এ পাপ আমার, এ পাপ তোমার
সৈয়দ নূরুল আলম
মিছিলের পর মিছিল—
হাতে ব্যানার, পোস্টার,
স্লোগানের ভিড়ে হঠাৎই
একটি মুখ আলোর মতো জেগে থাকে—
গোলাপি, মায়াময়, নিষ্পাপ এক ফুল|
শোকসভায় বসে,
চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুজলে,
তবু কি সব দুঃখ ভোলা যায়?
ফিরে কি পান বাবা
তাঁর আদরের কন্যাকে?
আর সন্তানহারা মা—
নিঃশব্দ রাতের মতো
বুকে বহন করেন এক অনন্ত শূন্যতা|
এ পাপ আমার,
এ পাপ তোমার|
আমরা কিছুই করতে পারি না—
শুধু অভিনয় করি,
নিজ নিজ বিবেকের সামনে
অন্ধকারের পর্দা টেনে দাঁড়াই|
তারপর ঘরে ফিরে
আমার-তোমার কিশোরী সন্তানের জন্য
জায়নামাজে বসে
কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি
তারা যেন ভালো থাকে,
স্কুল শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরে—
শকুনের তীক্ষ্ণ চোখ ফাঁকি দিয়ে|
ক্রমান্বয়ে শহরজুড়ে
নীরবে জমতে থাকে
আমাদের সকলের অপরাধ|
রাত্রিকালীন সংবাদ
বাবুল আনোয়ার
রাতভর চোখের ভেতর নগ্ন প্রহর
বিষাদ নীল মগ্নতায় ডুবে থাকি
অন্ধ মানুষের মতো পাঠ করি
সময়ের অচল পদ্য যত
দিনশেষে আসে সনাতনী রাত
মাথায় উপর ধ্রুপদী আকাশ
চুপচাপ নির্বিকার শুয়ে থাকে|
বিকেলের রাষ্ট্রনীতি
আনজাম মুনীর
কে প্রথম বলেছিলো
একটা সভ্যতার ছায়া যখন নিজের প্রাচীর ছাপিয়ে নদীর ওপরে গিয়ে পড়ে
তখন কি বুঝতে হয়
সিংহাসনের ভিতরে ইতিমধ্যেই সন্ধ্যা ঢুকে গেছে?
তখন আদালতের পাথরে জমে ওঠে গূঢ়নির্বাক শ্যাওলা
সংবিধানের অক্ষরে উড়ে আসে মরুভূমির ধুলো
কর ব্যবস্থার শস্যভাণ্ডারে ইঁদুরের মতো ঢুকে পড়ে লোভ
আর দূর উপকূলে
জলবায়ুর কালো ঘোড়া কামড়ে ছিঁড়ে খায় মানচিত্রের নোনা প্রান্তর
কোন নগর প্রথম শিখেছিলো
ব্যাংকের সিন্দুক ভরে গেলেও
ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে মুদ্রার কোনো প্রতিচ্ছবি জন্মায় না?
কোন ঋষি বুঝেছিলেন
নদীকে বেঁধে ফেললে ইতিহাসও একদিন শুকিয়ে যায়
আর কোন নাবিক লিখেছিলেন
পররাষ্ট্রনীতি আসলে সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের প্রাচীন সন্ধিচুক্তি?
গণিত তখন নক্ষত্র গোনে
পরিসংখ্যান মৃত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংখ্যা লুকায়
ডাটা সায়েন্স কাঁদে অদৃশ্য সার্ভারের ভিতরে
জীববিজ্ঞান দেখে
অক্সিজেনহীন নগরে গাছেরা ধীরে ধীরে নির্বাসিত হচ্ছে|
বিদ্যালয়ের কালো বোর্ডে
এক শিশু প্রশ্ন লেখে—
‘উন্নয়ন কি শুধু উঁচু সেতুর নাম
নাকি মানুষের ভেঙে যাওয়া ঘুমও তার অন্তর্ভুক্ত?’
দূরে কোনো প্রাচীন বন্দর থেকে
শঙ্খ, আজান, ঘণ্টা, বাউলগান, যুদ্ধের ঢাক
একসঙ্গে ভেসে আসে
আর পৃথিবী
তার দীর্ঘতর ছায়া নিয়ে
ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে হেঁটে যায়
***
চাকচিক্য
মাহফুজা অনন্যা
দূরত্ব এক অনবদ্য চিত্রকর—
সব মুখে এঁকে দেয় নক্ষত্রের প্রসাধন|
নিকটতা এলে—
আলোর গায়ে জমে ওঠে ব্যাকরণের ফাটল;
শব্দরা একে একে
নিজেদের ভিখারিপনা স্বীকার করে
মানুষ তখন খসে পড়া দেয়াললিপি
রঙের চেয়ে চুনের ধুলোই বেশি সত্য|
সৌন্দর্য বরাবরই দূরবীনের ধর্ম;
স্পর্শ কেবল মরীচিকার অন্তর্বাস খুলে ফেলে|
***
বৃষ্টি কিংবা কদমের উপাখ্যান
শাখাওয়াত তানভীর
আমি অ-প্রেমিক!
উপেক্ষার দহনে জলীয় প্রেম পোড়াই;
মেঘের অভিমানে বৃষ্টি তো নামবেই!
তোমার শরীর জুড়ে বৃষ্টির ফোঁটা
প্রণয়ীর ঠোটে চুম্বনের মরুময় তৃষ্ণা;
কামনার উত্তাপে কদম তো ফুটবেই!
আত্রাই
জহির খান
নদী তোমার ঢেউ স্রোতে ভাসে দারুণ সব জল
তুমি বন্ধু আমার আত্রাই
কেবল যেন জারুল মায়ায় জড়িয়ে থাকো...
আত্মার অস্তিত্বে
এখন
এই সব জলের খুব গহিনে প্রেম
পথিক ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে
এমন সব গন্তব্যে
তবু এই বেশ সাঁতারে গোল্লায় যাক জল
গুড় দুধ মধুর প্রতারণা জেনে
আহ কী প্রেম
পকেটভর্তি জলে ভেসে আসে এক অদ্ভুত নদী
কেটে নেয় মানুষের বয়স কাটে প্রেমরোগ...
***
হাহাকার
শাহীনা সোবহান
আগ্নেয় শিলায়
তীব্র বিষাদ
লাভার কষ্ট,
দগ্ধ আনন্দ
মৃতপ্রায় স্রোত|
উত্তপ্ত তরল
বিধ্বংসী অসুর|
প্রস্তর বৃষ্টি
কহে, তোমার দখিনে
হত্যাকাণ্ড, রক্তজবা
ˆতরি, ˆনবদ্যের অর্চনা|
নির্বাপিত প্রহ্লাদ
অসার অস্তিত্ব, সহাবস্থান
পরাভব হৃৎপিণ্ড|
প্রস্তুত হও,
কহে, কথকের নিনাদ
ব্যবিলনের শূন্যে
স্থির উদ্যান|
***
জাদুবাস্তব
বিনয় কর্মকার
পন্নগাঙ্কিত ক্যানভাসে কে বা শোভিত করে আপন নিবাস,
তাহলে কি সকলেই শান্তিদূত?
কেন বেড়ে ওঠে অজগর পথ, রাক্ষুসে হা-মুখ—
সাপে ভয় পাই তবু শিল্পের দায়, ক্যানভাসজুড়ে আঁকি মানুষের মুখ—
ম্যাজিক রিয়েলিজম হিস&-হিস& শব্দ তুলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে...
***
কয়েকটি কবিতা
নকিব মুকশি
যাযাবর
প্রত্যেক মানুষই মাছরাঙা,
নদ-নদীর সহচর,
একদিন নদীরাই বানিয়ে দেয়
তাকে যাযাবর
প্রবাহ
নদী—
ঝর্নার বর্ণমালায় রচিত কবিতা...
পাথর—
জলধারার কমা, সেমিকোলন...
পাখি—
আকাশের মিনিমাল অলংকার...
উড়ান—
নিজের ছায়া পেরোনোর যাত্রা...
পথ-পথিক
পথই মূলত
আকাশকে ছুঁতে পারে,
পথিক কেবল
গন্তব্য
সাপেক্ষতা
গন্তব্য সোজা হলেই
মন্তব্য পাতলা হয়ে যায়
সমুদ্র আছে বলেই
ঈশ্বর মাথা তুলে দাঁড়ায়

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
এ পাপ আমার, এ পাপ তোমার
সৈয়দ নূরুল আলম
মিছিলের পর মিছিল—
হাতে ব্যানার, পোস্টার,
স্লোগানের ভিড়ে হঠাৎই
একটি মুখ আলোর মতো জেগে থাকে—
গোলাপি, মায়াময়, নিষ্পাপ এক ফুল|
শোকসভায় বসে,
চোখ ভিজে ওঠে অশ্রুজলে,
তবু কি সব দুঃখ ভোলা যায়?
ফিরে কি পান বাবা
তাঁর আদরের কন্যাকে?
আর সন্তানহারা মা—
নিঃশব্দ রাতের মতো
বুকে বহন করেন এক অনন্ত শূন্যতা|
এ পাপ আমার,
এ পাপ তোমার|
আমরা কিছুই করতে পারি না—
শুধু অভিনয় করি,
নিজ নিজ বিবেকের সামনে
অন্ধকারের পর্দা টেনে দাঁড়াই|
তারপর ঘরে ফিরে
আমার-তোমার কিশোরী সন্তানের জন্য
জায়নামাজে বসে
কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি
তারা যেন ভালো থাকে,
স্কুল শেষে নিরাপদে ঘরে ফেরে—
শকুনের তীক্ষ্ণ চোখ ফাঁকি দিয়ে|
ক্রমান্বয়ে শহরজুড়ে
নীরবে জমতে থাকে
আমাদের সকলের অপরাধ|
রাত্রিকালীন সংবাদ
বাবুল আনোয়ার
রাতভর চোখের ভেতর নগ্ন প্রহর
বিষাদ নীল মগ্নতায় ডুবে থাকি
অন্ধ মানুষের মতো পাঠ করি
সময়ের অচল পদ্য যত
দিনশেষে আসে সনাতনী রাত
মাথায় উপর ধ্রুপদী আকাশ
চুপচাপ নির্বিকার শুয়ে থাকে|
বিকেলের রাষ্ট্রনীতি
আনজাম মুনীর
কে প্রথম বলেছিলো
একটা সভ্যতার ছায়া যখন নিজের প্রাচীর ছাপিয়ে নদীর ওপরে গিয়ে পড়ে
তখন কি বুঝতে হয়
সিংহাসনের ভিতরে ইতিমধ্যেই সন্ধ্যা ঢুকে গেছে?
তখন আদালতের পাথরে জমে ওঠে গূঢ়নির্বাক শ্যাওলা
সংবিধানের অক্ষরে উড়ে আসে মরুভূমির ধুলো
কর ব্যবস্থার শস্যভাণ্ডারে ইঁদুরের মতো ঢুকে পড়ে লোভ
আর দূর উপকূলে
জলবায়ুর কালো ঘোড়া কামড়ে ছিঁড়ে খায় মানচিত্রের নোনা প্রান্তর
কোন নগর প্রথম শিখেছিলো
ব্যাংকের সিন্দুক ভরে গেলেও
ক্ষুধার্ত শিশুর চোখে মুদ্রার কোনো প্রতিচ্ছবি জন্মায় না?
কোন ঋষি বুঝেছিলেন
নদীকে বেঁধে ফেললে ইতিহাসও একদিন শুকিয়ে যায়
আর কোন নাবিক লিখেছিলেন
পররাষ্ট্রনীতি আসলে সমুদ্রের সঙ্গে মানুষের প্রাচীন সন্ধিচুক্তি?
গণিত তখন নক্ষত্র গোনে
পরিসংখ্যান মৃত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সংখ্যা লুকায়
ডাটা সায়েন্স কাঁদে অদৃশ্য সার্ভারের ভিতরে
জীববিজ্ঞান দেখে
অক্সিজেনহীন নগরে গাছেরা ধীরে ধীরে নির্বাসিত হচ্ছে|
বিদ্যালয়ের কালো বোর্ডে
এক শিশু প্রশ্ন লেখে—
‘উন্নয়ন কি শুধু উঁচু সেতুর নাম
নাকি মানুষের ভেঙে যাওয়া ঘুমও তার অন্তর্ভুক্ত?’
