সংবাদ

হুমকিতে টাঙ্গুয়ার হাওর: প্রকৃতি বাঁচবে তো?


প্রতিনিধি, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রতিনিধি, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

হুমকিতে টাঙ্গুয়ার হাওর: প্রকৃতি বাঁচবে তো?
টাঙ্গুয়ার রূপ রক্ষায় প্রয়োজন টেকসই পর্যটন। ছবি : সংবাদ

সুনামগঞ্জ জেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের একটি অনন্য ‘রামসার সাইট’ (Ramsar Site) এবং পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ECA)। হিজল-করচের বন, হাজার হাজার প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি এবং বৈচিত্র্যময় জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এই জলাভূমি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অবাধে মাছ শিকারের মতো কারণে হাওরের বাস্তুতন্ত্র এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।

বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম দৃশ্যমান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ডিজেলচালিত বোট চলাচলের বিকট শব্দে পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। শুধু শব্দদূষণই নয়, পর্যটকদের ব্যবহৃত পলিথিন, অপচনশীল প্লাস্টিক বোতল এবং হাউসবোটের অপরিশোধিত মানববর্জ্য সরাসরি হাওরের পানিতে মিশছে। এতে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণীরাও জীবনসংকটে পড়ছে।

সংরক্ষিত এলাকা বা ‘অভয়াশ্রম’ হওয়ার পরও টাঙ্গুয়ায় নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার থামছে না। ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ার কারণে মাছের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সংকুচিত হয়ে আসছে হাওরের বিশাল জীববৈচিত্র্য।

পর্যটন ও মাছ শিকারের বাইরেও আরও কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ হাওরের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বিপুল পলি হাওরের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে, যা জলাভূমির আয়তন ও পানির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, হাওরের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করা হিজল ও করচ বন কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে হাওরের পাড় ভেঙে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বন্যা ও খরাও এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচাতে এখনই কঠোর নীতি গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, নির্ধারিত ধারণক্ষমতা অনুযায়ী হাউসবোট চলাচলের লাইসেন্স দিতে হবে এবং অভয়ারণ্য এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌকার প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাওর এলাকায় প্লাস্টিক বহন নিষিদ্ধ করে ‘জিরো প্লাস্টিক’ নীতি কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি হাউসবোটে ইকো-ফ্রেন্ডলি স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা সময়ের দাবি।

পরিশেষে, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধুমাত্র সুনামগঞ্জের নয়, এটি দেশের সম্পদ। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হাওরের মূল বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। টেকসই নীতি প্রয়োগ ও স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ অচিরেই তার রূপ হারাবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬


হুমকিতে টাঙ্গুয়ার হাওর: প্রকৃতি বাঁচবে তো?

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬

featured Image

সুনামগঞ্জ জেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের একটি অনন্য ‘রামসার সাইট’ (Ramsar Site) এবং পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা (ECA)। হিজল-করচের বন, হাজার হাজার প্রজাতির দেশি ও পরিযায়ী পাখি এবং বৈচিত্র্যময় জলজ প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিল এই জলাভূমি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য এবং অবাধে মাছ শিকারের মতো কারণে হাওরের বাস্তুতন্ত্র এখন মারাত্মক হুমকির মুখে।

বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ ধ্বংসের অন্যতম দৃশ্যমান কারণ হলো অনিয়ন্ত্রিত হাউসবোট। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত ডিজেলচালিত বোট চলাচলের বিকট শব্দে পরিযায়ী ও স্থানীয় পাখির স্বাভাবিক বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে। শুধু শব্দদূষণই নয়, পর্যটকদের ব্যবহৃত পলিথিন, অপচনশীল প্লাস্টিক বোতল এবং হাউসবোটের অপরিশোধিত মানববর্জ্য সরাসরি হাওরের পানিতে মিশছে। এতে পানির গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জলজ প্রাণীরাও জীবনসংকটে পড়ছে।

সংরক্ষিত এলাকা বা ‘অভয়াশ্রম’ হওয়ার পরও টাঙ্গুয়ায় নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারী জালের ব্যবহার থামছে না। ছোট-বড় সব ধরনের মাছ ধরা পড়ার কারণে মাছের বংশবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সংকুচিত হয়ে আসছে হাওরের বিশাল জীববৈচিত্র্য।

পর্যটন ও মাছ শিকারের বাইরেও আরও কিছু প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ হাওরের আয়ু কমিয়ে দিচ্ছে। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা বিপুল পলি হাওরের তলদেশ ভরাট করে ফেলছে, যা জলাভূমির আয়তন ও পানির ধারণক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, হাওরের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করা হিজল ও করচ বন কেটে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের ফলে হাওরের পাড় ভেঙে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে বন্যা ও খরাও এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর বাঁচাতে এখনই কঠোর নীতি গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, নির্ধারিত ধারণক্ষমতা অনুযায়ী হাউসবোট চলাচলের লাইসেন্স দিতে হবে এবং অভয়ারণ্য এলাকায় ইঞ্জিনচালিত নৌকার প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, হাওর এলাকায় প্লাস্টিক বহন নিষিদ্ধ করে ‘জিরো প্লাস্টিক’ নীতি কার্যকর করতে হবে। প্রতিটি হাউসবোটে ইকো-ফ্রেন্ডলি স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং নিষিদ্ধ জালের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা সময়ের দাবি।

পরিশেষে, টাঙ্গুয়ার হাওর শুধুমাত্র সুনামগঞ্জের নয়, এটি দেশের সম্পদ। পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি হাওরের মূল বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। টেকসই নীতি প্রয়োগ ও স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধিতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ অচিরেই তার রূপ হারাবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত