ভূমধ্যসাগরের বুকে নীরব ঘাতকের আবির্ভাব ঘটেছে। মাইলজুড়ে বিস্তৃত অণুশৈবালের কারণে ইসরায়েলের অধিকাংশ সুপেয় পানি শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে। গত ৩০ আগস্ট দেশটির উপকূলীয় ছয়টি শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের জাতীয় পানি সরবরাহ কোম্পানি ‘মেকোরোট’ এই তথ্য জানিয়েছে।
এই অণুশৈবালের উৎপত্তি হয়েছে নীল নদের বদ্বীপে। সাগরের স্রোতের টানে তা উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে ইসরায়েলের উপকূলে এসে পৌঁছায় । গত ২০ বছর ধরে উপকূলীয় পানি পরীক্ষা করে আসা বেন-গুরিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইডো বার-জেভ বলেন, ‘আমি জীবনে প্রথমবার এত বিশাল মাত্রায় এমন কিছু দেখলাম।’
মেকোরোটের মুখপাত্র লিওর গুটম্যান বলেন, ‘ইসরায়েলে এই ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি... এটি অত্যন্ত বিরল।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই সুপেয় পানির কোনো বড় ঘাটতি হয়নি। শুষ্ক জলবায়ুর দেশ ইসরায়েলে কোনো বড় নদী বা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত নেই। বর্তমানে দেশের অন্তত ৬৫ শতাংশ সুপেয় পানি আসে সমুদ্রের লোনা পানি শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যার বেশিরভাগ শোধনাগার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র অণুজীব- মাইক্রোঅ্যালগি বা অণুশৈবাল, যা সূর্যালোক, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পানির পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে । অন্তত বারো মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অণুশৈবাল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ।
ইসরায়েলের শোধনাগারগুলো মূলত ‘রিভার্স অসমোসিস’ বা বিপরীত অভিস্রবণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় পানির বড় বড় দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে পানিকে প্রথমে প্রাক-পরিশোধন করা হয়। এরপর ফিল্টারের সাহায্যে লবণ, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণু দূর করে বিশুদ্ধ পানি আলাদা করা হয়।
ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, শৈবাল এবং এর থেকে নির্গত উপাদানগুলো ফিল্টারের মেমব্রেন বা ছাঁকনিগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অকেজো করে ফেলতে পারে। পানিতে ভাসমান অপদ্রব্যের পরিমাণ অতিরিক্ত বেশি হলে সাধারণ শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
শোধনাগারগুলো বন্ধের পর সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে সরকারের পানি বণ্টন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক বিকল্প পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্যালিলি সাগর থেকে পানি পাম্প করা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ কূপগুলো সচল করা হয়েছে এবং জাতীয় পানির রিজার্ভ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু শহরে সাময়িকভাবে বাগানে সেচ ও সুইমিং পুলের পানি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মূলত কৃষকদের ক্ষেত্রে সুপেয় পানি ব্যবহারে বড় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গুটম্যান জানান, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন গ্রীষ্মকালে পানির চাহিদা সবচেয়ে শীর্ষে থাকে। ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাময়িক সংকট একটি বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয়কে সামনে এনেছে। জলবায়ু সংকটের তীব্র তাপদাহ ও খরার মুখে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানি শোধনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় সমাধানের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বড় ঝুঁকিও বহন করে।
প্রথমবার নয়, এর আগেও ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে ক্ষতিকর লাল জোয়ারের (রেড টাইড) কারণে এই অঞ্চলের অনেক শোধনাগার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে একসঙ্গে দেশের উপকূলের একটি বিশাল অংশে একাধিক শোধনাগার বন্ধ হওয়া সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক বার-জেভ। তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামীতে এই ধরনের ঘটনার হার আরও বৃদ্ধি পাবে।
মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, সমুদ্রের স্রোত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শক্তিশালী ঝড়ের কারণে পানিতে ক্ষতিকর সার ও বর্জ্য মিশে শৈবালের এই বিশালাকার ব্লুমকে ত্বরান্বিত করছে। বার-জেভ আরও সতর্ক করে বলেন, সমুদ্রে বড় ধরনের তেল নিঃসরণ ঘটলে এই অণুশৈবালের চেয়েও অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য শোধনাগারগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়তে পারে, যা আরও বেশি ভীতিকর। সূত্র: সিএনএন

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ভূমধ্যসাগরের বুকে নীরব ঘাতকের আবির্ভাব ঘটেছে। মাইলজুড়ে বিস্তৃত অণুশৈবালের কারণে ইসরায়েলের অধিকাংশ সুপেয় পানি শোধনাগার বন্ধ হয়ে গেছে। গত ৩০ আগস্ট দেশটির উপকূলীয় ছয়টি শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের জাতীয় পানি সরবরাহ কোম্পানি ‘মেকোরোট’ এই তথ্য জানিয়েছে।
এই অণুশৈবালের উৎপত্তি হয়েছে নীল নদের বদ্বীপে। সাগরের স্রোতের টানে তা উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে ইসরায়েলের উপকূলে এসে পৌঁছায় । গত ২০ বছর ধরে উপকূলীয় পানি পরীক্ষা করে আসা বেন-গুরিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ইডো বার-জেভ বলেন, ‘আমি জীবনে প্রথমবার এত বিশাল মাত্রায় এমন কিছু দেখলাম।’
মেকোরোটের মুখপাত্র লিওর গুটম্যান বলেন, ‘ইসরায়েলে এই ধরনের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি... এটি অত্যন্ত বিরল।’ তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই সুপেয় পানির কোনো বড় ঘাটতি হয়নি। শুষ্ক জলবায়ুর দেশ ইসরায়েলে কোনো বড় নদী বা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত নেই। বর্তমানে দেশের অন্তত ৬৫ শতাংশ সুপেয় পানি আসে সমুদ্রের লোনা পানি শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যার বেশিরভাগ শোধনাগার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত।
বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেন, এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র অণুজীব- মাইক্রোঅ্যালগি বা অণুশৈবাল, যা সূর্যালোক, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পানির পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে । অন্তত বারো মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অণুশৈবাল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ।
ইসরায়েলের শোধনাগারগুলো মূলত ‘রিভার্স অসমোসিস’ বা বিপরীত অভিস্রবণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় পানির বড় বড় দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে পানিকে প্রথমে প্রাক-পরিশোধন করা হয়। এরপর ফিল্টারের সাহায্যে লবণ, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণু দূর করে বিশুদ্ধ পানি আলাদা করা হয়।
ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, শৈবাল এবং এর থেকে নির্গত উপাদানগুলো ফিল্টারের মেমব্রেন বা ছাঁকনিগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অকেজো করে ফেলতে পারে। পানিতে ভাসমান অপদ্রব্যের পরিমাণ অতিরিক্ত বেশি হলে সাধারণ শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
শোধনাগারগুলো বন্ধের পর সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে সরকারের পানি বণ্টন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক বিকল্প পদক্ষেপ নিয়েছে। গ্যালিলি সাগর থেকে পানি পাম্প করা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ কূপগুলো সচল করা হয়েছে এবং জাতীয় পানির রিজার্ভ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু শহরে সাময়িকভাবে বাগানে সেচ ও সুইমিং পুলের পানি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মূলত কৃষকদের ক্ষেত্রে সুপেয় পানি ব্যবহারে বড় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গুটম্যান জানান, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন গ্রীষ্মকালে পানির চাহিদা সবচেয়ে শীর্ষে থাকে। ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাময়িক সংকট একটি বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয়কে সামনে এনেছে। জলবায়ু সংকটের তীব্র তাপদাহ ও খরার মুখে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানি শোধনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় সমাধানের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বড় ঝুঁকিও বহন করে।
প্রথমবার নয়, এর আগেও ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে ক্ষতিকর লাল জোয়ারের (রেড টাইড) কারণে এই অঞ্চলের অনেক শোধনাগার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবে একসঙ্গে দেশের উপকূলের একটি বিশাল অংশে একাধিক শোধনাগার বন্ধ হওয়া সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক বার-জেভ। তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামীতে এই ধরনের ঘটনার হার আরও বৃদ্ধি পাবে।
মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, সমুদ্রের স্রোত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শক্তিশালী ঝড়ের কারণে পানিতে ক্ষতিকর সার ও বর্জ্য মিশে শৈবালের এই বিশালাকার ব্লুমকে ত্বরান্বিত করছে। বার-জেভ আরও সতর্ক করে বলেন, সমুদ্রে বড় ধরনের তেল নিঃসরণ ঘটলে এই অণুশৈবালের চেয়েও অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য শোধনাগারগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়তে পারে, যা আরও বেশি ভীতিকর। সূত্র: সিএনএন

আপনার মতামত লিখুন