বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ হাকালুকি হাওর এখন অস্তিত্বের সংকটে। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশের বৃহত্তম এই হাওরটি অনন্য মৎস্যসম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ও পরিযায়ী পাখির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ আহরণ ও বন উজাড়ের ফলে এর প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জুরি ও পানাই নদীর পানি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়া দিয়ে পুষ্ট এই হাওর বর্ষায় প্রায় ১৮ হাজার ১১৫ হেক্টর আয়তনের এক বিশাল জলরাশিতে রূপ নেয়। হাকালুকি নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত আছে নানা লোকগাথা। কারও মতে ‘হাঙ্গর লুকি’ থেকে এর নাম, আবার কেউ বলেন কুকি ও নাগা উপজাতিদের দেওয়া ‘লুকানো সম্পদ’ অর্থ থেকেই হাকালুকি নামের সৃষ্টি।
হুমকিতে মৎস্যসম্পদ ও উদ্ভিদ
রুই, কাতলা, বোয়াল, পাবদা ও চিতলসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছের বিচরণক্ষেত্র এই হাওর। বছরে প্রায় আড়াই হাজার টন মাছ উৎপাদন হলেও বর্তমানে বিষ প্রয়োগ ও ইজারাদারি প্রথার কারণে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। অন্যদিকে হাওরের জলনিমজ্জিত অরণ্যের বৈশিষ্ট্য হিজল, করচ ও বরুণ গাছ উজাড় হওয়ায় পাখিদের আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। শীতের পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যাও এখন আগের চেয়ে অনেক কম।
ঐতিহ্যবাহী বাথান সংস্কৃতি ও লোককথা
প্রকৃতির পাশাপাশি হাকালুকির সঙ্গে মিশে আছে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা। শুষ্ক মৌসুমে হাওরে গবাদিপশু পালনের ‘বাথান’ পদ্ধতি এ অঞ্চলের এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘আফদ’ নামের ভৌতিক শক্তি কিংবা ‘মাছের রাখাল’-এর মতো বৈচিত্র্যময় সব লোককথা ও বিশ্বাস।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
হাওরের প্রধান সংকট এখন দূষণ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দদূষণে হাওরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে ঢেউয়ের তোড়ে পাড় ভাঙন বাড়ছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, হাকালুকিকে রক্ষা করতে হলে টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি। বনায়ন জোরদার করার পাশাপাশি ইজারা প্রথায় সংস্কার এবং মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
হাকালুকি হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও লোকঐতিহ্যের ধারক। এই সম্পদ রক্ষা করা না গেলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ।

শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রাণপ্রবাহ হাকালুকি হাওর এখন অস্তিত্বের সংকটে। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দেশের বৃহত্তম এই হাওরটি অনন্য মৎস্যসম্পদ, জলজ উদ্ভিদ ও পরিযায়ী পাখির জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছ আহরণ ও বন উজাড়ের ফলে এর প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
জুরি ও পানাই নদীর পানি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ছড়া দিয়ে পুষ্ট এই হাওর বর্ষায় প্রায় ১৮ হাজার ১১৫ হেক্টর আয়তনের এক বিশাল জলরাশিতে রূপ নেয়। হাকালুকি নামের উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত আছে নানা লোকগাথা। কারও মতে ‘হাঙ্গর লুকি’ থেকে এর নাম, আবার কেউ বলেন কুকি ও নাগা উপজাতিদের দেওয়া ‘লুকানো সম্পদ’ অর্থ থেকেই হাকালুকি নামের সৃষ্টি।
হুমকিতে মৎস্যসম্পদ ও উদ্ভিদ
রুই, কাতলা, বোয়াল, পাবদা ও চিতলসহ প্রায় ১০০ প্রজাতির মাছের বিচরণক্ষেত্র এই হাওর। বছরে প্রায় আড়াই হাজার টন মাছ উৎপাদন হলেও বর্তমানে বিষ প্রয়োগ ও ইজারাদারি প্রথার কারণে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। অন্যদিকে হাওরের জলনিমজ্জিত অরণ্যের বৈশিষ্ট্য হিজল, করচ ও বরুণ গাছ উজাড় হওয়ায় পাখিদের আশ্রয়স্থল নষ্ট হচ্ছে। শীতের পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যাও এখন আগের চেয়ে অনেক কম।
ঐতিহ্যবাহী বাথান সংস্কৃতি ও লোককথা
প্রকৃতির পাশাপাশি হাকালুকির সঙ্গে মিশে আছে স্থানীয়দের জীবনযাত্রা। শুষ্ক মৌসুমে হাওরে গবাদিপশু পালনের ‘বাথান’ পদ্ধতি এ অঞ্চলের এক অনন্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘আফদ’ নামের ভৌতিক শক্তি কিংবা ‘মাছের রাখাল’-এর মতো বৈচিত্র্যময় সব লোককথা ও বিশ্বাস।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
হাওরের প্রধান সংকট এখন দূষণ। কৃষিকাজে ব্যবহৃত কীটনাশক ও ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দদূষণে হাওরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বন উজাড়ের ফলে ঢেউয়ের তোড়ে পাড় ভাঙন বাড়ছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, হাকালুকিকে রক্ষা করতে হলে টেকসই ব্যবস্থাপনা জরুরি। বনায়ন জোরদার করার পাশাপাশি ইজারা প্রথায় সংস্কার এবং মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সরাসরি সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
হাকালুকি হাওর শুধু একটি জলাভূমি নয়, এটি লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা ও লোকঐতিহ্যের ধারক। এই সম্পদ রক্ষা করা না গেলে অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক পরিবেশ।

আপনার মতামত লিখুন