দূরে কোনো প্রাচীন বন্দর থেকে
শঙ্খ, আজান, ঘণ্টা, বাউলগান, যুদ্ধের ঢাক
একসঙ্গে ভেসে আসে
আর পৃথিবী
তার দীর্ঘতর ছায়া নিয়ে
ধীরে ধীরে বিকেলের দিকে হেঁটে যায়
***
চাকচিক্য
মাহফুজা অনন্যা
দূরত্ব এক অনবদ্য চিত্রকর—
সব মুখে এঁকে দেয় নক্ষত্রের প্রসাধন|
নিকটতা এলে—
আলোর গায়ে জমে ওঠে ব্যাকরণের ফাটল;
শব্দরা একে একে
নিজেদের ভিখারিপনা স্বীকার করে
মানুষ তখন খসে পড়া দেয়াললিপি
রঙের চেয়ে চুনের ধুলোই বেশি সত্য|
সৌন্দর্য বরাবরই দূরবীনের ধর্ম;
স্পর্শ কেবল মরীচিকার অন্তর্বাস খুলে ফেলে|
***
বৃষ্টি কিংবা কদমের উপাখ্যান
শাখাওয়াত তানভীর
আমি অ-প্রেমিক!
উপেক্ষার দহনে জলীয় প্রেম পোড়াই;
মেঘের অভিমানে বৃষ্টি তো নামবেই!
তোমার শরীর জুড়ে বৃষ্টির ফোঁটা
প্রণয়ীর ঠোটে চুম্বনের মরুময় তৃষ্ণা;
কামনার উত্তাপে কদম তো ফুটবেই!
আত্রাই
জহির খান
নদী তোমার ঢেউ স্রোতে ভাসে দারুণ সব জল
তুমি বন্ধু আমার আত্রাই
কেবল যেন জারুল মায়ায় জড়িয়ে থাকো...
আত্মার অস্তিত্বে
এখন
এই সব জলের খুব গহিনে প্রেম
পথিক ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে
এমন সব গন্তব্যে
তবু এই বেশ সাঁতারে গোল্লায় যাক জল
গুড় দুধ মধুর প্রতারণা জেনে
আহ কী প্রেম
পকেটভর্তি জলে ভেসে আসে এক অদ্ভুত নদী
কেটে নেয় মানুষের বয়স কাটে প্রেমরোগ...
***
হাহাকার
শাহীনা সোবহান
আগ্নেয় শিলায়
তীব্র বিষাদ
লাভার কষ্ট,
দগ্ধ আনন্দ
মৃতপ্রায় স্রোত|
উত্তপ্ত তরল
বিধ্বংসী অসুর|
প্রস্তর বৃষ্টি
কহে, তোমার দখিনে
হত্যাকাণ্ড, রক্তজবা
ˆতরি, ˆনবদ্যের অর্চনা|
নির্বাপিত প্রহ্লাদ
অসার অস্তিত্ব, সহাবস্থান
পরাভব হৃৎপিণ্ড|
প্রস্তুত হও,
কহে, কথকের নিনাদ
ব্যবিলনের শূন্যে
স্থির উদ্যান|
***
জাদুবাস্তব
বিনয় কর্মকার
পন্নগাঙ্কিত ক্যানভাসে কে বা শোভিত করে আপন নিবাস,
তাহলে কি সকলেই শান্তিদূত?
কেন বেড়ে ওঠে অজগর পথ, রাক্ষুসে হা-মুখ—
সাপে ভয় পাই তবু শিল্পের দায়, ক্যানভাসজুড়ে আঁকি মানুষের মুখ—
ম্যাজিক রিয়েলিজম হিস&-হিস& শব্দ তুলে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে...
***
কয়েকটি কবিতা
নকিব মুকশি
যাযাবর
প্রত্যেক মানুষই মাছরাঙা,
নদ-নদীর সহচর,
একদিন নদীরাই বানিয়ে দেয়
তাকে যাযাবর
প্রবাহ
নদী—
ঝর্নার বর্ণমালায় রচিত কবিতা...
পাথর—
জলধারার কমা, সেমিকোলন...
পাখি—
আকাশের মিনিমাল অলংকার...
উড়ান—
নিজের ছায়া পেরোনোর যাত্রা...
পথ-পথিক
পথই মূলত
আকাশকে ছুঁতে পারে,
পথিক কেবল
গন্তব্য
সাপেক্ষতা
গন্তব্য সোজা হলেই
মন্তব্য পাতলা হয়ে যায়
সমুদ্র আছে বলেই
ঈশ্বর মাথা তুলে দাঁড়ায়

আপনার মতামত লিখুন