(পূর্ব প্রকাশের পর)
এগারো.
ডা. জাহিদের সঙ্গে আনিস তার মা’র বিষয়ে বেশিক্ষণ আলাপ করতে পারেনি| ডাক্তারখানায় আজ রোগীর বেশ ভিড় ছিল| রাতে সে আরও বিস্তারিত ফোনে আলাপ করবে বলে ডা. জাহিদের চেম্বার থেকে বের হয়ে এল|
ডা. জাহিদের চেম্বার থেকে থানা খুব বেশি দূরে নয়| হাঁটার পথ| আনিস সরাসরি থানায় চলে এলে| থানায় ঢুকে দিঘল বারান্দায় পুলিশের এক সদস্য পেয়ে গেল| সে বারান্দার একপাশে একটা মোটা পিলারে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে| কাঁধে রাইফেল|
আনিস ডাকল, ‘শোনেন|’
পুলিশের সেই সদস্য শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে বলল, ‘জি, বলুন|’
আনিস নেমট্যাগে দেখল, পুলিশের সেই সদস্যের নাম— আমিনুল ইসলাম| সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের সাব-ইন্সপেক্টর জুনায়েদ আহমেদ সাহেব আছেন?’
পুলিশ সদস্য আমিনুল ইসলাম বলল, ‘না, স্যার তো নাই|’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘তিনি কোথায়?’
পুলিশ সদস্য বলল, ‘স্যার একটা কেস নিয়ে দূরে গেছেন|’
‘কখন ফিরবেন?’
‘জানি না| ঘণ্টাখানেক আগে বের হয়েছেন| ফিরতে তো দেরি হবেই|’
‘তাহলে তো সমস্যা|’
‘কী সমস্যা?’
‘আমি একজনের সাথে দেখা করতে এসেছি| আপনাদের থানায় হাজতে আছে|’
‘তার কী নাম?’
‘মনসুর আলী| পরশুদিন আঁধারিয়া গ্রাম থেকে তাকে ধরে নিয়ে এসেছে| জুনায়েদ আহমেদ সাহেব গিয়েছিলেন|’
‘ও, সেই পাগলাটার কথা বলছেন? দুই দিন ধরে খুব বিরক্ত করছে| তার অত্যাচারে আমরা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি| উল্টো করে পিটিয়েও লাভ হয়নি|’
আনিস আঁতকে উঠে বলল, ‘ওহো, বলেন কী! উল্টো করে পিটিয়েছেন?’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম বলল, ‘হ্যাঁ| আসামি সে| উল্টো করে পিটাতেই হবে| এছাড়া উপায় ছিল না|’
‘কেন, কী করেছে?’
‘হাজতে আরও দুইজন আসামি ছিল| তার জন্য সরিয়ে নিতে হয়েছে| আচ্ছা, বাদ দিন সে কথা| আপনি তার কী হন?
‘কার, মনসুর আলীর?
আমিনুল ইসলাম কিছুটা বিরক্তির চেহারা করে বলল, ‘জি|’
আনিস বলল, ‘আমরা একই গ্রামের|’
‘আপনি কি তদ্বির করতে এসেছেন?’
‘না, ওসব কিছু না| আমি শুধু তার সঙ্গে দেখা করব|’
‘তাহলে আপনাকে ওসি স্যারের পারমিশন নিতে হবে|’
‘ঠিক আছে| ওসি সাহেব কি থানায় আছেন?’
‘জি, আছেন|’
‘আমি কি পারমিশন নিতে সরাসরি তার রুমে চলে যাব?’
‘না| আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন| ভেতরে গিয়েও বসতে পারেন| আমি আগে ওসি স্যারের সাথে কথা বলে নিই|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘জি, আচ্ছা|’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেল| জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’
আনিস বলল, ‘আমার নাম আনিসুল হক ভুঁইয়া|’
‘হুম, আচ্ছা|’ —বলেই পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুমের দিকে চলে গেল| বারান্দার শেষ মাথায় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুম|
আনিস বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল| পাশেই একটা লম্বা বেঞ্চি আছে| সে সেখানটায় বসল না| সে বারান্দা থেকেই একটা দরজা গলে থানার ভেতরটা দেখল| থানার ভেতরটা বেশ এলোমেলো| পুরোনো টেবিল, পুরোনো চেয়ার ও পুরোনো ফাইল রাখার তাক| এমনকি মাথার ওপর ফ্যানগুলোও পুরোনো| ফ্যানগুলো কটকট শব্দ তুলে চলছে| দু’জন পুলিশ সদস্য একটা দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক একটা টেবিলে মাথা গুঁজে কী একটা ফাইল দেখছে| তার কোনোদিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই| কিছু ইউনিফর্ম দেয়ালের হুঁকে এলোমেলোভাবে টানিয়ে রাখা|
আনিস বারান্দার যে স্থানটায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানটায় ছায়ার আধিক্য বেশি| তারপরও একধরনের ভ্যাপসা গরম তাকে স্পর্শ করে থমকে আছে| একটুও বাতাস নেই| মনে হচ্ছে আজ যে কোনো সময় বৃষ্টি হবে| আনিস ঘামছে| সে বেঞ্চিটায় বসবে কি না ভাবল| পরক্ষণ তার বসতে ইচ্ছে হলো না| সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থানার আশপাশ দেখতে থাকল| এমনিই| থানার সামনের রাস্তাটা বেশ দীর্ঘ| খানিকটা দূরে একটা খেলার মাঠ| মাঠের পর পুরোনো দোতলা একটা স্কুল| এখান থেকে বের হয়ে তাকে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে| নৌকাঘাট এখান থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে, উপজেলা সদরের দক্ষিণপাশে| তার নৌকাটা সেখানে বাঁধা| বশির নৌকায় বসে আছে| আজকাল ঘাট থেকে নৌকা যেভাবে চুরি হয়!
সাধারণত আনিস উপজেলা সদরে এলে বেশ হাঁটে| কিন্তু আজ সে থানা থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিবে| বাইরে যা রোদ উঠেছে! মধ্যদুপুরের রোদ| আকাশ থেকে রোদ যেন গলে গলে পড়ছে| এছাড়া তার মা’র শরীর সত্যি খুব খারাপ| তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে| কয়েকদিন ধরেই মা শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামায় খুব কষ্ট পাচ্ছে| গতরাতে কুমিল্লা থেকে বাড়ি ফিরে যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল| প্রতিবার শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে হেঁচকি উঠছিল|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুম থেকে বের হয়ে এল| আনিসের কাছে এসে বলল, ‘ওসি স্যার এখন একটা ফোনে ব্যস্ত| কুমিল্লা পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে ফোন এসেছে| স্যার আপনাকে হাজতে আসামির সাথে দেখা করতে বলেছেন| তবে যাবার আগে যেন স্যারের সাথে দেখা করে যান|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, অসুবিধা নেই| আমি অবশ্যই দেখা করে যাব| আপনি কি আমাকে হাজতের সামনে নিয়ে যেতে পারবেন?’
আমিনুল ইসলাম জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আগে কখনও এই থানায় আসেননি?’
আনিস বলল, ‘এসেছি| তবে হাজতে কারও সাথে দেখা করতে নয়, অন্য কাজে|’
আমিনুল ইসলাম হাসল| বলল, ‘চলুন|’
বাইরে যে এমন কাঠফাটা রোদ, হাজতের সামনে এসে একদম বোঝা যাচ্ছে না| হাজতের পরিবেশটা একদম অন্ধকার না হলেও কেমন নীলাভ আবছা-অন্ধকার জমে আছে| হয়তো হাজতের দেয়াল নীল রঙের বলে এমনটা মনে হচ্ছে| অথচ হাজতের সামনে থেকে একটু মোড় ঘুরতেই একটা বাতি জ্বলছে| একটা ফ্যান চলছে শব্দ করে— কট কট, কট কট, কট কট|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম আনিসকে হাজতের সামনে রেখে বলল, ‘আমি যাই| সামনে আমার কাজ আছে|’
আনিস বলল, ‘জি, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ|’
আমিনুল ইসলাম যেতে যেতে বলল, ‘আপনাকেও ধন্যবাদ| একটা কথা, আপনি কিন্তু অবশ্যই ওসি স্যারের সাথে দেখা করে যাবেন|’
আনিস বলল, ‘অবশ্যই| আমি আমার প্রয়োজনেই দেখা করব|’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম চলে গেল| কিন্তু সে বেশিদূর গেল না| সামান্য দূরে অন্য আরেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আলাপ শুরু করল| আনিস তাদের দিকে এক নজর তাকিয়ে হাজতের ভেতর আবার দৃষ্টি ফেলল| সে ভালো করে ঠাহর করতেই দেখল, একজন মানুষ হাজতের পুব-দক্ষিণ কোণে হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে বসে আছে| চেহারাটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না| মনে হচ্ছে সে ঘুমোচ্ছে|
হাজতের ভেতর সেই মানুষটা বাদে দ্বিতীয় আর কেউ নেই| আনিস বুঝল, মানুষটা মনসুর পাগলা| এছাড়া মানুষটার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি| সে আস্তে করে ডাকল, ‘পাগলা|’
মানুষটার কোনো সাড়াশব্দ নেই|
আনিস আবার ডাকল, ‘পাগলা, আমি আনিস|’
মানুষটা এবারও কোনো সাড়াশব্দ করছে না|
আনিস ধন্ধে পড়ে গেল| ভাবল, বসে থাকা মানুষটা মনসুর পাগলাই তো, নাকি অন্য কেউ? তাহলে সাড়া দিচ্ছে না কেন? সে এদিকওদিক তাকাল| ঠিক তখনই পুলিশের এক সদস্য আমিনুল ইসলাম আবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী, সাড়া দিচ্ছে না?’
আনিস একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘না, কোনো সাড়া দিচ্ছে না|’
আমিনুল ইসলাম বলল, ‘আজ সকাল থেকেই সে এমন ঝিম মেরে আছে| সকালে নাস্তাটা পর্যন্ত খায় নাই| দাঁড়ান, আমি লাঠি নিয়ে আসি|’
আনিস তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘কী, আপনি কি তাকে পেটাবেন?’
আমিনুল ইসলাম হেসে বলল, ‘না, তাকে এখন কেন পেটাব? আমার মনে হচ্ছে, সে হাঁটুতে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে| আমি হাজতের এই শিকগুলোতে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারব| সে উঠে যাবে|’
আনিস কিছু বলল না|
আমিনুল ইসলাম একটা লাঠি এনে হাজতের শিকগুলোতে কয়েকবার বাড়ি মারল| মানুষটা চোখ তুলে তাকাল|
আনিস দেখল, মানুষটা মনসুর পাগলাই|
আমিনুল ইসলাম বলল, ‘বলছিলাম না, ভড়ং, ঝিম মেরে আছে|’ বলেই সে হাজতের সামনে থেকে চলে গেল|
আনিস মনসুর পাগলার দিকে ভালো করে তাকাল|
মনসুর পাগলা বসা থেকেই কয়েক মুহূর্ত আনিসের দিকে তাকিয়ে রইল| তারপর সে ধীর ভঙ্গিতে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল| যতটুকু ধীর ভঙ্গিতে সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল, এরচেয়ে আরও ধীরভাবে সে আনিসের দিকে এগিয়ে এল| হাজতের শিক ধরে নির্ভরতা নিয়ে দাঁড়াল|
আনিস দেখল, মনসুর পাগলার মুখ বেশ ফোলা| গলার কাছে আঁচড়ের দাগ| পরনের পাঞ্জাবিটা স্থানে স্থানে ছেঁড়া| চোখগুলো লাল|
আনিস একটু থমকে গেল| নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছিস, পাগলা?’
মনসুর পাগলা কিছু না বলে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল| এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত, তিন মুহূর্ত, তারপর সে কেঁদে উঠল| বাচ্চাদের মতো কান্না— ইঁ ইঁ ইঁ, ইঁ ইঁ ইঁ| কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করল|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম আবার এগিয়ে এল| কিন্তু এসেই কী ভেবে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল|
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কাঁদছিস কেন, পাগলা?’
মনসুর পাগলা কান্না একটু সামলে হেঁচকি তোলার গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কাইল তুমি আসো নাই ক্যান?’
আনিস বলল, ‘পাগলা, তুই জানিস না, গতকাল মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব? মাকে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখাব?’
‘জানি| আমি মনে করছিলাম তুমি পরশুদিন পুলিশের নৌকার লগে লগে আইবা| তুমি আসো নাই|’
‘আরে পাগল, তোকে কী বোঝাব! আচ্ছা, বাদ দে| আজকে তো এসেছি| শুধু তোর জন্যই এসেছি|
‘ভালা করছ| এখান থাইকা আমারে লইয়া যাও| হেরা আমারে খালি মারে|’
আনিস জানে পুলিশ মনসুর পাগলাকে মেরেছে| তারপরও জিজ্ঞেস করল, ‘কে মারে?’
‘পুলিশ| কাইল রাইতে আমারে পা দুইডা উল্টাইয়া টানাইয়া এমুন পিডান পিডাইছে আমি পেচ্ছাব কইরা দিছি| এই দেখো, আমার পিঠ, শরীল, কোমর পিডাইয়া লাল কইরা ফেলাইছে|’ বলেই মনসুর পাগলা তার গায়ের পাঞ্জাবিটা তুলে পিঠ দেখাতে শুরু করল|
আনিস দেখল, মনসুর পাগলার পিঠে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাটবাঁধা থোকা থোকা লাল দাগ| গায়ের সাদা পাঞ্জাবিতেও রক্তের দাগ|
আনিস কী বলবে বুঝতে পারল না| তবুও সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোকে ক্যান মেরেছে?’
মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি নাকি আমার বউরে গাঙে চুবাইয়া মারছি|’
‘আমি তো জানি, তুই মারিস নাই|’
‘হ হ, তুমি ঠিক কইছ| আমি সেতারারে মারি নাই|’
‘তুই কি পুলিশের কাছে কোনো কথা স্বীকার করেছিস?’
‘কী কথা স্বীকার করমু?’
‘ওই তো, পুলিশের মার খেয়ে অনেক ভুল কথাও স্বীকার করে ফেলে| তুই তো বলিসনি যে, তোর বউকে তুই মেরেছিস?’
মনসুর পাগলা চোখ ছোট করে বলল, ‘আনিস, তুমি এইডা কী কও? আমি ক্যান স্বীকার করমু? আমি কি আমার বউরে মারছি? আমি কোনো অন্যায় করি নাই|’
আনিস বলল, ‘আমি ওটাই বোঝাতে চেয়েছি| তুই কোনো অন্যায় করিসনি| তাহলে তোর আর চিন্তা কী?’
‘তাইলে আমারে পিডাইল ক্যান?’
‘সেটা আমি ওসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করব| আমি একটু পরই ওসি সাহেবের সাথে বসব|’
‘ও, তুমি ওসি সাবের লগে বসবা? ভালা ভালা| তুমি ওসি সাবরে কইবা, আমি আমার বউরে মারি নাই| হেয় নৌকা উল্টাইয়া পানিত ডুইবা মরছে|’
আনিস সায় দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘তুমি ওসি সাবরে আরও কইবা, তাইনে আমারে যেন ছাইড়া দেয়| তুমি তারে কইয়া এখান থাইকা আমারে অখনই লইয়া যাইবা| আমার এখানে দম বন্ধ হইয়া আইতাছে|’
আনিস সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘পাগলা, আমি ওসি সাহেবকে বললেই কি তিনি তোরে এখান থেকে ছাড়বে? আইনকানুন আছে না? তোরে আদালতে তুলবে| আমি বড় উকিল ধরব| আদালত থেকে তোকে জামিন করাবো|’
‘হেইডা কতদিন লাগবে?’
‘লাগবে তো পাঁচ-ছয়দিন| এক সপ্তাহও লাগতে পারে|’
‘কও কী, কও কী, আনিস? হেরা আমারে এতদিনে পিডাইয়া মাইরা ফেলাইব|’
‘আমি ওসি সাহেবকে অনুরোধ করব| এখানকার কেউ তোর গায়ে একটা ফুলের টোকাও যেন না দেয়|
মনসুর পাগলা আনিসের হাত মুঠো করে ধরে বলল, ‘তুমি হেইডা কইবা! ওসি সাবরে হেইডা কইবা! আমার ভালা লাগতাছে, আনিস| আমার ভালা লাগতাছে|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে আবেগের সুরে বলল, ‘অবশ্যই বলবো, পাগলা| অবশ্যই|’ ক্রমশ...

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬
(পূর্ব প্রকাশের পর)
এগারো.
ডা. জাহিদের সঙ্গে আনিস তার মা’র বিষয়ে বেশিক্ষণ আলাপ করতে পারেনি| ডাক্তারখানায় আজ রোগীর বেশ ভিড় ছিল| রাতে সে আরও বিস্তারিত ফোনে আলাপ করবে বলে ডা. জাহিদের চেম্বার থেকে বের হয়ে এল|
ডা. জাহিদের চেম্বার থেকে থানা খুব বেশি দূরে নয়| হাঁটার পথ| আনিস সরাসরি থানায় চলে এলে| থানায় ঢুকে দিঘল বারান্দায় পুলিশের এক সদস্য পেয়ে গেল| সে বারান্দার একপাশে একটা মোটা পিলারে হেলান দিয়ে সিগারেট টানছে| কাঁধে রাইফেল|
আনিস ডাকল, ‘শোনেন|’
পুলিশের সেই সদস্য শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা ফেলে বলল, ‘জি, বলুন|’
আনিস নেমট্যাগে দেখল, পুলিশের সেই সদস্যের নাম— আমিনুল ইসলাম| সে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনাদের সাব-ইন্সপেক্টর জুনায়েদ আহমেদ সাহেব আছেন?’
পুলিশ সদস্য আমিনুল ইসলাম বলল, ‘না, স্যার তো নাই|’
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘তিনি কোথায়?’
পুলিশ সদস্য বলল, ‘স্যার একটা কেস নিয়ে দূরে গেছেন|’
‘কখন ফিরবেন?’
‘জানি না| ঘণ্টাখানেক আগে বের হয়েছেন| ফিরতে তো দেরি হবেই|’
‘তাহলে তো সমস্যা|’
‘কী সমস্যা?’
‘আমি একজনের সাথে দেখা করতে এসেছি| আপনাদের থানায় হাজতে আছে|’
‘তার কী নাম?’
‘মনসুর আলী| পরশুদিন আঁধারিয়া গ্রাম থেকে তাকে ধরে নিয়ে এসেছে| জুনায়েদ আহমেদ সাহেব গিয়েছিলেন|’
‘ও, সেই পাগলাটার কথা বলছেন? দুই দিন ধরে খুব বিরক্ত করছে| তার অত্যাচারে আমরা একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে গেছি| উল্টো করে পিটিয়েও লাভ হয়নি|’
আনিস আঁতকে উঠে বলল, ‘ওহো, বলেন কী! উল্টো করে পিটিয়েছেন?’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম বলল, ‘হ্যাঁ| আসামি সে| উল্টো করে পিটাতেই হবে| এছাড়া উপায় ছিল না|’
‘কেন, কী করেছে?’
‘হাজতে আরও দুইজন আসামি ছিল| তার জন্য সরিয়ে নিতে হয়েছে| আচ্ছা, বাদ দিন সে কথা| আপনি তার কী হন?
‘কার, মনসুর আলীর?
আমিনুল ইসলাম কিছুটা বিরক্তির চেহারা করে বলল, ‘জি|’
আনিস বলল, ‘আমরা একই গ্রামের|’
‘আপনি কি তদ্বির করতে এসেছেন?’
‘না, ওসব কিছু না| আমি শুধু তার সঙ্গে দেখা করব|’
‘তাহলে আপনাকে ওসি স্যারের পারমিশন নিতে হবে|’
‘ঠিক আছে| ওসি সাহেব কি থানায় আছেন?’
‘জি, আছেন|’
‘আমি কি পারমিশন নিতে সরাসরি তার রুমে চলে যাব?’
‘না| আপনি এখানে একটু অপেক্ষা করুন| ভেতরে গিয়েও বসতে পারেন| আমি আগে ওসি স্যারের সাথে কথা বলে নিই|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘জি, আচ্ছা|’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম পা বাড়াতে গিয়ে থেমে গেল| জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম?’
আনিস বলল, ‘আমার নাম আনিসুল হক ভুঁইয়া|’
‘হুম, আচ্ছা|’ —বলেই পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুমের দিকে চলে গেল| বারান্দার শেষ মাথায় পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুম|
আনিস বারান্দায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল| পাশেই একটা লম্বা বেঞ্চি আছে| সে সেখানটায় বসল না| সে বারান্দা থেকেই একটা দরজা গলে থানার ভেতরটা দেখল| থানার ভেতরটা বেশ এলোমেলো| পুরোনো টেবিল, পুরোনো চেয়ার ও পুরোনো ফাইল রাখার তাক| এমনকি মাথার ওপর ফ্যানগুলোও পুরোনো| ফ্যানগুলো কটকট শব্দ তুলে চলছে| দু’জন পুলিশ সদস্য একটা দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে| পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক একটা টেবিলে মাথা গুঁজে কী একটা ফাইল দেখছে| তার কোনোদিকে তাকানোর ফুরসৎ নেই| কিছু ইউনিফর্ম দেয়ালের হুঁকে এলোমেলোভাবে টানিয়ে রাখা|
আনিস বারান্দার যে স্থানটায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানটায় ছায়ার আধিক্য বেশি| তারপরও একধরনের ভ্যাপসা গরম তাকে স্পর্শ করে থমকে আছে| একটুও বাতাস নেই| মনে হচ্ছে আজ যে কোনো সময় বৃষ্টি হবে| আনিস ঘামছে| সে বেঞ্চিটায় বসবে কি না ভাবল| পরক্ষণ তার বসতে ইচ্ছে হলো না| সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থানার আশপাশ দেখতে থাকল| এমনিই| থানার সামনের রাস্তাটা বেশ দীর্ঘ| খানিকটা দূরে একটা খেলার মাঠ| মাঠের পর পুরোনো দোতলা একটা স্কুল| এখান থেকে বের হয়ে তাকে অনেকটা পথ হাঁটতে হবে| নৌকাঘাট এখান থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে, উপজেলা সদরের দক্ষিণপাশে| তার নৌকাটা সেখানে বাঁধা| বশির নৌকায় বসে আছে| আজকাল ঘাট থেকে নৌকা যেভাবে চুরি হয়!
সাধারণত আনিস উপজেলা সদরে এলে বেশ হাঁটে| কিন্তু আজ সে থানা থেকে বের হয়ে একটা রিকশা নিবে| বাইরে যা রোদ উঠেছে! মধ্যদুপুরের রোদ| আকাশ থেকে রোদ যেন গলে গলে পড়ছে| এছাড়া তার মা’র শরীর সত্যি খুব খারাপ| তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে| কয়েকদিন ধরেই মা শ্বাসপ্রশ্বাসের ওঠানামায় খুব কষ্ট পাচ্ছে| গতরাতে কুমিল্লা থেকে বাড়ি ফিরে যায়-যায় অবস্থা হয়েছিল| প্রতিবার শ্বাসপ্রশ্বাস ফেলার সঙ্গে সঙ্গে হেঁচকি উঠছিল|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার রুম থেকে বের হয়ে এল| আনিসের কাছে এসে বলল, ‘ওসি স্যার এখন একটা ফোনে ব্যস্ত| কুমিল্লা পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে ফোন এসেছে| স্যার আপনাকে হাজতে আসামির সাথে দেখা করতে বলেছেন| তবে যাবার আগে যেন স্যারের সাথে দেখা করে যান|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, অসুবিধা নেই| আমি অবশ্যই দেখা করে যাব| আপনি কি আমাকে হাজতের সামনে নিয়ে যেতে পারবেন?’
আমিনুল ইসলাম জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি আগে কখনও এই থানায় আসেননি?’
আনিস বলল, ‘এসেছি| তবে হাজতে কারও সাথে দেখা করতে নয়, অন্য কাজে|’
আমিনুল ইসলাম হাসল| বলল, ‘চলুন|’
বাইরে যে এমন কাঠফাটা রোদ, হাজতের সামনে এসে একদম বোঝা যাচ্ছে না| হাজতের পরিবেশটা একদম অন্ধকার না হলেও কেমন নীলাভ আবছা-অন্ধকার জমে আছে| হয়তো হাজতের দেয়াল নীল রঙের বলে এমনটা মনে হচ্ছে| অথচ হাজতের সামনে থেকে একটু মোড় ঘুরতেই একটা বাতি জ্বলছে| একটা ফ্যান চলছে শব্দ করে— কট কট, কট কট, কট কট|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম আনিসকে হাজতের সামনে রেখে বলল, ‘আমি যাই| সামনে আমার কাজ আছে|’
আনিস বলল, ‘জি, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ|’
আমিনুল ইসলাম যেতে যেতে বলল, ‘আপনাকেও ধন্যবাদ| একটা কথা, আপনি কিন্তু অবশ্যই ওসি স্যারের সাথে দেখা করে যাবেন|’
আনিস বলল, ‘অবশ্যই| আমি আমার প্রয়োজনেই দেখা করব|’
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম চলে গেল| কিন্তু সে বেশিদূর গেল না| সামান্য দূরে অন্য আরেক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে আলাপ শুরু করল| আনিস তাদের দিকে এক নজর তাকিয়ে হাজতের ভেতর আবার দৃষ্টি ফেলল| সে ভালো করে ঠাহর করতেই দেখল, একজন মানুষ হাজতের পুব-দক্ষিণ কোণে হাঁটুর ওপর মুখ গুঁজে বসে আছে| চেহারাটা ঠিক দেখা যাচ্ছে না| মনে হচ্ছে সে ঘুমোচ্ছে|
হাজতের ভেতর সেই মানুষটা বাদে দ্বিতীয় আর কেউ নেই| আনিস বুঝল, মানুষটা মনসুর পাগলা| এছাড়া মানুষটার গায়ে সাদা পাঞ্জাবি| সে আস্তে করে ডাকল, ‘পাগলা|’
মানুষটার কোনো সাড়াশব্দ নেই|
আনিস আবার ডাকল, ‘পাগলা, আমি আনিস|’
মানুষটা এবারও কোনো সাড়াশব্দ করছে না|
আনিস ধন্ধে পড়ে গেল| ভাবল, বসে থাকা মানুষটা মনসুর পাগলাই তো, নাকি অন্য কেউ? তাহলে সাড়া দিচ্ছে না কেন? সে এদিকওদিক তাকাল| ঠিক তখনই পুলিশের এক সদস্য আমিনুল ইসলাম আবার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘কী, সাড়া দিচ্ছে না?’
আনিস একটু দ্বিধা নিয়ে বলল, ‘না, কোনো সাড়া দিচ্ছে না|’
আমিনুল ইসলাম বলল, ‘আজ সকাল থেকেই সে এমন ঝিম মেরে আছে| সকালে নাস্তাটা পর্যন্ত খায় নাই| দাঁড়ান, আমি লাঠি নিয়ে আসি|’
আনিস তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘কী, আপনি কি তাকে পেটাবেন?’
আমিনুল ইসলাম হেসে বলল, ‘না, তাকে এখন কেন পেটাব? আমার মনে হচ্ছে, সে হাঁটুতে মাথা দিয়ে ঘুমাচ্ছে| আমি হাজতের এই শিকগুলোতে লাঠি দিয়ে বাড়ি মারব| সে উঠে যাবে|’
আনিস কিছু বলল না|
আমিনুল ইসলাম একটা লাঠি এনে হাজতের শিকগুলোতে কয়েকবার বাড়ি মারল| মানুষটা চোখ তুলে তাকাল|
আনিস দেখল, মানুষটা মনসুর পাগলাই|
আমিনুল ইসলাম বলল, ‘বলছিলাম না, ভড়ং, ঝিম মেরে আছে|’ বলেই সে হাজতের সামনে থেকে চলে গেল|
আনিস মনসুর পাগলার দিকে ভালো করে তাকাল|
মনসুর পাগলা বসা থেকেই কয়েক মুহূর্ত আনিসের দিকে তাকিয়ে রইল| তারপর সে ধীর ভঙ্গিতে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল| যতটুকু ধীর ভঙ্গিতে সে বসা থেকে উঠে দাঁড়াল, এরচেয়ে আরও ধীরভাবে সে আনিসের দিকে এগিয়ে এল| হাজতের শিক ধরে নির্ভরতা নিয়ে দাঁড়াল|
আনিস দেখল, মনসুর পাগলার মুখ বেশ ফোলা| গলার কাছে আঁচড়ের দাগ| পরনের পাঞ্জাবিটা স্থানে স্থানে ছেঁড়া| চোখগুলো লাল|
আনিস একটু থমকে গেল| নিজেকে একটু সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছিস, পাগলা?’
মনসুর পাগলা কিছু না বলে ফ্যাল ফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল| এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত, তিন মুহূর্ত, তারপর সে কেঁদে উঠল| বাচ্চাদের মতো কান্না— ইঁ ইঁ ইঁ, ইঁ ইঁ ইঁ| কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করল|
পুলিশের সদস্য আমিনুল ইসলাম আবার এগিয়ে এল| কিন্তু এসেই কী ভেবে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল|
আনিস জিজ্ঞেস করল, ‘তুই কাঁদছিস কেন, পাগলা?’
মনসুর পাগলা কান্না একটু সামলে হেঁচকি তোলার গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কাইল তুমি আসো নাই ক্যান?’
আনিস বলল, ‘পাগলা, তুই জানিস না, গতকাল মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাব? মাকে কুমিল্লায় বড় ডাক্তার দেখাব?’
‘জানি| আমি মনে করছিলাম তুমি পরশুদিন পুলিশের নৌকার লগে লগে আইবা| তুমি আসো নাই|’
‘আরে পাগল, তোকে কী বোঝাব! আচ্ছা, বাদ দে| আজকে তো এসেছি| শুধু তোর জন্যই এসেছি|
‘ভালা করছ| এখান থাইকা আমারে লইয়া যাও| হেরা আমারে খালি মারে|’
আনিস জানে পুলিশ মনসুর পাগলাকে মেরেছে| তারপরও জিজ্ঞেস করল, ‘কে মারে?’
‘পুলিশ| কাইল রাইতে আমারে পা দুইডা উল্টাইয়া টানাইয়া এমুন পিডান পিডাইছে আমি পেচ্ছাব কইরা দিছি| এই দেখো, আমার পিঠ, শরীল, কোমর পিডাইয়া লাল কইরা ফেলাইছে|’ বলেই মনসুর পাগলা তার গায়ের পাঞ্জাবিটা তুলে পিঠ দেখাতে শুরু করল|
আনিস দেখল, মনসুর পাগলার পিঠে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্ত জমাটবাঁধা থোকা থোকা লাল দাগ| গায়ের সাদা পাঞ্জাবিতেও রক্তের দাগ|
আনিস কী বলবে বুঝতে পারল না| তবুও সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোকে ক্যান মেরেছে?’
মনসুর পাগলা বলল, ‘আমি নাকি আমার বউরে গাঙে চুবাইয়া মারছি|’
‘আমি তো জানি, তুই মারিস নাই|’
‘হ হ, তুমি ঠিক কইছ| আমি সেতারারে মারি নাই|’
‘তুই কি পুলিশের কাছে কোনো কথা স্বীকার করেছিস?’
‘কী কথা স্বীকার করমু?’
‘ওই তো, পুলিশের মার খেয়ে অনেক ভুল কথাও স্বীকার করে ফেলে| তুই তো বলিসনি যে, তোর বউকে তুই মেরেছিস?’
মনসুর পাগলা চোখ ছোট করে বলল, ‘আনিস, তুমি এইডা কী কও? আমি ক্যান স্বীকার করমু? আমি কি আমার বউরে মারছি? আমি কোনো অন্যায় করি নাই|’
আনিস বলল, ‘আমি ওটাই বোঝাতে চেয়েছি| তুই কোনো অন্যায় করিসনি| তাহলে তোর আর চিন্তা কী?’
‘তাইলে আমারে পিডাইল ক্যান?’
‘সেটা আমি ওসি সাহেবকে জিজ্ঞেস করব| আমি একটু পরই ওসি সাহেবের সাথে বসব|’
‘ও, তুমি ওসি সাবের লগে বসবা? ভালা ভালা| তুমি ওসি সাবরে কইবা, আমি আমার বউরে মারি নাই| হেয় নৌকা উল্টাইয়া পানিত ডুইবা মরছে|’
আনিস সায় দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা|’
মনসুর পাগলা বলল, ‘তুমি ওসি সাবরে আরও কইবা, তাইনে আমারে যেন ছাইড়া দেয়| তুমি তারে কইয়া এখান থাইকা আমারে অখনই লইয়া যাইবা| আমার এখানে দম বন্ধ হইয়া আইতাছে|’
আনিস সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘পাগলা, আমি ওসি সাহেবকে বললেই কি তিনি তোরে এখান থেকে ছাড়বে? আইনকানুন আছে না? তোরে আদালতে তুলবে| আমি বড় উকিল ধরব| আদালত থেকে তোকে জামিন করাবো|’
‘হেইডা কতদিন লাগবে?’
‘লাগবে তো পাঁচ-ছয়দিন| এক সপ্তাহও লাগতে পারে|’
‘কও কী, কও কী, আনিস? হেরা আমারে এতদিনে পিডাইয়া মাইরা ফেলাইব|’
‘আমি ওসি সাহেবকে অনুরোধ করব| এখানকার কেউ তোর গায়ে একটা ফুলের টোকাও যেন না দেয়|
মনসুর পাগলা আনিসের হাত মুঠো করে ধরে বলল, ‘তুমি হেইডা কইবা! ওসি সাবরে হেইডা কইবা! আমার ভালা লাগতাছে, আনিস| আমার ভালা লাগতাছে|’
আনিস মাথা ঝাঁকিয়ে আবেগের সুরে বলল, ‘অবশ্যই বলবো, পাগলা| অবশ্যই|’ ক্রমশ...

আপনার মতামত লিখুন