সংবাদ

বিদেশি সাহিত্য

নয়া উপনিবেশবাদ ও এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যভাবনা


মাসুমুর রহমান মাসুদ
মাসুমুর রহমান মাসুদ
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩ এএম

নয়া উপনিবেশবাদ ও এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যভাবনা
এডওয়ার্ড ডব্লিউ সাইদ



নিজেকে জানা, নিজের দেশ সম্পর্কে জানা এবং দেশের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জনের জন্য বর্তমান সময়ে অপরিহার্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে এডওয়ার্ড সাঈদের ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’— যা প্রাচ্যবাদ বলে সমধিক পরিচিত| এটি কেবলমাত্র একটি গ্রন্থ নয়, আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব, সাহিত্য রাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অবদান| এটি একদিকে উপনিবেশবাদী ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচন করেছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণের সঙ্গে প্রাচ্যকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে|

এডওয়ার্ড উব্লিউ সাঈদ, ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে এক এপিসকোপ্যালিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি একাধারে সাহিত্য সমালোচক, রাজনৈতিক কর্মী সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ| ১৯৭৮ সালে তাঁর ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থ প্রকাশিত হলে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে হৈচৈ পড়ে যায়| সাঈদের আলোচনায় ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এবং এদের জনগণের ওপর উপনিবেশবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচিত হলেও সময়ের বয়ে চলা স্রোতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নয়, উপনিবেশিত সমস্ত দেশ দেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ হয়ে উঠেছে এই প্রাচ্যতত্ত্ব বা ওরিয়েন্টালিজম| একজন ব্যক্তির ওরিয়েন্টালিজম পাঠের আগের পৃথিবী এবং পরের পৃথিবী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হবে এতে সন্দেহ নেই| এটি পাঠের মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মপরিচয় উদ্ঘাটনের পথ সুগম হয়| ফলে তার ধ্যন-ধারণা, ভাব চিন্তার জগত পুরোপুরি পরিবর্তিত রূপ গ্রহণ করে|

.

‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থ রচনার পেছনে তাঁর উদ্বাস্তু জীবন ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এছাড়া তাঁর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে এই গ্রন্থে| ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এডওয়ার্ড উব্লিউ সাঈদ তাঁর পরিবার শরণার্থী হয়ে কায়রোতে চলে যায়| কায়রোর ভিক্টোরিয়া কলেজে তার শৈশব কৈশোর কাটে| এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন| তাঁর উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা এবং পাশ্চাত্য কবি, সাহিত্যিক সাংবাদিকদের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তৈরি বয়ান তাকে প্রতিবাদী করে তুলে| পশ্চিমা গণমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভুল চিত্রায়নের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন এবং বারবার দেখিয়েছেন কীভাবে সংবাদ জ্ঞানকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে| এজন্য সাঈদের মতে, “জ্ঞানই হলো ক্ষমতা”| তাঁর লেখালেখিতে এন্তোনিও গ্রামসি, মিশেল ফুকো কার্ল মার্কসের প্রভাব স্পষ্ট| তবে তিনি নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি রাজনীতির সংযোগকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন|

.

সাঈদের মতে, ‘‘প্রাচ্য’’ মূলত পশ্চিমা জ্ঞান কল্পনার এক নির্মাণ, যা বাস্তব প্রাচ্যের প্রতিফলন নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে গড়ে ওঠা একটি ধারণা মাত্র| আঠারো উনিশ শতকে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রাচ্য সম্পর্কে যে ধারণা সৃষ্টি হয় এবং যে জ্ঞান সেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান করা হতো তা সম্পূর্ণ কল্পনা প্রসূত| প্রাচ্যতত্ত্ব এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যেখানে ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রাচ্যের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম সমাজকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছে| উপস্থাপনা নিরপেক্ষ ছিলো না| একাডেমিক, ক্ষমতার কাঠামো আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থে গড়ে ওঠা এক জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থাই ছিলো প্রাচ্যতত্ত্ব| সাঈদ বলেছেন, ‘‘প্রাচ্য’’ বাস্তব কানো ভৌগোলিক অঞ্চল নয়| পশ্চিমা চিন্তার ভেতরে ˆতরি এক কল্পিত ধারণা| এতে প্রাচ্যবাসীকে পশ্চাৎপদ, রহস্যময়, অবিশ্বাসযোগ্য বা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, অষ্টাদশ উনিশ শতকে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ যখন বিশ^ব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছিলতখনই প্রাচ্যতত্ত্ব একটি একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে| ব্রিটিশ ফরাসি গবেষকরা আরবি, ফার্সি, উর্দু, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষা শেখেন এবং সেসব ভাষার সাহিত্য চর্চা গবেষণা করতে শুরু করেন| কিন্তু এই গবেষণা মূলত প্রাচ্যকে জানার নিরপেক্ষ প্রচেষ্টা ছিলো না| এটি ছিলো তাদের ঔপনিবেশিক শাসনকে আরও দীর্ঘায়িত কার্যকর করার অন্যতম কৌশল| ফলে প্রাচ্যের সমাজ সংস্কৃতিকে যে রূপে ইউরোপীয়রা উপস্থাপন করেছেতা আসলে ছিলো পশ্চিমা মানসিক কাঠামোর প্রতিফলন| এর মধ্য দিয়ে তারা পশ্চিমকে অগ্রগামী, মহৎ, শিক্ষিত, মানবিক, উদার ˆনতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছে| অপরদিকে প্রাচ্যকে পশ্চাৎপদ, হিংস্র, অশিক্ষিত, বর্বর অনৈতিক হিসেবে উপস্থাপনের বয়ান ˆতরি করেছে| এই ˆদ্বত কাঠামোর ফলে প্রাচ্যকে দখল করা, শাসন করা তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটি ন্যয্যতা ˆতরি হয় পশ্চিমাদের পক্ষে|

.

এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন মিশেল ফুকোর ‘‘জ্ঞান ক্ষমতার সম্পর্ক’’ এবং এন্তোনিও গ্রামসির ‘‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’’ তত্ত্বকে ব্যবহার করে| তিনি দেখিয়েছেন প্রাচ্যতত্ত্ব আসলে এক ধরনের ডিসকোর্স বা বয়ান| এই জ্ঞানের ভেতর দিয়ে পশ্চিমারা উপনিবেশিত দেশে ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে| গ্রন্থটিতে সাঈদ সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপরও এর প্রভাব ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কীভাবে শেক্সপিয়র থেকে কিপলিং পর্যন্ত ইউরোপীয় সাহিত্যেও প্রাচ্যের চিত্র নির্মিত হয়েছে| আবার কীভাবে কূটনীতি পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাচ্যতত্ত্ব কার্যকর ভূমিকা রেখেছে| মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কিত পশ্চিমা মিডিয়া একাডেমিক আলোচনাতেও ইসলাম আরব সংস্কৃতিকে বারবার সন্ত্রাস, হিংসা পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করেছে| সাঈদের মতে, প্রাচ্যবাদের মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজ নিজেদেরকে যৌক্তিক, অগ্রসর উন্নত হিসেবে উপস্থাপন করেছে| অপরদিকে প্রাচ্যকে স্থবির, রহস্যময় অনুন্নত হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ফলে সাঈদ দৃঢ়ভাবে বলেনপ্রাচ্য আসলে পশ্চিমা জ্ঞানজগতের একটি নির্মাণ, বাস্তব প্রাচ্য সেখানে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি|

.

প্রাচ্য শুধু রাজনৈতিকভাবে উপনিবেশিত হয়নি| সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও অধীন হয়েছে| যেমন: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতীয় সমাজকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে তাদের শাসনকে ‘‘আলোকায়নের যুগ বা সূচনা’’ হিসেবে একটি মহৎ মিশন বিবেচনা করা হয়| এভাবে প্রাচ্যকে শাসন কর্তৃত্ব জারি করণের ক্ষেত্রে দুটি কৌশল গ্রহণ করেছে পশ্চিমারা| একটি হলো, প্রাচ্যের বাস্তব চিত্রকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এমন একটি ইমেজ ˆতরি করা হয়েছে যেখানে প্রাচ্যের অধিবাসীরা নিজেদের নিকৃষ্ট ভাবতে শুরু করেছিলো| পশ্চিমা সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনি শিল্পকলায় প্রাচ্যকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেখানে নারী রহস্যময় যৌন আবেদনময়ী, সমাজ অযৌক্তিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মানুষ অক্ষম নিয়ন্ত্রণহীন| এতে পশ্চিমা পাঠকগণ যেমন বিনোদন পেয়েছে, তেমনি ঔপনিবেশিক শাসনকে নৈতিক বৈধতাও দিয়েছে| অপরটি হলো, পশ্চিমের একাডেমিক গবেষণা গণমাধ্যম প্রাচ্যের রাজনৈতিক ইমেজকে বিকৃত করেছে| মুসলমানদের বারবার ‘‘সন্ত্রাসী’’, ‘‘হিংস্র’’ ‘‘অসভ্য’’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ফলে প্রাচ্যের অধিবাসীরা আন্তর্জাতিকভাবে সব সময় ‘‘সন্দেহভাজন’’ হিসেবে গণ্য হয়েছে| সাঈদের এই তত্ত্বের মূল কথাগুলো সহজভাবে বলা যায় এভাবে

. প্রাচ্যবাদ একটি পশ্চিমানির্মাণ’ : সাঈদের মতে, ‘প্রাচ্যবাওরিয়েন্টবলতে যা বোঝানো হয়, তা কোনো বাস্তব ভৌগোলিক সত্য নয়| বরং এটি পশ্চিমা লেখকদের কল্পনা, সাহিত্য এবং রাজনীতির মাধ্যমে ˆতরি করা একটি ধারণা| পাশ্চাত্য নিজেকেউন্নতএবংযৌক্তিকহিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রাচ্যকেঅনুন্নত’, ‘অযৌক্তিকএবংঅসভ্যহিসেবে উপস্থাপন করেছে|

. আমরা বনাম তারা (অপরীকরণ) : সাঈদ দেখিয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সবসময় একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রাচ্যকে দেখেছে| পাশ্চাত্য শক্তিশালী, যৌক্তিক, সভ্য এবং মানবিক| প্রাচ্য দুর্বল, রহস্যময়, অলস, অসভ্য এবং নারীসুলভ| কাঠামোগতভাবে এই বিভাজনটি করা হয়েছে যাতে পাশ্চাত্য নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারে|

. জ্ঞান ক্ষমতার সম্পর্ক: সাঈদের তত্ত্বে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর প্রভাব রয়েছে| সাঈদ বলেন, “জ্ঞানই হলো ক্ষমতা|” ইউরোপীয় পণ্ডিতরা যখন প্রাচ্য সম্পর্কে বই লিখেছেন বা গবেষণা করেছেন, তখন তারা মূলত সাম্রাজ্যবাদকে ˆবধতা দিয়েছেন| প্রাচ্যকেঅক্ষমহিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্য ছিল এটাই বোঝানো যেতাদের শাসন করা পশ্চিমাদের জন্য ন্যায্য|

. স্টিরিওটাইপিং বা গৎবাঁধা ধারণা: প্রাচ্যবাদীদের কাজকর্মে প্রাচ্যের মানুষদের কিছু নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা হয়েছে| যেমন: আরব মানেই নিষ্ঠুর বা উগ্রবাদী| ভারতীয় মানেই আধ্যাত্মিকতায় ডুবে থাকা মানুষ| এই ধারণাগুলো প্রাচ্যের আসল ˆবচিত্র্য এবং সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে না|

ফলে প্রাচ্যবাদ মূলত পূর্বের ওপর পশ্চিমের আধিপত্য বজায় রাখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো| এই ˆদ্বত কাঠামো উপলব্ধির জন্য ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থটি পাঠ এবং মনোজগতে এর সারকথা ধারণ করা উপনিবেশিত জাতির পক্ষে বাঞ্ছনীয়|

.

আধুনিক যুগে প্রাচ্যবাদ প্রসঙ্গ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সাঈদ ১৯৭৮ সালে বইটি লিখলেও, তার তত্ত্ব আজও গুরুত্বপূর্ণ| আধুনিক মিডিয়া এবং হলিউড কীভাবে প্রাচ্যের মুসলিম এশীয়দের চিত্রায়িত করেতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়:

. চলচ্চিত্রে স্টিরিওটাইপ হচ্ছে দেদার| হলিউডের অনেক অ্যাকশন সিনেমায় আরব বা দক্ষিণ এশীয় চরিত্রদের হয়উগ্রবাদী’, না হয়হাস্যকরবাবোকাহিসেবে দেখানো হয়| তাদের নিজস্ব কোনো মানবিক গল্প থাকে না, তারা কেবল পশ্চিমা নায়কের হাতে মার খায়|

. নিউজ মিডিয়ার ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে যখন প্রাচ্যের যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ অথবা অন্য কোনো সংকট দেখানো হয়, তখন প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এই মানুষগুলো আদিম এবং তারা নিজেরা নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ| এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে ˆবধতা দেওয়া এবং তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুপ্ত বাসনা|

. সংস্কৃতি হেজিমোনিও বিশেষ লক্ষ্যণীয়| প্রাচ্যের যোগব্যায়াম, হিজাব বা ঐতিহ্যবাহী পোশাককে যখন পশ্চিমা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি কেবল ‘‘অ্যাকজোটিক’’, ‘‘সেকেলে’’ দেখানোর জন্য ব্যবহার করে কিন্তু এর পেছনের ইতিহাসকে সম্মান করে না, সেটিও এক ধরনের আধুনিক প্রাচ্যবাদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়|

.

তদুপরি এডওয়ার্ড সাঈদের তত্ত্বের সমালোচনাও কম নয়| তাঁর তত্ত্ব যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনি অনেক পণ্ডিত এর সমালোচনাও করেছেন| অ্যান্টি-অক্সিডেন্টালিজম অনেকে মনে করেন, সাঈদ পশ্চিমাদের সমালোচনা করতে গিয়ে নিজেওপাশ্চাত্যবাদতৈরি করেছেন| অর্থাৎ, তিনি সব পশ্চিমা পণ্ডিতকে একইভাবেখারাপবাশোষকহিসেবে দেখেছেনযা পুরোপুরি সঠিক নয়| তবে, সাঈদপাশ্চাত্যবাদবিষয়টি অস্বীকার করে আত্মোন্মোচনের বিষয়ে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন| সমালোচকরা বলেন, অনেক পশ্চিমা পণ্ডিত কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং জ্ঞানতৃষ্ণা থেকেই প্রাচ্যের ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন| সাঈদ তাদের অবদানকে ছোট করেছেন| সাঈদ প্রাচ্যকে কেবল একটিশিকারহিসেবে দেখিয়েছেন| সমালোচকদের মতে, প্রাচ্যের মানুষরাও যে ইতিহাসের নির্মাতা এবং তারা যে পশ্চিমাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে, সাঈদ তা এড়িয়ে গেছেন| অস্পষ্ট ভৌগোলিক সীমা বলতে সাঈদ মূলত আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যকে ফোকাস করেছেন| ভারত, চীন, জাপান, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা বা রাশিয়ার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবাদ কীভাবে কাজ করে, তা তার তত্ত্বে অনেকটাই অস্পষ্ট|

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬


নয়া উপনিবেশবাদ ও এডওয়ার্ড সাঈদের প্রাচ্যভাবনা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ জুলাই ২০২৬

featured Image



নিজেকে জানা, নিজের দেশ সম্পর্কে জানা এবং দেশের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা অর্জনের জন্য বর্তমান সময়ে অপরিহার্য পাঠ্য হয়ে উঠেছে এডওয়ার্ড সাঈদের ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’— যা প্রাচ্যবাদ বলে সমধিক পরিচিত| এটি কেবলমাত্র একটি গ্রন্থ নয়, আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব, সাহিত্য রাজনীতির ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অবদান| এটি একদিকে উপনিবেশবাদী ক্ষমতার মুখোশ উন্মোচন করেছে এবং অন্যদিকে পশ্চিমাদের আত্মপরিচয় নির্মাণের সঙ্গে প্রাচ্যকে কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে|

এডওয়ার্ড উব্লিউ সাঈদ, ফিলিস্তিনের জেরুজালেমে এক এপিসকোপ্যালিয়ান খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি একাধারে সাহিত্য সমালোচক, রাজনৈতিক কর্মী সাংস্কৃতিক চিন্তাবিদ| ১৯৭৮ সালে তাঁর ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থ প্রকাশিত হলে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে হৈচৈ পড়ে যায়| সাঈদের আলোচনায় ফিলিস্তিনসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ এবং এদের জনগণের ওপর উপনিবেশবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচিত হলেও সময়ের বয়ে চলা স্রোতে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য নয়, উপনিবেশিত সমস্ত দেশ দেশের জনগণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পাঠ হয়ে উঠেছে এই প্রাচ্যতত্ত্ব বা ওরিয়েন্টালিজম| একজন ব্যক্তির ওরিয়েন্টালিজম পাঠের আগের পৃথিবী এবং পরের পৃথিবী সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণরূপে পৃথক হবে এতে সন্দেহ নেই| এটি পাঠের মধ্য দিয়ে মানুষের আত্মপরিচয় উদ্ঘাটনের পথ সুগম হয়| ফলে তার ধ্যন-ধারণা, ভাব চিন্তার জগত পুরোপুরি পরিবর্তিত রূপ গ্রহণ করে|

.

‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থ রচনার পেছনে তাঁর উদ্বাস্তু জীবন ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে| এছাড়া তাঁর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন রয়েছে এই গ্রন্থে| ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এডওয়ার্ড উব্লিউ সাঈদ তাঁর পরিবার শরণার্থী হয়ে কায়রোতে চলে যায়| কায়রোর ভিক্টোরিয়া কলেজে তার শৈশব কৈশোর কাটে| এরপর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন| তাঁর উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা এবং পাশ্চাত্য কবি, সাহিত্যিক সাংবাদিকদের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে তৈরি বয়ান তাকে প্রতিবাদী করে তুলে| পশ্চিমা গণমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভুল চিত্রায়নের বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন এবং বারবার দেখিয়েছেন কীভাবে সংবাদ জ্ঞানকে ব্যবহার করা হয় ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে| এজন্য সাঈদের মতে, “জ্ঞানই হলো ক্ষমতা”| তাঁর লেখালেখিতে এন্তোনিও গ্রামসি, মিশেল ফুকো কার্ল মার্কসের প্রভাব স্পষ্ট| তবে তিনি নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি রাজনীতির সংযোগকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন|

.

সাঈদের মতে, ‘‘প্রাচ্য’’ মূলত পশ্চিমা জ্ঞান কল্পনার এক নির্মাণ, যা বাস্তব প্রাচ্যের প্রতিফলন নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে গড়ে ওঠা একটি ধারণা মাত্র| আঠারো উনিশ শতকে ইউরোপসহ পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রাচ্য সম্পর্কে যে ধারণা সৃষ্টি হয় এবং যে জ্ঞান সেসব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান করা হতো তা সম্পূর্ণ কল্পনা প্রসূত| প্রাচ্যতত্ত্ব এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া, যেখানে ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সাংস্কৃতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রাচ্যের ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ধর্ম সমাজকে বিশেষভাবে উপস্থাপন করেছে| উপস্থাপনা নিরপেক্ষ ছিলো না| একাডেমিক, ক্ষমতার কাঠামো আধিপত্য বিস্তারের স্বার্থে গড়ে ওঠা এক জ্ঞানতাত্ত্বিক ব্যবস্থাই ছিলো প্রাচ্যতত্ত্ব| সাঈদ বলেছেন, ‘‘প্রাচ্য’’ বাস্তব কানো ভৌগোলিক অঞ্চল নয়| পশ্চিমা চিন্তার ভেতরে ˆতরি এক কল্পিত ধারণা| এতে প্রাচ্যবাসীকে পশ্চাৎপদ, রহস্যময়, অবিশ্বাসযোগ্য বা বিপজ্জনক হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, অষ্টাদশ উনিশ শতকে ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ যখন বিশ^ব্যাপী বিস্তৃত হচ্ছিলতখনই প্রাচ্যতত্ত্ব একটি একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে| ব্রিটিশ ফরাসি গবেষকরা আরবি, ফার্সি, উর্দু, সংস্কৃতসহ বিভিন্ন ভাষা শেখেন এবং সেসব ভাষার সাহিত্য চর্চা গবেষণা করতে শুরু করেন| কিন্তু এই গবেষণা মূলত প্রাচ্যকে জানার নিরপেক্ষ প্রচেষ্টা ছিলো না| এটি ছিলো তাদের ঔপনিবেশিক শাসনকে আরও দীর্ঘায়িত কার্যকর করার অন্যতম কৌশল| ফলে প্রাচ্যের সমাজ সংস্কৃতিকে যে রূপে ইউরোপীয়রা উপস্থাপন করেছেতা আসলে ছিলো পশ্চিমা মানসিক কাঠামোর প্রতিফলন| এর মধ্য দিয়ে তারা পশ্চিমকে অগ্রগামী, মহৎ, শিক্ষিত, মানবিক, উদার ˆনতিক হিসেবে উপস্থাপন করেছে| অপরদিকে প্রাচ্যকে পশ্চাৎপদ, হিংস্র, অশিক্ষিত, বর্বর অনৈতিক হিসেবে উপস্থাপনের বয়ান ˆতরি করেছে| এই ˆদ্বত কাঠামোর ফলে প্রাচ্যকে দখল করা, শাসন করা তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটি ন্যয্যতা ˆতরি হয় পশ্চিমাদের পক্ষে|

.

এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থে জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন মিশেল ফুকোর ‘‘জ্ঞান ক্ষমতার সম্পর্ক’’ এবং এন্তোনিও গ্রামসির ‘‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’’ তত্ত্বকে ব্যবহার করে| তিনি দেখিয়েছেন প্রাচ্যতত্ত্ব আসলে এক ধরনের ডিসকোর্স বা বয়ান| এই জ্ঞানের ভেতর দিয়ে পশ্চিমারা উপনিবেশিত দেশে ক্ষমতাকে প্রতিষ্ঠিত করে| গ্রন্থটিতে সাঈদ সাহিত্য, শিল্পকলা, ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান আন্তর্জাতিক রাজনীতির ওপরও এর প্রভাব ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন কীভাবে শেক্সপিয়র থেকে কিপলিং পর্যন্ত ইউরোপীয় সাহিত্যেও প্রাচ্যের চিত্র নির্মিত হয়েছে| আবার কীভাবে কূটনীতি পররাষ্ট্রনীতিতে প্রাচ্যতত্ত্ব কার্যকর ভূমিকা রেখেছে| মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কিত পশ্চিমা মিডিয়া একাডেমিক আলোচনাতেও ইসলাম আরব সংস্কৃতিকে বারবার সন্ত্রাস, হিংসা পশ্চাৎপদতার প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করেছে| সাঈদের মতে, প্রাচ্যবাদের মাধ্যমে পশ্চিমা সমাজ নিজেদেরকে যৌক্তিক, অগ্রসর উন্নত হিসেবে উপস্থাপন করেছে| অপরদিকে প্রাচ্যকে স্থবির, রহস্যময় অনুন্নত হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ফলে সাঈদ দৃঢ়ভাবে বলেনপ্রাচ্য আসলে পশ্চিমা জ্ঞানজগতের একটি নির্মাণ, বাস্তব প্রাচ্য সেখানে সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি|

.

প্রাচ্য শুধু রাজনৈতিকভাবে উপনিবেশিত হয়নি| সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবেও অধীন হয়েছে| যেমন: ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন ভারতীয় সমাজকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছে যাতে তাদের শাসনকে ‘‘আলোকায়নের যুগ বা সূচনা’’ হিসেবে একটি মহৎ মিশন বিবেচনা করা হয়| এভাবে প্রাচ্যকে শাসন কর্তৃত্ব জারি করণের ক্ষেত্রে দুটি কৌশল গ্রহণ করেছে পশ্চিমারা| একটি হলো, প্রাচ্যের বাস্তব চিত্রকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এমন একটি ইমেজ ˆতরি করা হয়েছে যেখানে প্রাচ্যের অধিবাসীরা নিজেদের নিকৃষ্ট ভাবতে শুরু করেছিলো| পশ্চিমা সাহিত্য, ভ্রমণ কাহিনি শিল্পকলায় প্রাচ্যকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেখানে নারী রহস্যময় যৌন আবেদনময়ী, সমাজ অযৌক্তিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন, মানুষ অক্ষম নিয়ন্ত্রণহীন| এতে পশ্চিমা পাঠকগণ যেমন বিনোদন পেয়েছে, তেমনি ঔপনিবেশিক শাসনকে নৈতিক বৈধতাও দিয়েছে| অপরটি হলো, পশ্চিমের একাডেমিক গবেষণা গণমাধ্যম প্রাচ্যের রাজনৈতিক ইমেজকে বিকৃত করেছে| মুসলমানদের বারবার ‘‘সন্ত্রাসী’’, ‘‘হিংস্র’’ ‘‘অসভ্য’’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে| ফলে প্রাচ্যের অধিবাসীরা আন্তর্জাতিকভাবে সব সময় ‘‘সন্দেহভাজন’’ হিসেবে গণ্য হয়েছে| সাঈদের এই তত্ত্বের মূল কথাগুলো সহজভাবে বলা যায় এভাবে

. প্রাচ্যবাদ একটি পশ্চিমানির্মাণ’ : সাঈদের মতে, ‘প্রাচ্যবাওরিয়েন্টবলতে যা বোঝানো হয়, তা কোনো বাস্তব ভৌগোলিক সত্য নয়| বরং এটি পশ্চিমা লেখকদের কল্পনা, সাহিত্য এবং রাজনীতির মাধ্যমে ˆতরি করা একটি ধারণা| পাশ্চাত্য নিজেকেউন্নতএবংযৌক্তিকহিসেবে প্রমাণ করার জন্য প্রাচ্যকেঅনুন্নত’, ‘অযৌক্তিকএবংঅসভ্যহিসেবে উপস্থাপন করেছে|

. আমরা বনাম তারা (অপরীকরণ) : সাঈদ দেখিয়েছেন যে, পাশ্চাত্য সবসময় একটি দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মাধ্যমে প্রাচ্যকে দেখেছে| পাশ্চাত্য শক্তিশালী, যৌক্তিক, সভ্য এবং মানবিক| প্রাচ্য দুর্বল, রহস্যময়, অলস, অসভ্য এবং নারীসুলভ| কাঠামোগতভাবে এই বিভাজনটি করা হয়েছে যাতে পাশ্চাত্য নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারে|

. জ্ঞান ক্ষমতার সম্পর্ক: সাঈদের তত্ত্বে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর প্রভাব রয়েছে| সাঈদ বলেন, “জ্ঞানই হলো ক্ষমতা|” ইউরোপীয় পণ্ডিতরা যখন প্রাচ্য সম্পর্কে বই লিখেছেন বা গবেষণা করেছেন, তখন তারা মূলত সাম্রাজ্যবাদকে ˆবধতা দিয়েছেন| প্রাচ্যকেঅক্ষমহিসেবে তুলে ধরার উদ্দেশ্য ছিল এটাই বোঝানো যেতাদের শাসন করা পশ্চিমাদের জন্য ন্যায্য|

. স্টিরিওটাইপিং বা গৎবাঁধা ধারণা: প্রাচ্যবাদীদের কাজকর্মে প্রাচ্যের মানুষদের কিছু নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলা হয়েছে| যেমন: আরব মানেই নিষ্ঠুর বা উগ্রবাদী| ভারতীয় মানেই আধ্যাত্মিকতায় ডুবে থাকা মানুষ| এই ধারণাগুলো প্রাচ্যের আসল ˆবচিত্র্য এবং সংস্কৃতিকে উপস্থাপন করে না|

ফলে প্রাচ্যবাদ মূলত পূর্বের ওপর পশ্চিমের আধিপত্য বজায় রাখার একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামো| এই ˆদ্বত কাঠামো উপলব্ধির জন্য ‘‘ওরিয়েন্টালিজম’’ গ্রন্থটি পাঠ এবং মনোজগতে এর সারকথা ধারণ করা উপনিবেশিত জাতির পক্ষে বাঞ্ছনীয়|

.

আধুনিক যুগে প্রাচ্যবাদ প্রসঙ্গ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সাঈদ ১৯৭৮ সালে বইটি লিখলেও, তার তত্ত্ব আজও গুরুত্বপূর্ণ| আধুনিক মিডিয়া এবং হলিউড কীভাবে প্রাচ্যের মুসলিম এশীয়দের চিত্রায়িত করেতা লক্ষ্য করলে দেখা যায়:

. চলচ্চিত্রে স্টিরিওটাইপ হচ্ছে দেদার| হলিউডের অনেক অ্যাকশন সিনেমায় আরব বা দক্ষিণ এশীয় চরিত্রদের হয়উগ্রবাদী’, না হয়হাস্যকরবাবোকাহিসেবে দেখানো হয়| তাদের নিজস্ব কোনো মানবিক গল্প থাকে না, তারা কেবল পশ্চিমা নায়কের হাতে মার খায়|

. নিউজ মিডিয়ার ভূমিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোতে যখন প্রাচ্যের যুদ্ধ বা দুর্ভিক্ষ অথবা অন্য কোনো সংকট দেখানো হয়, তখন প্রায়ই এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এই মানুষগুলো আদিম এবং তারা নিজেরা নিজেদের সমস্যা সমাধান করতে ব্যর্থ| এর পেছনে উদ্দেশ্য থাকে পশ্চিমা হস্তক্ষেপকে ˆবধতা দেওয়া এবং তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুপ্ত বাসনা|

. সংস্কৃতি হেজিমোনিও বিশেষ লক্ষ্যণীয়| প্রাচ্যের যোগব্যায়াম, হিজাব বা ঐতিহ্যবাহী পোশাককে যখন পশ্চিমা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি কেবল ‘‘অ্যাকজোটিক’’, ‘‘সেকেলে’’ দেখানোর জন্য ব্যবহার করে কিন্তু এর পেছনের ইতিহাসকে সম্মান করে না, সেটিও এক ধরনের আধুনিক প্রাচ্যবাদ হিসেবে বিবেচনা করা যায়|

.

তদুপরি এডওয়ার্ড সাঈদের তত্ত্বের সমালোচনাও কম নয়| তাঁর তত্ত্ব যেমন সমাদৃত হয়েছে, তেমনি অনেক পণ্ডিত এর সমালোচনাও করেছেন| অ্যান্টি-অক্সিডেন্টালিজম অনেকে মনে করেন, সাঈদ পশ্চিমাদের সমালোচনা করতে গিয়ে নিজেওপাশ্চাত্যবাদতৈরি করেছেন| অর্থাৎ, তিনি সব পশ্চিমা পণ্ডিতকে একইভাবেখারাপবাশোষকহিসেবে দেখেছেনযা পুরোপুরি সঠিক নয়| তবে, সাঈদপাশ্চাত্যবাদবিষয়টি অস্বীকার করে আত্মোন্মোচনের বিষয়ে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন| সমালোচকরা বলেন, অনেক পশ্চিমা পণ্ডিত কেবল ক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং জ্ঞানতৃষ্ণা থেকেই প্রাচ্যের ভাষা সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন| সাঈদ তাদের অবদানকে ছোট করেছেন| সাঈদ প্রাচ্যকে কেবল একটিশিকারহিসেবে দেখিয়েছেন| সমালোচকদের মতে, প্রাচ্যের মানুষরাও যে ইতিহাসের নির্মাতা এবং তারা যে পশ্চিমাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে, সাঈদ তা এড়িয়ে গেছেন| অস্পষ্ট ভৌগোলিক সীমা বলতে সাঈদ মূলত আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যকে ফোকাস করেছেন| ভারত, চীন, জাপান, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা বা রাশিয়ার ক্ষেত্রে প্রাচ্যবাদ কীভাবে কাজ করে, তা তার তত্ত্বে অনেকটাই অস্পষ্ট|


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত