্তবতাকে দৃশ্যমান করে তুলেছে|

এই গ্রন্থে লেখক ভারতবর্ষের সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ঔপনিবেশিক শাসনের কৌশল স্বাধীনতা আন্দোলনের ভয়াবহতা নিষ্ঠুরতার বাস্তব চিত্র কারা-ইতিহাসের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন| ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পর ঔপনিবেশিক শাসন ভারতে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল কারাব্যবস্থা| এই কারাব্যবস্থা কেবল অপরাধ দমন বা শাস্তি প্রদানের উপায় ছিল না; বরং এটি ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ, শোষণ রাজনৈতিক দমনের কার্যকর হাতিয়ার| ঔপনিবেশিক ভারতের কারাগারগুলো গড়ে উঠেছিল ইউরোপীয় দণ্ডতত্ত্ব, সামরিক শৃঙ্খলা জাতিভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সমন্বয়ে| ১৮৬৪ ১৮৯৪ সালের কারা আইন এবং সংশ্লিষ্ট জেল কোডের মাধ্যমে বন্দিদের ওপর কঠোর নজরদারি, বাধ্যতামূলক শ্রম, একাকী বন্দিত্ব শারীরিক-মানসিক শাস্তি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে| বিশেষতকালাপানিবা দ্বীপান্তর দণ্ড, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং কঠোর শ্রম ঔপনিবেশিক শাস্তি দমননীতির চরম বহিঃপ্রকাশ| ব্রিটিশ ভারতের কারাগার কেবর অপরাধীদের আটক রাখার স্থান ছিল না; এটি ছিল শাসনের ভয়, নিয়ন্ত্রণ আনুগত্য আরোপের এক সুসংগঠিত পরিসর| গ্রন্থটি সেই নীরব ইতিহাসের দরজা খুলে দেয়যেখানে কারাগার শুধু ইট-পাথরের দেওয়াল নয়, বরং ঔপনিবেশিক শাসনের এক জীবন্ত দলিল|

গ্রন্থের সূচনাপর্বে প্রাক-ঔপনিবেশিক ভারতের কারাব্যবস্থা এবং ব্রিটিশদের দ্বৈত শাসনব্যবস্থার সময়কার প্রশাসনিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে কারাগারের বিবর্তন আলোচনা করা হয়েছে| লেখক যেখানে দেখিয়েছেন, আধুনিক কারাগার কোনো স্বাভাবিক সামাজিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রক্ষমতার একটি সুপরিকল্পিত সৃষ্টি| এই আলোচনাগুলো পাঠককে কারাব্যবস্থার ঐতিহাসিক শিকড় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেয়|

গ্রন্থেরদণ্ড বা শাস্তিঅংশে শাস্তির ধারণা শাস্তির পারস্পরিক সম্পর্ক, শাস্তির ধরন এবং ঔপনিবেশিক সরকারের দণ্ডনীতির বিশদ বিশ্লেষণ করেছেন| যেখানে কারাগারকে শুধু অপরাধীদের আবদ্ধ রাখার স্থান হিসেবে নং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ শাসনের একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে দেখানো হয়েছে| শাস্তি বিধানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা তাদের ক্ষমতার উৎস সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে|

কারাগার নির্মাণ প্রেক্ষিতঅধ্যায়ে কারাগার প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক প্রশাসনিক কারণ বিশ্লেষণ করেছেন| কারাগার কীভাবে একটি শাস্তি বিধায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে, বিনা বিচারে অটক রাখার প্রথা কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অংশে পরিণত এবং কারাগার রাজনীতির সম্পর্ক কীভাবে বিকশিত হয়এইসব বিষয়েরই গভীর আলোচনা করা হয়েছে|

গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে কারা প্রশাসন, করা ব্যবস্থাপনা, কারা শাসন, কারা মহাপরিদর্শকের ভূমিকা, কারাবিধি এবং কারাসংস্কার সম্পর্কিত আলোচনা| দীর্ঘ সময় ধরে কারাগার পরিচালনার নীতিমালা প্রশাসনিক রূপান্তরগুলো ধারবাহিক বিবরণ গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে মূল্যবান|

কারাগার বন্দিজীবনঅংশে বন্দিদের দৈনন্দিন জীবন, নারী বন্দি, কারাগারে মা শিশু, ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং বন্দিদের মানসিক জগতের নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে| লেখক বন্দিজীবনের মানবিক দিকগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন| ফলে কারাগারের ইতিহাস এখানে শুধু প্রাশসিক ইতিহাস হয়ে থাকেনি, বরং মানবজীবনের ইতিহাসেও পরিণত হয়েছে|

প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের বিচারিত নিয়ন্ত্রণ কারাগারের ক্ষমতাঅধ্যায়ে বিচারিত নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক ক্ষমতা এবং বন্দিদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে| এখানে লেখক দেখিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রে আইনের শাসনের আড়ালে কীভাবে প্রাশসিনক ক্ষমতা অনেক সময় বিচারিত জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে অবস্থান করেছে|

গ্রন্থের আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো— ‘উপনিবেশিবাদ, আইন সহিংসতা’| ঔপনিবেশিক সন্ত্রাস, নির্জন কারাবাস, সেল-ব্যবস্থা, শারীরিক মানসিক নির্যাতন এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার নানা রূপ এখানে তথ্য-প্রমাণসহ উপস্থাপিত হয়েছে| লেখক এখানে দেখিয়েছেন কীভাবে কারাগারে জনমনে ভীতি আতঙ্ক সৃষ্টির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে|

ঔপনিবেশিক অবকাঠামো নির্মাণ বন্দিশ্রমঅধ্যায়ে বন্দিদের শ্রম ব্যবহারের ইতিহাস, বহির্মুখী আবাসিক শ্রমব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে বন্দি শ্রমের ভূমিকা বিশ্লেষণ করা হয়েছে| এই অধ্যায়টি লেখকের গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণামূলক অধ্যায়|

গ্রন্থের শেষেদ্বীপান্তর এবং কয়েদি উপনিবেশঅধ্যায়ে বিশেষ মনোযোগ দাবি করে| মরিশাস, প্রণালি অঞ্চল এবং আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে কয়েদি উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, বন্দিদের জীবনসংগ্রাম এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসনের প্রকৃতি এখানে সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে| বিশেষত আন্দামান সংক্রান্ত আলোচনা পাঠককে ঔপনিবেশিক দণ্ডব্যবস্থার এক ভয়াবহ অধ্যায়ে মুখোমুখি দাঁড় করায়|

১০৩টি বিরল আলোকচিত্র এবং আংশিক ছবি রঙিন হওয়াতে গ্রন্থটিকে আরো পরিপূর্ণতা দান করেন| সব মিলিয়েকারাগারে অনুসন্ধানগ্রন্থটি শুধু একটি কারা-ইতিহাস নয়, এটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র, আইন, ক্ষমতা, শাস্তি এবং মানবজীবনের জটিল সম্পর্কের এক বিস্তৃত দলিল| বাংলা ভাষায় কারাব্যবস্থার আদ্যোপান্ত ইতিহাসমূলক গ্রন্থ নেই বলা যায়| তাই কারাব্যবস্থা বিষয়ক গবেষণার জন্য গ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে বলেই আমি মনে করি

কারাগারে অনুসন্ধান| মো. খোসবর আলী| প্রকাশক: পুণ্ড্র প্রকাশন, ঢাকা| প্রকাশকাল: মে ২০২৬| মূল্য: ১৩০০ টাকা|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত