সংবাদ

অনুবাদ গল্প

যখন বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয়



যখন বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয়
তায়েব সালিহ

তাহের ওয়াদ রাওয়াসি চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলে বন্ধুগণ, দুনিয়াটা উল্টো পথে চলছে| তুমি, মেহেইমিদ, চেয়েছিলে চাষি হতে, আর হয়ে গেলে এক সাহেব; আর মাহজুব চেয়েছিল সাহেব হতে, আর সে হয়ে গেল চাষি|’

সম্প্রতি মাহজুবের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে এবং সে আর হাঁপানির কষ্টের কথা বলে না, যে দোহাই দিয়ে সে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল| সে হেসে বলল, ‘আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, যদি আমার সাধ্য থাকত, আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম, আর কেউ আমাকে ডিঙিয়ে যেতে পারত না| আমি গভর্নর অথবা মন্ত্রী হয়ে যেতাম|’

মন্ত্রী হওয়ার ব্যাপার তো কঠিন কিছু নয়, শিশুর খেলার মতো’, বলল তাহের| ‘এখন যে কোনো ব্যক্তিই মন্ত্রী হতে পারে| আল্লাহর কসম, বাকরির আওলাদ তুরেইফি যদি মন্ত্রী না হয়, তবে আমি আমার বাপের ছেলেই নই|’

ওকে কোন মন্ত্রণালয় দেবে?’ বলল মেহেইমিদ| ‘মন্ত্রণালয় তো একটাও খালি নেই|’

ওর জন্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নেই’, বলল তাহের| ‘ওকে দাতব্য সংস্থার মন্ত্রী, বা ফার্মেসির মন্ত্রী, বা লোকোমোটিভের মন্ত্রী, এমনই কোনো এক আজগুবি ব্যাপারস্যাপার বিষয়ক মন্ত্রী বানিয়ে দেবে, এমনটা তো আজকাল হয়েই থাকে|’

তুরেইফি, ওয়ালাদ আল-বাকরি’, বলল মাহজুব, ‘সমবায়টাও ঠিকমতো সামলাতে পারে না| ওকে বানাতে চাও মন্ত্রী!’

মন্ত্রীগিরি করতে কোনো যোগ্যতার দরকার পড়ে?’ বলল তাহের| ‘ধাপ্পাবাজি করতে পারলে আর লোকজনকে ডাঁট দেখানো ছাড়া কী করে! এদের কাজই তো অনেক বড় কথা বলা আর ঘোড়ার আণ্ডা ভাজা| কেবলজয় হোকআরজিন্দাবাদ”— বললেই চলে| দেখো, কোন দল এখন শক্তিশালী আর সে দলে ঢুকে পড়ো| একটু বক্তৃতা করো, দলবাজি, আর গোপনে মাল ঢালো| দেখবে, তুমি একদিন সংসদ সদস্য হয়ে গেছ| তারপর আর কীআরাম আর ক্ষমতা|’

আর সংসদে ঢোকার পর,’ মেহেইমিদ বলল, ‘যদি তোমায় মন্ত্রী না বানায়, তখন কী করবে?’

যদি আমাকে মন্ত্রী না বানায়,’ বলল ওয়াদ রাওয়াসি, ‘আল্লাহর কসম, আমি ওদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করব|’

তারপর?’ বলল মাহজুব|

তারপর আর কী?’ বলল তাহের| ‘কেন, এমনই তো| আরাম করে বসে থাকো| যা চাই, ঘণ্টা বাজাও, চলে আসবে| এসো অমুক| অমুক দূর হও| অমুক, তোমাকে পুলিশ সুপার করে দিলাম| অমুক, তুমি ইন্সপেক্টর-জেনারেল| অমুক, তুমি আমার কথা শুনছ না, জেলে যাও| অমুক, তোমার মুখ আর দেখতে চাই না| অমুক, তুমি দারুণ কাজের লোক| আমি যখন শেভ্রোলেট চড়ে শহরের ভেতরে রাজপথ দিয়ে যেতে থাকব, তখন লোকজন চিৎকার করবে— “তাহের ওয়াদ রাওয়াসি জিন্দাবাদ! তাহের ওয়াদ রাওয়াসির জয় হোক!” যদি আমি গভর্নর-জেনারেল হয়ে যেতাম!’

মাহজুব হো হো করে হেসে বলল, ‘শয়তান তোমার ওপর আছর করুক, অমুক-তমুক নিপাত যাক!’

জানার জন্য বলছি,’ মেহেইমিদ বলল, ‘তোমার গাড়িটা শেভ্রোলেট হতো না| যে গাড়িতে চড়বে এর পাশে যদি শেভ্রোলেট দাঁড় করাও, তবে ঘোড়ার পাশে গাধার মতো দেখাবে|’

আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই,’ বলল ওয়াদ রাওয়াসি| ‘শেভ্রোলেটের থেকেও বড় কিছু আছে নাকি?’

হ্যা, অবশ্যই আছে,’ বলল মেহেইমিদ|

কত বড় সেটা?’ বলল তাহের|

এত্ত বড়,’ বলল মেহেইমিদ এবং দুহাত প্রসারিত করল|

আল্লাহ সর্বশক্তিমান,’ বলল তাহের| ‘আল্লাহ তোমায় নিরাপদ রাখুন, যদি এমনই হয়, তবে ধরে নাও কাল থেকেই আমি প্রেসিডেন্সির প্রার্থী|’

তিন জনেই সেই দুপুরের বিশ্রামের সময়, সেই একই ˆবঠকখানায়, সেই একই খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে হেসে উঠল|

আহ, বন্ধু,’ মেহেইমিদ বলল, ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো| গভর্নর আর মন্ত্রীওরা কী রকম আছে জানো? বরং তুমি ওদের সবার চাইতে ভালো আছো| তোমার কোনো চিন্তা নেই, কেউ তোমার কাছে কিছু চাইতে আসে না, আর তুমিও কারো কাছে কিছু চাইতে যাও না|’

মাহজুব গভীর, বিষণ্ন একটা নিশ্বাস ফেলল|

আল্লাহর কসম, তুমি ঠিক বলেছ,’ তাহের বলল| ‘যখন জানো যে, রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে, আল্লাহ তোমায় নিরাপদ রাখুন, পুলিশপ্রধান হওয়া বা সর্বাধিনায়ক হওয়ার আর কী এমন প্রয়োজন? সমস্যা তো তোমার, হে মেহেইমিদ| পড়াশোনা করে জীবনটা নষ্ট করে দিলে, দেশ বিদেশে সফর করে বেড়ালে, আর শেষপর্যন্ত খালি হাতে এই স্রষ্টার অভিসম্পাতপ্রাপ্ত ওয়াদ হামিদে ফিরে এলে| যেন ভুল করেই সাহেব হয়ে গিয়েছিলে| অনেক দিন যাবতই তোমার মনটা এই দুর্দশাগ্রস্ত গাঁয়ের চাষবাসে পড়ে রয়েছে|’

অপরাহ্ণের বিশ্রামরত দাদার খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে মেহেইমিদও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল| কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল, ‘তোমরা যা বলছ, ঠিকই বলছ| মাহজুবেরই ওই পথে যাওয়া উচিত ছিল| তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, আছে| সে ক্ষমতা চায়| কিন্তু আমি চাই সত্য| ক্ষমতার সন্ধান করা আর সত্যের সন্ধানের মধ্যে কতটা যে তফাৎ|’

ওয়াদ রাওয়াসি বিদ্রুপ করে হেসে বলল, ‘মানে এই অভিশপ্ত ওয়াদ হামিদে তুমি চলে এসেছকারণ, এখানে সত্যকে পাবে! আল্লাহর কসম, ব্যাপারটা চরম হাস্যকর হবে!’

এটা সত্যের ব্যাপার নয়,’ বলল মাহজুব| ‘এটা বোকামির ফল| মেহেইমিদ আর আমি প্রাইমারি স্কুলে সহপাঠী ছিলাম| তোর, মনে আছে? আমি ছিলাম ক্লাসে সবচেয়ে মেধাবী| মেহেইমিদ ছিল অনেক পিছিয়ে| আমার আব্বা, আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন, বলেছিলেন, “ব্যস| আর স্কুল-টিস্কুলের দরকার নেই|” সেই বছর গম কাটার জন্য শ্রমিকের সমস্যা ছিল, আব্বা ফসল তোলায় খুব কষ্টে পড়েছিলেন| তিনি বললেন, “এসো, সকলের মতো আমাদের সঙ্গে কাজে লেগে পড়|” মেহেইমিদের পিতা, আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুন, একদমই ভিন্ন কথা বললেন, সে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না শেষ ডিগ্রি অর্জিত হয়| আর শেষমেশ কী হলো? মেহেইমিদ দুনিয়া চষে বেড়িয়ে এসে শেষে আবার চাষবাদে ফিরে এসেছে, প্রবাদ আছে না, “ বদর, আমরা কখনো আসি নি, কখনো যাই নি|”’

তিনি ছিলেন একজন কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তি, সব সময় নিজের মত অনুসারে অন্যদের চালাতেন,’ বলল তাহের| ‘তিনি যা ভাবতেন সেটাই সঠিক মনে করতেন, কেউ তার মত পরিবর্তন করতে পারত না| এর মূল্য যাই হোক, আল্লাহ তাঁর আত্মা শান্তিতে রাখুন|’

এর পর থেকে সবকিছুই ভুলের মধ্যদিয়ে গেল|’ মেহেইমিদ বলল| ‘শুরুতেইনাবলতে হয়| আমি ওয়াদ হামিদে সুখেই ছিলাম| দিনে জমি চাষ করতাম, সন্ধ্যারাতে মেয়েদের মুগ্ধ করতে গান শোনাতাম| পাখি ধরতাম, নীল নদে জলহস্তীর মতো লাফালাফি করতাম| হৃদয় মুক্ত আর প্রশান্ত ছিল| দাদু চাইলেন তাই সাহেব হতে হলো| আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম হলাম শিক্ষক| শিক্ষকতা করতে গিয়ে বললাম মেরোবিতে কাজ করতে চাই, ওরা বলল খার্তুমে যাও| খার্তুমে বললাম ছেলেদের পড়াতে চাই, ওরা বলল মেয়েদের পড়াও| মেয়েদের স্কুলে বললাম ইতিহাস পড়াতে চাই, ওরা বলল ভূগোল পড়াও| বললাম আফ্রিকার ভূগোল পড়াতে চাই, ওরা বলল ইউরোপ পড়াও| এভাবেই চলতে থাকল আর কি|’

ওয়াদ রাওয়াসি প্রাণ খুলে হাসল| ‘লোকেদের মাথায় ঘিলু নেই,’ সে বলল| ‘আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে বসতাম|’

যদি চাও’— বলল মাহজুব, ‘আমরা একটা বিপ্লব সংগঠিত করতে পারি, তুরেইফিকে সমবায়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারি|’

হঠাৎ প্রশ্নটা সামনে চলে এলো| ওয়াদ রাওয়াসি সোজা হয়ে বসে মেহেইমিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মেহেইমিদ, তুমি তো নিশ্চিতভাবেই আমার আর মাহজুবের চাইতে বয়সে ছোট| আমার তো মনে হয় না তোমার অবসর নেবার বয়স হয়েছে| তাহলে তারা অসময়ে কেন তোমাকে অবসরে পাঠিয়ে দিলো?’

মেহেইমিদের নামাজের গল্পটা মনে পড়ল এবং সে হেসে ফেলল|

হ্যাঁ, তাই তো!’ বলল মাহজুব, ‘কী ঘটেছিল? বলো|’

যখন ব্যাপারটা চরমে পৌঁছাল,’ বলল মেহেইমিদ, ‘আমি কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে বললাম, “আমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে| আমি আর চাকরি করতে চাই না| আর সেবা করতে চাই না| আমার যা অর্জন সেটা দিয়ে দিন আর আমাকে বাবা আর দাদার বাড়ি ফিরে যেতে দিন; খোদার সাধারণ বান্দাদের মতো মতো হাল চাষ করে আর জমি আবাদ করে; কলসি থেকে পানি পান আর নদীর ধারে জন্মানো ঢেড়স দিয়ে শুকনো রুটি খেয়ে জীবন যাপন করব; রাতে ˆবঠকখানার আঙিনায় চিৎ হয়ে শুয়ে মাথার ওপরের স্বচ্ছ বিশাল আসমান আর রূপোর থালার মতো চাঁদ দেখব|” আমি বললাম, “আমি সেইসব দিনে ফিরে যেতে চাই, যখন মানুষ ছিল মানুষ, আর সময় ছিল সময়|” আমি বললাম, “ব্যস| আপনাদের পাওনা থাকলে হিসেব কষে বুঝে নিন, আর আমাকে আমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিন| এখন থেকে আমাদের পথ আলাদা|”’

আর ওরা তোমাকে কী বলল, মেহেইমিদ?’ জিজ্ঞেস করল ওয়াদ রাওয়াসি| ‘শোনা যায় দেশি শাসকেরা বড় কঠোর| আল্লাহ বাঁচান| ইংরেজদের সময় হলে সে ধমক দিয়ে বলত, “বেরিয়ে যাও|” আর এখন দেশি শাসক পেছনে লাথি দিয়ে বের করে দেয়|’

কোনো মারধর বা লাথি নেই,’ হাসতে হাসতে বলল মেহেইমিদ| ‘সব কিছু সুন্দর আর নিয়ম মেনে হয়| আইন-কানুন আর চিঠিপত্র অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা, “দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছিআরআমরা আনন্দের সঙ্গে অবহিত করছি|” এক মাস আমি বাসায় বসে ছিলাম| তারপর তারা, যেমন বলে, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বিষয়টা মিটিয়ে নিল| এমন হলো যে, আমার আর এক বছর বাকি ছিল, ওটা তারা আমার হিসেবে ধরে নিলো| তারপর: তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আর তোমার শান্তি হোক|’

আর চলে আসার সময় রাগ ঝাড়তে কাউকে দু-একটা থাপ্পড় মারো নি?’

মেহেইমিদ মারধরের মানুষ নয়,’ বলল মাহজুব|

সহিংসতা প্রদর্শনের কী আছে?’ বলল মেহেইমিদ| ‘সবকিছু ঠিকমতোই মিটেছিল|’

আর তোমার ছেলেমেয়েরা, মেহেইমিদ?’

ছেলেদের সরকার নিয়ে গেছে,’ কণ্ঠস্বরে কিছুটা বিষণ্নতা মাখিয়ে বলল মেহেইমিদ, ‘আর মেয়েরা রয়ে গেছে সাহেবদের হেফাজতে| ওদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হোক| ওদের ভাবনার দুনিয়ায় গাড়ি, ফ্রিজ, পদ আর মর্যাদা ঢুকে পড়েছে| ওরা এখানে আসতে চাইলে স্বাগত; আর ওখানে থাকতে চাইলে আমি স্বাধীনতা, সভ্যতা আর গণতন্ত্রের যুগে আমার দেয়া উপহার হিসেবেই মনে করব ওদের| আর আমার কথা কী, ওয়াদ রাওয়াসি, আমি ভুল করে ভদ্রলোক হয়ে গিয়েছিলাম; আমি তো আদতে চাষি, যেমন তুমি বলেছ, চলে গিয়েছিল উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরেফিরে আবার শেকড়ে ফিরে এসেছি| আমি ফিরে এসেছি এখানে গোরস্থ হওয়ার জন্য| আল্লাহর কসম, ওয়াদ হামিদের মাটি ছাড়া আর কোনো মাটিতে আমি আমার দেহ রাখব না|’

ওয়াদ রাওয়াসি হেসে বলল, ‘মেহেইমিদ, তুমি হয় কবি, নয়তো তোমাকে বার্ধক্যে পেয়েছে| সে যাই হোক, তোমাকে গাঁয়ে স্বাগতম| ওয়াদ হামিদ এক অভিশপ্ত জায়গা| গ্রীষ্মে অসহনীয় গরম, আর শীতেআল্লাহ বাঁচানভীষণরকম হিম| খেজুরের পরাগায়নের সময় মশা, আর বাজরা উঠলে মাছি| সাপ-বিছা, ম্যালেরিয়া আর আমাশয়| জীবন এখানে খাটুনি আর ঝামেলার, তোমার মাথার চুলের মতো অসংখ্য সমস্যা এখানে| যদি আমাদের কথা জানতে চাও, বলব, আমরা এখানে চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি| জন্মের সময় চিৎকার করেছ, মৃত্যুর সময়ও চিৎকার করবে| তুমি সম্মানের জীবন কাটিয়ে এসেছে মাথার ওপর পাখার বাতাস অফিসের আসনে হেলান দিয়ে বসে| কল থেকে পানি আসে, বিদ্যুতের আলো, আর প্রথম শ্রেণিতে যাতায়াত| আহা! আহা! হিম শীতের গভীর রাতে পানি নিয়ে যাওয়ার খাল কাটো নি| গাধায় চড়ে চড়ে পাছা ফুলে যায় নি| খেজুর পাকলে, আল্লাহ যেন ওগুলোর উপর প্রবল বৃষ্টি বা ঝড় পাঠিয়ে বরকত থেকে বঞ্চিত না করেন, এই দোয়া করতে করতে পাহারায় বসে থাকো নি| পাখি বা পঙ্গপাল যেন গম নষ্ট না করে, এই ভয়ে বুকের মধ্যে হাত রেখে পাহারা দাও নি| আর এখন, দক্ষিণের হাওয়া তোমার পক্ষে ঘুরতেই, সপ্তম আকাশের ঝলমলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য তুমি ˆবঠকখানায় এসে শুয়ে পড়তে চাও| তোমায় হাজারো স্বাগতম, তুমি ঘরের মানুষ হয়ে আবার ঘরে এসেছ|’

খুব ভালো বলেছ, ওয়াদ রাওয়াসি,’ হেসে বলল মাহজুব|

আর মেহেইমিদ বহু বছর পর তার সূক্ষ্ম খটখটে হাসি হাসল| ‘ওয়াদ রাওয়াসি,’ সে বলল, ‘তুমি আমার চাইতেও একজন বড় কবি|’

[তায়েব সালিহ (১৯২৯-২০০৯) উত্তর সুদানে জন্মগ্রহণ করেন এবং খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন| শিক্ষক হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করার পর, তিনি বিবিসির আরবি বিভাগে কাজ করতে লন্ডনে চলে যান| পরে সালিহ আরব উপসাগরের কাতারের তথ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে এবং তার পর প্যারিসে ইউনেস্কো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন| আধুনিক আরবি ভাষার বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক| দ্য ওয়েডিং অব জইন-এর পর প্রকাশিত তাঁরসিজন অফ মাইগ্রেশন টু দ্য নর্থআধুনিক আরবি সাহিত্যে ধ্রুপদী উপন্যাসের মর্যাদায় সমাদ্রত (যা এনওয়াইআরবি ক্লাসিক হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে)| তার আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস বন্দরশাহ| গল্পটি বন্দরশাহ উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে|] 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬


যখন বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হয়

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬

featured Image

তাহের ওয়াদ রাওয়াসি চিৎ হয়ে শুয়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলে বন্ধুগণ, দুনিয়াটা উল্টো পথে চলছে| তুমি, মেহেইমিদ, চেয়েছিলে চাষি হতে, আর হয়ে গেলে এক সাহেব; আর মাহজুব চেয়েছিল সাহেব হতে, আর সে হয়ে গেল চাষি|’

সম্প্রতি মাহজুবের স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে এবং সে আর হাঁপানির কষ্টের কথা বলে না, যে দোহাই দিয়ে সে ফজরের নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিল| সে হেসে বলল, ‘আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, যদি আমার সাধ্য থাকত, আমি পড়াশোনা চালিয়ে যেতাম, আর কেউ আমাকে ডিঙিয়ে যেতে পারত না| আমি গভর্নর অথবা মন্ত্রী হয়ে যেতাম|’

মন্ত্রী হওয়ার ব্যাপার তো কঠিন কিছু নয়, শিশুর খেলার মতো’, বলল তাহের| ‘এখন যে কোনো ব্যক্তিই মন্ত্রী হতে পারে| আল্লাহর কসম, বাকরির আওলাদ তুরেইফি যদি মন্ত্রী না হয়, তবে আমি আমার বাপের ছেলেই নই|’

ওকে কোন মন্ত্রণালয় দেবে?’ বলল মেহেইমিদ| ‘মন্ত্রণালয় তো একটাও খালি নেই|’

ওর জন্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা নেই’, বলল তাহের| ‘ওকে দাতব্য সংস্থার মন্ত্রী, বা ফার্মেসির মন্ত্রী, বা লোকোমোটিভের মন্ত্রী, এমনই কোনো এক আজগুবি ব্যাপারস্যাপার বিষয়ক মন্ত্রী বানিয়ে দেবে, এমনটা তো আজকাল হয়েই থাকে|’

তুরেইফি, ওয়ালাদ আল-বাকরি’, বলল মাহজুব, ‘সমবায়টাও ঠিকমতো সামলাতে পারে না| ওকে বানাতে চাও মন্ত্রী!’

মন্ত্রীগিরি করতে কোনো যোগ্যতার দরকার পড়ে?’ বলল তাহের| ‘ধাপ্পাবাজি করতে পারলে আর লোকজনকে ডাঁট দেখানো ছাড়া কী করে! এদের কাজই তো অনেক বড় কথা বলা আর ঘোড়ার আণ্ডা ভাজা| কেবলজয় হোকআরজিন্দাবাদ”— বললেই চলে| দেখো, কোন দল এখন শক্তিশালী আর সে দলে ঢুকে পড়ো| একটু বক্তৃতা করো, দলবাজি, আর গোপনে মাল ঢালো| দেখবে, তুমি একদিন সংসদ সদস্য হয়ে গেছ| তারপর আর কীআরাম আর ক্ষমতা|’

আর সংসদে ঢোকার পর,’ মেহেইমিদ বলল, ‘যদি তোমায় মন্ত্রী না বানায়, তখন কী করবে?’

যদি আমাকে মন্ত্রী না বানায়,’ বলল ওয়াদ রাওয়াসি, ‘আল্লাহর কসম, আমি ওদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করব|’

তারপর?’ বলল মাহজুব|

তারপর আর কী?’ বলল তাহের| ‘কেন, এমনই তো| আরাম করে বসে থাকো| যা চাই, ঘণ্টা বাজাও, চলে আসবে| এসো অমুক| অমুক দূর হও| অমুক, তোমাকে পুলিশ সুপার করে দিলাম| অমুক, তুমি ইন্সপেক্টর-জেনারেল| অমুক, তুমি আমার কথা শুনছ না, জেলে যাও| অমুক, তোমার মুখ আর দেখতে চাই না| অমুক, তুমি দারুণ কাজের লোক| আমি যখন শেভ্রোলেট চড়ে শহরের ভেতরে রাজপথ দিয়ে যেতে থাকব, তখন লোকজন চিৎকার করবে— “তাহের ওয়াদ রাওয়াসি জিন্দাবাদ! তাহের ওয়াদ রাওয়াসির জয় হোক!” যদি আমি গভর্নর-জেনারেল হয়ে যেতাম!’

মাহজুব হো হো করে হেসে বলল, ‘শয়তান তোমার ওপর আছর করুক, অমুক-তমুক নিপাত যাক!’

জানার জন্য বলছি,’ মেহেইমিদ বলল, ‘তোমার গাড়িটা শেভ্রোলেট হতো না| যে গাড়িতে চড়বে এর পাশে যদি শেভ্রোলেট দাঁড় করাও, তবে ঘোড়ার পাশে গাধার মতো দেখাবে|’

আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই,’ বলল ওয়াদ রাওয়াসি| ‘শেভ্রোলেটের থেকেও বড় কিছু আছে নাকি?’

হ্যা, অবশ্যই আছে,’ বলল মেহেইমিদ|

কত বড় সেটা?’ বলল তাহের|

এত্ত বড়,’ বলল মেহেইমিদ এবং দুহাত প্রসারিত করল|

আল্লাহ সর্বশক্তিমান,’ বলল তাহের| ‘আল্লাহ তোমায় নিরাপদ রাখুন, যদি এমনই হয়, তবে ধরে নাও কাল থেকেই আমি প্রেসিডেন্সির প্রার্থী|’

তিন জনেই সেই দুপুরের বিশ্রামের সময়, সেই একই ˆবঠকখানায়, সেই একই খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে হেসে উঠল|

আহ, বন্ধু,’ মেহেইমিদ বলল, ‘আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো| গভর্নর আর মন্ত্রীওরা কী রকম আছে জানো? বরং তুমি ওদের সবার চাইতে ভালো আছো| তোমার কোনো চিন্তা নেই, কেউ তোমার কাছে কিছু চাইতে আসে না, আর তুমিও কারো কাছে কিছু চাইতে যাও না|’

মাহজুব গভীর, বিষণ্ন একটা নিশ্বাস ফেলল|

আল্লাহর কসম, তুমি ঠিক বলেছ,’ তাহের বলল| ‘যখন জানো যে, রাতের খাবারের ব্যবস্থা আছে, আল্লাহ তোমায় নিরাপদ রাখুন, পুলিশপ্রধান হওয়া বা সর্বাধিনায়ক হওয়ার আর কী এমন প্রয়োজন? সমস্যা তো তোমার, হে মেহেইমিদ| পড়াশোনা করে জীবনটা নষ্ট করে দিলে, দেশ বিদেশে সফর করে বেড়ালে, আর শেষপর্যন্ত খালি হাতে এই স্রষ্টার অভিসম্পাতপ্রাপ্ত ওয়াদ হামিদে ফিরে এলে| যেন ভুল করেই সাহেব হয়ে গিয়েছিলে| অনেক দিন যাবতই তোমার মনটা এই দুর্দশাগ্রস্ত গাঁয়ের চাষবাসে পড়ে রয়েছে|’

অপরাহ্ণের বিশ্রামরত দাদার খাটে চিৎ হয়ে শুয়ে মেহেইমিদও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল| কিছুক্ষণ ভেবে সে বলল, ‘তোমরা যা বলছ, ঠিকই বলছ| মাহজুবেরই ওই পথে যাওয়া উচিত ছিল| তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, আছে| সে ক্ষমতা চায়| কিন্তু আমি চাই সত্য| ক্ষমতার সন্ধান করা আর সত্যের সন্ধানের মধ্যে কতটা যে তফাৎ|’

ওয়াদ রাওয়াসি বিদ্রুপ করে হেসে বলল, ‘মানে এই অভিশপ্ত ওয়াদ হামিদে তুমি চলে এসেছকারণ, এখানে সত্যকে পাবে! আল্লাহর কসম, ব্যাপারটা চরম হাস্যকর হবে!’

এটা সত্যের ব্যাপার নয়,’ বলল মাহজুব| ‘এটা বোকামির ফল| মেহেইমিদ আর আমি প্রাইমারি স্কুলে সহপাঠী ছিলাম| তোর, মনে আছে? আমি ছিলাম ক্লাসে সবচেয়ে মেধাবী| মেহেইমিদ ছিল অনেক পিছিয়ে| আমার আব্বা, আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন, বলেছিলেন, “ব্যস| আর স্কুল-টিস্কুলের দরকার নেই|” সেই বছর গম কাটার জন্য শ্রমিকের সমস্যা ছিল, আব্বা ফসল তোলায় খুব কষ্টে পড়েছিলেন| তিনি বললেন, “এসো, সকলের মতো আমাদের সঙ্গে কাজে লেগে পড়|” মেহেইমিদের পিতা, আল্লাহ তাঁর মঙ্গল করুন, একদমই ভিন্ন কথা বললেন, সে পড়াশোনা চালিয়ে যাবে যতক্ষণ না শেষ ডিগ্রি অর্জিত হয়| আর শেষমেশ কী হলো? মেহেইমিদ দুনিয়া চষে বেড়িয়ে এসে শেষে আবার চাষবাদে ফিরে এসেছে, প্রবাদ আছে না, “ বদর, আমরা কখনো আসি নি, কখনো যাই নি|”’

তিনি ছিলেন একজন কর্তৃত্বপরায়ণ ব্যক্তি, সব সময় নিজের মত অনুসারে অন্যদের চালাতেন,’ বলল তাহের| ‘তিনি যা ভাবতেন সেটাই সঠিক মনে করতেন, কেউ তার মত পরিবর্তন করতে পারত না| এর মূল্য যাই হোক, আল্লাহ তাঁর আত্মা শান্তিতে রাখুন|’

এর পর থেকে সবকিছুই ভুলের মধ্যদিয়ে গেল|’ মেহেইমিদ বলল| ‘শুরুতেইনাবলতে হয়| আমি ওয়াদ হামিদে সুখেই ছিলাম| দিনে জমি চাষ করতাম, সন্ধ্যারাতে মেয়েদের মুগ্ধ করতে গান শোনাতাম| পাখি ধরতাম, নীল নদে জলহস্তীর মতো লাফালাফি করতাম| হৃদয় মুক্ত আর প্রশান্ত ছিল| দাদু চাইলেন তাই সাহেব হতে হলো| আমি ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম হলাম শিক্ষক| শিক্ষকতা করতে গিয়ে বললাম মেরোবিতে কাজ করতে চাই, ওরা বলল খার্তুমে যাও| খার্তুমে বললাম ছেলেদের পড়াতে চাই, ওরা বলল মেয়েদের পড়াও| মেয়েদের স্কুলে বললাম ইতিহাস পড়াতে চাই, ওরা বলল ভূগোল পড়াও| বললাম আফ্রিকার ভূগোল পড়াতে চাই, ওরা বলল ইউরোপ পড়াও| এভাবেই চলতে থাকল আর কি|’

ওয়াদ রাওয়াসি প্রাণ খুলে হাসল| ‘লোকেদের মাথায় ঘিলু নেই,’ সে বলল| ‘আল্লাহ তোমাকে নিরাপদ রাখুন, আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, তাদের বিরুদ্ধে বিপ্লব করে বসতাম|’

যদি চাও’— বলল মাহজুব, ‘আমরা একটা বিপ্লব সংগঠিত করতে পারি, তুরেইফিকে সমবায়ের চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে দিতে পারি|’

হঠাৎ প্রশ্নটা সামনে চলে এলো| ওয়াদ রাওয়াসি সোজা হয়ে বসে মেহেইমিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মেহেইমিদ, তুমি তো নিশ্চিতভাবেই আমার আর মাহজুবের চাইতে বয়সে ছোট| আমার তো মনে হয় না তোমার অবসর নেবার বয়স হয়েছে| তাহলে তারা অসময়ে কেন তোমাকে অবসরে পাঠিয়ে দিলো?’

মেহেইমিদের নামাজের গল্পটা মনে পড়ল এবং সে হেসে ফেলল|

হ্যাঁ, তাই তো!’ বলল মাহজুব, ‘কী ঘটেছিল? বলো|’

যখন ব্যাপারটা চরমে পৌঁছাল,’ বলল মেহেইমিদ, ‘আমি কর্তৃপক্ষের কাছে গিয়ে বললাম, “আমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে| আমি আর চাকরি করতে চাই না| আর সেবা করতে চাই না| আমার যা অর্জন সেটা দিয়ে দিন আর আমাকে বাবা আর দাদার বাড়ি ফিরে যেতে দিন; খোদার সাধারণ বান্দাদের মতো মতো হাল চাষ করে আর জমি আবাদ করে; কলসি থেকে পানি পান আর নদীর ধারে জন্মানো ঢেড়স দিয়ে শুকনো রুটি খেয়ে জীবন যাপন করব; রাতে ˆবঠকখানার আঙিনায় চিৎ হয়ে শুয়ে মাথার ওপরের স্বচ্ছ বিশাল আসমান আর রূপোর থালার মতো চাঁদ দেখব|” আমি বললাম, “আমি সেইসব দিনে ফিরে যেতে চাই, যখন মানুষ ছিল মানুষ, আর সময় ছিল সময়|” আমি বললাম, “ব্যস| আপনাদের পাওনা থাকলে হিসেব কষে বুঝে নিন, আর আমাকে আমার প্রাপ্য বুঝিয়ে দিন| এখন থেকে আমাদের পথ আলাদা|”’

আর ওরা তোমাকে কী বলল, মেহেইমিদ?’ জিজ্ঞেস করল ওয়াদ রাওয়াসি| ‘শোনা যায় দেশি শাসকেরা বড় কঠোর| আল্লাহ বাঁচান| ইংরেজদের সময় হলে সে ধমক দিয়ে বলত, “বেরিয়ে যাও|” আর এখন দেশি শাসক পেছনে লাথি দিয়ে বের করে দেয়|’

কোনো মারধর বা লাথি নেই,’ হাসতে হাসতে বলল মেহেইমিদ| ‘সব কিছু সুন্দর আর নিয়ম মেনে হয়| আইন-কানুন আর চিঠিপত্র অনুযায়ী সব আনুষ্ঠানিকতা, “দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছিআরআমরা আনন্দের সঙ্গে অবহিত করছি|” এক মাস আমি বাসায় বসে ছিলাম| তারপর তারা, যেমন বলে, বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বিষয়টা মিটিয়ে নিল| এমন হলো যে, আমার আর এক বছর বাকি ছিল, ওটা তারা আমার হিসেবে ধরে নিলো| তারপর: তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, আর তোমার শান্তি হোক|’

আর চলে আসার সময় রাগ ঝাড়তে কাউকে দু-একটা থাপ্পড় মারো নি?’

মেহেইমিদ মারধরের মানুষ নয়,’ বলল মাহজুব|

সহিংসতা প্রদর্শনের কী আছে?’ বলল মেহেইমিদ| ‘সবকিছু ঠিকমতোই মিটেছিল|’

আর তোমার ছেলেমেয়েরা, মেহেইমিদ?’

ছেলেদের সরকার নিয়ে গেছে,’ কণ্ঠস্বরে কিছুটা বিষণ্নতা মাখিয়ে বলল মেহেইমিদ, ‘আর মেয়েরা রয়ে গেছে সাহেবদের হেফাজতে| ওদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হোক| ওদের ভাবনার দুনিয়ায় গাড়ি, ফ্রিজ, পদ আর মর্যাদা ঢুকে পড়েছে| ওরা এখানে আসতে চাইলে স্বাগত; আর ওখানে থাকতে চাইলে আমি স্বাধীনতা, সভ্যতা আর গণতন্ত্রের যুগে আমার দেয়া উপহার হিসেবেই মনে করব ওদের| আর আমার কথা কী, ওয়াদ রাওয়াসি, আমি ভুল করে ভদ্রলোক হয়ে গিয়েছিলাম; আমি তো আদতে চাষি, যেমন তুমি বলেছ, চলে গিয়েছিল উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরেফিরে আবার শেকড়ে ফিরে এসেছি| আমি ফিরে এসেছি এখানে গোরস্থ হওয়ার জন্য| আল্লাহর কসম, ওয়াদ হামিদের মাটি ছাড়া আর কোনো মাটিতে আমি আমার দেহ রাখব না|’

ওয়াদ রাওয়াসি হেসে বলল, ‘মেহেইমিদ, তুমি হয় কবি, নয়তো তোমাকে বার্ধক্যে পেয়েছে| সে যাই হোক, তোমাকে গাঁয়ে স্বাগতম| ওয়াদ হামিদ এক অভিশপ্ত জায়গা| গ্রীষ্মে অসহনীয় গরম, আর শীতেআল্লাহ বাঁচানভীষণরকম হিম| খেজুরের পরাগায়নের সময় মশা, আর বাজরা উঠলে মাছি| সাপ-বিছা, ম্যালেরিয়া আর আমাশয়| জীবন এখানে খাটুনি আর ঝামেলার, তোমার মাথার চুলের মতো অসংখ্য সমস্যা এখানে| যদি আমাদের কথা জানতে চাও, বলব, আমরা এখানে চমৎকার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি| জন্মের সময় চিৎকার করেছ, মৃত্যুর সময়ও চিৎকার করবে| তুমি সম্মানের জীবন কাটিয়ে এসেছে মাথার ওপর পাখার বাতাস অফিসের আসনে হেলান দিয়ে বসে| কল থেকে পানি আসে, বিদ্যুতের আলো, আর প্রথম শ্রেণিতে যাতায়াত| আহা! আহা! হিম শীতের গভীর রাতে পানি নিয়ে যাওয়ার খাল কাটো নি| গাধায় চড়ে চড়ে পাছা ফুলে যায় নি| খেজুর পাকলে, আল্লাহ যেন ওগুলোর উপর প্রবল বৃষ্টি বা ঝড় পাঠিয়ে বরকত থেকে বঞ্চিত না করেন, এই দোয়া করতে করতে পাহারায় বসে থাকো নি| পাখি বা পঙ্গপাল যেন গম নষ্ট না করে, এই ভয়ে বুকের মধ্যে হাত রেখে পাহারা দাও নি| আর এখন, দক্ষিণের হাওয়া তোমার পক্ষে ঘুরতেই, সপ্তম আকাশের ঝলমলে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকার জন্য তুমি ˆবঠকখানায় এসে শুয়ে পড়তে চাও| তোমায় হাজারো স্বাগতম, তুমি ঘরের মানুষ হয়ে আবার ঘরে এসেছ|’

খুব ভালো বলেছ, ওয়াদ রাওয়াসি,’ হেসে বলল মাহজুব|

আর মেহেইমিদ বহু বছর পর তার সূক্ষ্ম খটখটে হাসি হাসল| ‘ওয়াদ রাওয়াসি,’ সে বলল, ‘তুমি আমার চাইতেও একজন বড় কবি|’

[তায়েব সালিহ (১৯২৯-২০০৯) উত্তর সুদানে জন্মগ্রহণ করেন এবং খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন| শিক্ষক হিসেবে সংক্ষিপ্ত সময় কাজ করার পর, তিনি বিবিসির আরবি বিভাগে কাজ করতে লন্ডনে চলে যান| পরে সালিহ আরব উপসাগরের কাতারের তথ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে এবং তার পর প্যারিসে ইউনেস্কো আরব উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করেন| আধুনিক আরবি ভাষার বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক| দ্য ওয়েডিং অব জইন-এর পর প্রকাশিত তাঁরসিজন অফ মাইগ্রেশন টু দ্য নর্থআধুনিক আরবি সাহিত্যে ধ্রুপদী উপন্যাসের মর্যাদায় সমাদ্রত (যা এনওয়াইআরবি ক্লাসিক হিসেবেও প্রকাশিত হয়েছে)| তার আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস বন্দরশাহ| গল্পটি বন্দরশাহ উপন্যাস থেকে নেয়া হয়েছে|] 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত