একসময় যে প্রমত্তা নদী ছিল মানুষের চোখের জল আর নিঃস্ব হওয়ার কারণ, এখন সেই নদীর বুকেই স্বপ্নের ফসল বুনছেন উত্তরবঙ্গের ৪ লাখ পরিবার। ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও পদ্মার বুকে জেগে ওঠা ধূ ধূ বালুচরে কঠোর পরিশ্রমে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়েছেন নদীভাঙা মানুষ। বেলে-দোআঁশ মাটিতে এখন ফলছে সোনা, আর গবাদিপশুর খামার পাল্টে দিচ্ছে চরের চিরচেনা অভাবের চিত্র।
‘ইরিগেশন সাপোর্ট প্রজেক্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড নিয়ার ইস্ট’ (ইসপান)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রধান পাঁচটি নদ-নদীতে চরের আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭২২ দশমিক ৮৯ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট জমির ১ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চর রয়েছে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা অববাহিকায়। এই বিশাল ভূখণ্ডে বসবাসকারী প্রায় ৭ লাখ মানুষের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
বালুচরে সবুজের সমারোহ
কয়েক বছর আগেও যেসব চরে ঘাস পর্যন্ত জন্মাত না, এখন সেখানে বন্যায় জমে থাকা পলিমাটির কল্যাণে উর্বর আবাদি জমি তৈরি হয়েছে। দিগন্তবিস্তৃত এসব চরে এখন গম, ভুট্টা, সরিষা, চিনাবাদাম, মিষ্টি আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও হরেক রকমের শাকসবজি চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া ডালজাতীয় ফসলের বাম্পার ফলন চরের অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে।
সিরাজগঞ্জের চৌহালীর মিনারদিয়ার চরের কৃষক আতাউল বলেন, ‘বালুচরে কোনো ফসল হবে - এটা স্বপ্নেও ভাবিনি। এখন এই বালুচরেই আবাদ করে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে।’
খামারে সমৃদ্ধি ও দুগ্ধ বিপ্লব
চরের বিস্তৃত চারণভূমি এখন গবাদিপশু পালনের আদর্শ ক্ষেত্র। খোলামেলা পরিবেশে রোগবালাই কম হওয়ায় অনেক পরিবার গড়ে তুলেছেন গরু-মহিষ ও ছাগলের ছোট ছোট খামার। পাবনার বেড়া উপজেলার চর নাগদা ও চর সাঁড়াশিয়ার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন গবাদিপশুর খামার রয়েছে।
দুধ ব্যবসায়ী আব্দুল আউয়াল জানান, তিনি প্রতিদিন চর থেকে কমপক্ষে ২৫ মণ দুধ সংগ্রহ করে বিভিন্ন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করেন। চরাঞ্চলে উৎপাদিত এই দুধ এখন জাতীয় পর্যায়ে পুষ্টির চাহিদা মেটাতে বড় ভূমিকা রাখছে।
বঞ্চিত তবুও লড়াকু
ভাগ্যবদল হলেও চরের বাসিন্দারা এখনো মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেকটা বঞ্চিত। বিশেষ করে দুর্গম চরে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা পৌঁছায়নি বললেই চলে। স্থানীয়দের দাবি, চরের এই কৃষি ও খামার ব্যবস্থাকে টেকসই করতে হলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চরাঞ্চলের এই সম্ভাবনাময় কৃষি ও পশুপালন খাতকে সঠিক পরিকল্পনার আওতায় আনা গেলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটাতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন